আল মাহমুদের কবিতায় ইসলামী ঐতিহ্যের রূপায়ণ -ড. নঈম আহমেদ

একজন কবি জীবনের সমগ্রতাকে অন্বেষণ করেন কালের ত্রিস্তরে। মানুষের জীবন সময়ের স্রোতধারায় আবর্তিত। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়েই জীবনের সমগ্রতা প্রকাশিত। তিনি ইতিহাসে ও ঐতিহ্যে নির্ভর করেন, সেখান থেকে আহরণ করেন নানা উপাদান; আবার আবিষ্কারও করেন নিজস্ব শৈলীতে। সমকালের শ্রেষ্ঠ কবির লেখায় তার পূর্বসূরিরা প্রভাব বিস্তার করে থাকে। কেননা কোনো কবি বা শিল্পীই এককভাবে পরিপূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে পারেন না। ‘ Tradition and Individual Talent প্রবন্ধে টি.এস. এলিয়ট বলেন: …and novelty is better than repetition. Tradition is a matter of much wider significance. It cannot be inherited, and if you want it you must obtain it by great labor. It involves, in the first place, the historical sense. ঐতিহ্যের সাথে ইতিহাসচেতনার সম্পর্ক গভীর। ইতিহাসচেতনার তাৎপর্য হলো বিনাশশীল কাল ও অবিনাশী ঐতিহ্য সম্পর্কে জ্ঞান। অতীত কখনোই নিজের যুগের কীর্তিকে সম্পূর্ণ বিনষ্ট হতে দেয় না। বর্তমানের অন্তরে সে ফল্গুধারার মতো প্রবাহিত হয়, বর্তমানের অন্তরালে সে বিরাজ করে, ভবিষ্যতের গর্ভে সে পুনর্জাত হয়। ‘হে অতীত, তুমি ভুবনে ভুবনে, কাজ করে যাও গোপনে গোপনে’- অতীতের এই অবিনাশী অস্তিত্বকেই বলে ঐতিহ্য। ঐতিহ্য সম্পর্কে স্পষ্ট ও পরিপূর্ণ বোধকে সংহত আকারে বলা যায় ইতিহাস চেতনা।
আল মাহমুদ বর্তমান বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের প্রধানতম কবি। বাংলাদেশের মানুষ-প্রকৃতি-সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-সমাজ-রাজনীতিকে শিল্পস্বরে প্রকাশ করেন অপূর্ব কাব্যকুশলতায়। সেজন্য এই কবিকে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বশীল কবি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মৌলিকতা, নিজস্ব কাব্যভাষা নির্মাণ, আঞ্চলিক শব্দের আধুনিক ব্যবহার, ইতিহাস-ঐতিহ্যের দক্ষ রূপায়ণে কবি আল মাহমুদের তুলনা নেই। এ দেশের অধিকাংশ মানুষের যে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তাকে তিনি কবিতায় উপস্থাপন করেন অত্যন্ত সফলভাবে। অর্থাৎ ইসলামী ঐতিহ্যকে তিনি শিল্প সফলতার সাথে প্রয়োগ করেন। বর্তমান সভ্যতায় আধুনিক মানুষ যেমন বিশ্বনাগরিক, তেমনি বিশ্বের নানা জাতির ঐতিহ্যেরও উত্তরাধিকারী। বাংলা কাব্যে, বিশেষভাবে মধ্যযুগের বাংলা কাব্যে মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যাপক বিস্তৃতি লক্ষণীয়। আধুনিক বাংলা কবিতায় তার ধারাবাহিকতা পাওয়া যায়। বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক উত্তরাধিকাররূপে এবং আধুনিক মানুষ হিসেবে কবি এই ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট। আধুনিক বাংলা কাব্যে সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মোহিতলাল মজুমদার ও জীবনানন্দ দাশ এ-ক্ষেত্রে সীমিত আকারে শুরু করলেও সর্বপ্লাবী স্রোত সৃষ্টি করেন কাজী নজরুল ইসলাম। পরবর্তীকালে ফররুখ আহমদও তার ব্যাপ্তি ঘটান।
আল মাহমুদ পৃথিবীর প্রধান জাতিগুলোর উত্তরাধিকার নিজের কবিসত্তায় সঞ্চার করে নিয়েছেন গভীর পাঠ-প্রক্রিয়ায়। কঠিন পরিশ্রমের মাধ্যমেই যেহেতু ঐতিহ্যকে অর্জন করতে হয়, সেহেতু তিনি একই পদ্ধতিতে এই পথে এগিয়েছেন। তাঁর ভাষায় : “দৈবক্রমে জেলখানায় আমি আমার কবিজীবনের সার্থকতা নিয়ে ভেবে দেখার সুযোগ পাই এবং সেমেটিক ধর্মগ্রন্থগুলোর ওপর একটি তুলনামূলক স্টাডি এবং গবেষণার সুযোগ পাই। সেহেতু বৌদ্ধ ও হিন্দু শাস্ত্রগুলো আগেই আমার মোটামুটি আয়ত্ত ছিল, সে কারণে পবিত্র কোরআন সহজেই আমার বোধগম্য হতে থাকে এবং সৌন্দর্যতত্ত্ব সম্বন্ধে আমার ধারণাই পাল্টে যায়। এ সময় আমি ব্যাপকভাবে প্রাচীন কাব্য অধ্যয়ন শুরু করি। একই সাথে সেমেটিক, পারসিয়ান, হিন্দু এবং ল্যাটিন জগৎ আমার কাছে উন্মুক্ত হতে থাকে। এভাবেই যাকে বলে কাব্যের উত্তরাধিকার, আমার মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে। কেবল একটি দেশ বা ভাষার উত্তরাধিকার নয়, বরং সারা পৃথিবীর সাহিত্যিক উত্তরাধিকার।’’ [আল মাহমুদ: সাক্ষাৎকার] ফলে তাঁর কবিতায় ঐতিহ্যের বিচিত্রতা লক্ষ করা যায়।


সেমেটিক বা ইসলামিক ঐতিহ্যের চর্চা আল মাহমুদের প্রথম পর্যায়ের কবিতায় সূচিত হয়। তবে পূর্ণ বিকাশলাভ করে দ্বিতীয় পর্যায়ের কাব্যে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তরে’র “অন্ধকারে একদিন”, “নূহের প্রার্থনা” ও “শিল্পের ফলক” কবিতা তিনটিতে সেমেটিক ঐতিহ্যের রূপায়ণ ঘটেছে শিল্পিতভাবে। ঐশী ধর্মগ্রন্থগুলোর মতে, আদম ও হাওয়া পৃথিবীর প্রথম মানব ও মানবী। তারা পৃথিবীতে আগমনের আগে জান্নাতে বসবাস করতেন, আহার-বিহার করতেন ইচ্ছে মতো, তবে আল্লাহর নিষেধ ছিলো একটিমাত্র বৃক্ষের কাছে যেতে ও তার ফল খেতে। একদিন ইবলিস শয়তান (বাইবেলে সাপরূপী) একাকী হাওয়াকে অমরত্ব ও জ্ঞানের প্রলোভন দেখিয়ে সেই নিষিদ্ধ ফল নিজে খায় ও আদমকে খাওয়ায়। ফলে প্রভুর আদেশ লঙ্ঘন করার অপরাধে দু’জনই শাস্তিস্বরূপ পৃথিবীর দুঃখময় প্রান্তরে নিক্ষিপ্ত হয়। ধীরে ধীরে পৃথিবীর বুকে মানবধারা বিস্তার লাভ করে তাদের বংশ থেকেই। আদি এই গল্প ইহুদি-খ্রিষ্টান-মুসলিম সব ধর্মগ্রন্থেই রয়েছে। একে কবি “অন্ধকারে একদিন” ও “শিল্পের ফলক” কবিতায় রূপায়িত করেন।
মায়াবী কথার ফাঁকে বোঝালো সে: প্রভুর শহরে আমি নাকি যেতে পারি! অপরূপ নিষিদ্ধ বিতান পার হয়ে চোখের পলকে অলৌকিক ফলবতী বৃক্ষের নিচে। বললাম, তীক্ষèধার আমার কিরিচে অলৌকিক স্পর্ধা দাও। ঈশ্বরের অপরূপ ফল আমি যেন বিদ্ধ করে নিতে পারি। যেন ভাগ করে দিতে পারি- আমার সে প্রিয়তমা নারীকে কেবল।
[‘অন্ধকারে একদিন’, লোক লোকান্তর]
মানবজাতির আদি উৎসের এই কাহিনীকে কবি বর্তমান সময়ে মানবপ্রেম ও শিল্পের সাথে অঙ্গীভূত করেন দক্ষতায়। কবি ঐতিহ্যকে আত্মস্থ ও শিল্পের রূপান্তর প্রক্রিয়ায় সফল।

“নূহের প্রার্থনা” কবিতায় প্রাচীন পয়গম্বর নূহের সাথে একজন নারী ও পুরুষের কথোপকথনের মাধ্যমে মানবিক আর্তি প্রকাশিত। আল্লাহর অলৌকিক আক্রোশ মহাপ্লাবনরূপে সমস্ত পৃথিবীকে দিকচিহ্নহীন করে ফেলে। চারিদিকে শুধুমাত্র জলের থৈ থৈ বিস্তার। মাঝে মাঝ জলের উপর মানব-মানবীর বিকৃত মৃতদেহে ইতস্তত ছড়ানো অবস্থায়। একমাত্র ভাসমান নূহ নবীর নৌকা। দীর্ঘদিন ভেসে থাকার পর একদিন কয়েকজন পুণ্যবান পুরুষ ও নারী সমভিব্যাহারে নূহ একটি কপোত হাতে হাঁটু গেড়ে পাটাতনের ওপর বসেন এবং প্রার্থনার ভঙ্গিতে পাখিটি আকাশের দিকে তুলে ধরেন।
আকাক্সক্ষার মতো সিক্ত মোহময় মাটিতে কি আমি রাখবো প্রথমই পা? অথবা যে প্রশংসার বাণী আমরা ধারণ করি হৃদয়ের কোমল কৌটোয় তার কোনো কলি উচ্চারিত হবে এই অধমের নত মুখ থেকে? আদমের কালোত্তীর্ণ সেই পাপ যেন হে প্রভু আবার কভু ছদ্মবেশী সাপের মতন গোপন পিচ্ছিল পথে বেরিয়ে না আসে।
[‘নূহের প্রার্থনা’, লোক লোকান্তর]
মহাপ্লাবনে ভাসমান সমগ্র পৃথিবী, এক টুকরো মাটির প্রত্যাশায় কবতুর উড়িয়ে দেবার পূর্বে নূহের প্রার্থনা তাৎপর্যপূর্ণ। জীবন পিপাসায় উন্মুখ নৌকার যাত্রীরা ও নূহ আবারো জনপদ গড়তে ও সেখানে স্রষ্টার মহিমা গায়তে চান। তাই অনুরোধ, স্রষ্টার আদেশ অমান্য করে আদম যে পাপের বীজ মানব রক্তে রোপণ করেছেন তা যেন আবারো যে কোনো উপায়ে প্রকাশ না পায়। নূহের প্রার্থনায় সেই অঘটনের শঙ্কা ও সাবধান বাণী উচ্চারিত। আল মাহমুদ মানবজাতির আদি দু’টি কাহিনীকে একই কবিতায় পরস্পর সংলগ্ন করে ব্যবহার করেন মানবিক আকাক্সক্ষাকে সামনে রেখে।
এই পর্বের পরবর্তী দু’টি কাব্য ‘কালের কলস’ ও ‘সোনালি কাবিনে’ কবি উল্লেখ করার মতো সেমেটিক ঐতিহ্যের ব্যবহার করেননি। বাঙালি ও লোক ঐতিহ্যের রূপায়ণ এ পর্বে কবি সাফল্যের সাথে করেন।


কবি সেমেটিক বা ইসলামিক ঐতিহ্যে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাবর্তন করেন দ্বিতীয় পর্বের কবিতায়। ভাবধারা, উপমা, চিত্রকল্প, প্রতীক বা অনুষঙ্গ-নির্মাণে কবি অতীত ইতিহাস বিস্মৃত হন না কখনো। তাঁর প্রত্যাবর্তনের দ্বিতীয় উৎস যেন ব্যক্তিসত্তার নতুন দিগন্ত। কবির আধ্যাত্মিক, রহস্যময় ও ধর্মবিশ্বাস-আশ্রিত কবিতা জীবনের পূর্ণাঙ্গ উপলব্ধির ফলেই অপরিসীম ব্যঞ্জনা লাভ করে। তাঁর সবুজ, সতেজ, বিবর্ণ আশা-আকাক্সক্ষা-বেদনায় উদ্বেলিত জীবনের অন্তঃপুরে সূর্যের আলোকসম্পাত নবজাগরণ সূচিত করে। [রফিকউল্লাহ খান, বাংলাদেশের কবিতা: সমবায়ী স্বতন্ত্রস্বর] কবিজীবনের ব্যাপক পরিবর্তন আসে “মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো” থেকে, জীবনাদর্শ ও কাব্যাদর্শ উভয় দিক থেকে। এ-পর্যায়ে তিনি ব্যাপকভাবে সেমেটিক ঐতিহ্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পরিবর্তিত ভাব-ভাবনা, বক্তব্য এবং আঙ্গিকে এই ঐতিহ্যচেতনা অবলম্বন হয়ে ওঠে। কবিতার পরিভাষার ক্ষেত্রে তিনি মূলত বাইবেল, কোরআন ও ইতিহাস থেকে গ্রহণ করেন। ফলে তাঁর কবিতার এক নতুন জগৎ নির্মিত হতে থাকে। কাব্যভাষা ও বোধের পরিধি বিস্তৃত ও বৈচিত্র্যময় হয়ে ওঠে। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’র নামকবিতা, “প্রাচীর থেকে কথা”, “ধাতুর ওলান থেকে” কবিতা তিনটিতে সেমেটিক ঐতিহ্য স্বাক্ষরিত।

জেলখানায় বন্দী অবস্থায় লেখা “প্রাচীর থেকে কথা”য় কবি এমন একজন মানুষের প্রতিনিধি, যে জেলখানায় আবদ্ধ। যে ব্যক্তি সেই সমস্ত সংগ্রামী, খেটে খাওয়া, সামাজিক মানুষের সঙ্গে জড়িত, যারা দেশের কৃষক, শ্রমিক ও বিপ্লবী নেতা; অন্য দিকে যে সংসারে জননী ও শিশুর আত্মীয়। কিন্তু এই ব্যক্তিকে প্রাচীর থেকে কে যেন ‘যোশেফ’ বলে ডাক দেয়, যে জেলখানায় বন্দী অবস্থায় রাজার স্বপ্নের ব্যাখ্যা করে।
কে যেন প্রাচীন থেকে কথা বলে, যোশেফ, যোশেফ! রাজার স্বপ্নের মানে বলেছিলে তুমি সেই লোক?না আমি যোশেফ নই, না। জানি ফ্যারাও কে, স্রেফ নিজেরই স্বপ্নের দাগে লাল করে রেখেছি দুচোখ।
[‘প্রাচীর থেকে কথা’, মায়াবী পর্দা দুলো ওঠো]
কবি নিজেকে ‘যোশেফ’ বা ‘ইউসুফ’ হিসেবে মেনে নিতে নারাজ; তবে কবি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে সমাজতান্ত্রিক সংগ্রাম ও সংঘাতের প্রেক্ষিত বিবেচনায় এনে এই সত্য বুঝেছে যে, প্রাচীরের বাইরে গণমানুষের অধিকার আদায় ও মানুষে মানুষে সাম্য প্রতিষ্ঠায় নিয়োজিত বিপ্লবীদের হত্যার মধ্য দিয়ে হত্যাকেই আরো উৎসাহিত ও বেগবান করা হয়েছে। তাই কবি নিজের স্বপ্নের রক্তাক্ত বাস্তবতার সাথে যোশেফের স্বপ্নের বৈসাদৃশ্যের কথা বলেন। অতীত ইতিহাসে বন্দীর স্বপ্ন ও স্বপ্ন ব্যাখ্যার প্রসঙ্গ নিজের স্বপ্নের সাথে উচ্চারণের মাধ্যমে কবি আসলে ইতিহাবোধের পরিচয় দিয়েছেন। আধুনিক ঐতিহ্যবাদী কবির জন্য ইতিহাসচেতনায় ঋদ্ধ হওয়া জরুরি।

সেমেটিক ঐতিহ্যের সরাসরি রূপায়ণ হয়েছে “ধাতুর ওলান থেকে” কবিতায়। মোশি বা মুসা নবী সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য ও প্রত্যাদেশের জন্যে সিনাই পর্বতে চল্লিশ দিন অবস্থান করেন। বনি ইশরাইল বা ইহুদি জাতির লোকজন তাঁর বিলম্ব দেখে অধৈর্য হয়ে সোনার গো-বৎস বা গরুর বাছুরের প্রতিমা সমিরি নামের একজন ব্যক্তিকে দিয়ে নির্মাণ করে এবং পূজা বা তার উদ্দেশে শ্রদ্ধা বা অর্চনা নিবেদন করতে থাকে। অথচ মুসা নবী তাদেরকে সম্রাট ফেরাউনের অত্যাচার ও লাঞ্ছনা থেকে বাঁচিয়েছেন। স্রষ্টার কাছ থেকে সুস্বাদু খাদ্যসামগ্রী প্রতিদিন আকাশ থেকে তাদের জন্য বরাদ্দের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু মাত্র কিছু দিনের অনুপস্থিতিতে তারা স্রষ্টার আদেশ লঙ্ঘন করে; তবে সিনাই পর্বত থেকে উঠে আসা আলোর আহ্বান তাদেরকে ডেকে যায় অনবরত।
মানুষ আবার দেখো সোনার গাভীর কাছে যায়; পেছনে পর্বতশীর্ষে দীর্ঘ নিঃশ্বাসের মতো সুন্দর আওয়াজে পবিত্র অক্ষরগুলো ঝরে যায়, আয় ফিরে আয়! আর সে আহ্বান শোনো বিবেক ফাটিয়ে দিয়ে বাজে।
[‘ধাতুর ওলান থেকে’, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো]
কবি বাইবেল ও কোরআনের এই কাহিনীকে কাব্যভাষায় ব্যক্ত করেন। আসলে কবি স্রষ্টার সত্য ও মানুষের পৌত্তলিকতার মধ্যে নিরন্তর দ্বন্দ্বকে নির্দেশ করেন। মানুষের আদি অভ্যাস হলো কোনো শক্তিকে প্রতীকে রূপান্তরিত করে তার উপাসনা করা। এই গল্পেও মুসার জাতি বনি ইসরাইল বা ইহুদিরা তা-ই করেছে। তবে কবি যেহেতু মুসার আদর্শে বিশ্বাসী, সেহেতু সোনার গাভীর উপাসনাকে কবি নেতিবাচক হিসেবে উপস্থাপন করেন। মুসার কাছে আল্লাহর আদেশপ্রাপ্ত প্রস্তর ফলকের আহ্বান তাই সংবেদনশীল মানুষের মাঝে বিবেক ফাটিয়ে দিয়ে বেজে ওঠে। অর্থাৎ ঐশী বাণী আলোড়ন সৃষ্টি করেছে কবির মাঝে। কবি সেই সত্যে উজ্জীবিত হয়ে ওঠেন; ঐতিহ্য থেকে সত্যে গমন করেন। ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ কাব্যের “ইহুদিরা” ও ‘প্রহরান্তের পাশফেরা’র “ইউসুফ” কবিতায় সত্যের আদর্শে প্রাণিত কবি একই প্রসঙ্গে সৃষ্টিশীল।

“মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো” তাঁর কাব্যজগতে একটি বাঁকফেরার স্মারকচিহ্ন। এই কবিতায় তিনি প্রথম স্পষ্টভাবে কোরআনের আদর্শ গ্রহণ করেন। এই গ্রন্থের ঐতিহাসিক দৃষ্টান্তকে কবি সমকালীন পরিপ্রেক্ষিতের মাঝে স্থাপন করেন। একে কবির ‘আত্ম-আবিষ্কারের অন্যতর দিগন্ত’ হিসেবে অভিহিত করা যায় অনায়াসে।
আমি জনমানবহীন বিরান নগরীর পরিত্যক্ত পাথরে আল্লার আদেশ পরিত্যাগ করতে পারি না। আমি ধ্বংসস্তূপের ওপর থেকে সেই মহাগ্রন্থের কাছে নেমে এলাম। যখন দু’হাত বাড়িয়ে তা বুকের কাছে তুলে আনতে যাবো, খোলা পৃষ্ঠায় একটি আয়াতের ওপর নজর পড়লো:
“এই ভাবে বহু শহর আমি ধ্বংস করেছি যেহেতু তা ছিল অন্যায়কারী,
ফলে তা ধ্বংসস্তূপ হয়ে রয়েছে-আর পরিত্যক্ত কূপ, আর উঁচু চূড়ার প্রাসাদ।”
বহু চেষ্টায়, বহু হোঁচট ও হুমড়ি খেতে খেতে আমি আমার পুরোনো আবাসস্থলে পৌঁছলাম। আমার ঘরভাঙা ইটের ঢিবির মতো উঁচু হয়ে আছে। আমি আমার সন্তানদের নাম ধরে বিলাপ করলাম।
[‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো]
পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যায়ের জন্যে অনেক সভ্যতা ও নগর ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়ে জনমানবহীন পরিত্যক্ত প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। কবি কোরআনের আয়াতের মাধ্যমে সেই সত্যকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। কারণ তিনি মনে করেন, বর্তমান শাসনব্যবস্থায় দেশে বহু শোষণ ও অন্যায় সংঘটিত হয়ে আসছে; এ জন্যেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হিসেবে এই শহর বিনাশপ্রাপ্ত হয়েছে। কবির উপলব্ধিতে আদর্শিক ঐতিহ্যের মৌল উৎস ঐশীবাণী জাগ্রত। ফলে কবি স্বপ্নের মাঝে অবচেতন মনে নগর বিনাশের কারণ অনুসন্ধানে সেই উৎসের কাছে ফিরে গেছেন।

আল মাহমুদের আদর্শিক ঐতিহ্যপ্রীতির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’র “হযরত মুহম্মদ” ও ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’র ‘‘নাত’’ কবিতায়। হযরত মুহম্মদ সা.-কে নিয়ে বাংলা সাহিত্যের মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগে শিল্পোত্তীর্ণ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষভাবে আধুনিক সাহিত্যে গোলাম মোস্তফা, কাজী নজরুল ইসলাম ও ফররুখ আহমদ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন। গভীর আবেগ, অনুভূতি, বিশ্বাস, চেতনা, ভক্তি নিয়ে কবিরা কাজ রচনা করেন। কবি যে জীবনাদর্শে আস্থাশীল সেই আদর্শের রূপকার হযরত মোহাম্মদ সা.। ‘মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো’য় কবি জীবন ও সভ্যতা ধ্বংসের কারণরূপে তাঁর প্রাপ্ত সত্যের অনুসরণ না করার বিষয়টি উল্লেখ করেন। “হযরত মুহম্মদ” কবিতায় কবি জীবন ও জগৎ বিনির্মাণে তাঁর জীবনাদর্শের অবদানের কথা ব্যক্ত করেন। অন্যদিকে কবি তাঁর মহিমা, জ্যোতির্ময় ব্যক্তিত্ব, মহাকালিক ব্যাপ্তি, কৃতিত্ব ও বিচ্ছুরিত আলোর জয়গান গেয়েছেন সংহত কাব্যভাষায়।
লাত্-মানাতের বুকে বিদ্ধ হয় দারুণ শায়ক যেসব পাষাণ ছিল গঞ্জনার গৌরবে পাথর একে একে ধসে পড়ে ছলনার নকল নায়ক পাথর চৌচির করে ভেসে আসে ঈমানের স্বর।
লাঞ্ছিতের আসমানে তিনি যেন সোনালি ঈগলডানার আওয়াজে তাঁর কেঁপে ওঠে বন্দীর দুয়ার ছিন্নভিন্ন হয়ে যায় জাহেলের সামান্য শিকল আদিগন্ত ভেদ করে চলে সেই আলোর জোয়ার।
[‘হযরত মোহাম্মদ’, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না]
তাঁর আগমনের মুহূর্তকালকে আরববিশ্বের অন্ধকার যুগ বলা হয়। মানবতার চরম অপমান, লাঞ্ছনা, বিশৃঙ্খলা ও সীমাহীন পাপে জর্জরিত এক সমাজ ও সময়ে তাঁর আবির্ভাব। অতঃপর মনুষ্যত্বের পূর্ণ প্রকাশ ও বিকাশের মাধ্যমে নতুন এক সমাজ, রাষ্ট্র ও সভ্যতার নবজন্ম তাঁরই হাতে। আরববিশ্ব ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে ‘সেই আলোর জোয়ার’ প্লাবন সৃষ্টি করে। ভারতীয় উপমহাদেশে আরব বণিকদের মাধ্যমে অষ্টম শতাব্দীর পর তাঁর জীবনাদর্শের প্রবেশ, প্রচার ও বিকাশ ঘটে। তারই ধারাবাহিকতায় বিশ শতকে সম্পূর্ণ স্বাধীন একটি দেশে (১৯৭১) সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আদর্শিক ঐতিহ্যে তা পরিণত। আল মাহমুদ সেই ঐতিহ্যে উজ্জীবিত হয়ে মানবতার মুক্তিদাতা হিসেবে তাঁর কাব্যিক নান্দীপাঠ করেন।

সেমেটিক ঐতিহ্যের মধ্যে সুফিমত বা সুফিবাদ উল্লেখযোগ্য। মুসলিম মরমি সাধকরা এ মতের অনুসারী। দ্বিতীয় পর্যায়ের কবিতায় এই মনোভাবের সূচনা এবং তৃতীয় পর্যায়ে একটা পরিণতির দিকে অগ্রসর। আল মাহমুদ বিশ্বজগতের সৌন্দর্য, জীবন ও প্রকৃতির মাঝে স্রষ্টাকে খুঁজে পেয়েছেন। স্রষ্টাকে রূপময়-লীলাময় প্রেমকামী রূপে যাঁরা কল্পনা করেছেন তাঁদের মতে স্রষ্টা নিজের মহিমায় মুকুররূপে সৃষ্টি করেছেন জগৎ। কবি এই সৃষ্টির মুকুরে নিজের রূপ নিজেই প্রত্যক্ষ করেন। এ মতের সুফিরা সৃষ্টিকে মনে করে রূপময়-লীলাময় আল্লাহর গধহরভবংঃধঃরড়হ বলে; এবং এর ভিত্তি হলো প্রেম। যেখানে রূপ, সেখানেই প্রেম, অথবা প্রেমই দান করে রূপদৃষ্টি। সেজন্যে এই তত্ত্বে বিশ্বাসী সুফিরা প্রেমবাদী, বিশ্বপ্রেম তাদের সাধনার লক্ষ ও পাথেয়। ‘আরব্য রজনীর রাজহাঁস’ কাব্যে “ডাক” কবিতায় সৃষ্টি ও স্রষ্টার সাথে নিজেকে সংযুক্ত করেন।
তোমাকে ডেকেছি বলে আমি নড়ে ওঠে জগত জঙ্গমপর্বতও পাঠায় সেলামি নদী ফেলে সাগরে কদম।
ঝাঁক বেঁধে পাখি উড়ে যায় চঞ্চুতে আহার্যের স্তবকথা বলো, হাওয়ার ভাষায়সীমাহীন নীলিমা নীরব। … … …
ভাগ্যের অদৃশ্যে বসে যিনি ঠিক রাখে আত্মার বাদাম আমি ঠিক চিনি বা না চিনিতারই প্রতি অজস্র সালাম।
[‘ডাক’, আরব্যরজনীর রাজহাঁস]
প্রকৃতি ও প্রাণী জগতে কবি স্রষ্টার নিদর্শন দেখে অভিভূত। স্রষ্টার প্রতি সৃষ্টির প্রেমানুভব উপলব্ধির ফলে কবি স্রষ্টার প্রতি আরো ভাবাবেগে মগ্ন হয়ে পড়েন। নিজের অদৃষ্ট, অস্তিত্ব ও আত্মার নিয়ন্ত্রক মহাশক্তির উদ্দেশে কবি তাই আন্তরিক সালাম প্রেরণ করেন।

অন্য দিকে কবি ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ কাব্যের “আলো নিরাকার” কবিতায় ভেবেছেন সৃষ্টি স্রষ্টারই প্রতিরূপ, স্রষ্টা নিরাকার আলোময় শক্তি এবং তিনিই অনন্ত সময়ব্যাপী মহাকাল। তিনি সৃষ্টি ও বিনাশের মালিক, সমস্ত আলোর উৎস এবং নিরাকার আলোর মতো তাঁর স্বরূপ। কবি এই মহান শক্তির ভক্ত। কবি সবসময় উৎগ্রীব হয়ে গুণগান গায়তে থাকেন স্রষ্টার আলোয় আলোকিত হবার এবং প্রেমভাবে তাঁর সান্নিধ্য পাওয়ার জন্য। কেননা সেই মহাশক্তির দয়া-প্রেম পেলে কবি সমস্ত ভয় থেকে মুক্ত হতে পারেন।
অথচ তোমার স্পর্শে পৃথিবীতে বসন্তের ফুল যখন ফুটতে থাকে কিংবা মেরু বরফে আবৃত গরম হ্রদের খোঁজে উড়ে যায় হাঁসেরা ব্যাকুল;অথবা মৃত্যুর শব্দে মাঝপথে ঝরে পড়ে মৃত। নিয়মের সুতোগুলো ধরে আছে তোমারই আঙুল ঘূর্ণাবর্তে তুমি নেই, ঘুরে যায় নক্ষত্র নীলিমাবিলুপ্তির নেশা যেন আমাদেরই অস্তিত্বে আকুল আরম্ভ অদৃশ্য যার কেন খুঁজি তারই পরিসীমা? কালের বিচারে তুমি মহাকাল, অনন্ত সময় আমি এক কবি মাত্র, গুণ গাই, আমার কী ভয়।
[‘আলো নিরাকার’, মিথ্যাবাদী রাখাল]

সুফিমতে, সৃষ্টি দেখে স্রষ্টার কথা মনে পড়ে- এটিই রূপ; এ সৃষ্টি বৈচিত্র্য দেখে স্রষ্টার সঙ্গে সম্পর্কবোধ জন্মে- এটিই অনুরাগ; এবং তাঁর প্রতি কতর্ব্যবুদ্ধি জাগে- এটিই বংশী; আর সাধনার আদিস্তরে পাওয়া না পাওয়ার সংশয়বোধ থাকে- তারই প্রতীক নৌকা। এরপরে ভাবপ্রবণ মনে উপ্ত হয় আত্মসমর্পণ ব্যঞ্জক সাধনার আকাক্সক্ষা- এটিই অভিসার। এরপর সাধনায় এগিয়ে গেলে আসে অধ্যাত্ম্য স্বস্তি- তা-ই মিলন। এরও পরে জাগে পরম আকাক্সক্ষা- একাত্ম হওয়ার বাঞ্ছা- যার নাম বাকাবিল্লাহ- বিরহ। কবির আকাক্সক্ষা সেই সেই আলোকিত সর্বশক্তিমান সত্তায় মিলিত হওয়া। ‘এক চক্ষু হরিণ’ গ্রন্থের “ঠিকানাহীন নাওয়ের ভাসান” কবিতায় নৌকার প্রতীকে অভিসার, পীরের মাহাত্ম্য ও আল্লাহর প্রেমভক্তি প্রকাশ পেয়েছে।
ঠিকানাহীন নাওয়ের ভাসান ঠেকলো অজান চরে হালের মুঠি ছেড়ে শ’তান ডুবলো রে অন্তরে। বাতাস এসে ছড়িয়ে দিল বদর পীরের ফুঁবুকের মাঝে উঠলো জিকির আল্লাহু আল্লাহু।
[‘ঠিকানাহীন নাওয়ের ভাসান’, এক চক্ষু হরিণ]

‘দোয়েল ও দয়িতা’ কাব্যের “হে আমার আরম্ভ ও শেষ” কবিতায় কবি স্রষ্টার প্রতি ভক্তিপ্রেম ও শেষ আশ্রয় প্রার্থনা করেন। স্রষ্টা সীমাহীন কালের নিয়ন্তা এবং সৃষ্টির উত্থান-পতন-পরিবর্তন-জন্ম-মৃত্যুর মালিক। কবি তাই জীবনের সূচনা ও সমাপ্তির নির্ধারক সেই স্রষ্টার প্রতি নিবেদন-
হে আমার আরম্ভ ও শেষ। অনন্তের কিনারা আমার এবার আমাকে নাও। অপ্রস্তুত আত্মা আমি। কিন্তু জানি তুমি ছাড়া আমার দোদুল্যমান শরীরের নৌকাখানি অন্যঘাটে জমায়নি পাড়ি। পারানির কড়ি নেই। কিন্তু ছিল তোমাকে ভরসা। পাপী আমি। কিন্তু জানি বহুদূরে আছে এক ক্ষমার তোরণ। ভ্রান্ত আমি। কিন্তু জানি আছে এক দয়ার্দ্র হাসির দীপ্তি অনন্তে, অসীমে। হে আমার আরম্ভ ও শেষ।
[‘হে আমার আরম্ভ ও শেষ’, দোয়েল ও দয়িতা]
কবি স্রষ্টার মহিমা উপলব্ধি করে অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নিজেকে উপস্থাপন করেন। সমস্ত ভক্তি-প্রেম-সমর্পণ তাঁর প্রতি নিবেদিত। নিজেকে অপ্রস্তুত, সম্বলহীন, পাপী ও ভ্রান্ত হিসেবে চিহ্নিত করে কবি স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেন ভরসা, আশ্বাস, সুপথ, ক্ষমা ও দয়া। কেননা কবির বিশ্বাস জীবনের সূচনা, বিকাশ ও সমাপ্তি সেই সত্তার অধীন। কবির অন্তিম আকাক্সক্ষা স্রষ্টার করুণায় সিক্ত হয়ে পারলৌকিক মুক্তি।


আল মাহমুদের ঐতিহ্যের সীমানায় সুফিবাদ আর এক মাত্রা যোগ করেছে তৃতীয় পর্বে। অনেক সময় মৃত্যুচেতনার সঙ্গে সুফিমতের মিশ্রণ ঘটেছে। ‘দ্বিতীয় ভাঙন’ কাব্যে “ভরহীন” কবিতায় কবি স্রষ্টাকে পাওয়ার আকাক্সক্ষা, স্রষ্টার রূপময়-লীলাময় বিশ্বজগৎ, স্রষ্টার মহিমা কীর্তন এবং স্রষ্টার জ্যোতি বা আলোয় উদ্ভাসিত হওয়ার বাসনা ব্যক্ত হয়েছে। সকল যাত্রার শেষে, জীবনের অন্তিমে কবি প্রভুকে পাওয়ার আকাক্সক্ষা ব্যক্ত করেন। কারণ কবি মনে করেন তাঁর জীবনযাত্রা শেষ। এখন শুধু প্রতীক্সক্ষায় থাকা অন্তিম বিদায়ের-
স্তব্ধতার মত শুধু বলে ওঠা, তোমাকে পেলাম। তোমার নামে প্রেমদরিয়ার ঢেউয়েরা লাফায়নুনের গুঞ্জন ওঠে আটলান্টিকে, কি অশান্ত জলনামের মহিমা গায় মেঘপুঞ্জ। পাখির কুলায়নামের জিকির ওঠে। দশদিকে তোমার গজল। অন্তিম পেরিয়ে এসে দাঁড়িয়েছি। আর নেই ভর এখন আমাকে ধর মেলে দিয়ে নূরের চাদর।
[‘ভরহীন’, দ্বিতীয় ভাঙন]

এই গ্রন্থের “প্রার্থনার ভাষা” কবিতায় স্রষ্টায় আত্মনিবেদন, প্রেমভক্তি, সান্নিধ্যের আকুতি ও আলোর তৃষ্ণা প্রকাশিত। নিজেকে এক টলায়মান নৌকার প্রতীকে উপস্থাপন করেন কবি, যার হাল ধরে আছেন মহান স্রষ্টা। কবির আকুতি-
প্রার্থনার ভাষা দাও প্রভু, নির্জ্ঞান আত্মসমর্পণের সহজতা। আমি কি পাড়ি দিয়ে যাচ্ছি না হাঙরসংকুল সমুদ্রের চেয়ে দুরূহ যে আয়ু? সেই দিন এবং রাত্রি? উদয় আর অস্ত। আঁধার এবং আলো। না আলো আর অন্ধাকার আর নয়। জ্বলুক তোমার নূরের দীপ্তিযা ভেদ করে যায় পৃথিবীর উদরে লুকানো সমস্ত গলিত ধাতুরসাত পরত পর্দা। পৌঁছুতে চাই প্রভু তোমার সান্নিধ্যে তোমার সিংহাসনের নিচে একটি ফুরফুরে প্রজাপতি হয়ে। যার পাখায় আঁকা অনাদিকালের অনন্ত রহস্য।
[‘প্রার্থনার ভাষা’, দ্বিতীয় ভাঙন]

‘বিরামপুরের যাত্রী’র নাম কবিতায় কবি জীবন সায়াহ্নের অনুভূতির সঙ্গে সুফিমতের সংমিশ্রণ ঘটান। অতীতের বিরামপুরের বা মরমি পথের পথিক যেসব পীর-দরবেশ রয়েছেন, নিজেকে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত ভেবেছেন। ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনের মধ্যবর্তী কবরের জীবনকেই কবি ‘বিরামপুর’ হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এই কবরের পথের যাত্রী কবি নিজেই।
এই মাটি পুরুষের বুক। এই মাটিকে কে বলে মৃত্তিকা?
কত দরবেশ ঘোরাতে ঘোরাতে তারার তসবিহ দানা পার হয়ে চলে গেছে
পাথরের লৌহ কপাট। তারা ছিলেন বিরামপুরে যাত্রী
এখন আমিও।
[‘বিরামপুরের যাত্রী’, বিরামপুরের যাত্রী]

‘না কোনো শূন্যতা মানি না’ কাব্যের “অনামাঙ্কিত হৃদয়” কাব্যে মৃত্যুচেতনার মাঝেই সুফিবাদ প্রকাশ পেয়েছে। স্রষ্টার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা, আত্মনিবেদন বা প্রেমভক্তি কবি জীবনের শেষ দিনগুলোতে হয়ে উঠেছে অকৃত্রিম ও আন্তরিক।
কিন্তু আমার মত নির্মাণের অর্থের কথা তো বলিনি। আসলে আমি জানি না আমি কী। তবে সব সময় আমি ক্ষমার দিকে মাথা ঝুঁকিয়ে রেখেছি। না দেখেও উবুড় হয়ে পড়ে থেকেছি। এখন আমাকে নিয়ে আমার কোনো বেদনা অনুভূত হচ্ছে না।
[‘অনামাঙ্কিত হৃদয়’, না কোনো শূন্যতা মানি না]

পৃথিবীর জীবনের প্রতি আসক্তি, মোহ ও আকর্ষণ হারিয়ে কবি একমাত্র স্রষ্টার দিকে মুখ ফিরিয়েছেন। তাঁর ক্ষমার কাঙাল হয়ে আছেন রাত্রিদিন। শেষ বয়সে তাই জীবনের প্রতি এক ধরনের নিস্পৃহ বোধ অনুভব করেছেন।
এই পর্বের কবিতায় সেমেটিক ঐতিহ্যের রূপায়ণ হয়েছে দ্বিতীয় পর্বের তুলনায় কম। এ পর্যায়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সময় বাস্তবতা ও লোকঐতিহ্য তাঁর কবিতায় প্রাধান্য পেয়েছে। তবে সেমেটিক ঐতিহ্যের ব্যবহার হয়েছে উল্লেখযোগ্য। ‘নদীর ভিতরে নদী’ কাব্যের “নারী শতাব্দীতে নাদিরার জন্য” কবিতায় আরব ও ইহুদি উভয় জাতির আদি ঐতিহ্য আদম-হাওয়ার প্রসঙ্গ নতুনভাবে প্রকাশ করেন । এই গ্রন্থের “পুরুত্থানের ফুৎকার” কবিতাটি সেমেটিক ঐতিহ্যের স্মারক। সেমেটিক জাতিগুলোর মধ্যে মহাপ্রলয়, শেষ বিচারের দিন এবং পারলৌকিক জীবনের প্রতি বিশ্বাস বর্তমান। [আল কোরআন: ৭৫: ১-২০, ৯৯: ১৮৮, ১০২: ১-৮] উত্তরাধিকার সূত্রেই এই বিশ্বাস প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বহমান। এই কবিতায় কবি মুসলিম জাতির প্রেক্ষিত, দৃষ্টিভঙ্গি ও বিশ্বাস থেকে মহাধ্বংস ও পুনরুত্থান নিজস্ব কাব্যভাষায় প্রাণবন্ত করে তুলেছেন। ইস্রাফিল ফেরেস্তার শিঙ্গার ফুঁয়ে মহাবিশ্ব ধ্বংস হয়ে যাবার পর কবরে সংগুপ্ত সকল মানুষ জীবিত হয়ে উঠে সেই মহাবিচারের ময়দানের দিকে অগ্রসর হবে। কবির ভাষায়-
এবার নানাদিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে শিঙ্গাটি একটিমাত্র গ্রহের দিকে তাক করলেন অক্লান্তবাদক। আওয়াজে বিদ্যুৎ বইতে লাগল ঝলকে ঝলকে। চড় চড় শব্দে সমস্ত সমাধিভূমিরমাটি চৌচির হয়ে বেরিয়ে পড়তে লাগল অগণিত মানুষের মাথা। তাদের প্রভু তাদের যেভাবে প্রথম সৃজন করেছিলেন ঠিক সেইভাবে। যেন কোনো অন্তর্নিহিত তাগিদে তারা উঠে আসছে পৃথিবীর পেট থেকে পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশে। পিঁপড়ের সারির মত তারা ছুটে চলেছে সেই ময়দানে যেখানে, আদম ও হাওয়ার সমস্ত সন্ততির সংকুলান সম্ভব বলে তারা আগে থেকেই জানে। তারা একটি মাত্র বিহ্বল বাক্যে পরস্পরকে সচেতন করতে চাই, আজ হাসর। তারা চলেছে সেই ময়দানে যেখানে থেকে তাদের মুখ ঘুরিয়ে দেয়া হবে অনন্তকালের আনন্দ কিংবা অনুতাপদগ্ধ অসহনীয় দোজখের দিকে।
[‘পুনরুত্থানের ফুৎকার’, নদীর ভিতরে নদী]

বাঙালি মুসলমানের বিশ্বাসগত ঐতিহ্যে শেষ বিচারের দিন সম্পর্কে একটা চেতনা ও প্রতীতি বর্তমান। বাংলা কাব্যে এই দিনকে কেন্দ্র করে প্রচুর কবিতা ও গান রচিত হয়েছে। বিশেষভাবে মধ্যযুগের কাব্যে এর প্রাচুর্য উল্লেখযোগ্য। আধুনিক বাংলা কাব্যেও তার ধারাবাহিকতা লক্ষ্যযোগ্য। আল মাহমুদ নিজস্ব ভঙ্গিতে পৃথিবী ধ্বংসের ও বিচারের ময়দানে জমায়েত হবার চিত্র আঁকেন নানা দৃশ্যকল্পে। গদ্যের আঙ্গিকে বর্ণিত কবিতাটিতে কবির বিশ্বাসের সততা ও আন্তরিকতা প্রকাশিত।
আল মাহমুদ আজীবন লোকঐতিহ্যের সঙ্গে আত্মীয়তা করেছেন; কখনো এই পথ থেকে সরে আসেননি। লোকঐতিহ্য তাঁর কবিতায় নিছক শিল্পসৃষ্টির জন্য ব্যবহৃত হয়নি; গভীর জীবনবোধ, গণচেতনা, জাতির আত্মপরিচয়, প্রাণস্রোত ও প্রতিবেশকে নগর সভ্যতার বিপরীতে স্থাপন এবং বর্তমান জীবন ও সময় বাস্তবতার সঙ্গে শেকড়ের সম্বন্ধসূত্র সৃষ্টিতে ব্যবহৃত হয়েছে। কখনো তা নির্মাণ থেকে পুনর্নিমাণে শিল্পরূপ হয়ে উঠেছে।

আল মাহমুদের কবিতায় ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রকৃতি নিম্নরূপে চিহ্নিত করা যায়:
ক. কবি মানবজাতির ইতিহাসচেতনার আলোকে কবিতা নির্মাণ করেন। বিশেষভাবে বাঙালি জাতির ইতিহাস ভ্রমণের মাধ্যমে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জীবন ও জগতের সঙ্গে কবি সংযোগ সেতু সৃষ্টি করেন।
খ. বায়ান্নোত্তর বাংলাদেশের কাব্যধারায় আত্মআবিষ্কার ও আত্মপরিচয়ের খোঁজে কবি ইতিহাসের পথে পরিভ্রমণ করেন। অন্যদিকে ইতিহাসচেতন কবি ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতার পরিচয় দেন সচেতনভাবে।
গ. বাঙালি জাতি হিসেবে সঙ্কর হবার কারণে একাধিক ধারার ঐতিহ্যের প্রতি কবির অনুরাগ প্রতিফলিত। প্রথমত, বাঙালি ঐতিহ্যর বিশাল জগতে কবির পরিভ্রমণ; দ্বিতীয়ত, সেমেটিক ঐতিহ্যের শৈল্পিক পরিগ্রহণ এবং তৃতীয়ত, লোকঐতিহ্যের সঙ্গে গভীর সংযোগ তাঁর কবিতাকে বাংলাদেশের সংস্কৃতির শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করায়।
ঘ. ইতিহাস-ঐতিহ্যের বিশাল জগতে পরিভ্রমণ করে কবি আবহমান কাল ও সমাজ-সভ্যতার সঙ্গে নিজস্ব কাব্যধারাকে আপন শৈলীতে সংযুক্ত করেন।
ঙ. ঔপনিবেশিক চিন্তাচেতনা, শেকড়বিচ্ছিন্নতা ও নগরসংস্কৃতির বিপরীতে বাঙালির আবহমান ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে আত্মীয়তা জাতির প্রতি কবির দায়বদ্ধতার পরিচয় তুলে ধরে।
শৈল্পিক দক্ষতায় ঐতিহ্য ধারণ ও লালনের জন্য আল মাহমুদকে আধুনিক ঐতিহ্যবাদী কবি হিসেবে অভিহিত করা যায় নির্দ্বিধায়। হ
লেখক : কবি ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply