আল-কুরআনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি -এস এম জি মোস্তফা

আল-কুরআন হচ্ছে একটি বিজ্ঞানময় গ্রন্থ, যা মহান আল্লাহ তায়ালা নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর উপর দীর্ঘ ২৩ বছরে ধারাবাহিকভাবে নাযিল করেছেন। আল-কুরআন রাসূল (সা.)-এর জীবনের সবচেয়ে বড় মোজেজা। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে এ মহাগ্রন্থের প্রত্যেকটি আয়াতেই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বৈজ্ঞানিক বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে। আবিষ্কৃত অনাবিষ্কৃত সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের তথ্য ও তত্ত্ব রয়েছে মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে। এ কিতাব কখনো পুরনো বা জীর্ণ হবে না। এর আশ্চর্য ধরনের বিস্ময়কারিতা কখনো ক্ষান্ত হবে না। এই কিতাব জ্ঞান-বিজ্ঞানের কূলকিনারাহীন অগাধ জলধি। এর ভেতরে রয়েছে অফুরন্ত জ্ঞান- বিজ্ঞানের তত্ত্ব ও অনায়ত্ত অসংখ্য দিক দিগন্ত। ড. যুগলুল নাজ্জার বলেন, ‘আল-কুরআনে প্রায় ১০০০ আয়াত রয়েছে আধুনিক বিজ্ঞান সম্পর্কে। আর পরোক্ষভাবে প্রতিটি আয়াতই বিজ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত প্রদান থেকে মুক্ত নয়।’ ড. এম শমশের আলী বলেন, ‘আল-কুরআনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে এরকম ৭৫০টি আয়াত রযেছে।’ গবেষক মোস্তাক আহমাদ লিখেছেন, ‘কুরআনে বিজ্ঞান সম্পর্কে বলা হয়েছে এরূপ আয়াত রয়েছে ২২২২টি।’ সাইয়েদ এইচ এম শহীদুল ইসলাম বলেন, ‘কুরআন মাজিদের ৮০% আয়াতে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, রাজনীতি, অর্থনীতি সম্পর্কে বলা হয়েছে।’ ডা: জাকির নায়েক বলেন, কুরআনের ৮০% আয়াত বিজ্ঞান দ্বারা সত্য প্রমাণিত হয়েছে, আর বাকি ২০% সম্পর্কে বিজ্ঞান নীরব (বিজ্ঞানের দুর্বলতার জন্য)। এ সম্পর্কে জানতে হলে বিজ্ঞানকে আরো কিছু দিন অপেক্ষা করতে হবে। ইদানীং আমরা গবেষক আনওয়ার হোসাইনের ‘আল কুরআন দ্য ট্রু সায়েন্স সিরিজ’ থেকে জানতে পেরেছি যে আল-কুরআন ১০০%ই বৈজ্ঞানিকভাবে সত্য পরিণত হয়েছে। আজকের বিজ্ঞানীরা আল-কুরআনের পরকাল সম্পর্কিত আয়াতসমূহের বৈজ্ঞানিক সত্যতা খুঁজে পেয়েছেন। ইতোমধ্যে কয়েক শত বিজ্ঞানী বিজ্ঞানের আলোকে আল্লাহর অস্তিত্ব সম্পর্কে গ্রন্থ রচনা করেছেন এবং তারা এক ও একক অদৃশ্য স্রষ্টার অস্তিত্ব রয়েছে বলে বিশ্ববাসীকে নিশ্চিত জানিয়ে দিয়েছেন। ড. মরিস বুকাইলি আল-কুরআন ও বিজ্ঞান সম্পর্কে দীর্ঘ কাল যাবৎ গবেষণা করে এ তথ্য জানিয়েছেন যে, আল-কুরআনে এমন কোনো আয়াত নেই যাকে বিজ্ঞান আক্রমণ করতে পারে। তার রচিত ‘লা বাইবেল লা কুরআন য়েট লা সায়েন্স’ গ্রন্থটি সারা বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সূরা ইয়াসিনের ২ নং আয়াতে কুরআন মাজিদকে আল্লাহ তায়ালা বিজ্ঞানময় গ্রন্থ বলে ঘোষণা দিয়েছেন। কুরআন মাজিদ ১০০% বিজ্ঞানময়। এর একটি সুদৃঢ় প্রমাণ এই যে কম্পিউটার দ্বারা কুরআনকে পরীক্ষা করে যে ফলাফল পাওয়া গিয়েছে তা হচ্ছে, আল-কুরআন মানবরচিত কিতাব নয়, হতেও পারে না এবং এটা যাবতীয় ভুলত্রুটি থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। পৃথিবীর সূচনাকাল থেকে সাম্প্রতিক কাল পর্যন্ত সমগ্র মানবগোষ্ঠী সম্মিলিত হয়ে যদি কুরআনের মত অনুরূপ কোনো কিতাব রচনা করতে চায়, তাহলে সহ¯্র বিলিয়ন বর্ষব্যাপী প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা করা সত্ত্বেও ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। আল-কুরআনে অপূর্বভাবে সকল জ্ঞান-বিজ্ঞানের সফল সমাবেশ ঘটেছে। এর মাঝে না অতিরিক্ত কিছু আছে আর না আছে কোন কমতি। এতে ঞযবড়ষড়মু থেকে শুরু করে অংঃৎড়হড়সু পর্যন্ত, মৃত্তিকা থেকে সূচিত হয়ে নভোমণ্ডল পর্যন্ত সমস্ত জ্ঞানের শাখাই বিদ্যমান রয়েছে। আল-কুরআনে বিজ্ঞান সম্পর্কে গবেষণা করতে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বাংলাদেশের বিশিষ্ট গবেষক, তরুণ শিক্ষাবিদ ও ব্যবস্থাপনাবিদ ড. মো: মোবারক হোসাইন বলেন, ‘রসায়ন, জীববিজ্ঞান, পদার্থ, নৃতত্ত্ব, চিকিৎসা, গণিত, তড়িৎ, যন্ত্র, স্থাপত্যবিদ্যাসহ বিজ্ঞানের সব শাখার বিষয়ে কুরআন ও হাদিসে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন মাজিদে পরমাণু, মহাকাশ এমনকি কম্পিউটার বিজ্ঞান সম্পর্কেও বলেছে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে। আধুনিক বিজ্ঞানের সকল প্রমাণিত বিষয় আল-কুরআনে ১৪০০ বছর পূর্বেই বর্ণিত হয়েছে। ড. মরিস বুকাইলি তার রচিত বাইবেল কুরআন ও বিজ্ঞান নামক গ্রন্থে সৌরমণ্ডল, তারকারাজি, তারকা, তারকাপুঞ্জ ও গ্রহব্যবস্থার গঠন ও বিকাশ; বহুবিশ্বের ধারণা, আন্তঃ তারকা পদার্থ, সূর্য ও চন্দ্র, নক্ষত্রমণ্ডল, গ্রহমণ্ডল, নিম্নতম আকাশ, চন্দ্র ও সূর্যের কক্ষপথ, বিশ্বজগতের সম্প্রসারণ, মহাশূন্য বিজয় প্রভৃতি সম্পর্কে আল-কুরআনের দেয়া তথ্য ও আধুনিক বিজ্ঞানের মাঝে সাদৃশ্য প্রদর্শন করেছেন। এ ছাড়া পানিচক্র ও সমুদ্র, পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ, পৃথিবীর আবহাওয়া, উচ্চতা, আবহাওয়া মণ্ডলে বিদ্যুৎ, ছায়া, প্রাণিজগৎ, উদ্ভিদজগৎ, প্রাণের উৎপত্তি, উদ্ভিদজগতে বংশবিস্তার, প্রাণিজগতে বংশবিস্তার, প্রাণিজগতে সমাজের অস্তিত্ব, মৌমাছি, মাকড়সা, প্রাণিদুগ্ধ উৎপাদনের উৎস প্রভৃতি সম্পর্কেও তিনি কুরআন মজিদের বর্ণনা ও আধুনিক বিজ্ঞানের মাঝে সামঞ্জস্যতা প্রমাণ করেছেন। মাওলানা মওদূদী রহ. রচিত ‘তাফহীমুল কুরআন’, সাইয়েদ কুতুব শহীদ রহ. রচিত ‘ফি যিলালিল কুরআন’সহ আধুনিক কালের অনেক তাফসির সাহিত্যে আল-কুরআন ও বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যতা শত সহ¯্র পৃষ্ঠাভরে বিশদ বিবরণ রয়েছে। ড. উইলিয়াম ক্যাম্পবেল তার গ্রন্থ ইতিহাস ও বিজ্ঞানের আলোকে বাইবেল ও কুরআন গ্রন্থে কুরআন মাজিদের অপব্যাখ্যার মাধ্যমে উল্লেখ করেন যে, কুরআনে ৪০টি বৈজ্ঞানিক ভুল রয়েছে। উল্লেখ্য, যে তিনি ইতঃপূর্বে কুরআনের বৈজ্ঞানিক ভুলের উপর রিসার্চ করেই পিএইচডি লাভ করেছিলেন। তার এ চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় কোনো মুসলিম সাহস প্রদর্শন না করলেও থেমে থাকেননি ভারতের ওংষসধরপ জবংবধৎপয ঋড়ঁহফধঃরড়হ এর প্রতিষ্ঠাতা জীবন্ত কম্পিউটার, কালের কিংবদন্তি ডা: জাকির আবদুল করিম নায়েক। তিনি ২০০০ সালের ১ এপ্রিল আমেরিকার শিকাগো শহরে আয়োজিত ওঈঘঅঊ (আইসিএনএই) কনফারেন্সে ‘বিজ্ঞানের আলোকে বাইবেল ও কুরআন’ বিষয়ে ড. ক্যাম্পবেলের সাথে বিতর্ক করেন। এ বিতর্কে তিনি অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে প্রমাণ করে দেখান যে কুরআনে নয়, বরং ভুল রয়েছে ক্যাম্পবেলের গবেষণায়। তিনি সেখানে হাজার হাজার লোকের সম্মুখে ক্যাম্পবেলের সমস্ত যুক্তি খণ্ডন করে প্রদর্শন করেন যে কুরআন ও বিজ্ঞানের মাঝে ১০০% সামঞ্জস্যতা রয়েছে, এমনকি কুরআন বিজ্ঞানের চাইতেও অনেক বেশি অগ্রগামী। শুধু তাই নয়, ঐ বিতর্কে তিনি বাইবেলের অসংখ্য বৈজ্ঞানিক ভুল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে উল্টো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে এসেছিলেন ক্যাম্পবেলকে। আজ পর্যন্ত কেউ তার মোকাবেলা করতে আগ্রসর হয়নি। আগেই উল্লেখ করেছি, কুরআন মাজিদে সমস্ত বিজ্ঞানের মৌলতত্ত্ব রয়েছে। এ ছাড়াও এ ঐশীগ্রন্থে রয়েছে হাজার হাজার বৈজ্ঞানিক গোপন ইঙ্গিত, যা সূক্ষ্মদর্শীর নজর এড়িয়ে যেতে পারে না। ওংষসধরপ ঋড়ঁহফধঃরড়হ ইধহমষধফবংয কর্তক প্রকাশিত ঝপরবহপব রহ ঞযব ছঁৎধহ গ্রন্থে আল-কুরআনে বর্ণিত অনেক বিষয়ের বৈজ্ঞানিক বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে। কুরআন ও বিজ্ঞানের সামঞ্জস্যতা ও ইসলামী বিজ্ঞানের রেনেসাঁ জাগ্রত করতে যারা বিভিন্ন সময় দৃঢ়হস্তে কলম ধরেছেন তাদের মধ্যে জামালুদ্দীন আফগানি, রশিদ রিযা, মুহাম্মদ আবদুহ, শাহ ওয়ালি উল্লাহ দেহলবি, সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী, সাইয়েদ কুতুব, মুহাম্মদ কুতুব, ড. ইউসুফ আল কারযাভি, সাইয়েদ বদিউজ্জামান নুরসি, সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী, সাইয়েদ সুলাইমান নদভী, স্যার সৈয়দ আমীর আলী, সাইয়েদ হোসাইন নাসর, ড. ওসমান বকর, ড. তাহাজাবির আল-আলওয়ানি, ড. আব্দুল হামিদ আবু সুলাইমান, ড. আব্দুর রশীদ মতিন, ড. উমর চপরা, জাস্টিস তাকি উদ্দীন উসমানী, প্রকৌশলী শফি হায়দার সিদ্দিকী, প্রকৌশলী প্রফেসর হামিদুর রহমান, ডা: গোলাম মোয়াযযাম, ডা: জাকির নায়েক, ড. আসলাম পারভেজ, ড. কাজী দীন মুহম্মদ, বিজ্ঞানী হারুন ইয়াহিয়া, ড. মেহমেদ গরমেজ, ড. তারিক রমাদান, ড. আবু আমিনাহ বিলাল ফিলিপ্স, বিজ্ঞানী প্রফেসর জিম আল খলিলী, ড. ইবরাহীম ইলমাসরী, ড. এম শমশের আলী, ড. উসমান নাজাতি, মাওলানা মুহিউদ্দীন খান, মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, ড. ফুয়াদ সিজগিন, ড. সালিম আল- হাসানী, আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ, মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুর রহীম রহ., ড. আসলাম পারভেজ, আনোয়ার ইবনে আক্তার, ডা: তারেক মাহমুদ চোগতাঈ, ড. জামাল আল বাদাভি, ঐতিহাসিক গোলাম আহমাদ মোর্তজা, এম আকবর আলী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। আজকের দিনে কুরআনের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ জাতির সামনে প্রকাশিত হওয়ার কারণে সারা বিশ্বে ইসলামী বিজ্ঞান ও দর্শনের রেনেসাঁ আন্দোলনে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা।
আল-কুরআনে বিজ্ঞানের সকল শাখার উপস্থিতির কারণে মুসলিম বিজ্ঞানীরা ইসলামের সোনালি যুগে চীন থেকে গ্রানাডা পর্যন্ত, প্রাচ্য-পাশ্চাত্যে বিজ্ঞানের আলোক মশাল প্রজ্বলন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। আজকে পাশ্চাত্যের সমাজ কার্পণ্য ও কঞ্জুসি করে হলেও ইবনে সিনাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জনক, জাবির ইবনে হাইয়ানকে রসায়নের জনক, আলখোয়ারিজমিকে বীজগণিতের জনক, ইবনে খালদুনকে সমাজবিজ্ঞানের জনক, আশ-শায়বানিকে আন্তর্জাতিক আইনের জনক, অপটিক্স ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জনক হিসেবে ইবনে হাইসামদেরকে মেনে নিয়েছে। ড. মো. ইবরাহীম খলিল বলেন, নিরপেক্ষ দৃষ্টি দিয়ে গবেষণা করলে দেখা যাবে যে বিজ্ঞানের সকল শাস্ত্রের জনক স্বর্ণযুগের মুসলমানরাই। ইউরোপীয় রেনেসাঁ ছিলো মুসলমানদেরই বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির বিশেষ ফসল। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা বলেন, ইসলামের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শত বছর ধরে আলোকবর্তিকা দানকারী স্থানগুলো ইউরোপে পুনর্জাগরণ ও আলোর পথ প্রশস্ত করেছে।’ মুসলমানরা যদি বিজ্ঞানের মশাল না জ্বালাতেন তাহলে ইউরোপের পুনর্জাগরণ আজও হতো কি না যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। আমাদের কালের অন্যতম সমাজবিজ্ঞানী ও দার্শনিক আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী বলেন, বিজ্ঞানের এমন কোনো শাখা প্রশাখা নেই যেখানে মুসলিমদের হাতের স্পর্শ ঘটেনি। মুসলিমদের রচিত কালজয়ী গ্রন্থসমূহ শতাব্দীর পর শতাব্দীব্যাপী পাশ্চাত্য দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে পঠিত হয়েছে। সাম্প্রদায়িক বিষবাষ্পে আক্রান্ত পাশ্চাত্যের গবেষকবৃন্দ মুসলিম সভ্যতা উল্লেখ না করে আরব সভ্যতা হিসেবে উল্লেখ করে থাকে। বিজ্ঞান জগতে মুসলিম মিল্লাতের শ্রেষ্ঠ যুগ হিসেবে সাধারণত ৭৫০-১১০০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত এই ৩৫০ বছরকে গণনায় ধরা হয়। অথচ এই উত্তরাধিকার কাজে লাগাতে পাশ্চাত্যকে ঊনবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে।
পাশ্চাত্যে একমাত্র স্পেন ব্যতীত অন্য কোথাও মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠিত ছিলো না। স্পেনেও যদি মুসলিমরা প্রবেশ করতে সক্ষম না হতো তাহলে নিশ্চিতভাবে এ সত্য বলা যায় যে, আধুনিক বিজ্ঞান আরো কয়েক শতাব্দী পিছনে পড়ে থাকতো। (নন্দিত জাতি নিন্দিত গন্তব্যে, মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, পৃ: ২৫৩)
ভূগোল, পরিবেশ, প্রাণী, উদ্ভিদ সাগর মহাসাগর, আগ্নেয়গিরি সম্পর্কেও বলা হয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞানের সকল তথ্য রয়েছে এই মহাগ্রন্থে। তার মধ্য থেকে কতিপয় নমুনা হচ্ছে, বর্তমান বিশ্বের আলোড়ন সৃষ্টিকারী বিগব্যাং থিওরিও আল-কুরআনে রয়েছে। সূরা আম্বিয়ার ৩০ নং আয়াতে এর বর্ণনা রয়েছে। সূরা হামীম সাজদাহর ১১ নং আয়াতে ছায়াপথ সৃষ্টির পূর্বে গ্যাসপিণ্ডের বর্ণনা রয়েছে। পৃথিবীর আকার গোলাকার হওয়া সম্পর্কে সূরা যুমার এর ৫ নং আয়াত ও সূরা নাযিয়াতের ৩০ নং আয়াতে বিবরণ রয়েছে। সূরা ফুরকানের ৬১ নং আয়াতে বলা হয়েছে, চাঁদের আলো প্রতিফলিত কিরণ। সূরা ইউনুসের ৫ নং আয়াতে সূর্যের নিজস্ব আলো প্রজ্বলনের কথা বলা হয়েছে। সূরা আম্বিয়ার ৩৩ নং আয়াতে চন্দ্র, সূর্যসহ সকল কিছুরই আবর্তনের কথা বলা হয়েছে। সূরা যারিয়াতের ৪৭ নং আয়াতে সম্প্রসারণশীল বিশ্বের কথা বর্ণিত হয়েছে। সূরা হিজরের ২২ নং আয়াতসহ অসংখ্য আয়াতে পানিচক্রের বিবরণ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জায়গায় পাহাড় পর্বত সৃষ্টি রহস্য, সমুদ্রের পানির বর্ণনা, প্রতিটি বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি হওয়া, ভ্রƒণবিদ্যা ইত্যাদির সূক্ষ্ম বিবরণ রয়েছে। আল-কুরআনে ফিঙ্গার প্রিন্টেরর কথা ও বিভিন্ন গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব (এলিয়েন) থাকার ঈঙ্গিত প্রদান করেছে।

এছাড়াও এ মহাগ্রন্থে সকল প্রযুক্তিরও বিবরণ রয়েছে। যেমন সূরা বাকারার ২০ নং আয়াতে আলোকতত্ত্বের বর্ণনা রয়েছে। এ আয়াতকে কেন্দ্র করেই বিজ্ঞানী আল হাসান ইবনে হাইসাম সর্বপ্রথম তার লেখা ‘কিতাব আল মানাযির’ (ইড়ড়শ ঙভ ঙঢ়ঃরপং) গ্রন্থে বিখ্যাত আধুনিক আলোকত্ব উপস্থাপন করেন এবং তিনি ক্যামেরা, লেন্স আবিষ্কার করেন। সেই সূত্র ধরেই টেলিস্কোপ, মাইক্রোস্কপ, টেলিভিশন, মনিটর, প্রজেক্টর সিনেমা প্রভৃতি আবিষ্কৃত হয়েছে। এ জন্য আল হাসানকে সিনেমা সূত্রের আসল জনক বলা হয়। সূরা আর রহমানের ৩৩ নং আয়াত থেকেই বিজ্ঞানীরা রকেট আবিষ্কারের ধারণা পায়। মুসলিম বিজ্ঞানী হাসান আল রাম্মা সর্বপ্রথম রকেট আবিষ্কার করেন। পরবর্তীতে বিজ্ঞানী আবু রায়হান আল বিরুনীর গবেষণার সাহায্যে পাশ্চাত্যবাসীরা রকেট আবিষ্কার করে। সূরা ফিলের ৪ নং আয়াত আকাশে উড্ডীয়মান পাখির প্রস্তর নিক্ষেপ থেকে পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা এবং ড্রোনের সাহায্যে বোমা নিক্ষেপের ধারণা এসেছে। মুসলমানদের গ্রন্থেই সর্বপ্রথম বিভিন্ন ধরনের বোম্ব ও আগ্নেয়াস্ত্রের বিবরণ পাওয়া যায়। সূরা আলাম নাশরাহর ১৭ নং আয়াত থেকে ফ্রিজ আবিষ্কারের ধারণা এসেছে। সূরা নাহলের ৭৯ নং আয়াত থেকে উড়োজাহাজ আবিষ্কারের ধারণা পাওয়া যায়। মুসলিম স্পেনের বিজ্ঞানী আব্বাস ইবনে ফিরনাসই সর্বপ্রথম উড়োজাহাজ আবিষ্কার করেন। কিন্তু এর কৃতিত্ব লুফে নিয়েছেন রাইটভ্রাতৃদ্বয়। আল কুরআনে বর্ণিত ইউনুস আ. এর মাছের পেটে জীবনধারণের বর্ণনা থেকে সাবমেরিনের ধারণা পাওয়া যায়। কুরআন মাজিদে হযরত হযরত নূহ (আ)-এর জাহাজ আবিষ্কারের বিবরণ রয়েছে। হযরত নূহ ছিলেন দুনিয়ার প্রথম অ্যাডমিরাল ও নৌবিজ্ঞানী।
হযরত দাউদ (আ) এর সময় ইষধংঃ ঋঁৎহধপব ছিলো। যা থেকে তিনি লৌহ গলিয়ে বর্ম নির্মাণ করতেন। তার সমসাময়িক যুগকে লৌহযুগ বলা হয়। সূরা নামলের ১৭-১৮ নং আয়াত থেকে মোবাইল ফোন ও বেতার এর ধারণা পাওয়া যায়। এ ভিন্ন কুরআন মাজিদে স্বচ্ছ কাচ, স্থাপত্যশিল্প, নান্দনিক চিত্র-শিল্প, নৌপ্রযুক্তি, সামরিক প্রযুক্তি, পোশাক শিল্প ইত্যাদির বিবরণ রয়েছে। কুরআনে কারিমের মতো এক মহান নেয়ামতকে আঁকড়ে ধরার কারণে ও এর মাধ্যমে জ্ঞান গবেষণার কারণে দুনিয়ার সমস্ত প্রযুক্তি আবিষ্কারের সৌভাগ্য লাভ করেছিলো মুসলিমরা। আজকের যুগের কম্পিউটারের ভিত্তি হচ্ছে অষমড়ৎঃরঃযস. এই অ্যালগরিদমের আবিষ্কারক হচ্ছেন একজন মুসলিম গণিতবিদ, যার নাম আবু আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খাওয়ারিজমি। এভাবে মুসলিমদের অসংখ্য প্রযুক্তি আজকের দুনিয়ায় চলছে, কিন্তু তারা হয়তো এর কমই জানে। ঋড়ঁহফধঃরড়হ ড়ভ ঝপরবহপব, ঞবপযহড়ষড়মু ধহফ ঈরারষরুধঃরড়হ এর চেয়ারম্যান প্রফেসর সালিম আল হাসানি তার লেখা “১০০১ওহাবহঃরড়হ” গ্রন্থে স্বর্ণযুগের মুসলিমদের এক হাজার একটি আবিষ্কারের বিবরণ দিয়েছেন। ইসলামী বিজ্ঞানের মহান ঐতিহাসিক প্রফেসর ফুয়াদ সিজগিন (ঋঁধঃ ঝবুমরহ) তার রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ “এবংপযরপযঃব উবং অৎধনরংযপযবহ ঝবযৎরভঃঃঁসং” গ্রন্থে ইসলামের প্রাথমিক কালের মুসলিমদের অগণিত আবিষ্কারের বর্ণনা দিয়েছেন। সাম্প্রতিককালে আমরা যত আবিষ্কার ও প্রযুক্তি প্রত্যক্ষ করছি তার সাথে কোনো না কোনো ভাবে মুসলিমরা জড়িত রয়েছেন। সুতরাং মুসলিমরা যদি কুরআন মাজিদকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে, একে সংবিধান রূপে মেনে নয় এবং এ ঝরমহ এর কিতাবকে ঝপরবহপব চর্চার মূলপ্রেরণা হিসেবে গ্রহণ করে তাহলে মুসলিম বিশ্বের চলমান অবস্থা পরিবর্তন হতে বেশি সময় লাগার কথা নয়।
মুসলিম স্বর্ণযুগের ইতিহাস ৫৭টি মুসলিম রাষ্ট্রের সরকারসমূহের দরজায় করাঘাত করে তাই- ই ফিস ফিস করে আজ বলে যায়।

লেখক : শিক্ষার্থী, সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ, জামালপুর

SHARE

Leave a Reply