আয়নায় দাঁড়ালে কি রক্তের দাগ দেখেন?

রেজোয়ান সিদ্দিকী

বাংলাদেশে লাশের রাজনীতি নতুন কোন ঘটনা নয়। রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, ৩৮ বছর পর এখন তা বিপন্ন প্রায়। কেউ কল্পনাও করেনি যে, এত রক্তদান, এত আত্মত্যাগ এর সব কিছু নিয়ে কেউ কোনদিন তামাশা করতে পারে। এখন সেই তামাশাই আমাদের দেখতে হচ্ছে। আমরা তো ভেবেছিলাম লক্ষ শহীদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা আমরা অর্জন করেছি, সেই স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক জীবনব্যবস্থা দেবে। হানাহানির অবসান ঘটাবে। রক্তপাত বন্ধ করবে। পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে গিয়ে আমরা এক আধুনিক কর্মমুখর প্রতিযোগিতামূলক সমৃদ্ধিশালী বাংলাদেশ গড়ে তুলব। কিন্তু ইতিহাসের চাকা যেন এক নির্দিষ্ট স্থানে আবর্তিত হচ্ছে। আমরা হিংসা বিদ্বেষ বিভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ বীরের জাতি হিসেবে নিজেদের পুনরুত্থাপিত করতে পারিনি। একই বৃত্তের ভেতরে অবিরাম ঘুরপাক খাচ্ছি। রক্ত ঝরানো তার এক কলঙ্কজনক করুণ অধ্যায়।

আমরা যাদের শত্র“ বলে চিহ্নিত করেছি তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করার চেয়ে দৈহিকভাবে শেষ করে দেয়ার কোশেষ করেছি। সেই প্রক্রিয়ায় ১৯৭৫ সালের ২রা জানুয়ারি বিপ্লবী রাজনীতিক সিরাজ সিকদারকে হত্যা করে আমরা সদম্ভে আস্ফালন করেছি, কোথায় সেই সিরাজ সিকদার! সেসব আস্ফালন ফলদায়ী হয়নি। বরং ইতিহাসের অমোঘ নিয়মে রক্তের রাজনীতি রক্ত আরও বাড়িয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা মরহুম মতিউর রহমান রেন্টু তার ‘আমার ফাঁসি চাই’ গ্রন্থে রক্তের পিপাসা নিয়ে অনেক কথা লিখেছেন। কেউ বিশ্বাস করেছি। কেউ করিনি। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রক্তের ঋণ শোধ করতে হয়।

২০০৬ সালের ২৮ শে অক্টোবর এমনি এক রক্তের হোলিখেলা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি। রক্তের আকাক্সক্ষায়, খুনের নেশায় কোন মানুষ এতটা ভয়াবহ উন্মত্ততায় নিজের পশুপ্রবৃত্তির কাছে আত্মসমর্পণ করতে পারে এটি ছিল আমাদের কল্পনারও বাইরে। আওয়ামী লীগ তখন ক্ষমতার মোহে ভয়াবহ এক মদমত্ততায় লিপ্ত। ক্ষমতায় তুলনামূলকভাবে শক্তিহীন ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের তত্ত্বাবধায়ক সরকার মেরুদণ্ডহীন নখ-দন্তহীন, সিদ্ধান্তহীন কাপুরুষ। আওয়ামী লীগ এই সরকারের কাছে অবিরাম নানা অযৌক্তিক এবং অসঙ্গত দাবি তুলেই যাচ্ছিল। তারা এমন এক পরিবেশ সৃষ্টি করছিল যাতে দেশে এক ভয়াবহ অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। প্রফেসর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ সেসব অন্যায় অন্যায্য দাবির কাছে অবিরাম আত্মসমর্পণ করেই যাচ্ছিলেন। তাই দাবির মাত্রাও বাড়ছিল। আজ এ দাবি পূরণ হয়তো কালকে এক নতুন দাবি। সে দাবি পূরণ হলে আবারও এক নতুন দাবি। এভাবেই চলছিল সবকিছু। শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের আঙুল নাচিয়ে নাচিয়ে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান প্রেসিডেন্ট যদি তাদের দাবি মেনে না নেন তাহলে তারা বঙ্গভবনের গ্যাস-পানি-বিদ্যুৎ বন্ধ করে দেবেন।

শেষ পর্যন্ত খোদার ওপর খোদগারি করে বলেছিলেন, ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ যদি তাদের দাবিগুলো মেনে না নেয় তাহলে তারা বঙ্গভবনে অক্সিজেনের সরবরাহ বন্ধ করে দেবেন। এইসব ইতর বক্তব্যের জন্য আল্লাহ-তায়ালা সম্ভবত ওবায়দুল কাদেরকে কিছুটা শিক্ষা দিয়ে দিয়েছেন।

কিন্তু তার আগেই ঘটে গেছে ভয়াবহ ঘটনা। বিএনপি’র নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার যেদিন সংবিধান অনুযায়ী ক্ষমতা ছেড়ে দেয়, সেদিনই সারা দেশে রক্তের হোলিখেলার ডাক দিয়েছিলেন মহাজোট নেত্রী শেখ হাসিনা। চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতা ছেড়ে দেয়ার আগে থেকেই তারা সারা দেশে অবরোধ সৃষ্টি করে রেলপথ, রাজপথ, বন্দর সবকিছু প্রায় অচল করে দিয়েছিল। শেখ হাসিনা ডাক দিয়েছিলেন, লগি-বৈঠা নিয়ে যেন ২৮ শে অক্টোবর আওয়ামী লীগের কর্মীরা রাজধানীতে সমবেত হয়।

ড. ইয়াজউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে একহাত নিয়ে নেয়ার জন্য এ আহবান। জোট সরকার তো নেই। এবার তত্ত¡াবধায়ক সরকারকে শেখ হাসিনার হুকুম বরদার হিসেবে শেখ হাসিনার কথামত সকল সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।

চ্যালেঞ্জ যেভাবে এসেছিল সেটা মোকাবেলা করা জরুরি ছিল। ছাত্রদল অবস্থান নিয়েছিল মুক্তাঙ্গনে। জামায়াতের অবস্থান ছিল পল্টন এলাকায়। আওয়ামী লীগ গুলিস্থান এলাকায় তাদের লগি-বৈঠার সমাবেশ ডেকেছিল। সংঘাত এড়াতেই হোক আর কুচক্রীদের ষড়যন্ত্রই হোক মধ্যরাতে মুক্তাঙ্গন থেকে সরিয়ে নেয়া হয় ছাত্রদলকে। শূন্য ময়দান। আওয়ামী লীগের নৃশংস ঘাতক বাহিনী লগি বৈঠা নিয়ে প্রস্তুত। পল্টন এলাকায় কোন উত্তেজনা ছিল না। সমাবেশ চলছিল, বক্তৃতা চলছিল। গুলিস্থান থেকে পল্টন খুব দূরের পথ নয়। আকস্মিকভাবেই আওয়ামী লীগের লগি-বৈঠাধারী খুনি দস্যু দলের মত রা-রা-হা-হা করতে করতে ছুটে এল পল্টন এলাকায়। সেখানে চলছিল সাধারণ মানুষের হাঁটা-চলা। মাইকে বক্তব্য শোনা, বাদাম, ক্ষীরা, শসা বিক্রেতার চিরাচরিত আহবান।

কিন্তু আওয়ামী ঘাতকরা রক্তের লোলুপ নেশায় চড়াও হল পল্টনের মোড়ে কিছু নিরীহ মানুষের ওপর। তারা প্রকাশ্য দিবালোকে শত শত পথচারী, সাংবাদিক, টিভি ক্যামেরার সামনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে হত্যা করতে শুরু করল কল্পিত প্রতিপক্ষকে। সেই ভয়াবহ দৃশ্য টিভি চ্যানেলগুলোতে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়েছে। সারা বিশ্বের আনাচে কানাচে গোটা মানবজাতিই আতঙ্কে শিহরিত হয়ে উঠেছে। এ কেমন বর্বরতা! এ কেমন নিষ্ঠুরতা! এই যুগেও আদিম উল্লাসে মানুষ এভাবে মানুষকে হত্যা করতে পারে। তারা লগি বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে একজন তরুণকে রাজপথে শুইয়ে ফেলল। সে আবার উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই আবারও লগি বৈঠাধারীরা তার মাথায় শরীরে সারা অঙ্গে নির্মমভাবে আঘাত করতে শুরু করল। আবারও সে লুটিয়ে পড়ল মাটিতে। রক্তে ভেসে গেল রাজপথ। নিরপরাধ মানুষের এই অকল্পনীয়, অবর্ণনীয় মর্মান্তিক হাত্যাকাণ্ডের দৃশ্যে গোটা পৃথিবী আতঙ্কের সঙ্গে প্রত্যক্ষ করল। টেলিভিশনের রিপোর্টাররা এই ভয়াবহতার বিবরণ দিতে গিয়ে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন। এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে কোন মানবসন্তান? এখানেই তারা থামেনি। মৃত্যু পথযাত্রী ঐ তরুণ যখন হাত-পা ছড়িয়ে আকুতি করছিল তখন তার মৃত্যু নিশ্চিত করার জন্য লগি বৈঠাধারীরা তার প্রায় মৃত দেহের ওপর উঠে উল্লাসে নৃত্য করছিল এবং তার শরীরের ওপর দাঁড়িয়ে অবিরাম নৃত্য করছিল।

 

এই বর্বরতা, এই পৈশাচিকতা, এই নিষ্ঠুরতা গোটা বাংলাদেশকেই বিশ্বের দরবারে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল। আমরা একটি সভ্যজাতি। আমাদের ইতিহাস আড়াই হাজার বছরের সভ্যতার ইতিহাস। আমাদের পূর্ব পুরুষরা আড়াই হাজার বছর আগে সভ্যতার সিঁড়ি নির্মাণ করেছিলেন। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ২১ শ’ বছর আগে আমাদের লিপি নির্মাণ করেছিলেন। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ১৫শ’ বছর আগে কাব্য রচনা করেছিলেন। আমাদের পূর্ব পুরুষরা সারা বিশ্বে বাণিজ্যের জন্য জাহাজ ভাসিয়েছিলেন। আমাদের পূর্ব পুরুষরা মসলিনের মত সূ² তন্তুতে সূ² বস্ত্র বয়ন করেছিলেন, যা সারা পৃথিবীতে আমাদের সুনাম সৃষ্টি করেছিল।

এই সভ্যতা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ধ্বংস করে আওয়ামী লীগের মদদে বাংলাদেশের যে ইতিহাস রচিত হল সে ইতিহাস কলঙ্কের ইতিহাস। সে ইতিহাস আমাদের আড়াই হাজার বছরে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করে বসল। এত বছরের সভ্যজাতি আওয়ামী লীগের লগি বৈঠার কারণে এক বর্বর জাতিতে পরিণত হল। পৃথিবীর মানুষ আমাদের অডিও সভ্যতার খবর রাখে না কিন্তু তার এই খবর রাখে যে, বাংলাদেশ পৃথিবীর নিকৃষ্টতম বর্বরজাতি।

এই গ্লানি রাখবার জায়গা নেই। শেখ হাসিনা এই পৈশাচিক বর্বরতাকে যৌক্তিক ভিত্তিতে দাঁড় করানোর জন্য সাফাই গেয়েছেন যে, আত্মরক্ষার জন্য তারা লগি বৈঠার কর্মীরা এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু ক্লিপে তন্যতন্য করে খুঁজেও এদের কাউকে আক্রমণকারী হিসেবে প্রমাণ করা যায়নি।

আজ ২৮ শে অক্টোবর আমরা বেদনাবিধুর চিত্তে স্মরণ করছি সেদিনের সাত শহীদকে, যারা জীবন দিয়ে আমাদের আত্ম উজ্জীবনের পথ প্রশস্ত করে গেছেন। আমাদের সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধে রুখে দাঁড়াতে শিখিয়ে গেছেন। আমি তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি। সেই সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডকে যারা যৌক্তিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেন তাদের উদ্দেশে বলতে চাই রক্তের ঋণ বড় নিষ্ঠুর দায়!

SHARE

Leave a Reply