ইতিহাসের নির্মম সরকারি হত্যাকান্ড

মুহাম্মদ আবদুল জব্বার

20শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা দ্বীনের পথে নিজেকে বিলিয়ে দেয়া এক অগ্রজ দুর্বার নির্ভীক সৈনিক। যিনি আল্লাহর দরবারে জান্নাতি মেহমান। যিনি আছেন হযরত হামজা, হাসানুল বান্না, সাইয়েদ কুতুব ও মালেকের পথ ধরে শহীদদের মিছিলের অগ্রভাগে। যিনি লক্ষ কোটি জনতার হৃদয়ে উচ্চকিত এক অনন্য নাম ‘শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা’! যিনি অনাগত ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাছে সাহসী, উদ্যোমী ও মিথ্যা অবিচারের বিরুদ্ধে এক প্রচন্ড দ্রোহের নাম!
যাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। এগিয়ে চলে সরব মিশন, শুরু হয় সম্মিলিত মিডিয়া সন্ত্রাস। এরপর আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে পরিচালিত হয় সর্বকালের নিষ্ঠুরতম নির্মম বিচারিক হত্যাকান্ড! আইন আদালতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে ২০১৩ সালের ১২ ডিসেম্বর ফাঁসি কার্যকর করে আওয়ামী চক্রান্তকারীরা। আসামির আত্মপক্ষের ন্যূনতম আইনি সুযোগ থেকে বঞ্চিত করে সেদিন হায়েনারা আহলাদে মেতে ওঠে। বিবাদিপক্ষ আগে থেকেই দাবি করে আসছিল এ বিচারব্যবস্থা অস্বচ্ছ ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। সর্বশেষ ২৫ নভেম্বর ২০১৪ সালে আব্দুল কাদের মোল্লার বিচারের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলো যেখানে তাঁর দন্ডের বিরুদ্ধে রিভিউ করার সুযোগ ছিল। আসামিকে রিভিউয়ের সুযোগ না দিয়ে সময়ের আগেই ষড়যন্ত্রের বিচারিক হত্যাকান্ডের নির্মমতাকেও হার মানিয়ে সরকারি হত্যাকান্ড ঘটাল আওয়ামী ইসলামবিদ্বেষী ফ্যাসিস্টরা!
বাংলাদেশে তথ্যসন্ত্রাসের আরেক নজির শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ। যেখানে দেশের অধিকাংশ মিডিয়া হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। দাবি একটাই কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই। এক কথায় সম্মিলিত মিডিয়া সন্ত্রাস! ৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ সাল থেকে টানা ২ মাস এ সকল মিডিয়া দিনে রাতে ২০ থেকে ২২ ঘণ্টা লাইভ নিউজ করতে লাগল। সারাদেশের মানুষ স্তম্ভিত হলো। শাহবাগের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সংসদে শাস্তি বাড়াতে নতুন আইন পাস করা হলো। সিন্ডিকেট নিউজে দেশবাসী অতিষ্ঠ হতে লাগল। দেশে যেন আর কোন খবর নেই, সমস্যা , সম্ভাবনা নেই, খবর একটাই তরুণ প্রজন্ম জেগেছে! মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জেগেছে! ফাঁসি চাই! ফাঁসি চাই, কাদের মোল্লার ফাঁসি চাই! এরপর ক্ষণে ক্ষণে মঞ্চের আস্তরণ পরিবর্তন হতে লাগল। দাবি এলো ইসলামী রাজনীতি বন্ধ করতে হবে, ইসলামী ব্যাংক বন্ধ করতে হবে। দৈনিক আমার দেশ পত্রিকা, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভি বন্ধ করতে হবে। ইসলামী ব্লগ, ওয়েবসাইট ও পেজগুলো বন্ধ করতে হবে। শুধু তাই নয় আন্দোলনকারীরা মিডিয়াগুলোর ছত্রছায়ায় আল্লাহ, রাসূল, নামাজ ও রোজা নিয়ে কটূক্তি করতে থাকল। নিহত ইসলামবিদ্ধেষী রাজিব হায়দারের নামাজে জানাজা শাহবাগে নারী-পুরুষ, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হলো! শুধু তাই নয় সংসদে নিহত রাজিব হায়দারকে শহীদ হিসেবে আখ্যা দিলেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তার সম্মানে নীরবতা পালন করলেন।
এভাবে সরকার শাহবাগীদের কথা আমলে নিয়ে দেশের অধিকাংশ জনমত উপেক্ষা করে প্রায় সকল দাবি এক এক করে পূর্ণ করে চলছে। সাংবাদিক নামধারী বোধ বিবেকহীন ব্যক্তিরা এ ধরনের নির্লজ্জকর মিথ্যাচারে নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন তাদের বিবেকের কাছে। প্রশ্ন থেকেই যায়। জানি না তাদের বিক্রীত মগজে কোন নাড়া দেবে কি-না? স্বাধীনতার চেতনা ও তরুণ প্রজন্মের নবজাগরণের নামে নিরপরাধ মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা এ কেমন চেতনা?
নির্লজ্জ মিথ্যার বেসাতির বাদ্য-বাদকদের কাছে কথিত যুদ্ধাপরাধী (!) জামায়াত নেতা আব্দুল কাদের মোল্লার ব্যাপারে এই প্রশ্নগুলোর কি কোন উত্তর আছে?
১৯৭১ সালে দালাল আইনে প্রায় ৩৭ হাজার লোকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল। এমন একজন কুখ্যাত খুনির (?) বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কোথাও ১৯৭১-২০১০ পর্যন্ত কোন মামলা তো দূরের কথা সাধারণ ডায়েরিও হয়নি কেন?
তিনি কী করে ১৯৭২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলে অবস্থান করে অধ্যয়ন অব্যাহত রাখেন ও ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত পড়াশুনা করেন?
তিনি যদি যুদ্ধাপরাধী হয়ে থাকেন তাহলে ১৯৭৭ সালে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পিলখানার রাইফেলস স্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক এবং ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ব কিভাবে পালন করলেন?
তিনি কিভাবে ১৯৭৪-১৯৭৫ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাম্পাসের উদয়ন স্কুলের শিক্ষকতা করেন?
কিভাবে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান আব্দুল কাদের মোল্লাকে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ দেন?
তিনি কিভাবে ১৯৮১-৮২ সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের পরপর দুইবার সহসভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন?
মিডিয়ায় মিথ্যার বেসাতি যারা অনুরণিত করছেন ১৯৮১-৮২ সালে কাদের মোল্লা যখন সাংবাদিক নেতা ছিলেন তখন তাদের মুখে কে আঠা লাগিয়ে দিয়েছিল? তাহলে কি তারা কারো এজেন্ডা বাস্তবায়ন করছেন?
তাহলে তার অপরাধ কী? এগুলোই কি তার অপরাধ যে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্সে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল লাভ করেছেন?
তিনি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ণাঙ্গ স্কলারশিপ প্রত্যাখ্যান করে ইসলাম ও দেশের খেদমতে আত্মনিয়োগ করেছেন।
তিনি বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার বিস্তারে নেতৃত্বদানকারী সংগঠক এবং ‘ঢাকা মানারাত’সহ দেশে শতাধিক আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে অনুঘটকের ভূমিকা রেখেছেন।
তিনি জামায়াতে ইসলামীর অন্যতম নীতিনির্ধারক ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল। ঢাকা মহানগরী শাখার সাবেক আমীর এবং বিগত দুই দু’টি জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী ছিলেন।
তিনি রাশেদ খান মেনন ও মতিয়া চৌধুরীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের নেতা থাকাকালীন ইসলামী আন্দোলনের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে বাম রাজনীতি পরিত্যাগ করেন।
উল্লেখিত বিষয়গুলোর উপস্থাপন নেতিবাচক বিকৃতমনা নরঘাতকদের কাছে অরণ্যে রোদন ছাড়া আর কিছুই নয়। তারা তাদের চক্ষু অন্ধকারের মোটা আস্তরণ দিয়ে ঢেকে রেখেছে। এরা দেখেও দেখে না, বুঝেও বুঝে না। তাদের কাছে সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করার সক্ষমতা নেই, তারা যেন মানুষ নামে অচেতন লাশ। অর্থের গোলাম। তাদের হীন চক্রান্ত শুধুমাত্র নিরপরাধ এক আব্দুল কাদের মোল্লা বা কথিত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চাওয়ার মাঝে সীমাবদ্ধ নয়। তারা দেশে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ সেক্যুলারিজমের বিষবাষ্প চিরতরে দায়েম-কায়েম করতে চায়।
একজন আব্দুল কাদের মোল্লাকে হত্যা করে যারা উল্লাস প্রকাশ করেছেন, ভেবেছেন নিজেরা বিজয়ী হয়ে গিয়েছেন তাদের মনে করিয়ে দিতে চাই-
‘শহীদরা মিল্লাতের জীবন, মিল্লাতের গৌরব, দুর্যোগের রাহবার। হতাশাগ্রস্ত মুসাফিরের জন্য তারা আলোকদিশা ধ্রুবতারা। সেই ধ্রুবতারাদের একজনই শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লা!’
একজন শহীদ আব্দুল কাদের মোল্লার রক্তের ওপর দিয়ে যে জাগরণ ইসলামপ্রিয় তৌহিদী জনতার মাঝে উঠেছে, অন্যায়ের প্রতিবাদ করার তারুণ্যের যে ঝড় শুরু হয়েছে, সে জাগরণী ঝড়ে ইসলাম ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হবেই, ইনশাআল্লাহ।

লেখক : কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply