ইসলামবিরোধী চলচ্চিত্র: ইহুদিবাদের নতুন ষড়যন্ত্র

মীযানুল করীম

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর সন্ত্রাসবাদী হামলায় যুক্তরাষ্ট্রে তিন হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। ঠিক ১১ বছর পর ২০১২ সালের একই দিনে ইউটিউবে প্রচারিত একটি ভিডিওচিত্র পৃথিবীর কোটি কোটি মুসলমানের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একজন লেখকের এই ভাষ্য যে ছবিটি নিয়ে তার নাম ইনোসেন্স অব মুসলিম, যখন সেই ৯/১১-এর ঘটনায় টুইন টাওয়ার ধূলিসাৎ হওয়ার পেছনে ইহুদিচক্রান্ত থাকার নানা যুক্তি, তথ্য ও প্রমাণ মিডিয়ায় এবার তুলে ধরা হচ্ছিল, তখন সেই ইহুদিদের চক্রান্তের আরেক ফসল উপরিউক্ত চলচ্চিত্রটি দেখে শুধু মুসলমান নয়, বিবেকবান যেকোনো মানুষ মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছিলেন। ইসলাম, তার নবী (সা) এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে নীলনকশার অংশ হিসেবে শ্যাম বাসেলি ছায়াছবিটি নির্মাণ করেছেন আমেরিকায়। ‘মুসলমানের নির্দোষিতা’ নামের এই ছবি তৈরি করে ইহুদিবাদী চক্র শুধু দোষ নয়, ক্ষমার অযোগ্য জঘন্য অপরাধ করেছে। এর যে প্রচণ্ড প্রতিক্রিয়ার ঝড় উঠেছে দেশে দেশে তা পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের গায়েও সজোরে আঘাত হেনেছে। ইহুদির অর্থ সাহায্যে আরেক ইহুদিবাদী বানিয়েছেন, তাদের মতলবি সিনেমা। ইনোসেন্স অব মুসলিম বা মুসলমানদের নির্দোষিতা শীর্ষক এই ছবিতে তারা নিষ্পাপ বলে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এবং ইসলাম হয়েছে বিদ্রƒপের শিকার। ইসরাইল তথা ইহুদিবাদী আগ্রাসন আধিপত্যের স্বার্থেই এটি নির্মিত। ইসলামের ব্যাপারে বিদ্বেষ সৃষ্টি, মুসলমানদের আবেগ উসকিয়ে তাদের ঘাড়ে দায় চাপানো, সমাজে বিভাজন ও সহিংসতার প্রসার ইত্যাদি উদ্দেশ্য এর পেছনে সক্রিয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদি ব্যবসায়ীদের সাহায্য নিয়ে ৫০ লাখ ডলার বা প্রায় ৪০ কোটি টাকায় তৈরি হয়েছে এই সিনেমা। পাশ্চাত্যের মিডিয়া এটিকে ‘স্বল্পব্যয়ে নির্মিত’ বলে বারবার প্রচার করে মূলত এর ইসলামবিদ্বেষী চরিত্র গৌণ করে দেখাতে যাচ্ছে। রহস্যজনক হলো, ক্যালিফোর্নিয়ায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়েই এটি বানানো সম্ভব হয়েছে। এর নির্মাতা শ্যাম নাকুলা বাসিলে (৫৫) মিসরের কপ্টিক খ্রিস্টান হলেও ইহুদিবাদী। পশ্চিমা মিডিয়াও স্বীকার করেছে, লোকটি প্রতারক মাত্র। ২০১০ সালের জুনে যুক্তরাষ্ট্রে তার ২১ মাস জেল হয়েছে। গত ১৫ সেপ্টেম্বর থেকে সে আত্মগোপনে। তবে বিশ্বেজুড়ে তীব্র নিন্দা প্রতিবাদেও তার নির্বিকার উক্তি : ‘ইসলামের দোষগুলো তুলে ধরেছি এই ছবিতে’। ক্ষমা চাওয়া দূরের কথা, সামান্য দুঃখবোধও ওর নেই বলে তিনি জানিয়ে দিয়েছেন। তার দেশ মিসরের একজন সালাফি আলেম বলেছেন, এই ছায়াছবি নির্মাণে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেয়া উচিত। এদিকে ছবিটির এক অভিনেত্রী বলেছেন, ধর্মবিদ্বেষের বিষয়টি না জেনেই এতে তিনি অংশ নিয়েছেন।
আর উদ্ধত নির্মাতা বাসিলের ঘোষণাÑ এই ছবি নির্মাণের জন্য নয়, লিবিয়ায় মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিহত হওয়ায় আমি দুঃখিত। আমিই ছবিটির ১৪ মিনিটের ভিডিও প্রকাশ করেছি ইন্টারনেটে। পুরো ছায়াছবি প্রকাশের কথা ভাবছি। ধর্মীয় বিষয় নিয়ে তার যে গভীর রাজনীতি রয়েছে, তা লুকাননি এই উগ্র সাম্প্রদায়িক লোকটি। বলেছেন, এটা রাজনৈতিক সিনেমা। আমরা এখন আদর্শিক যুদ্ধে নিয়োজিত। দুই ঘণ্টার ছবিতে ইসলমাবিরোধী বক্তব্য দিয়ে মুসলমানদের উত্তেজিত করতে চেয়েছি। বাসিলে লুকিয়ে যাওয়ার পর ১৭ তারিখ ভোরে লসএঞ্জেলেসের সরকারি কর্মচারীরা তার পরিবারের চার সদস্যকে তার কাছে পৌঁছিয়ে দেয়। এত বোঝা যাচ্ছে, কর্তৃপক্ষ তার আত্মগোপনের স্থান সম্পর্কে জানে। তবুও তাকে গ্রেফতার না করা তাৎপর্যপূর্ণ।
মিসরের সরকারি আইনজীবী আদেশ দিয়েছেন, আলোচ্য চলচ্চিত্রে সংশ্লিষ্টতার কারণে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী সাতজন মিসরী খ্রিষ্টানের বিচার হবে। তারা ইসলাম ধর্ম ও এর রাসূল (সা)-এর অবমাননা করেছেন এবং সাম্প্রদায়িক সঙ্ঘাতে জুগিয়েছেন উসকানি। ইন্টার পোল বলেছে, এদের গ্রেফতারের জন্য মিসরের অনুরোধ সম্পর্কে তাদের জানা নেই। আর সংস্থাটির সনদে নিষেধ রয়েছে রাজনৈতিক, সামরিক, ধর্মীয় ও জনগোষ্ঠীগত ধরনের কোনো ইস্যু নিয়ে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে। সারা বিশ্বেই মার্কিন সিনেমাটির তীব্র নিন্দা, প্রতিবাদ ও সমালোচনা হয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম বিশ্ব এখন বিক্ষুব্ধ, জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ও ব্যাপক আন্দোলনে উত্তাল। কোথাও কোথাও তা সহিংসরূপ নিয়েছে এবং কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হচ্ছে। ১১ সেপ্টেম্বর বেনগাজিতে মার্কিন কনসুলেটে ঘটনাক্রমে উপস্থিত ছিলেন গাদ্দাফি-উত্তর লিবিয়ায় নিযুক্ত প্রথম রাষ্ট্রদূত ক্রিস স্টিভেন্স। জনতার হামলা চলাকালে তিনি সরে পড়তে চেয়েও পারেননি এবং ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান মর্মান্তিকভাবে। লিবীয় প্রসাশন সেখানকার সহিংসতার জন্য উগ্রপন্থী আল কায়দাকে দায়ী করেছে। অন্যান্য দেশের মতো মার্কিন দখলদারির আফগানিস্তানেও জনতা বিক্ষোভ করে আমেরিকার পতাকা পুড়িয়েছে। ওবামার ছবি পোড়ানো এবং দূতাবাসে হামলার ঘটনা ঘটেছে কোনো কোনো দেশে। বাংলাদেশে এই চলচ্চিত্র প্রদর্শনকারী ইউটিউব বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভারত ও পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ একই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এমনকি রাশিয়াও এই পদক্ষেপ নেয়ার চিন্তাভাবনা করছে।
মার্কিন দূতাবাস বন্ধ করার দাবিও উঠেছে কোনো কোনো দেশে। চরম আপত্তিকর ছবিটিকে কেন্দ্র করে দেশে দেশে প্রচণ্ড প্রতিবাদজনিত ঘটনায় ১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত নিহত হয় ১৯ জন।
যুক্তরাষ্ট্র সরকার বিশ্বব্যাপী তীব্র প্রতিবাদ দেখে চলচ্চিত্রটির সমালোচনা ও দুঃখ প্রকাশ করেছে। কিন্তু এটি নিশ্চয়ই দু-একদিনের মধ্যে কিংবা অতিসংগোপনে তৈরি হয়নি। মার্কিন প্রশাসন সব জেনেশুনে নীরব নিষ্ক্রিয় ছিল এবং তাদের প্রশ্রয় ও অনুমোদন না থাকলে এমন একটি সাম্প্রদায়িক ও ঘৃণাত্মক ছায়াছবি নির্মাণ অসম্ভব বলে সহজেই মনে করা যায়। অন্তত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মুসলিম ভোটারদের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে হলেও প্রশাসনের ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়া উচিত ছিল।
এর থেকে বোঝা যায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবিসহ ইসলামবিদ্বেষী চক্র এখন কত বেশি প্রভাবশালী। তারা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে বিশেষ লক্ষ্যে কাজ করে যায়।
আলোচ্য সিনেমাটি দিয়ে ইসলাম ও মুসলমানদের হেয় করা এবং সেই সাথে তাদের উসকে দিয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেয়া দুটোই উদ্দেশ্য। উদ্ভূত পরিস্থিতি ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্র আবার তার আগ্রাসী মূর্তি ধরেছে এবং ঘটমান ঘটনাবলির আড়ালে ইসলামবিদ্বেষের মূল বিষয়টি ক্রমশ গৌণ করার প্রচেষ্টার কমতি থাকবে না। লিবিয়ায় প্রচণ্ড বিক্ষোভের সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূতসহ কয়েকজনের মৃত্যু নিঃসন্দেহে সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত ও অত্যন্ত মর্মান্তিক ঘটনা। বিদেশী কূটনীতিকদের নিরাপত্তা বিধান যে কোনো দেশের শুধু সরকার নয়, জনগণেরও দায়িত্ব। এদিকে বেনগাজির ঐ অনাকাক্সিক্ষত অঘটনকে কেন্দ্র করে আমেরিকা গাদ্দাফি পতনের ন্যাটো হামলার মতো আগ্রাসী তৎপরতা শুরু করে দিয়েছে। সাথে সাথে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর পর এখন মার্কিন এফবিআই গোয়েন্দা লিবিয়ার ভেতরে তৎপর। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঘোষণা দিয়ে এটা জানিয়ে দিলেন। তার প্রতিজ্ঞা; যারা ওই হামলা করেছে ওদের ধরে শায়েস্তা না করা পর্যন্ত আমরা বিশ্রাম নেবো না। এর অর্থ ঢোকার সুযোগ পেয়ে আলকায়দা ও জঙ্গি এবং গাদ্দাফিপন্থী খোঁজার নামে লিবিয়ায় অনির্দিষ্টকালের সহিংসতার তাণ্ডব চালাবে মার্কিন ফৌজ। সারা বিশ্বেই এখন যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিক ও নাগরিকেরা শঙ্কিত সম্ভাব্য হামলার ভয়ে। এ পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ওবামা আশা করছেন মুসলিম বিশ্বের সরকারগুলো মার্কিন কূটনীতিকদের রক্ষার ব্যবস্থা নেবে। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি বলেই দিয়েছেন, সারা দুনিয়ায় আমাদের মিশনগুলোর নিরাপত্তার জন্য আমরা আগ্রাসী পদক্ষেপ নিচ্ছি।
এর মানে যক্তরাষ্ট্র যে আগ্রাসী শক্তি তার স্বীকৃতি দিচ্ছে নিজেই। তার লোকজনের নিরাপত্তার কথা বলে আর সবার নিরাপত্তা বিপন্ন করতে মার্কিন সরকার দ্বিধা করবে না। অতএব আপত্তিকর সিনেমাবিরোধী প্রচণ্ড আন্দোলনে বেকায়দায় পড়ে এখন উল্টো পরিস্থিতির ফায়দা তুলতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে বিশ্ব মুসলিম সতর্কতা, দূরদর্শিতা ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় দিতে হবে। প্রতিক্রিয়া দেখাতে গিয়ে কোনো চরম পন্থা নয়, সহিংসতা নয়। উসকানির ফাঁদ পেতে রাখে ধূর্ত প্রতিপক্ষ। নিছক আবেগের বশে এত কিছুতেই পা রাখা চলবে না। অন্যথায় ভুলের জন্য দিত হবে চরম মাসুল।
লিবিয়াসহ কোথাও কোথাও সংঘটিত সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিগত মহাসচিব আইরিন খান, এখন রোমে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন আইন সংস্থার (আইটিএর) মহাপরিচালক। তিনি এক নিবন্ধে লিখেছেন সহিংসতার পক্ষে কোনো অজুহাত দাঁড় করানো যায় না। মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন সব মানুষই এর নিন্দা করেন। আর আলোচ্য সিনেমাটি মারাত্মক আপত্তিকর। সবাই এর নিন্দা করেছেন। এটি নিষিদ্ধ করুন, ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলুনÑ এই দাবি করছেন কেউ কেউ। স্থির করতে হবে, বাকস্বাধীনতা কোন পর্যায়ে গেলে অপব্যবহার হিসেবে গণ্য হবে এবং তা সেন্সর করতে হবে। তিনি আরো বলেন, উদার গণতন্ত্রী দেশগুলোতে হেইট স্পিক বা বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে আইন কানুন আছে। তবে দেশটা যত বেশি উদার, আইনটির প্রয়োগ ততবেশি এড়িয়ে যাওয়া হয়। কয়েক বছর আগে ডেনমার্কে কার্টুন নিয়ে যা ঘটে গেল, তাতে এটাই দেখা গেছে। পরিহাসের বিষয়, পাশ্চাত্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের ‘বিদ্বেষাত্মক বক্তব্য’কে অপরাধ বলে গণ্য করা হয় না। তাই যত উদ্ভট আর জঘন্য হোক না কেন, রকমারি আইডিয়ার জমজমাট বাজার এই দেশটি।
এদিকে লেবাননে ইসরাইলি আগ্রাসন প্রতিরোধ সংগ্রামের পুরাধা ব্যক্তিত্ব এবং বহুল আলোচিত হেজবুল্লাহ সংগঠনের প্রধান শেখ হাসান নাসরুল্লাহ ঘোষণা দিয়েছেন, ইসলামের অবমাননাকর সিনেমাটি পুরো প্রকাশ করা হলে পরিণাম হবে ভয়াবহ। তিনি ১৭ সেপ্টেম্বর ডাক দিয়েছেন সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভের। পাকিস্তানের হামিদ মীর প্রখ্যাত সাংবাদিক কলামিস্ট। তিনি বেসরকারি চ্যানেল জিওটিভির প্রধান এবং সেকুলার মহলের একজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী। ধর্মনিরপেক্ষদের কাছে ধর্মের অবমাননা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু আলোচ্য চলচ্চিত্রটি এতই উসকানিমূলক ও বিদ্বেষপূর্ণ যে হামিদ মীর ‘চলচ্চিত্র নয়, সন্ত্রাসবাদ’ শীর্ষক নিবন্ধ না লিখে পারেননি। দৈনিক জং-এ প্রকাশিত এ লেখায় মীর বলেছেন, ইনোসেন্স অব মুসলিম নামে এই চলচ্চিত্র বর্তমান যুগের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসবাদ। কারণ এর দৃশ্য ও সংলাপ বোমা বিস্কোরণের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই কম নয়।
হামিদ মীর জোরালো ভাষায় লিখেছেন, মুসলিম উম্মাহর সঙ্কট ও করণীয় সম্পর্কে। যে মহলটি আলেমসমাজকে মৌলবাদী সাম্প্রদায়িক মনে করে তাদের সমালোচনা করে তৃপ্তি পায়, তাদের ঘনিষ্ঠজন হয়েও হামিদ মীর কিছু নিরেট সত্য কথা না বলে পারেননি। তিনি লিখেছেন, আমার আফসোস হয় এ ব্যাপারে প্রেসিডেন্ট ওমাবা ও তার প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া নিছক লোক দেখানো। এই চলচ্চিত্রকে আমেরিকার প্রশাসনবিরোধী হিসেবে অভিহিত করাই যথেষ্ট নয়। তার সাথে স্বীকার করতে হবে, দেশটিকে মুসলিমবিরোধী ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র রূপে অপব্যবহারের প্রয়াস পাচ্ছে কতিপয় খ্রিষ্টান ও ইহুদি সন্ত্রাসী। এরা তথাকথিত সন্ত্রাসবাদী আল কায়দা তালেবান হাক্কানি নেটওয়ার্কের চেয়েও ভয়ঙ্কর। হামিদ মীরের দুঃখ, মুসলিম বিশ্বের কোনো শাসকের এই অনুভূতি ও উদ্যম নেই, নবী (সা)-এর অবমাননাকারীদের নির্মূল করে দেবে। তিনি বলেন, পাকিস্তানের মাদরাসাগুলোর বিরুদ্ধে আমেরিকা অভিযোগ করে থাকে। অথচ মাদরাসা ছাত্ররা কখনো খ্রিস্টান বা ইহুদি ধর্মের অবমাননার কথা চিন্তাও করে না। অপর দিকে বাসেলি ইসলাম ও এর নবী (সা)-এর অবমাননা করেছেন। আজ আমরা সালাউদ্দিন আইউবি হওয়ার সাহস দেখাতে পারি না। আমাদের পরমাণু শক্তি আছে, ঈমানি শক্তি নেই। আমরা পরস্পরকে মারছি ও মরছি। আসুন, আমাদের সবার শত্রুর বিরুদ্ধে আমরা এক হই। পাশ্চাত্যের ইসলামবিদ্বেষী ও ইহুদিবাদী চক্রের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একের পর এক চলচ্চিত্র নির্মাণ, কার্টুন প্রকাশ, গ্রন্থরচনা ইত্যাদি চলছেই। ইনোসেন্স অব মুসলিম এর কারণে যখন মুসলিমবিশ্ব ছাড়িয়ে গেছে প্রতিবাদী মানুষের উত্তাল বিক্ষোভ, তখন জানা গেল আরো কিছু তথ্য। তা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র ও নেদারল্যান্ডে দু’টি চলচ্চিত্রের কাজ চলছে যার লক্ষ্য মুসলমানদের ঐক্য বিনষ্ট করা। একজন শিয়া-সুন্নি ইস্যুর মতো বস্তাপচা মালমসলা ব্যবহার করা হয়েছে। ছবি দু’টির একটি বিশেষ করে ইরানকে টার্গেট করে। এতে ইরানি ও আরবদের মাঝে বংশীয় বিরোধ উসকে দেয়ার অপপ্রয়াস বিদ্যমান। আরেকটি ছবিতে দেখানো হবে, সিরিয়ায় শিয়া-সুন্নি হিসেবে মুসলমানেরা বিভক্ত। বুঝতে অসুবিধা হয় না, ইসরাইল-আমেরিকার জঘন্য রাজনৈতিক লক্ষ্যে এই ধর্মীয় বিষয়ের অপব্যবহার করা হচ্ছে।
এ দিকে প্যারিসের ‘শার্লি হেরদো’ নামের কুখ্যাত ব্যঙ্গ সাময়িকী চরম উসকানিমূলক কয়েকটি কার্টুন ছাপিয়েছে রাসূলুল্লাহ সা:কে নিয়ে। এটা মার্কিন চলচ্চিত্রের বিরুদ্ধে বিশ্ব মুসলিমের চলমান বিক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালার শামিল। ১৮ সেপ্টেম্বর আফগানিস্তানে আত্মঘাতী মহিলার বোমা হামলায় ১২ জন মারা যাওয়ার ভয়াবহ ঘটনার পরদিনই ইসলামবিরোধী কার্টুনগুলো প্রকাশিত হলো। দ্বিতীয় বৃহত্তম বিদ্রোহী গ্রুপ হেজবে ইসলামী বলেছে, সমালোচিত মার্কিন সিনেমাটির প্রতিবাদে এই হামলা। ফরাসি ম্যাগাজিন ‘শার্লি হেরদো’র সম্পাদক নিজেও কার্টুনিস্ট। তিনি ঔদ্ধত্য দেখিয়ে বলেছেন, যারা আঘাত পেতে চায়, তাদের আঘাত দিতেই কার্টুনগুলো আঁকা হয়েছে। রাজনৈতিক ও ধর্মীয় নেতৃবর্গ পরিস্থিতির অবনতি না ঘটাতে আহ্বান জানিয়েছেন। এমনকি ফ্রান্সের মতো কট্টর সেকুলার রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রী জাঁ শার্ক আইরল্ট বলেছেন, কোনো বাড়াবাড়িই আমি সমর্থন করি না। ব্যঙ্গ সাময়িকীটি গত বছর ‘রাসূল মুহাম্মদ সম্পাদিত শরিয়া সংস্করণ’ বের করেছিল।

লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply