ইতিহাসের ‘কাতিন গণহত্যা’ -গোলাপ মুনীর

আজ থেকে ৮১ বছর আগে ১৯৪০ সালের ৫ মার্চে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ পলিটব্যুরোর নেয়া সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ডের ২২ হাজার নাগরিকের ওপর এক ভয়াবহ গণহত্যা চালানো হয়। এই গণহত্যা প্রধানত চলে তিনটি স্থানে : কাতিন জঙ্গল, কালিনিন ও কার্কিভে গুপ্তপুলিশ বাহিনী এনকেভিডির বন্দিশালায়। এদের মধ্যে ছিল পোলিশ নাগরিক, ডাক্তার, অধ্যাপক, আইনজ্ঞ, সেনা ও পুলিশ কর্মকর্তা, জমি ও কলকারখানার মালিক এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী। এই গণহত্যা চলে সে বছরের এপ্রিল ও মে মাসজুড়ে। এই গণহত্যার পর সোভিয়েত সরকারি বাহিনী লাশগুলোকে কাতিন গ্রামের কাছের এক জঙ্গলের ভেতরের এক গোপন গণকবরে পুঁতে রাখে। এই গণহত্যা ইতিহাসে স্থান পেয়েছে সোভিয়েত কমিউনিস্টদের সৃষ্ট এক কালো অধ্যায় হিসেবে। আজকের দিনে ইতিহাসে তা অভিহিত হচ্ছে প্রধানত ‘কাতিন গণহত্যা’ নামে। এটি আরো অনেক নামেই পরিচিত: কাতিন ম্যাসাকার কিংবা কাতিন জঙ্গল ম্যাসাকার। তৎকালীন সোভিয়েত পলিটব্যুরোর অনুমোদনে, স্টালিনের সমর্থনে সোভিয়েত গোপন পুলিশ এনকেভিডি এই গণহত্যা চালায়। ১৯৩৯ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মি পোল্যান্ডে আগ্রাসন চালিয়ে পোল্যান্ডের পূর্বাঞ্চল দখলের প্রায় ৮ হাজার পোলিশ কর্মকর্তাকে জেলে পাঠায়। এসব বন্দীর মধ্যে সেনাসদস্য ছাড়াও ছিল শিক্ষক, ডাক্তার, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ, যারা শেষ পর্যন্ত এই গণহত্যার শিকার হয়। এই গণহত্যার লক্ষ্য ছিল পোলিশ জাতিকে ধ্বংস করে দেয়া, যাতে আর কোনো দিন জাতি হিসেবে পোলিশরা পুনর্গঠিত হতে না পারে। কমিউনিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগপাশ থেকে বের হতে না পারে।

এই গণহত্যার উদ্যোগটির সূচনা করেন এনকেভিডির প্রধান ল্যাভরেনতি বেরিয়া। তিনি স্টালিনের কাছে প্রস্তাব পাঠান : ১৯৩৯ সালের পোল্যান্ডে আগ্রাসন চালিয়ে বন্দী করা ৮ হাজার পোলিশকে মেরে ফেলতে হবে। ৫ মার্চে স্টালিন পলিটব্যুরোর সব সদস্যের কাছে নোট পাঠান। এই নোটে যুদ্ধবন্দীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ ছিল। পলিটব্যুরো তাতে সম্মতি দেয়। সাবেক সোভিয়েত কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক স্টালিন নির্দেশ দেন যুদ্ধবন্দীদের ওপর গণহত্যা চালানোর, যার শিকার হয়েছিল ২২০০ পোলিশ। এটি ছিল বেশ কয়েকটি যুদ্ধের যুদ্ধবন্দীদের যুগপৎ মৃত্যুদণ্ড কার্যক্রম।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট শাসকেরা এই গণহত্যার শিকার পোলিশদের কাতিন জঙ্গলে গোপনে গণকবর দেয়ার মধ্য দিয়ে এই অপকর্ম চিরদিনের জন্য গোপন রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তা আর গোপন থাকেনি। ১৯৪৩ সালের এপ্রিলে কাতিন জঙ্গল জার্মানদের দখলে চলে যায়। তখন জার্মানরা এই গণকবর আবিষ্কার করে। সে বছর ১৩ এপ্রিল বার্লিন রেডিও এই গণকবরের কথা ব্যাপকভাবে প্রচার করে। সে সময়ে জার্মানেরা এ ব্যাপারে একটি কমিশন গঠন করে। এই কমিশনে ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের ফরেনসিক এক্সপার্টরা ছিলেন। এই কমিশনে সংশ্লিষ্টরা সবাই কাতিন গণহত্যার জন্য সোভিয়েতকে দায়ী করে। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়ন তা অস্বীকার করে। সোভিয়েতরা বরং পাল্টা দাবি তোলে: ১৯৪১ সালে পোল্যান্ড জার্মানদের দখলে চলে যাওয়ার পর জার্মানরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। কিন্তু এটি ছিল কমিউনিস্ট শাসিত সোভিয়েত ইউনিয়নের বড় মাপের এক ঐতিহাসিক মিথ্যাচার। এই মিথ্যাচার এখন প্রতিষ্ঠিত অঁংপযরিঃু ষরব-এর আদলের কধঃুহ ষরব নামের সোভিয়েত সংস্করণ হিসেবে।

সে সময়টায় পোল্যান্ডের একটি প্রবাসী সরকার কাজ করছিল লন্ডনে। এই সরকার ১৯৪৩ সালে গণহত্যা প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যাখ্যা দাবি করে। তখনো স্টালিন পার্ল্টা দাবি তোলে: পোল্যান্ডের প্রবাসী সরকার নাৎসিদের সাথে হাত মিলিয়ে এই মিথ্যা দাবি তুলেছে। অপরদিকে স্টালিন মস্কোভিত্তিক পোল্যান্ডের আরেকটি প্রবাসী সরকারকে সমর্থন দিতে শুরু করে। সে সময়ে লন্ডনভিত্তিক প্রবাসী সরকারের পোলিশ প্রধানমন্ত্রী সিকোরস্কি আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের মাধ্যমে তদন্ত দাবি করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলার সময় জার্মান নাৎসি বাহিনী কাতিন গণকবর খুঁড়ে বের করার আগে পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন কমিউনিস্ট পার্টি কাতিন হত্যার দায়িত্ব জোরালোভাবে অস্বীকার করে আসছিল। কিন্তু প্রেসিডেন্ট গর্বাচেভ ১৯৯০-এ সর্বপ্রথম রাশিয়ার কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরিচালিত কাতিন গণহত্যার কথা স্বীকার করেন। আর পুতিন তা স্বীকার করেন ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে। কমিউনিস্টদের এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ওপর প্রলেপ লাগানোর লক্ষ্য নিয়ে রাশিয়া ২০১০ সালে পোল্যান্ডকে সাথে নিয়ে এই গণহত্যার সত্তরতম বার্ষিকী উদযাপনের উদ্যোগ নেয়। সে আয়োজনে অংশ নিতে রাশিয়ার পার্লামেন্টের বেশির ভাগ মুখ্য সদস্যসহ ৯৪ জন বিশিষ্ট রুশ গণ্যমান্য দিকপাল নিয়ে প্রেসিডেন্ট লেখ খটিনস্কি তার স্ত্রী মারিয়াসহ কাতিনের জঙ্গলের উদ্দেশে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু এরা নিজেরা সবাই মর্মান্তিক ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন। মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনায় এরা সবাই সেই কাতিনের জঙ্গলেই হারিয়ে যান।

সে যা-ই হোক, সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৯০-৯১) এবং রুশ ফেডারেশন (১৯৯১-২০০৪)-এর প্রসিকিউটর জেনারেলের অফিস পরিচালিত একটি তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যায়: সোভিয়েতরাই এই গণহত্যার জন্য দায়ী। এই তদন্তে ১৮০৩ জন পোলিশ নাগরিকের হত্যা নিশ্চিত করা হয়। তবে এ ঘটনাকে যুদ্ধাপরাধ বা গণহত্যা হিসেবে স্বীকার করা হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত অপরাধীদের অনেকেই ইতোমধ্যেই মারা গেছেন, এই অজুহাতে এই তদন্ত বন্ধ রাখা হয়। তা ছাড়া প্রচলিত মরণোত্তর পুনর্বাসনের জন্য রুশ সরকার এই হত্যাকাণ্ডকে স্টালিনবাদী দমনের শিকার শ্রেণিভুক্ত করতেও সম্মত হয়নি।
তবে মানবাধিকার সমাজ এক স্মারক বিবৃতিতে বলে: এ তদন্তে শুধু ১৮০৩ জন লোক হত্যার মধ্যেই এই হত্যাকাণ্ডের পরিসমাপ্তি ঘটেছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সাধারণ জ্ঞান হচ্ছে, ১৪,৫০০ জনের চেয়েও বেশি বন্দী হত্যা করা হয়েছে- এর ব্যাখ্যা প্রয়োজন। অপরদিকে রাশিয়ান পার্লামেন্ট এক ঘোষণায় অনুমোদন করে: সোভিয়েত কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে এই গণহত্যার জন্য দায়ী।

পেছনের কথা

নাৎসি জার্মানি পোল্যান্ড আক্রমণ করে ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বরে। এরই মধ্যে জার্মানরা পোল্যান্ড থেকে ফিরে যাবে এই দাবি তোলে ব্রিটেন ও ফ্রান্স, ‘পুলিশ-ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ হয় এবং ‘ফ্রাঙ্কো-পোলিশ সামরিক জোট’ জার্মানি আক্রমণ করে। তা অর্জনে ব্যর্থ হয়ে ৩ সেপ্টেম্বর ফ্রান্স, ব্রিটেন ও ব্রিটিশ কমনওয়েলথের বেশির ভাগ দেশ জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এসব দেশ পোল্যান্ডকে সীমিত সামরিক সহায়তা দেয়। এরা জার্মানির বিরুদ্ধে সীমিত পরিমাণে সামরিক ব্যবস্থাও নিয়েছিল, যা ‘ফনেও যুদ্ধ’ নামে পরিচিত।
সোভিয়েত ইউনিয়ন ‘মলতভ-রিবেনত্রপ’ চুক্তি অনুসারে ১৯৩৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর এর নিজস্ব আক্রমণের সূচনা করে। পোলিশ বাহিনী ছিল সোভিয়েত কমান্ডের অধীনে। তাই রেড আর্মিকে খুব সামান্য প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। তখন সোভিয়েত বাহিনীর হাতে ২৫,০০০ থেকে ৪,৫৪,৭০০ পোলিশ সৈন্য ও নাগরিক বন্দী হয়। কেউ কেউ মুক্তি পেয়েছিল, আবার কেউ কেউ পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। তবে সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশ এনকেভিডি পরিচালিত বন্দিশিবিরে আটক ছিল ১,২৫,০০০ পোলিশ। তাদের মধ্যে ৪২,৪০০ জন ছিল পোলিশ সৈন্য, যাদের বেশির ভাগই সাবেক পোলিশ অঞ্চলে বসবাসকারী ইউক্রেনীয় ও জাতিগত পোলিশ সেনা: এরা ছিল সোভিয়েত বাহিনীর অধীনে। অক্টোবরে তাদের মুক্ত করে দেয়া হয়। পশ্চিম পোল্যান্ডে জন্মগ্রহণকারী ৪৩ হজিার সৈন্য ছিল জার্মানির নিয়ন্ত্রণে। পরে জার্মানরা তাদের হস্তান্তর করেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন গ্রহণ করেছিল ১৩,৫৭৫ জন পোলিশ বন্দীকে।
তখন সোভিয়েত দমননীতির শিকার হয় সামরিক ও সরকারি কর্মী ছাড়াও বিভিন্ন শ্রেণিপেশার পোলিশ নাগরিক। হাজার হাজার পোলিশ বুদ্ধিজীবী ছাড়াও গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট, মিলিটারি-পুলিশ, কারখানা মালিক, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা ও পুরোহিতরা এই এই গণহত্যার শিকার হন।

গণহত্যার প্রস্তুতি

১৯৩৯ সালের অক্টোবর থেকে পরের বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে বন্দীদের জিজ্ঞাসাবাদ চলে। তখন এনকেভিডি অফিসাররা ছিলেন ব্যস্তসমস্ত। অনেকটা ক্ষুব্ধ। কিন্তু বন্দীরা ভেবেছিল এই জিজ্ঞাসাবাদের পর হয়তো তাদের মুক্ত করে দেয়া হবে। কিন্তু এই জিজ্ঞাসাবাদ কার্যত ছিল বন্দীদের বাছাই করে নির্ধারণ করা: কাকে মেরে ফেলা হবে, আর কাকে বাঁচিয়ে রাখা হবে। এনকেভিডির রিপোর্ট মতে, যেসব বন্দী সোভিয়েত প্রবণতা গ্রহণের বিপরীত বলে মনে হবে, তাদের ঘোষণা করা হবে: ‘hardened and uncompromising enemy of Soviet Authority’।
১৯৪০ সালের ৫ মার্চ সোভিয়েত পলিটব্যুরোর ৬ সদস্য- স্টালিন, ভিয়াচেসলেভ, মলতভ, ল্যাজার কাগানোভিচ, ক্লিমেন্ট ভরোশিলভ, আনাসতাস মিকোয়ান ও মিখাইল কালিনিন স্বাক্ষরিত এক আদেশে ২৫,৭০০ পোলিশ নাগরিক ও প্রতিবিপ্লবী হত্যার কথা বলা হয়, যারা দখল করা পশ্চিম ইউক্রেন ও বেলারুশের বন্দিশালায় রয়েছে। ইতিহাসবিদ জেরহার্ড উইনবার্গের মতে, এই গণহত্যা চালানোর কারণ ছিল- স্টালিন চেয়েছিলেন, পোলিশ মিলিটারির বেশির ভাগ মেধাবীকে হত্যার মধ্য দিয়ে ভবিষ্যৎ পোলিশ সামরিক বাহিনীর সম্ভাবনা সমূলে ধ্বংস করে দেয়া। সোভিয়েত নেতৃত্ব, বিশেষত জোসেফ স্টালিন পোলিশ বন্দীদের একটি সমস্যা হিসেবে মনে করতেন। কারণ, এরা সোভিয়েত শাসনাধীনে থাকার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে। সে ভাবনা থেকেই এরা সিদ্ধান্ত নেয় বিশেষ বন্দিশিবিরে আটক বন্দীদের গুলি করে হত্যা করা হবে। কারণ, তাদের মতে এরা সোভিয়েত কর্তৃপক্ষের শত্রু।

হত্যাকাণ্ড কার্যকর করা

এই গণহত্যার শিকার হয় ২২ হাজার পোলিশ বন্দী। তবে নিশ্চিত মৃত্যুর সংখ্যা ধরা হয় ২১,৭৬৮ জন। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত সোভিয়েত গোপন দলিল-দস্তাবেজ মতে, ১৯৪০ সালের ৩ এপ্রিলের পর বেশির ভাগ কিংবা প্রায় সবাই ৩টি বন্দিশিবিরে থাকা ১৪,৫৫২ জন বন্দীকে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে ৪,৪২১ জন ছিল কোজেলস্ক থেকে, ৩,৮২০ জন স্টারোবেলস্ক থেকে এবং ৬,৩১১ জন অস্টাক্লভ থেকে এবং ৭,৩০৫ জন বেলারুশ ও ইউক্রেনীয় বন্দিশালা থেকে। সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশ বাহিনীর প্রধান পিয়তর সোপরেনেনকো সংশ্লিষ্ট ছিলেন এই কাতিন গণহত্যা ও অন্যান্য হত্যাকাণ্ডের জন্য বন্দী বাছাইয়ের কমিটিতে।
কাতিন গণত্যার শিকার পোলিশ সেনাদের মধ্যে একজন ছিলেন অ্যাডমিরাল, ২ জন জেনারেল, ২৪ জন কর্নেল, ৭৯ জন লেফটেন্যান্ট, ২৫৮ জন মেজর, ১৭ জন ন্যাভাল ক্যাপ্টেন, ৪৫ জন প্রাইভেট, ৩,৪২০ জন নন-কমিশন্ড অফিসার ও ৭ জন চ্যাপলেইন, ২০০ জন পাইলট, সরকারি প্রতিনিধি ও রয়েলটি (একজন প্রিন্স, ৪৩ জন কর্মকর্তা) ও বেসামরিক লোকজন (৩ জন ভূস্বামী, ১৩১ জন শরণার্থী, ২০ জন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ৩০০ ডাক্তার, কয়েক শ আইনজীবী, প্রকৌশলী, শিক্ষক, শতাধিক লেখক ও সাংবাদিক। সব মিলিয়ে এনকেভিডি হত্যা করে পোল্যান্ডের অফিসার বাহিনীর প্রায় অর্ধেক। সব মিলিয়ে এনকেভিডি হত্যা করে ১৪ জন পোলিশ জেনারেল: তাদের নাম ও পদবিসহ সোভিয়েত গোপন দলিলে লেখা রয়েছে। এরা সবাই জাতিগতভাবে পোলিশ সম্প্রদায়ভুক্ত ছিলেন না। কারণ, দ্বিতীয় পোলিশ রিপাবলিক ছিল একটি মাল্টি-এথনিক স্টেট (বহুজাতি সম্প্রদায়ের দেশ)। দেশটির কর্মকর্তা বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ছিল বেলারুশিয়ান, ইউক্র্যানিয়ান ও ইহুদি। এক হিসাব মতে- কাতিন হত্যাকাণ্ডের শিকারদের ৮ শতাংশই ছিল পোলিশ ইহুদি। ৩৯৫ জন বন্দীকে হত্যা করা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছিল। পরে এদের অন্যান্য বন্দিশিবিরে পাঠানো হয়। বন্দিশিবিরের ৯৯ শতাংশকেই হত্যা করা হয়েছিল কিতান জঙ্গলে। স্টারোবেলস্ক ক্যাম্পের বন্দীদের হত্যা করা হয় এনকেভিডির কার্কিভের আভ্যন্তরীণ বন্দিশালায়। এরপর লাশগুলো কাছের একটি গ্রামে পুঁতে রাখা হয়। আর অস্টাসকভ ক্যাম্পের পুলিশ কর্মকর্তাদের হত্যা করা হয় এনকেভিডির কালিনিনের অভ্যন্তরীণ বন্দিশালায়। এদের কবর দেয়া হয় মেদনেভেতে। এ তিনটি গণকবরের সবগুলোই গোপন রাখা হয়েছিল। এগুলো ছিল ১৯৩৭-৩৮ সালের গ্রেট পার্জের সময়কার গোপন গণকবর। পরবর্তী সময়ে সেখানে এনকেভিডির জন্য এগুলোকে পরিণত করা হয় বিনোদন এলাকা।

কাতিন গণহত্যার উন্মোচিত গণকবর

কালিনিনের এনকেভিডি কারাগারের এই গণহত্যা কার্যকর করার বিষয়টির বিস্তারিত বিবরণ ওঠে আসে কালিনিনের ‘বোর্ড অব ডিস্ট্রিক্ট এনকেভিডি’-এর সাবেক প্রধান দিমিত্রি তোকারেভের এক শুনানিতে। তোকারেভের বর্ণনা মতে- শুটিং শুরু হয় সন্ধ্যায় এবং শেষ হয় ভোররাতে। ১৯৪০ সালের ৪ এপ্রিল প্রথম পরিবহনে নিয়ে যাওয়া হয় ৩৯০ জনকে। হত্যাকারীরা এক রাতে এত বেশি মানুষকে হত্যা করতে গিয়ে হিমশিম খায়। পরবর্তী পরিবহনে নেয়া হয় অনধিক ২৫০ জনকে। সাধারণত এদের হত্যা করা হয় জার্মানে তৈরি ‘২৫ এসিপি ওয়ালথার মডেল ২’ পিস্তল দিয়ে। এই পিস্তল সরবরাহ করে মস্কো। সোভিয়েত ইউনিয়নে তৈরি রিভলবারও ব্যবহার করা হয়। হত্যাকারীরা বরং স্ট্যান্ডার্ড সোভিয়েত রিভলবারের চেয়ে জার্মান অস্ত্রই বেশি ব্যবহার করে। কারণ, সোভিয়েত রিভলবারের জন্য প্রয়োজন হতো অধিকতর রিকয়েল। এর ফলে প্রথম এক ডজন হত্যার পর হত্যাকাণ্ড কষ্টদায়ক হয়ে ওঠে। এনকেভিডির প্রধান এক্সিকিউশনার ভ্যাসিলি মিখাইলোভিচব্লোখিন ব্যক্তিগতভাবে হত্যা করেন ৭০০০ জনকে। এপ্রিলের ২৮ দিনে এদের হত্যা করা হয়। হত্যার শিকার অনেকের বয়স ছিল ১৮ বছরের মতো।

মৃত্যুদণ্ডের পর তাদের ব্যক্তিগত তথ্য পরীক্ষা করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের অনুমোদনে পর তাদের হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তাদের ডেথ সেলে নিয়ে যাওয়া হতো। ডেথ সেলের চারপাশে ছিল বালির দেয়াল ও ভারী ফেল্ট-লাইনড দরজা। তাদের সেলের মাঝখানে হাঁটুগেড়ে বসতে বলা হতো। এরপর হত্যাকারী পেছন থেকে এসে ঘাড়ে ও পিঠে গুলি করে হত্যা করা হতো। বিপরীত দিকের দরজা দিয়ে লাশ সরিয়ে নেয়া হতো। লাশগুলো বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ৫-৬টি ট্রাকে নিয়ে তোলা হতো। এর পরবর্তী ব্যক্তিকে কনডেম সেলে নিয়ে আসা হতো ও তাকের একইভাবে হত্যা করা হতো। ১৯৯১ সালের পরে উদঘাটিত তথ্য মতে- একইভাবে বন্দীদের হত্যা করা হতো এনকেভিডির হেডকোয়ার্টারে। এই হত্যাকাণ্ড চলতো প্রতি রাতে শুধু মে দিবসের সরকারি ছুটির দিনের রাত ছাড়া। সম্ভবত ইউক্র্যানীয় ও বেলারুশের কারাগারের তিন হাজার থেকে চার হাজারের মতো পোলিশের লাশের কবর দেয়া হয়েছিল যথাক্রমে বাইকিভনিয়া ও কুরাপাতিতে। তাদের মধ্যে ৫০ জন নারী ছিল।

উদঘাটন

১৯৮০-এর দশকে পোলিশ ও সোভিয়েত সরকার থেকে চাপ আসে এই হত্যাকাণ্ড বিষয়ের দলিলপত্র প্রকাশ করার ব্যাপারে। পোলিশ শিক্ষাবিদেরা চেষ্টা চালান কাতিন হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি ১৯৮৭ সালের পোলিশ-সোভিয়েত যৌথ কমিশনের অ্যাজেন্ডায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য, যাতে পোলিশ-রুশ সেন্সরড এপিসোডগুলো কমিশন তদন্ত করে দেখতে পারে। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত পণ্ডিতজনেরা উদঘাটন করেন- জোসেফ স্টালিন অবশ্যই এই হত্যাকাণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে মিখাইল গর্বাচেভ স্বীকার করেন এনকেভিডি পোলিশদের হত্যা করেছে। তিনি কাতিনের মেদনভ ও পিয়াতি খাটস্কি ছাড়াও আরো দুটি গণকবর নিশ্চিত করেন।

১৯৮৯ সালের ৩০ অক্টোবর গর্বাচেভ কয়েকশ পোলের একটি প্রতিনিধিদলকে কাতিন মেমোরিয়াল পরিদর্শনের অনুমতি দেন। এই সফরের আয়োজন করে পোলিশ সংগঠন ‘ফ্যামিলিজ অব কাতিন ভিকটিমস’। এই প্রতিনিধিদলে অন্তর্ভুক্ত ছিলেন প্রেসিডেন্ট কার্টারের আমলের যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ন্যাশনাল সিকিউরিটি অ্যাডভাইজার জিগনিউ ব্রেজেজেনেস্কি। তখন সেখানে এক গণসমাবেশ হয়। ব্যানার উঁচিয়ে সংহতি আন্দোলনের সূচনা করা হয়। সেখানে মেমোরিয়ালে লেখা হয় : In memory of Polish officers killed by the NKVD in 1941। বেশ ক’জন ভিজিটর কাছের কেজিবি কম্পাউন্ডের বেড়া ডিঙিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে সেখানে মোমবাতি প্রজ্বলিত করে।

তখন ব্রেজেজেনেস্কি মন্তব্য করেন: ‘বেশির ভাগ মানুষের মতো আমার ব্যক্তিগত দুঃখবোধ থেকে আমি এখানে আসিনি। বরং এসেছি কাতিন গণহত্যার প্রকৃতির ব্যাপারে প্রতীকী স্বীকৃতি জানাতে। রুশ ও পোলদের নির্যাতন চালিয়ে এখানে হত্যা করা হয়েছে। তারা এখানে একত্রে শায়িত। আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে: যা ঘটেছে, সে সত্যটি বলতে হবে। কারণ সত্য প্রকাশের মধ্য দিয়ে নয়া সোভিয়েত নেতৃত্বকে এনকেভিডি ও স্টালিনের করা অপরাধ থেকে দূরে থাকতে হবে। শুধু সত্যই হতে পারে পোল্যান্ড সোভিয়েত জনগণের সত্যিকারের বন্ধুত্বের ভিত্তি। সত্যি এর পথ করে নেবেই। সে উপলব্ধিতেই আমি এখানে পরিদর্শনে আসতে পেরেছি।’
তার এই বক্তব্য ব্যাপক প্রচার পায় সোভিয়েত টেলিভিশনে। ১৯৯০ সালের ১৩ এপ্রিল ছিল এই গণকবর আবিষ্কারের সপ্তম বর্ষপূর্তির দিন। সেদিন সোভিয়েত ইউনিয়ন এই গণহত্যার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে পরিপূর্ণ দুঃখ প্রকাশ করে এবং সোভিয়েত গুপ্ত পুলিশের দায় স্বীকার করে। ওই দিনটিকে বিশ্বব্যাপী ‘কাতিন স্মরণ দিবস’ ঘোষণা করা হয়।

কমিউনিস্ট শাসনোত্তর তদন্ত

১৯৯০ সালে রাশিয়ার ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন ১ নম্বর প্যাকেজে সিল করা টপ-সিক্রেট ডকুমেন্ট প্রকাশ করেন এবং এগুলো পোল্যান্ডের নয়া প্রেসিডেন্ট লেস ওয়ালেসার কাছে হস্তান্তর করেন। এসব ডকুমেন্টের মধ্যে জর্জিয়ান বলশেভিক ও সোভিয়েত রাজনীতিবিদ ল্যাভরেনতি বেরিয়ার ১৯৪০ সালের ৫ মার্চের একটি প্রস্তাব ছিল। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের মার্শাল, স্টেট সিকিউরিটি অ্যাডমিনিস্ট্র্যাটর, সোভিয়েত নিরাপত্তা প্রধান এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জোসেফ স্টালিনের আমলের এনকেভিডির প্রধান। পরে ১৯৪১ সালে স্টালিনের অধীনে হন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী। ১৯৪৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেন পলিটব্যুরোতে। তিনি তার প্রস্তাবে কোজেলস্কি, অস্টাসকভ ও স্টারোবেলস্ক ক্যাম্পসহ পশ্চিম ইউক্র্যান ও বেলারুশের কিছু ক্যাম্পের ২৫,৭০০ জন পোলিশ বন্দীকে হত্যার প্রস্তাব করেছিলেন। অন্যান্যদের মাঝে এতে স্টালিনেরও স্বাক্ষর ছিল।
আরেকটি ডকুমেন্টে পোলদের কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেটি ছিল সোভিয়েত রাজনীতিবিদ, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তা আলেক্সান্ডার শেলেপিনের ১৯৫৯ সালে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির ফার্স্ট সেক্রেটারি নিকিতা ক্রুশ্চেভের কাছে ২১,৮৫৭ জন পোলিশ বন্দী হত্যার তথ্য জানিয়ে লেখা একটি নোট। সেই সাথে বলা হয়েছিল তাদের ব্যক্তিগত ফাইল ধ্বংস করে দেয়ার জন্যও। এই উদঘাটন সোভিয়েত মিডিয়ায়ও প্রকাশ করা হয়। বিষয়টিকে দেখা হয় গর্বাচেভ ও বরিস ইয়েলৎসিনের ক্ষমতার দ্বন্দ্বের জের হিসেবে।

১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের চিফ মিলিটারি প্রসিকিউটর বিচারকাজ শুরু করেন পিওতর সোপরানেনকোর বিরুদ্ধে; কাতিন হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়ার অভিযোগে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিচারকাজ বন্ধ করে দেয়া হয়, কারণ সোপরানেনকোর বয়স তখন ৮৩ বছর, প্রায় অন্ধ এবং ক্যান্সার অপারেশনোত্তর সময় কাটাচ্ছিলেন। অবশ্য সোপরানেনকো অবশ্য তার নিজের স্বাক্ষরের কথা অস্বীকার করেছিলেন।

২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে কাওয়ানিউস্কির রাশিয়া সফরের সময় রুশ কর্মকর্তারা ঘোষণা দেন: কাতিন হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত সব ডকুমেন্ট ডিক্লাসিফাইড হওয়ার সাথে সাথে পোলদের হাতে সব তথ্য তুলে দিতে তারা রাজি। ২০০৫ সালের মার্চে রুশ ফেডারেশনের প্রসিকিউটর জেনারেলের অফিস সমাপ্ত করে এই হত্যাকাণ্ডের দশকব্যাপী তদন্ত। রুশ ফেডারেশনের চিফ মিলিটারি প্রসিকিউটর আলেক্সান্ডার স্যাভেনকভ ঘোষণা দেন ১৪,৫৪২ জন পোলিশ নাগরিকের মধ্যে তদন্তে ১৮০৩ জনের হত্যার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেছে। তিনটি ক্যাম্প থেকে এদের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছিল। তিনি সাত হাজার যুদ্ধবন্দীর ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা নির্ধারণ করতে পারেননি, যারা কোনো বন্দিশিবিরে ছিল না, ছিল কারাগারে। তবে স্যাভেনকভ ঘোষণা দেন, এটি কোনো গণহত্যা ছিল না। আর এই গণহত্যার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়নের যেসব সৈনিক দায়ী ছিল, এরা ইতোমধ্যেই মারা গেছেন। অতএব এদের বিচার নিয়ে কথা বলে আর কোনো লাভ নেই। রাশিয়ার পরিচালিত তদন্তে সংগৃহীত ১৮৩ খণ্ডের ডকুমেন্টের মধ্যে ১১৬টিকে ঘোষণা করা হয় রাষ্ট্রীয় গোপন দলিল এবং এগুলোকে ক্লাসিফাইড করা হয়।

২০০৫ সালের ২২ মার্চে পোলিশ পার্লামেন্ট ‘সেজম’-এর নিম্নকক্ষ সর্বসম্মতিক্রমে এক আইন পাস করে বলা হয় রুশিয়ান আর্কাইভকে ডিক্লাসিফাইড করতে। সেজম আরো অনুরোধ জানায় কাতিন ম্যাসাকারকে গণহত্যা অপরাধ হিসেবে ক্লাসিফাইড করার জন্য। এই রেজ্যুলেশনে জোর দিয়ে বলা হয়, রুশ কর্তৃপক্ষ এক গণহত্যা হিসেবে অস্বীকার করে অপরাধের বোঝা কমাতে চায়। এর মাধ্যমে রাশিয়া এই গণহত্যা ও এর জন্য দায়ীদের সম্পর্কে পুরোপুরি তথ্য উদঘাটনের কাজটিকে জটিল করে তুলছে।
২০০৭ সালের শেষ ও ২০০৮ সালের প্রথম দিকে রুশিস্কায়া গ্যাজেটা, কমসোলস্কায়া প্রাভদা ও নেজাভিসিমায়া গ্যাজেটাসহ অন্যান্য রাশিয়ান সংবাদপত্র এই মর্মে খবর ছাপে যে, নাৎসিরা উদ্বেগ ছড়াচ্ছে যে এই অপরাধে ক্রেমলিনের গোপন অনুমোদন ছিল। এর ফলে পোলিশ ‘ইনস্টিটিউট অব ন্যাশনাল রিমেমব্রেন্স’ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এর নিজস্ব তদন্ত শুরু করার।

২০০৮ সালে পোলিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুশ সরকারের কাছে হত্যাকাণ্ডের সময়কার এনকেভিডির ভিডিও ফুটেজ চেয়ে পাঠায়। রাশিয়া তা দিতে অস্বীকার করে। পোলিশ সরকারের বিশ্বাস, এই ফুটেজ ও অন্যান্য ডকুমেন্ট অপারেশনের সময়ে সোভিয়েতের সাথে গ্যাস্টাপো সহযোগিতা ছিল: তার প্রমাণ পাওয়া যেত। এ কারণেই রাশিয়া এই গণহত্যা সম্পর্কিত আর কোনো ডকুমেন্ট প্রকাশ করতে চাইছে না। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, গ্যাস্টাপো ছিল নাৎসি জার্মানির সরকারি গুপ্ত পুলিশ বাহিনী।
পরবর্তী বছরগুলোতে এই ঘটনার আরো ৮১ খণ্ড দলিল ডিক্লাসিফাইড করা হয় এবং হস্তান্তর করা হয় পোলিশ সরকারের কাছে। ২০১২ সালের দিকে এসে ১৮৩ খণ্ড দলিলের মধ্যে ৩৫টি ক্লাসিফাইড থেকে যায়।
২০০৮ সালের জুনে রাশিয়ান আদালত সম্মত হয় কাতিন ডকুমেন্ট ডিক্লাসিফাইড সম্পর্কিত একটি মামলার শুনানি করতে। সেই সাথে সম্মত হয় ঘটনার শিকারদের বিচারিক পুনর্বাসনে। একটি পোলিশ সংবাদপত্রকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে পুতিন কাতিন হত্যাকাণ্ডকে একটি ‘রাজনৈতিক অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করেন।
২০১০ সালের ২১ এপ্রিল রাশিয়ান সুপ্রিম কোর্ট মস্কো সিটি কোর্টকে আদেশ দেয় চলমান একটি কাতিন মামলার আপিল শুনানির জন্য। ‘মেমোরিয়াল’ নামের সুশীলসমাজের একটি গোষ্ঠী বলে, এর রুলিংয়ে কাতিন হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত সব ডকুমেন্ট ডিক্লাসিফাইড করতে বলা হতে পারে। একই বছরের ৮ মে রাশিয়া পোল্যান্ডের কাছে হস্তান্তর করে ৬৭ খণ্ডের ‘ক্রিমিনাল কেইস নম্বর ১৫৯’। প্রায় ২৫০ পৃষ্ঠার এসব প্রতিটি খণ্ডের কপি রাখা হয় ৬টি বাক্সে। প্রতি বক্সের ওজন ছিল ১২ কেজি। রুশ প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদেভেদে একটি খণ্ড হস্তান্তর করেন ভারপ্রাপ্ত পোলিশ প্রেসিডেন্ট ব্রনিসলো কমোরয়োস্কির কাছে। এরা দুজন সম্মত হন দুই রাষ্ট্র অব্যাহত প্রচেষ্টা চালাবে এই বিয়োগান্ত ঘটনার সত্য উদঘাটনে।
২০১০ সালের নভেম্বরে রাশিয়ার ফেডারেল অ্যাসেম্বলির নিম্নকক্ষ স্টেট ডোমা এক আনুষ্ঠানিক ঘোষণায় স্বীকার করে নেয়, জোসেফ স্টালিন ও সোভিয়েত কর্মকর্তারা ল্যাভরেনিতির অধীন গুপ্ত পুলিশ বাহিনী এনকেভিডিকে আদেশ দিয়েছিল এই হত্যাকাণ্ড চালানোর জন্য।
এখন এটি সুস্পষ্ট হয়ে গেছে সোভিয়েত কমিউনিস্ট শাসক জোসেফ স্টালিন, সোভিয়েত পলিটব্যুরো ও এনকেভিডি কাতিন হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে। এরা এর মাধ্যমে বিশ্বে কমিউনিস্ট শাসনের আরেক কালো অধ্যায় রচনা করে।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply