ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসানবিশ্ব ইমাম খোমেনিকে প্রথমবারের মত চিনেছে ১৯৭৮ সালের শেষাশেষি, যখন ইরানের রাজতন্ত্রের বিরোধিতা করার কারণে তিনি ফ্রান্সে নির্বাসিত ছিলেন। প্যারিসের অদূরে বসে ইরানের শাহ মুহাম্মদ রেজা পাহলভির বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনির ঘোষিত যুদ্ধ এবং আমেরিকা বিরোধী কঠোর বক্তব্য এক অভূতপূর্ব মিডিয়া কাভারেজ এনে দিলো এবং ইমামকে বিংশ শতকের অন্যতম বিপ্লবী চরিত্র হিসেবে পরিচিত করলো। পত্র-পত্রিকা আর নিউজ বুলেটিনে তার ছবি ভরে উঠলো। এই ছবি বিশ্বের অসংখ্য মানুষের কাছে, বিশেষত পশ্চিমা বিশ্বের কাছে নিতান্তই অপরিচিত ছিলো। সাদা দাড়ি এবং কালো পাগড়িধারী এই মানুষটিকে দেখে মনে হতো যেনো ইতিহাসের পাতা থেকে সময় অতিক্রম করে বর্তমানে চলে এসেছেন। তার সমস্ত কিছুই ছিলো নতুন আর অপরিচিত। এমনকি তার নামটিও- ‘রুহুল্লাহ’। আর দুনিয়ার অসংখ্য পলিটিশিয়ান ও সাংবাদিকদের মনে যে প্রশ্নটি নাড়া দিয়ে যাচ্ছিলো, তা ছিলো: কী ধরনের বিপ্লবী মানুষ এই খোমেনি?
আবরাহাম লিঙ্কন, লেনিন, চার্চিল, হিটলার, মুসোলিনির মত বিপ্লবী থেকে শুরু করে আবদুল নাসের, নেহরু, ক্যাস্ট্রো হয়ে এমনকি চে গিভারার কথায় মুখর দুনিয়ার মাঝে খোমেনি ছিলেন ব্যতিক্রম। তিনি এমন এক ইসলামী বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, যার বিজয় ছিলো অবধারিত। তিনি কমিউনিস্ট ছিলেন না, ছিলেন না ক্যাপিটালিস্ট কিংবা ন্যাশনালিস্ট। প্রথমত তিনি ছিলেন একজন ইসলামী নেতা, দ্বিতীয়ত ইরানের জনগণের নেতা। তার শ্লোগান ছিলো- ‘পশ্চিমের মতও নয়, পূর্বের মতও নয়, শুধু ইসলামী প্রজাতন্ত্র চাই।’

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
তরুণ রুহুল্লাহ খোমেনি

জন্ম, শৈশব ও শিক্ষা

২৪ সেপ্টেম্বর, ১৯০২ সালে ইরানের খোমেন শহরের একটি সম্ভ্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ মুসাভি আল খোমেনি। ইমাম খোমেনির পিতার নাম ছিলো সাইয়্যেদ মোস্তফা মুসাভি আল খোমেনি। তিনি ছিলেন অত্যন্ত উঁচুদরের আলেম। ইরাকের নাজাফ ও সামেরায় পড়াশুনা করে একজন বিশিষ্ট মুজতাহিদ হিসেবে পরিচিত হন তিনি। খোমেইন প্রদেশে অত্যন্ত প্রভাবশালী ইসলামী নেতা ছিলেন তিনি। কিন্তু তৎকালীন অত্যাচারী জমিদার শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর কারণে তাকে নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। আর এ সময়েই জন্ম হয় তার তৃতীয় সন্তানের; সাইয়্যেদ রুহুল্লাহ আল মুসাভি আল খোমেনি। যিনি কালক্রমে হয়ে ওঠেন আয়াতুল্লাহ খোমেনি এবং একপর্যায়ে ইরানসহ সারা বিশ্বের অসংখ্য মুক্তিকামী মানুষের বিপ্লবের চেতনা; ইমাম খোমেনি।
সাত বছর বয়সে কুরআনের হাফেজ হন। পরবর্তী কয়েক বছরে গণিত শিক্ষা সমাপ্ত, সহপাঠীদের পড়া বুঝতে সাহায্য করার মাধ্যমে শিক্ষকতার আরম্ভ, খেলাখুলা, সাঁতার, দৌড়, ঘোড়ায় চড়া, এমনকি অস্ত্র পরিচালনা পর্যন্ত সবকিছুতেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী এবং অত্যন্ত দক্ষ হয়ে বেড়ে ওঠেন ইমাম খোমেনি। সে সময়ে ইরানকে সম্মিলিতভাবে শাসন করতো ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়া। রাশিয়ান বাহিনী আক্রমণ করলে আত্মরক্ষার জন্য ১২ বছর বয়সে বড় ভাইয়ের সাথে অস্ত্রও ধরেন তিনি।
১৫ বছর বয়সে মা মারা যান। এরপর ১৭ বছর বয়সে আরাকে গমন করে শেখ মুহাম্মদ গোলপায়গানির কাছে উচ্চতর যুক্তিবিদ্যা ও আব্বাস আরাকির কাছে শরহে লুময়া নামক ফিকহের বই অধ্যয়ন করেন। ১৮ বছর বয়সে ইরানের ধর্মীয় নগরী ‘কোমে’ গমন করেন ইমাম খোমেনি, যেখানে তাঁর বিপ্লবী জীবনের সূচনা হয়। সেখানে তিনি ফিকাহশাস্ত্রে উচ্চতর শিক্ষা লাভ করেন। তবে কোমের বেশিরভাগ আলেমই পলিটিকস থেকে সচেতন দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। এর কারণও ছিলো বটে। অত্যাচারী শাসকের বিরোধিতা করলে সে সময়ে গোটা মাদ্রাসা-ই বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা ছিলো। সুতরাং পণ্ডিতগণ কৌশলগত কারণে শরিয়াহ শিক্ষা দেয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তবে ইমাম খোমেনি মাঝে মাঝে তেহরানে যেতেন এবং আয়াতুল্লাহ হাসান আল মুদাররেস এর পলিটিক্যাল বিষয়ের লেকচার শুনতেন। আয়াতুল্লাহ হাসান আল মুদাররেস ছিলেন এ ব্যাপারে সমসাময়িক আলেমগণের ব্যতিক্রম।

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
রেজা শাহ পাহলভি

পাহলভি বংশের ক্ষমতা গ্রহণ

প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জয়লাভের পর ইরানে নতুন সরকার নিয়োগ করলো ব্রিটেন। সমর এবং অর্থ মন্ত্রণালয় সরাসরি ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হওয়ার আইনি বৈধতা লাভ করলো। ব্রিটেনকে নির্লজ্জভাবে সমর ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ দেয়ার কারণে মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়লো। শায়খ মুহাম্মাদ আল খায়বানি ও মির্জা কুজাক খান সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ব্রিটেন এক ইরানি সাংবাদিককে প্রাইম মিনিস্টার নিয়োগ করলো। আর এই নতুন প্রাইম মিনিস্টারের সাথে ষড়যন্ত্র করে আর্মি অফিসার রেজা শাহ ক্ষমতা দখল করে নিলো। ক্ষমতায় এসেই শুরু করলো বিরোধীমতের সকলকে গণগ্রেফতার।
১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে শুরু হলো রেজা শাহের শাসন। রেজা শাহ, ইমাম খোমেনির বিপ্লব যার ছেলের পতনের মাধ্যমে সাফল্য লাভ করে আরো প্রায় অর্ধশত বছর পরে। শুরু হলো ইরানে পাহলভি রাজবংশের শাসন। আর প্রায় একইসময়ে কোম নগরীর সুবিশাল ফায়জিয়া মাদ্রাসায় শুরু হলো ইমামের প্রাথমিক বিপ্লব, আর তা ছিলো তৎকালীন সর্বোচ্চ আলেমগণের কাছে তার চিন্তাভাবনা প্রকাশ করা এবং আলেমগণকে তার মতের স্বপক্ষে একত্রিত করা।

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
নবাব সাফাভিকে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে শহীদ করা হয়

জনগণ ও ইসলামের ওপর সর্বাত্মক আক্রমণ

রেজা শাহ দেশের মোট কৃষিজমির অর্ধেক নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নিয়ে সাধারণ কৃষকদের দাসে পরিণত করলো। এ ছাড়াও নানাভাবে চলতে থাকলো জনগণের ওপর অত্যাচার নির্যাতন। তুরস্ক থেকে ঘুরে এসে সেক্যুলার কামাল আতাতুর্কের অনুকরণে ইরানেও ইসলামকে মুছে ফেলার ষড়যন্ত্র করলো এই শাহ। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো, নিষিদ্ধ হলো জুমার খুতবা ও কারবালার শোকসভা। আলেমগণের পাগড়ি পরার ওপরেও জারি হলো নিষেধাজ্ঞা। দাড়ি রাখলে ট্যাক্স দিতে হতো। বাতিল হলো হিজরি ক্যালেন্ডার। স্কুলগুলোয় বন্ধ করা হলো ইসলামী শিক্ষা। কোথাও কুরআন শিক্ষা দেয়া যেত না। কোমের আলেমগণ অত্যাচার-নির্যাতন ও গ্রেফতারের সম্মুখীন হতে থাকেন। গ্রেফতার এড়াতে তারা প্রায়ই ভোরে পালিয়ে যেতেন মাদ্রাসা থেকে, আবার সন্ধ্যায় ফিরে আসতেন। রেজা পাহলভির বাহিনী মাঝে মাঝে আলেমদের থানায় নিয়ে যেত। পাগড়ি পরায় তো নিষেধাজ্ঞা ছিলোই, উপরন্তু আলেমগণের জোব্বা ছিঁড়ে তাদেরকে অপমান করা হতো। যাহোক, এসবের মাঝেই রেজা শাহ তার ছেলে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভিকে শাসনভার গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত করছিলো। একইসময়ে যার ভবিষ্যৎ শত্রু ইমাম খোমেনি তখন জিহাদের এক নীরব প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন ধর্মীয় নগরী কোমের এক মাদ্রাসায়। আলেমগণের মাঝে সীমাবদ্ধ সেই বিপ্লব ছিলো ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রথম ধাপ।

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
মার্কিন প্রভু জিমি কার্টারের সাথে ইরানের শাহ

বিপ্লবের প্রথম ধাপ

প্রথম পাহলভি রাজা, রেজা পাহলভির শাসনামলে আলেমদের নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব করার মত দৃঢ় ভিত্তি ছিলো না। তৎকালীন আলেমগণ পলিটিক্যাল কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের বিরোধী ছিলেন। সরকারি অত্যাচার ও হুমকি ছাড়াও তাদের পলিটিক্সে অংশগ্রহণ না করার আরেকটি বড় কারণ ছিলো চিন্তাগত। তাদের অধিকাংশই বলতেন যে, ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করবেন ইমাম মাহদি (আ.)। এটি আমাদের কাজ নয়। আমাদের কাজ কেবল মানুষকে শরিয়তসহ ইসলামের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দেয়া।
ইমামের প্রথম বিপ্লব ছিলো আলেমগণকে এই ধারণা থেকে বের করে এনে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানানো। সুতরাং ইমামের প্রথম বিপ্লবটা ছিলো আলেমগণকে শক্তিশালী করা; নিজেদের ভিতরে এবং জনগণের মাঝেও। আলেমগণের এক সভায় ইমাম বলেছিলেন-
“আপনাদের খুতবায় অবশ্যই রাজনৈতিক বিষয়ের আলোচনা থাকতে হবে। কারণ জুমার নামাজ হলো সম্পূর্ণরূপে একটি পলিটিক্যাল ইবাদত। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখতে পাচ্ছি যে, আমাদের জুমার খুতবাগুলোর সাথে মানুষের চাহিদার কোনো সম্পর্ক নেই। মুসলিম সমাজের চাহিদার প্রতিফলন নেই। মসজিদই হলো সেই জায়গা যেখানে পলিটিক্যাল ইস্যু উত্থাপিত হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমরা মসজিদকে মুসলমানদের স্বার্থ থেকে অনেক দূরে সরিয়ে ফেলেছি।…”
ইমাম আরও বলেন, “বর্তমানে আমাদের মাঝে যে ইসলাম আছে, তা থেকে পলিটিক্সকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে। তারা ইসলামের মূল ভিত্তিকে বাদ দিয়ে দিয়েছে, আর বাকিটুকু আমাদেরকে দিয়েছে। এ কারণেই ইসলাম সম্পর্কে আমাদের (সমাজের) এই অজ্ঞতা। আমরা জানিই না ইসলামের মৌলিক অংশটা কী। যতদিন পর্যন্ত না মুসলমানরা ইসলামকে খুঁজে পাবে, ততদিন পর্যন্ত আমরা গৌরব অর্জন করতে পারবো না।…”

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
মাদ্রাসায় ঢুকে ছাত্রদের হত্যা করে শাহের বাহিনী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও রেজা শাহের ছেলের ক্ষমতা গ্রহণ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলো। ইরানের শাহ রেজা পাহলভি নাৎসি জার্মানির পক্ষ নিয়ে করুণভাবে পরাজিত হলো। শত্রুপক্ষ ইরানের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়তে শুরু করলো। তখন ১৯৪১ সাল। ব্র্রিটেন সিদ্ধান্ত নিলো রেজা শাহকে সরিয়ে ফেলতে হবে। তাদের পরিকল্পনা ছিলো রেজা শাহকে ইতালিতে নির্বাসনে পাঠিয়ে তার ছেলে মুহাম্মাদ রেজা পাহলভিকে রাজক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা। সেইভাবে তারা মুহাম্মাদ রেজা শাহকে ক্ষমতায় নিয়ে এলো। প্রসঙ্গত বলতে হয়, বিশ্বের অন্যান্য দেশের আভ্যন্তরীণ ব্যাপারে নাক গলানোর এই স্বভাব ব্রিটেনের এখনো যায়নি, এবং ব্রিটেনসহ বড় বড় অন্যান্য শক্তি আজো বিশ্বের বহু দেশের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করে চলেছে।
শুরু হলো ইরানের সর্বশেষ শাহ মুহাম্মাদ রেজা পাহলভির শাসন। তরুণ শাহ তখন ঘুণাক্ষরেও কল্পনা করতে পারেনি যে তারই শত্রু ইমাম খোমেনি ততদিনে ২৫০০ বছরের রাজতন্ত্র উৎখাতের বিপ্লব অর্ধেকটা শেষ করেছেন: আলেমগণ ইমামের নেতৃত্বে ভবিষ্যৎ বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন।
ইমামের বই প্রকাশিত হলো: ‘কাশফ-আল-আসরার’ (রহস্য উন্মোচন)। এখানে তিনি শাহের তীব্র সমালোচনা করেন। সেই সাথে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় আলেমগণের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন। এই বইয়ে তিনি বলেন, “(ইসলাম) ধর্ম ও রাজনীতি (পলিটিক্স) আলাদা নয়। যারা ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করতে চায়, তারা না বোঝে পলিটিক্স, আর না তাদের আছে ধর্মের জ্ঞান।” ধর্ম থেকে রাজনীতিকে আলাদা করা পশ্চিমাদের ইচ্ছা বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ইসরাইল ও কমিউনিস্টদের উত্থান

১৯৪৮ সালে ব্রিটেনসহ শয়তানি শক্তিগুলোর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ফিলিস্তিনের একটা বড় অংশ জবরদখল করে মুসলিম বিশ্বে শয়তানের প্রাণভোমরা হিসেবে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল প্রতিষ্ঠা হলো। বিতাড়িত হলো ফিলিস্তিনিরা তাদের জন্মভূমি থেকে। শুরু হলো মুসলিম বিশ্বের এক নতুন ঈমানী পরীক্ষা। ফিলিস্তিন মুক্ত হবে কি? প্রথম কিবলা বায়তুল মুকাদ্দাস ফিরে পাবো কি?
ইমাম খোমেনি প্রায়ই তার লেকচারে ফিলিস্তিন মুক্ত করার সক্ষমতা অর্জনের কথা বলতেন। শাহাদাতে অনুপ্রাণিত করে ইমাম বলেছিলেন –
“প্রতিটি কাজকেই আগে গভীর পর্যবেক্ষণ ও চিন্তা থেকে শুরু হতে হয়। আর যদি আমাদের ভেতরে দুর্বলতা থাকে, তাহলে আমরা কিছুই করতে পারবো না। নিজেদেরকে শক্তিশালী করুন। অন্তরকে দৃঢ় করুন। আল্লাহর রাহে নিজেকে উৎসর্গ করে দিন। সকল প্রার্থনাই আল্লাহর কাছে করা হয়, কারণ তিনিই শক্তির কেন্দ্র। দোয়াসমূহে বলা হয় আল্লাহর নিকটবর্তী হতে, কারণ তা আপনাকে শক্তি দেবে, যেহেতু সর্বশক্তিমান আল্লাহ আপনার সাহায্যকারী। যে আল্লাহকে আঁকড়ে ধরে, কিসে তার ভয়! আপনারা যারা আল্লাহর নিকটবর্তী হতে চান, (দুনিয়ার) কোন শক্তিকে আপনারা ভয় করবেন ! আপনারা কি শহীদি মৃত্যুকে ভয় করেন? শাহাদাৎ কি ভয়ের বিষয়? আপনারা কি বন্দী হওয়াকে ভয় করেন? আল্লাহর রাহে জেলবন্দী হওয়া কি ভয়ের বিষয়? আপনারা নির্যাতনকে ভয় করেন? আল্লাহর রাহে নির্যাতিত হওয়ায় কোনো সমস্যা আছে?”
আবার ১৯৫০ সালের দিকে ইরানে কমিউনিস্টদের উত্থান ঘটলো। মার্কসবাদের প্রচার চলতে লাগলো ব্যাপকভাবে। তথাকথিত জাতীয়তাবাদী পার্টি, তুদা পার্টি ইত্যাদি বামপন্থী দল নাস্তিক্যবাদী ধ্যান ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করার কাজে লেগে পড়লো। আর বিপরীতে ইরানের ইসলামপন্থী মহল লেগে পড়লেন তাদেরকে মোকাবিলা করতে। এটা অস্ত্রের যুদ্ধ ছিলো না, এ যুদ্ধ ছিলো মানুষের মস্তিষ্ক দখলের। এ সময়ে ইমাম খোমেনি হাওজাগুলোতে (ধর্মশিক্ষা কেন্দ্রে) এক ইন্টেলেকচুয়াল বিপ্লব শুরু করেন। তিনি আলেমগণের পাঠ্যসূচিতে যুক্তিশাস্ত্র ও দর্শনকে অন্তর্ভুক্ত করেন। উদ্দেশ্য; মার্কসবাদী ও নাস্তিক্যবাদী দর্শনকে মোকাবিলা করা ও দূরীভূত করা।

শাহের ষড়যন্ত্র ও বিদ্রোহ দমন

কোনো শাসক যতই একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র কায়েম করতে থাকে, তখনই তার পতন ঘনিয়ে আসেÑ এটাই ইতিহাসের অলঙ্ঘনীয় নিয়ম। আর সেই নিয়তির দিকে এগিয়ে যেতে রেজা শাহ সংবিধান সংশোধন করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতা অধিগ্রহণ করলো, পার্লামেন্টের ইলেকশনে হস্তক্ষেপ করলো। কোমের দিকে ইসলামপ্রিয় গণমানুষের স্রোত দেখে ইরানের শাহ তার প্রধানমন্ত্রীকে পাঠালো কোমের শীর্ষস্থানীয় আলেমদের সাথে আলোচনা করতে। আয়াতুল্লাহ বুরুজারদি এবং আয়াতুল্লাহ কাশানি উভয়েই ইমাম খোমেনিকে আলোচনার কাজে নিযুক্ত করলেন। শাহের প্রধানমন্ত্রী ইমামকে বুঝ দেয়ার চেষ্টা করলো যে তারা শুধু সিনেটের মতামতের ভিত্তিতে শাহের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংবিধান সংশোধন করছে, তারা ইসলামবিরোধী কিছু করছে না। ইমাম জবাবে বললেন : “আমরা এটা হতে দেবো না।” প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞাসা করলো, কেন? ইমাম জবাব দিলেন-
“কারণ ভবিষ্যতে তোমরা এই প্ল্যাটফর্মকে ব্যবহার করবে ইসলামী আইনকে নিষিদ্ধ করতে। তোমরা একটার পর একটা ইসলামী আইন নিষিদ্ধ করবে।” ব্যর্থ প্রধানমন্ত্রী ফিরে গেলো তেহরানে।
এ দিকে শাহ মিথ্যা সংবাদ ও ছবি প্রচার করলো যে, তাকে হত্যাচেষ্টা করা হয়েছে। এই ছুতায় ইরানে শাহের বিরোধী দল, কমিউনিস্ট তুদা পার্টিসহ বিরোধী সকল মতের বড় বড় নেতাদের গ্রেফতার করা হলো। গ্রেফতার হলেন আয়াতুল্লাহ কাশানিও। কিন্তু বিরোধীদের একটি গ্রুপ সশস্ত্র বিদ্রোহ চালিয়ে গেলো। তখন প্রেসিডেন্ট ছিলো সেক্যুলারপন্থী মোহাম্মদ মোসাদ্দেক। এই সরকারের প্রধানমন্ত্রীকে হত্যা করা হয় সে বিদ্রোহে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সেনাশাসন জারি করে আমেরিকায় পালিয়ে গেলো শাহ। দেশে ফিরে এসে নিজের আর্মির এক কমান্ডারকে প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ দিলো সে। এটা ছিলো ১৯৫৩ সালের ঘটনা, যার দায় সম্প্রতি আমেরিকা স্বীকার করে নিয়ে বলেছে যে, ’৫৩ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে মোসাদ্দেক সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পেছনে মার্কিন গোয়েন্দা বাহিনীর প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিলো।
যাহোক, আমেরিকার ইচ্ছায় শাহ পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো এবং মোটামুটিভাবে বিদ্রোহ দমন করতে সক্ষম হলো। সেক্যুলার মোসাদ্দেককে জেলবন্দী করা হলো এবং আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভিকে অ্যারেস্ট করে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে শহীদ করা হলো। পিতা রেজা শাহের মতোই আলেমদের ওপর জুডিশিয়াল কিলিংসহ সবধরনের অত্যাচার চালিয়েছিলো মুহাম্মাদ রেজা শাহ পাহলভি। তবে ১৯৫৩ সালের এই অভ্যুত্থান, যাতে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মোসাদ্দেক সরকারকে উৎখাত করা হয়, তা ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিলো। এই ঘটনায় ইরানের সাথে মার্কিন বন্ধুত্ব দৃঢ় হলো, এবং শেষমেশ ইরানের আর্মি হয়ে উঠলো মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে শক্তিশালী ও অপ্রতিরোধ্য বাহিনী। বিশ্বের মধ্যে পঞ্চম শক্তিশালী আর্মি। আর এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন নিয়ন্ত্রণ হলো আরো দৃঢ়।

ইমামের পর্যবেক্ষণ

তৎকালীন ইরানের প্রায় সকল বিপ্লবী আন্দোলন-ই ইমাম তার জীবনে প্রত্যক্ষ করেছেন। এগুলো প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ করা, সেইসাথে ইরানের বাইরের বিভিন্ন বিপ্লবী নেতার সাথে যোগাযোগ ও তাদের অভিজ্ঞতা-পর্যবেক্ষণ, ইত্যাদি ইমামের নিজস্ব বিপ্লবী চিন্তাধারাতে সহায়তা করেছিলো।
আয়াতুল্লাহ কাশানিকে বন্দী করা, আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভিকে শহীদ করা এবং এমনকি সেক্যুলার মোসাদ্দেকের বন্দী হওয়া- তিনটি বিপ্লব প্রচেষ্টার ব্যর্থতা সম্পর্কে ইমাম তার পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করেন। তার মতে এসব বিপ্লবের ব্যর্থতার কারণ ছিলো জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ব্যাপক অংশগ্রহণ, যা বিপ্লবকে রক্ষা করে- তার অভাব। একটা দেশের প্রায় শতভাগ মানুষ যদি অর্জিত বিপ্লবকে রক্ষা করার জন্য প্রস্তুত না থাকে, তবে অর্জিত বিপ্লব রক্ষা করা সম্ভব হয় না। নিরঙ্কুশ মুসলিম গণভিত্তিই হলো সফল ইসলামী বিপ্লবের ভিত্তি।

ইমাম খোমেনি একটি বিপ্লবের নাম । কৃষিবিদ মো. রাকিব হাসান
ইমাম খোমেনিকে গ্রেফতার করে সরাসরি এয়ারপোর্টে নেয়া হয়

বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ

ষাটের দশকে ইমামের বিপ্লব প্রকাশ্য হতে শুরু করলো। অর্থাৎ কোম নগরীর সর্ববৃহৎ মাদ্রাসা, ফায়জিয়া মাদ্রাসা থেকে বিপ্লব আত্মপ্রকাশ করলো। এটাকে বিপ্লবের দ্বিতীয় ধাপ বলা যেতে পারে। প্রথম ধাপ ইমাম তার বিচক্ষণতা, প্রজ্ঞা ও জ্ঞানের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছিলেন ইতোমধ্যেই; আলেমগণের কাছে ইসলামী রাষ্ট্র কায়েমের প্রয়োজনীয়তা ও গুরুত্ব তুলে ধরে তাদের অধিকাংশকে একত্রিত করেছিলেন। এ ছাড়াও গুরু আয়াতুল্লাহর বুরুজারদির অনুসরণে শিয়া-সুন্নি বৃহত্তর মুসলিম ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যও কাজ করেছিলেন আলেমগণের মাঝে।
যাহোক, ইমামের হাজার হাজার ছাত্রের মাঝে বিপ্লবে যাদের নাম অগ্রভাগে ছিলো, তারা ছিলেন আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মোতাহারি, আয়াতুল্লাহ বেহেশতি, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ি এবং হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানজানি। ইমামের নেতৃত্ব ও পরিচালনায় শাহের বিরুদ্ধে বিপ্লব পরিণত হলো ইসলামী জিহাদে। যখন দুনিয়ার অন্যান্য জায়গায় বামপন্থী আন্দোলন চলছে এবং বিজয়ীও হচ্ছে, তখন ইরানে ইমাম খোমেনির পরিচালিত ইসলামী বিপ্লব ছিলো সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
১৯৬১ সাল। দেশের বড় বড় তেলকূপগুলো সব আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছে। ৫০ বছরে ব্রিটেন যতটা চুরি করতে পারেনি, মাত্র দশ বছরে তার বহুগুণে তেল চুরি করে নিয়ে গেলো আমেরিকা। ৩৪০ মিলিয়ন টন অপরিশোধিত তেল। সেইসাথে আর্মিকে শক্তিশালী করতে যে বিপুল অর্থব্যয় করে শাহ, তাতে দেশের আর্থিক রিজার্ভ অত্যন্ত কমে আসে। ইমাম বললেন-
“যদি এটা ত্রিশ বছর ধরে চলে, তাহলে আমাদের আর কোনো তেলকূপই অবশিষ্ট থাকবে না। আমাদের জনগণের কোনো তেল থাকবে না, কৃষিও থাকবে না। জনগণ ভিক্ষুকে পরিণত হবে। অর্ধেক জনগণ এখন পথে বসেছে, আর বাকিরাও বসবে, তাদের কোনো রিজার্ভ থাকবে না। আমরা যদি এই লোককে (শাহকে) আরো সময় দিই, তাহলে সে আমাদের গৌরব-মর্যাদাকে শেষ করে ছাড়বে।”

রুহুল্লাহ খোমেনি থেকে আয়াতুল্লাহ খোমেনি, অতঃপর  সর্বস্তরের মানুষের কাছে ইমাম খোমেনি হয়ে ওঠা

১৯৬১ সালে সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ বুরুজারদির মৃত্যু কোমের হাওজাকে এক ঐতিহাসিক টার্নিং পয়েন্টের মুখোমুখি করলো। শাহ ভাবলো, আয়াতুল্লাহ বুরুজারদির মৃত্যু কোমের হাওজাকে দুর্বল করে দিয়েছে। সুতরাং যেভাবে সে তিনজন গুরুত্বপূর্ণ বিদ্রোহী আয়াতুল্লাহ কাশানি, আয়াতুল্লাহ নবাব সাফাভি ও সেক্যুলার মোসাদ্দেককে পথের কাঁটা হিসেবে সরিয়ে দিয়েছিলো, সেভাবেই তার সর্বশেষ পথের কাঁটা ইমাম খোমেনিকে সরিয়ে দেওয়ার কূপমণ্ডূকতায় লিপ্ত হলো। হযরত মাসুমার (রহ.) মাজারে গিয়ে শাহ এক দীর্ঘ বক্তৃতায় বললো, এতদিন তার পথে এক দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যক্তি ছিলো, এখন সে চলে গিয়েছে। সুতরাং শাহ তার পিতার স্বপ্ন পূরণ করতে পারেব। (অর্থাৎ আয়াতুল্লাহ বুরুজারদির মৃত্যুতে সে আবার ইরানকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করবে, যা তার পিতার স্বপ্ন ছিলো।) সে দম্ভোক্তি করে বলেছিলো, “কেউ আমাকে থামাতে পারবে না। কেউ আমার পথে এসে দাঁড়াতে পারবে না।” কিন্তু মহান আল্লাহ তায়ালার পরিকল্পনা ছিলো ভিন্ন, যা মুশরিক শাহের অনুধাবন করার কোনো ক্ষমতাই ছিলো না।
সুতরাং অপরিণামদর্শী শাহ তার স্বৈরশাসনকে দৃঢ় করলো এবং মুসলমানদের ওপর সেক্যুলারিজমকে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করলো। সে মতো বছরখানেক পরেই নির্বাচনে ভোটার ও প্রার্থীর মুসলমান হওয়ার শর্তটি সংবিধান থেকে উঠিয়ে দিলো। এ ছাড়াও কুরআন হাতে শপথের নিয়মও তুলে দেয়া হলো। ইমাম খোমেনিসহ বড় বড় আলেমগণ শহীদ আয়াতুল্লাহ হায়েরি আল ইয়াজদির ছেলের বাসায় জরুরি বৈঠকে বসলেন। প্রার্থীদের মুসলমান হওয়ার শর্ত উঠিয়ে দেয়ায় বাহাই সম্প্রদায়ের লোকেরা রাষ্ট্রের অ্যাডমিনিস্ট্রেশনে প্রবেশ করবে বলে তারা আশঙ্কা প্রকাশ করলেন এবং সংবিধান সংশোধনের বিরোধিতা করলেন। ইমাম লিখলেন :
“ধর্মীয় নেতা ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা কি কখনো সভ্যতার অগ্রগতি এবং বৈজ্ঞানিক উন্নতির সাথে দ্বিমত পোষণ করেছেন?… কখনো কি এমন হয়েছে যে তোমরা একটা ফ্যাক্টরি বানাতে চেয়েছো আর তারা তোমার বিরোধিতা করেছে? তোমরা স্পেসে ঘুরে বেড়ানোর মেশিন তৈরি করতে চেয়েছো আর ধর্মীয় নেতাগণ তোমার পথে এসে দাঁড়িয়েছে? আমাদের দাবি হলো নারীদের ধ্বংস ও ব্যভিচারের পথে টেনে আনা হবে না। গত ২০ বছর যাবৎ হিজাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। মানুষ ও দেশের জন্য তাতে কী লাভ হয়েছে? এই খেলা বন্ধ করো, কুরআন ও ঐশী ধর্মের ওপর থেকে তোমার হাত উঠিয়ে নাও (হস্তক্ষেপ করা বন্ধ করো) এবং ডেভেলপমেন্ট, সিভিলাইজেশন ইত্যাদির নামে দেশের সংবিধান লঙ্ঘন করো না ।’
উত্তরে শাহ লিখলো, তোমরা আলেমরা সাধারণ মানুষকে শরিয়ত শিক্ষা দাও, কিন্তু পলিটিক্সের মধ্যে নাক গলাতে এসো না। আর এই বক্তব্যে আয়াতুল্লাহগণকে অপমানজনকভাবে সম্বোধন করা হয়েছিলো।
ইমাম খোমেনি তখনি ছাত্রদেরকে বিপ্লবী কমিটি তৈরি করার নির্দেশ দিলেন। এই কমিটির দায়িত্ব ছিলো ইমামের বক্তব্য প্রচার ও বিভিন্ন কর্মসূচির আয়োজন করা। প্রথমেই প্রচার করতে বলা হলো আয়াতুল্লাহগণকে অপমান করে দেয়া শাহের চিঠি। এই চিঠির অসংখ্য কপি ছড়িয়ে দেয়া হলো মানুষের মাঝে। এই চিঠিকে মানুষজন ওলামাগণের ওপর সরাসরি আঘাত ও অপমান হিসেবে দেখলো। মুহূর্তের মধ্যে ইরানের রাস্তায় বিক্ষুব্ধ জনতা নেমে এলো। ইমাম কঠোর ভাষায় শাহকে হুঁশিয়ার করলেন-
“(শাহ!) যেহেতু তুমি আমাদেরকে বলেছো সাধারণ মানুষকে শিক্ষাদান করতে, সুতরাং আমি সধারণ মানুষকে বলছি- হে জনগণ! (শোনো!) সেইসাথে তোমার সরকারকেও বলছি : অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যে তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছো ধর্মীয় নেতাগণের উপদেশকে সম্মান ও তোয়াক্কা করবে না। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব হলো জাতির খুঁটিস্বরূপ, জনগণের আশ্রয়। আর তুমি মনে করছো যে তুমি কুরআন, দেশের সংবিধান এবং মুসলমানদের অনুভূতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে টিকে থাকতে পারবে। কুরআনের শিক্ষাকে উপেক্ষা ও অপমান করার পরিণতির ব্যাপারে আমি তোমাকে সতর্ক করছি। যদি সতর্ক না হও, তাহলে মুসলিম স্কলার এবং ধর্মীয় নেতাগণ তা-ই করবেন, যা করা দরকার।”
ছয় মাসেও বিক্ষোভ-সভা-সমাবেশ-মিছিল থামলো না, বরং যেনো বেড়েই চললো। এর মূল কারণ ছিলো নাস্তিক্যবাদ দ্বারা ইসলাম-প্রিয় মানুষের চিন্তা- চেতনার ওপর আঘাত করা।
এবার ইমাম খোমেনিকে বাদ দিয়ে অন্যান্য আলেমগণের উদ্দেশে টেলিগ্রাম করলো শাহ। অথচ তখন মিছিলে মিছিলে শুধু ইমাম খোমেনির নাম ও ছবি। যাহোক, সেই টেলিগ্রামে আলেমগণকে মিথ্যা কথা বলা হলো। শাহ তার টেলিগ্রামে বলেছিলো যে সংবিধানের সংশোধনীগুলো বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু ইমাম খোমেনি বললেন যে না, সংশোধনীগুলো আসলে বাতিল হয়নি। আর যদি হয়েই থাকে, তাহলে তা সরকারিভাবে ঘোষণা করতে হবে। শাহ বাধ্য হলো সরকারি গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে সংশোধনী বাতিলের কথা প্রকাশ করতে।
এভাবে, শাহের অপকর্মগুলোর সমালোচনা, জনগণকে তা জানানো এবং শাহকে আলেমগণের বক্তব্য মানতে বাধ্য করা- ইত্যাদির মাধ্যমে ইমাম খোমেনির প্রকাশ্য বিপ্লব প্রাণ পেতে শুরু করলো। আর খোমেইন প্রদেশের রুহুল্লাহ খোমেনি হয়ে উঠলেন অবিসংবাদিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি, আর সর্বস্তরের জনসাধারণের মুখপাত্র- ইমাম খোমেনি।

সাদা বিপ্লব (White Revolution)

শাহের পরপর কয়েকটি সরকার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সঙ্কট ও অচলাবস্থা নিরসনে ব্যর্থ হলো। ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহ ১৯৬৩ সালে ‘সাদা বিপ্লব’ বা যিরঃব ৎবাড়ষঁঃড়রহ এর ঘোষণা দিলো, যা কার্যত ফাঁকা বুলি ছাড়া আর কিছুই ছিলো না। মার্কিন দালাল হিসেবে জনগণকে শোষণ করা ও দেশের তেলসম্পদ আমেরিকার হাতে তুলে দিয়ে জনগণকে সাদা বিপ্লবের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাহ কার্যত তার পতনকেই ত্বরান্বিত করছিলো।
সাদা বিপ্লবের নামে শাহের লোক দেখানো ট্রাক্টর চালানো, কিছু কৃষককে তাদের জমি ফেরত দেয়া ইত্যাদি কাজের আড়ালে সে আসলে কৃষিকে ধ্বংস করছিলো, যেনো আমেরিকার জন্য বাজার তৈরি করা যায়। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশেও ঘটে চলেছে অনুরূপ ঘটনা: কোনো নির্দিষ্ট দেশের জন্য বাজার তৈরি করার লক্ষ্যে নিজস্ব শিল্প ধ্বংস করা। যাহোক, বিপ্লবের পর দেশে ফিরেই ‘বেহেশতে যাহরা’ কবরস্থানে প্রথম ভাষণ দেন ইমাম খোমেনি। তখন তিনি এই সাদা বিপ্লবের প্রকৃত চেহারা সম্পর্কে বলেছিলেন-
“তারা ভেবেছিলো (বলেছিলো) যে কৃষি সংস্কার ও কৃষক পুনর্বাসনের নামে, কৃষকদের দারিদ্র্য থেকে উদ্ধার করার নামে তারা কৃষকদের রক্ষা করেছে। কিন্তু দীর্ঘদিন পর, এখন তোমার এই সংস্কারের ফলস্বরূপ কৃষকই ধ্বংস হয়ে গিয়েছে এবং সামগ্রিকভাবে আমাদের কৃষিই শেষ হয়ে গিয়েছে। এখন দেশ সবদিক দিয়ে বাইরের সাহায্যের মুখাপেক্ষী হয়ে পড়েছে। সুতরাং, মুহাম্মাদ রেজা পাহলভি এই পদক্ষেপ নিয়েছিলো আমেরিকার জন্য এদেশে বাজার তৈরি করতে এবং চাল-গমসহ সবকিছুর জন্য আমেরিকার ওপর নির্ভরশীল হতে। কিংবা ইসরাইল থেকে ডিম কেনা, আমেরিকা থেকে যন্ত্রপাতি কেনার উদ্দেশ্যে। তাই এই সংস্কারের নাম করে সে যা যা করেছিলো, তার সবই ছিলো দুর্নীতি। এই কৃষি সংস্কার এদেশকে চপেটাঘাত করেছে। হয়তো আমরা বিশ বছরেও এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারবো না।”
তো শাহ যখন সাদা বিপ্লব ঘোষণা করলো, এর প্রকৃত চেহারা বুঝতে পেরে ইমাম খোমেনি আলেমগণকে ডেকে বলেন যে এখন সময় এসেছে দৃঢ় শপথ নিয়ে সরাসরি শাহের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা করার। সুতরাং কোম থেকে জারি করা হলো এক ফতোয়া। এই ফতোয়ায় শাহের কর্মকাণ্ডকে ইসলামবিরোধী ও সংবিধানবিরোধী বলে ঘোষণা করা হয়। জনগণকে রাস্তায় নামিয়ে আনার জন্য এই ফতোয়াটিই যথেষ্ট ছিলো। শহরগুলোর সব দোকানপাট স্বতঃস্ফূর্তভাবে বন্ধ রাখা হলো। লাখো নারী-পুরুষের মিছিলের এক অভূতপূর্ব দৃশ্যের অবতারণা হলো।
জনগণের সরাসরি বিপক্ষে যাবার পরিবর্তে শাহ তার সাদা বিপ্লবের দফাগুলির ওপর এক গণভোটের প্রস্তাব করলো। সেইসাথে এ-ও বললো যে, সে কোমে গিয়ে ধর্মীয় নেতাদের সাথে দেখা করবে পরিস্থিতি শান্ত করার জন্য। জবাবে কোম নগরীতে শাহের প্রবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করলেন ইমাম খোমেনি। এই সংবাদও সারাদেশে ছড়িয়ে পড়লো। এসময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন ইমামের ছাত্ররা, যেনো ইমামের বক্তব্য দেশের মানুষের কাছে বিভিন্নভাবে পৌঁছে দেয়া যায়। শাহের দুঃশাসনের প্রতি গণ-অশ্রদ্ধা প্রদর্শনের জন্য ইমাম আরেকটি কাজ করলেন এ সময়ে। ইরানে নওরোজ উৎসব, অর্থাৎ নববর্ষ পালন অত্যন্ত ঐতিহ্যগত একটি সার্বজনীন অনুষ্ঠান। কিন্তু সে বছর নববর্ষের দিনকে ইমাম খোমেনি শোক দিবস হিসেবে ঘোষণা করলেন। কৌশল হিসেবে নিষেধ করেছিলেন রমজান মাসের খুতবা। সুতরাং লোকজন মসজিদে গিয়ে সবকিছু বন্ধ পেলো। এতে এই অনুভূতি মানুষের মাঝে আরো প্রকট হলো যে, শাহ ইসলামী কর্মকাণ্ড বন্ধের ষড়যন্ত্র করছে।

কারবালার ঘটনার পুনরাবৃত্তি

ইরানি জনগণ হাজার বছর ধরে নওরোজ অনুষ্ঠান পালন করে আসছে। কিন্তু সেবার নওরোজের দিনে মানুষ শোক দিবস পালন করলো। যেনো ইরানের ইতিহাসের হাজার বছরের সকল শাসকের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে আবির্ভূত হলেন ইমাম খোমেনি। গোটা ইরানজুড়ে যেদিন আনন্দ উৎসব চোখে পড়ার কথা, সেদিন দেখা গেলো উল্টো দৃশ্য। এ ছিলো শাহের শাসনক্ষমতার ওপর এক সরাসরি আঘাত। এ ছিলো হাজার বছরে রাজতন্ত্রের ওপরে ইসলামী নেতৃত্বের বিজয়। ছিলো বেলায়েতে ফকিহ, অর্থাৎ ফিকাহবিদের শাসনের পূর্বাভাস, যার ছক ইমাম এঁকেছিলেন আরো প্রায় ত্রিশ বছর আগে। শাহের টনক নড়লো। অসহিষ্ণু শাহ বেছে নিলো গণহত্যার পথ।
২২ মার্চ, ১৯৬৩ সাল। ইরানি নববর্ষের দ্বিতীয় দিন। হযরত ইমাম জাফর সাদেক (রহ) এর শাহাদাৎ দিবস উপলক্ষে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছে। মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে ইসলামপ্রিয় মানুষের ভিড়ে তিল ধারণের জায়গা নেই। এমন সময় সেখানে সামরিক যান, বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদিতে করে পৌঁছে গেলো মেশিনগানে সজ্জিত শাহের সন্ত্রাসী সাভাক বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনী। ইসলামবিরোধী শ্লোগান দিয়ে তারা নিরস্ত্র মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত করলো ফায়জিয়া মাদ্রাসা প্রাঙ্গণ। আহতদের যারা হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন, তাদেরও জোরপূর্বক বের করে দেয়া হলো। এ যেনো কারবালার ঘটনার-ই পুনরাবৃত্তি! শাহের বাহিনীর এই নৃশংসতার খবর ইমামের কানে পৌঁছলে তিনি ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জনতার উদ্দেশে বলেন-
“আপনারা শান্ত থাকুন। আপনারা এমন সব পবিত্র ধর্মীয় নেতার অনুসারী, যারা এর চাইতে আরো বেশি নির্যাতন ভোগ করেছেন। যারা এ ধরনের দৌরাত্ম্য ও নির্যাতন চালায় শেষ পর্যন্ত তা বুমেরাং হয়ে তাদের কাছেই ফিরে যায়। ইসলামের ইজ্জত-কদর বজায় রাখার জন্য আপনাদের অনেক ধর্মীয় নেতাই মৃত্যুবরণ করেছেন। তারা এর দায়িত্বভার এখন আপনাদের ওপর ন্যস্ত করে গেছেন। সুতরাং, তাদের পবিত্র উত্তরাধিকার হিফাজত করার দায়িত্ব আপনাদেরই।”
সেদিন রাতে ইমামের বাসায় যখন তার ছাত্র ও আলেমগণ জড়ো হলেন, তিনি তাদেরকে সাহস দিলেন। শাহকে উদ্দেশ করে বললেন-
“আমি নিজেকে প্রস্তুত করেছি। প্রস্তুত করেছি আমার দেহ ও এই বুক- তোমার বর্ষা ও তীর গ্রহণ করার জন্য। ইনশাআল্লাহ, আমি তোমার কাছে মাথা নত করবো না। এবং আমি তোমার দুঃশাসন ও নির্যাতনের মুখে পিছু হটবো না কিংবা আত্মসমর্পণও করবো না। আমি তোমার দেশ ও ইসলামবিরোধী কোনো কর্মকাণ্ডের ব্যাপারেই চুপ করে থাকবো না। এবং যতদিন আমার হাতে কলম আছে, আমি ততদিন তোমার মোকাবিলায় ফতোয়া জারি করবো এবং লিফলেট লিখতে থাকবো।”

ইমামের গ্রেফতার : শুরু হলো এক দীর্ঘ বিপ্লব

শাহ কর্তৃক ইরানে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের দূতাবাস চালুর ঘোষণাকে ইমাম অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে নিলেন। ফিলিস্তিন ইস্যু ইমামের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। আর এই শাহ সেই ইসরাইলের দূতাবাস চালু করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদি নিপীড়নকে বৈধতা দিলো।
ইমাম তার বাসভবনে আলেমগণকে ডাকলেন। আশুরার খুতবায় শাহের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে সকলে একমত হলেন।
৫ই জুন, ১৯৬৩ সাল। আশুরার বক্তৃতায় ইমাম খোমেনি বললেন- “(হে শাহ!) তোমাকে ইসলামের নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হবে। এবং ধর্মীয় নেতাগণের কথা শুনতে হবে। তারা এদেশের ভালো চান। ইসরাইল থেকে ফিরে আসো, কারণ ইসরাইলের পক্ষে থাকাটা তোমার কোনোই কাজে আসবে না। দুর্দশাগ্রস্ত, নীচ! তোমার জীবনের ৪৫ বছর পার হয়ে গিয়েছে, আজ পর্যন্ত কখনো একটু গভীরভাবে চিন্তা করো নাই, তোমার কাজের প্রতিক্রিয়া ভেবে দেখো নাই, অতীত থেকে শিক্ষা নেও নাই। তারা তোমাকে যে মিথ্যাবাদিতা ও ধোঁকাবাজি শিক্ষা দিচ্ছে, তা শুনো না। নির্বোধ কে? অসহিষ্ণু কে? ইসলাম আর আলেমগণ, নাকি তুমি আর তোমার সাদা বিপ্লব? কিসের এই বিপ্লব? এর গোড়া কোথায়, তা বলো। উন্মোচন করো। তুমি কতদিন ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে চাও? তুমি কতদিন মানুষকে ভুলপথে চালিত করতে চাও?”
পাহলভি রাজবংশের ইতিহাসে আর কেউ কখনো শাহকে এভাবে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে কথা বলেন নাই। ইমাম খোমেনিই সেই ব্যক্তি ছিলেন, যিনি অত্যাচারী শাসককের তার গর্জনের চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিতে প্রতি-উত্তর করেছিলেন। সেটা এমন এক সময়, যখন শাহের রাজনৈতিক বিরোধিতা বলতে আর কিছু অবশিষ্ট ছিলো না। এমনই এক সময়ে আয়াতুল্লাহ খোমেনি তার বিরুদ্ধে কার্যত যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। তার আশুরার ভাষণ ম্যাজিকের মত কাজ করলো।
স্বৈরশাসক শাহ তার ক্ষমতার হুমকি হিসেবে দেখলো ইমাম খোমেনিকে। গভীর রাতে ইমাম গ্রেফতার হলেন। খবর ছড়িয়ে পড়লো সর্বত্র। সকালে রাস্তায় নেমে এলো দেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ, তাদের অবিসংবাদিত নেতা ইমাম খোমেনির জন্য। এর শুরু হলো শাহের অত্যাচারী বাহিনীর গুলি। সেনাবাহিনী, নিয়মিত পুলিশ ও মোসাদ-সিআইএর হাতে বর্বরতার বিশেষ ট্রেনিংপ্রাপ্ত ‘সাভাক বাহিনী’ একযোগে হামলা করলো। খোদ তেহরানেই ১৫,০০০ এর ওপরে মানুষ শাহাদাত বরণ করেন। কোম নগরীতে শহীদ করা হয় চার শতাধিক লোককে। প্রথমদিকে তারা নিয়ম মেনে পায়ে গুলি করছিলো। এরপর সরাসরি মাথায়। যে দৃশ্য আমরা বাংলাদেশে প্রত্যক্ষ করছি আজ। এমনকি সে সময়ে শাহের জারি করা সামরিক শাসন এতটাই বর্বর হয়ে উঠেছিলো যে, মাথায় গুলি করতে যে সেনা অস্বীকৃতি জানাবে, সেই সেনাকে গুলি করে হত্যা করার নির্দেশ দিলো শাহ। হেলিকপ্টার থেকে পর্যন্ত বৃষ্টির মত গুলিবর্ষণ করা হলো। হত্যাযজ্ঞ শেষে হেলিকপ্টারযোগে অসংখ্য লাশ গুম করার জন্য তুলে নিয়ে কোমের নিকটবর্তী লবণ হ্রদে ফেলে দিয়েছিলো জালিম বাহিনী। সেই লবণ হ্রদ এখন শহীদদের স্মৃতিচারণের জায়গা হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
ইমামের গ্রেফতার কেবল বিপ্লবকেই বেগবান করলো। বাণিজ্যিক ধর্মঘট, রাস্তায় সভা-সমাবেশ বিক্ষোভ ইত্যাদি চলতে লাগলো অব্যাহতভাবে। নয় মাসের মাথায় শাহ বাধ্য হলো ইমামকে মুক্তি দিতে, যদিও প্রাথমিকভাবে তাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করেছিলো।
এর প্রায় সাত মাস পর আমেরিকার সাথে এক চুক্তি করলো শাহ। এই চুক্তি অনুযায়ী যত বড় অপরাধীই হোক, যদি সে আমেরিকান হয় তবে ইরানের মাটিতে তাকে কোনো ধরনের শাস্তি প্রদান করা হবে না। ইমাম খোমেনি এর তীব্র বিরোধিতা করে ধর্মীয় এক সভায় বক্তব্য দেন। সেদিন রাতেই আবার গ্রেফতার হলেন তিনি। গভীর রাতে উঁচু উঁচু দেয়ালে দড়ি লাগিয়ে কমান্ডো স্টাইলে তার বাড়িতে ঢুকে পড়লো শাহের বাহিনী। এরপর দরজা ভেঙে ঢুকলো ইমামের ঘরে। ইমাম বলললেন, “যদি তোমরা রুহুল্লাহর খোঁজে এসে থাকো, তবে এই যে আমি রুহুল্লাহ।” এই কথা বলে তিনি পরিবারের অন্যান্য সদস্যদেরকে গ্রেফতারের ব্যাপারে নিষেধ করলেন শাহের বাহিনীকে। এরপর তারা ইমামকে নিয়ে গেলো। এবার আর তাকে জেলে রাখা হলো না। গাড়িতে করে সরাসরি নিয়ে যাওয়া হলো তেহরান এয়ারপোর্টে। সেখানে তিনি জানতে পারেন যে তাকে তুরস্কে নির্বাসনে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাহ। এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হয়ে ওঠে; তা হলো- দেশব্যাপী ইমামের জনপ্রিয়তার কারণে ইমামের ডাকে বিভিন্ন সময়ের বিক্ষোভ মিছিল, শোকদিবস পালন ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মসূচিতে জনতার যে ঢল নেমেছিলো, তা থেকেই বোঝা গিয়েছিলো ইমামকে হত্যা করলে শাহের মসনদ-ই ধ্বংস হয়ে যাবে। তাই গুপ্তহত্যার ইচ্ছা সত্ত্বেও নিজ স্বৈরাচারী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে ইমামকে নির্বাসনে পাঠালো মুহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভি।

[আগামী সংখ্যায় সমাপ্য]

SHARE

Leave a Reply