ইসরাইল, ইরান এবং ওবামার মতিগতি

মীযানুল করীম

কিছু দিন আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদে শপথ নিয়েছেন বারাক ওবামা। নির্বাচনে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট ও ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী বারাক হোসেন ওবামা এবং রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী মিট রমনি। ওবামা কৌশলগত কারণে হোক আর যে কারণেই হোক, নির্বাচনী প্রচারণায় ইরানের বিষয়ে সংযম প্রদর্শন করেছেন। তিনি ইরানের কথিত পারমাণবিক অস্ত্র ইস্যুর সুরাহার জন্য সামরিক পন্থার চেয়ে কূটনৈতিক প্রয়াসের ওপর বেশি জোর দিয়েছেন তখন। অপর দিকে, আফগানিস্তান ও ইরাকে আগ্রাসনের হোতা, সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের দল রিপাবলিকান পার্টি ইরান ইস্যুতে উগ্র প্রপাগান্ডা চালায়। তাদের প্রার্থী রমনি ইরানে সামরিক হামলার পক্ষে। তাদের দৃষ্টিতে ইরানের দোষ আসলে যতটা না পরমাণু শক্তি অর্জন, তার চেয়ে বেশি ইসরাইলের দখলদারির বিরুদ্ধে অনমনীয় অবস্থান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রাক্কালে কয়েক মাসব্যাপী নির্বাচনী প্রচারাভিযানে ইসরাইলের উগ্রপন্থী প্রধানমন্ত্রী বেনজামিন নেতানিয়াহু প্রকাশ্যে ও সোৎসাহে সমর্থন দিয়ে গেছেন রমনিকে। ওবামা তখন চুপ ছিলেন এ ব্যাপারে। মনে করা হচ্ছে, এবার চাক হ্যাগেলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিয়োগ করে কিঞ্চিৎ ‘মধুর প্রতিশোধ’ নিয়েছেন নেতানিয়াহুর ভূমিকার। তবে হ্যাগেলকে নিয়ে ইহুদিবাদী লবি সাথে সাথে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করায় ওবামা এখন ‘ভারসাম্য’ রাখতে আবার ইসরাইলকে খুশি করার জন্য তৎপর।

মুরসির বিরুদ্ধে মতলবি প্রপাগান্ডা
মিসর দীর্ঘ দিন আমেরিকার বিশ্বস্ত বশংবদরূপী ‘মিত্র’ ছিল। বিশেষ করে হোসনি মোবারক তার তিন দশকের শাসনকালে মার্কিন প্রশাসনের বরকন্দাজের ভূমিকা পালন করেছেন। তখন আরব দেশগুলোর আর কোনো নেতা ইহুদিবাদী ইসরাইলের এত ঘনিষ্ঠ ছিলেন না। আরব বসন্তের ঝড়ে মোবারকের পতনে শঙ্কিত হয়ে ওঠে ওয়াশিংটন। যখন মিসরের জাতীয় নির্বাচনে ইসলামপন্থীরা বিজয়ী হলো, তখন তো আমেরিকার উদ্বেগ চরমে। কিন্তু সুচতুর যুক্তরাষ্ট্র সরকার মিসরের সাথে সম্পর্কে ফাটল না ধরার ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করে। বলা বাহুল্য, এটা করেছে তার নিজের গরজেই। একই কারণে যুক্তরাষ্ট্র একপর্যায়ে এসে তাহরির স্কোয়ারের আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থন জানিয়েছিল মোবারককে ত্যাগ করে। মার্কিনিরা অভিন্ন কৌশল নিয়েছে মিসরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইসলামপন্থী ড. মোহাম্মদ মুরসি জয়লাভ করার পরেও। তার দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে বছরের পর বছর মোবারক চরম নির্যাতন করার সময়ে ওয়াশিংটন বরাবরই ছিল স্বৈরাচারী মোবারকের সবচেয়ে শক্তিশালী মদদগার। কিন্তু নির্বাচনে ব্রাদারহুডের প্রতি জনসমর্থন দেখে যুক্তরাষ্ট্র মুরসির প্রতি কৌশলগত নমনীয় মনোভাব দেখাতে থাকে। সম্প্রতি সংবিধান প্রণয়ন, গণভোট ও ডিক্রি ইস্যুতে পাশ্চাত্যপন্থী সেকুলার মহল মুরসির বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আন্দোলনে নেমেছিল। তখনো মার্কিন প্রশাসন প্রেসিডেন্ট মুরসির বিরুদ্ধে যায়নি। মোবারকের মতো আদর্শহীন স্বৈরতন্ত্রী মার্কিন স্বার্থ নিরাপদ রাখবেন বলে নিশ্চিত থাকা যেত। কিন্তু মুরসির মতো আদর্শবাদী গণতন্ত্রী দেশের চেয়ে বিদেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন বলে যুক্তরাষ্ট্র মোটেও আশাবাদী হতে পারে না। ব্রাদারহুডকে ঘোর ইসরাইলবিরোধী বলেই মনে করে ওয়াশিংটন। তাই মুরসি সরকারের সাথে দৃশ্যত হলেও ভালো সম্পর্ক রেখে ইসরাইলের জন্য যতটা সম্ভব সুবিধা আদায় করা মার্কিন প্রশাসনের একটা উদ্দেশ্য। আমেরিকার ফন্দি হলো, ‘মিসরকে হাতছাড়া করা যাবে না। এই গুরুত্বপূর্ণ আরব দেশটাকে শত্রু না বানিয়ে নরমে-গরমে মিসরকে দিয়ে নিজের ও ইসরাইলের জন্য সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে মিসরের ইসলামপন্থী বর্তমান সরকারকে কখনো তোয়াজ করা হবে; কখনো চাপে রাখা হবে।’
বিশ্লেষকদের মতে, এই চাপ দেয়ার সর্বশেষ নজির মিসরীয় প্রেসিডেন্টের একটা পুরনো উক্তি নিয়ে মার্কিনিদের নতুন করে যুক্তিহীন মাতামাতি। ১৬ জানুয়ারি বিবিসি, রেডিও তেহরান ও রয়টার্স জানিয়েছে, আমেরিকা ড. মোহাম্মদ মুরসির ইসরাইলবিরোধী একটি মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে। স্বাভাবিকভাবেই সবাই জানতে চাইবেন, ওয়াশিংটন মিসর সরকারের ব্যাপারে হঠাৎ এমন অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া কেন দেখাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ২০১০ সালের একটি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, মুরসি ইহুদিদের ‘রক্তচোষা’ বলেছিলেন। আরো বলেছেন, ‘আমাদের শিশুদের ওদের প্রতি ঘৃণা নিয়ে বড় করতে হবে’। মার্কিন কর্মকর্তারা বলছেন, এমন উক্তি গুরুতর আপত্তিকর। ১৫ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে হোয়াইট হাউজ মুখপাত্র বললেন, ‘মুরসির এই বক্তব্য অত্যন্ত আক্রমণাত্মক’। নিউ ইয়র্ক টাইমস মুরসির বক্তব্যটি প্রকাশ করেছে। মার্কিন সরকার মুরসির কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে তার এই উক্তির।
ব্রাদারহুড নেতা থাকাকালে দুই বছর আগে ড. মুরসি এ ধরনের কথা বলেছেনÑ এটা মিসরের তখনকার মোবারক সরকারের সবচেয়ে বড় মিত্র ও মদদগার যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন এত দিন পর্যন্ত জানত না বলে বিশ্বাস করা যায় না। মুরসি যে ইহুদিদের ‘রক্তচোষা’ বলেছেন, এটা তো শত শত বছরের পুরনো কথা। ওদের শোষক স্বভাবের কারণে বিশ্ববিখ্যাত ইংরেজ নাট্যকার শেকসপিয়র তো ৪০০ বছর আগেই এটা তুলে ধরেছেন শাইলক চরিত্রের মধ্য দিয়ে। আর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় শত্রু এবং মধ্যপ্রাচ্যে অশান্তির সবচেয়ে বড় কারণ যে ইহুদিবাদ, তাকে ঘৃণা করতে আরবরাসহ সব শান্তিকামী মানুষই বাধ্য। যদি মুরসির ভাষা কিছুটা উগ্র এবং শব্দচয়ন কিঞ্চিৎ আপত্তিকরও মনে করা হয়, তা হলে মুরসি সরকারের ভূমিকা মূল্যায়ন না করে সাবেক আমলের কথা নিয়ে কেন চায়ের কাপে ঝড় তোলার প্রয়াস? যুক্তরাষ্ট্র মিসরীয় প্রেসিডেন্টের কাছে তার এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা পর্যন্ত তলব করেছে। সম্প্রতি গাজা ইস্যুতে ফিলিস্তিন-ইসরাইল শান্তি প্রয়াসে মিসরের প্রেসিডেন্ট কাণ্ডারির ভূমিকা নিয়ে প্রশংসা কুড়িয়েছেন। তাকে সহায়তা করেছেন সদ্য বিগত মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি কিনটন। তখন ইসরাইল যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে। কিন্তু এর পরপরই ইসরাইল চুক্তি লঙ্ঘন করে ফিলিস্তিনি হত্যার ঘটনা ঘটায় এবং শত শত ইহুদি বসতি অবৈধভাবে নির্মাণের ঘোষণা দেয়। কই, তখন তো মার্কিন কর্তাবাবুরা এ জন্য ইসরাইলের রাষ্ট্রদূতকে তলব করেননি, নেতানিয়াহুর কাছে এর কৈফিয়ত চাননি, এমনকি ইসরাইলকে কড়া হুঁশিয়ারি পর্যন্ত দেননি।
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির ওয়াকিবহাল পর্যবেক্ষকদের অভিমত, আসলে মিসরের নতুন প্রেসিডেন্টকে চাপে রাখতেই পুরনো কথা নিয়ে মতলবি হইচই শুরু হয়েছে। মুরসির কথাটা হয়তো মার্কিন প্রশাসনের উদ্যোগেই নিউ ইয়র্ক টাইমসে প্রকাশ করা হয়েছে বিশেষ লক্ষ্যকে সামনে রেখে। এর সময়টাও লক্ষ করার মতো। মার্কিন কংগ্রেস প্রতিনিধিদল যখন কায়রোতে, তখন ওয়াশিংটন মুরসির নিন্দায় মুখর হয়ে উঠল। তাকে বিব্রত করা এবং বেকায়দায় ফেলা ছাড়া এর আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে? মিসরকে এখন অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা প্রদান কঠিন হয়ে দাঁড়াবে বলে আমেরিকা পরোক্ষ হুমকি দিয়েছে। এ বাবদ বার্ষিক ১৫০ ডলার পাচ্ছে মিসর। অনেকেই মনে করেন, অর্থ সাহায্যের মুলা ঝুলিয়ে যুক্তরাষ্ট্র মিসরকে ‘গাধা’ বানিয়ে রাখতে চায়, যেন ইসলামপন্থী সরকারও মোবারকের নীতি অনুসরণ করে চলে। শর্তের জালে বন্দী থাকলে কায়রো এমন নীতি গ্রহণের সাহস পাবে না, যা আমেরিকা ও ইসরাইলের জন্য অসুবিধাজনক। যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ খায়েশ হলো, মুরসির নেতৃত্বাধীন ব্রাদারহুড সরকার মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামি জাগরণে যেন সহায়তা না করে। ‘ইসলামি প্রজাতন্ত্র’ ইরানের সাথে ঘনিষ্ঠ না হতে কিংবা সিরিয়ার বিদ্রোহীদের ইসলামী অংশকে মদদ না দিতেই যুক্তরাষ্ট্র মিসরকে এক ধরনের হুঁশিয়ারি দিচ্ছে।
মিসরীয় নেতা মুরসি ‘সব মানুষের প্রতি সমান শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা পোষণ করেন’Ñ এই ধারণা স্পষ্ট করার জন্য মার্কিন প্রশাসন তার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। এটা শুধু হাস্যকরই নয়, যুক্তরাষ্ট্রের চরম স্ববিরোধিতা ও সুবিধাবাদের নজির। কারণ, এই দাম্ভিক পরাশক্তি মানুষের প্রতি ভালোবাসার ক্ষেত্রে অমার্জনীয় বৈষম্য করে আসছে যুগ যুগ ধরে। ইসরাইল তথা ইহুদিদের জন্য মার্কিনিদের ভালোবাসা উপচে পড়লেও মুসলমানদের বেলায়, বিশেষ করে বঞ্চিত, নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের জন্য সে ভালোবাসার প্রমাণ মেলে না। লাখ লাখ আরবকে উচ্ছেদ করে এবং হত্যা-নির্যাতনের মাধ্যমে ইহুদিদের আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার প্রতি আমেরিকার শ্রদ্ধা অফুরান। এর বিপরীতে, ৬৫ বছর ধরে স্বদেশহারা, শত লাঞ্ছনা ও অত্যাচারের শিকার ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের বিন্দুমাত্রও শ্রদ্ধা নেই।

নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও নতুন ঝামেলা
আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট বারাক হোসেন ওবামা ২০০৮ সালে প্রথমবার নির্বাচিত হয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা ংবপৎবঃধৎু ড়ভ উবভবহপব হিসেবে নিয়োগ দিয়েছিলেন হিলারি ক্লিনটনকে। এই আইনজীবী ওবামার ডেমোক্র্যাটিক পার্টির একজন রাজনীতিক এবং সাবেক ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্ট বিল কিনটনের স্ত্রী। হিলারি আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী নেই। তিনি এখন অসুস্থতাজনিত বিশ্রামে রয়েছেন। এর পরই পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নেয়া শুরু করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
যা হোক, ওবামা এবার তার দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে হিলারির স্থলাভিষিক্ত করেছেন চাক হ্যাগেলকে। তিনি গত শতাব্দীর ষাট ও সত্তর দশকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে অংশ নিয়ে বীরত্বসূচক সম্মাননা পেয়েছেন। এখন তিনি যুদ্ধবিরোধী ও শান্তিবাদী হিসেবে পরিচিত। কৌতূহল জাগানো বিষয় হলো, হ্যাগেল ছিলেন রিপাবলিকান পার্টির সিনেটর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ায় এখন সেই দলের লোকজন তার নিন্দায় মুখর। নেব্রাস্কা থেকে নির্বাচিত সিনেটর থাকাকালে স্পষ্টবাদী হ্যাগেল বলেছিলেন ‘আমি আমেরিকার একজন সিনেটর, ইসরাইলের সিনেটর নই।’ এতে মার্কিন ইহুদি লবি বিষম ক্ষিপ্ত। আর তিনি যুদ্ধবিরোধী বলে যুদ্ধবাজ বুশের দোসর ‘নিউকন’ বা নব্যরক্ষণশীল গোষ্ঠী হ্যাগেলের তীব্র সমালোচনায় সরব।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরাইল তথা ইহুদিবাদীদের সার্বিক স্বার্থ রক্ষার সর্ব প্রধান প্রেশার গ্রুপ হলো, অ্যারাব ইসরাইলি পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (আইপ্যাক)। অনেক বছর আগেই হ্যাগেল এটিকে ‘ইহুদি লবি’ বলেছিলেন। তার আগে মনে করা হতো আরব শেখদের অর্থ দিয়ে এই কমিটি যারা চালান, তারা বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।
হ্যাগেলকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে ওবামা চূড়ান্তভাবে নিয়োগদানে অটল থাকলে ইসরাইল কী করবে? সে দেশের প্রখ্যাত ইহুদি কলামিস্ট ও শান্তিবাদী সংগঠক উরি আভনারি লিখেছেন, এখন চুটকি শোনা যাচ্ছেÑ ‘ইসরাইল হ্যাগেলকে তাড়াতে ভেটো দেবে। এই ভেটো মোকাবেলায় ওবামাকে সিনেটের ৯০ শতাংশ সদস্যের সমর্থন পেতে হবে অবশ্যই। যদি তা না পান, তাহলে নেতানিয়াহুর দেয়া তিনটি নাম থেকে একটি বাছাই করে তাকেই নিয়োগ করতে হবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে।’
আভনারি যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকপর্যায়ে ইহুদিবাদীদের প্রভাবের বিষয়ে উল্লেখ করেছেন, কার্যত আমেরিকান সিনেটর প্রায় সবাই ইসরাইলি সিনেটরদের মতো ভূমিকা পালন করে থাকেন। কোনো ইস্যুতে তারা ইসরাইলের সমালোচনা করার সাহস রাখেন না। কারণ, সেটা হবে তাদের জন্য রাজনৈতিক আত্মহত্যা।
যুক্তরাষ্ট্রে যাতে ইসরাইলপন্থীরাই নির্বাচিত ও পুনর্নির্বাচিত হন, সে জন্য ইহুদি লবি তার বিপুল সম্পদ ব্যবহার করে আসছে। এখানেই শেষ নয়। হাতেগোনা যে ক’জন কগ্রেস সদস্য ইসরাইলের সমালোচনার সাহস দেখান, তাদের আসনে যাতে ইসরাইলপন্থীরা জিতে, সে জন্য প্রকাশ্যেই সম্পদ বিনিয়োগ করছে ইহুদি লবি। এটা করে তারা প্রায় সব সময়ই সফল হচ্ছে।
আভনারির ধারণা, শেষ পর্যন্ত চাক হ্যাগেলও ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করে চলবেন। বিশেষ করে ইসরাইলের কয়েকজন জেনারেল এ ব্যাপারে আশাবাদী। ওবামা হ্যাগেলকে নিয়োগ দিয়ে নেতানিয়াহুর মতো কট্টরপন্থীদের ‘সামান্য শাস্তি’ দিতে চান। তবে ইসরাইল সম্পর্কে মার্কিননীতির বড় কোনো পরিবর্তন অদূরভবিষ্যতে আসবে বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন না।
প্রসঙ্গক্রমে, অনেকেই স্মরণ করছেন ওবামার প্রথম শাসনামলের একটা ঘটনা। ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি চ্যাস ফ্রিম্যানকে জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের (এনএসসি) প্রধানের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ করেছিলেন। ফ্রিম্যান কূটনীতিক হিসেবে খুবই সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু ইহুদি লবি তাকে পছন্দ করেনি।
অতএব, ইসরাইলের স্বার্থে তাকে সরিয়ে দিতে হলো। ওবামা এই ইস্যুতে ইহুদি লবির সাথে সঙ্ঘাতের চেয়ে জনগণের সমালোচনা শোনা উত্তম ভাবলেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অবৈধ রাষ্ট্র ইসরাইলের অন্যতম জন্মদাতা। ৬৫ বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এই বিষফোঁড়াকে লালন-পালন, নিরাপত্তা দান, পরিচর্যা, সমৃদ্ধ, শক্তিশালীÑ সব কিছুই করেছে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রই। অর্থাৎ দেশটি ইহুদি অপরাষ্ট্রশক্তির অভিভাবক। কিন্তু সাম্প্রতিককালে মনে হচ্ছে, ‘কুকুর লেজ নাড়ে না, বরং লেজই নাড়াচ্ছে কুকুরটাকে।’ এমন ধারণার কারণ, ‘ক্ষুদ্র’ ইসরাইল ‘বৃহৎ’ যুক্তরাষ্ট্রের তোয়াক্কা না করে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে চরম পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা। ইরানে হামলার ব্যাপারে মার্কিন দ্বিধা সত্ত্বেও ইসরাইলের একগুঁয়েমি ও সদম্ভ সিদ্ধান্ত এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত।
আসলে কি ইসরাইল হঠাৎ শক্তি সঞ্চয় করে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং আমেরিকাকে থোড়াই কেয়ার করছে? সাবেক ইসরাইলি যোদ্ধা ও পার্লামেন্ট সদস্য উরি আভনারি তা মনে করেন না। তার ভাষায়, ‘অন্তত পাঁচ দশক ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি প্রণীত হচ্ছে ইসরাইলের রাজধানীতে। মার্কিন সরকারে এই অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলো যেসব কর্মকর্তা দেখাশোনা করেন, তারা ইহুদি। হিব্রুভাষী যে ব্যক্তিকে ইসরাইলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত করা হয়, তিনি সহজেই ওয়াশিংটনে ইসরাইলি রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালনে সক্ষম। মাঝে মধ্যে ভাবি, মার্কিন ও ইসরাইলি কূটনীতিকেরা বৈঠকে বসে কি কখনো কখনো ইড্ডিশ ভাষায় কথা বলা শুরু করে দেন না?’ উল্লেখ্য, ইহুদিদের হিব্রু ভাষার ইউরোপীয় সংস্করণ ইড্ডিশ নামে পরিচিত।

ইসরাইলের সাত খুন মাফ
ইরানের পরমাণু ইস্যুতে আমেরিকার হম্বিতম্বি, হুমকি-ধমকি এবং ইসরাইলের স্পর্ধা-আস্ফালনের শেষ নেই। অথচ ইরান পারমাণবিক বোমা বানিয়ে ফেলেছে, এমন কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জগৎ। এমনকি শিগগিরই যে ইরানের এমন সামর্থ্য অর্জিত হবে তারও প্রমাণ পায়নি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)। শুধু বলা হচ্ছে, তেহরানের কাছে যে প্রযুক্তি আছে, তা দিয়ে একপর্যায়ে পরমাণু অস্ত্র বানাতে সক্ষম হতে পারে। অপর দিকে, ইরান বারবার জোর দিয়ে বলে আসছে, জ্বালানি ও চিকিৎসার মতো শান্তিপূর্ণ প্রয়োজনে এই প্রযুক্তি ব্যবহৃত হবে। কিন্তু কে শোনে কার কথা। ইরানের এই অবিচ্ছেদ্য অধিকারের কানাকড়ি দামও নেই মার্কিন-ইসরাইলি জুটির কাছে। আসলে কোনো মুসলিম রাষ্ট্র পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হওয়াকে ওয়াশিংটন কিছুতেই মেনে নিতে পারে না। তার আশঙ্কা, এটা ইসরাইলের আগ্রাসনের প্রতিরোধে কাজে লাগানো হবে।
এবার আসুন ইসরাইল প্রসঙ্গে। ইহুদি দেশটি অনেক বছর আগেই পরমাণু বোমার মালিক হয়েছে। আর তা সম্ভব করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইসরাইলের কাছে এই বোমা আছে অনেক। তবুও সে পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি বা এনপিটিতে স্বাক্ষর দেয়নি আজো। এমন কোনো ইচ্ছাও তার নেই। অথচ যুক্তরাষ্ট্র একটুও চাপ দিচ্ছে না ইসরাইলকে। অতএব, এটা স্পষ্ট যে, মার্কিন মদদেই ইসরাইলের এই শক্তি ও অবস্থান। অন্য দিকে, ইরান এনপিটির পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখছে। ইরান তার পরমাণু কার্যক্রমের বিষয়ে আন্তর্জাতিক পরিদর্শন ও সংলাপের বিরোধী নয়। তবুও ‘যত দোষ নন্দঘোষ’। আমেরিকা তার দোসর ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা প্রভৃতি দেশসহ সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে, কিছুতেই ইরানকে পারমাণবিক প্রতিরক্ষাশক্তি অর্জন করতে দেবে না। এ জন্য কোনো যুক্তি এবং নীতিনৈতিকতার পরোয়া না করে এবং নানা অজুহাত ও অপপ্রচারের আশ্রয় নিয়ে ইরানকে কোণঠাসা করার সর্ববিধ উপায় অবলম্বন করা হবে।
সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট কার্টারের জাতীয় নিরাপত্তাবিষয়ক উপদেষ্টা জবিগনিউ ব্রেজেজিনমিক ইরানে সম্ভাব্য ইসরাইলি হামলা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘ধারণা করা হয়েছেÑ ইসরাইলের হাতে শতাধিক পারমাণবিক মারণাস্ত্র আছে। তিনি বলেছেন, এর পরও কী করে বিশ্বাস করা যায় যে, ইরান প্রথমে পরমাণু অস্ত্রের বিরাট ভাণ্ডার না গড়ে ইসরাইলে হামলা চালাবে? ইরানের সে সামর্থ্য অর্জন করতে কমপক্ষে কয়েক বছর লেগে যাবে।’
এ দিকে একটি ওয়াকিবহাল সূত্র মতে, ১৯৮৬ সালেই ইসরাইলের কাছে দুই শতাধিক পরমাণু বোমা ছিল। আর এখন তাদের হাতে পর্যাপ্ত প্লুটোনিয়াম থাকার কথা, যা দিয়ে বছরে এ ধরনের দশটি বোমা বানানো যায়।
এই তথ্য দিয়েছেন এইলিন ফেমিং। তিনি ইন্টারনেটে আরো প্রকাশ করেছেন, ‘আমার একটি বই লেখার কাজে গবেষণার প্রয়োজনে ২০০৫ সালে জেরুসালেম গিয়েছিলাম। সেখানে সাক্ষাৎ করি ইসরাইলের পারমাণবিক বোমার হোতা মোর্দেচাই ভানুনুর সাথে। তিনি আমাকে বললেন, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট কেনেডি ইসরাইলকে পরমাণু বোমা বানানো থেকে বিরত রাখতে চেয়েছিলেন। তুমি এটা জান কি? ইসরাইলের দিমোনায় একটি প্ল্যান্টের বাইরে সাইনবোর্ডে লেখা ছিল, এটি টেক্সটাইল প্ল্যান্ট অর্থাৎ বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান। আসলে এটা পরমাণু অস্ত্র তৈরি করার কারখানা। এই সত্য স্বীকার করে নিতে কেনেডি বাধ্য করেছিলেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী ডেভিড বেনগুরিয়নকে। তখন বেনগুরিয়ন বললেন, ‘এই পরমাণু জ্বালানি চুল্লি শুধু শান্তিপূর্ণ কাজের জন্য’। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কেনেডি এই প্ল্যান্টের ভেতরটা প্রকাশ্যে পরিদর্শনের ওপর জোর দেন। এ জন্য তিনি ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীকে একাধিক চিঠি পর্যন্ত দিয়েছেন।
ইসরাইলের দিমোনা পারমাণবিক স্থাপনা নির্মাণ করার দায়িত্ব ছিল ফ্রান্সের। এ জন্য অর্থের জোগান দিয়েছে জার্মানি। কারণ হিটলারের হলোকাস্টের কারণে জার্মানি নিজেকে অপরাধী ভাবছিল। ইসরাইলের এই প্ল্যান্টের ভেতরে সব লেখা ছিল ফরাসি ভাষায়। আজ থেকে সিকি শতাব্দী আগেই এই প্ল্যান্টের সাতটি তলা ছিল মাটির নিচে।
এইলিন ফেমিং আরো জানিয়েছেন, ১৯৫৫ সালে শিমন পেরেজ ও বেনগুরিয়ন ফরাসি সরকারের ঊর্ধ্বতনপর্যায়ে জানান, ইসরাইল সুয়েজ খাল ও সিনাই অঞ্চল নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে মিসরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করলে ফ্রান্স আমাদের পারমাণবিক জ্বালানি চুল্লি দেবেÑ এতে প্যারিস যেন রাজি হয়;’ পরের বছরই সেই যুদ্ধ হলো। মার্কিন প্রেসিডেন্ট আইসেনহাওয়ার দাবি জানালেন, ইসরাইলকে সিনাই ছেড়ে দিতে হবে। এ দিকে জ্বালানি চুল্লির কাজ এগিয়ে যেতে থাকে। পরে জনসন যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হলেন, তিনি ইসরাইলের সাথে এই মর্মে চুক্তি করেছিলেন যে, প্রতি বছর দু’জন করে মার্কিন সিনেটর ইসরাইল গিয়ে তাদের পরমাণু প্ল্যান্ট পরিদর্শন করে আসবেন। তারা পরিদর্শনে যাওয়ার আগে ইসরাইল প্ল্যান্টে একটি দেয়াল তুলে দিত। ফলে ভূগর্ভস্থ সিঁড়ি ও লিফট আর চোখে পড়ত না। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত মার্কিন সিনেটররা পরিদর্শন করতে সেখানে গেছেন। কিন্তু তারা কোনো দিন জানতে পারেননি যে, দেয়াল তুলে দিমোনা পরমাণু প্ল্যান্টের একাংশ আড়াল করে রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট নিক্সন এই পরিদর্শন কাজ বন্ধ করে দিলেন। তিনি বিষয়টাকে উপেক্ষা করেছিলেন। এই সুযোগে ইসরাইল তার পারমাণবিক অস্ত্র উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply