ইন্দো-মার্কিন কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং প্রাসঙ্গিক ভাবনা

মো: হাবিবুর রহমান হাবীব

বিশ্বব্যবস্থায় সময়ের আবর্তে ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তন খুবই স্বাভাবিক। এশিয়া অঞ্চলে এর প্রভাব ব্যাপক। ফলে ছোট ও দুর্বল দেশগুলোকে নিরাপত্তা, উন্নয়ন ও অন্যান্য দেশের সাথে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে নানা মাত্রার সমস্যা সব সময় মোকাবেলা করতে হয়। ৯/১১, ইন্দো-চীন আঞ্চলিক দ্বন্দ্ব, চীন-যুক্তরাষ্ট্র প্রতিযোগিতা, ইন্দো-মার্কিন কৌশলগত সম্পর্ক সব মিলিয়ে এশিয়ায় বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ার একটি জটিল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত অংশীদারিত্বের আলোচনা সামনে রেখে বর্তমান বিশ্বে পরাশক্তিসমূহ যে খেলায় মেতেছে, তার আলোকে বাংলাদেশের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন করার চেষ্টা করব।
বিষয়গুলো বুঝার স্বার্থে প্রথমে ৯/১১-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থার যে পরিবর্তন হয়েছে তা খেয়াল করি- থমাস বার্নেটের লিখা, “The Pentagon’s new map” মার্চ ২০০৩-এ এসকোয়ার ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। এতে তিনি ক্ষমতা ও উদ্বেগ বিষয় দু’টি Core ও Gap নামে ভৌগোলিক বিভাজনের ওপর ভিত্তি করে ব্যাখ্যা করেন। বিল ক্লিনটনের সময় বিশ্বায়নকে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত কার্যক্রম চলছিলো যা এখন সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্যের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে শাসন করার কৌশল দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে। বার্নেটের মতে, যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত সন্ত্রাসবাদী ও শয়তান রাষ্ট্রসমূহ core রাষ্ট্রসমূহের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি Functioning-core” এবং “Non-integrating Gap” নামে রাষ্ট্রসমূহকে যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের মূল্যবোধে বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী এই দু’টি বিষয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করেন। Gap চিহ্নিত দেশসমূহ যারা সন্ত্রাসবাদসহ সকল সমস্যার উৎপত্তিস্থল তাদের ব্যাপারে সহায়তা, যুদ্ধ, এমনকি দখল করে অবস্থান পরিবর্তন করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। “Non-integrating Gap” হচ্ছে সেই সব দেশে যারা এখনও খারাপ হয়নি বা স্বাভাবিকও নয়। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে উপদেশ দেন- যুক্তরাষ্ট্রের অবশ্যই core রাষ্ট্রের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে এবং চূড়ান্তভাবে “Non-integrating Gap” দেশসমূহের বিষয়ে হস্তক্ষেপ করতে হবে।
নতুন ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত ম্যাপটিতে পশ্চিমা বিশ্বের আওতাভুক্ত প্রতিটি দেশসহ চীন-ভারত দেশ দু’টিকে core এবং বাংলাদেশ, উত্তর কোরিয়া, কিউবাসহ মুসলিম বিশ্বের সকল দেশকে Gap-এর মধ্যে দেখানো হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তুরস্ক, আলজেরিয়া, মরক্কো, ভেনিজুয়েলাসহ ল্যাটিন ও মধ্য আমেরিকার কয়েকটি দেশকে মধ্যবর্তী বা “Non-integrating Gap”-এর মধ্যে দেখানো হয়েছে। “Clash of Civilization” বিষয়টি মাথায় রেখে গোপন উদ্দেশ্য মুসলিম বিশ্বের পতন, বিশ্বের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ ও চীনের উত্থান ঠেকানোর মধ্যে নিহিত।
একই সাথে মুসলিম বিশ্ব ও চীনের সাথে দ্বন্দ্বে না জড়িয়ে কৌশলে চীনকে তাদের দলভুক্ত দেখানো হয়েছে। চীনকে প্রতিহত করতে ভারতকে কাছে পাওয়ার জন্য তাকেও তাদের দলভুক্ত দেখানো হয়েছে। এমনিভাবে যুক্তরাষ্ট্রের একুশ শতকের ভূ-কৌশলগত নকশা নির্ণয় ও বাস্তবায়ন চলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন গোয়েন্দা রিপোর্ট যেমন, “Maping the Global Future” (2004), “National Defence Strategy” (2005), “The National Security Strategy” (2006) সহ সবগুলো রিপোর্টে স্পষ্ট করে বলা হয় যুক্তরাষ্ট্র যেকোন মূল্যে অর্থনীতি, রাজনীতি, সামরিক, প্রযুক্তি, সংস্কৃতিসহ সকল দিক দিয়ে বিশ্বের নেতৃত্ব রক্ষা করতে বদ্ধ পরিকর।
ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতি, সামরিক শক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতার বুলি, গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন, আয়তন, ভৌগোলিক অবস্থান ও বৃহৎ জনগোষ্ঠী দেশটিকে এশিয়ায় যে কোন পরাশক্তির জন্য কৌশলগত বন্ধু হিসেবে এক ধাপ এগিয়ে রাখে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন মার্চ ২০০৩- এ ভারত সফর করার সময় যে “ভিশন স্টেটমেন্ট’ স্বাক্ষর করেছেন তার মধ্য দিয়ে ইন্দো-মার্কিন নতুন অক্ষশক্তির আবির্ভাব হয়েছে মনে করা হয়। ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’ অনুযায়ী, এই উপমহাদেশে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য ইন্দো-মার্কিন আঁতাত কাজ করবে এবং এশিয়ার (অর্থাৎ চীনকে সামনে রেখে) স্ট্র্যাটেজিক স্থিতিশীলতার দায়িত্ব হবে ভারতের এই আঁতাতের ভিত্তিতেই, যা বাস্তবে রূপ নিতে থাকে ৯/১১-এর পর থেকেই। যুক্তরাষ্ট্রে ৯/১১ এবং ভারতে ২৬/১১ (মুম্বাই হামলা) দেশ দু’টিকে একই সাথে কাজ করতে তৎপর করেছে। অনেকের ধারণা ৯/১১ যুক্তরাষ্ট্রের নতুন বিশ্বব্যবস্থা গঠনের জন্য এবং ২৬/১১ ভারতকে বন্ধু হিসেবে ঘনিষ্ঠভাবে পাওয়ার জন্য একই সূত্র দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে(?)।
বুশের দ্বিতীয় মেয়াদে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ব্যাপক উন্নয়ন হয় দেশ দু’টি মূলত তাদের পরিপূরক স্বার্থের কারণেই একত্রিত হয়েছে। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র চায় শক্তিশালী ভারত আর ভারত চায় এশিয়ায় একক আধিপত্য।
তাদের সম্পর্ক যদি পরস্পরের পরিপূরক মনে করি তবে তা সংক্ষেপে পাঁচটি বিষয়ের মাধ্যমে বলা যায় সন্ত্রাসবাদ নিয়ন্ত্রণ, মধ্য এশিয়ার বাজার দখল ও নিয়ন্ত্রণ, জ্বালানি ও শক্তিসম্পদ নিয়ন্ত্রণ, চীনকে থামানো, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ, ভারত মহাসাগরে আধিপত্য রক্ষা এবং আঞ্চলিক ও বিশ্ব কর্তৃত্ব। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েলের ভাষ্য অনুযায়ী, “India has the potential to help keep the peace in the vast India Ocean and its periphery.” এর কারণ হিসেবে বলা চীনের মতো বৃহৎ উদীয়মান সুপার পাওয়ারকে রুখতে এমন শক্তির প্রয়োজন যা কেবল ভারতকে বিবেচনায় আনে।
ভারতকে উন্নত করতে যুক্তরাষ্ট্র, সামরিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তি, শিক্ষাসহ সব দিকে থেকে সহায়তা দিচ্ছে। হেনরি কিসিঞ্জারের ভাষায়, “To Prevent the rise of another dominant power to emerge between Singapore and Aden. And this is compatible with American interest.”
বিশ্বব্যবস্থায় কোন পক্ষ কখনও অন্য পক্ষকে ক্ষমতা দিয়ে দেয় না বরং ক্ষমতা নিয়ে নেয়, যা যুক্তরাষ্ট্র ভারতের মাধ্যমে সহজে পেতে ইচ্ছুক। ভারতও চেষ্টা করছে পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে। রাজনৈতিকভাবে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত সম্পর্ক দুটো পর্যায়ে চর্চা হবেÑ প্রথমত, দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধান প্রতি বছর শীর্ষ বৈঠক করবেন। দ্বিতীয়ত, দেশ দু’টি প্রতি বছর অন্ত একটি শীর্ষ সম্মেলনে মিলিত হবে। একই সাথে পররাষ্ট্র মন্ত্রীদ্বয় পররাষ্ট্র সংক্রান্ত আলোচনা করবেন। অর্থনৈতিকভাবে- দেশ দু’টি শীর্ষ পর্যায়ে একটি সমন্বয়ক গ্রুপ, অর্থ মন্ত্রীদ্বয়ের নেতৃত্বে ইন্দো-মার্কিন অর্থনৈতিক ফোরাম, বাণিজ্য মন্ত্রীদ্বয়ের নেতৃত্বে বাণিজ্য ফোরামের মাধ্যমে কৌশলগত অংশীদারিত্ব রক্ষা করবে।
দেশ দু’টির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কার্যক্রম বিশ্ব অর্থনীতি এবং পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের তাগিদের মধ্যে পরিষ্কার। যেখানে প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বহাল রাখার জন্য এক ধরনের আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব অনিবার্য।
সামরিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার দিক থেকে বিচার করলে দেখা যায়, FBI দিল্লিতে অফিস খোলার অনুমতি পেয়েছে ১৯৯৯ সালে। ভারত স্বাধীন হয় ১৯৪৭ সালে। অথচ এত দিনে তা সম্ভব হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন, ভারতের রাজনৈতিক ও কৌশলগত পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ ইন্দো-মার্কিন কৌশলগত ও নতুন আঞ্চলিক অক্ষশক্তি গড়ে তোলার শর্ত তৈরি করে দেয়। শুরুটা হয় উপসাগরীয় যুদ্ধে মার্কিন বিমানের মুম্বাইতে তেল নেয়ার অনুমতি দেয়া থেকে। ১৯৯৫ সালে ইন্দো-মার্কিন সামরিক সহায়তা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৯৮ সালে ভারতের পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার ফলে সম্পর্ক কিছুটা খারাপ হলেও সফল কূটনীতিক তৎপরতায় তা আবার ভালো হয়ে যায়।
যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে কিছুসংখ্যক পারমাণবিক বোমা রাখার অনুমতি দেয় No First Use Doctrine বা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রথমে ব্যবহার করবে না এই শর্তে। এপ্রিল ২০০১-এ ভারত যুক্তরাষ্ট্রের National Missile Defence Programme সমর্থন করে। জানুয়ারি ২০০২ থেকে মার্কিন সামরিক-কূটনৈতিক কর্মকর্তারা ভারতে আসছেন। সে সময় ওয়াশিংটনে বুশ-বাজপেয়ি শীর্ষ বৈঠক সম্পর্কে ভারত মন্তব্য করে ‘Most substantive and consequential in the history of Indo-US relations.’ ইন্দো-মার্কিন প্রতিরক্ষা আঁতাত তিনটি ক্ষেত্রে সম্প্রসারিত –
প্রতিরক্ষা সম্পর্কিত বাণিজ্য ও কৃৎকৌশলে সহযোগিতা;
সামরিক বাহিনীর সরাসরি সহযোগিতা বৃদ্ধি;
নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত নীতি ও অবস্থান মূল্যায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা।
তাদের সম্পর্কের সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- সম্পর্ক দ্রুত গভীর করা, ভারতের সাথে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক স্বার্থের অভিন্নতা প্রতিষ্ঠা ও সঙ্গতিপূর্ণ নীতি ও কৌশল চর্চা। পাকিস্তান নয়, ভারতই পুরো এশিয়া অঞ্চলে চীনসহ অন্যান্য শক্তিকে দমিয়ে রেখে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রধান মার্কিন অবলম্বন।
২০০৫ সালে ওয়াশিংটন ও নয়া দিল্লি ‘Defence Framework’ নামে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে যেখানে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য নিরাপত্তাই মূল ধরা হয়। ১৮ ডিসেম্বর ২০০৬ ভারতের সাথে বেসামরিক পারমাণবিক বাণিজ্য চুক্তি করে যুক্তরাষ্ট্র। এর কারণ হিসেবে Council of Foreign Affairs এর লেখক ইস্টার প্যান উল্লেখ করেন, ‘চীনের উত্থানের (মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদের ওপর প্রভাব) ফলে ঐ অঞ্চলে সাম্যাবস্থা আনার জন্য ভারতের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক গড়তে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে। সর্বশেষ হিলারি ক্লিনটন ও ভারতের বিদেশমন্ত্রী শ্রী এস এম কৃষ্ণা ৩ জুন, ২০১০ ওয়াশিংটনে ‘ndia-US Strategic Dialogue’ এ মিলিত হন এবং তাদের সম্পর্ক ওবামার ভাষায় একুশ শতকের ‘Defining Partnership’- এ রূপ নেয়।
তাদের এরূপ সম্পর্কে দুই পক্ষের স্বার্থের দিকে তাকানো যাক। ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান খেয়াল করি পশ্চিমে মুসলিম বিশ্বের দেশসমূহ (ইরান, পাকিস্তান), উত্তর-পশ্চিমে মধ্য এশিয়া, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, উত্তরে চীন, উত্তর-পূর্বে চীন, উত্তর কোরিয়া, প্রশান্ত মহাসাগর, দক্ষিণে ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ-পূর্বে বঙ্গোপসাগর, ইন্দোনেশিয়া, মালেশিয়া, গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ, পূর্বে বাংলাদেশে (প্রায় ভারতের মধ্যে) ও মিয়ানমার, কেন্দ্রে ভারত একটি বৃহৎ রাষ্ট্র।
কোন দেশ যখন কোথাও আক্রমণ বা তার অবস্থান স্থায়ী ও শক্তিবৃদ্ধি করতে চায় তখন অবশ্যই ঐ অঞ্চলে বৃহৎ কোন শক্তির সাহায্য একান্ত প্রয়োজন। চীন বর্তমান বিশ্বে দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ এবং আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অতিক্রম করে বিশ্বে এক নম্বর অর্থনীতির দেশে পরিণত হবে (The New York Times, Monday, August 16, 2010, www.nytimes.com)। মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়ায় তেল ও অন্যান্য সম্পদের ওপর চীনের প্রভাব ও ইচ্ছা লক্ষণীয়। চীনই একমাত্র দেশ যে ভবিষ্যৎ যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভুত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। চীন-রাশিয়ার মূল আদর্শ পুঁজিবাদের বিপরীত। সতর্কতার কারণে, ভারত-চীন-রাশিয়া ত্রীপক্ষীয় সম্পর্ক যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তোলার কারণ। তারা হয়তো গোপনে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা খর্ব করে বহু মেরু বিশ্ব গঠন করবে। চীন-রাশিয়া যদি ভবিষ্যতে একত্র হয় এবং ভারত তাতে যোগ দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ভরাডুবি নিশ্চিত। এমতাবস্থায়, যুক্তরাষ্ট্র জোরদার কূটনীতির মাধ্যমে ভারতকে (চীন-রাশিয়ার মূল্যবোধ ভারতের স্বার্থবিরোধী বুঝিয়ে) নিজের পক্ষে টানতে অত্যন্ত সচেষ্ট।
রিচার্ড নিক্সন যেমন চীনের সাথে সম্পর্ক গড়ে রাশিয়াকে থামানোর চেষ্টা করেছিল একই উপায়ে বুশ ভারতকে নিয়ে চীনকে থামানোর চেষ্টা করেছে (Beijing Review : Vol. 49, No. 11, March 16, 2006) যা ওবামা পূর্ণতা দিতে চলেছে।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার প্রাকৃতিক সম্পদ (তেল) নিজের করতে দেশ কয়েকটির মধ্যে দারুণ খেলা জমে উঠেছে। সবাই নিজের প্রভাব বিস্তারের লক্ষ্যে মিত্র বৃদ্ধি করতে তৎপর। যুক্তরাষ্ট্রের সেনা গোটা পৃথিবীতে থাকলেও দক্ষিণ এশিয়ায় নেই। যা আফগানিস্তান দিয়ে পাকিস্তান পর্যন্ত বি¯তৃত করে পাকিস্তানের পারমাণবিক ক্ষমতা হস্তগত করার মাধ্যমে ভারত মহাসাগরসহ পুরো এশিয়ায় দৃঢ় অবস্থান তৈরি করে নিজের জ্বালানি ও সম্পদের নিশ্চয়তা বিধান করতে যুক্তরাষ্ট্র সব দিক থেকে তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। সম্প্রতি ইরানের পরমাণু শক্তি বিষয়টি নতুন মাত্রা যোগ করেছে। এই অঞ্চলে কৌশলগত স্থিতিশীলতার জন্যই কী অস্ত্র প্রতিযোগিতা, সন্ত্রাসবাদের বিস্তার? চীন, উত্তর কোরিয়া, ইরান একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মাথাব্যথার কারণ। কারো একক আধিপত্য রুখতে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সাথে এই সম্পর্ক গড়েছে বলাই যুক্তিযুক্ত।
এবার ভারতের দিকে তাকানো যাক, ভারত নিজেকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক সুপার পাওয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের মতো সুপার পাওয়ারের সহায়তা একান্ত প্রয়োজন। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে স্থায়ী আসন লাভ ভারতের দীর্ঘ দিনের স্বপ্ন। ভারতের প্রতিযোগী চীন, চীনের প্রতিপক্ষ যুক্তরাষ্ট্র, সহজ কথা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্ব। পাক-ভারত সীমান্ত সমস্যা যুক্তরাষ্ট্রকে কাজে লাগিয়ে নিজের অনুকূলে সমাধান করে নিতে চায় ভারত। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে থেকে বল অনুভব করাসহ মধ্য এশিয়ার ব্যাপক প্রাকৃতিক সম্পদে ভাগ বসানো ও নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের স্থায়ী লক্ষ্য।
ইন্দো-চীন, ইন্দো-রাশিয়া বা চীন-ভারত-রাশিয়া এক ধরনের সম্পর্ক লক্ষ্য করা যায়। ভারতের সাথে এমনিভাবে প্রায় সব উন্নত দেশের কৌশলগত সম্পর্ক আছে, এমনকি ইরানের সাথেও। ভারত-রাশিয়া স্নায়ুযুদ্ধভিত্তিক সম্পর্ক এখন বাণিজ্যিক সম্পর্কে পরিণত হয়েছে। একই সাথে চীন ভারতের অন্যতম প্রধান বাণিজ্য অংশীদার। ভারতের স্বপ্ন এদের দু’জনের ওপরে ওঠা এবং তাদের সাথে কোন রকম বিরোধে না গিয়ে গা বাঁচিয়ে চলে কৌশলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসন লাভ করে নিজের অবস্থান জানান দেয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো একক পরাশক্তির সমর্থন ও সকলের সাথে শক্তিশালী বন্ধুত্ব অর্জন ভারতের বৈদেশিক নীতির অন্যতম অংশ। ভারত বহু মেরু বিশ্বে নিজেকে একটি মেরু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পছন্দ করে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে নিজের সমান মর্যাদার দেশ মনে করে।
বলা বাহুল্য, ভারত যেমন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তার স্থায়ী স্বার্থ হাসিলের জন্য অস্থায়ী বন্ধুত্বের ভিত্তিতে কাজ করছে তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে চাপের মুখে রেখে স্বার্থ হাসিলে মরিয়া। ড. মনমোহন সিং জুলাই ২০০৫-এ ওয়াশিংটনে বলেছিলেন, ‘India has a long term and strategic vision of relations with the US.’ মোট কথায় ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান, অর্থনৈতিক ইচ্ছা, আত্মমর্যাদা, আঞ্চলিক আধিপত্য, নিরাপত্তাসহ গোটা বিশ্ব নিয়ন্ত্রণের ইচ্ছা দেশ দু’টিকে একত্রে হাঁটতে শর্ত হিসেবে কাজ করছে।
এই বহুমুখী কৌশলগত খেলায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা, স্বার্থ, উন্নতি ও অন্যান্যদের সাথে বন্ধত্বসহ আত্মমর্যাদা নিয়ে বিশ্বব্যবস্থায় টিকে থাকা অবশ্যই প্রশ্নের মুখে।
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিষয়টি বুঝার জন্য বিশ্বের মানচিত্র আর একবার দেখে নিতে পারেন। বাংলাদেশ যেমন অর্থনীতি, বাণিজ্য ও উন্নয়নের ক্ষেত্রে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে তেমনি ভূ-রাজনৈতিক জটিলতার এই খেলায় সর্বস্ব হারাতে পারে। বাংলাদেশের উচিত এই ভূ-রাজনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থানকে ট্রাম কার্ড বানিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করা যা ক্ষতি নয় বরং আমাদেরকেই সবার ওপরে উঠতে সহায়তা করবে কারণ আমাদের কাছে সবার স্বার্থ ও বাধ্যবাধকতা আছে। আমাদের ওপর নয় বরং আমরাই সবার ওপর কথা বলতে পারি। এ জন্য জাতীয় শক্তি ও ঐক্যের কোনো বিকল্প নেই।
বাংলাদেশের মনে রাখা উচিত যে, তার চারপাশে ভারত, পাকিস্তান, চীন, উত্তর কোরিয়া এবং ইরান ও মিয়ানমার (হয়নি তবে হওয়ার সম্ভাবনা আছে) সবাই পারমাণবিক শক্তিধর, আয়তন ও প্রভাব অনেক এগিয়ে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ অনেক হাঙ্গরের মুখে যেখানে টিকে থাকাই সার্থকতা।
বঙ্গোপসাগরের কথা বিবেচনা করি। সেখানে ভারতের স্বার্থ অনেক বেশি। ভারত, চীন, পাকিস্তান, মিয়ানমার ও ভবিষ্যৎ প্রতিযোগী বাংলাদেশের ব্যাপারে ব্যাপক সচেতন। পাকিস্তান ও মিয়ানমারের মতো বাংলাদেশে চীন যেন গভীর সমুদ্রবন্দর গড়ার নামে নেভাল বেস গঠন করতে না পারে সে জন্য ভারত সচেষ্ট। অপর দিকে চীন বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে আগ্রহী। হরমুজ থেকে মালাক্কা প্রণালি গুরুত্বপূর্ণ তেল ট্রানজিট। ভারত এই সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এজন্য চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
চীন মিয়ানমারের সাথে যেমন ঘনিষ্ঠ বাংলাদেশকেও সে রকম ঘনিষ্ঠ হিসেবে পেতে চায়। এতে যেমন তার কৌশলগত অবস্থান তৈরি হবে, একই সাথে সমুদ্রবন্দর ও ট্রানজিট সুবিধার মাধ্যমে দেশটির অর্থনীতি আরো সমৃদ্ধ হবে। পাকিস্তান ও চীন ভারতের শত্র“ দেশ। মিয়ানমারের আদর্শ ভারতের আদর্শবিরোধী। ভারত ও সেভেন সিস্টারের সমন্বয়সহ সার্বিকভাবে ভারতের কাছে বাংলাদেশের গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি।
এই আলোচনার প্রেক্ষিতে, ট্রানজিট, চট্টগ্রাম বন্দর, এশিয়ান হাইওয়ে ইত্যাদি বিষয় যদি আমরা বিবেচনা করি সমীকরণ নিশ্চয়ই ভিন্ন দাঁড়াবে। এ ছাড়া ভারত ও চীন তাদের প্রতিবেশীদের সাথে কিভাবে আচরণ করছে সে বিষয়টিও বাংলাদেশের ভাবা উচিত। ভারতের প্রখ্যাত গবেষক ড. সুবাস কপিলের মতো অনেকেই মনে করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বাংলাদেশকে গভীর পর্যবেক্ষণে রেখেছে এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে চলেছে যাতে কল্পিত চীন-মিয়ানমার-পাকিস্তান-বাংলাদেশ শক্তিবলয় গঠিত হতে না পারে।
রাহুল বেদি, ‘India and China : Neighbourhood Problem’ নামে এশিয়ান টাইমস্-এ জানুয়ারি ১৭, ২০০৩ সালে একটি প্রবন্ধে বলেন, ‘from the brief study it is evident that Bay of Bengal is turning into an arena of rivalry between three principal contenders i.e. US and India apparently in one end China in opposite end’ সময় অনেক গড়িয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। ভারত যথাসাধ্য বাংলাদেশের ওপর বহুমুখী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় ব্যস্ত। চীনও বসে নেই। বাংলাদেশ আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক খেলায় অন্যতম ভূ-কৌশলগত উপাদানে পরিণত হয়েছে।
অবস্থা বিবেচনায়, চীন, ভারত দু’টি দেশ থেকে আমাদের সুবিধা আদায়সহ সম্পর্কে অবশ্যই ভারসাম্য আনতে হবে। কারো থেকে বিমুখ বা কারো প্রতি অতি ঝুঁকে পড়া অবশ্যই দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির জন্য যথেষ্ট হবে। প্রকৃতপক্ষে ভারসাম্য কথাটি আপেক্ষিক। আমরা যেমন ভারতকে বাদ দিয়ে সম্পর্ক বিবেচনা করতে পারি না, তেমনি চীনকে বাদ দিয়ে নিজের অবস্থান, নিরাপত্তা, উন্নয়ন অসম্ভব প্রায়। কারো স্বার্থের উপাদান না হয়ে বরং তাদেরকে বাধ্য করতে হবে আমাদের স্বার্থে আমাদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করতে। এ জন্য দক্ষ কূটনীতির কোন বিকল্প নেই।
মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ অবস্থার দিকে না তাকিয়ে দেশটির সাথে সম্পর্ক জোরদার করা একান্ত প্রয়োজন। দেশটির সাথে সমুদ্রসীমা নিয়ে সমস্যার সমাধান করতে চীনকে বিবেচনায় আনতে হবে। সমুদ্রসীমা ও রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে কূটনীতিক উপায় অবলম্বন করতে হবে।
ভারতের সাথে অমীমাংসিত সব বিষয়ে সমাধানের লক্ষ্যে কূটনীতিক তৎপরতার মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করতে হবে। ভারত যদি আমাদের বন্ধু মনে করে তবে আমাদের স্বার্থে জোড় গলায় তাদের সাথে আলোচনা করতে সমস্যা কোথায়। যেহেতু বাংলাদেশের সৃষ্টি থেকে ভারতের সাথে বিশ্বাসের ঘাটতি, বিষয়টি বিবেচনা করে কাজ করা উচিত।
এই সব সমস্যা সমাধান করতে, নির্দিষ্ট বৈদেশিক নীতি, ভবিষ্যৎ ও বর্তমান কৌশল নির্ণয়, দক্ষ কূটনীতিক মহল, জাতীয় ঐক্য ও ব্যাপকভিত্তিক গবেষণা একান্ত প্রয়োজন। এজন্য সরকারকে দায়িত্বশীল হতে হবে। দলীয় রাজনীতি আর জাতীয় স্বার্থ এক জিনিস নয়, বিষয়টিও মনে রাখা উচিত।
আমাদের প্রতিরক্ষা হতে হবে আত্মরক্ষামূলক। খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও পরিবেশ সমস্যা সমাধান, বিশ্বমানের শিক্ষা নিশ্চিত করাসহ সার্বিক উন্নয়নই হতে হবে আমাদের লক্ষ্য। সামরিকায়ন বা কারো দ্বারগ্রস্ত হয়ে নিরাপত্তার আশা নয় বরং সচেতন, প্রকৃত শিক্ষিত, আদর্শ দেশপ্রেমিক জনগণই প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তাসহ সকল উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু; যা এই দেশকে বিশ্ব দরবারে মর্যাদাশীল করতে একান্ত প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য এখন সময়ের পরীক্ষা চলছে। মনে রাখতে হবে, যে জাতি স্বপ্ন দেখতে জানে সে জাতি তা বাস্তবায়নও করতে জানে। এই স্বপ্ন দেখা ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব কার?
লেখক : আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply