আল কুরআনে বর্ণিত জান্নাতের বর্ণনা -আবু হুসাইন

পর্ব-২
জান্নাতে কে না যেতে চাই। সবাই একবাক্য বলে আমি জান্নাতে যেতে চাই। কিন্তু এই জান্নাত কী? এখানে কী কী জিনিস থাকবে? এর সঙ্গী-সাথী হবে কারা? এদের পোশাক হবে কী? সেখানে কী কী নেয়ামত থাকবে? আল-কোরআনে সকল ব্যাপারে জান্নাতের কথা বলা হয়নি। শুধুমাত্র ইসলামের প্রায়োগিক দিকগুলো যে মেনে চলবে তার ব্যাপারে জান্নাতের কথা বলা হয়েছে।
আল-কোরআনে জান্নাতের ব্যাপারে সে সমস্ত নিয়ামত ও পরিচয়ের কথা বলা হয়েছে সে সংক্রান্ত আয়াতগুলোই এই সঙ্কলনে তুলে ধরা হয়েছে।

অভিবাদন ও মোবারকবাদ
অপরদিকে যারা দুনিয়ায় ঈমান এনেছে এবং যারা সৎকাজ করেছে তাদেরকে এমন বাগিচায় প্রবেশ করানো হবে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তারা তাদের রবের অনুমতিক্রমে চিরকাল বসবাস করবে। সেখানে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানো হবে শান্তি ও নিরাপত্তার মোবারকবাদ সহকারে। (১৪:২৩)
তারা প্রার্থনা করে থাকে, “হে আমাদের রব! আমাদের নিজেদের স্ত্রীদের ও নিজেদের সন্তানদেরকে নয়নশীতলকারী বানাও এবং আমাদের করে দাও মুত্তাকিদের ইমাম।” (এরাই নিজেদের সবরের ফল উন্নত মনজিলের আকারে পাবে। অভিবাদন ও সালাম সহকারে তাদের সেখানে অভ্যর্থনা করা হবে। তারা সেখানে থাকবে চিরকাল। কী চমৎকার সেই আশ্রয় এবং সেই আবাস! (২৫:৭৪-৭৬)
যেদিন তারা তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করবে, তাদের অভ্যর্থনা হবে সালামের মাধ্যমে এবং তাদের জন্য আল্লাহ বড়ই সম্মানজনক প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। (৩৩:৪৪-৪৫)
আর যারা তাদের রবের অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকতো তাদেরকে দলে দলে জান্নাত অভিমুখে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে তারা যখন সেখানে পৌঁছবে তখন দেখবে জান্নাতের দরজাসমূহ পূর্বেই খুলে দেয়া হয়েছে। ব্যবস্থাপকরা তাদের বলবে, তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমরা অত্যন্ত ভালো ছিলে, চিরকালের জন্য এখানে প্রবেশ করো। (৩৯:৭৩)
তারা নিজেরা তার মধ্যে প্রবেশ করবে এবং তাদের বাপ-দাদারা ও স্ত্রী-সন্তানদের মধ্য থেকে যারা সৎকর্মশীল হবে তারাও তাদের সাথে সেখানে যাবে। ফেরেশতারা সব দিক থেকে তাদেরকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য আসবে এবং তাদেরকে বলবে : “তোমাদের প্রতি শান্তি। তোমরা দুনিয়ায় যেভাবে সবর করে এসেছো তার বিনিময়ে আজ তোমরা এর অধিকারী হয়েছো।” কাজেই কতই চমৎকার এ আখেরাতের গৃহ! (১৩:২৩-২৪)

আল্লাহর সন্তুষ্টি
তোমরা কখনো এমন দেখতে পাবে না যে, যারা আল্লাহ ও আখেরাতের প্রতি ঈমান পোষণ করে তারা এমন লোকদের ভাল বাসছে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করেছে। তারা তাদের পিতা, অথবা পুত্র অথবা ভাই অথবা গোষ্ঠীভুক্ত হলেও তাতে কিছু এসে যায় না। আল্লাহ এসব লোকদের হৃদয়-মনে ঈমান বদ্ধমূল করে দিয়েছেন এবং নিজের পক্ষ থেকে একটি ‘রূহ’ দান করে তাদের শক্তি জুগিয়েছেন। তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে নহরসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। তারা সেখানে চিরদিন অবস্থান করবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। তারা আল্লাহর দলের লোক। জেনে রেখো আল্লাহর দলের লোকেরাই সফলকাম। (৫৮:২২)
আল্লাহর নাফরমানি থেকে আত্মরক্ষাকারীরা নিশ্চিতরূপে বাগান ও ঝর্নাসমূহের মধ্যে অবস্থান করবে, সত্যিকার মর্যাদার স্থানে মহাশক্তিধর সম্রাটের সান্নিধ্যে। (৫৪:৫৪-৫৫)
(অন্য দিকে বলা হবে) হে প্রশান্ত আত্মা! চলো তোমার রবের দিকে, এমন অবস্থায় যে তুমি (নিজের শুভ পরিণতিতে) সন্তুষ্ট (এবং তোমরা রবের প্রিয়পাত্র) শামিল হয়ে যাও আমার (নেক) বান্দাদের মধ্যে এবং প্রবেশ করো আমার জান্নাতে। (৮৯:২৭-৩০)
যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তারা নিশ্চিতভাবে সৃষ্টির সেরা। তাদের পুরস্কার রয়েছে তাদের রবের কাছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। এসব সে ব্যক্তির জন্য যে তার রবকে ভয় করে। (৯৮:৭-৮)
মুহাজির ও আনসারদের মধ্যে থেকে যারা সবার আগে ঈমানের দাওয়াত গ্রহণ করার ব্যাপারে উদ্যোগী হয়েছে এবং যারা পরে নিষ্ঠাসহকারে তাদের অনুসরণ করছে আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন বাগান তৈরি করে রেখেছেন যার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে এবং তারা তার মধ্যে থাকবে চিরকাল। এটাই মহা সাফল্য। (৯:১০০)
তখন আল্লাহ বলবেন, এটি এমন একটি দিন যেদিন সত্যবাদীদেরকে তাদের সত্যতা উপকৃত করে। তাদের জন্য রয়েছে এমন বাগান যার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হচ্ছে। এখানে তারা থাকবে চিরকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন এবং তারাও আল্লাহর প্রতি। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। (৫:১১৯)

আল্লাহর প্রতিশ্রুতি
এ ধরনের মানুষের কাছে থেকে তাদের উত্তম আমলসমূহ আমি গ্রহণ করে থাকি, তাদের মন্দ কাজসমূহ ক্ষমা করে দেই। যে প্রতিশ্রুতি তাদের দিয়ে আসা হয়েছে তা ছিলো সত্য প্রতিশ্রুতি। সেই প্রতিশ্রুতি অনুসারে এরা জান্নাতি লোকদের অন্তর্ভুক্ত হবে। (৪৬:১৬)
এ শ্রেণীর লোক যারা ঈমান আনয়ন করছে এবং সৎকাজ করেছে আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা ও বড় পুরস্কারের প্রতিশ্রতি দিয়েছেন। (৪৮:২৯)
যারা আল্লাহকে ভয় করে তাদের জন্য যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছে তার অবস্থা হচ্ছে এই যে, তার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হচ্ছে, তার ফলসমূহ চিরস্থায়ী এবং তার ছায়ার বিনাশ নেই। এ হচ্ছে মুত্তাকিদের পরিণাম। (১৩:৩৫)
আর যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে তাদেরকে আমি এমন সব বাগিচায় প্রবেশ করাবো যার নিম্নদেশ দিয়ে ঝরনাধারা প্রবাহিত হতে থাকবে এবং তারা সেখানে থাকবে চিরস্থায়ীভাবে। এটি আল্লাহর সাচ্চা ওয়াদা। আর আল্লাহর চাইতে বেশি সত্যবাদী আর কে হতে পারে? (৪:১২২)
তবে যারা তওবা করবে, ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তাদের সমান্যতম অধিকারও ক্ষুণœ হবে না। তাদের জন্য রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত, যার প্রতিশ্রুতি করুণাময় নিজের বান্দাদের কাছে অদৃশ্য পন্থায় দিয়ে রেখেছেন। আর অবশ্যই এ প্রতিশ্রুতি পালিত হবেই। (১৯:৬০-৬১)
তবে যারা ঈমান আনে ও সৎকাজ করে তাদের জন্য রয়েছে নিয়ামতে পরিপূর্ণ জান্নাত, যেখানে তারা থাকবে চিরকাল। এ হচ্ছে আল্লাহর অকাট্য প্রতিশ্রুতি এবং তিনি পরাক্রমশালী ও জ্ঞানময়। (৩১:৮-৯)

চিরস্থায়ী
আর যারা ঈমান আনবে এবং সৎকাজ করবে তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে থাকবে তারা চিরকাল। (২:৮২)
অন্যদিকে রাসূল ও তার ঈমানদার সাথীরা নিজেদের জান-মাল দিয়ে জিহাদ করেছে। সমস্ত কল্যাণ এখন তাদের জন্য এবং তারাই সফলকাম হবে। আল্লাহ তাদের জন্য এমন বাগান তৈরি করে রেখেছেন, যার নিম্নদেশে স্রোতস্বিনী প্রবাহিত হচ্ছে। তার মধ্যে তারা থাকবে চিরকাল। এটাই মহা সাফল্য। (৯:৮৮-৮৯)
তবে যারা ঈমান আনে, সৎকাজ করে এবং নিজের রবের একনিষ্ঠ অনুগত বান্দা হয়ে থাকে, তারা নিশ্চিত জান্নাতের অধিবাসী এবং জান্নাতে তারা চিরকাল থাকবে।  (১১:২৩)
আর যারা ভাগ্যবান হবে, তারা জান্নাতে যাবে এবং সেখানে চিরকাল থাকবে, যতদিন পৃথিবী ও আকাশ প্রতিষ্ঠিত থাকবে, তবে যদি তোমার রব অন্য কিছু করতে চান। এমন পুরস্কার তারা পাবে যার ধারাবাহিকতা কখনো ছিন্ন হবে না। (১১:১০৮)
তাদের অবস্থা হয় এই যে, নিজেদের রবের সন্তুষ্টির জন্য তারা সবর করে, নামাজ কায়েম করে, আমার দেয়া রিজিক থেকে প্রকাশ্যে ও গোপনে খরচ করে এবং ভালো দিয়ে মন্দ দূরীভূত করে। আখেরাতের গৃহ হচ্ছে তাদের জন্যই। অর্থাৎ এমন সব বাগান যা হবে তাদের চিরস্থায়ী আবাস। (১৩:২২)
এ ধরনের সব মানুষ জান্নাতে যাবে। তারা সেখানে চিরদিন থাকবে, তাদের সেই কাজের বিনিময়ে যা তারা পৃথিবীতে করেছিলো। (৪৬:১৪)
যে ব্যক্তিই আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে এবং নেককাজ করবে আল্লাহ তাকে এমন সব জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার নিচে দিয়ে ঝরনা বয়ে চলবে। এসব লোক সেখানে চিরদিন থাকবে। এসব লোকের জন্য আল্লাহ সর্বোত্তম রিজিক রেখেছেন। (৬৫:১১)
(এ বিষয়ে তোমরা টের পাবে সেইদিন, যখন একত্র করার দিন তোমাদের সবাইকে তিনি একত্র করবেন। সেদিনটি হবে তোমাদের পরস্পরের হার-জিতের দিন। যে আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছে এবং নেক আমল করে আল্লাহ তা’আলা তার গোনাহ মুছে ফেলবেন আর তাকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পাদদেশ দিয়ে ঝরনা বইতে থাকবে। এসব লোক চিরস্থায়ীভাবে সেখানে থাকবে। এটাই বড় সফলতা। (৬১:৯)

ভয় ও দুঃখ বিহীন জীবন
সেখানে তারা কখনো মৃত্যুর স্বাদ চাখবে না। তবে দুনিয়াতে যে মৃত্যু এসেছিলো তা তো এসেই গেছে। আর আল্লাহ তাঁর করুণায় তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবেন। এটাই বড় সফলতা। (৪৪:৫৬-৫৭)
আর এ জান্নাতের অধিবাসীরা কি তারাই নয়, যাদের সম্পর্কে তোমরা কসম খেয়ে বলতে, এদেরকে তো আল্লাহ তাঁর রহমত থেকে কিছুই দেবেন না। আজ তাদেরকেই বলা হয়েছে, প্রবেশ করো জান্নাতে তোমাদের কোন ভয়ও নেই, দুঃখও নেই।” (৭:৪৯)
যারা কল্যাণের পথ অবলম্বন করেছে তাদের জন্য আছে কল্যাণ এবং আরো বেশি। কলঙ্ক কালিমা বা লাঞ্ছনা তাদের চেহারাকে আবৃত করবে না। তারা জান্নাতের হকদার, সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। (১০:২৬)
সেখানে তারা কোন বাজে কথা শুনবে না, যা কিছুই শুনবে ঠিকই শুনবে। আর সকাল সন্ধ্যায় তারা অনবরত নিজেদের রিজিক লাভ করতে থাকবে। এ হচ্ছে সেই জান্নাত, যার উত্তরাধিকারী করবো আমি আমার বান্দাদের মধ্য থেকে মুত্তাকিদেরকে। (১৯:৬২-৬৩)
এ ঘটনায় আমি আদমকে বললাম, “দেখো, এ তোমার ও তোমার স্ত্রীর, শত্রু, এমন যেন না হয় যে, এ তোমাদেরকে জান্নাত থেকে বের করে দেয় এবং তোমরা বিপদে পড়ে যাও। এখানে তো তুমি এ সুবিধে পাচ্ছো যে, তুমি না অভুক্ত ও উলঙ্গ থাকছো এবং না পিপাসার্ত ও রৌদ্রক্লান্ত হচ্ছো। (২০:১১৭-১১৯)
তবে যাদের ব্যাপারে আমার পক্ষ থেকে পূর্বাহ্নেই কল্যাণের ফয়সালা হয়ে গেছে তাদেরকে অবশ্যই এ থেকে দূরে রাখা হবে, তারা সামান্যতম খস্খসানিও তারা শুনবে না এবং তারা চিরকাল নিজেদের মনমতো জিনিসের মধ্যে অবস্থান করবে। সেই চরম ভীতিকর অবস্থা তাদেরকে একটুও পেরেশান করবে না এবং ফেরেশতারা এগিয়ে এসে তাদেরকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাবে এই বলে, “এ তোমাদের সেই দিন যার প্রতিশ্রুতি তোমাদের দেয়া হতো।” (২১:১০১-১০৩)
অন্য দিকে যেসব লোক এখানে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদেরকে আল্লাহ তাদের সাফল্যের পন্থা অবলম্বনের জন্যই নাজাত দেবেন। কোন অকল্যাণ তাদেরকে স্পর্শ করবে না এবং তারা দুঃখ ভারাক্রান্তও হবে না। (৩৯:৬১)
যারা আমার আয়াতসমূহের ওপর ঈমান এনেছিলো এবং আমার আদেশের অনুগত হয়েছিল। সেই দিন তাদের বলা হবে, “হে আমার বান্দারা, আজ তোমাদের কোন ভয় নেই এবং কোন দুঃখও আজ তোমাদের স্পর্শ করবে না। (৪৩:৬৮-৬৯)
যারা ঘোষণা করেছে আল্লাহই আমাদের রব, অতঃপর তার ওপরে স্থির থেকেছে নিশ্চয়ই তাদের জন্য কোন ভয় নেই এবং তারা মনমরা ও দুঃখ ভারাক্রান্ত হবে না। (৪৬:১৩)

জান্নাতিদের প্রশান্তি
অন্য দিকে যারা আমার আয়াত মেনে নিয়েছে এবং সৎকাজ করেছে আর এ পর্যায়ে আমি কাউকে তার সামর্থের অতিরিক্ত দায়িত্ব অর্পণ করি না তারা হচ্ছে জান্নাতবাসী। সেখানে তারা থাকবে চিরকাল। তাদের মনে পরস্পরের বিরুদ্ধে যা কিছু গ্লানি থাকবে তা আমি বের করে দেবো। তাদের নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবাহিত হবে এবং তারা বলবে : “প্রশংসা সব আল্লাহরই জন্য, যিনি আমাদের এ পথ দেখিয়েছেন। আমরা নিজেরা পথের সন্ধান পেতাম না যদি না আল্লাহ আমাদের পথ দেখাতেন। আমাদের রবের পাঠানো রাসূলগণ যথার্থ সত্য নিয়েই এসেছিলেন।” সে সময় আওয়াজ ধ্বনিত হবে : “তোমাদেরকে এই যে জান্নাতের উত্তরাধিকারী বানানো হয়েছে, এটা তোমরা লাভ করেছো সেই সমস্ত কাজের প্রতিদানে যেগুলো তোমরা অব্যাহতভাবে করতে।” তারপর জান্নাতের অধিবাসীরা জাহান্নামের অধিবাসীদেরকে ডেকে বলবে : “আমাদের রব আমাদের সাথে যে সমস্ত ওয়াদা করেছিলেন তার সবগুলোকেই আমরা সঠিক পেয়েছি, তোমাদের রব যেসব ওয়াদা করেছিলেন, তোমরাও কি সেগুলোকে সঠিক পেয়েছো। (৭:৪২-৪৪)
আবার এ কথাও সত্য, যারা ঈমান আনে (অর্থাৎ যারা এ কিতাবে পেশকৃত সত্যগুলো গ্রহণ করে) এবং সৎকাজ করতে থাকে, তাদেরকে তাদের রব তাদের ঈমানদের কারণে সোজা পথে চালাবেন। নিয়ামতভরা জান্নাতে যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত হবে। সেখানে তাদের ধ্বনি হবে “পবিত্র তুমি যে আল্লাহ”! তাদের দোয়া হবে, “শান্তি ও নিরাপত্তা হোক”! এবং তাদের সবকথার শেষ হবে এভাবে, “সমস্ত প্রশংসা বিশ্ব-জাহানের রব আল্লাহর জন্য।” (১০:৯-১০)
চিরন্তন অবস্থানের জান্নাত, যার মধ্যে তারা প্রবেশ করবে, পাদদেশে প্রবাহিত হতে থাকবে নদী এবং সবকিছুই সেখানে তাদের কামনা অনুযায়ী থাকবে। এ পুরস্কার দেন আল্লাহ মুত্তাকিদেরকে। এমন মুত্তাকিদেরকে, যাদের পবিত্র থাকা অবস্থায় ফেরেশতারা যখন মৃত্যু ঘটায় তখন বলে, “তোমাদের প্রতি শান্তি, যাও নিজেদের কর্মকান্ডের বদৌলতে জান্নাতে প্রবেশ করো।” (১৬:৩১-৩২)
তবে যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তাদের আপ্যায়নের জন্য থাকবে ফেরদৌসের বাগান। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে এবং কখনো সে স্থান ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে তাদের মন চাইবে না। (১৮:১০৭-১০৮)
তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীরা জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমাদের খুশি করা হবে।” (৪৩:৭০)
তারা একে অপরকে (পৃথিবীতে অতিবাহিত) অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করবে। তারা বলবে আমরা প্রথমে নিজের পরিবারের লোকদের মধ্যে ভয়ে ভয়ে জীবন যাপন করতাম। পরিশেষে আল্লাহ আমাদের ওপর মেহেরবানি করেছেন এবং দগ্ধকারী আজাব থেকে আমাদের রক্ষা করেছেন। অতীত জীবনে আমরা তাঁর কাছেই দোয়া করতাম সত্যিই তিনি অতি বড় উপকারী ও দয়াবান। (৫২:২৫-২৮)
যেদিন তোমরা ঈমানদার নারী ও পুরুষদের দেখবে, তাদের ‘নূর’ তাদের সামনে ও ডান দিকে দৌড়াচ্ছে। (তাদেরকে বলা হবে) “আজ তোমাদের জন্য সুসংবাদ।” জান্নাতসমূহ থাকবে যার পাদদেশ দিয়ে ঝরনাধারাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। যেখানে তারা চিরকাল থাকবে। এটাই বড় সফলতা। (৫৭:১২)
প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের কাছে দায়বদ্ধ। তবে ডান দিকের লোকেরা ছাড়া যারা জান্নাতে অবস্থান করবে। সেখানে তারা অপরাধীদের জিজ্ঞসা করতে থাকবে, কিসে তোমাদের দোজখে নিক্ষেপ করলো। তারা বলবে : আমরা নামাজ পড়তাম না। অভাবীদের খাবার দিতাম না। সত্যের বিরুদ্ধে অপবাদ রটনাকারীদের সাথে মিলে আমরাও রটনা করতাম; প্রতিফল দিবস মিথ্যা মনে করতাম। শেষ পর্যন্ত আমরা সে নিশ্চিত জিনিসের মুখোমুখি হয়েছি। সে সময় সুপারিশকারীদের কোন সুপারিশ তাদের কাজে আসবে না। এদের হলো কি যে এরা এ উপদেশবাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে যেন তারা বাঘের ভয়ে পলায়নপর বন্য গাধা। (৭৪:৩৮-৫১)
মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, এরা সবাই পরস্পরের বন্ধু ও সহযোগী। এরা ভালো কাজের হুকুম দেয় এবং খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করে। এরা এমন লোক যাদের ওপর আল্লাহর রহমত নাজিল হবেই। অবশ্যই আল্লাহ সবার ওপর পরাক্রমশালী এবং জ্ঞানী ও বিজ্ঞ। এ মুমিন পুরুষ ও নারীকে আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তাদেরকে তিনি এমন বাগান দান করবেন যার নিম্নদেশে ঝরনাধারা প্রবহমান হবে এবং তারা তার মধ্যে চিরকাল বাস করবে। এসব চিরসবুজ বাগানে তাদের জন্য থাকবে বাসগৃহ এবং সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করবে। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। (৯:৭১-৭২)
প্রকৃত ব্যাপার এই যে, আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের প্রাণ ও ধন-সম্পদ জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নিয়েছেন। তারা আল্লাহর পথে লড়াই করে এবং মারে ও মরে। তাদের প্রতি তাওরাত, ইনজিল ও কুরআনে (জান্নাতের ওয়াদা) আল্লাহর জিম্মায় একটি পাকাপোক্ত ওয়াদা বিশেষ। আর আল্লাহর চাইতে বেশি নিজের ওয়াদা পূরণকারী আর কে আছে। কাজেই তোমরা আল্লাহর সাথে যে কেনা-বেচা করছো সে জন্য আনন্দ করো। এটিই সবচেয়ে বড় সাফল্য। আল্লাহর দিকে বারবার প্রত্যাগমনকারী তার ইবাদতকারী, তার প্রশংসা বাণী উচ্চারণকারী, তার জন্য জমিনে বিচরণকারী তার সামনে রুকু ও সিজদাকারী, সৎকাজের আদেশকারী, অসৎকাজ থেকে বিরতকারী এবং আল্লাহর সীমারেখা সংরক্ষণকারী (সেই সব মুমিন হয়ে থাকে যারা আল্লাহর সাথে কেনাবেচার সওদা করে) আর হে নবী! এ মুমিনদেরকে সুখবর দাও! (৯:১১১-১১২)
নিশ্চিতভাবে সফলকাম হয়েছে মু’মিনরা যারা নিজেদের নামাজে বিনয়াবনত হয়, বাজে কাজ থেকে দূরে থাকে, জাকাতের পথে সক্রিয় থাকে, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে, নিজেদের স্ত্রীদের ও অধিকারভুক্ত বাঁদীদের ছাড়া, এদের কাছে (হেফাজত না করলে) তারা তিরস্কৃত হবে না, তবে যারা এর বাইরে আরো কিছু চাইবে তারাই হবে সীমালঙ্ঘনকারী, নিজেদের আমানত ও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে এবং নিজেদের নামাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণ করে, তারাই এমন ধরনের উত্তরাধিকারী যারা নিজেদের উত্তরাধিকার হিসেবে ফিরদাউস লাভ করবে এবং সেখানে তারা থাকবে চিরকাল।  (২৩:১-১১)
তবে যে বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আল্লাহর সামনে হাজির হবে। (সেদিন) জান্নাত মুত্তাকিদের কাছাকাছি নিয়ে আসা হবে। (২৬:৮৯-৯০)
এ কথা সুনিশ্চিত যে, যে পুরুষ ও নারী মুসলিম, মুমিন, হুকুমের অনুগত, সত্যবাদী, সবরকারী, আল্লাহর সামনে বিনত, সাদকাদানকারী, রোজা পালনকারী, নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজতকারী এবং আল্লাহকে বেশি বেশি স্মরণকারী আল্লাহ তাদের জন্য মাগফিরাত এবং প্রতিদানের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। (৩৩:৩৫)
হে ঈমান আনয়নকারীগণ! আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি ব্যবসায়ের সন্ধান দেবো যা তোমাদেরকে কঠিন আজাব থেকে মুক্তি দেবে? তোমরা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আন এবং আল্লাহর পথে অর্থ-সম্পদ ও জান-প্রাণ দিয়ে জিহাদ করো এটাই তোমাদের জন্য অতীব কল্যাণকর যদি তোমরা তা জান। আল্লাহ তোমাদের গোনাহ মাফ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে এমনসব বাগানে প্রবেশ করাবেন যার নিচে দিয়ে ঝরনাধারা বয়ে চলবে। আর চিরস্থায়ী বসবাসের জায়গা জান্নাতের মধ্যে তোমাদেরকে সর্বোত্তম ঘর দান করবেন। এটাই বড় সফলতা। (৬১:১০-১২)
তোমাদের অর্থ-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি একটি পরীক্ষা। আর কেবলমাত্র আল্লাহর কাছে আছে বিরাট প্রতিদান। তাই যথাসাধ্য আল্লাহকে ভয় করে চলো। শোন, আনুগত্য করো এবং নিজেদের সম্পদ ব্যয় করো। এটা তোমাদের জন্যই ভাল। যে মনের সঙ্কীর্ণতা থেকে মুক্ত থাকলো সেই সফলতা লাভ করবে। যদি তোমরা আল্লাহকে করজে হাসানা দাও তাহলে তিনি তোমাদেরকে তা কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেবেন এবং তোমাদের ভুল-ত্রুটি ক্ষমা করবেন। আল্লাহ সঠিক মূল্যায়নকারী ও অতীব সহনশীল। সামনে উপস্থিত ও অনুপস্থিত সবকিছুই তিনি জানেন। তিনি মহাপরাক্রমশালী ও মহাজ্ঞানী। (৬৪:১৫-১৮)
হে ঈমানদারগণ, আল্লাহর কাছে তওবা করো, প্রকৃত তওবা। অসম্ভব নয় যে, আল্লাহ তোমাদের দোষত্রুটিসমূহ দূর করে দেবেন এবং এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যারা পাদদেশ দিয়ে ঝরনাসমূহ প্রবাহিত হতে থাকবে। সেটি হবে এমন দিন যেদিন আল্লাহ তাঁর নবী এবং নবীর সঙ্গী ঈমানদারদের লাঞ্ছিত করবেন না। তাদের ‘নূর’ তাদের সামনে ও ডান দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকবে এবং তারা বলতে থাকবে, হে আমাদের রব, আমাদের জন্য আমাদের ‘নূর’ পূর্ণাঙ্গ করে দাও ও আমাদেরকে ক্ষমা করে দাও। তুমি সব কিছু করতে সক্ষম। (৬৬:৮)
তবে যারা নামাজ পড়ে (তারা এ দোষ থেকে মুক্ত)। যারা নামাজ আদায়ের ব্যাপারে সবসময় নিষ্ঠাবান। যাদের সম্পদে নির্দিষ্ট হক আছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের। যারা প্রতিফলের দিনটিকে সত্য বলে মানে। যারা তাদের প্রভুর আজাবকে ভয় করে। কারণ তাদের প্রভুর আজাব এমন বস্তু নয় যে সম্পর্কে নির্ভয় থাকা যায়। যারা নিজেদের লজ্জাস্থান নিজের স্ত্রী অথবা মালিকানাধীন স্ত্রীলোকদের ছাড়া অন্যদের থেকে হিফাজত করে। স্ত্রী ও মালিকানাধীন স্ত্রীলোকদের ক্ষেত্রে তারা তিরস্কৃত হবে না। তবে যারা এর বাইরে আর কেউকে চাইবে তারা সীমালঙ্ঘনকারী। যারা আমনত রক্ষা করে ও প্রতিশ্রুতি পালন করে। আর যারা সাক্ষ্য দানের ক্ষেত্রে সততার ওপর অটল থাকে। যারা নামাজের হিফাজত করে। এসব লোক সম্মানের সাথে জান্নাতের বাগানসমূহে অবস্থান করবে। তাদের প্রত্যেকে কি এ আশা করে যে, তাকে প্রাচুর্যে ভরা জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ দেয়া হবে। (৭০:২২-৩৮)
(সমাপ্ত)

SHARE

Leave a Reply