ইমাম হোসাইন (রা.) এর সুদৃঢ় চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য -মুহাম্মদ জাফর উল্লাহ

সত্য ও ন্যায়ের ঝান্ডাবাহী জান্নাতে যুবকদের সরদার সৈয়দ ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন নবী বংশের উজ্জ্বল প্রদীপ। কারবালার রক্তাক্ত প্রান্তরে শাহাদাতের অভূতপূর্ব ঘটনার আকস্মিকতায় তাঁর সুবিশাল জীবনের অনেক দিকই অধিকাংশ মুসলমানের নিকট অজানা। শোকবিহ্বল উম্মতে মুহাম্মদী (সা.) প্রায় ক্ষেত্রে আশুরার আলোচনায় কারবালার মর্মান্তিক ঘটনার বর্ণনা শুনেই ক্ষান্ত হন কিন্তু তাঁর পূত-পবিত্র বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্ম এবং অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য তাদের কাছে অজানাই থেকে যায়।
নবী দৌহিত্র, মা ফাতিমা ও  হজরত আলী (রা)-এর কলিজার টুকরা ইমাম হোসাইনের জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে তাঁর উন্নত চরিত্রের নিদর্শন, যা প্রতিটি মুমিন মুসলমানের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ।
বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর স্নেহ ছায়ায় লালিত ইমাম হাসান ও হোসাইন (রা.) ছিলেন চেহারা-সুরতে চলনে-বলনে নবীজীরই প্রতিরূপ। শিশুকাল হতেই নবীজীর সাহাবীগণ তাঁদের অত্যন্ত স্নেহ, সম্মান ও শ্রদ্ধার চোখে দেখতেন। তাঁদের ভালোবাসার কথা নবীজী বহুস্থানে বহুবার উচ্চারণ করেছেন- এ কথা সর্বজনবিদিত। নবীজীর অনেক হাদিসে তা উদ্ধৃত।
ছোটবেলা থেকেই তাঁরা নবীগৃহে স্বয়ং রাসূলে পাক (সা.) হতে দ্বীনি শিক্ষা লাভ করেন। পিতা ‘জ্ঞানের দরজা’ হজরত আলী (রা.) ও মাতা খাতুনে জান্নাত ফাতিমার সান্নিধ্য ছিল তাঁদের শিক্ষার সবচেয়ে বড় সহায়ক।
হজরত হোসাইন (রা.) ছিলেন একজন উৎকৃষ্ট কোরআনে হাফেজ ও জগৎশ্রেষ্ঠ ক্বারী। মসজিদে নববীর আঙিনায় খুব অল্প বয়সেই তিনি পবিত্র কোরআন হেফজ করেন। তাঁর সুললিত কণ্ঠের কোরআন তিলাওয়াত শোনার জন্য সাহাবীরা ছিলেন দিওয়ানা। ইবাদত-বন্দেগিতে তিনি ছিলেন একনিষ্ঠ, অতুলনীয়। আয-যুবায়ের বিন বকর (রা.) বলেন, মুসআব আমাকে জানিয়েছেন যে হযরত হোসাইন (রা.) ২৫ বার মদীনা থেকে মক্কায় পায়ে হেঁটে পবিত্র হজ পালন করেছেন। আল্লাহর প্রিয় এই বান্দা  নামাজের প্রতি প্রচন্ড আকর্ষণ অনুভব  করতেন সবসময়। শাহাদাতে কারবালার অর্থাৎ আশুরার পূর্ব রাতে তিনি পরিবার পরিজন নিয়ে অবর্ণনীয় ক্ষুৎপিপাসায় কাতর অবস্থায়ও সারারাত আল্লাহ্র আরাধনায় মশগুল ছিলেন। আশুরার দিন শাহাদাতের পূর্বমুহূর্তে শহীদি খুনে রক্তাক্ত কারবালা প্রান্তরে শত্রু সৈন্য বেষ্টিত সঙ্কটময় মুহূর্তেও জোহরের নামাজ আদায় করেন।
ইমাম হোসাইন (রা.) কেমন জ্ঞান সাধক ছিলেন তার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ হলো : একবার আমীর মুয়াবিয়া (রা.) কুরাইশ বংশীয় একজন লোককে বলেছিলেন, “মসজিদে নববীতে যখন তুমি একদল লোককে (একজনকে ঘিরে) চক্রাকারে নিশ্চল হয়ে বসে থাকতে দেখবে, যেন মনে হবে তাদের মাথার ওপর পাখি বসে আছে, ধরে নেবে যে, তা হচ্ছে আবু আবদুল্লাহ্র (ইমাম হোসাইনের) পাঠচক্র, যাঁর জামা হাতের কব্জির অর্ধেকাংশ পর্যন্ত প্রলম্বিত। লোকেরা তাঁর পাঠ গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছে।” ফিক্হশাস্ত্রে তাঁর জ্ঞান ছিল গভীর। (তারিখে ইবনে আসাকির)
ঘোড়সওয়ার ও অসি চালনায় তিনি বিশেষ দক্ষতা অর্জন করেন। কিশোর বয়স হতেই ইমাম হোসাইন (রা.) যুদ্ধবিদ্যার সবক গ্রহণ করেন। যৌবনে পদাপর্ণের সাথে সাথে তিনি মুসলিম সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। তিনি দু-একটি যুদ্ধেও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। জিহাদের ডাকে প্রয়োজনের মুহূর্তে সাড়া দিতে তিনি কখনো পিছপা হতেন না। বাইজেন্টাইন (রোমান) সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) জয়ের যুদ্ধেও এই অকুতোভয় সৈনিক অংশ নিয়েছিলেন। জিহাদের ময়দানে তাঁর উপস্থিতি মুসলিম মুজাহিদদের অপরিসীম অনুপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ করত।
তিনি ছিলেন দানশীল। গরিব অসহায়ের দরদি। তাঁর দুয়ার হতে কেউ খালি হাতে ফিরে যায়নি। মানুষের অসহায়ত্ব দেখলে তাঁর মন হাহাকার করে উঠত।
একবার এক গ্রাম্য গরিব বেদুইন মদীনার অলিগলি ঘুরে কোথাও কিছু না পেয়ে ইমাম হোসাইন (রা.)-এর দুয়ারে এসে হাজির। তিনি তখন গভীর  মনোযোগের  সাথে নামাজে রত। ভিক্ষুকের হাঁকডাকে তাড়াতাড়ি নামাজ শেষ করে দুয়ারে এসে দেখেন গরিব লোকটির অবস্থা সত্যিই শোচনীয়। তিনি গৃহভৃত্য কাম্বারের কাছে জানতে পারলেন তাঁর পরিবারের খরচের জন্য মাত্র ২০০ দিরহাম অবশিষ্ট আছে। তিনি বললেন, তা নিয়ে এসো, কারণ এমন একজন প্রার্থী এখানে উপস্থিত হয়েছে যার প্রয়োজন আমার পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজনের চাইতে অনেক বেশি। ইমাম হোসাইন (রা.) সে অর্থের পুরোটাই গরিব বেদুইনের হাতে তুলে দিয়ে বললেন : এটা রাখো, আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাই, আমার অন্তর তোমার জন্য বিগলিত, আমার যদি আরো থাকত, তাও তোমাকে দিয়ে দিতাম। উন্মুক্ত আকাশ হতে সম্পদের বারিপাত ঝরুক তোমার মাথার ওপর; কিন্তু ভাগ্যের ওপর সন্দেহ আমাদের অসুখী করে রাখে।”
ভিক্ষুকটি ইমাম বংশের মর্যাদার কথা কৃতজ্ঞচিত্তে উচ্চারণ করতে করতে বিদায় নিলো। (তারিখে ইবনে আসাকির ৪র্থ খন্ড)
তিনি ঋণগ্রস্ত অনেক সাহাবীকে ঋণমুক্ত করেছেন। কবিদের তিনি ভালোবাসতেন। মুক্ত হস্তে তাদের দান করতেন। কেউ কেউ তাতে আপত্তি করলে তিনি বলতেন : সেই অর্থই সর্বোত্তম যা একজন মানুষের মর্যাদা রক্ষা করে। (তাহজিবুল কামাল)
তিনি বিভিন্ন মজলিসে লোকদের উদ্দেশে বলতেন, “যে দানশীল সে-ই সম্মানিত হবে, যে কৃপণ সে লাঞ্ছিত হবে। আপন প্রয়োজনের অর্থ বিলিয়ে দেয়ার মাঝেই রয়েছে মহত্ত্ব। প্রতিশোধ নেয়ার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যে ক্ষমা করে দেয় সে-ই সবচেয়ে উত্তম। আত্মীয়তার বন্ধনকে যে অটুট রাখে সে-ই শ্রেষ্ঠ। যে অন্যকে ইহ্সান করে আল্লাহ্ তাকে ইহ্সান করেন, কারণ আল্লাহ্ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”
হজরত উসামা বিন যায়েদ (রা.) অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি ভাবলেন যে তাঁর সময় শেষ হয়ে এসেছে। তিনি বলতে লাগলেন, “আমি তো ৬০ হাজার দিরহাম ঋণী। এটা আদায় হলে আমার মৃত্যুকালীন কষ্ট লাঘব হতো। কে আমার ঋণভার লাঘব করবে?”
ইমাম হোসাইন (রা.) এ কথা শুনলেন। তিনি কালবিলম্ব না করে উসামার কাছে গেলেন এবং তাঁর সব ঋণ পরিশোধ করে দিলেন।
ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন স্নেহশীল পিতা, অনুগত ভ্রাতা এবং আত্মীয়তার অটুট বন্ধনে আবদ্ধ একজন আদর্শ মানব। তাঁর সন্তানরা যেমন তাঁকে হৃদয় দিয়ে ভালোবাসত তেমনি আত্মীয়স্বজনরা মক্কা হতে কুফার পথে পথে, কারবালা প্রান্তরে গভীর সঙ্কটময় মুহূর্তেও তাঁর সাথে ছিলেন। একে একে সকল পুরুষ সদস্য হাসিমুখে শাহাদাতের পিয়ালা পান করেছেন তবুও ইমামকে একা ছেড়ে যাননি। পৃথিবীর ইতিহাসে এ দৃশ্য বিরল। ইমাম হাসান (রা.) কর্তৃক আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর পক্ষে খিলাফত ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত প্রথমে ইমাম হোসাইন (রা.) মানতে চাননি। কিন্তু যখন দেখলেন ইমাম হাসান (রা.) তাঁর সিদ্ধান্তে অটল তখন তিনি বললেন, “আপনি আমার চেয়ে বড়, আপনি খলিফা ও আমার গুরুজন, আপনাকে মানার জন্য আমি আদিষ্ট হয়েছি; অতএব আপনার কাছে যা উত্তম বলে মনে হয় তাই করুন।” (তাহাজিবুল কালাম ৬ষ্ঠ খন্ড)

নবী-নন্দিনী ফাতিমা যাহরার প্রিয় পুত্র ইমাম হোসাইন (রা.) ছিলেন পরম বাগ্মী ও  শৈল্পিক মানুষ। তিনি যখন কথা বলতেন তা যেন কথা নয়, তখন মনে হতো যে তাঁর মুখ দিয়ে ঝরে পড়ছে মুক্তোর দানা। কবিত্ব শক্তিতেও তিনি ছিলেন বলীয়ান। তাঁর কাব্যপ্রতিভার অনেক নিদর্শন ছড়িয়ে আছে আরবি সাহিত্যে। তাঁর অধিকাংশ কবিতায় ফুটে উঠেছে নীতিকথা, মানুষের কল্যাণমূলক উপদেশ। যেমন :
#    যদি দুনিয়ার জীবনকে বেশি মূল্যবান মনে করা হয়, স্মরণ রেখ আল্লাহ্র পুরস্কার তার চেয়েও মর্যাদার ও অতীব চমৎকার।
#    যদি দেহকে তৈরি করা হয়েছে-মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার জন্য- তাহলে তলোয়ারের আঘাতে মৃত্যুই অধিক শ্রেয়।
#    পৃথিবীর সমস্ত সম্পদকেই যদি মৃত্যুর মাধ্যমে ছেড়ে যেতে হয় তাহলে সম্পদ বিলিয়ে দিলে ক্ষতিই বা কী?
#    দু’দিনের এ সম্পদ নিয়ে কেনই বা এত কৃপণতা!
তিনি অন্য একটি কবিতায় বলেছেন :
সৃষ্টির মুখাপেক্ষী হয়ো না
নির্ভার হয়ে নির্ভর করো স্রষ্টার ওপর,
সত্যবাদী হোক কিংবা মিথ্যাবাদী
কারো হাতে মিটবে না তোমার প্রয়োজনÑ
মহান আল্লাহ্র অফুরন্ত ভান্ডার হতে
তালাশ করো তোমার রিজিক।
তিনি ছাড়া রিজিকের মালিক আর কেউ নেই।
যে বিশ্বাস করে মানুষই তার প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা রাখে
বুঝতে হবে পরম দয়াল দাতার প্রতি তার বিশ্বাস অনিশেষ শূন্য।
ইমামের কবিতার মধ্য দিয়েই তাঁর মনোভাব প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাঁর কষ্টার্জিত অর্থ রিক্ত হস্তে দান করে তিনি যখন অসহায়ের দুঃখ লাঘব করছেন তখন ইয়াজিদ ও তার দোসররা রাষ্ট্রীয় কোষাগার বায়তুলমালকে নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করে লুটেপুটে খাচ্ছে আর চারিদিকে ষড়যন্ত্রের জাল বুনে অবৈধ ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার অপপ্রয়াস চালাচ্ছে। নবী দৌহিত্র এ অন্যায় অবিচার দেখে কিভাবে মুখ বুজে সহ্য করে থাকতে পারেন?
প্রজ্ঞাবান অনুপম চরিত্রের অধিকারী ইমাম হোসাইন (রা.) এর ব্যক্তিত্ব ছিলো অতুলনীয়। ইয়াজিদ যখন তার পিতার অবৈধ অসিয়তনামার বদৌলতে মুসলিম উম্মাহ্র ঘাড়ে চেপে বসে তখন তার এমন কোনো গুণ ছিল না যে মানুষ তাকে সানন্দে আমীরুল মুমিনিন হিসেবে মেনে নেবে। যেখানে (সমকালীন সর্বজন শ্রদ্ধেয়) হযরত আবদুল্লাহ্ ইবনে যুবায়ের, আবদুল্লাহ্ ইবনে ওমর, আবদুল্লাহ্ ইবনে আব্বাস (রা.) প্রমুখ উচ্চমর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গ কেউই তার হাতে বায়াত হননি এবং প্রকৃত পক্ষে হযরত হাসান (রা.) ও আমীর মুয়াবিয়া (রা.)-এর সাথে সম্পাদিত চুক্তি অনুযায়ী ইমাম হোসাইন (রা.)-ই ছিলেন খেলাফতের একমাত্র হকদার; সেখানে তিনি কি করে তার অবৈধ অগণতান্ত্রিক শাসন মেনে নেবেন?
ইয়াযিদ যখন অনৈতিকভাবে রাজসিংহাসনে আরোহণ করেন তখন তার বয়স মাত্র সাঁইত্রিশ বছর। আর ইমাম হোসাইন (রা.) জ্ঞানে গুণে পরিপক্ব ছাপ্পান্ন বছরের এক পরিপূর্ণ কামিল ইনসান। বংশানুক্রমিকভাবে নানা, বাবা ও মায়ের পূত-পবিত্র স্বভাব ও গুণাবলি; সর্বোপরি পিতার বীরত্ব তাঁর মাঝে বিরাজমান ছিল।
ইংরেজ ঐতিহাসিক প্রফেসর সিডিলট ইমাম হোসাইনের (রা.) সহজ-সরল জীবনের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “তাঁর মধ্যে একটি গুণেরই অভাব ছিল, তা হলো ষড়যন্ত্রের মানসিকতা; যা ছিল উমাইয়া বংশীয়দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।” (প্রাগুক্ত- পৃ: ৮৪)
শাহাদাত লাভের জন্য এমন উদগ্রীব মানুষ এ পৃথিবীতে খুব কমই পরিদৃষ্ট হয়েছে। তিনি বলতেন, “শরীরের জন্য যদি মৃত্যুই অনির্বায, তবে আল্লাহ্র পথে শহীদ হওয়াই মানুষের জন্য উত্তম?” জিহাদের জন্য নিজের ধন-সম্পদ পুত্র-পরিজন ও নিজের জীবনকে দৃঢ়চিত্তে, স্থির মস্তিষ্কে উৎসর্গ করার মাধ্যমে তিনি তা প্রমাণ করেছেন। জীবন উৎসর্গের এমন একটি দৃষ্টান্ত এ পৃথিবীতে আর একটিও নেই। ‘সৎকাজের আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের’ খোদায়ী আহ্বানে সাড়া দানের এ বিরল নজির আর কোথাও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
ইমাম হোসাইন (রা)-এর চারিত্রিক মাধুর্যের ম্যাগনেটিক পাওয়ার (আকর্ষণশক্তি) এতই প্রবল ছিল যে, পরম শত্রুও তাঁর মিত্রে পরিণত হয়েছিল। ইয়াজিদ বাহিনীর একাংশের কমান্ডার হোর ইবনে ইয়াজিদ নিজের জীবন বিপন্ন করে হোসাইন (রা.)-এর  পক্ষে লড়াই  করেছিলেন। শুধু কি একা! না, ৩০ জন ইয়াজিদী সৈন্যসহ। আহলে বাইতের ইজ্জত-আব্রু রক্ষার্থে সম্মুখ সমরে অংশ নিয়ে এ জিন্দাদিল মুজাহিদগণ একে একে নিজেদেরকে কারবালা প্রান্তরে কুরবান করে দিলেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এটি বিরল ঘটনা।
বন্ধু, আত্মীয়-পরিজন, ভাইয়ের সন্তান, নিজের সন্তানদের একের পর এক মৃত্যু (শাহাদাত) প্রত্যক্ষ করেও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ইমাম হোসাইন (রা.) ক্ষণিকের জন্য বিব্রত, বিচলিত হননি। নিশ্চিত মরণ জেনেও তাঁর পদযুগল একটুও টলেনি। একবারের জন্যও শত্রুকে পৃষ্ঠ প্রদর্শন করেননি। পর্বতসম দৃঢ়তা নিয়ে প্রগাঢ় আস্থার সাথে একাকী শতসহস্র ইয়াজিদী সৈন্যের বিরুদ্ধে সিংহের মত লড়াই করে হাসিমুখে শহীদ হলেন। কিন্তু আল্লাহ্ ও রাসূল (সা) বিরোধী অগণতান্ত্রিক, অবৈধ, স্বৈরশাসকের হাতে হাত মেলাননি। এ অসম, একতরফা চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধে নিজের পরিণতি কী হতে পারে তা পূর্বাহ্নে স্থির নিশ্চিত জেনেই এ আপসহীন সিপাহসালার শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। তিনি প্রায়ই বলতেন, “নির্যাতনকারীর আনুগত্য জঘন্যতম অপরাধ। আমি মৃত্যুকে সৌভাগ্য মনে করি। কিন্তু জালিমের সাথে জীবন যাপনকে অন্যায় ছাড়া কিছুই মনে করি না।”
কারবালায় কি হোসাইনের মৃত্যু হয়েছে? না- প্রকৃত মৃত্যু সাধিত হয়েছে ইয়াজিদের। পাপিষ্ঠ ইয়াজিদ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, পক্ষান্তরে হোসাইন (রা) কিয়ামত পর্যন্ত মুমিন হৃদয়ে চিরঞ্জীব থাকবেন।
হোসাইন (রা)-এর পবিত্র খুন কিয়ামত পর্যন্ত সকল মজলুম মুসলমানের হৃদয়ে বিপ্লবের অগ্নিশিখা রূপে প্রজ্বলিত হবে। দেশে দেশে কোরআন-সুন্নাহ বিরোধী রাজতন্ত্রী, অগণতান্ত্রিক, স্বৈরশাসকদের পতন ঘটাবে।
ইমাম হোসাইন (রা.)-এর পূত-পবিত্র চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অর্জনের মধ্যে আমাদের কল্যাণ রয়েছে। রাসূলে পাক (সা.) এর সহী ও সুপ্রসিদ্ধ সেই হাদিসটি সদা স্মরণযোগ্য :
“হোসাইন আমার থেকে আর আমি হোসাইন থেকে। যে হোসাইনকে ভালোবাসে, আল্লাহ্ তাকে ভালোবাসেন; সে আমার দৌহিত্রের একজন। যে আমাকে ভালোবাসে সে যেন হোসাইনকে ভালোবাসে।”
আল্লাহ্র জমিনে আল্লাহ্র দ্বীন কায়েমের লক্ষ্যে আমাদের সবার উচিত ইমাম হোসাইন (রা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা প্রদর্শন ও তাঁর আদর্শ অনুকরণ। মহান আল্লাহ্ নবী বংশের শহীদগণের শাহাদাত কবুল করুন, তাঁদের মর্যাদা চিরকাল সমুন্নত রাখুন।

লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE