ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রত্যাশিত মান

আতিকুর রহমান

csইসলাম মানুষের ইহকালীন শান্তি এবং পরকালীন মুক্তির একমাত্র সনদ। ইসলাম মানুষের জন্য একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। মানুষের ব্যক্তি ও সমাজ জীবনের সর্বত্র প্রতিষ্ঠা লাভই ইসলামের অন্তর্নিহিত দাবি। সে আলোকে ইসলাম একটা পূর্ণাঙ্গ আন্দোলনও বটে। মানবসমাজকে মানুষের প্রভুত্বের যাঁতাকল থেকে মুক্ত করে আল্লাহর প্রভুত্ব ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে সুখী সুন্দর জীবন যাপনের সুযোগ করে দেয়াই হচ্ছে ইসলাম। কাজেই মানুষের প্রকৃত শান্তি, মুক্তি ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই ইসলাম। এই শাশ্বত সত্যটি বাস্তবে উপলব্ধি করতে পারলে যেকোন ব্যক্তিই বলবে ইসলাম মূলতই একটি আন্দোলন। আর ইসলামী আন্দোলন হচ্ছে সব ফরজের বড় ফরজ। আল্লাহ তায়ালার প্রকৃত বান্দাহ হওয়ার জন্য পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হওয়া প্রয়োজন। আর ইসলামী সমাজ ছাড়া পূর্ণাঙ্গ মুসলমান হওয়া কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ জন্য ইসলামী আন্দোলনের মাধ্যমে বড় ফরজটি আদায় করলে অন্যান্য ফরজ আদায় করা সহজ হয়ে যায়। ইসলামী আন্দোলনকে বিজয়ী করার জন্য এ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মীবাহিনীর সঠিক ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। আন্দোলনের কর্মীদের প্রত্যাশিত মান ও ভূমিকাই এ আন্দোলন বিজয়ী হওয়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করে থাকে।

ইসলামের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ইসলাম শব্দটি আরবি ‘সিলমুন’ শব্দ থেকে এসেছে। যার অর্থ শান্তি এবং সন্ধি। আরবি ভাষায় ‘ইসলাম’ বলতে বুঝায় আনুগত্য ও বাধ্যতা। আল্লাহর প্রতি আনুগত্য ও তার বাধ্যতা স্বীকার করে নেয়া এ ধর্মের লক্ষ্য বলেই এর নাম হয়েছে ইসলাম। মূলত ইসলাম হচ্ছে আল্লাহর পক্ষ থেকে মানবজাতির কল্যাণের জন্য প্রেরিত মুহাম্মদ (সা) এর প্রদর্শিত জীবনযাপনপদ্ধতি। পারিভাষিক অর্থে একমাত্র আল্লাহপ্রদত্ত ও রাসূল (সা) প্রদর্শিত জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করা এবং এর বিপরীত সকল মত ও পথ পরিহার করে চলাকেই ইসলাম বলা হয়।

আন্দোলনের সংক্ষিপ্ত পরিচয়
আন্দোলন শব্দটি ‘দোলন’ থেকে এসেছে। আন্দোলন (Movement এবং হারকাতুন) এখন একটা রাজনৈতিক পরিভাষা হিসেবেই প্রচলিত। যার সাধারণ অর্থ কোন দাবি-দাওয়া প্রতিষ্ঠার জন্য এবং কোন কিছু রদ বা বাতিল করার জন্য কিছু লোকের সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, নড়াচড়া বা উদ্যোগ গ্রহণ করা। এর ব্যাপক ও সামগ্রিক রূপ হলো প্রতিষ্ঠিত কোন কিছুকে অপসারণ করে সেখানে নতুন কিছু কায়েম বা চালু করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা, প্রাণান্তকর চেষ্টা।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এর অর্থ হলো একটা রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তন করে অন্য একটা ব্যবস্থা কায়েমের চেষ্টা করা।
আদর্শিক দৃষ্টিকোণ থেকে একটা দেশের প্রতিষ্ঠিত সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন ব্যবস্থার প্রবর্তন ও প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে পরিচালিত সংঘবদ্ধ ও সুসংগঠিত প্রচেষ্টাই আন্দোলন। এভাবে আমরা এক কথায় বলতে পারি, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য পরিচালিত সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা বা সংগ্রাম সাধনার নামই আন্দোলন।
ইসলামী আন্দোলনের পরিচয়
উপরে ইসলাম ও আন্দোলনের আলাদা আলাদা পরিচয় উপস্থাপনের ক্ষেত্রে যে অর্থ ও সংজ্ঞা সংক্ষিপ্ত পরিসরে আলোচনা করা হয়েছে তার আলোকে এটা পরিষ্কার হয়ে যায় যে, আন্দোলন, সংগ্রাম, বিপ্লব প্রভৃতি শব্দ আজ ইসলামের আলোচনায় বা জ্ঞান গবেষণায় নতুন করে যুক্ত করা হয়নি। ইসলামের মূল প্রাণসত্তার সাথে এই শব্দগুলো ওতপ্রোতভাবেই জড়িয়ে আছে। আল কুরআন ইসলামকে আদ-দ্বীন হিসেবে (অর্থাৎ পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান) ঘোষণা করেই শেষ করেনি বরং সেই সাথে এই ঘোষণাও দিয়েছে যে, এই দ্বীন এসেছে তার বিপরীত সমস্ত দ্বীন, মত ও পথের ওপর বিজয়ী হওয়ার জন্য।
মহান আল্লাহ বলেন, ‘তিনিই হচ্ছেন সেই মহান সত্তা, যিনি তাঁর রাসূলকে একটি সুস্পষ্ট পথনির্দেশ ও সঠিক জীবনবিধান দিয়ে প্রেরণ করেছেন, যেন সে (রাসূল) একে দুনিয়ার (প্রচলিত) সব কয়টি জীবনব্যবস্থার ওপর বিজয়ী করে দিতে পারে, তা মোশরেকদের কাছে যতোই অপছন্দনীয় হোক না কেন!’ (সূরা আত তওবা : ৩৩, আস সফ: ০৯ ও আল ফাতহ : ২৮)
কাজেই কোন বিপরীত শক্তির ওপর বিজয়ী হওয়ার স্বাভাবিক দাবিই হলো একটা সর্বাত্মক আন্দোলন, একটা প্রাণান্তর সংগ্রাম, একটা সার্বিক বিপ্লবী পদক্ষেপ। এই কারণেই আল কুরআনে জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহকে ঈমানের অনিবার্য দাবি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আর হাদিসে বলা হয়েছে … আল্লাহর পথে জিহাদ বা দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম কিয়ামত পর্যন্ত অব্যাহত রাখতে হবে।
উপরের উল্লিখিত আলোচনার আলোকে বলা যায় আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন বিজয় করা তথা ইকামতে দ্বীনের কাজ আঞ্জাম দেয়ার জন্য যে সংগঠন সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে তাকে ইসলামী আন্দোলন বলা হয়। সুতরাং যে দেশে আল্লাহর আইন ও রাসূলের (সা) আদর্শ কায়েম নেই তা কায়েমের চেষ্টাই ইসলামী আন্দোলন।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীর পরিচয়
ইসলামকে সমাজের সর্বস্তরে ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কায়েম করার প্রচেষ্টা এবং সংগ্রামে জড়িত সকল পর্যায়ের ব্যক্তিকে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী বলা হয়। অন্যভাবে বলা যায়- যারা আল্লাহর দ্বীনকে কায়েমের জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় লিপ্ত থাকে এবং শুধু নিজে আন্দোলনের কাজ করে ক্ষান্ত হয় না, অন্যদেরকেও আন্দোলনে সম্পৃক্ত করায় এবং দ্বীনের দাওয়াত ঘরে ঘরে পৌঁছায় তাদেরকে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী বলা হয়। এ ক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে দুনিয়ায় পরিচালিত ইসলামী আন্দোলনসমূহে জনশক্তির মাননির্ধারণে বিভিন্ন ক্যাডারভিত্তিক পদ্ধতি চালু থাকলেও সকলের মূল পরিচয় হলো সে ইসলামী আন্দোলনের কর্মী।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীর গুরুত্ব
ইসলামী আন্দোলনসহ দুনিয়ার প্রচলিত সকল আন্দোলনেই কর্মীবাহিনীর গুরুত্ব অপরিসীম। কর্মী ছাড়া কোন আন্দোলন ও সংগঠনের অস্তিত্বই কল্পনা করা যায় না। কর্মীরাই জীবন বাজি রেখে আন্দোলন ও সংঠনের জন্য কাজ করে, আন্দোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করে এবং প্রতিপক্ষ ও বিরোধীদের মোকাবেলা করে। কর্মীরা দাওয়াতের মাধ্যমে আন্দোলনের ব্যাপারে জনমত তৈরি করে, সাধারণ ছাত্র-জনতাকে আন্দোলনের কাজে শরিক করে এবং তাদেরকে সংগঠনের জনশক্তিতে রূপান্তরিত করে। কর্মীদের আর্থিক কোরবানির মাধ্যমেই সংগঠনের প্রাথমিক তহবিল ও বায়তুলমাল গঠিত হয়। তা ছাড়া কর্মীদের মধ্য থেকে ভবিষ্যৎ আন্দোলনের সর্বস্তরের দায়িত্বশীল সৃষ্টি হয় এবং কর্মীদের ত্যাগ-তিতিক্ষা কোরবানির মাধ্যমেই একটি আন্দোলন সফলতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়। ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা, চিন্তাশক্তি আল্লাহপ্রদত্ত আমানত। আর আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত সকল পর্যায়ের কর্মীদের যোগ্যতা ও দক্ষতাকে কার্যকর খাতে কাজে লাগানোও আন্দোলনের এক বিরাট আমানত।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের মৌলিক কাজ
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাজের ব্যাপ্তি অনেক হলেও কিছু মৌলিক কাজের ব্যাপারে সর্বদায় তাদেরকে সতর্ক থাকতে হয়Ñ
১. জ্ঞানের ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা ২. উন্নত আমলের অধিকারী হওয়া ৩. সংগঠনের আনুগত্য ও শৃঙ্খলা সংরক্ষণ করা ৪. সংগঠনের সকল পর্যায়ের কর্মসূচি ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সচেষ্ট থাকা ৫. দাওয়াতি কাজ তথা ইসলামী আদর্শের প্রচারে ভূমিকা রাখা ৬. সংগঠনকে নিয়মিত আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করা ৭. আত্মগঠন ও চরিত্রগঠনের জন্য নিরলসভাবে প্রচেষ্টা চালানো ৮. অর্পিত দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করা। ৯. পারস্পরিক যোগাযোগ ও সম্পর্ক রক্ষা করা ১০. সংগঠনকে পরামর্শ দান ১১. এহতেসাব বা সংশোধনের উদ্দেশ্য সমালোচনা ১২. সময়ের কোরবানি করা। ১৩. ক্রমান্বয়ে আন্দোলন ও সংগঠনের সাথে নিজেকে একাত্ম করে ফেলা। ১৪. নিজের পরিবারের সংশোধন করা এবং তাদেরকে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেয়া। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদার লোকেরা, তোমরা নিজেদের ও নিজেদের পরিবার পরিজনদের (জাহান্নামের সে কঠিন) আগুন থেকে বাঁচাও, তার জ্বালানি হবে মানুষ আর পাথর।’ (সূরা তাহরিম : ৬)

ইসলামী আন্দোলনের একজন যথার্থ কর্মীর মাঝে যেসব বৈশিষ্ট্য থাকা জরুরি
ক.    জ্ঞান অর্জন ও সচেতনতা : ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মীর ইসলামী আদর্শ, আন্দোলন ও সংগঠনসংক্রান্ত যেই কোন প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব দেবার মতো জ্ঞান থাকতে হবে। এ ছাড়া আল্লাহর পরিচয়, রাসূলের (সা) মর্যাদা, আখেরাত, আন্দোলনের গুরুত্ব, আন্দোলনের মক্কি ও মাদানি জীবন, মুহাসাবাহ সংক্রান্ত জ্ঞান অর্জন করা জরুরি। পাশাপাশি অন্যান্য আদর্শ ও মতবাদগুলোর মোকাবেলায় ইসলামকে যথার্থভাবে তুলে ধরার যোগ্যতাও তার মাঝে থাকতে হবে। দেশ ও আন্তর্জাতিক সমসাময়িক ঘটনাবলি সম্পর্কেও তাকে সর্বদা সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
খ.    দ্বীনি আন্দোলনকে নিজের জীবনের মিশনে পরিণত করা : ইসলামী আন্দোলনের একজন প্রকৃত কর্মীর জীবনের প্রধান কাজই হবে দ্বীনি আন্দোলন, অন্য কিছু নয়। বাস্তবিক প্রয়োজনে অন্যান্য কাজের সাথে তিনি অবশ্যই জড়িত হবেন কিন্তু প্রধান কাজ হিসেবে গণ্য করবেন ইসলামী আন্দোলনকে। আন্দোলনের কাজকে তিনি কখনও অবসর সময়ের বা বিশেষ কোন মওসুমের মনে না করে বরং এ কাজকে তার জীবনের সাথে সম্পৃক্ত করে নেবেন। মনে রাখতে হবে একজন মানুষ কখনও কখনও দ্বীনি আন্দোলনের অনেক খেদমত করতে পারেন, সাহায্য করতে পারেন কিন্তু ইসলামী আন্দোলনের একজন যথার্থ ও প্রকৃত কর্মী হতে হলে দ্বীনি আন্দোলন তথা ইসলামী জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে নিজের জীবনের মিশনে পরিণত করতে হবে।
গ.    আন্দোলনের কাজকে অগ্রাধিকার দান : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা যখন জীবনের সকল প্রকার কাজকর্মের ওপরে আন্দোলনের কাজকে অগ্রাধিকার না দিয়ে ব্যক্তিগত, পারিবারিক অথবা বৈষয়িক স্বার্থকে আন্দোলনের ওপর অগ্রাধিকার দেয় তখন আন্দোলনের প্রাণশক্তি বিনষ্ট হয়। সুতরাং একজন প্রকৃত কর্মীর জন্য কখনও আন্দোলনের কাজের চেয়ে দুনিয়ার কাজকে প্রাধান্য দেয়া সমীচীন নয়। বস্তুত একজন কর্মীর আন্দোলন হবে আল্লাহর জন্য, আর চাকরি-বাকরি, পেশা-ক্যারিয়ার সবকিছু হবে আন্দোলনকে সামনে রেখে। আন্দোলনের স্বার্থকে প্রাধান্য না দিলে একজন কর্মীর যোগ্যতা অনেক সময় সংগঠন সঠিকভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পায় না। আন্দোলনের কাজকে অগ্রাধিকার প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ বলেন, ‘(হে নবী) বলো, যদি তোমাদের পিতা, তোমাদের সন্তানাদি, তোমাদের ভাই, তোমাদের পরিবারপরিজন, তোমাদের বংশ-গোত্র এবং তোমাদের ধনসম্পদ যা তোমরা অর্জন করেছো এবং ব্যবসা-বাণিজ্য যা অচল হয়ে যাবে বলে তোমরা ভয় করো, তোমাদের বাসস্থানসমূহ যাকে তোমরা পছন্দ করো, যদি (এগুলো) তোমার আল্লাহ, তাঁর রাসূল (সা) ও তাঁর পথে জিহাদ করা থেকে অধিক প্রিয় হয়, তবে তোমরা আল্লাহ তায়ালার বিধান আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করো, আর আল্লাহ ফাসেক সম্প্রদায়কে কখনো হেদায়েত করেন না।’ (সূরা তওবা : ২৪)
