আসামে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা : রহস্য কী?

মীযানুল করীম

জুলাই মাসের শেষ দিকে হঠাৎ ভারতের আসামে মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার সূচনার পর সহিংসতার তাণ্ডব বোড়োল্যান্ড এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। গত দুই দশকের মধ্যে এটা ছিল সেখানে ষষ্ঠবারের মতো ভয়াবহ দাঙ্গা। অতীতের প্রায় প্রতিবারের মতো এবারও এর শিকার কৃষিজীবী সাধারণ মুসলমানেরা। তাদের পূর্বপুরুষেরা বহু দিন আগে প্রধানত পূর্ববঙ্গ থেকে উত্তর আসামের সে অঞ্চলে সংগ্রাম করে বসত গড়েছিলেন। এবারে অমুসলিম বোড়ো উপজাতীয় লোকজনের সৃষ্ট দাঙ্গায় প্রায় এক শ’ মানুষ নিহত এবং বহু লোক আহত হন। ৬০০ গ্রাম বিরান হয়ে যায় লুটপাট এবং ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয়ার কারণে। ৫ লাখ অসহায় মানুষ সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয়শিবিরে উঠেছেন। এদের একটা বড় অংশ পাশের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে অবস্থান করছে।
সম্প্রতি মিয়ানমারে রাখাইনরা মুসলমানদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেই তদন্ত বা সাক্ষ্য প্রমাণের জন্য অপেক্ষা না করে হামলা ও হত্যায় মেতে উঠেছিল। তেমনি ঘটনা ঘটলো ভারতের বোড়োদের বেলায়ও। কাকতালীয় হচ্ছে রাখাইন ও বোড়ো উভয়ই মঙ্গোলীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী। ২৯ জুলাই কোকড়াঝাড়ে ৪ জন বোড়ো যুবক সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়। তারা এ জন্য মুসলমানদের দায়ী করে পরিকল্পিত দাঙ্গা শুরু করে দেয়।
উপজাতীয় সাধারণ দুর্বৃত্তদের সাথে যোগ দেয় অত্যাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত বোড়ো গেরিলারা। এরা লিবারেশন টাইগার্স নামে স্বাধীন বোড়োল্যান্ড প্রতিষ্ঠার জন্য ভারতীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে আসছে। শত শত বোড়োর ব্যাপক হামলা ও বর্বরতার বলি হয়েছেন নিরীহ বাঙালি অভিবাসীরা।
আসামের এমপি (জনতা দল) আলী আনোয়ার আনসারী বলেছেন, ‘গুজরাট দাঙ্গার পুনরাবৃৃত্তির চেষ্টা চলছে আসামে। সেখানে মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রত্যক্ষ মদদ দিয়েছেন দাঙ্গায়।
তেমনি আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ দাঙ্গায় জুগিয়েছেন ইন্ধন। এবার শতাধিক মুসলিম নিহত এবং তাদের কয়েক হাজার বাড়িঘর ভস্মীভূত হয়েছে। অসংখ্য মানুষ এখন উদ্বাস্তু।’ আনসারী এমনকি মুখ্যমন্ত্রীকে গ্রেফতারের দাবিও জানান। এদিকে মুসলমানদের পূর্ণ নিরাপত্তার দাবিতে অল আসাম মাইনোরিটি স্টুডেন্টস ইউনিয়ন হরতাল পালন করেছে।
এবার যখন বাংলাদেশ-ভারতের মুসলমানরা পবিত্র রমজান মাসে লায়লাতুল কদরের ইবাদতে ব্যস্ত, ঠিক তখনি আসামে নতুন করে দাঙ্গার শিকার হলেন অসহায় মুসলমানেরা। ভারতীয় রাজ্যটির রাজধানী গৌহাটি থেকে এএফপি জানায়, (সাম্প্রতিক মুসলিম হত্যাযজ্ঞের হোতা) বোড়ো উপজাতীয় দুর্বৃত্তরা একজন মুসলমানের ওপর হামলা চালিয়ে তার গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। তারা একটি পুলও পোড়ানোর প্রয়াস পায়। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ঈদুল ফিতরের পূর্ব মুহূর্তে স্বার্থান্বেষী শক্তি ব্যাঙ্গালোরসহ দক্ষিণ ভারতের নানা জায়গায় গুজব ছড়িয়ে দেয়, ‘আসামে হত্যার প্রতিশোধ দাক্ষিণাত্যে নেবে মুসলমানেরা।’ ফলে হাজার হাজার হিন্দু নারী-পুরুষ (যারা প্রধানত আসাম অঞ্চলের) প্রাণভয়ে দক্ষিণ ভারত থেকে আসামের দিকে ছুটতে থাকে। ব্যাঙ্গালোর স্টেশনে প্রচণ্ড ভিড় জমে যায় এবং তাদের প্রত্যাবর্তনের জন্য বিশেষ ট্রেন দিতে হয়। আসলে মুসলিম নিধনই ছিল কথিত প্রতিশোধের গুজব ছড়ানোর লক্ষ্য। ঈদের সময় ট্রেনে খোঁজ করে ৪ জন নির্দোষ মুসলমানকে পৈশাচিক উপায়ে হত্যা করা হয়েছে। হামলায় ও নির্যাতনে কয়েকজন মুসলিম মারাত্মকভাবে আহত হয়েছেন। সর্বশেষ ২৫ আগস্ট বোড়োদের সূচিত দাঙ্গায় ৫ জন নিহত হওয়ায় জারি করতে হলো সান্ধ্য আইন।
আসামের দাঙ্গার জের ধরে ভারতের অন্যত্রও আতঙ্ক ও উত্তেজনা প্রসঙ্গে বিখ্যাত সাংবাদিক-কলামিস্ট এম জে আকবর লিখেছেন, আসাম থেকে উৎসারিত ভীতি ও সহিংসতা ভারতজুড়ে বিভিন্ন নগরীকে সংক্রমিত করেছে। তার মতে, সেখানে অভিবাসী মুসলমান এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্ঘাতের কারণ ভূমি ও অর্থনীতি। তার ভাষায়, শতবর্ষের সঙ্কটময় রাজনীতি হিন্দু ও মুসলমানদের মাঝে মানসিক ও দৈহিক দূরত্ব তৈরি করায় সহিংসতা হয়ে উঠেছে উভয়ের মধ্যকার সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য।
উত্তর-পূর্ব ভারতের ৭টি রাজ্য বা প্রদেশ সাতবোন নামে অভিহিত। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশের সংলগ্ন ৪টি রাজ্য আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরাম এবং সেই সাথে মনিপুর, নাগাল্যান্ড ও অরুণাচল। ভারতের উত্তর-পূর্ব অংশ দেশের বাদবাকি এলাকা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন। ভাষাগত ও নৃতাত্ত্বিক দিক থেকেও এই অঞ্চল অনেকটা ভিন্ন। এখানে ধর্মীয় সম্প্রদায়গত দাঙ্গার তেমন নজির নেই। বরং ভারতের কেন্দ্রীয় শাসন থেকে মুক্তির সশস্ত্র আন্দোলনের ধারাই রাজনীতির প্রধান ইস্যু। এই আন্দোলন নস্যাৎ করাসহ বিভিন্ন উদ্দেশ্যে আসামে মুসলিমবিরোধী মনোভাব উসকে দেয়ার ষড়যন্ত্র চলছে ইদানীং।
প্রাসঙ্গিক একটি ঘটনা হলো সম্প্রতি আসামে জনৈকা হিন্দু মহিলা এমএলএ (প্রাদেশিক আইন পরিষদ সদস্য) ইসলাম গ্রহণ এবং একজন মুসলমানকে বিয়ে করেন। এ কারণে তার মতো সম্মানিত ব্যক্তিও নির্যাতিত হয়েছেন। গৌহাটির এক জায়গায় খাওয়ার সময় তাকে ও তার স্বামীকে বেদম প্রহার করা হলো। রুমিনাথ নামের ওই মহিলা বলেছেন, আমার অন্য ধর্ম গ্রহণকে রাজনৈতিক ইস্যু বানানো হয়েছে। উল্লেখ্য, আসামে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ভারতের উত্তর ও পশ্চিম অংশের তুলনায় নগণ্য হলেও মুসলমানদের প্রতি নীরবে অবিচার বহাল রয়েছে। তারা এ রাজ্যেও শিক্ষা, অর্থনীতি, বাণিজ্য, কর্মসংস্থান প্রভৃতি ক্ষেত্রে বৈষম্য বঞ্চনার শিকার।
এক দিকে মুসলমানরা অধিকার বঞ্চিত, অন্য দিকে বাংলাভাষী অভিবাসী মুসলমানদের অবস্থা আরো করুণ। তা ছাড়া, সার্বিকভাবে বাঙালিরা আসামে অনেক অধিকার ভোগ করতে পারেন না। সেখানে বাংলাভাষা আজো উপেক্ষিত, যদিও বাঙালিরা সংখ্যায় বিপুল। অতীতে বাংলাভাষার মর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য কয়েকজন বাঙালিকে প্রাণ দিতে হয়েছে আসামের বুকে।
আসামের দাঙ্গায় মুসলমানদের কোনো লাভ নেই। বরং তারাই হবে সব দিক দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত। সেখানে তারা যে শুধু সংখ্যালুঘ, তা নয়। ভারতের অন্যান্য এলাকার মতো সেখানেও প্রশাসন এবং নিরাপত্তা বাহিনী মুসলমানদের প্রতি বন্ধুসুলভ নয়। বাস্তবেও মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরাই প্রায় একচেটিয়াভাবে শিকার হয়েছেন এই দাঙ্গায়। তবুও সাম্প্রদায়িক শক্তির অপপ্রচার থেমে থাকেনি। বিজেপির মতো হিন্দুত্ববাদী দল বলেছে, বোড়োদের সাথে মুসলমানদের দাঙ্গায় প্রতিবেশী বাংলাদেশের উসকানি আছে। এ যেন চোরের মার বড় গলা। তা ছাড়া, দু’টি বিষয় বিবেচনার দাবি রাখে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার স্বঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর জন্য তাদের পক্ষপাতিত্ব না থাকার প্রমাণ তারা প্রথমাবধি দিয়ে আসছে। দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ, অর্থাৎ এখানকার মুসলমানেরা গত ৬৫ বছরে ভারতের কোনো সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মদদ দিয়েছে বলে কেউ একটি প্রমাণও দিতে পারেনি। আর এমন উদ্ভট ও অবাস্তব অভিযোগ সুস্থ মস্তিষ্কের কেউ বিশ্বাস করতে পারেন না।
শাক দিয়ে মাছ চাপা দিয়ে রাখা যায় না। ভারতের যে সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশ থেকে ভারতে অনুপ্রবেশ এবং বেআইনি প্রবেশের ধুয়া তোলায় অভ্যস্ত এমনকি এই অজুহাতে ফালানির মতো দরিদ্র কিশোরীকে হত্যা করতেও দ্বিধাহীন, সেই খুনিবাহিনী বিএসএফই আসল কথাটা বলে দিয়েছে। এর পরিচালক ইউকে বনসাল পত্রিকাকে সাক্ষাৎকারে বললেন, আসামের চলমান দাঙ্গায় সীমান্তের কোনো দেশের নেই উসকানি। অভিবাসী মুসলমানরাও এতে জড়িত নয়। এই দাঙ্গার কারণ স্থানীয় সঙ্ঘাত। অবশ্য ১৮ আগস্ট এ কথা বলার পরদিনই দক্ষিণ ভারতে গুজব ছড়িয়ে মুসলমান ট্রেনযাত্রী খুঁজে খুঁজে হত্যার অভিযানে নেমেছিল কট্টর হিন্দুরা।
বোড়োদের সাথে বিবাদ মূলত আসামের সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অহমিয়াদের। বোড়োদের সশস্ত্র সঙ্ঘাত চলে আসছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন বাহিনীর সাথে। সে ক্ষেত্রে হঠাৎ নিরীহ, নিম্নবিত্ত ও শান্তিপ্রিয় মুসলিম কৃষিজীবীরা বোড়োদের টার্গেটে পরিণত হওয়া বিস্ময়কর ও রহস্যময়। অমুসলিমদের সূচিত এই দাঙ্গায় মারাত্মক ক্ষতি হলো মুসলমানদের। অথচ সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘ পরিবার বলেছে, এই দাঙ্গায় নাকি মুসলিম অধ্যুষিত বাংলাদেশের উসকানি আছে। বোঝা যাচ্ছে, ১৯৪৭ সালে হিন্দুপ্রধান ভারত রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ৬৫ বছর পরও আসামে কেন, বিভিন্ন স্থানে মুসলিম জনপদ থাকবে, এটা বিজেপিসহ সঙ্ঘ পরিবারের বিষম গাত্রজ্বালা ঘটাচ্ছে। বোড়োদের তারা দাঙ্গা বাধাতে উসকিয়েছে বলে মনে করা যায়।
কট্টর হিন্দুত্ববাদী আরএসএস শিবসেনা, বিজেপি, বজরং, বিশ্বহিন্দু পরিষদ প্রভৃতির একই পরিবারভুক্ত একটি সংগঠন ‘বনবাসী কল্যাণ কেন্দ্র’। আসাম, মেঘালয়, অরুণাচলের পাহাড়ি ও উপজাতি অধ্যুষিত এলাকায় এদের নেটওয়ার্ক ও তৎপরতা অত্যন্ত বিস্তৃত। দরিদ্র, পশ্চাৎপদ ও অশিক্ষিত পাহাড়ি লোকজনকে হিন্দুত্ববাদীরা বুঝিয়ে থাকে, অতীতে মুসলিম শাসকদের অত্যাচারেই ওদের পূর্ব-পুরুষরা বনে-জঙ্গলে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল। এভাবে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গামুক্ত জনপদেও উগ্র বিদ্বেষের বিষবাষ্প দেয়া হচ্ছে ছড়িয়ে। ফলে আসাম, মেঘালয় প্রভৃতি রাজ্যে মুসলমানরা জানমাল ইজ্জতের প্রতি হুমকি অনুভব করছে।
জুলাই মাসের শেষ দিকে বোড়োদের মুসলিমবিরোধী দাঙ্গা সংঘটিত হয়। এরপর প্রথমে মনে হয়েছিল, সহিংসতার অবসান ঘটেছে। কিন্তু উত্তেজনা ও আতঙ্ক ঠিকই বজায় ছিল। রমজানের শেষ দিকে হঠাৎ গুজব তুলে আসামের বাইরেও সুপরিকল্পিতভাবে মুসলিম সংখ্যালঘুদের হত্যা নির্যাতনের পালা শুরু হয়। প্রশাসন সন্ত্রাস সহিংসতা রোধ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিক ও মানবিক অধিকার রক্ষার বিষয়ে আন্তরিকতার পরিচয় দেয়নি। এই অবস্থায় হত্যা, হামলা পুরো বন্ধ হয়নি এবং নিরীহ শান্তিপ্রিয় অভিবাসীরা রয়েছেন নিদারুণ অতঙ্কে।
এই প্রেক্ষাপটে আসাম নিয়ে গোপন রিপোর্ট ফাঁসের খবর দিয়েছেন দৈনিক নয়া দিগন্তের ভারত প্রতিনিধি। ২৫ আগস্ট প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, সাম্প্রতিক দাঙ্গাকালীন সহিংসতা দমনে জরুরি হওয়া সত্ত্বেও জুনিয়র পুলিশ কর্মকর্তারা ব্যবস্থা নিতে অক্ষম ও অনিচ্ছুক ছিলেন। এসব অফিসার ও জওয়ানরা দৃঢ় ব্যবস্থা নিতে চাননি। যদিও জমিজমার বিষয় এই দাঙ্গার একটা প্রধান কারণ। গোপন রিপোর্টে বলা হয় যে, কারণ আরো ছিল। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বোড়ো নয় এমন মানুষেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও তাদের মনে বঞ্চনার তীব্র অনুভূতি রয়েছে। তাদের স্বার্থ উপেক্ষিত বলেই তারা মনে করছেন। পুলিশের উক্ত রিপোর্টে জানানো হয়, আসামের ওই অঞ্চল নামে বোড়োল্যান্ড হলেও আসলে সেখানে তারা জনসংখ্যার মাত্র ২৭ শতাংশ। মোট ৩৩ লাখ বাসিন্দার ১১ লাখ বোড়ো, ৭ লাখ মুসলমান, বাঙালি হিন্দু ১ লাখ, অহমিয়া হিন্দু ৩ লাখ। অথচ এই অ-বোড়ো জনগোষ্ঠী রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অধিকার বঞ্চিত। বোড়োল্যান্ড কাউন্সিলের ৪০ জন সদস্যের ৩৬ জনই বোড়ো। একই হারে ওরা ভোগ করছে চাকরিসহ আর্থসামাজিক নানান সুবিধা।
পুলিশ রিপোর্টটিতে দাঙ্গার উৎস ও পূর্ব নজিরগুলো তুলে ধরে জানানো হয়, ১৯৯৩ সাল থেকেই কথিত বোড়োল্যুান্ডে দাঙ্গা, হত্যা আর গ্রাম ধ্বংসের মাধ্যমে জাতিগত নির্র্মূল অভিযান চলে আসছে, যাতে ক্রমশ বোড়োদের সংখ্যাধিক্য দেখানো সম্ভব হয়। ’৯৩, ’৯৪, ’৯৬ ও ’৯৮ সালে ইউরোপের বসনিয়ার স্টাইলে নির্মূল অভিযান চলে। প্রায় প্রতিবার টার্গেট ছিলেন মুসলমানেরা। একবার সাঁওতাল ও অন্যদের ওপর হামলা ও তাদের বাস্তুচ্যুত করা হয়। বোড়ো জঙ্গিদের কাছে একে-৪৭ রাইফেল ও গ্রেনেড লাঞ্চার থাকার কথাও রিপোর্টে উল্লিখিত হয়েছে।
প্রায় একই সময়ে তথ্য পাওয়া গেছে আসামের দাঙ্গার দায় ও প্রতিকারের ব্যাপারে। কলকতার রাজনৈতিক মহল- বিশেষত মুসলিম নেতৃবর্গ মনে করেন, এই দাঙ্গার পশ্চাতে যৌথভাবে তৎপর ছিল ক) রাজনৈতিক, খ) প্রশাসনিক, গ) উপজাতীয় শক্তি। অর্থাৎ শুধু বোড়ো দুর্র্বৃত্তরা নয়, মদদগার রাজনীতি এবং নিষ্ক্রিয় প্রশাসনও সাম্প্রদায়িকতা দোষে দুষ্ট।
আর রাজনৈতিক সংগঠনরূপে এক্ষেত্রে অভিযোগের অঙ্গুলি দু’টি দলের দিকে- বিজেপি আর কংগ্রেস। জাতীয় রাজনীতিতে তারা পরস্পর প্রতিযোগী হলেও বোড়োল্যান্ডের মুসলমানদের নির্মূল করার বেলায় একে অন্যের সহযোগী। এ জন্য বিজেপির হিন্দুত্বদর্শন এবং কংগ্রেসের হিন্দুভোট ধরে রাখার তাগিদ কাজ করেছে। আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ একজন কংগ্রেস। পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস নেতা আবদুল মান্নান পর্যন্ত বলেন, দাঙ্গা দমনে গগৈ সম্পূর্ণ ব্যর্থ।
কংগ্রেসমহল বলছে, দাঙ্গার ব্যাপারে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা আগাম সতর্ক করে দিয়েছিল। তবুও রাজ্য সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। তবে সিপিএমের অভিমত, সদিচ্ছা থাকলে সরকার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দাঙ্গা বন্ধ করতে পারে। আসামের দাঙ্গা দমনে রাজ্য ও কেন্দ্র, দুই সরকারই পরিচয় দিয়েছে ব্যর্থতার।’
এখন প্রতিকারের উপায় কী? আসামে দাঙ্গা সম্পূর্ণ বন্ধ করা, নিরাপত্তাবোধ ফিরিয়ে আনাসহ সংশ্লিষ্ট ইস্যুর যথাযথ সমাধানের লক্ষ্যে বিভিন্ন দাবি উঠেছে। যেমন ক) সর্বপ্রথম বোড়ো টেরিটরিয়াল এরিয়া প্রশাসন কাঠামো ভেঙে দেয়া। খ) বোড়োদের কাছ থেকে সব বেআইনি অস্ত্র উদ্ধার। গ) ক্ষতিগ্রস্তদের আশু ও পর্যাপ্ত পুনর্বাসন। ঘ) তাদের নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র তৈরি করা। ঙ) বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশনের মাধ্যমে দাঙ্গার দায়দায়িত্ব ও প্রতিকারপন্থা নির্ধারণ। চ) দুর্র্বৃত্তদের উপযুক্ত শাস্তি এবং নির্যাতিতদের নিরাপত্তা বিধান। ছ) ব্যর্থ মুখ্যমন্ত্রীর অপসারণ ইত্যাদি।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply