ইতিহাসের সাথে ঐতিহ্যের পথে

আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ#

ইতিহাস কালের সাক্ষী

Kaldunকাল অজস্র মুহূর্তের সমষ্টি। প্রতিটি মুহূর্তই ধাবমান যা বর্তমান, তা যেন একটি প্রহেলিকা। বলতে না বলতেই বর্তমান হয়ে যায় কাল। মহাকালের এক একটি মুহূর্ততো দূরের কথা একটি বছরও যেন একটি বুদবুদ কিংবা অতি ক্ষুদ্র বিন্দুর মতো। এই যে মহাকালের গর্ভে অসংখ্য সময় হারিয়ে গেছে, তার সাথে স্থান করে নিয়েছে অজস্র ঘটনাপ্রবাহ।
মানবের পৃথিবীতে আগমন যত প্রাচীন, তার ইতিহাসও ততটাই পুরনো। ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষকগণ প্রাগৈতিহাসিক (prehistoric) বলতে একটি পরিভাষা ব্যবহার করে থাকেন। বাস্তবে তেমন কিছু থাকার সুযোগ নেই। হতে পারে মানুষের রচিত ইতিহাস যা ধারণ করতে পারেনি, তাকে আমরা ইতিহাসের অংশ মনে করছি না। কিন্তু আল কুরআনের ‘ইতিহাস পর্ব’ এ ধারণা নাকচ করে দেয়। আমরা বিজ্ঞানের যে যুগ অতিক্রম করছি তা অতীতকে হাতড়ে এনে হাজির করে আমাদের কাছে। ‘টাইম মেশিনের’ সাহায্যে অতীতে ফিরে যাওয়ার ধারণা বিজ্ঞানের কল্পকথা যা পাওয়া যায়, তা যদি বাদও দিই, আমরা কি ‘ইথারে’ ভাসমান অতীত কাহিনীকে অস্বীকার করতে পারবো যা ছবির মতো জ্যান্ত কিংবা শব্দের মতো বাঙময় হয়ে আমাদের কাছে ধরা দেবে নিকট ভবিষ্যতে?
ইতিহাসকে সাক্ষী করে আমরা যদি পথ চলতে থাকি, চলার পথে পথে, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে আমাদের সাথে দেখা হবে মানুষের নানা জাতি, গোত্র, সম্প্রদায়সমূহের রেখে যাওয়া পদচিহ্নের সাথে। ইতিহাসের বুকে ধারণ করা সব ঘটনা স্বর্ণালি কিংবা বর্ণালি নয়। কোন কোন ইতিহাস যেন মানবসভ্যতার কালো অধ্যায়, রক্তাক্ত, বেদনার্ত আর অগৌরবের সে ইতিহাস আমরা ঘৃণাভরে স্মরণ করি, আপন সত্তার সাথে সম্পর্কিত করতে অস্বীকার করি।
ফলে ইতিহাসের বুকে স্থান পেয়েও কোন কোন জাতি সম্প্রদায় তার অনুজ্জ্বল অবস্থা নিয়ে ম্রিয়মাণ ও ঘৃণার্হ। আর কোন কোন জাতির ইতিহাস স্বল্পদৈর্ঘ্য, সভ্যতা ক্ষণিকের, কিন্তু সর্বত্র দ্যুতিময় ও কল্যাণবাহী।
একটা কথা আমরা প্রায়ই বলি- মানুষের সভ্যতা তার ইতিহাসের সমান দীর্ঘ, তার সংস্কৃতি তার ঐতিহ্যের সমান বিস্তৃত।
ইতিহাসের সাথে ঐতিহ্যের পথেÑ এই সত্য সন্ধানে একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অনুসন্ধিৎসু প্রয়াস।

ইতিহাসের ইতিহাস ও তার উপাদান
সংজ্ঞা : আধুনিক ইতিহাসের জনক হিসেবে খ্যাতি রয়েছে হেরোডটাস (Herodotus)-এর। তিনি মানবসভ্যতার গভীর অনুসন্ধিৎসা নিয়ে গবেষণা করেছেন। ব্যাপক অনুসন্ধানের পর গভীর প্রত্যয় ও প্রজ্ঞা দিয়ে তিনি অতীতের ঘটনাপ্রবাহকে বিচার-বিশ্লেষণ করে সত্য ঘটনাসমূহ বের করে আনেন। অতীতের অসংখ্য ঘটনা অনেকভাবে তার বর্ণনা মানুষের কাছে এসেছে। এসব ঘটনার আধুনিক তথ্যভান্ডার গড়ে তুলে সেসব তথ্যের মধ্যে যেগুলো অধিক বর্ণনায় উল্লিখিত (commonly narrated) সেগুলোকে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠিতে ধরে নেন হেরোডটাস। তাই হেরোডটাস ইতিহাসকে সংজ্ঞায়িত করেন এভাবে ‘History is the true and agreeable delineation of the past events অর্থাৎ ইতিহাস হচ্ছে অতীত ঘটনাসমূহের সত্য ও সহমত হওয়ার মতো বর্ণনা।
সমাজবিজ্ঞানের জনক ইবনে খালদুন (Ibn Khaldun) ইতিহাস নিয়েই প্রধানত কাজ করেছেন। ইবন খালদুন সমাজ সভ্যতা, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতিসহ প্রায় সকল বিষয়ের ইতিহাসকে ঘেঁটেছেন। এ কথা মানতে হবে সমাজ ও সভ্যতা যত এগিয়েছে মানবজীবনে ততই অগ্রগতি হয়েছে এবং এই অগ্রগতি প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে দেয়ার জন্যই ইতিহাস রচনা অবশ্যম্ভাবী হয়ে পড়েছে। এ জন্য ইবনে খালদুনের ইতিহাসের সংজ্ঞা একটু ভিন্ন রকম। তিনি বলেছেন- “The narrative description of human society and civilization is the history” অর্থাৎ মানবসমাজ ও সভ্যতার বর্ণনামূলক উপস্থাপনাই ইতিহাস। একটু বিস্তৃত সংজ্ঞা হিসেবে আমরা ১৮৭৬ সালে প্রদত্ত John J Anderson এর A manual of general history থেকে উদ্ধৃত করতে পারি। “History is the narration of the events which have happened among mankind, including an account of rise and fall of nations, as well as of other great changes which have affected the political and social condition of the human race.” জাতিসমূহের উত্থান-পতনসহ মানবজাতির রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার বড় ধরনের পরিবর্তনে প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনাসমূহ যা মানবসমাজে সংঘটিত হয়েছে তার বর্ণনাকে ইতিহাস বলা হয়।
Arnold J Toynbee ইতিহাসকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করেন। “Histoty not used is nothaing for all intellectuals life is action, like practical life, and if you don’t use the stuff well, it might as well be dead.” অর্থাৎ অব্যবহৃত ইতিহাস কোন কিছুই নয়। বুদ্ধিভিত্তিক জীবনের জন্য এটি কর্মতৎপরতা, যেমন বাস্তব জীবন এবং যদি এর সঠিক ব্যবহার না করা যায়, অবশ্যম্ভাবীরূপে ইতিহাসের মৃত্যু ঘটে।
সে জন্যই আবার গুছিয়ে এনে বলতে হয়, ইতিহাস হচ্ছে অতীতের গুরুত্বপূর্ণ ও সত্য কাহিনীর সমষ্টি।
“It is an umbrella term that relates to past events as well as the memory, discovery, collection, organization, presentation and interpretation of information about these events”

আল কুরআনের ইতিহাস আলোচনা
আল কুরআন মানবের প্রতি তার স্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের প্রেরিত সর্বশেষ হেদায়েত গ্রন্থ। যুগে যুগে মানবকে বিচ্যুতি ও বিকৃতি থেকে রক্ষা করে সত্য সঠিক পথে, আলোকিত রাজপথে ফিরিয়ে আনার জন্যই স্রষ্টা ‘অহি’ বা তার পক্ষ থেকে বাণী পাঠিয়েছেন। পৃথিবীতে মানবের প্রথম পদক্ষেপ ‘আদম’ ও ‘হাওয়া’র মাধ্যমে।
মানব ইতিহাস ও সভ্যতা নিয়ে যারা কাজ করেছেন তাদের একটি অংশ বলেছেন, আদিম (প্রাচীন) মানুষ ছিল অসভ্য, বর্বর, নিরক্ষর, গুহাবাসী ও অন্ধকারের বাসিন্দা। কিন্তু কুরআন বলছে, পৃথিবীর প্রথম মানুষ ‘আদম’ জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি (আশরাফুল মাখলুকাত) হিসেবে প্রেরিত হন। তিনি স্রষ্টা কর্তৃক শেখানো জ্ঞানে শিক্ষিত ছিলেন। অপর দিকে তিনি নবী ছিলেন। ফলে ছিলেন আলোকিত ও সভ্য।
আল কুরআনে মানব ইতিহাসে বড় বড় সভ্যতা (great civilization) বড় বড় জাতিসমূহ, তাদের উত্থান-পতন ও অনেক খুঁটিনাটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাসমূহ আকারে ইঙ্গিতে ভবিষ্যতের মানুষদের সতর্ক করার উদ্দেশ্যে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে ৬৬৬৬টি আয়াত রয়েছে যার মধ্যে ১০০০ আয়াতে কাহিনী ও ১০০০ আয়াতে উদাহরণ বর্ণনা করা হয়েছে। এই সমস্ত উদাহরণ ও ইতিহাসভিত্তিক আয়াতে কোন কোন ঘটনা পুনরাবৃত্ত হয়েছে।
কুরআন সম্পর্কে আমাদের জানা রয়েছে যে মানব সৃষ্টির অনেক আগেই হেদায়েতের সর্বশেষ গ্রন্থ এই কুরআন হুবুহু ‘লাওহে মাহফুজে’ বা সংরক্ষিত স্থানে লিখে রাখা হয়। আর তা মানুষের কাছে প্রেরিত হয় একটি বিশেষ অধ্যায়ে, বিশেষ প্রক্রিয়ায়, ধীরে ধীরে। একটি সমাজ আন্দোলন ও একটি সভ্যতা নির্মাণের স্তরে স্তরে। এ সভ্যতার নাম ‘ইসলামী সভ্যতা’ যা বিশ্বকে হাজার বছরেরও অধিককাল ফুলে ফলে সুশোভিত করেছে।

