আসলেই কি জামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাত হয়েছে?

 মুহাম্মদ সাজ্জাদ হুসাইন

Sajjadজামায়াতের সাথে আওয়ামী লীগের আঁতাত হয়েছে কিনা এ কথাটি দেশে বিদেশে বেশ কিছুদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। আমাদের সাংগঠনিক অঙ্গনেও বিশেষ করে তৃণমূল পর্যায়ের জনশক্তি দায়িত্বশীলদের কাছে এ প্রশ্নটি করছেন। আমি নিজেও দু-একটি জেলা শাখায় সফরে গিয়ে এ প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি। পত্রপত্রিকা, Electronic Media এবং সামাজিক সাইটগুলোতেও এ ব্যাপারে প্রচুর পরিমাণ Post দেখা যায়। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়কেন্দ্রিক আগে ও পরে মূলত বিষয়টি ‘Talk of the country’ তে পরিণত হয়। সকলের মনে প্রশ্ন ছিল পর্দার অন্তরালে কিছু ঘটছে কিনা? লেখাটির শুরুর প্রারম্ভেই কাছে থাকা বাংলা Dectionary টা হাতে নিয়ে আঁতাত শব্দটির বাংলা অর্থ খুঁজে বের করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু সেখানে না পেয়ে কষ্ট লাগল তখন Internet এ গিয়ে Search দিলে একজনের লেখায় পেলাম আঁতাত মানে হলো বন্ধুত্বপূর্ণ গোপন সম্পর্ক। আঁতাত শব্দটি Negative বোঝা গেলেও তার অর্থ পাওয়া গেল Positive।
ট্রাইব্যুনালের রায়ে মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী সাহেবের ফাঁসির রায় হলেও আপিল বিভাগ তাঁকে সাজা কমিয়ে আমৃত্যু জেলখানায় বন্দি থাকার ফয়সালা দেয়।
৫ জানুয়ারির তথাকথিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান মহাজোট সরকার কিছুদিন আগে বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে আনে।
ফিরিয়ে আনা দোষের কিছু নয়। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতেও জনপ্রতিনিধিদের হাতে অর্থাৎ Parliament-এর হাতে বিচারপতিদের Impeachment করার ক্ষমতা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের মতো অনুন্নত দেশে (এখানে শুধু আর্থিক অনুন্নতির কথা বলছি না Democratic System follow করার অনুন্নতির কথা বলছি) যে নির্বাচন ৫ জানুয়ারি হয়েছে তার মাধ্যমে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং ১৫২ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সংসদের হাতে Impeachment ক্ষমতা আসা কত ভয়ঙ্কর তা সময় এলেই টের পাওয়া যাবে।
তবে কিছু নমুনা আমরা ট্রাইব্যুনালে দেখতে পাই। আসামিপক্ষের আইনজীবীদের দাবি অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষ যেসব সাক্ষী এবং তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে তা দিয়ে সাঈদী সাহেবের ১ মাসেরও জেল হওয়ার সম্ভাবনা নেই। তাই তড়িঘড়ি করে বিচারপতিদের লাগাম ধরার জন্য এ ব্যবস্থা। সরকার ভেবেছে সাঈদী সাহেবের গোটা বাংলাদেশে যে জনপ্রিয়তা, এমনকি খোদ আওয়ামী লীগের তৃণমূলপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। যদি রায় মৃত্যুদণ্ডের দিকে গড়ায় তাহলে যে পরিস্থিতি তৈরি হবে সেটা এ অবৈধ সরকারের পক্ষে মোকাবেলা করা কঠিন হয়ে পড়বে। সাঈদী সাহেবের প্রথম রায় হওয়ার পর উদ্ভূত পরিস্থিতির কথা সরকারের নিশ্চয়ই মনে আছে। শতশত মানুষ শহীদ হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছে, কারাবরণ করেছে হাজার হাজার। ঢাকা শহর সারাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন ছিলো দিনের পর দিন। জেলা সড়কগুলো ছিল যানবাহন শূন্য।
কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামের রাস্তা অবরুদ্ধ থাকার ফলে পর্যটকদের প্লেন এবং জাহাজে করে ঢাকায় আনতে হয়েছে। জেলাগুলোর প্রত্যন্ত এলাকায় জনরোষের কারণে প্রশাসনিক লোকজন যেতে পারত না। এমনকি র‌্যাব, বিজিবি, পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীও রাতের বেলা অভিযান পরিচালনা করতে যেয়ে জনগণের দ্বারা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ত। এমনকি আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার কারণে বগুড়ায় সেনাবাহিনী নামাতে বাধ্য হয়। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের ২৮ তারিখে তো এ সরকারের Two third majority ছিলো। আর বর্তমানে তো তারা অবৈধ। বিশ্বের কোন দেশ এখনো পর্যন্ত তাদের স্বীকৃতি দেয়নি। তাই তারা কৌশল করে আঁতাতের খবর প্রচার করল। এতে অনেকগুলো লাভ।
১. ২০ দলীয় জোটের মধ্যে ভাঙন ধরানো।
২. জামায়াত আওয়ামী লীগের কাছে নতি স্বীকার করেছে এটি দেশবাসীর কাছে প্রমাণ করা।
৩. জামায়াত-শিবিরের জনশক্তির মনোবল দুর্বল করে দেয়া। এতে করে দুর্বল কর্মীদের মধ্যে প্রশ্নের উদ্ভব হবে।
৪. পরিস্থিতি উত্তপ্ত না হলে আরও কয়দিন ক্ষমতার রস আস্বাদন করা।
আমাদের বন্ধুমহলের অনেকেই প্রশ্ন করে সাঈদী সাহেবের যেহেতু ফাঁসি হয় নাই তাহলে কি জামায়াতের সাথে সরকারের আঁতাত হয়েছে এটা বুঝা যায় না? আমি তাদেরকে পাল্টা প্রশ্ন করতে চাই সাঈদী সাহেবের ফাঁসি হলেই কি আঁতাত হয় নাই প্রমাণ হতো। তাহলে তারা চান যে আমাদের নেতার ফাঁসি হউক আর এর মাধ্যমে প্রমাণ হউক সরকারের সাথে জামায়াতের আঁতাত হয় নাই। বাহ! কী সুন্দর যুক্তি।
গোয়েবলসীয় পদ্ধতির অনুসরণ করে আওয়ামী লীগ মূলত জনগণের মধ্যে আঁতাতের একটা প্রশ্ন তুলেছে। বারবার মিথ্যা প্রচারের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ দেশের মানুষের একটা অংশের মনে এ প্রশ্নটি তোলার সুযোগ পেয়েছে। এক্ষেত্রে তারা সরাসরি বক্তব্য না দিয়ে সুশীলসমাজ কিংবা মিডিয়াকে দিয়ে বলিয়েছে।
German Politician Joseph Goebbels বলেন,
‘If you tell a lie Big enough and keep repeating it, people will eventually come to believe it. The lie can be maintained only for such time as the state can shield the people from the political, economic and/or military cense queues of the lie. It thus become vitally important for the state to use all of its powers to repress dissent, for the truth is the mortal enemy of the lie, and thus by extension, the truth is the greatest enemy of the state’
অবৈধ আওয়ামী সরকারের সাথে আঁতাত হলে জামায়াত কেন্দ্রীয় নীতিনির্ধারণী ফোরাম নির্বাহী পরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগর জামায়াতের নায়েবে আমীর মাওলানা এ.এইচ আব্দুল হালিম ভাই এবং মহানগর জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদকে নির্যাতনে পঙ্গু করে দেয়া হতো না। সরকারের সাথে আঁতাত হলে নিশ্চয়ই প্রতিদিনই সারাদেশে জামায়াত শিবির কর্মীরা ধৎৎবংঃ হতো না। আঁতাত হলে নিশ্চয়ই নেতৃবৃন্দকে আত্মগোপন করে মাসের পর মাস কষ্টকর জীবন-যাপন করতে হতো না।
যেসব কারণে আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত হতে পারে না
জামায়াত যদি আওয়ামী লীগের সাথে আঁতাত করে তাহলে শহীদ আবদুল কাদের মোল্লাসহ শত শত শহীদের রক্তের সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করা হবে।
অসংখ্য ভাই যারা দায়িত্বশীলবৃন্দকে মুক্ত করার জন্য হাত হারিয়েছিল, পা হারিয়েছিল, চোখ হারিয়েছিল এখনো আহত অবস্থায় বিছানায় যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন তাদের হৃদয়ে অনেক বড় আঘাত দেয়া হবে।
অসংখ্য শহীদ পরিবার যারা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, ভাই হারিয়েছেন, স্বামী হারিয়েছেন তাদের কাছে জবাব দেয়ার মতো কোন উত্তর জামায়াত-শিবিরের কাছে থাকবে না।
বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন তার আদর্শিক মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান থেকে পদচ্যুত হবে।
বিগত দিনের আন্দোলন সংগ্রামে জামায়াতের প্রতি মানুষের যে আস্থা জন্মেছিলো সেটা ভেঙে যাবে।
রাজনৈতিকভাবে জামায়াত বাংলাদেশে পরাজিত হয়ে যাবে যার ক্ষতিপূরণ খুব সহজে সম্ভব হবে না।
বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি জনশক্তির মনে প্রশ্ন উঠবে আর তার উত্তর সহজে দেয়া সম্ভব হবে না।
আওয়ামী লীগের সাথে জামায়াতের কোন ধরনের সমঝোতা হয়নি এটা এখন জামায়াতকে তার মৌখিক জবাব এবং কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে এবং জামায়াত সে ধারাবাহিকতায় কাজ করে যাচ্ছে বলে আমাদের বিশ্বাস।

লেখক : কেন্দ্রীয় প্রকাশনা সম্পাদক
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply