ইমিউন সিস্টেমের রহস্য উদঘাটন

গোলাপ মুনীর..

ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও অন্যান্য পরজীবী হচ্ছে অতি ক্ষুদ্র অণুজীব। বিজ্ঞানের ভাষায় মাইক্রোঅর্গানিজম। এসবের আক্রমণ থেকে নিজেদের রক্ষার জন্য প্রাণিকুলের রয়েছে কয়েক স্তরের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা। এর প্রথম স্তরটি হচ্ছে শরীরের চামড়া এবং বাহ্যিক তরল নিঃসরণ। আমাদের শরীরে ঢুকতে চাওয়া অণুজীব এই স্তরে আটকা পড়ে। যদি এই দৈহিক স্তর ভেঙে কোনো অণুজীব শরীরে প্রবেশ করতে চায়, তখন শরীরের ইমিউন সিস্টেম তথা রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা তাৎক্ষণিকভাবে আপনা-আপনি সাড়া দিয়ে অণুজীবকে শরীরে ঢুকতে বাধা দেয়। কোনো আঘাত ও সংক্রমণের সময় শরীরে এই ইমিউন সিস্টেম আক্রমণকারী অণুজীবের আক্রমণ প্রতিহত করে তা ধ্বংস করে দিতে পারে। এই সহজাত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইনেইট ইমিউন সিস্টেম সব গাছপালা ও প্রাণীর মধ্যেই রয়েছে। এই প্রতিরোধব্যবস্থা যদি হামলাকারী অণুজীবকে ঠেকাতে না পারে, তবে দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধব্যবস্থা সে দায়িত্ব নেয়। এই দ্বিতীয় স্তরের প্রতিরোধব্যবস্থার নাম অ্যাডাপ্টিভ বা অ্যাকোয়ার্ড ইমিউন সিস্টেম। অ্যাডাপ্টিভ ইমিউন সিস্টেম তৈরি করে অ্যান্টিবডি বা প্রতিবস্তু, যা লড়াই করে সংক্রমণের বা হন্তক কোষের বিরুদ্ধে। এই প্রতিবস্তু ধ্বংস করে দেয় সংক্রমিত কোষকে। এই অ্যাডাপ্টিভ ইমিউন সিস্টেম রয়েছে শুধু চোয়ালওয়ালা মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে।
রোগজনক অণুজীব বা প্যাথোজেনের বিরুদ্ধে ইনেইট ইমিউন সিস্টেম যতটা দ্রুত সক্রিয় হয়, অ্যাডাপ্টিভ ইমিউন সিস্টেম কাজ করে তার চেয়ে ধীরগতিতে। প্রথম ইমিউন সিস্টেম দ্রুত থামিয়ে দেয় ইনফেকশন মেমরি। দ্বিতীয় ধরনের ইমিউন সিস্টেম একটু সময় নিয়ে সরিয়ে দেয় ইনফেকশন মেমরি। দ্বিতীয় স্তরে এসেই শরীরের প্যাথোজেন পুরোপুরি সরানো কাজ সম্পন্ন হয়। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যখন ইনেইট ইমিউনিটি প্যাথোজেনের মেমরি আটকায় না, তখন অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটি তৈরি করে একটি ইমিউনজিক্যাল মেমরি, যার মাধ্যমে এই স্তরের ইমিউনিটিতে দ্রুত কাজ করার শক্তি জন্ম নেয়। এর ফলে এই স্তরে জোরালো সাড়া দেয়ায় ক্ষমতা সুষ্টি হয়। এই দুই স্তরের ইমিউন সিস্টেম সংক্রমণের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলে। যখন এই দুই স্তরের প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়, তখন প্রদাহ বা জ্বালাযন্ত্রণাদায়ক রোগ অটোইমিউন ডিজঅর্ডার সৃষ্টি হতে পারে।
২০১১ সালের চিকিৎসা বিষয়ের ওপর নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে তিন বিজ্ঞানীকে। এরা উদঘাটন করেছেন উল্লিখিত উভয় ধরনের ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করে তোলার কৌশল। এ পুরস্কারে অর্ধেক অর্থ পেয়েছেন জুলস হফম্যান ও ব্রুস বেউটলারকে, তাদের ইমিউন সিস্টেম সক্রিয় করা সম্পর্কিত আবিষ্কারের জন্য। আর বাকি অর্ধেক অর্থ  দেয়া হয়েছে রালফ স্টিনম্যানকেÑ তার ডেনড্রাইটিক সেল ও অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটির ভূমিকা সম্পর্কিত আবিষ্কারের জন্য। ইনেইট ও অ্যাডপ্টিভ পর্যায়ে কিভাবে ইমিউন-ব্যবস্থা কাজ করে, তা আবিষ্কার করে এই তিন নোবেল বিজয়ী বিজ্ঞানী রোগকৌশল বা ডিজিজ মেকানিজমে নতুন গভীর দৃষ্টিভঙ্গি যোগ করেছেন। তাদের এই আবিষ্কারের ফলে বিভিন্ন সংক্রমণ, ক্যান্সার ও যন্ত্রণাদায়ক রোগের, এমনকি অটোইমিউন ডিজিজের প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন ও চিকিৎসা উদ্ভাবনের পথ খুলে গেছে।
জুলস হফম্যানের বয়স ৭০। সর্বশেষ চাকরি করেছেন ১৯৭৪-২০০৯ সাল পর্যন্ত ফ্রান্সের স্ট্রাসবুর্গ ইউনিভার্সিটিতে। এ বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই ১৯৬৯ সালে তিনি সম্পন্ন করেন তার ডক্টরাল ডিগ্রি। সেখানেই চলে তার এই পুরস্কার-বিজয়ী গবেষণাকর্ম। ব্রুস বেউটলারের বয়স ৫৪। কাজ করতেন যুক্তরাষ্ট্রের লা জুলার স্ক্রিপস রিসার্চ ইনস্টিটিউটে। যদিও তিনি তার নোবেল-জয়ী গবেষণাকর্ম করেন নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে ডালাসের ইউনিভার্সিটি অব টেক্সাসে। রালফ স্টিনম্যান আজ বেঁচে নেই। অভিযোগ উঠেছে, ১১০ বছরের নোবেল ফাউন্ডেশনের নিয়ম ভেঙে এই প্রথমবারের মতো তাকে মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেয়া হলো। কারণ, মরণোত্তর নোবেল পুরস্কার দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। এই পুরস্কার ঘোষণা করা হয় গত ৩ অক্টোবরে। আর তিনি মারা যান এর ৩ দিন আগে ৩০ সেপ্টেম্বর।
নোবেল ফাউন্ডেশন এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করে, স্টিনম্যানের মৃত্যুর খবর রকফেলার ইউনিভার্সিটির মাধ্যমে ক্যারোলিন্স্কা ইনস্টিটিউটে নোবেল অ্যাসেম্বলিতে এসে পৌঁছে ইউরোপীয় সময় ৩ অক্টোবর বিকেল আড়াইটায়। আর নোবেল অ্যাসেম্বলি এই পুরস্কার ঘোষণা করে ওই দিন সকাল সাড়ে ১১টায়। নোবেল ফাউন্ডেশনের স্ট্যাটিউট অনুযায়ী মুত্যুর পর কারো কর্ম উপস্থাপন করা হলে, তাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া যাবে না। তবে কারো মৃত্যুর আগে পুরস্কার ঘোষণা করা হলে এবং পুরস্কার গ্রহণের আগে তিনি মারা গেলে তাক পুরস্কার দেয়া যাবে। অতএব নোবেল ফাউন্ডেশনের ব্যাখ্যা হচ্ছে, রালফ স্টিনম্যানকে চিকিৎসায় এ বছর নোবেল পুরস্কার দিয়ে ফাউন্ডেশন কোনো নিয়ম ভঙ্গ করেনি। এবার তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে এই সরল বিশ্বাসে যে, তিনি বেঁচে আছেন। স্টিনম্যান কাজ করতেন রকফেলার ইউনিভার্সিটিতে। তিনি তার মূল্যবান এ গবেষণায় নিয়োজিত ছিলেন ১৯৭০ সাল থেকে। মারা যান ৬৮ বছর বয়সে।
ওয়াচডগ সেল : ১৯৭৩ সালে স্টিনম্যান জেনবিল এ. কোহেনের সাথে একযোগে কাজ করে একটি নতুন ধরনের কোষ আবিষ্কার করেন। তিনি এর নাম দেন ডেনড্রাইটিক সেল। সংক্ষেপে ডিসি। অনুমান করা হয়, ইমিউন সিস্টেমের জন্য এই সেল বা কোষ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ডিসি সেলগুলো একটি গাছের মতো। এটি প্রথম আবিষ্কার হয় জার্মানিতে ১৮৬৯ সালে। আবিষ্কার করেন পল লেঙ্গারহ্যানস। তিনি মনে করতেন, এগুলো স্নায়ুব্যবস্থা বা নার্ভাস সিস্টেমের অংশ। এ সেলগুলো পাওয়া গিয়েছিল দেহ ও পরিবেশের ইন্টারফেসগুলোতেÑ চামড়ার বাইরের স্তরের মতো। ডিসিগুলো রয়েছে বায়ুপথ ও অন্ত্রের উপরি ভাগে। সেখানে এরা কাজ করে গেটকিপারের মতো।
মজার ব্যাপার হলো, গত বছর এক ভিডিও ইন্টারভিউয়ে স্টিনম্যান বলেছিলেন, কুইবেকের স্কুল থেকে পাস করে ম্যাকগ্রিল বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়ার আগ পর্যন্ত জীবিজ্ঞানের প্রতি তার কোনো আগ্রহ ছিল না। এ বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে তিনি জীববিজ্ঞানের কোর্স করেন। তিনি বলেন, আমি জানতে চাইÑ কী করে ইমিউন সিস্টেম সাড়া দেয়, কিভাবে এ সিস্টেম কাজ করে। এই আগ্রহই আমাকে নিয়ে যায় রকফেলার বিশ্ববিদ্যালয়ে। তিনি বলেন, ইমিউন সিস্টেমের রয়েছে নানা প্রক্রিয়া। এরা শরীরে অব্যাহতভাবে সংক্রমণ ঠেকানোর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে চলে। এগুলো শরীরকে শিখিয়ে দেয়, কখন কোন প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। আমাদের আগে ইমিউন সিস্টেম সম্পর্কে যা আবিষ্কার করে গেছেন, তা টেস্ট টিউবে সৃষ্টি করা হয়। কিন্তু কিছু একটা আড়ালে থেকে যায় এই টেস্ট টিউবে। ফলে আমরা মাইক্রোস্কোপ ব্যবহার করে নজর দিই কোষের ওপর। আমরা চিহ্নিত করি এমন কিছু কোষ, যা এর আগে কেউ দেখেননি। এগুলোই অবাক করা ডেনড্রাইটিক কোষ।
১৯৬০-এর দশকে এমনটি প্রমাণিত হয় যে, এক ধরনের শ্বেতকোষ (লিম্পোসাইটস) ‘টি-সেল’ ও কিছু অ্যাক্সেসরি সেল স্তন্যপায়ী প্রাণীর মধ্যে সেল-মেডিয়েটেড ইমিউনের সাড়ার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তখনো এসব সেলের পরিচয় ও কাজ সম্পর্কে আমাদের কিছুই জানা ছিল না। স্টিনম্যান ও কোহেন ইমিউন সিস্টেমের সাড়া দেয়ার বিষয়টি জানার জন্য গবেষণা করছিলেন স্পিøন সেল বা প্লিহা কোষ নিয়ে। এরা প্রমাণ করতে সক্ষম হন, ডিসি সেলের উপস্থিতির কারণেই ইমিউন সিস্টেমের সাড়া জোরালো হয়। প্রথম দিকে গবেষণার এ ফলাফল নিয়ে সংশয় ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে প্রমাণ করেন ডিসি সেল টি-সেলকে সক্রিয় করায় অনন্য অবদান রাখতে সক্ষম। শরীরের ওয়াচডগ হিসেবে ডিসি সেল ক্ষতিকর ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া ও বিষাক্ত অণুজীবকে দেহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ডিসি সেলগুলোর একটি কাজ হচ্ছে অ্যান্টিজেনগুলোকে আটক করে এগুলোকে ছোট ছোট টুকরায় বিভাজন করা। ডিসিগুলো তখন চলে যায় ইমিউন বা লিম্পোয়েড টিস্যুতে। বিজ্ঞানের ভাষায় ডিসি সেলগুলো সেলের সাইটোপ্লাজমের মধ্যে অ্যান্টিজেনগুলোকে পেপটাইডে রূপান্তর করে। আর এই পেপটাইডগুলো তখন বন্ধন সৃষ্টি করে ‘মেজর হিস্টোকম্পাটিবিলিটি কমপ্লেক্স (এমএইচসি)-এর উৎপাদগুলোর সাথে। এমএইচসি হচ্ছে জেনোমের সেই এলাকা, যা ইমিউনিটি ও অটোইমিউনিটির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এরপর এই এমএইচসি সেলের উপরি ভাগে প্রবেশ করে টি-সেলে অ্যান্টিজেন দেয়ার জন্য। এটি তখন টি-সেলকে সিগন্যাল দেয় অণুজীবের আক্রমণ ঠেকাতে সাড়া দিতে। বিশেষ করে তা বি-সেল নামের রক্তকোষকে সক্ষম করে তোলে সংক্রমণ দূর করার মতো প্রতিবস্তু তৈরি করতে। আর কিলার টি-সেলকে তৈরি করে সংক্রমিত কোষ ধ্বংস করতে।
কিন্তু এখনো বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে, কী করে ইমিউন সিস্টেম শুরুতেই জানতে পারে যে সংক্রমণ ঘটেছে। ক্লিনিকের লোকেরা দীর্ঘদিন ধরে জেনে আসছে, রোগীদের রয়েছে বিভিন্ন পর্যায়ের ইনেইট ইমিউনিটি। যেমন- যদি রোগীর নিউট্রোফিলস না থাকে, প্রাথমিক পর্যায়ে সংক্রমণের সময় যে রক্তকোষ রক্তধারায় প্রত্যাবাসিত হয়, সেগুলো সব ধরনের সংক্রমণের ভয়াবহ ঝুঁকিতে থাকে। এখানে ইনেইট ইমিউনিটি ছাড়া আর কোনো কিছুই সাড়া দেয় না। কিন্তু কিভাবে এই ইনেইট ইমিউনিটি সাড়া দেয়? এখানে মেকানিজম বা কৌশলটা কী, যা আমাদের সতর্ক করে তোলে? এটি সহজবোধ্য, ইমিউন সিস্টেমের রয়েছে একটি জেনেটিক্যালি প্রোগ্রামড ক্যাপাসিটি, যার মাধ্যমে ইমিউনিটি সিস্টেম কোনো অণুজীবের উপস্থিতি ধরতে পারে এবং দাঁড় করতে পারে কিছু বিশেষ সেন্সর বা রিসেপ্টর মলিকিউল। কিন্তু এই রিসেপ্টরগুলো কী?
১৯৯৬ সালে হফম্যান স্ট্রাসবুর্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে তার সহকর্মীদের নিয়ে পরীক্ষা করে দেখেন, কী করে ড্রসোফিলা অর্থাৎ ফলের মাছি সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তিনি দেখতে পেলেন, যেসব মাছির জিনে টুল নামের মিউটেশন জিন রয়েছে, সেগুলো ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের বিরুদ্ধে সংক্রমণবিরোধী কোনো কার্যকর সাড়া দিতে পারে না। আসলে হফম্যান ও তার সহকর্মীরা পরীক্ষা করে দেখছিলেন- পোকামাকড় কিভাবে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তারা চিহ্নিত করেন কিছু পেপটাইড। ইমিউন সিস্টেম এই পেপটাইড সৃষ্টি করে এ কাজের জন্য। এই পরীক্ষা শেষ হয় অ্যান্টিমাইক্রোবায়েল পেপটাইডের জন্য প্রমোটার সিকুয়েন্সে টুল জিনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা চিহ্নিত করার মাধ্যমে। এটি জানার মাধ্যমে এটুকু স্পষ্ট হয়, টুল জিনের মলিকুলার প্রডাক্ট প্যাথোজেনিক অরগানিজমকে সক্রিয় করার পেছনে ভূমিকা পালন করে। আর এই টুল সক্রিয়করণ ইমিউন সিস্টেমকে সক্রিয় করার জন্য অপরিহার্য। ১৯৯৮ সালে ব্রুস বেউটলার টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সময় দেখতে পেলেন, পরিবর্তীত জিন ইঁদুরের মধ্যে লাইপোপলিসেকারাইড (এলপিএস) নামের ব্যাকটেরিয়া দমনের ব্যাপক ক্ষমতা রয়েছে। বেউটলার ও তার সহযোগীরা দেখলেন, ইঁদুরের পরিবর্তীত জিন আর টুলসদৃশ জিন একই ধরনের। টুলসদৃশ এই জিনের নাম টুল-লাইক রিসেপ্টর বা টিএলআর। যখন টিএলআর বন্ধন গড়ে তোলে এলপিএস-এর সাথে, তখন সিগন্যাল সক্রিয় হয়। হফম্যান ও বেউটলারের আবিষ্কার থেকে জানা যায়, স্তন্যপায়ী প্রাণী ও ফলের মাছি সংক্রমণের বিরুদ্ধে ইনেইট ইমিউন ব্যবস্থাকে সক্রিয় করে তুলতে একই ধরনের মলিউকুল ব্যবহার করে।
শেষ কথা : বিজ্ঞানীদের এই সেন্সর মলিউকুল আবিষ্কারের ফলে ইনেইট ইমিউনিটি নিয়ে গবেষণাকর্ম ব্যাপক বেড়ে গেছে। এরই মধ্যে এক ডজনেরও বেশি টিএলআর চিহ্নিত করা হয়েছে মানুষ ও ইঁদুরের দেহে। এগুলোর প্রত্যেকটি প্রোগ্রাম করা হয়, যাতে এগুলো মাইক্রোঅর্গানিজমের সুনির্দিষ্ট ধরনের কিছু মলিকিউল চিনতে পারে। যখন কোনো ব্যক্তির মাঝে জিনের পরিবর্তন ঘটে, তখন টিএলআরের কারণে তার ইনফ্লেমেটরি রোগের বা যন্ত্রণদায়ক রোগের ঝুঁকি থাকে।
আগেই বলা হয়েছে, সংক্রমণ ঠেকাতে ইনেইট ইমিউনিটি যখন ব্যর্থ হয়, তখন সে দায়িত্ব নেয় অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটি। অতএব এটি স্পষ্টÑ ইনেইট ইমিউনিটি এমন কাজ করে, যার ফলে অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটি যথাযথভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। এই স্তরের ইমিউনিটির মধ্যে সঠিক সংশ্লিষ্টতার কৌশলটা কী, তা এখনো অস্পষ্ট। বেউটলার ও তার সহকর্মীরা স্ক্রিপস ইনস্টিটিউটের ডেভিড নামাজিস ল্যাবরেটরির সহায়তায় প্রমাণ করতে সক্ষম হন, কার্যকর প্রতিবস্তু উৎপাদনে সিগন্যালিংয়ের জন্য টিএলআর প্রয়োজনীয় নয়। এ থেকে এরা সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন, প্রচুরসংখ্যক অন্য্যান্য জিন অ্যাডাপ্টিভ ইমিউনিটির সহায়তা করে থাকতে পারে।
আমরা আশা করছি, নিকট ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা প্রাণিকুলের ইমিউনিটি সিস্টেম বা সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্পর্কে আরো ভালো করে জানতে পারবেন, আর সেই সূত্রে আমরা আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেমকে আরো কার্যকরভাবে সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজে লাগাতে পারব। বাঁচতে পারব অনেক রোগের হাত থেকে।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply