আসুন সুন্দরকে পৌঁছে দিই -শাহীদুল হাসান তারেক

আসুন সুন্দরকে পৌঁছে দিই, না হয় অসুন্দর মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পৃথিবীতে যত অকল্যাণ সব কিছুর মূলে ভালো মানুষদের নীরবতা দায়ী

১.
নাভিদ নেওয়াজ। বুয়েটে মেকানিকাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ছে এখন। বাবা মেডিসিন ইন্ডাস্ট্রিতে জব করেন। মা গৃহিণী। ছোটবেলা থেকেই অসাধারণ মেধাবী ও বিনয়ী। নাভিদের খুব বাগান করার শখ। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর ফ্রি সময়ে অনেকগুলো ফুল ও ঔষধি গাছ লাগিয়েছিল। কিন্তু কোচিংয়ের জন্য যখন ঢাকা চলে যাবে তখন গাছের কী হবে? চট করে বুদ্ধি এলো আপুকে দায়িত্ব দিয়ে যাওয়া যায়। কিন্তু আপুর এসবে ভালো লাগে না। সে সারাক্ষণ মোবাইল নিয়ে বন্ধুদের সাথে চ্যাট করে। এখন কিভাবে কনভিন্স করা যায়!
হঠাৎ মনে পড়লো কুরআন শিখানোর সময় হুজুর একটি হাদীস বলেছিলেন, আপুকে চিঠি দিয়ে হাদীসটি পাঠিয়ে দিবো আর চিঠিতে তার প্রিয় একটি চকোলেট ঢুকিয়ে রাখবো, যে চিন্তা সেই কাজ। খাতা কলম নিয়ে লেখতে বসলো-

আপু তোর মনে আছে, হুজুর যখন আমাদের বাসায় কোর’আন পড়াতে আসতেন, তখন আমাদের বিভিন্ন হাদীস শুনিয়ে যেতেন। আমার গাছ পছন্দ তুই জানিস। তাই একটি হাদীস আমি নোট করে রেখেছিলাম “যদি কোনো মুসলমান একটি বৃক্ষ রোপণ করে অথবা কোনো শস্য উৎপাদন করে এবং তা থেকে কোনো মানুষ কিংবা পাখি অথবা পশু ভক্ষণ করে, তবে তা উৎপাদনকারীর জন্য সদকা (দান) স্বরূপ গণ্য হবে।“ (সহীহ বুখারী)
আমি তো আগামীকালই চলে যাচ্ছি, তুই আমার গাছগুলি দেখে রাখিস, কেমন?
ইতি
নাভিদ

২.
রাইফ প্রতিদিন রাতে মুভি দেখে, সেই মুভিটার লিংকও ফেসবুক ওয়ালে শেয়ার করে। হল লাইফে ফজরের পর ফেসবুক স্ক্রল করতে একদিনও এমন হয়নি, রাইফের ফেসবুক ওয়াল থেকে মুভির দাওয়াত আসেনি। সে কেমন মুভি দেখত আমার কখনো জানার সুযোগ হয়নি।
মুভি দেখা বা না দেখা আলোচ্য বিষয় নয়। আমরা সেদিকে যাবোও না। আমরা কথা বলব টাইমলাইনে শেয়ার করা নিয়ে, রাইফের মুভি দেখার সংবাদ ফেসবুকে প্রচার করার ফলে সে কয়েকটা জায়গায় আটকে যাচ্ছে। সেই পয়েন্টগুলো খেয়াল করুন-

প্রথম ধাপ : “নিশ্চয় যারা এটা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতা ছড়িয়ে পড়ুক, তাদের জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।” (সূরা নুর : ১৯)

দ্বিতীয় ধাপ : “যে লোক বিভ্রান্তির দিকে ডাকে তার উপর সে রাস্তার অনুসারীদের পাপের অনুরূপ পাপ বর্তাবে। এতে তাদের পাপরাশি সামান্য হালকা হবে না।” (সহীহ মুসলিম)

তৃতীয় ধাপ : মানুষের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামাহ সময়। হায়াতের চেয়ে কম অনিশ্চয়তার কোনো কিছু মানুষকে দেয়া হয়নি। রাইফ কিন্তু সেই হায়াতকে নিঃশেষ করে দিচ্ছে, যার ফলে চিরস্থায়ী ক্ষতিকেই ক্রয় করে নিচ্ছে। ‘সময়ের কসম নিশ্চয়ই সকল মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, শুধু তারা নয় যারা ঈমান এনেছেন, সৎকাজ করেছেন, একে অপরকে সত্য ও সবরের উপদেশ দিয়েছেন/দিয়ে থাকেন/দিচ্ছেন।’ (সূরা আসর)

৩.
মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সা. জীবনের সর্বশেষ নাসিহাহগুলোর একটি ছিল “উপস্থিতরা অনুপস্থিতদের কাছে আমার বাণী পৌঁছে দিবেন।”
সূরা আসরে যে সৎকাজের কথা বলা হয়েছে সূরা ফুসসিলাতে নজর দিলে তার ব্যাখ্যা পাই, “তার কথার চেয়ে আর কার কথা সর্বোত্তম যে মানুষকে আল্লাহ তায়ালার পথে ডাকে আর নিজে ভালো কাজ করে।।” (৪১:৩৩) সূরা আসরের বাকি অংশেও সত্যের উপদেশের নির্দেশনা এসেছে। দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ নাসিহাহ বা কল্যাণ কামনা করা হিসেবে সহিহ মুসলিমে হাদীস গ্রহণ করা হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি সালাম বলেছেন: “যে লোক সঠিক পথের দিকে ডাকে তার জন্য সে পথের অনুসারীদের প্রতিদানের সমান প্রতিদান রয়েছে। এতে তাদের প্রতিদান হতে সামান্য ঘাটতি হবে না।” (সহিহ মুসলিম)
রাসূলুল্লাহ সা. থেকে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বর্ণনা করেছেন- “একটি আয়াত হলেও তা আমার পক্ষ থেকে প্রচার করো।” তবে হাদীসের শেষাংশে সতর্কও করা হয়েছে, মিথ্যা প্রচারকারী বা জাল হাদীস বর্ণনাকারীদের জন্য জাহান্নাম। (সহীহ বুখারী, জামে আত তিরমিজী)

৪.
যেদিন শিঙায় ফুঁ দেয়া হবে। আপন আত্মীয়স্বজন দূরে চলে যাবে। মুখ বন্ধ করে দেয়া হবে। হাত, পা আমাদের গুনাহের সাক্ষ্য দিবে। মাটি তার ভেতরের সকল কিছু বের করে দিবে। আসমান ফেটে যাবে। সমুদ্র উত্তাল হবে। অর্ধহাত উপরে সুর্য থাকবে। মগজ গলে পায়ে গড়িয়ে পড়বে। ঘামে মানুষ সাঁতার কাটতে থাকবে। চিৎকার দিয়ে বিচারের ফয়সালা চাইবে। সেদিন- “খুব ছোট ভাল আমল মানুষ দেখতে পারবে, আবার খুব ছোট, সরিষার দানা পরিমাণ খারাপ কাজও দেখতে পারবে।” (সূরা যিলযাল : ৭-৮)
জ্ঞানী লোকমান তাঁর ছেলেকে উপদেশ দিয়ে বললেন: “হে আমার প্রিয় বৎস, নিশ্চয়ই তা (পাপ-পুণ্য) যদি সরিষা দানার পরিমাণ হয়, অতঃপর তা থাকে পাথরের মধ্যে কিংবা আসমানসমূহে বা যমিনের মধ্যে, আল্লাহ তাও নিয়ে আসবেন; নিশ্চয় আল্লাহ সূক্ষ্মদর্শী, সর্বজ্ঞ।” (সূরা লোকমান : ১৬)।
কিয়ামত পর্যন্ত যে আমল জারি থাকবে। হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার যাবতীয় আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে ৩টি আমল বন্ধ হয় না- ১. সদকায়ে জারিয়া (কাউকে ইসলামের জ্ঞান দেয়া, ইসলামী আমল শিখানো, প্রতিষ্ঠান বা মসজিদ বানানো, পাঠাগার বানানো ইত্যাদি) ২. এমন জ্ঞান (ইলম)- যার দ্বারা উপকৃত হওয়া যায় ও ৩. এমন নেক সন্তান- যে তার জন্য দোয়া করে। (সহিহ মুসলিম : ৪৩১০)

৫.
আমরা কল্যাণের অভিযাত্রী। মানুষের কল্যাণের জন্যই বিশ্বাসীদের উত্থান। এর কারণ ভালো কাজের আদেশ দেওয়া ও মন্দ কাজ থেকে নিষেধ করা। আর এই দাওয়াতই অবিচল আস্থার পরিচায়ক।
“তোমরা হলে সর্বোত্তম উম্মাহ। তোমাদের আবির্ভাব/উত্থান ঘটানো হয়েছে মানবজাতির (কল্যাণের) উদ্দেশ্যে। তোমরা ভালো কাজের আদেশ করবে ও মন্দ কাজ থেকে বারণ করবে এবং আল্লাহর প্রতি অবিচল আস্থা রাখবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)
দাওয়াতের এই অভিযাত্রায় প্রজন্মান্তর আমাদের অবস্থান শেষ জমানার মুসলিম। এই জমানার ব্যাপারে রাসূলে আকরাম সা.-এর বক্তব্য হচ্ছে- “মানুষ সকালে ঈমানদার হবে সন্ধ্যায় ঈমানহারা হয়ে যাবে।” আরেক হাদীসে এসেছে “এই জামানায় ঈমান ধরে রাখা হাতে অঙ্গার রাখার মতো হয়ে যাবে।” এমতাবস্থায় দাওয়াত ও তাবলিগ, তাযকিয়াহ এবং তারবিয়াহ মানুষের জন্য খুবই জরুরি। মানুষকে তার উপকারী জিকর স্মরণ করিয়ে দেয়া। সে যেনো ভুলে না যায় সে আল্লাহর গোলাম। এটাই দাঈদের কর্তব্য, দাওয়াতের হক্ব। উল্লিখিত আলোচনায় দাওয়াতের ক্ষেত্র ও প্রয়োগ বুঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে, এই প্রয়োগ গল্পাকারে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। স্কুুল, কলেজ, মাদ্রাসা সকল পর্যায়ে প্রকাশ্যে ও গোপন অপরাধ এবং অপরাধীর সংখ্যা বাড়ছে।
বিশ্বাসীদের দাওয়াতের একাংশ হবে এমন মুসলমানদের কল্যাণের আহবান করা যারা ঈমানদার হিসেবে পরিচিত কিন্তু নিজেকে অপরাধ প্রবণতা থেকে দূরে রাখতে পারছেন না। এই অংশকে দাওয়াতের উদ্দেশ্যই হবে প্রশিক্ষণ ও পরিশুদ্ধির অন্তর্ভুক্ত করা, ইসলামী আদর্শের শক্তি ও উপাদান হিসেবে তাদের চিন্তা ও বিবেককে কাজে লাগানো। অনেকের মনের মধ্যে এমন প্রশ্নের উদ্রেক হয় যে, মুসলমানদের মধ্যে দাওয়াত কিসের? কেন দিতে হবে? তারাতো আল্লাহকে বিশ্বাস করেনই- তাহলে আর দাওয়াত কেন? কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার হাকীকত দেখুন- তিনি ঘোষণা করলেন- ‘হে ঈমানদারগণ! ঈমান আনো আল্লাহর প্রতি, তাঁর রসূলের প্রতি, আল্লাহ তাঁর রাসূলের ওপর যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি এবং পূর্বে তিনি যে কিতাব নাযিল করেছেন তার প্রতি। যে ব্যক্তি আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাবর্গ, তাঁর কিতাবসমূহ, তাঁর রাসূলগণ ও পরকালের প্রতি কুফরি করলো, সে পথভ্রষ্ট হয়ে বহুদূর চলে গেলো।’ (সূরা নিসা : ১৩৬)
কাদেরকে ‘ঈমান আনো’ বলা হচ্ছে? যারা পূর্বেই ঈমান এনেছে তাদেরকে। আচ্ছা, তাদেরকে আবার বলা, ‘তোমরা ঈমান আনো’ -কথাটা আপাত দৃষ্টিতে অদ্ভুত মনে হয়। তাই না?
মাওলানা সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী তাফহীমুল কুরআনের ব্যাখ্যায় বলেছেন এখানে ‘ঈমান’ শব্দটি দু’টি আলাদা আলাদা অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। ঈমান আনার একটি অর্থ হচ্ছে অস্বীকৃতির পরিবর্তে স্বীকৃতির পথ অবলম্বন করা। অস্বীকারকারীদের থেকে আলাদা হয়ে স্বীকৃতিদানকারীদের দলে শামিল হয়ে যাওয়া। এর দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে- কোনো জিনিসকে সাচ্ছা দিলে, সরল অন্তঃকরণে এবং পূর্ণ দায়িত্ব সচেতনতা সহকারে মেনে নেয়া। নিজের চিন্তা, রুচি, পছন্দ, দৃষ্টিভঙ্গি, মনোভাব, চাল-চলন এবং নিজের বন্ধুত্ব, শত্রুতা ও প্রচেষ্টা-সংগ্রামের সকল ক্ষেত্রকে সে যে আকিদার ওপর ঈমান এনেছে পুরোপুরি সেই অনুযায়ী ঢেলে সাজানো। প্রথম অর্থের দিক দিয়ে যেসব মুসলমান স্বীকারকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয় এ আয়াতে তাদেরকেই সম্বোধন করা হয়েছে। তাদের কাছে দাবি করা হয়েছে। দ্বিতীয় অর্থটির প্রেক্ষিতে তোমরা মুমিনে পরিণত হও।
আমাদের সমাজব্যবস্থার কথা ভাবুন, একটুখানি চোখ খুলে দেখুন এখানে সাচ্ছা মুমিনের কত অভাব। এই সাচ্ছা মুমিন, নেফাক ছেড়ে দেওয়া মুমিন হিসেবে নিজেকে তৈরি ও অন্যদের প্রস্তুতির জন্য দাওয়াত প্রয়োজন। এই দাওয়াত একান্ত ব্যক্তিগত পর্যায় থেকে দেয়া আবশ্যক। অন্যতম কর্তব্য। আর এই কর্তব্য পালন ইনস্টিটিউশনাল প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করাই হলো ইসলামের অন্যতম কনসেপ্ট। সূরা আস শুরা ১৩-১৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ দাওয়াত ও তাবলিগের ইনস্টিটিউশনাল ভিতকেই যেনো মজবুত করে দিয়েছেন। মুহাম্মদ সা.কে বলা হচ্ছে এই শরীয়ত শুধু তোমার জন্যই না এই আদেশ ও দ্বীন তোমার পূর্বের নূহ, ইব্রাহিম, মূসা ও ঈসা (আ)কেও দিয়েছি। তোমরা এ জীবনবিধান (সমাজে) প্রতিষ্ঠিত করো। কখনো অনৈক্য সৃষ্টি করো না। এর পরবর্তী আয়াতে দলাদলি ও অনৈক্যের কারণ বলা হচ্ছে- নিজেদের পারস্পরিক বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ থেকেই সকল মতবিরোধ। এই মতবিরোধের উর্ধ্বে ওঠে রাসূলের কাজ কী? পরবর্তী আয়াতে সেই নির্দেশনা- (যে দ্বীনের পথে নূহ, ইব্রাহিম, মূসা, ঈসা আহবান করেছেন) যেহেতু এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে, তাই হে মুহাম্মাদ এখন তুমি সেই দ্বীনের দিকেই আহবান জানাও এবং যেভাবে তুমি আদিষ্ট হয়েছো সেভাবে দৃঢ়তার সাথে তা আঁকড়ে ধরো এবং এসব লোকের ইচ্ছা আকাক্সক্ষার অনুসরণ করো না। এদের বলে দাও, “আল্লাহ যে কিতাব নাযিল করেছেন আমি তার ওপর ঈমান এনেছি। আমাকে আদেশ দেয়া হয়েছে যেন তোমাদের মধ্যে ইনসাফ করি। আল্লাহই আমাদেরও রব এবং তোমাদেরও রব তিনিই। আমাদের কাজকর্ম আমাদের জন্য আর তোমাদের কাজকর্ম তোমাদের জন্য। আমাদের ও তোমাদের মাঝে কোনো বিবাদ নেই। একদিন আল্লাহ আমাদের সবাইকে একত্রিত করবেন। তাঁর কাছেই সবাইকে যেতে হবে।”
অর্থাৎ আমাদেরকে জ্ঞান, বিশ্বাস ও পরিশুদ্ধির জায়গাকে শক্তিশালী করার জন্য আহবান বন্ধ করা যাবে না। আর সেই আহবান রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষেরও অন্যতম কাজ। (সূরা হজ্ব : ৪১) রাষ্ট্র প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে দাঈ নিয়োগ করে মানুষের অন্তরের কালিমা দূর করবে। প্রশান্তি ছড়িয়ে দিবে। সমাজ থেকে নেফাকি ও কুটিলতা দূর হবে।
আমরা মানুষকে সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় যে দাওয়াত প্রদান করে থাকি এই দাওয়াত কোনো দল বা মতাদর্শের দাওয়াত নয়। এই আহবান সুন্নাতে আম্বিয়া আলাইহিসসালাম। আমাদের নাম বা পরিচয় শুধুমাত্র পরিচয়ের ভিন্নতার কারণে তত্ত্ব বা মতাদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। দারুল আরকাম (ইসলামের গৃহ) ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রথম শিক্ষায়তন বা বিশ্ববিদ্যালয়। আমরা যখন দাওয়াতের সাংগঠনিক প্রক্রিয়া নিয়ে কাজ শুরু করি তখন এই উপমহাদেশের আলেমগণ ও মুসলিম মানুষের মধ্যে ইসলামী চেতনার জাগরণ ছিল অনুপস্থিত, দিকে দিকে অশান্তি, অরাজকতা, শ্রেণীবৈষম্য ছিল চোখে পড়ার মতো। কোনো প্রক্রিয়া এমন ছিল না, যে প্রক্রিয়ায় সকল ধরনের (মাদ্রাসা, স্কুল; কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়) শিক্ষার্থী এবং ভিন্ন পেশার মানুষ এসে ইসলাম শিখতে পারবে। এমতাবস্থায় এমন একটি দারুল আরকামের প্রয়োজন আবশ্যক হয়ে গিয়েছিল “যারা মানুষকে (আল্লাহর) আয়াতসমূহ পড়ে শোনাবে, তাদের জীবনকে পবিত্র করবে; তাদেরকে হিকমাহ শিক্ষা দেবে।” (সূরা জুমআ : ২)
কেন এই প্রশিক্ষণ? কারণ, এই প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে আরেকটা কাজও তাদের জন্য আবশ্যক – আর তা হলো দুনিয়ার প্রচলিত (সব কয়টি) জীবনব্যবস্থার ওপর ইসলামকে বিজয়ী করা। (সূরা আস সফ : ৯)।
সুতরাং আমাদের দাওয়াতের প্রথম ধাপ হচ্ছে ‘মুসলিমদের থেকে নেফাকি ও কর্মীয় বৈষাদৃশ্য (ইসলামী দাওয়াত ও কর্মনীতি, সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী) দূর করার আহবান পৌঁছানো ও উত্তম প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে ইসলাম বিজয়ের শক্তি হিসেবে প্রস্তুত করা।
অন্য দিক থেকে দাওয়াতের উদ্দিষ্ট ব্যক্তির মধ্যে থাকবেন প্রতিবেশী, বন্ধু, কাছের ও দূরের অমুসলিম মানুষ। এই অমুসলিমগণকে দাওয়াতের লক্ষ্যই হবে ইসলামের সুমহান আদর্শ তুলে ধরা। তাদেরকে মানুষ হিসেবে আল্লাহর ইবাদাতের প্রতি আহবান করা? এই দাওয়াতের বিস্তৃত ঘোষণা-
বল : হে আহলি কিতাব! এসো এমন একটি কথার দিকে, যা আমাদের ও তোমাদের মধ্যে একই ধরনের। তা হচ্ছে আমরা আল্লাহ ছাড়া কারো বন্দেগি ও দাসত্ব করবো না। তাঁর সাথে কাউকে শরিক করবো না। আর আমাদের কেউ আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেও নিজের রব হিসেবে গ্রহণ করবে না। যদি তারা এ দাওয়াত গ্রহণ করতে প্রস্তুত না হয়, তাহলে পরিষ্কার বলে দাও “তোমরা সাক্ষী থাকো, আমরা অবশ্যই মুসলিম (একমাত্র আল্লাহর বন্দেগি ও আনুগত্যকারী)।” (সূরা আলে ইমরান : ৬৪)

উল্লিখিত নির্দেশনা থেকে অমুসলিমদের কাছে আহ্বান পৌঁছানোর হিকমা গ্রহণ করা যেতে পারে। তাহলে ঈমানের দাবি হিসেবে আমাদের যতটুকু ছাড় দিলে আল্লাহর হুদুদ (সীমা) লঙ্ঘন হবে না, ততটুকু ছাড় দিয়ে দাওয়াত প্রদানের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া। দাওয়াত ও তাবলিগের ক্ষেত্রে কখনোই প্রান্তিকতার নীতি অবলম্বন করা যাবে না, তাড়াহুড়ো, ত্বরিত ফল লাভের প্রচেষ্টা, আদর্শ দাঈর বৈশিষ্ট্য নয়। আবার কেউ দাওয়াত গ্রহণ না করলে পাল্টা আঘাত করলে তাকেও সমুচিত জবাব দেয়া, অযাচিত মন্তব্য ও কঠোরতা, ক্ষমতার প্রয়োগ, জোরজবরদস্তি, আক্রমণাত্মক তৎপরতা পরিচালনা করে শত্রু খতম করার নীতিও দাওয়াতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকর দিক। এর ফলাফল সুদূরপ্রসারী। দাওয়াতের সর্বোত্তম নীতিই হলো চরম শত্রুতার মোকাবেলায় সবর ও ইস্তিকামাত। দুশমনকে বন্ধু মনে করা, ভুলত্রুটি ক্ষমা করা, চিত্তাকর্ষণের জন্য জাকাত প্রদান। জঘন্য দুশমন ও ক্ষতিকারক হলেও ‘কাওলাল লাইয়িনা’ নরম সুরে আল্লাহর দাসত্বের আহ্বান পৌঁছানো। সর্বাবস্থায় প্রজ্ঞা এবং বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দেয়া, দাঈকে মনস্তাত্ত্বিক সমস্যার চিকিৎসক হওয়া অত্যন্ত জরুরি, যাকে দাওয়াত দেয়া হচ্ছে তার ব্যাপারে পূর্ব থেকেই প্রাথমিক ধারণা রাখা, তার কষ্ট ও আনন্দের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং কষ্টের সময় সহানুভূতি জানানো, আনন্দের সময় উৎসাহ প্রদান। দাওয়াতের চরিত্র এভাবেই আদর্শ দাঈর আচরণে প্রতিফলিত হয় এবং এভাবেই দুনিয়াব্যাপী অমুসলিমদের মাঝে দাওয়াত ছড়িয়ে যাবে। একটি আলোকিত ও সমৃদ্ধ পৃথিবী প্রতিষ্ঠিত হবে।

আসুন সুন্দরকে পৌঁছে দিই, না হয় অসুন্দর মাথাচাড়া দিয়ে উঠবে। পৃথিবীতে যত অকল্যাণ সব কিছুর মূলে ভালো মানুষদের নীরবতা দায়ী। আমরা নীরব না থেকে পরবর্তী প্রজন্মকে তৈরি করি, উত্তর প্রজন্মের জন্য একটি সুন্দর বসুন্ধরা রেখে যাই। অন্ধকার পৃথিবীর দুয়ারে আঘাত করে সত্য ও সুন্দরের আহবান পৌঁছে দিই। আমরা জাগলেই পৃথিবী জেগে উঠবে ইন-শা-আল্লাহ।
আমরা উঠবো বলে ফুটে ফুলসব
পাতায় লুকানো পাখি করে কলরব
মিনারে আযান হাঁকে সুর উৎসব
ইক্বামতে সালাম বলে আকাশের রব।
লেখক : সহকারী সম্পাদক, ছাত্রসংবাদ

SHARE

Leave a Reply