আল মামুন আমাদের পথ চলার প্রেরণা

মোহাম্মদ মোশাররফ হোসেন

আল্লাহর এ সুন্দর পৃথিবীতে সত্য-মিথ্যার দ্বন্দ্বের ইতিহাস অতি প্রাচীন। আল্লাহর অনুগত বান্দারা সব সময়ই চেষ্টা করছে সত্যকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে। অন্য দিকে মিথ্যার ধ্বজাধারীরা সত্যের আলোকে নিভিয়ে দিতে চেয়েছে বারবার। কিন্তু তারা জানে কি যে আল্লাহ তার নূরকে প্রজ্বলিত করবেনই। (সূরা আস সফ, আয়াত-৮) ইতিহাস সাক্ষী, তারা ব্যর্থ হয়েছে। সত্যকে তারা নিভিয়ে দিতে পারেনি বরং উল্টো প্রতিক্রিয়াই হয়েছে; সত্যের এ আলো সীমাবদ্ধ এলাকা থেকে বিস্তৃত প্রান্তরে ছড়িয়ে পড়ছে। লাখো কোটি মানুষ আল্লাহর নূরের আলোতে আলোকিত হয়ে উঠেছে। কিন্তু সত্য মিথ্যার লড়াই পৃথিবীর বুক থেকে একেবারে মুছে যায়নি। হযরত ইবরাহিম (আ)-নমরুদ, হযরত মূসা (আ)-ফেরাউন, হযরত মুহাম্মদ (সা)-আবু জেহেলের লড়াই এখনও চলছে। শহীদ আবদুল মালেক ও শহীদ হাসান আল বান্নার শাহাদাত এ কথারই সাক্ষ্য বহন করে, সাক্ষ্য বহন করে কুমিল্লা জেলার বুড়িচং থানার এক বিজয়ী সৈনিক শহীদ আল মামুন ভাইয়ের শাহাদাত।
শাহাদাতের আগের কথা
আমি তখন বাকশীমুল ইউনিয়নের সভাপতি, আল মামুন ভাই বুড়িচং থানা সেক্রেটারি।
শাহাদাত : দাওয়াহ ও ইসলামিক স্টাডিজ প্রথম বর্ষের ছাত্র সংগঠনের সদস্যপ্রার্থী শহীদ আল মামুন। শহীদ আল মামুন ৩১ অক্টোবর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের পুলিশ ও ছাত্র লীগের হামলায় মারাত্মকভাবে আহত হন। ১লা নভেম্বর ১৯৯৮ সালে ৯৮তম শহীদ হিসেবে শাহাদাত বরণ করেন।
মাতার অনুভূতি
আমার ছেলে ছিল নিষ্পাপ। সে কোনো অন্যায় করেনি, সে দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য জীবন দিয়েছে। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। আমি দোয়া করি আল্লাহ যেন তাকে শহীদ হিসেবে কবুল করেন। সে নিয়মিত নামাজ আদায় করত। আল্লাহ যেন তার খুনিদের বিচারের ব্যবস্থা করেন।
কুমিল্লার বুড়িচংয়ের বাকশীমুল গ্রামবাসীর অনুভূতি তারা গানে গানে দূর অজানায়
পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়
তোমায় আজো খুঁজে ফিরি হৃদয় আঙিনায়।
‘বজ্রের ধ্বনি ছিলো সে ছিলো ‘সওতে হাদী’
দিল সে কাঁপিয়ে আরবের মাটি রাসূল সত্যবাদী।
জাগালো সে এক নতুন লগ্ন সকলের অন্তরে,  জাগায়ে গেল সে জনতাকে চিরসুপ্তির প্রান্তরে। সাড়া পড়ে গেল চারদিকে এই সত্যের পয়গামে হলো মুখরিত গিরি-প্রান্তর চির সত্যের নামে।’
শিক্ষাজীবন : শহীদ আল মামুন ভাই প্রথম শ্রেণী থেকে দাখিল পর্যন্ত নিজ গ্রাম বাকশীমুল ফাজিল মাদ্রাসায় পড়ালেখা করেন। কৃতিত্বের সাথে আলিম পাস করেন পাশের গ্রামের খাড়াতাইয়া কামিল মাদ্রাসা থেকে। পিতার বুকভরা আশা আর চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে দাওয়াহ এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিষয়ে অনার্সে ভর্তি হন। বিদ্যাপীঠ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া। কিন্তু কে জানে পিতার সেই স্বপ্ন অনার্স প্রথম বর্ষে অধ্যয়নকালেই প্রতিদিনের মতো ক্যাম্পাসের সকল কাজ শেষ করে ক্লাস করার জন্য কলেজে যাওয়ার সময় আগে থেকে ওঁৎ পেতে থাকা ছাত্রলীগ নামদারি সন্ত্রাসী সাইফুল চক্র ও পুলিশ বাহিনী নিরপরাধ শিবির নেতা কর্মীদের লক্ষ করে গুলি চালাবে? আর সেই গুলিতে সকলের সামনে থাকা প্রাণপ্রিয় ভাই আল মামুুন শাহাদাত বরণ করেন। সেদিন শহীদ আল মামুন ভাই অধ্যয়নের সমাপ্তি টেনে পিতার হাতে তুলে দেন গর্বিত শহীদের পিতার সার্টিফিকেট। আমাদেরকে দেন শহীদের সহপাঠী কিংবা শহীদের ভাই সার্টিফিকেট।
সংগঠনিক জীবন :  ছোটকাল থেকে মিষ্টভাষী শহীদ আল মামুন ভাই ছাত্রশিবিরের আদর্শ দেখে নিজ গ্রাম বাকশীমুলের আরো পাঁচ-ছয়জন সাথী হয়ে যান। আনুগত্যের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছেন তিনি। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি না হয়ে শহীদের তামান্না ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় মদিনা ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করার আশায় চলে যান সুদূর ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় কুষ্টিয়ায়। আল মামুন ভাই অনার্সে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই কুরআন, হাদিস, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়নের প্রতি আকর্ষণ বেড়ে যায়। দেখতে দেখতে তিনি সাথীর শপথ গ্রহণ করেন। আমাকেও সাথী হওয়ার জন্য কন্টাক্ট করে পরামর্শ দিতেন যে সাথী হতে দেরি করতে নেই। আমিও তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে সাথীর শপথ নিই। এর পর থেকেই সদস্য হওয়ার তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে সংগঠনের দিকনির্দেশনার আলোকে সদস্য সিলেবাস শেষ করার চেষ্টা অব্যাহত রেখে ১৯৯৮ সালে শিবিরের সদস্য প্রার্থী হওয়ার প্রশ্নপত্র লাভ করেন। সাংগঠনিক দায়িত্ব পালনে তিন ছিলেন খুবই তৎপর। শাহাদাৎকালীন সময়ে তিনি শৈলকুপা শাখার দায়িত্বশীল ছিলেন।
কী হয়েছিল সেদিন
সেদিনের ঘটনা লিখতে গেলে কলম থেমে যায়, বলতে গেলে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়, কারণ দীর্ঘদিন এক সাথে কাজ করেছি, এক সাথে শাহাদাতের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত আমার সাথে যোগাযোগ ছিল। শাহাদাতের কয়েক দিন আগে আমার কাছে নিজ হাতের লেখা চিঠি দিয়ে বলেছিলেন, ক্যাম্পাসের অবস্থা বেশি ভাল যাচ্ছে না, কখন যে শহীদ হয়ে যাই আপনাকে পরামর্শ দিয়ে গেলাম যত দ্রুত সদস্য হয়ে যাবেন এবং কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমকমে ভর্তি হবেন।
৩১ অক্টোবর ঐ দিন ছিল সারা দেশে বিক্ষোভ মিছিল। আমরা হঠাৎ মিছিল শেষ করে বুড়িচং শিবির অফিসে এসে পত্রিকা খুলে দেখি ইবিতে ছাত্রলীগ নামধারী পুলিশ বাহিনী  ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা চালায় এবং আল মামুন গুরুতর আহত। তখন চিন্তায় পড়ে গেলাম না জানি আল মামুন ভাই শহীদ হয়ে আল্লাহর দরবারে চলে গেলেন। তার পর শহীদের বড় ভাই আবুল কালাম ও গিয়াস উদ্দিন ঢাকা চলে যান। গিয়ে দেখেন শহীদ আল মামুনের কফিন নিয়ে ঢাকায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে জানাজা পড়ার জন্য প্রস্তুত সবাই। আবুল কালাম ও গিয়াস উদ্দিন মিছিলের এক ভাইকে জিজ্ঞাসা করেন, এই যে ভাই, আল মামুনের বাড়ি কোথায়? উত্তরে এক ভাই বলেন, উনার বাড়ি কুমিল্লায়।
এই ঘটনার পর থেকে শহীদের গ্রামে হাজার হাজার মানুষ আসতে লাগল, কখন শহীদের কফিন আসবে? আমরাও সবাই অপেক্ষা করতে লাগলাম। শাহাদাতের দিন ছিল তাঁর সদস্য শপথ কণ্টাক্টের দিন।
সন্ত্রাসীদের লোলুপদৃষ্টি কেন আল মামুনকে ঘিরে
আল মামুন ভাই ছিলেন সুঠাম দেহের অধিকারী। মিষ্টি হাসিসম্পন্ন, শান্ত, নম্র ও মেধাবী ছাত্রনেতাই নন, ছিলেন ভালো শিল্পীও বটে। তিনি প্রোগ্রাম কিংবা চলার পথে কিংবা রুমে গাইতেন ‘প্রশংসা সবই কেবল তোমারই, পৃথিবী আমার আসল ঠিকানা নয়’।
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে সকল ছাত্রের প্রিয় ছাত্রনেতা হওয়াটাই তার ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তৎকালীন ইবি সভাপতি ছিলেন নজরুল ইসলাম। দাওয়াতি কাজে তার খুবই আগ্রহ ছিল। প্রতিদিন দেশের মধ্যে কয়েকজনের নিকট চিঠি লিখতেন। শাহাদাতের চারদিন পরও চিঠি আসতে লাগল গ্রামের সমর্থক ও কর্মীদের মাঝে। মেসের মধ্যে ছিলেন সকলেরই প্রিয়। সবাইকে নিয়ে নামাজে যেতেন, পবিত্র কুরআন হাদিস শিক্ষা দিতেন। শিক্ষকের সাথে ছিল তার খুবই ভালো সম্পর্ক। অনার্সে প্রথম বর্ষে প্রথম ক্লাসে স¤পূর্ণ আরবি ও ইংরেজিতে বক্তব্য দিয়ে নিজ মেধার যোগ্যতার প্রমাণ করায় ক্লাস ক্যাপ্টিনের দায়িত্ব তার ওপর পড়ে।
শাহাদাতের পর
শাহাদাতের খবর সকলের কাছে পৌঁছালে সাবেক নেতৃবৃন্দ মিছিলসহকারে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। আল মামুন ভাইয়ের বৃদ্ধ পিতা ও ভাইয়েরা এলে সেখানে তাদের আহাজারিতে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
জানাজা ও দাফন : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো: তাহের গ্রামের বাড়িতে শহীদের কফিনের সাথে আসেন। শুভাকাক্সক্ষীদের ঐতিহাসিক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তব্য শেষে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাযায় স্কুল- কলেজ ও  মাদ্রাসার শিক্ষকমণ্ডলী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী, সাংবাদিকসহ সর্বস্তরের জনতার উপস্থিতিতে মানুষের ঢল নামে যা ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এলাকার সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতিতে দ্বিতীয় জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাঁকে চিরশায়িত করে রাখা হয়।
ইতিকথা
প্রতিদিনই মানুষ মারা যায় বিভিন্নভাবে। কিন্তু শাহাদাতের মৃত্যু সবার ভাগ্যে জুটে না। আজকে নিজেকে খুবই হতভাগা মনে হচ্ছে। যে মৃত্যুর কামনা করেছিলেন স্বয়ং সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ নেতা হযরত মুহাম্মদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। তিনি আল্লাহর শপথ নিয়ে বলেছিলেন, আমার ইচ্ছা হয় আমি একবার মৃত্যুবরণ করি আবার জীবিত হই, আবার মৃত হই, আবার জীবিত হই, আবার আল্লাহর পথে শহীদ হই। আল্লাহ তো শহীদদের জীবিত বলেছেন, তার পক্ষ থেকে তারা রিজিকপ্রাপ্ত। তারা চেয়েছিল যে শহীদ আল মামুন হত্যার মাধ্যমে ইসলাম ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের অগ্রযাত্রাকে স্তব্ধ করে দেবে। পবিত্র কুরআনে আছে, ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা চেয়েছিল হাতিওয়ালা বাহিনী নিয়ে কাবাঘর ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আল্লাহ তার চক্রান্তকে আবাবিল নামক ছোট ছোট পাখি পাঠিয়ে তাদেরকে পশুর চিবানো ভুসির মতো করে দিয়েছিলেন। আর ঠিক সেভাবেই আবরাহা বাহিনীর উত্তরসূরি সন্ত্রাসী জাকিরচক্র চেয়েছিল ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে মসজিদে গুলি চালিয়ে আল্লাহর পবিত্র ঘরসহ ইসলাম ও ইসলামের পতাকাবাহীদের উৎখাত করতে। আজও সেই মসজিদ অসংখ্য গুলির দাগ বহন করছে। এই কি মুসলিম নামধারী সোনার যুবকদের চরিত্র? আল্লাহ তো তাদের পশুর চিবানো ভুসির মতো করবেনই এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এভাবে আর ক’দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হত্যা চলবে? আল্লাহ যেন তাকে শাহাদাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করেন। আমাদের সকলকে শাহাদাতের তামান্না দিয়ে কুরআনের আলোয় এ সুন্দর পৃথিবীকে আলোকিত করার তৌফিক দিন।
কুল ইন্না সালাতি ও নুসুকি ওমাহ ইয়ায়া ওমামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। তাই মাবুদের দরবারে সবসময়ই প্রার্থনা, তিনি যেন শহীদদের মত সকল সদস্য ভাইয়ের ওপরই সন্তুষ্ট হয়ে যান আর শহীদদের সেই ফুলবাগানে এই নগণ্য বান্দাকেও যেন শরিক রাখেন। আমিন।

SHARE

Leave a Reply