ঘ.    আন্দোলন ও সংগঠনের প্রতি গভীর আস্থা : আন্দোলনের কর্মসূচি, কর্মনীতি ও নীতি-পলিসি এবং পদ্ধতি, প্রক্রিয়া ও কার্যক্রমের ব্যাপারে একজন কর্মীর অবশ্যই গভীর আস্থা থাকতে হবে। আন্দোলন ও সংগঠনের ব্যাপারে মানসিক আস্থা ও বিশ্বাস ছাড়া আন্দোলনের পথে যেমন একাত্ম হয়ে চলা অবাস্তব তেমনি অনাস্থা ও দুর্বল মনোভাব নিয়ে আন্দোলন ও সংগঠনের যথার্থ কর্মীও হওয়া যায় না।
ঙ.    আন্দোলন ও সংগঠন নিয়ে সার্বক্ষণিক চিন্তা-ভাবনা : আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত একজন যথার্থ কর্মীকে অবশ্যই আন্দোলনের উন্নতি-অবনতি নিয়ে ভাবতে হবে। তাঁর মনে-প্রাণে-ধ্যানে, চিন্তা-ভাবনায় আন্দোলনের কথা সার্বক্ষণিক কম-বেশি জাগরূক থাকবে। আন্দোলনের লাভ-ক্ষতি, সুবিধা-অসুবিধা ও জয়-পরাজয়কে নিজের লাভক্ষতি, সুবিধা-অসুবিধা ও জয়-পরাজয় বলে বিবেচিত করবে।
চ.    আন্দোলন ও সংগঠনের জন্য যেকোনো ত্যাগ স্বীকারে সদা প্রস্তুত থাকা : ইসলামী আন্দোলনের যথার্থ কর্মী হচ্ছেন তিনি যিনি আন্দোলনের কল্যাণের জন্য নিজের যেকোন ক্ষতি স্বীকার করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন। নিজের ধন, মাল, সামাজিক প্রতিষ্ঠা, আরাম-আয়েশ, ক্যারিয়ার সব কিছুর ওপর তিনি প্রাধান্য দেন আন্দোলনের স্বার্থ ও প্রয়োজনকে। আন্দোলনের স্বার্থে প্রয়োজন হলে তিনি নিজের মূল্যবান জীবনকেও বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত থাকেন। যিনি নিজের কথা আগে চিন্তা করেন তারপর আন্দোলনের কথা চিন্তা করেন তার পক্ষে সত্যিকার কর্মী হওয়া সম্ভব নয়। অনেকে এমন আছেন কার্যত ছোটখাটো কোরবানি করতেও পিছপা হন। আন্দোলনের জন্য নিজের সামান্য ব্যক্তিগত সুবিধা ও স্বার্থ পরিহার করতে চান না, তারা মোটেও প্রকৃত কর্মী নন। যদি কেউ এরূপ ধারণা নিয়ে আন্দোলনে যোগদান করে যে জানমালের কোরবানি না করে শুধু জামায়াতভুক্ত হলেই নাজাত পাওয়া যাবে, তাহলে এসব লোক বিরাট সমস্যা সৃষ্টি করে এবং তাদের দ্বারা আন্দোলনের অগ্রযাত্রা ব্যাহত হয়।
ছ.    আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনই হবে একমাত্র মূল লক্ষ্য : ইসলামী আন্দোলনের পরম লক্ষ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ। সে জন্য আন্দোলনের একজন আদর্শ কর্মীর ইবাদত-বন্দেগি, আন্দোলন, সংগঠন, ত্যাগ- কোরবানি, জীবন-মৃত্যু সবকিছুই হবে আল্লাহর জন্য। প্রতিটি কথা ও কাজ, সকল তৎপরতা, চলাফেরা, অপরের সাথে বন্ধুত্ব বা বৈরীভাব পোষণ, লেনদেন, জীবিকা অর্জনসহ আন্দোলনের সকল কাজকর্ম একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য হচ্ছে কিনা তা খতিয়ে দেখা এবং এর প্রেরণা কিভাবে বর্ধিত করা যায় তার আপ্রাণ চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ বলেন, তুমি (একান্ত বিনয়ের সাথে) বলো, অবশ্যই আমার নামাজ, আমার কাজ কর্ম, আমার জীবন, আমার মৃত্যু সব কিছুই সৃষ্টিকুলের মালিক মহান আল্লাহ তায়ালার জন্য। (সূরা আনয়াম : ১৬২)
জ.    ব্যক্তিজীবনে শরিয়তের অনুসরণ : জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে ইসলামী শরিয়তের নির্দেশিত পথে পরিচালিত করাই ইসলামী আন্দোলনের একজন যথার্থ কর্মীর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তার আমল আখলাক হবে উন্নত আকর্ষণীয়, অন্যদের জন্য অনুকরণযোগ্য। তিনি থাকবেন সকলের প্রশ্নের ঊর্ধ্বে। ব্যক্তিজীবনে ইসলামের বিধিবিধান কঠোরভাবে মেনে চলবেন। তিনি শুধু রাষ্ট্র ও সমাজে ইসলাম কায়েমের শ্লোগানই দিয়েই কাজ শেষ করবেন না, পাশাপাশি তা নিজের জীবনে পুরোপুরি বাস্তবায়নের জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রত্যাশিত মান
যেকোনো বিপ্লবী আন্দোলন বা দলের কর্মীবাহিনীর মান অবশ্যই উচ্চস্তরের উচ্চদরের হওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা কর্মীদের মান প্রত্যাশিত না হলে সেই আন্দোলন যেমন সফলতা লাভ করতে পারে না তেমনি বিজয় লাভ করলেও বেশিদিন টিকে থাকতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের স্ট্যান্ডার্ডের কোন সীমারেখা নেই। মানুষ তার কুপ্রবৃত্তিকে দমন করে আমলের মাধ্যমে ফেরেশতার চেয়েও উত্তম হতে পারে। মানুষের সর্বোচ্চ আমল বা স্ট্যান্ডার্ড হলো ইহসান। মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘অন্য দিকে যারা ঈমান এনেছে এবং ভালো কাজ করেছে, তারাই হচ্ছে সৃষ্টিকুলের (মধ্যে) সর্বোৎকৃষ্ট। তাদের জন্য তাদের মালিকের কাছে পুরস্কার রয়েছে (এমন এক) জান্নাত, যার তলদেশে প্রবাহিত থাকবে ঝর্ণাধারা, এরা সেখানে অনন্তকাল ধরে অবস্থান করবে; আল্লাহ তায়ালা তাদের ওপর সন্তুষ্ট হবেন, তারাও তাঁর ওপর সন্তুষ্ট থাকবে; এটা এ জন্য যে, সে তার মালিককে (যথাযথ) ভয় করেছে।’ (সূরা আল বাইয়্যেনাহ : ৭-৮)
রাসূল (সা) হাদিসে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য ৯টি আমলের কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘আমার রব আমাকে ৯টি জিনিসের নির্দেশ দিয়েছেনÑ
১. গোপন ও প্রকাশ্যে সকল অবস্থায় যেন আল্লাহকে ভয় করে চলি ২. খুশি বা ক্রদ্ধ উভয় অবস্থায় যেন ইনসাফ কায়েম করি ৩. অভাব এবং সচ্ছল উভয় অবস্থায় যেনো সততা ও ভারসাম্য রক্ষা করে চলি ৪. যে আমার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করবে তার সাথে যেন সম্পর্ক স্থাপন করি ৫. যে আমাকে বঞ্চিত করে তাকে যেন দান করি ৬. কেউ জুলুম করলে আমি যেন তাকে মাফ করে দেই ৭. আমার নীরবতা যেন সৎচিন্তায় পরিণত হয় ৮. আমার কথাই যেন আল্লাহর স্মরণ হয় এবং ৯. আমার দৃষ্টি যেন শিক্ষণীয় হয়।’
এসব কাক্সিক্ষত গুণাবলির কথা উল্লেখের পর নবী করিম (সা) বলেন, আমাকে হুকুম করা হলো আমি যেন ‘আমর বিল মারুফ’ এবং ‘নাহি আনিল মুনকার’ এর কাজ করি। এর থেকে বোঝা যায় সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধের জন্য যে উম্মতে ওয়াসাতের উত্থান তাঁর প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে এ গুণাবলি থাকা অপরিহার্য। এ গুণাবলির অভাবে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীগণ তাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করতে সক্ষম হবে না। সুতরাং ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের কাক্সিক্ষত মানের মানদন্ড হলোÑ
ক.    মহান আল্লাহ তায়ালা যে মান পছন্দ করেন।
খ.    আল কুরআন মানুষকে যে মানে তৈরি করতে চায়।
গ.    নবী ও রাসূলগণ সাহাবাদেরকে যে মানে তৈরি করেছিলেন এবং
ঘ.    যে মানের ফলে আল্লাহ বান্দার সকল গুনাহ মাফ করে দেন এবং আখেরাতে পুরস্কারস্বরূপ তাকে জান্নাত দান করেন।
কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ৩ ধরনের মান অর্জন করা আবশ্যক : ১. নৈতিক ও আদর্শিক মান ২. সত্যের পথে আহবানকারী হিসাবে মান ৩. সাংগঠনিক মান।

নৈতিক ও আদর্শিক মান
ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মীর ব্যক্তিগতভাবে এমন কিছু নৈতিক ও আদর্শিক মান থাকতে হবে যেগুলো অর্জন ব্যতীত আন্দোলনের কর্মী হিসেবে তার পক্ষে সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করা সম্ভব হবে না।
১.    ইসলামী আদর্শ ও ভিত্তিসমূহে দৃঢ় ঈমান : ইসলামী জীবনাদর্শের প্রতি সুদৃঢ় ঈমান না থাকলে আন্দোলনের ভালো কর্মী হওয়া যায় না। যে দ্বীনের ভিত্তিতে সে জীবনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায় তার ওপর নিজেকে অবিচল ঈমান রাখতে হবে। ঐ জীবনব্যবস্থার সত্যতা ও নির্ভুলতা সম্পর্কে তার নিজের মন নিঃসংশয় হতে হবে। এ ব্যাপারে তার নিজের চিন্তা পুরোপুরি একাগ্র হতে হবে। কেননা সন্দেহ, সংশয় ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব অবস্থায় মানুষ এ কাজ করতে পারে না। মানসিক সংশয় এবং বিশৃঙ্খল চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ইসলামী আন্দোলনে ভালো ভূমিকা রাখা যায় না। ঈমান যত মজবুত হবে ততই দ্বীনের পথে চলা সহজ হবে। আর প্রকৃত ঈমানের জন্য দৃঢ়তা ও অবিচলতা জরুরি বিষয়। জান্নাতের অনন্ত পুরস্কারের সুসংবাদ তাদের জন্যই যারা শুধু মৌখিক ঈমানই গ্রহণ করেনি বরং মৌখিক ঘোষণার সাথে সাথে এর ওপর অবিচল দৃঢ় থেকেছে।
২.    উত্তম চরিত্রের অধিকারী হওয়া : যারা সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলন করবে, সমাজে ভালোর প্রসার ও মন্দ দূর করার প্রচেষ্টা চালাবে তাদের জন্য উত্তম চরিত্রের কোনো বিকল্প নেই। উত্তম চরিত্রের পূর্ণতা দানের জন্যই (রাসূল)কে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছে। অবশ্যই তাঁর পূর্ণাঙ্গ চরিত্র তো এমন এক অথই সমুদ্র, ডুব দিয়ে যার অসীম গহিনতায় পৌঁছা অসম্ভব। যার চরিত্র উন্নত নয়, উত্তম নয়, তার দ্বারা কোন ভালো কাজ, দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ হওয়ার কথা নয়। এ প্রসঙ্গে সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদুদী (রহ) বলেন, ‘চারিত্রিক গুণাবলি মানুষের মন জয় করে নেয়। এগুলো তলোয়ারের চাইতেও ধারালো এবং হীরা, মণি-মুক্তার চাইতেও মূল্যবান। যে এহেন চারিত্রিক গুণাবলি অর্জনকারী সে তার চার পাশের জনবসতির ওপর বিজয় লাভ করে। কোনো দল পূর্ণাঙ্গরূপে এ গুণাবলির অধিকারী হয়ে কোনো মহান উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য সুসংবদ্ধ প্রচেষ্টা চালালে দেশের পর দেশ তার করতলগত হতে থাকে এবং দুনিয়ার কোনো শক্তিই তাকে পরাজিত করতে সক্ষম হয় না।’
৩.    তাকওয়ার গুণে গুণান্বিত হওয়ার প্রচেষ্টা : ইসলামী আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য যেহেতু তাকওয়াভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সেহেতু এ আন্দোলনের কর্মীদের জন্য তাকওয়ার সত্যিকার গুণে গুণান্বিত হওয়া অতীব জরুরি বিষয়। তাকওয়া হচ্ছে আত্মার এমন একটি গুণ, যা মানুষকে আল্লাহর নির্দেশ পালন করতে এবং তাঁর নিষেধাজ্ঞা থেকে বিরত থাকতে উদ্বুদ্ধ করে। মানুষের সমস্ত আমলের বুনিয়াদ হলো তাকওয়া। মহান আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি তার ঘরের ভিত্তি স্থাপন করেছে আল্লাহর ভয় ও তাঁর সন্তুষ্টির ওপর- সে ব্যক্তি উত্তম, না যে ব্যক্তি তাঁর ঘরের ভিত্তি দাঁড় করিয়েছে পতনোন্মুখ একটি গর্তের কিনারায় এবং যা তাকেসহ (অচিরেই) জাহান্নামের আগুনে গিয়ে পড়বে; আল্লাহ তায়ালা যালেম সম্প্রদায়কে হেদায়াত দেন না। (সূরা তওবা : ১০৯)
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা তাকওয়ার গুণাবলি অর্জন ব্যতীত দ্বীনি আন্দোলনে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারে না। ইসলামী আন্দোলনের পথ যেহেতু কণ্টকাকীর্ণ সেহেতু এ পথে টিকে থাকা অনেক কঠিন। সকল ধরনের বাধা প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করে আন্দোলনে টিকে থাকা এবং সঠিক ভূমিকা পালনের জন্য নির্ভীকতার গুণ অর্জন আবশ্যক। আর তাকওয়াই হচ্ছে সে নির্ভীকতার প্রতীক। তাকওয়াবান ব্যক্তি হয় নির্ভীক, সাহসী, নরশাদুল। তাকওয়াবান ব্যক্তিদের মাথা আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে নত হয় না, তাদেরকে কেউ পদানত, পরাভূত করতে পারে না। তামাম দুনিয়া তাদেরকে ভয় করে। আর যারা আল্লাহকে ভয় করে না, তামাম দুনিয়া তাদেরকে ভয় দেখায়। এরা তেলাপোকা দেখলেও ভয় করে, রাতের আঁধারে গাছের পাতার নড়াচড়া দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে যায়। রাসূল (সা) বলেছেন, এমন এক সময় আসবে যখন পৃথিবীর সকল জাতি একজোট হয়ে তোমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়বে, যেমনভাবে পেয়ালার মধ্যে খাদ্যবস্তু একত্র হয়ে যায়। একজন সাহাবী তখন প্রশ্ন করলেন, তবে আমরা কি তখন সংখ্যায় কম থাকবো? উত্তরে রাসূল (সা) বললেন, না বরং তোমরা সংখ্যায় বেশি থাকবে। কিন্তু তোমরা বন্যায় ভেসে আসা খড়কুটোর ন্যায় দুর্বল হয়ে যাবে এবং আল্লাহ শত্রুদের অন্তরে তোমাদের ব্যাপারে লালিত ভয়-ভীতি দূর করে দেবেন, আর তোমাদের অন্তরে দুর্বলতা সৃষ্টি করে দেবেন। অপর একজন জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা)! কী সেই দুর্বলতা? রাসূল (সা) বললেন, তোমাদের সেই দুর্বলতা হলো দুনিয়াকে ভালোবাসা এবং মৃত্যুকে অপছন্দ করা। (আহমদ, আবু দাউদ)।
৪.    সবরের অধিকারী হওয়া : ইসলামী আন্দোলনে প্রত্যাশিত ভূমিকা পালন করতে হলে আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মীদের সবর বা ধৈর্যশীল হতে হবে। দুনিয়াতে মুমিনদের চলার পথ ফুল বিছানো নয়। এই পথ অত্যন্ত বন্ধুর ও কণ্টকাকীর্ণ। জান্নাত পেতে হলে অবশ্যই ধৈর্যের পরীক্ষা দিতে হবে এবং উত্তীর্ণ হতে হবে। আন্দোলন করতে গিয়ে যদি সে গালি খেয়ে হাসবার ও নিন্দাবাদ হজম করার ক্ষমতা না রাখে এবং দোষারোপ ও মিথ্যা প্রপাগান্ডাকে নির্বিবাদে এড়িয়ে গিয়ে স্থিরচিত্তে ও ঠান্ডা মস্তিষ্কে নিজের কাজে ব্যস্ত না থাকতে না পারে, তাহলে এ পথে পা না বাড়ানোই তার জন্য বেহতর, কারণ এ পথে কাঁটা বিছানো। এ পথে এমন সব লোকের প্রয়োজন যারা নিজেদের কাপড়ে কোন কাঁটা বিঁধলে কাপড়ের সে অংশটি ছিঁড়ে কাঁটাগাছের গায়ে রেখে দিয়ে নিজের পথে এগিয়ে যেতে থাকবে। সারাজীবন একটি উদ্দেশ্য সম্পাদনের জন্য সে অনবরত পরিশ্রম করতে থাকবে এবং একের পর এক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েও পরিশ্রম থেকে বিরত হবে না। তাকে মনে রাখতে হবে, অনাদিকাল থেকে তার এ ভাগ্যই লিখে রাখা হয়েছে যে, সে অনুর্বর জমিতে হাল চালাবে, তার অনুর্বরতা ও চাষের অনুপযোগিতার বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আপন গায়ের ঘাম দিয়ে এবং সম্ভব হলে তাজা খুন দিয়ে তাকে সিক্ত করতে হবে এবং ফলাফলের পরোয়া না করে বীজ বপন করতে হবে। যদি জমি তার প্রচেষ্টায় সিক্ত ও উর্বর হয়, তাহলে সাফল্য নিশ্চিত। কিন্তু সে যদি এ অনুৎপাদনশীল জমিতে সারা জীবন নিষ্ফল পরিশ্রম করতে থাকে এবং অবশেষে একদিন এ কাজেই জীবন দিয়ে দেয়, তথাপি প্রকৃতপক্ষে সে বিফলকাম নয়। তার জন্য এ সাফল্য কি কম যে, যে কাজ সে ফরজ মনে করতো তার জন্য সে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অটল ছিল এবং ব্যর্থতা তাকে তার কর্তব্য পালন থেকে বিরত রাখতে পারেনি। (মাওলানা মওদূদী) অপর দিকে আন্দোলনের ময়দানে ধৈর্যই আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার অন্যতম শর্ত। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই তোমরা যদি সবর করো ও তাকওয়া অবলম্বন করো তবে যে মুহূর্তে (শত্রুরা) তোমাদের ওপর চড়াও হয়ে আসবে তখন পাঁচ হাজার চিহ্নযুক্ত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদের সাহায্য করবেন।’ (সূরা আলে ইমরান : ১২৫)
৫.    হিকমত অবলম্বন করা : আন্দোলনের দাওয়াত উপস্থাপনের ক্ষেত্রে সময় ও পরিস্থিতির যথাযথ মূল্যায়ন এবং সে আলোকে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে। দাওয়াত প্রদানকারী এমন কর্মসূচি গ্রহন করবে, যাতে করে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিরোধীদের শক্তি খর্ব হয়ে যায়।
৬.    ইখলাছ বা বিশুদ্ধ নিয়ত : মানুষের যাবতীয় কাজের ফলাফল যেহেতু নিয়তের ওপরই নির্ভর করে সেহেতু ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আন্দোলনে ভূমিকা রাখার ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ নিয়তের অধিকারী হতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, যারা আখিরাতের চাষের জমি চায়, আমি তার কৃষিভূমি বাড়িয়ে দিই। আর যারা দুনিয়ার ক্ষেতফসল চায় তাকে দুনিয়া থেকেই কিছু দিয়ে থাকি। কিন্তু আখেরাতে তার কোনো হিস্যা নেই। (সূরা শূরা : ২০)
৭.    তাওয়াক্কুল বা আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতা : ইসলামী আন্দোলনের দায়িত্বপালনকালীন সময়ে আন্দোলনের বিশেষ কোন পরিস্থিতিতে আন্দোলনের কর্মীরা ঘাবড়িয়ে যাবে না। আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলের ভিত্তিতে আন্দোলনের কর্মীদের এমন আত্মবিশ্বাস জন্মাতে হবে যে, আল্লাহর সাহায্য আমি বা আমরা পাবোই।
৮.    ইস্তিকামাত বা অবিচল নিষ্ঠা ও দৃঢ়তা অবলম্বন : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আরেকটি জরুরি গুণ থাকতে হবে আর তা হচ্ছে ইস্তিকামাত বা দ্বীনের ওপর অবিচল থাকা, দৃঢ় হয়ে থাকা। মহান আল্লাহকে রব মেনে যারা এর ওপর দৃঢ় অবিচল থাকে তাদের জন্য কোন ভয় নেই, নেই কোনো দুশ্চিন্তার কারণ। জান্নাত হবে তাদের পুরস্কার। মহান আল্লাহ বলেন, (অপর দিকে) যারা বলে, আল্লাহ তায়ালাই হচ্ছেন আমাদের মালিক, অতঃপর (এ ঈমানের ওপর) তারা অবিচল থাকে, তাদের কাছে ফেরেশতা নাজিল হবে এবং তাদের বলবে (হে আল্লাহর প্রিয় বান্দারা) তোমরা ভয় পেয়ো না, চিন্তিত হয়ো না; তোমাদের কাছে যে জান্নাতের ওয়াদা করা হয়েছিলো, তোমরা তারই সুসংবাদ গ্রহণ করো। (সূরা হা মিম আস সাজদা : ৩০)
৯.    দ্বীনি কাজের প্রতিযোগিতা করা : ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা দ্বীনি ব্যাপারে প্রতিযোগিতার মনোভাব নিয়ে কাজ করবে। শিথিলতা, অলসতা, গড়িমসি ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব পরিহার করে চলবে। মহান আল্লাহ বলেন, তোমরা তোমাদের মালিকের পক্ষ থেকে ক্ষমা পাওয়ার কাজে প্রতিযোগিতা করো, আর সেই জান্নাতের জন্যও, যার প্রশস্ততা আকাশসমূহ ও পৃথিবী সমান, আর এই (বিশাল) জান্নাত প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে সেসব লোকের জন্য, যারা আল্লাহকে ভয় করে। (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)
১০.    আমানতদার হওয়া : আমানতের সংরক্ষণ ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য। মহান আল্লাহ বলেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা আমানতসমূহ তাদের (যথার্থ) মালিকদের কাছে সোপর্দ করে দেবে, আর যখন মানুষের মাঝে (কোন কিছুর) ব্যাপারে তোমরা বিচার ফয়সালা করো তখন তা ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তিতে করবে; আল্লাহ তায়ালা তার মাধ্যমে তোমাদের যা কিছু উপদেশ দেন তা সত্যি সত্যিই সুন্দর! আল্লাহ তায়ালা সব কিছু দেখেন ও শুনেন (সূরা নিসা : ৫৮) রাসূল (সা) বলেছেন, যার মধ্যে আমানতদারিতা নেই তার ঈমান নেই।

সত্যের পথে আহবানকারী হিসেবে মান
সত্যের পথের আহবানকারী হিসেবে আন্দোলনের কর্মীদের নিম্নোক্ত গুণ বৈশিষ্ট্য থাকতে হবেÑ
১.    হিকমত ও সদুপদেশ সহকারেই মানুষের কাছে দাওয়াত পৌঁছানো,
২.    উত্তম পন্থায় বিতর্ক। (সূরা নাহল : ১২৫)
৩.    নম্রভাষী হওয়া। (সূরা ত্বহা : ৪৩-৪৪)
৪.    কোমল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া। (সূরা আলে ইমরান : ১৫৯)
৫.    মন্দের জবাব ভালো দিয়ে দেয়া। (সূরা হা মিম আস সাজদা : ৩৪)
৬.    ক্ষমাশীল হওয়া। (সূরা আরাফ : ১৯৯)
৭.    প্রাঞ্জল ভাষায় দাওয়াত দেয়া। (সূরা ত্বহা : ২৫-২৮)
৮.    কথা ও কাজে মিল থাকা। (সূরা বাকারা : ৪৪, সূরা সফ : ২-৩)
৯.    মুজাহাদায়ে নাফসের অধিকারী হওয়া,
১০. ফানা ফিল ইসলাম হয়ে যাওয়া। রাসূল (সা) এটাকে এভাবে বলেছেন, এদের সাথে দেখা হলেই আল্লাহর ইয়াদ আসবে, আল্লাহর কথাই মনে পড়বে।

সাংগঠনিক মান
ইসলামী আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত কর্মীদের নিম্নোক্ত সাংগঠনিক মান অর্জন করা জরুরি :
১.    আনুগত্যপরায়ণতা ও শৃঙ্খলাবোধ,
২.    পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও ভালোবাসা,
৩.    পরামর্শ দান,
৪.    সংশোধনের উদ্দেশ্য এহতেসাব বা সমালোচনা।

ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য বর্জনীয় ত্রুটিসমূহ
১. অহঙ্কার ও আত্মম্ভরিতা ২. রিয়া ও প্রদর্শনেচ্ছা ৩. হিংসা-বিদ্বেষ ৪. আত্মপূজা ও স্বার্থপরতা ৫. পদের প্রতি লোভ।

ক্ষতিকর ত্রুটিসমূহ
১. কু-ধারণা ২. গিবত ৩. চোগলখুরি বা কূটনামি ৪. কানাকানি ও ফিসফিসানি ৫. মেজাজের ভারসাম্যহীনতা ৬. একগুঁয়েমি ৭. একদেশদর্শিতা ও চরমপন্থী মনোভাব ৮. হতাশা ৯. দুর্বল সঙ্কল্প।

সবশেষে বলা যায়, ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের প্রত্যাশিত মান অর্জন ও সংরক্ষণই মূলত এই আন্দোলনকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে। সুতরাং নিজেকে যোগ্য করে তৈরি করতে হলে উপরিউক্ত যাবতীয় বিষয়ের প্রতি আমাদের লক্ষ রাখা উচিত।

লেখক : সেক্রেটারি জেনারেল, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply