ইতিহাস নিয়ে কিছু কথা -এবনে গোলাম সামাদ

প্রতিটি জাতি গড়ে ওঠে ইতিহাসের নানা ঘটনার ঘাত-প্রতিঘাতে। অতীতকে বাদ দিয়ে কোনো জাতির বর্তমানকে ব্যাখ্যা করা চলে না। আমরা বর্তমানকে ব্যাখ্যা করতে যেয়ে ঘরোয়াভাবে অতীত নিয়ে কিছু কথা বলতে চাচ্ছি। আমাদের এই আলোচনার উদ্দেশ্য হবে অতীতের ছকে ফেলে বর্তমানের বিশ্লেষণ। কারণ, অতীতকে এখন নানাভাবে চেপে যাবার চেষ্টা হচ্ছে বিশেষ রাজনৈতিক কারণে, যার নির্মোক উন্মোচন প্রয়োজন। একটা বিষয়কে মনে করা যায় স্বতঃসিদ্ধ। তা হলো, আজকের বাংলাদেশের উদ্ভব হতে পেরেছে পাকিস্তান আন্দোলনের ফলে। পাকিস্তান আন্দোলনের ভিত্তি ছিল মুসলিম জাতীয়তাবাদ, যা গড়ে উঠেছিল ব্রিটিশ শাসনামলে এই উপমহাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে। এই উপমহাদেশ ব্রিটিশ শাসনের আওতাভুক্ত না হলে হয়তো এই মুসলিম জাতীয়তাবাদের উদ্ভব হতো না। কারণ, মুসলিম শাসনামলে কখনই কোনো মুসলমান নৃপতি মুসলিম জাতীয়তাবাদের কথা বলেননি। আমরা জাতীয়তাবাদের ধারণা পেয়েছি ইউরোপের কাছ থেকে, ব্রিটিশ শাসনামলে। জেম্স মিল (ঔধসবং গরষষ) প্রথম ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস নিয়ে একটি বিখ্যাত ইতিহাস বই রচনা করেন। বইটির নাম ছিল ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ইৎরঃরংয ওহফরধ (১৮১৭)। জেমস মিল হলেন বিখ্যাত ব্রিটিশ দার্শনিক, অর্থনীতিবিদ এবং রাজনীতিবিদ স্টুয়ার্ট মিলের পিতা। জেমস মিল ছিলেন বিলাতের লিবারেল পার্টির সমর্থক। এক সময় লিবারেল পার্টি বিলাতে ছিল খুবই শক্তিশালী রাজনৈতিক দল।
ইসলাম একটি আন্তর্জাতিক ধর্ম। এই উপমহাদেশ তার উদ্ভব-ভূমি নয়। কিন্তু যে বিশেষ মুসলিম জাতীয়তাবাদকে নির্ভর করে এই উপমহাদেশে পাকিস্তান আন্দোলন শুরু হতে পেরেছিল তার জন্ম হয়েছিল এই উপমহাদেশেই। ধর্ম হিসেবে ইসলাম আর মুসলিম জাতীয়তাবাদ একই আবেগের ফল নয়। মুসলিম জাতীয়তাবাদ ছিল একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা। ঠিক ধর্মীয় বাস্তবতা নয়। যারা পাকিস্তান আন্দোলন করেছিলেন তারা সকলেই ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত। কোনো মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক পাকিস্তান আন্দোলনের নেতৃত্ব প্রদান করেননি। বরং দেওবন্দি মাওলানারা করেছেন পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা। দেওবন্দ হলো ভারতের উত্তর প্রদেশে অবস্থিত একটি জায়গার নাম। এখানকার মুসলিম ধর্মীয় বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এই উপমহাদেশর সুন্নি মুসলমানদের কুরআন-হাদিস চর্চার প্রাণকেন্দ্র। পাকিস্তান আন্দোলনের নেতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ সুন্নি মাজহাবভুক্ত ছিলেন না। তিনি ছিলেন শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত। শিয়ারা বেশ কয়েকটি ফিরকায় বিভক্ত। জিন্নাহ যে ফিরকায় জন্মেছিলেন তা খাতেমুন নব্যিয়াতে বিশ্বাস করে না। দেওবন্দি মাওলানারা এই জন্য ছিলেন জিন্নাহর ঘোর বিরোধী। কিন্তু জিন্নাহর নেতৃত্বে পাকিস্তান আন্দোলন পরিচালিত ও সফল হতে পেরেছিল। বাংলাভাষী মুসলমান পাকিস্তান আন্দোলনে সাড়া দিয়েছিলেন। তাই শেষ পর্যন্ত হতে পেরেছিল পূর্ব পাকিস্তান। পাকিস্তানের ধারণা ও পাকিস্তান আন্দোলন তাদের ওপর কেউ জোর করে চাপিয়ে দেয়নি। শেখ মুজিবুর রহমান ছাত্রজীবনে মুসলিম ছাত্র লীগের একজন উল্লেখযোগ্য নেতা ছিলেন। তিনি সক্রিয়ভাবে পাকিস্তান আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। শেখ মুজিব জন্মেছিলেন পূর্ব বাংলায়। বর্তমানে যা পরিচিত গোপালগঞ্জ জেলা হিসেবে। কিন্তু তিনি লেখাপড়া শেখেন কলকাতায়। তিনি ছাত্র ছিলেন তদানীন্তন কলকাতার ইসলামী কলেজের। এই কলেজের ছাত্ররা পাকিস্তান আন্দোলনে পালন করেছিল সক্রিয় ভূমিকা। এটা হলো প্রকৃত ইতিহাস। শেখ মুজিব ছিলেন মুসলিম জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের কথা বলেছেন অনেক পরে। যদিও তাঁকে বলা হচ্ছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের জনক, যা প্রকৃত ইতিহাস নয়। জনাব তাজউদ্দীন এক সময় ছিলেন ছাত্রলীগের নেতা। তিনিও সমর্থন করেছেন পাকিস্তান আন্দোলনকে। কিন্তু তার মধ্যে গোড়া থেকেই কাজ করেছে বাম চেতনা। অনেক বামপন্থী এক সময় ঢুকে পড়েন মুসলিম লীগে। এ এক বিচিত্র ইতিহাস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই উপমহাদেশের কম্যুনিস্টরা পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন করেন। তাদের এই সমর্থনের একটা কারণ ছিল, ব্রিটিশ ভারতের সেনাবাহিনীতে ছিল মুসলিম প্রাধান্য। কম্যুনিস্টরা এই সময় চেয়েছিলেন এই উপমহাদেশর মুসলমানরা ব্রিটেনের পক্ষ নিয়ে জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করুক। কারণ এই যুদ্ধের সময় যদিও রাশিয়া প্রথমেই জাপানের সঙ্গে যুদ্ধ করতে যায়নি। তথাপি, যেহেতু জাপান ছিল জার্মানের মিত্র আর জার্মানের সঙ্গে হচ্ছিল রাশিয়ার যুদ্ধ। তাই এই উপমহাদেশর কম্যুনিস্টরা চেয়েছিলেন ইংরেজের বিজয়। তারা বলেছিলেন, মুসলমানদের এই উপমহাদেশে আছে পৃথক জাতিসত্তা। আর তাই তাদের আছে পৃথক রাষ্ট্রগঠনের অধিকার। যা তারা পরে আর স্বীকার করেননি। তারা ১৯৪৭ সালের ২৭ এপ্রিল শরৎচন্দ্র বসু ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী যে পৃথক স্বাধীন বাংলাদেশের দাবি উত্থাপন করেন, তাকে সমর্থন জানাননি। জ্যোতি বসুও আর একজন কম্যুনিস্ট ছিলেন তখনকার বাংলা প্রদেশের আইনসভার সদস্য। তারা আইনসভায় ভোট দেন বাংলা প্রদেশকে বিভক্ত করার পক্ষে। তাজউদ্দীন এবং শেখ মুজিবের চিন্তাধারা এক খাতে প্রবাহিত হয়নি। এর একটি কারণ হলো তাজউদ্দীন যুক্ত ছিলেন কম্যুনিস্টদের সঙ্গে। কিন্তু শেখ মুজিব কোনো দিনই তার ছাত্রজীবনে বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না। তাজউদ্দীন তার ছাত্রজীবনের এক পর্যায়ে পড়াশোনা করেছেন খ্রিস্টান মিশনারি কলেজে। তিনি খ্রিস্টান চিন্তা-চেতনার দ্বারাও ছিলেন কিছুটা প্রভাবিত। কিন্তু শেখ মুজিবের ওপর এরকম কোনো প্রভাব ছিল না। তাজউদ্দীন ১৯৭১-এ ভারতে যান। গঠন করেন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার। কিন্তু যে কারণেই হোক শেখ মুজিব ভারতে যাননি। যদিও তার পক্ষে ভারতে যাওয়া মোটেও অসম্ভব ছিল না। এই ইতিহাস খুবই জটিল। যার নেপথ্য কাহিনী এখনো আমরা জানি না। তবে এটুকু আমরা জানি যে, শেখ মুজিব এবং তাজউদ্দীনের মধ্যে পরে গুরুতর মতভেদ দেখা দেয়। শেখ মুজিব তাজউদ্দীনকে বাদ দেন তার মন্ত্রিসভা থেকে। সবচেয়ে যা জটিল মনে হয় তা হলো শেখ মুজিব কর্তৃক বাকশাল গঠন। কারণ, শেখ মুজিব আগাগোড়াই বলেছেন বহুদলীয় গণতন্ত্রের কথা। কিন্তু বাকশাল গঠিত হয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের একদলীয় সরকারের আদর্শের অনুকরণে। শেখ মুজিব ইতঃপূর্বেই বিশেষভাবে ছিলেন মার্কিনঘেঁষা। কিন্তু ১৯৭৫ সালে তিনি হয়ে পড়েন সোভিয়েত ইউনিয়নের অনুরক্ত। কেন কী কারণে তাঁর এই ভাবান্তর ঘটতে পেরেছিল সে ইতিহাস আমরা এখনো জানি না। কিন্তু এ কথা অনুমান করতে পারি যে, সেটা ছিল ঠাণ্ডা লড়াইয়ের যুগ। শেখ মুজিব যদি মার্কিন পক্ষ পরিত্যাগ না করতেন, তবে সম্ভবত তাঁকে তাঁর জীবনে ঐ রকম করুণ পরিণতির সম্মুখীন হতে হতো না। এই ইতিহাস এখনো বিশেষভাবে আলোচিত হয়নি। আমরা এ বিষয়ে জানি না প্রকৃত ইতিহাস। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলছেন, প্রকৃত ইতিহাস জানবার কথা। কিন্তু তিনি এই ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত কোনো প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেননি। যদি করেন তবে সেটা হবে বাংলাদেশের ইতিহাস লেখার ক্ষেত্রে বিশেষ সহায়ক। আওয়ামী লীগ বলছে প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতারা বলছেন না কেন বাকশাল গঠনে শেখ মুজিব উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধী চলেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে সহযোগিতা করে। কিন্তু তাই বলে তিনি সোভিয়েত কম্যুনিস্ট পার্টির অনুকরণে ভারতে কোন এক দলের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চাননি। চেয়েছেন গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে। শেখ মুজিবও পারতেন বাংলাদেশে একই পন্থা অনুসরণ করতে। কিন্তু তিনি সেটা না করে উদ্যোগ নেন এক দলের রাজত্ব গড়বার।
আমরা প্রকৃত ইতিহাস জানতে চাই। আওয়ামী লীগের উচিত হবে দেশবাসীর কাছে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরা। কারণ, তারা আছেন ক্ষমতায়। আর শেখ মুজিব ছিলেন তাদের নেতা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠছে, তারা প্রকৃত প্রস্তাবে গণতন্ত্রী নন। তাদের মধ্যে এখনো কাজ করছে একদলের রাজত্বের দর্শন। যেটা নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হতে পারছে দেশবাসীর মনে। আওয়ামী লীগ এদেশের মানুষকে বোঝাতে চাচ্ছে যে, আজকের বাংলাদেশের ভিত্তি হলো বিশুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদ। কিন্তু বাংলা ভাষায় যারা কথা বলেন, তাদের শতকরা ৪০ ভাগ বাস করেন ভারতে। আর শতকরা ৬০ ভাগ বাস করেন বাংলাদেশে। ভারতের বাংলাভাষীরা ভাষার ভিত্তিতে একটা পৃথক রাষ্ট্র গড়তে চাচ্ছেন না। তারা সংযুক্ত থাকতে চাচ্ছেন ভারতের সঙ্গে। অন্যদিকে বাংলাদেশের বাংলাভাষীরা হতে চাচ্ছেন না ভারতীয়। তারা বজায় রাখতে চাচ্ছেন তাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। তাদের এই মনোভাবকে আওয়ামী লীগের বিশুদ্ধ বাঙালি জাতীয়তাবাদ দিয়ে কি ব্যাখ্যা করা চলে? কেন ও কী কারণে এই মনোভাব সৃষ্টি হতে পেরেছে তার ইতিহাস উপলব্ধি করা প্রয়োজন। আমাদের জাতীয় স্বার্থেই এই উপলব্ধির এখন বিশেষ প্রয়োজনীয়তা আছে। প্রত্যেক জাতির আছে নিজস্ব সমস্যা। সমস্যা আমাদেরও আছে। জাতি হিসেবে টিকতে হলে এসব সমস্যার সমাধান করতে হবে। অথবা করতে হবে এসব সমস্যার তীব্রতাকে কমিয়ে আনবার চেষ্টা। কিন্তু সেটা না করে আমরা যেন অতীত নিয়ে বড় বেশি টানাটানি করছি। সাবেক পাকিস্তান এখন আর নেই। আওয়ামী লীগ বলছে বিএনপি হলো পাকিস্তান ঘেঁষা দল। কিন্তু সে তা নয়। অন্যদিকে বিএনপি বলছে আওয়ামী লীগ হলো একটা ভারতপন্থী দল। তার হাতে শাসনক্ষমতা থাকলে এদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হতে বাধ্য। আমাদের সমস্ত চিন্তা-চেতনা যদি বিএনপি ও আওয়ামী লীগের এই কলহের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে তবে সেটা হয়ে উঠবে আমাদের জাতীয় সত্তা সুদৃঢ় হওয়ার পথে বিশেষ প্রতিবন্ধকতা। আমাদের থাকতে হবে সুস্পষ্ট জাতীয় নীতি। কেবল অতীত নিয়ে কথা কাটাকাটি করে একটা জাতি শক্তিশালী হতে পারে না। একটা জাতিকে বাঁচতে হয় ভবিষ্যতের ভাবনা ভেবেও।

SHARE