কেন এই আলোচনা
কুরআনের এ আলোচনা মূলত গাফেল, বেখেয়াল ও অসতর্ক মানুষকে সচেতন, সতর্ক করার জন্য। উদাহরণস্বরূপ আমরা কুরআন নাজিল হওয়ার সময়কালকে একবার স্মরণে আনি। নবী হজরত ঈসা (আ)-এর ঊর্ধ্বলোকে চলে যাওয়ার পর ৫৭০ বছর পৃথিবী আর কোন নবী রাসূল পায়নি। সমগ্র  পৃথিবী এক অন্ধকারে ছেয়ে যায়। ঘুমঘোর সেই তমসায় মানবতা জ্ঞানবিজ্ঞান-সভ্যতা-সংস্কৃতি- বিবর্জিত হয়ে বর্বরতার যুগ অতিক্রম করছিল। রোম-পারস্যসহ সমগ্র  পৃথিবী খুন খারাবি আর পাশবিকতায় লিপ্ত। জাজিরাতুল আরব ছিল আরো ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির শিকার। পাথরের মূর্তি পূজায় নিমজ্জিত ছিল তারা। শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হয়েও তারা জড়বস্তুর কাছে নোয়াতো তাদের মাথা। নারী-শিশুকে জীবন্ত কবর দিতো। জেনা-ব্যভিচার ছিল তাদের স্বাভাবিক কাজ। অপরের ধনসম্পদ মেরে খাওয়া, সুদের নিগড়ে শোষণ করা ছিল নৈমিত্তিক ব্যাপার। বাবার মৃত্যু হলে সন্তানেরা তাদের সৎমাকে বিয়ে করতো। বোনদের শয্যাসঙ্গী করতো। এমনই ছিল তাদের অসংযত যৌনাচার।
এমনি সময়ে মুহাম্মদ (সা) এলেন পৃথিবীর বুকে। ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুওয়ত লাভ করলেন। ২৩ বছর ধরে নিরলস দাওয়াতি কাজ করলেন। লোকদের সংগঠিত করলেন। কুরআন শিক্ষা দিলেন।  নৈতিকভাবে সৎ ও সর্বোত্তম চরিত্রে সুশোভিত করলেন। বিশুদ্ধ আত্মার অধিকারী, সংযমী, প্রত্যয়ী ও ধৈর্যশীল মানুষ হিসেবে  তৈরি করলেন। তাদেরকে জাহেলি যুগের সমাজব্যবস্থার বিপরীতে এমন এক সমাজ তৈরি করলেন যেখানে জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই ছিলো সমান, কালোর ওপর ধলোর কিংবা ধলোর ওপর কালোর কোন প্রাধান্য রইলো না। প্রাধান্যের একমাত্র মাপকাঠি ছিল খোদাভীতি ও সততা। মদ, জুয়া, সুদ, ব্যভিচারসহ সব অনাচার নিষিদ্ধ হলো। একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠলো। ৫৩ বছর বয়সে নিজভূম থেকে পরবাসী হয়ে মদীনার ছোট্ট রাষ্ট্র গড়ে তুললেন। এ রাষ্ট্রের ভিত তৈরি হলো সততা কল্যাণ ইনসাফ, আদর্শ, সুকৃতি ও উন্নততর মানবতার ওপর। ৬৩ বছর বয়সে তিনি যখন ইন্তেকাল করেন, তার আগেই মক্কা বিজয় করেন। সমগ্র  জাজিরাতুল আরব তার রাজ্যসীমায় চলে আসে। রোম-পারস্য সাম্রাজ্যের সীমানা পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। আর তার মৃত্যুর পর ২০ বছরের মধ্যে জানা পৃথিবীর অর্ধেকটা তার রেখে যাওয়া আদর্শের আওতায় চলে আসে। এই যে বিশাল পরিবর্তন তার পেছনে অন্যতম নিয়ামক শক্তি ছিল ‘আল কুরআন’। বিশেষ করে আল কুরআনে বর্ণিত ইতিহাসসমূহ। এসব ইতিহাসে কয়েকটি কারণে উল্লেখ করা হয়। যেমন-
এক. পৃথিবীর বুকে আগেও যেসব জাতি শিরক ও কুফরিনির্ভর হয়ে মানুষের ওপর দুঃসহ শাসন চালিয়েছিলো তাদের চূড়ান্ত পরিণতি সম্পর্কে অবহিত করে সাবধান করা।
দুই. যে সমস্ত সভ্যতার ধারক বাহকগণ দোর্দন্ড প্রতাপে এক ধরনের দুর্দমনীয় শক্তিমত্তা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতি দিয়ে পৃথিবীকে চমকে দিয়েছিলো তাদের (নতুন সভ্যতার গোড়াপত্তনে) ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিমজ্জিত হওয়া ইত্যাদির বর্ণনা।
তিন. অনৈতিকতার ফলে বিপর্যস্ত মানবসভ্যতার মূলোৎপাটন করে পরাক্রমশালী স্রষ্টা কী করে নৈতিক বিজয় দিয়েছেন তার বর্ণনার মধ্য দিয়ে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি করা।
চার. সভ্যতার আবর্তন, সংস্কৃতির বিবর্তন ও আর্থসামাজিকতার যে চক্র তা পরিষ্কার করে তুলে ধরা।
পাঁচ. আল কুরআনে কিছু অতীত ইতিহাসের বর্ণনা রয়েছে, যা ঐ সময়কার মানুষের কাছে অন্য মাধ্যমে আসেনি। আবার কতিপয় ভবিষ্যদ্বাণী ধরনের ঘটনা বলা হয়েছে যা মানুষের সাধারণ বোধগম্যতায় আসার কথা নয়। অথচ আমরা আগেই বলেছি এসব মানবের যাত্রা শুরুর অনেক আগেই রচনা করা হয়েছে। বাস্তবতা হলো যিনি এই গ্রহের রচয়িতা তিনি একই সাথে অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সম্যক অবহিত বরং বলা যায় এ সবই তার রচনা। স্থান-কাল- পাত্রের ঊর্ধ্বে তিনি। তার কাছে তিনটি কালের অবস্থান একই সমতলে। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের কাছে যা গত হয়ে গেছে, যা বর্তমান হচ্ছে কিংবা আগামী হবে তার সবকিছুই সৃষ্টির বহু আগে তিনি ঘটনাপরম্পরা সাজিয়ে রেখেছেন। বর্তমানে একটি প্রকল্পের ৩টি ভিডিও বানানোর মতো। এটি বরং তার চাইতেও সহজ তার জন্য যিনি মানুষকে এই প্রযুক্তিগত জ্ঞান দিয়েছেন।

মানবসভ্যতার ইতিহাসকে কুরআন কিভাবে বর্ণনা করে
এক. কুরআনে একটি আলাদা সূরা আছে যার নাম আসর বা কাল। এটিকে বলা হয় কুরআনের ইতিহাস-দর্শনের দলিল। ইতিহাসকে অতি সংক্ষিপ্ত একটি মূল্যায়ন দেয়া হয়েছে সেখানে। বলা হয়েছে, “কালের শপথ। নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত।” ইতিহাস সাক্ষী দেয় আসলেই মানবের বৃহদাংশ শয়তানের প্রবঞ্চনার শিকার হয়ে নিজেকে নিজে ক্ষতিকর কার্যাবলির সাথে সম্পৃক্ত করে রাখে। তবে তারা ব্যতীত, যারা বিশ্বাস পোষণ করে আর সৎকাজ করে। যারা অন্যকে সত্যনিষ্ঠ থাকার শিক্ষা দেয় এবং ধৈর্য ধারণ করতে উপদেশ দেয়।
দুই. কুরআন পাকে বড় বড় জাতির মধ্য থেকে আ’দ, সামুদ, লুদ, বনি ইসরাইল, আইকা জাতির উল্লেখ করা হয়েছে। এই সমস্ত জাতি পৃথিবীতে অনেক শৌর্য, বীর্য, সভ্যতার ধারক-বাহক ছিল। কিন্তু সভ্যতা এই সমস্ত জাতির একটি পর্যায়ে অনৈতিকতা ও বাড়াবাড়ির চরম পর্যায়ে পৌঁছে মানবতাকে ভূলুণ্ঠিত করেছে। ওই নৈতিক দেউলিয়াপনার সময়কালে তাদের কাছে প্রত্যাশিত সত্যের আহবান নিয়ে হাজির হয়েছিলেন নবী-রাসূলগণ। কিন্তু ওইসব জাতি তাদের সাথে চরম ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণ করেছে, তাদের আনা সত্যকে অস্বীকার করেছে, কখনো এসব নবীকে তারা করাত দিয়ে কেটে টুকরো করেছে, কখনো গর্ত করে সেখানে ফেলে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে, কখনো লোহার আঁচড়া দিয়ে তাদের গায়ের চামড়া, হাড় খসিয়ে নিয়েছে, কখনো গোটা জাতি বেহায়াপনার চরমে পৌঁছেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই  নৈতিকতার ভিত্তিতে বৈবাহিক বন্ধন গড়ে তোলার পরিবর্তে যৌন স্বেচ্ছাচারিতায় মত্ত হয়েছে। অন্যের ধর্ম-সম্পত্তি জোর করে দখল ও ভোগ করা কোন ব্যাপারই ছিল না। কুরআন ওইসব জাতির শেষ পরিণতিগুলো উল্লেখ করেছে। প্রমাণ করেছে যে, শেষ পর্যন্ত তাদের ধ্বংস কেউ ঠেকাতে পারেনি।
বিশেষ করে ইতিহাসের পরাক্রমশালী ফেরাউন, হামান, নমরুদের কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। জালেমদের হাতে নবীদের নির্যাতনের কাহিনীর পাশাপাশি তাদের যে মর্মান্তিক ও দুর্ভাগ্যজনক পরিণতি তা-ও তুলে ধরা হয়েছে।
আল্লাহ বলেছেন, ‘আমি এই কুরআনে এই কথাগুলো সবিস্তারে বর্ণনা করেছি যাতে করে তারা এ থেকে কিছু শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।’ কিন্তু এটি তাদের প্রমাণের প্রতি বিদ্বেষ ছাড়া আর কিছু বাড়াবে না।’ (সূরা বনি ইসরাইল-৪১)
তিন. কুরআনের ইতিহাস বর্ণনায় জাতির সভ্যতার ভিত্তি আলোচনা করা হয়েছে যেমন করা হয়েছে সূরা বনি ইসরাইলে। এখানে বনি ইসরাইলকে যে চৌদ্দ দফা সমাজ-বিধান দেয়া হয়েছিল বা উল্লেখ করার মধ্য দিয়ে একটি সুশীল, সভ্য ও সংস্কৃতিবান সমাজের কী কী বৈশিষ্ট্য থাকা উচিত তা বলা হয়েছে। একনজরে সেগুলো ছিল- ১. এক আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করা ২. পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করা ৩. আত্মীয়স্বজন অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরের হক আদায় ৪. বাজে খরচ না করা, অপচয়কারীরা শয়তানের ভাই ৫. আত্মীয়স্বজন মিসকিন ও মুসাফিরের হক আদায়ে সমর্থ না হলে তাদের সাথে নরমভাবে কথা বলা ৬. কার্পণ্য না করা আবার অপব্যয়ও না করা ৭. অভাবের ভয়ে সন্তান হত্যা না করা ৮. ব্যভিচারে লিপ্ত না হওয়া ৯. অন্যায়ভাবে কাউকে হত্যা না করা ১০. ইয়াতিমের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ না করা ১১. প্রতিশ্রুতি পালন করা ১২. ওজনে কম না দেয়া ১৩. যে  বিষয়ে জ্ঞান নেই সেই বিষয়ে  পেছনে না লাগা ১৪. জমিনে দম্ভ ভরে চলাফেরা না করা।
চার. কুরআনে বর্ণনা করা হয়েছে কিভাবে ফেরাউনকে বারবার সুযোগ দেয়া হলো এবং শেষ পর্যন্ত পানিতে সদলবলে ডুবিয়ে মারা হলো এবং তাকে অনাগত মানবতার সামনে একটি নিদর্শন বানিয়ে রাখা হলো। বর্ণনা করা হয়েছে নমরুদের ধনসম্পদ, প্রতাপের কাহিনী এবং ইবরাহিমের প্রতি তার নির্যাতনের কাহিনী এবং অবশেষে সামান্য মশার কবলে তার মৃত্যুর কাহিনী, গর্ত খননকারী শাসক, তাদের রোমহর্ষক হত্যাকাহিনী এবং তারপর তাদের ইতিহাস থেকে বিলুপ্ত হওয়ার কাহিনী। আইকাবাসী ও মাদিয়ানবাসীর অত্যাশ্চর্য সভ্যতার কথা ও খোদাদ্রোহিতার শাস্তিস্বরূপ তাদের পতন, লুদ জাতির নৈতিক অধঃপতন আর তার ফলে তাদেরকে উলটে দেয়ার ইতিহাস, নূহ নবীর সাথে তার জাতির দুর্ব্যবহার, ঐতিহাসিক বন্যায় জাতির বিভ্রান্ত মানুষদের ধ্বংস হওয়া এবং জাহাজে করে তার ও অনুসারীদের বেঁচে যাওয়া। কুরআনে ২৫ জন নবীর ঘটনা ও ইতিহাস বর্ণনা করা হয়েছে, তাদের স্ব স্ব জাতির অসদাচরণের বর্ণনা দেয়া হয়েছে, ওই জাতির পরিণতিও আলোচনা করা হয়েছে। আবার নবী সুলাইমান, দাউদ, সাবার রানীর কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে। ইউসুফ (আ)-এর ভাইদের অসদাচরণ, তার বেড়ে ওঠা, মিশরের মন্ত্রীর ঘরে থাকা, মন্ত্রীর স্ত্রী কর্তৃক তাকে কুপ্রস্তাবে রাজি করতে না পেরে জেলে প্রেরণ, তার মুক্তি, তার মন্ত্রী হওয়া, ষড়যন্ত্রী ভাইদের আবার তার কাছে ফিরে আসা, তার পিতার ছেলেকে ফিরে পাওয়াসহ পুরো কাহিনী বর্ণনা করা হয়েছে।
এসব বর্ণনার উদ্দেশ্য হলো সেখান থেকে পরবর্তী যুগের মানুষরা শিক্ষা লাভ করে নতুন সমাজ সভ্যতা ও সংস্কৃতির বুনিয়াদ সম্পর্কে স্রষ্টাপ্রদত্ত দিকনির্দেশনা উপলব্ধি করতে পারে।
পাঁচ. কুরআনে সূরা ফিলে একটি নিকট অতীতের কথা তুলে ধরা হয়েছে আরববাসীর সামনে। বলা হয়েছে, ‘তুমি কি দেখেছ হাতিওয়ালাদের সাথে তোমার স্রষ্টা কী আচরণ করেছেন?’ মুহাম্মদ (সা)-এর জন্মের কিছুদিন আগে এই ঘটনা ঘটে। ইয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা চেয়েছিলো কাবার দিক থেকে মানুষকে তার প্রতিষ্ঠিত একটি ইবাদতখানার দিকে আকৃষ্ট করতে। এ জন্য সে কাবা ধ্বংস করার মানসে এক বিশাল হাতিবাহিনী দিয়ে মক্কা আক্রমণ করতে আসে। তার পরাক্রম সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকায় ভয়ে কাবার মোতাওয়াল্লি আবদুল মুত্তালিব ও তার লোকজন কাবার মালিকের ওপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকেন। আবরাহা ও তার লোকজন কাবার অদূরে মিনা পর্যন্ত এলে তাদের হাতিগুলো বসে পড়ে এবং কিছুক্ষণের মধ্যে আকাশে একদল ছোট পাখি (আবাবিল) তাদের চঞ্চুতে করে ছোট ছোট পাথর বয়ে এনে তাদের গায়ে মারে। এসব ছোট ছোট পাথরের আঘাত ও প্রতিক্রিয়ায় হাতি ও তাদের পিঠে আরোহীগণ চর্বিত খাবারের মতো ধুলায় মিশে যায়। এমন একটি তাজা ঘটনা বর্ণনা করার ফলে কুরাইশদের তা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ ছিল না। তাদের আবালবৃদ্ধবনিতা এই ঘটনা জানত।
কুরআনে এই কাবাঘর প্রতিষ্ঠার ইতিহাসও বর্ণনা করা হয়েছে। জনমানবহীন মরুপ্রান্তরে শিশু ইসমাইলকে তার মায়ের সাথে রেখে যাওয়া, ক্ষুধাকাতর তৃষ্ণার্ত ইসমাইলের কান্নায় পদাঘাতে ‘জমজমের’ উৎপত্তি, তাকে কেন্দ্র করে মানুষের বসতি গড়ে ওঠা, পিতা-পুত্রের যৌথ পরিশ্রমে ‘কাবাঘর’ নির্মাণ, মিনায় পুত্র কোরবানির চেষ্টা এবং তাকে কেন্দ্র করে পশু কোরবানির সংস্কৃতি গড়ে ওঠাসহ সামগ্রিকভাবে একটি মুসলিম মিল্লাতের পত্তন, তাদের সভ্যতার ধারাবাহিকতার সূচনা ও বিকাশ- এসব কিছুই কুরআনে বিভিন্নভাবে বর্ণনা করা হয়েছে।

কুরআনের ইতিহাস বর্ণনার কয়েকটি অন্যতম বৈশিষ্ট্যও অনুধাবনযোগ্য
এক. কুরআন যতগুলো ইতিহাস বর্ণনা করেছে তাতে কোনরকম কমতি বা ঘাটতি নেই। কেবলমাত্র সংঘটিত ঘটনার সঠিক চিত্রই তুলে ধরা হয়েছে। অতিশায়ন কিংবা কমানোর কোন সুযোগ রাখা হয়নি।
দুই. ইতিহাস বর্ণনা করেই বলা হয়েছে এ ইতিহাসের ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ নেয়ার কেউ আছে কি না। কোনো কালে কেউ সে চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেনি।
তিন. কুরআন বর্ণিত ইতিহাসের নিদর্শনসমূহ প্রাকৃতিকভাবে সংরক্ষিত। ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিসমূহ, তাদের সভ্যতা, সংস্কৃতির অনেক নিদর্শন বর্তমানের প্রতœতাত্ত্বিক গবেষণা, লেসার গবেষণার মাধ্যমে অনেক ছোট ছোট অতীতের শিলালিপি, মুদ্রা ইত্যাদি খোঁজ পাওয়া যায়। বর্তমানে মিশরের পিরামিড, পেত্রার শিলা পর্বতে খোদাই করা শহর-দালান কোঠা, খেলার মাঠ, স্টেডিয়াম, আবিষ্কৃত ফেরাউনের মমি, আরদুল কুরআন বা কুরআনে বর্ণিত স্থানসমূহে বিরাজমান বিভিন্ন বস্তু ও বিষয় নিয়ে গবেষণা ও লেখালেখি হচ্ছে।
এ স্থানে আমরা দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই কুরআন মানবসভ্যতার বড় বড় ইতিহাসকে সম্পূর্ণ অবিকৃত রেখে বর্ণনা করেছে। আধুনিক ইতিহাসের ছাত্র-শিক্ষকগণ বিপর্যস্ত মানবতাকে রক্ষা করতে হলে ইতিহাস বর্ণনা, রচনা, সংরক্ষণ ও চর্চার ক্ষেত্রে কুরআনের শৈলী (Quranic Style) মেনে চলতে পারেন।

ইতিহাসের উপাদান
ইতিহাস মানবকে নিয়ে কাজ করে। এখানে মানুষের জৈব ও মানস সত্তার বিকাশ, আর্থসামাজিক-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা, ধর্ম, শিক্ষা, খেলাধুলা, বিনোদন, জ্ঞান- বিজ্ঞান, সভ্যতার পথে পথে বেড়ে ওঠা এসব কিছুরই আলোচনা থাকে।
মানব ইতিহাসের অনেক সভ্যতার সাক্ষাৎ আমরা পাই। ইতিহাসে এসব সভ্যতার একটি নির্দিষ্ট সময়কাল নির্ধারণ করা আছে, যেসব এলাকায় বা স্থানে মানুষ ঐ সভ্যতার প্রাবল্য দেখতে পায় তা-ও স্থির হয়ে আছে। একই স্থানে রয়েছে সভ্যতার জীবনকাল। একটি সভ্যতার যেমন রয়েছে জন্ম, তেমনি রয়েছে ধীরে ধীরে তার শীর্ষ অবস্থানে পৌঁছানোর তীব্রতার ক্রমধারা এবং আবার সেই শীর্ষবিন্দু থেকে উলটো নিয়মে ধ্বংসের পশ্চাদযাত্রার ঘটনাও। একত্রিত সময়কালের মধ্যে সভ্যতার জন্ম-বৃদ্ধি-পতনের চক্র শেষ হয়।
ইতিহাসের প্রথম ও প্রধান উপাদান সত্যবাদিতা। এ সত্যনিষ্ঠতা অতীতের ঘটনাকে নিখাদভাবে তুলে ধরতে সহায়তা করে। সত্যিকারের ইতিহাস স্মৃতিকথা নয় আবার নয় কেবল ঘটনা, কার্যক্রম বা দিবসসমূহের সাদামাটা সমষ্টি। ‘সত্য নয়’ এমন কিছুকেই যেমন ইতিহাস গ্রহণ করে না, আবার সকল ছোট ছোট সত্য ঘটনা ও লেনদেনকে আমলে নেয় না। Lord Bdingbroke এর কথায় বলা যায়- ‘History is philosophy teaching by example’. আবার Shakespeare এর ভাষায় তা অন্যরকম-
‘There is history in all men’s lives,
Figuring the nature of the times deceased,
The which obraerrd, a men may prophesy,
With a near aim, of the main chance of things.
যাহোক, ইতিহাস কেবল আহরণ দিয়ে শিক্ষাদানের দর্শন নয়। ইতিহাস জ্ঞান, শিল্পকলা, আচার আচরণ ও মানবিক প্রয়াসের যে ধারাবাহিক উন্নতি-প্রাগ্রসরতার বর্ণনা।
ইতিহাসের মুখ্য দু’টি উৎস রয়েছে যার একটি হচ্ছে বিধিবদ্ধ আইন এবং অপরাধ বিচারিক আদালতের কার্যবিবরণী।
ইতিহাসের একটি কাজ হলো বর্তমানের একটি সভ্যতা বা জাতি অতীতের একটি বড় সভ্যতা বা জাতির সাথে কতটুকু সামঞ্জস্যশীল বা ব্যতিক্রমী তা অনুসন্ধান করা। মানবের অতীতের সাথে পরিচিতি (acquintana) হচ্ছে এই জ্ঞান অন্বেষার পথ।

মানুষের সীমাবদ্ধতা ও তার
ইতিহাসের সঙ্কট
মানবের রয়েছে অনেক মানবিক সীমাবদ্ধতা। জ্ঞান-বিজ্ঞান প্রযুক্তির অত্যাশ্চর্য বিকাশের পরও মানুষ স্বীকার করতে বাধ্য, মানুষ মাত্রই মরণশীল (Man is mortal), মানুষ মাত্রেই ভুল (To err is human), ব্যক্তিজীবনে মানুষ খুবই সীমাবদ্ধ এক প্রাণী। নির্দিষ্ট তার হায়াতে জিন্দেগি। শৈশবে ও বার্ধ্যকে সে এক অসহায় প্রাণী যদিও যৌবনে দুর্দান্ত প্রতাপময়। তার দৈহিক সৌষ্ঠব, সৌন্দর্য, শক্তি, সম্পদ সবকিছুই হেন, দুর্বল ও অসহায়।
একটি সভ্যতা যখন যৌবনে থাকে তখন ঐ সভ্যতার ধারক বাহক ও শাসকগোষ্ঠী তার ইতিহাস রচনাকার। বিশেষ করে কাগজ-কলম-কালির আবিষ্কার, মানুষের প্রথাগত ইতিহাস রচনার সূচনা ও বিকাশ লাভ করার পর একটি বিশেষ প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর ছাপাখানা, ইলেকট্রনিক মুদ্রণপ্রক্রিয়ার, বর্তমানে সামাজিক মাধ্যমসমূহ, সাইবার বিশ্বের গতিশীলতা এই কাজটিকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। সময়ের সাথে সাথে এখন চলছে একটি অসুস্থ প্রবণতা। আর তা হলো ইতিহাস বিকৃতি। এই বিষয়টি একটু আলোচনা ও অনুধাবনের দাবি রাখে। একটি প্রতিষ্ঠিত প্রবচন রয়েছে আধুনিক বিশ্বে History is written by the victors, বিজয়ীরাই ইতিহাসের স্রষ্টা বা রচয়িতা।
একটি বিজিত জাতির ওপর প্রবল পরাক্রমে বিজয়ী হয়ে গেলে বিজয়ী জাতির জয়জয়কার শুরু হয়। তখন ঐ বিজয়ী জাতি তাদের দেশের ও সমাজের একটি নতুন ইতিহাস শেখে। এটির জন্য আমাদেরকে অনেক দূর যেতে হবে না। হাতের কাছে রয়েছে ভূরি ভূরি উদাহরণ।
ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫০০ বছর মুসলমানগণ শাসন করে। তাদের শাসনামলে এ দেশে হিন্দুগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকলেও সংখ্যালঘিষ্ঠ মুসলিমগণ তাদেরকে সামাজিকভাবে মর্যাদা, সম্মান, রাজদরবারে চাকরি-বাকরি, শিক্ষা-দীক্ষা ও ব্যবসা বাণিজ্যে অবাধ সুযোগ দিয়েছিল। মুসলিমগণ রাষ্ট্রের ও রাজকার্যের ভাষণ হিসেবে ফার্সি ব্যবহার করতেন। এখানে অনেক মসজিদ, মক্তব, খানকাহ, মাদ্রাসা গড়ে উঠেছিল। সামাজিক আচার আচরণে মুসলিম সংস্কৃতির প্রভাব ছিল। ফলে তখন ইতিহাসের যে বই-পুস্তিকা ছিল তাতে মুসলিম শাসকদের কীর্তিগাথা উল্লেখ ছিল।
কিন্তু যখনই ব্রিটিশরা বণিকবেশে এসে ১৭৫৭ সালে এখানকার রাজ্য দখল করে নিলো, রাজদন্ড হাতে তুলে নিলো, তখনই পর্যায়ক্রমে এখানকার সকল সামাজিক প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি, আচার-আচরণ পরিবর্তিত হয়ে ব্রিটিশ ঘরানায় রূপান্তরিত হয়ে গেলো। যেহেতু বিজিত মুসলমানদের ক্ষমতা, জমি-জমা, ব্যবসা-বাণিজ্য, চাকরি-বাকরি সব কিছু পর্যায়ক্রমে এদেশীয় দোসর, হিন্দু সম্প্রদায়ের হাতে চলে যায় সেহেতু তাদের একটি প্রভাব সব কিছুতেই লক্ষ্য করা যায়। ক্ষমতা দখলের ৭৮ বছর পর ইংরেজগণ বদলে ফেলে শিক্ষাব্যবস্থা আর এই বদলে ফেলার সাথে সাথেই বদলে যেতে থাকে ইতিহাস রচনা ও বর্ণনার ধরন। সিলেবাস বদলে গেলো খুব দ্রুত।
সভ্যতার ইতিহাস যেন কেবল ব্রিটিশেরই তৈরি আর মুসলিমরা হয়ে গেলো অসভ্য, বর্বর একটি জাতি, যাদের নেই কোনো ইতিহাস, নেই কোন সমাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি কিংবা অন্য কোনো উল্লেখযোগ্য বিষয়।

১৯৪৭ সালে ভারত ও
পাকিস্তানের জন্ম
দুই দেশে আলাদা আলাদা ইতিহাসের যাত্রা শুরু হলো। পাকিস্তানের ইতিহাস বইয়ে মুসলিম ইতিহাস একরকম, আর ভারতের ইতিহাসে অন্য রকম। সেই যে অখন্ড ভারত যেখানে ৫০০ বছর শাসন করলো মুসলমান, রক্ষা করলো সকল জাতি-ধর্ম ও বর্ণের মানুষের ইজ্জত-সম্মান-আবরু, দিল তাদেরকে আর্থসামাজিক-সাংস্কৃতিক সর্বাধিকার ও সুযোগ, সেই ইতিহাসটাই পাল্টে গেলো। ভারতীয় বইপুস্তকে কেবলই মুসলিম শাসকদের রক্ত লোলুপতা, মন্দিরকে মসজিদ বানানো, হিন্দুকে প্রভাব খাটিয়ে মুসলিম বানানোর সব আজগুবি কাহিনী রচিত হলো। বিজিত বলে মুসলমান সেখানে কিছুই বলতে পারলো না।

এবার তাকানো যাক বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে
১৯৭১ সালে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও একসাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলাদেশ লাভ করেছে স্বাধীন ভূখন্ড, লাল-সবুজ পতাকা ও দেশ চালানোর ম্যান্ডেট। বিগত ৪৩ বছরে বাংলাদেশ বেশ ক’বার ক্ষমতার হাতবদল হয়েছে। ক্ষমতার এই হাতবদলের মধ্যেই বেশ ক’বার ইতিহাস নিয়ে হয়েছে নতুন নতুন বিতর্ক ও সঙ্ঘাত। ইতিহাস কি তাহলে কোন দালিলিক প্রমাণ ছাড়াই রচনা করা হচ্ছে?
এখনো আমরা ক্রমাগত বিতর্ক করছিÑ স্বাধীনতার ঘোষক কে? কত মা-বোন প্রাণ হারিয়েছেন মহান মুক্তিযুদ্ধে? ৩০ লক্ষ শহীদের কি কোন তালিকা আছে কিংবা সত্যিকারের একটি তালিকা যা পরিষ্কার করে বলে  দেবে কত মানুষ শহীদ হয়েছিলেন সে সময়? ১৯৭২ থেকে ১৯৭৫ এর ইতিহাস নিয়ে আমরা কি ঐকমত্যে পৌঁছাতে পেরেছি?
এভাবে ক্ষমতার হাতবদলে যারাই ক্ষমতায় এসেছেন প্রত্যেকেই আগের সরকারের ব্যর্থতার খতিয়ান, দুঃশাসনের ইতিবৃত্ত বর্ণনা করেছেন এবং করছেন।
আসলে এতে করে কখনো কি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন সত্যিকারের ইতিহাসের সন্ধান পাবে?
সব শাসকের দাবি তারাই সত্যিকারের ইতিহাস উপহার দিচ্ছে। ইতিহাস রচিত হবে ঐতিহাসিকদের হাতে, সত্যনিষ্ঠতার সাথে, বস্তুনিষ্ঠভাবে, দলমত নিরপেক্ষ থেকে? সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য কিছু সংখ্যক ঐতিহাসিকের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ইতিহাস কমিটি  তৈরি কি খুব কঠিন কাজ? আমরা কি পারবো- বিজয়ী-বিজিতের মনোভাব পরিহার করে দেশপ্রেমিকের সৎসাহস নিয়ে এগিয়ে আসতে?
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সময়ে একজন খুনি কসাই কাদেরের দায় চাপানো হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পর কৃতিত্বের সাথে পাস করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যম্পাসে অবস্থিত উদয়ন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের কয়েকবারের নির্বাচিত সহসভাপতি, সিনিয়র সাংবাদিক নেতা- আব্দুল কাদের মোল্লার ওপর। মুক্তিযুদ্ধকালীন পিরোজপুরের পারেরহাটের একজন দেলু রাজাকারের দায় চাপানো হয়েছে স্বাধীনতার পর একটানা তিন দশক বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে কুরআনের তাফসিরকারক, নির্বাচিত সংসদ সদস্য দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ওপর। আমি জানি না ভবিষ্যতে ইতিহাসে এগুলো কিভাবে লেখা হবে। ইতিহাস কি কাউকে ক্ষমা করে? নির্মম নিষ্ঠুর ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। সত্য তার নিজস্ব শক্তিতে একসময় না একসময় প্রতিভাত হবেই।

ইতিহাস বিকৃতি মানবের এক বিকৃত রুচির পরিচায়ক
এই সীমাবদ্ধতা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে কোনো জাতিই মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে না। দৃষ্টি প্রসারিত করে যদি একবার তাকাই ইরানের দিকে, তুরস্কের দিকে, মিশরের দিকে, ফিলিস্তিনের দিকে, ইসরাইলের দিকে, বলকানের দিকে, রাশিয়ার দিকে, আফগানিস্তানের দিকে, ইরাক, কুয়েতের দিকে- যেদিকে তাকাই সেদিকেই দেখি বিজিতের ওপর বিজয়ীর প্রতিশোধ নেয়ার পালা। একটি নিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা বলা খুব জরুরি মনে করছিÑ বিশ্বায়ন ও প্রযুক্তির এই যুগে সত্য কিন্তু আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে বেরিয়ে আসবে। শাসকেরা যতই চরিত্র নিয়ে ইতিহাস বিকৃত করুক না কেন উইকিলিকস কিংবা তার চাইতে ভয়ঙ্কর সুন্দর কোনো মাধ্যম তাদের দিকে করুণার হাসি হেসে ইতিহাসের বিকৃত অধ্যায়গুলোর প্রকৃত পাঠোদ্ধার করেই আসবে।

ইতিহাস কি সত্যি সত্যি পুনরাবৃত্ত হয়
শৈশব থেকে জেনে এসেছি History repeats itself. কিন্তু কখনো তার সত্যাসত্য নিয়ে ভাবিনি। এখন ভাবতে হচ্ছে। ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হওয়ার মানে কী?
এর মানে কি এমন যে, একবার আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলমুক্ত হয়ে স্বাধীন হওয়ার জন্য লড়াই করেছিলাম ১৯৭১ এ এবং অসংখ্য শহীদের জীবনের বিনিময়ে স্বাধীনতা লাভ করেছিলাম। এখন কি আবারও আরেকটি লড়াই জরুরি হয়ে পড়বে সে দেশের মানুষকে সত্যিকারের স্বাধীনতা দেয়ার জন্য? ইতিহাস পুনরাবৃত্ত হোক না হোক, ঘুরে ফিরে ক্ষমতার হাতবদল হয়। আজ যারা ক্ষমতায় কয়েক বছর পর তারা বিরোধী দলে, আবার যারা আজ বিরোধী দলে তারাই কয়েক বছর পর ক্ষমতায়।
সেই বিখ্যাত কথাটা কিন্তু সত্যি হয়ে রইলো- ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা লাভ করে না। নমরুদ থেকে শিক্ষা নেয়নি ফেরাউন, ফেরাউনের কাছ থেকে শিক্ষা নেয়নি কিসরা ও কায়সার, কিসরা থেকে শিক্ষা নেয়নি রেজা শাহ পাহলভী। আমাদের যেন ঘোর কাটাদশা। ইতিহাস আমাদের মগজ খুলছে না। আমরা যেই তিমিরে সেই তিমিরে থাকাটাই পছন্দ করছি। ঘুরে ফিরে হালাকু খান, চেঙ্গিস খানের প্রেতাত্মা আমাদের রাহুর মতো ভর করে আসছে। (চলবে)

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply