আসলেই কি হবে ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তিচুক্তি?

Act-01মাসুম খলিলী

আমেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরির বিশেষ উদ্যোগে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তিতে উপনীত হতে চূড়ান্ত প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। ২৯ এপ্রিলের মধ্যে একটি শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। পশ্চিমতীরে ইসরাইলি বসতি স¤প্রসারণকে কেন্দ্র করে তিন বছর শান্তি আলোচনা বন্ধ থাকার পর মিসরে প্রথম নির্বাচিত সরকার ড. মুরসির সেনা অভ্যুত্থানে পতন ঘটানোর মধ্য দিয়ে অনেকটা আকস্মিকভাবে এই আলোচনা শুরু হয়। এত দিন ইসরাইলের বসতি স¤প্রসারণ বন্ধের যে শর্তপূরণের জন্য ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আলোচনায় বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিলেন সে অবস্থান থেকে তিনি সরে আসেন। মাহমুদ আব্বাস ও ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুকে ওয়াশিংটনে ডেকে নিয়ে বারাক ওবামা করমর্দন করান এবং শান্তি আলোচনা আবার শুরুর ব্যবস্থা করেন। ২৯ এপ্রিলের ২০১৪ সময়সীমা শান্তিচুক্তিতে পৌঁছার জন্য তখনই নির্ধারণ করা হয়।
সর্বশেষ দফা আলোচনা শুরু হওয়ার পরবর্তী নয় মাসে একাধিক দফা আলোচনা হয়েছে শান্তিচুক্তিতে উপনীত হওয়ার ব্যাপারে। ইসরাইলি মিডিয়ায় জন কেরি শান্তিচুক্তির একটি কাঠামোর খসড়া তৈরি করেছেন বলে উল্লেখ করে এর কিছু মূল বিষয় প্রকাশ করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো প্রকাশ করা হয়নি, এ শান্তিকাঠামোয় কী কী প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে রয়েছে। শান্তিচুক্তির এই কাঠামো নিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী ও ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট ছাড়াও সৌদি আরব ও জর্দানের নেতৃবৃন্দের সাথে একাধিকবার কথা বলেন। দুই সপ্তাহ আগে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সাথে বৈঠক করেন। গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র যান মাহমুদ আব্বাস। সেখানে প্রেসিডেন্ট ওবামা ও জন কেরির সাথে মাহমুদ আব্বাসের তাৎপর্যপূর্ণ বৈঠক হয়। উভয় মার্কিন নেতাই ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রধানকে শান্তিচুক্তির আগামী সময়সীমায় আরো গুরুত্বপূর্ণ ছাড় দেয়ার আহŸান (পড়তে হবে চাপ দেন) জানান। সেই গুরুত্বপূর্ণ ছাড় কী হতে পারে এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক কোনো কিছু প্রকাশ করা হয়নি। তবে যেসব ইস্যু নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে মতের ব্যবধান বা বিতর্ক দেখা যাচ্ছে, সেসব ইস্যুতে ছাড় দেয়ার বিষয় থাকতে পারে।

তিন প্রস্তাব
ইসরাইল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে এ পর্যন্ত তিনটি প্রস্তাব কম-বেশি আলোচনায় এসেছে। এর মধ্যে একটি প্রস্তাবের ভিত্তি ছিল ১৯৪৮ সালে ইসরাইল প্রতিষ্ঠা লাভের ঘোষণায়। পরবর্তীকালে নানা বিন্যাসের মাধ্যমে প্রস্তাবটি আনা হয়েছে শান্তি আলোচনার এজেন্ডায়। বর্তমান সৌদি বাদশাহ আবদুল্লাহ যুবরাজ থাকাকালে দেয়া দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানটি এখনকার শান্তি আলোচনার মূল ভিত্তি। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমানাকে সামনে রেখে পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে এই প্রস্তাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের কথা বলা হয়েছে। এর বাইরে একটি প্রস্তাব আসে একরাষ্ট্রে দুই জাতিভিত্তিক সমাধান। এ প্রস্তাবের মূল বক্তব্য হলো ইসরাইল ও ফিলিস্তিনে একটি ফেডারেল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা। এটি এমন একটি রাষ্ট্রকাঠামো হবে যার আওতায় ইহুদি ও ফিলিস্তিনি দুই পক্ষ সম-অধিকারসম্পন্ন দু’টি আঞ্চলিক সরকারের অধীনে থাকবে। দুই পক্ষের সমন্বয়ে গঠিত হবে কেন্দ্রীয় সরকার। লিবিয়ান নেতা মোহাম্মার গাদ্দাফি একসময় এই প্রস্তাব বাস্তবায়নের পক্ষে ছিলেন। এ প্রস্তাব অনুসারে যে নতুন রাষ্ট্র হবে তাতে সব নাগরিকের সম-অধিকারের কথা থাকায় এই ব্যাপারে কখনো ইসরাইলের আগ্রহ ছিল না। এর বাইরে তৃতীয় একটি প্রস্তাব উগ্রপন্থী ইসরাইলিদের মাধ্যমে আলোচনায় চলে এসেছে। প্রস্তাবটির নাম দেয়া হয়েছে তিন রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধান। এতে বলা হচ্ছে ফিলিস্তিনিদের জন্য কোনো রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হলে এই অঞ্চলে কখনো সহাবস্থান ও শান্তি আসবে না। কারণ ফিলিস্তিনিরা আসলেই ইসরাইল রাষ্ট্রের অস্তিত্বকে স্বীকার করতে প্রস্তুত নয়। ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হলে একসময় ইসলামি প্রতিরোধ সংগঠন হামাস সরকারে চলে যাবে। এতে ইসরাইলের নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। এই প্রস্তাব অনুসারে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র এখন যে এলাকা নিয়ে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে তাকে তিন রাষ্ট্রের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। জেরুসালেমসহ অধিকৃত পশ্চিমতীরের ইহুদি বসতির এলাকা চলে যাবে চূড়ান্তভাবে ইসরাইলের হাতে। জর্দান নদীর পশ্চিম তীরের বাকি অংশ চলে যাবে জর্দানের নিয়ন্ত্রণে। গাজা উপত্যকাটি চলে যাবে মিসরের কর্তৃত্বে। এই তৃতীয় প্রস্তাবটির ব্যাপারে প্রকাশ্যে কোনো সরকার সমর্থনের কথা বলছে না। কিছু অন্তরালে চাপ সৃষ্টির জন্য এটাকে ব্যবহার করা হচ্ছে অস্ত্র হিসেবে।
দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের ব্যাপারে ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী প্রকাশ্যে দ্বিমত পোষণ না করলেও তিনি যেসব এজেন্ডা নিয়ে এগিয়ে যেতে চাইছেন তার সাথে সর্বশেষ প্রস্তাবের অনেক বক্তব্য মিলে যায়। নেতানিয়াহু নতুন করে একটি স্পর্শকাতর ইস্যু উত্থাপন করেছেন। এটি হলো শান্তিচুক্তির আগেই ইসরাইল যে ইহুদিদের জন্য তা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে।

ইহুদিদের জন্যই ইসরাইলÑ এ ঘোষণা কেন চাইছেন নেতানিয়াহু?
বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু অনেকটা আকস্মিকভাবে ঘোষণা করেছেন ফিলিস্তিনিদের শান্তিচুক্তি চাইলে আগে ইসরাইলকে ইহুদিদের জন্য রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ইসরাইলকে এই স্বীকৃতি দেয়ার প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন। তার এই অবস্থানকে সমর্থন করেছে আরব লিগ। শান্তি আলোচনার প্রধান পৃষ্ঠপোষক আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি প্রথমে বিষয়টি উপস্থাপন করেন ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু তিনি নিজেই পরে বলেছেন, এটি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুই নয় এখন। এর আগে ইসরাইল প্রতিষ্ঠার সময় ১৯৪৭ সালে জাতিসঙ্ঘ, ১৯৮৮ ও ২০০৪ সালে পিএলও প্রধান ইয়াসির আরাফাত এই ব্যাপারে স্বীকৃতি দিয়েছেন। জন কেরির এ বক্তব্যের সমালোচনা করে ইসরাইল বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র ভুল পক্ষের ওপর চাপ প্রয়োগ করছে। প্রশ্ন উঠেছে কেন নেতানিয়াহু এ মহূর্তে এটিকে এত গুরুত্ব দিয়ে সামনে নিয়ে এলেন? কেনই বা তিনি জেরুসালেমে ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে কোনো আপস না করার কথা বলছেন? কেনই বা পশ্চিম তীরে ইসরাইলি সেনা মোতায়েন নেতানিয়াহু অব্যাহত রাখতে চাইছেন?
১৯৪৭ সালের ১৮১ নম্বর প্রস্তাবে জাতিসঙ্ঘ ফিলিস্তিন এলাকায় একটি ইহুদি রাষ্ট্র একটি আরব রাষ্ট্র ও পৃথক জেরুসালেম নগরী প্রতিষ্ঠার কথা বলেছিল। ১৯৮৮ সালে ফিলিস্তিনিদের স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্যে ফিলিস্তিন এলাকায় দু’টি দেশের কথা বলা হয়। এর একটি ফিলিস্তিনিদের জন্য এবং আরেকটি হবে ইহুদিদের জন্য। ১৯৯৩ সালে পিএলও আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেয়। ২০০৭ সালের আগ পর্যন্ত ‘ইসরাইল একটি ইহুদি রাষ্ট্র’ এই মর্মে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষকে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দিতে হবে এমনটি কোনো বিষয় আসেনি। ২০০৭ সালের অ্যানাপোলিস সম্মেলনে ইস্যুটি প্রথম নিয়ে আসা হয়। অথচ বিশ্বের পরাশক্তিগুলো ফিলিস্তিন থেকে আরবদের বিতাড়িত করে যখন ইসরাইল প্রতিষ্ঠা করে তখন বিশ্বে ইহুদিদের জন্য একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করেছিল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের এনে এই রাষ্ট্রের নাগরিক করা হয়েছে। ঘটনার বাস্তবতা হিসেবে এটি এখন এক প্রকার স্বীকৃত বিষয় হয়ে আছে। এর পরও এ প্রস্তাব সামনে আনার পেছনে বেশ কিছু কারণ সক্রিয় থাকতে পারে। এসব কারণে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের পক্ষে ইহুদি রাষ্ট্রের প্রকাশ্য স্বীকৃতি দেয়া সম্ভব নয় বলেও মনে করা হচ্ছে।
ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র ও ইহুদিদের জন্য বিশেষ রাষ্ট্রের মধ্যে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক স¤প্রদায় বিশেষত পাশ্চাত্য দেশগুলো ইসরাইলের ভৌগোলিক সীমারেখা হিসেবে ১৯৬৭ সালের যুদ্ধপূর্ব সীমান্তকে স্বীকৃতি প্রদান করে। জাতিসঙ্ঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে এই সীমানাকে সামনে রেখে এই এলাকায় ইসরাইলের পাশাপাশি একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের কথা বলা হচ্ছে।
এই দুই রাষ্ট্রের মধ্যে ইসরাইলে ২০ শতাংশ আরব মুসলিম, দ্রæজ ও খ্রিষ্টান রয়েছে। আবার পশ্চিমতীর ও গাজা নিয়ে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র হলে সেখানে সংখ্যালঘু হিসেবে ইহুদি নাগরিক থাকতে পারে। ফিলিস্তিন নেতৃবৃন্দ চান দু’টি দেশই গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে বহাল থাকবে। কোনো ইহুদি ফিলিস্তিন রাষ্ট্রে বসবাস করতে চাইলে যেমন নাগরিক সম-অধিকার তার থাকবে তেমনিভাবে ইসরাইলে যেসব আরব মুসলিম বা খ্রিষ্টান বসবাস করছে তাদেরও সমনাগরিক অধিকার থাকবে। উদার ইসরাইলিরা এ ধারণার সাথে একমত হলেও উগ্র ডানপন্থীরা ইসরাইল রাষ্ট্রকে কেবল ইহুদিদের জন্য নির্ধারণ করে ফেলতে চায়। সেখানে যে ২০ শতাংশ আরব রয়েছে তারা ইসরাইলের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পাবে না। তারা হবে দেশটির দ্বিতীয় শ্রেণীর অধিবাসী। এ ক্ষেত্রে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ যদি ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে নতুন করে জনসমক্ষে স্বীকৃতি দেয় সেটিকে এ কাজের জন্য যুক্তি হিসেবে তুলে ধরা যাবে। আর নাগরিক অধিকারহারা ও নিষ্পেষিতভাবে বসবাস করার চেয়ে তারা ফিলিস্তিনে চলে যেতে আগ্রহী হতে পারে। এটি হলে ইসরাইল রাষ্ট্রে আরব সংখ্যাগরিষ্ঠতা বৃদ্ধির ব্যাপারে এক শ্রেণীর ইসরাইলির মধ্যে যে শঙ্কা আছে তা আর থাকবে না।
ইসরাইল হলো পৃথিবীতে এমন এক অদ্ভুত রাষ্ট্র যেখানে বিশ্বের যেকোনো ইহুদি মায়ের সন্তান রাষ্ট্রটির নাগরিকত্ব চাইতে পারে। এমনকি বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যদি ইহুদি মায়ের মেয়েকে বিয়ে করে থাকে তাহলে সেই ঘরের সন্তান ইসরাইলের অভিবাসন নিয়ে নাগরিক হতে পারে। জুদাইজম এমন একটি ধর্মমত যেখানে ইহুদি মায়ের সন্তান ছাড়া ইহুদি হওয়া যায় না। এ কারণে ইহুদি মায়েদের অধিক সন্তান গ্রহণের ব্যাপারে উৎসাহ জোগানো সত্তে¡ও ইহুদিদের জনসংখ্যা সেভাবে বাড়ছে না। এ জন্য ইহুদি গবেষকেরা ইহুদিসংখ্যা বৃদ্ধির জন্য বাইবেলে যে হারানো গোত্রের কথা উল্লেখ আছে সেই গোত্র আবিষ্কারের জন্য নানা ধরনের গবেষণা করে যাচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মিজোরাম ও মনিপুরে হারানো ইহুদি গোত্র আবিষ্কার করা হয়েছে। তাদের অনেককে নাগরিকত্ব দিয়ে ইসরাইলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত কিছু কিছু ক্ষুদ্র নৃতাত্তি¡ক জনগোষ্ঠীকে এই হারানো গোত্র বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইসরাইলের কট্টর ইহুদিরা দেশটির নাগরিক শক্তি বৃদ্ধির জন্য ইহুদিসংখ্যা বৃদ্ধির কথা ভাবছে। একই সাথে দ্বিতীয় একটি ইহুদি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বিষয়টি নিয়েও তাদের মধ্যে চিন্তাভাবনা চলছে। মিজোরামের ইহুদিরা সেখানে শিংল্যাং-ইসরাইল প্রতিষ্ঠার দাবিও জানিয়েছে।
ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি চাওয়ার মধ্যে আরেকটি বড় বিষয় রয়েছে। সেটি হলো, অঞ্চলটিতে ইহুদিদের স্থায়ী আদিবাসী অধিকারের স্বীকৃতি দেয়া। অর্থাৎ পৃথিবীর যেখান থেকেই ইহুদিরা এসে থাকুক না কেন, ফিলিস্তিন ও এর চার পাশের এলাকাকে তাদের আদিভূমি হিসেবে স্বীকার করে নেয়া। এর সাথে সাথে এই ভূখণ্ড থেকে যেসব ফিলিস্তিনি উচ্ছেদ হয়ে পৃথিবীর দেশে দেশে বসবাস করছে তাদের ফিরে আসার অধিকারকে স্থায়ীভাবে অস্বীকার করার পথ তৈরি করা। উদ্বাস্তু প্রত্যাবর্তনের অধিকারের বিষয়টি দুইপক্ষের মতবিরোধের একটি প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব বিবেচনায় বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সামনে ফিলিস্তিনিদের কাছ থেকে ইসরাইলের ইহুদি রাষ্ট্র হওয়ার স্বীকৃতি আদায় করে নেয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ ততটাই বিপজ্জনক ফিলিস্তিনিদের জন্য এই স্বীকৃতিতে প্রকাশ্যে সম্মত হওয়া।

সময় পার করে দেয়া
শান্তি চুক্তির আলোচনায় আরেকটি কৌশলগত কারণ নেতানিয়াহুর অনমনীয়তার কারণ হতে পারে। সেটি হলো অজুহাত তৈরি করে সময় পার করে দেয়া। ইতোমধ্যে ইসরাইলি সংসদ তিনটি তাৎপর্যপূর্ণ আইন সংসদে পাস করেছে। এর একটি হলো নির্বাচনে সংসদীয় আসনের জন্য ভোট প্রাপ্তির ন্যূনতম শতাংশ ২ ভাগ থেকে বাড়িয়ে সোয়া ৩ ভাগে উন্নীত করা। এর উদ্দেশ্য হলো আরবদের প্রতিনিধিত্বশীল সংগঠনগুলোকে দেশটির সংসদ নেসেটের বাইরে রাখা। আরব সংগঠনগুলোর মোট ভোট এই ৩ দশমিক ২৫ শতাংশের মধ্যে। নেসেটে পাস করা আরেকটি আইনের ঘোষিত লক্ষ্যই হলো অর্থোডক্স ইহুদি যুবকদের বাধ্যতামূলকভাবে সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার ব্যাপারে এখন যে আরো চার বছরের জন্য অব্যাহতি দেয়া হয়েছে তা বাতিল করা। তৃতীয়টি হলো শান্তিচুক্তি সংক্রান্ত। এ তিনটি আইনের পর্যালোচনা করে ইসরাইলি কলামিস্ট ইউরি অ্যাভনারি বলেছেন, শান্তি চুক্তি সংক্রান্ত আইনই হলো এই তিন চুক্তির মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ চুক্তি অনুযায়ী ইসরাইলের নিয়ন্ত্রিত যেকোনো ভূখণ্ডের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হলে এটি গণভোটে পাস হতে হবে। এ তিন আইনের প্রথমটি দিয়ে আরব ইসরাইলিদের সংসদে প্রতিনিধিত্বহীন করার একটি ব্যবস্থা করা হয়েছে আর দ্বিতীয়টি করা হয়েছে সামরিক বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধির জন্য। তৃতীয়টি শান্তিচুক্তি যদি সরকার সম্পাদনও করে গণভোটে যাতে এটি আটকে দেয়া যেতে পারে সে লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে। নেতানিয়াহুর বিরোধী পক্ষ এসব আইন পাসকে সমর্থন করেনি।
নেতানিয়াহু জানেন, আমেরিকার ওবামা প্রশাসন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন ফিলিস্তিনে দ্ব›দ্ব অবসানের ব্যাপারে একটি কিছু করার বাপারে সিরিয়াস। এর অংশ হিসেবে মার্কিন পরারষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি শান্তিচুক্তির একটি খসড়া কাঠামো ইসরাইলের কাছে উপস্থাপন করেছে। ইসরাইল এ সময়ে এমন একটি ইস্যু যদি সামনে নিয়ে আসতে পারে যেটি এ ক্ষেত্রে অচলাবস্থা তৈরি করে, তাহলে তেলআবিব পশ্চিম তীর এবং পূর্ব জেরুসালেমে আরো ইহুদি বসতি স¤প্রসারণ করতে পারবে। আর সে ক্ষেত্রে তিন রাষ্ট্র সমাধানের যে বক্তব্য তুলে ধরা হচ্ছে সেটার পক্ষে আরো সমর্থন জোগাড় করা সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে আরব শাসকদের নমনীয় করতে ব্রাদারহুড ভীতিকে সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে। বলা হচ্ছে ইসলামিস্টরা এই অঞ্চলে ক্ষমতায় গেলে আরব রাজতান্ত্রিক সরকারগুলোর ক্ষমতা হুমকির মধ্যে পড়বে।
এর মাধ্যমে ইসরাইল দু’টি লক্ষ্য অর্জন করতে চাইছে। প্রথমতো ইনোন পরিকল্পনা অনুসারে আরব রাষ্ট্রগুলোর ক্ষমতা ও নিরাপত্তার জন্য ইসরাইলের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল করে রাখতে চাইছে। দ্বিতীয়ত, হামাসের দোহাই দিয়ে ফিলিস্তিন সঙ্কটকে আরো দীর্ঘকাল ঝুলিয়ে রাখতে চাইছে। ইহুদি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি দাবি, স্বাধীনতার পরও ফিলিস্তিনে ইসরাইলি নিরাপত্তাবাহিনী রেখে দেয়া, পূর্ব জেরুসালেমে ফিলিস্তিনের রাজধানী করতে সম্মতি না জানানো, ’৬৭ সালের পূর্ব অবস্থাকে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে মেনে নিতে অনীহা সবগুলো সময় পার করে দেয়ার কৌশলের অংশ হতে পারে। এভাবে সময়ক্ষেপণ হলে ২০১৬ সালে নতুন আমেরিকান নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি ক্ষমতায় চলে আসতে পারে। আর সেটি হলে শান্তিচুক্তি সম্পাদন নিয়ে চাপ আর সে রকম না-ও থাকতে পারে।

গাজা দখলের হুমকি
শান্তি চুক্তিতে আসলে কতটা আন্তরিকতা ইসরাইলের রয়েছে তা কিছুটা অনুমান করা যায় দেশটির উগ্রবাদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী লিবারম্যানের বক্তব্যে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি অস্বীকার করে ইসরাইল স¤প্রতি গাজায় বিমান হামলা চালালে এর উত্তরে গাজা থেকে ইসলামি জিহাদ রকেট হামলা চালায়। এরপর ইসরাইলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী গাজা আবার দখল করে নেয়ার হুমকি দিয়েছেন। এই হুমকি তিনি এমন সময় দিলেন যখন ইসরাইলের বন্ধু ও মিসরের সেনানায়ক জেনারেল আল সিসি হামাসের সব তৎপরতা মিসরে বন্ধ করে দিয়ে এই প্রতিরোধ আন্দোলনকে সন্ত্রাসী সংগঠন ঘোষণা করেছে। অন্য দিকে সিসির আরেক পৃষ্ঠপোষক সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় ইসলামি রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে ঘোষণা করেছেন সন্ত্রাসী সংগঠন। এ ধরনের এক পরিস্থিতিতে গাজায় ইসরাইলের আরেক দফা হামলা ও গণহত্যা চালানোর আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছে। আর এতে ফিলিস্তিনিদের সাথে ইসরাইলের শান্তিচুক্তির প্রকৃত ইচ্ছার যেমন প্রকাশ ঘটছে তেমনিভাবে সেই তিন রাষ্ট্র সমাধানের গোপন প্রচেষ্টা এগিয়ে নেয়ার বিষয়টিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ২০০৮ সালের আমেরিকার প্রভাবশালী দৈনিক নিউ ইয়র্ক টাইমসে ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট এর গিউরা এইল্যান্ড বেশ জোরালোভাবে লিখেছিলেন, তিন রাষ্ট্র সমাধানের অংশ হিসেবে গাজাকে মিসর ও পশ্চিম তীরকে জর্দানের কাছে ছেড়ে দেয়া উচিত। তাদের যুক্তি ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের প্রতি ১০ আরবের মধ্যে মাত্র দু’জন ইহুদি সংখ্যাগরিষ্ঠের ইসরাইল থাকা উচিত বলে মনে করে। আশঙ্কার ব্যাপার হলো কিছু দিন আগে পর্যন্ত এ বিষয়টি কোনো ফোরামে উপস্থাপন করার মতো নয় বলে মনে করা হতো। অথচ মধ্যপ্রাচ্যের পরিবর্তিত পরিস্থিতি এবং আরব শাসকদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ইসরাইলি এবং কোনো কোনো পশ্চিমা মিডিয়াতে এ নিয়ে ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চলছে। ফলে ইসরাইল-ফিলিস্তিন শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ আরেকটি ফলহীন ঢাক ঢোল পেঠানো প্রচেষ্টায় পরিণত হতে পারে বলে ভিন্ন মতের আমেরিকান অধ্যাপক ও ইহুদি চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এক সময় যে মন্তব্য করেছিলেন সেটি বাস্তবে রূপ নিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

SHARE

Leave a Reply