ইসলামী আন্দোলনের পথে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত হওয়াই আমাদের কাজ

 মকবুল আহমাদ#

Koranতৃতীয় পর্ব

আল্লাহ তায়ালার ওপরই তায়াক্কুল

যারা আল্লাহ তায়ালার ওপরই তায়াক্কুল করে তারা দুনিয়ার বৃহত্তম শক্তির পরোয়া করে না এবং মহাপরাক্রমশালী ও দয়াময় সত্তার ওপর নির্ভর করে কাজ করে যায়। যার পেছনে তার সমর্থন আছে তাকে দুনিয়ার কেউ হেয়প্রতিপন্ন করতে পারে না। তার জন্য যে ব্যক্তি সত্যের ঝান্ডা বুলন্দ করার কাজে জীবন উৎসর্গ করবে তার প্রচেষ্টা তিনি কখনও নিষ্ফল হতে দেবেন না।
আল্লাহ বলেন, ‘‘তাদের অবাধ্য আচরণে তুমি মনোক্ষুণœ হয়ো না, তুমি বরং সর্বোচ্চ পরাক্রমশালী ও দয়ালু আল্লাহ তায়ালার ওপরই ভরসা করো।’’ (সূরা আশ-শু’আরা : ২১৭)
মহান রাব্বুল আলামিন ইরশাদ করেছেন, (নেককার মানুষ হচ্ছে তারা,) যারা ধৈর্য ধারণ করেছে (এবং সর্বাবস্থায়) নিজেদের মালিকের ওপরই নির্ভর করেছে।” (সূরা আল-আনকাবুত : ৫৯)
তারা সত্য পথে পূর্ণ অবিচলতার সাথে প্রতিষ্ঠিত থাকে কোনো ক্ষতি বা বিপদের মুখে কখনো সাহস ও হিম্মতহারা হয় না। ব্যর্থতা এদের মনে কোনো চিড় ধরায় না। লোভ লালসায় পা পিছলে যায় না। যখন আপাতদৃষ্টিতে সাফল্যের কোনো সম্ভাবনাই দেখা যায় না, তখনো এরা মজবুতভাবে সত্যকে আঁকড়ে ধরে থাকে।
নিজেদের আবেগ-অনুভূতি, কামনা-বাসনাকে সংযত রাখে। তাড়াহুড়া করে না। ভীত আতঙ্কিত হওয়া লোভ লালসা পোষণ করা এবং অসঙ্গত উৎসাহ উদ্দীপনা প্রকাশ থেকে তারা দূরে থাকে।
স্থির মস্তিষ্কে এবং ভারসাম্যপূর্ণ ও যথার্থ পরিমিত বিচক্ষণতা ও ফায়সালা করার শক্তিসহকারে কাজ করে। বিপদ আপদ ও সঙ্কট সমস্যার সম্মুখীন হলেও যেন তোমাদের পা-না টলে, উত্তেজনাকর পরিস্থিতি দেখা দিলে ক্রোধ ও ক্ষোভের তরঙ্গে ভেসে গিয়ে তোমরা যেন কোনো অর্থহীন কাজ করে না বসো। বিপদের আক্রমণ চলতে থাকলে অবস্থা সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে মোড় নিয়েছে দেখতে পেলে মানসিক অস্থিরতার কারণে তোমাদের চেতনাশক্তি  যেন বিক্ষিপ্ত ও বিশৃঙ্খল না হয়ে পড়ে। এর মধ্যেই প্রকৃত সবর নিহিত রয়েছে।
আল্লাহ বলেন, ‘‘কিন্তু যারা পরম ধৈর্য ধারণ করে এবং নেক আমল করে, এরাই হচ্ছে সেসব লোক, যাদের জন্য রয়েছে আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমা ও মহাপুরস্কার।’’ (সূরা হুদ : ১১)
মুসলমানদের মন কখনো কখনো কাফেরদের জুলুম, নিপীড়ন, কূটতর্ক এবং লাগাতার মিথ্যাচার ও মিথ্যা দোষারোপের ফলে বিরক্তিতে ভরে ওঠে। এ অবস্থায় ধৈর্য ও নিশ্চিন্ততার সাথে অবস্থার মোকাবেলা এবং আত্মসংশোধন ও আত্মসংযমের জন্য তাদের নামাজের ব্যবস্থাপত্র দেয়া হয়েছে।

নামাজের মাধ্যমে সাহায্য কামনা
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বর্ণিত আছে, “তোমার পূর্বেও অনেক রাসূলকে মিথ্যা বলা হয়েছে কিন্তু তাদের ওপর যে মিথ্যা আরোপ করা হয়েছে এবং যে কষ্ট দেয়া হয়েছে, তাতে তারা সবর করেছে। শেষ পর্যন্ত তাদের কাছে আমার সাহায্য পৌঁছে গেছে। আল্লাহর কথাগুলো পরিবর্তন করার ক্ষমতা কারো নেই এবং আগের রাসূলদের সাথে যা কিছু ঘটেছে তার খবর তো তোমার কাছে পৌঁছে গেছে।’’ (সূরা আল-আন’আম : ৩৪)
আল্লাহ পাক কুরআনে ইরশাদ করেন, ‘‘সবর ও নামাজ সহকারে সাহায্য ুচাও নিঃসন্দেহে নামাজ বড়ই কঠিন কাজ কিন্তু খোদাভীরুদের জন্য নয়।” (সূরা আল-বাকারা : ৪৫)
আল্লাহ বলেন, ‘‘প্রকৃত পক্ষে রাতের বেলা জেগে ওঠা প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে অনেক বেশি কার্যকর।” (সূরা আল-মুয্যাম্মিল : ৭)
মহান রাব্বুল আলামিন ঘোষণা করেন, ‘‘রাতের বেলায়ও তাঁর সামনে সিজদায় অবনত হও। রাতের দীর্ঘ সময় তাঁর তাসবিহ অর্থাৎ পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকো।’’ (সূরা দাহর : ২৬)
আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন, ‘‘(হে মুসলমানগণ) তোমাদের অবশ্যই ধন ও প্রাণের পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হবে এবং তোমরা আহলি কিতাব ও মুশরিকদের থেকে অনেক কষ্টদায়ক কথা শুনবে। যদি এমন অবস্থায় তোমরা সবর ও তাকওয়ার নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো তাহলে তা হবে বিরাট সাহসিকতার পরিচায়ক।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৮৬)
পবিত্র কুরআনুল কারীমে বলা হয়েছে, ‘‘এই ভরসা করার কারণেই বদরে (যুদ্ধে) আল্লাহ তায়ালা তোমাদের বিজয় ও সাহায্য দান করেছিলেন, অথচ (তোমরা জানো) তোমরা কত দুর্বল ছিলে; অতএব আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমরা (আল্লাহর) কৃতজ্ঞতা আদায় করতে সক্ষম হবে।’’ (সূরা আলে-ইমরান : ১২৩)

প্রতিশোধ নয় সহনশীল হওয়া
ইসলামী আন্দোলন বিজয়ী হওয়া ক্ষমতায় আসীন হওয়া মহান আল্লাহ তায়ালার ফায়সালা। সময়ের উত্থান পতনে অনেক সময়ে ক্ষমতাসীন না হলেও ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ আসে। তখন প্রতিশোধ নেয়ার একটা উদগ্র বাসনা মাঝে মধ্যে আন্দোলনের কর্মীদের মধ্যে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ইতিহাস সাক্ষী আল্লাহপ্রদত্ত সুযোগ, নেয়ামতকে সমাজের মানুষের কল্যাণে না লাগিয়ে যারা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণে ব্যস্ত তাদেরই প্রতিশোধের মানসিকতা সৃষ্টি হয়। এটা অবশ্যই পরিত্যাজ্য। আমরা প্রতিশোধ নয় ক্ষমা করব, প্রতিহিংসা নয় দরদ- ভালোবাসা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীদের হৃদয় জয় করব ইনশাআল্লাহ।
রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মক্কা বিজয়ের ইতিহাস দেখুন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার সাথীদের দীর্ঘ দুই দশক ধরে নিকৃষ্টতম জুলুম-অত্যাচার পরিচালনাকারী ঠাট্টা বিদ্রƒপকারী, হত্যার ষড়যন্ত্রকারী, দেশ থেকে বিতাড়নকারী, বিনা উসকানিতে আক্রমণকারী, মিথ্যা অভিযোগকারী, ইসলামের কট্টর  শত্রুদের সমস্ত বর্বরতম অপরাধকেও মাফ করে দিলেন। মহান আল্লাহ এ দিকেই ইঙ্গিত করে আল কুরআনে বললেন, “মন্দের প্রতিদান অনুরূপ মন্দই (হবে), কিন্তু যে ক্ষমা করে দেয় এবং আপস করে, আল্লাহতায়ালার কাছে অবশ্যই তার (জন্য) যথাযথ পুরস্কার রয়েছে, নিশ্চয়ই তিনি কখনো জালেমদের পছন্দ করেন না।’’ (সূরা আশ-শুরা : ৪০)
“যে ব্যক্তি ধৈর্য ধারণ করে এবং (মানুষদের) ক্ষমা করে দেয় (সে যেন জেনে রাখে) অবশ্যই এটা হচ্ছে সাহসিকতার কাজসমূহের অন্যতম।” (সূরা আশ-শুরা : ৪৩)
মনমগজের পরিবর্তন ক্ষমা, দয়া, অনুগ্রহ ও কোমলতার মাধ্যমেই সম্ভবপর। ক্রোধ ও প্রতিহিংসা বাস্তবায়নের মধ্যে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত আক্রোশ চরিতার্থ হওয়া ছাড়া কোনো লাভ হয় না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম  ও সাহবায়ে কেরামের জীবনে আমরা এ মহান গুণ দেখতে পাই। কিন্তু আমরা যখন সুযোগ পাই তখন এসব ইতিহাস, মহানুভবতা ভুলে গিয়ে আক্রোশ, ক্রোধ চরিতার্থ করতে গিয়ে মূল আদর্শিক প্রভাব ও বিজয়কে নস্যাৎ করে ফেলি। ইসলামী আন্দোলনের ভাইবোনদের সকল অবস্থায় এদিকে খেয়াল রাখা দরকার। আমাদের এ ধরনের উদার ও মহৎ ব্যবহার অনেকের মন জয় করতে আকৃষ্ট করবে।

রিজিক অšে¦ষণে সীমালঙ্ঘন না করা
বর্তমান আওয়ামী তথা ১৪ দলীয় সরকারের অব্যবস্থাপনা ও জুলুমের শিকার হয়ে অসংখ্য মানুষ জীবনের ন্যূনতম প্রয়োজনও মেটাতে পারছে না। বহু শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বেকার অর্থনৈতিক সচ্ছলতার প্রচেষ্টার দিক হারিয়ে ফেলে, যখন যতটুকু পাওয়া যায় ততটুকুই ধরতে চায়। হালাল হারামের সীমা খেয়াল রাখে না বা রাখার চেষ্টা করে না। সুদের কাজ কারবার লেনদেন, এমএলএম, মালটিপারপাস নামে বৈধ-অবৈধ অনেক প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন কোম্পানি বাজারে চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে জনগণের মন আকৃষ্ট করে। ইসলামী আন্দোলনের ভাইদের এ বিষয়টি যাচাই-বাছাই করে অংশ নেয়া বা যোগদান করা উচিত। বিশ্বস্ত একজনকে ভালো অফিস ও ভাতা দিয়ে সাইনবোর্ড হিসেবে ব্যবহার করে। প্রয়োজনে ইসলামী শরিয়াভিত্তিক বলে প্রচার চালিয়ে ব্যাপক বিনিয়োগ গ্রহণ করে। কিছুদিন পরেই  কোম্পানি লা-পাত্তা হয়ে যায়। ধৈর্য ধরে আয় রোজগার, চাকরি, কর্মসংস্থানের চেষ্টা করতে হবে। কিন্তু নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে মানুষের আমানত  ব্যবহার করে যেন ফাঁদে না পড়ি তা অবশ্যই খেয়াল রেখে চলতে হবে।
মুমিনদের জন্য আল্লাহর সাহায্য অবধারিত
বাতিলের মিথ্যা প্রচারণা, হামলা আর মামলা, জেল-জুলুম নির্যাতনের মোকাবেলায় সত্যপন্থীরাই বিজয়ী হবে। আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমাদের জন্য সেই দু’টি দলের মধ্যে একটি শিক্ষার নিদর্শন ছিল যারা (বদরে) পরস্পর যুদ্ধে লিপ্ত হয়েছিল। একটি দল আল্লাহর পথে যুদ্ধ করছিল এবং অন্য দলটি ছিল কাফের। চোখের দেখায় লোকেরা দেখছিল, কাফেরেরা মু’মিনদের দ্বিগুণ। কিন্তু ফলাফল (প্রমাণ করলো যে) আল্লাহ তার বিজয় ও সাহায্য দিয়ে যাকে ইচ্ছা সহায়তা দান করেন। অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন লোকদের জন্য এর মধ্যে বড়ই শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৩)
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত আছে, ‘‘স্মরণ করো যখন তোমাদের দু’টি দল কাপুরুষতার প্রদর্শনী করতে উদ্যোগী হয়েছিল অথচ আল্লাহ তাদের সাহায্যের জন্য বর্তমান ছিলেন এবং মু’মিনদের আল্লাহরই ওপর ভরসা করা উচিত। এর আগে বদরের যুদ্ধে আল্লাহ তোমাদের সাহায্য করেছিলেন অথচ তোমরা অনেক দুর্বল ছিলে। কাজেই আল্লাহর না-শোকরি করা থেকে তোমাদের দূরে থাকা উচিত, আশা করা যায় এবার তোমরা শোকরগুজার হবে। স্মরণ করো যখন তুমি মু’মিনদের বলছিলে: আল্লাহ তার তিন হাজার ফেরেশতা নামিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন, এটা কি তোমাদের জন্য যথেষ্ট নয়। অবশ্যই যদি তোমরা সবর করো এবং আল্লাহকে ভয় করে কাজ করতে থাকো, তাহলে যে মুহূর্তে দুশমন তোমাদের ওপর চড়াও হবে ঠিক তখনই তোমাদের রব (তিন হাজার নয়) পাঁচ হাজার চিহ্নযুক্ত ফেরেশতা দিয়ে তোমাদের সাহায্য করবেন।” (সূরা আলে-ইমরান : ১২২-১২৫)
আল্লাহ পাক ঘোষণা করেন, ‘‘প্রকৃত পক্ষে সত্য এই যে, আল্লাহ তোমাদের সাহায্যকারী এবং তিনি সবচেয়ে ভালো সাহায্যকারী।’’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৫০)
মহাগ্রন্থ আল-কুরআনে বর্ণিত আছে, ‘‘আল্লাহ যদি তোমাদের সাহায্য করেন তাহলে কোনো শক্তি তোমাদের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করতে পারবে না। আর যদি তিনি তোমাদের পরিত্যাগ করেন, তাহলে এরপর কে আছে তোমাদের সাহায্য করার মতো? কাজেই সাচ্চা মু’মিনদের আল্লাহরই ওপরই ভরসা করা উচিত।’’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৬০)
যেভাবে নূহ এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা সাফল্য লাভ করেছিলেন এবং তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল ঠিক তেমনি তুমি ও তোমার সাথীরাও সাফল্য লাভ করবে এবং তোমাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। এটিই আল্লাহর চিরাচরিত রীতি। শুরুতে সত্যের দুশমনরা যতই সফলতার অধিকারী হোক না কেন সবশেষে একমাত্র ঈমানদাররাই সফলকাম হবে। তোমাদের দাওয়াতকে দাবিয়ে দেয়ার জন্য তোমাদের বিরোধীদের আপাতদৃষ্টে যে সাফল্য দেখা যাচ্ছে, তাতে তোমাদের মন খারাপ করার কোনোই প্রয়োজন নেই। তোমরা সবর ও হিকমত সহকারে কাজকে অব্যাহত রাখো।
যারা আল্লাহভীরুতা ও নেকির পথে চলার ক্ষেত্রে সব রকমের দুঃখ-কষ্ট বরদাশত করেছে কিন্তু ন্যায়ের পথ থেকে সরেনি তার মধ্যে যেসব লোক অন্তর্ভুক্ত যারা দীন ও ঈমানের কারণে হিজরত করে দেশান্তরিত হওয়ার দুঃখ-কষ্ট সহ্য করবে এবং সেসব লোকও অন্তর্ভুক্ত যারা জুলুম-নির্যাতনে ভরা দেশে থেকে সাহসিকতার সাথে সব বিপদের মোকাবেলা করবে।

আল্লাহর দরবারে ধরনা দেয়া
বিপদ মুসিবতের সময় সবচেয়ে বড় পাওনা হচ্ছে বান্দা তার মাবুদের কাছে গিয়ে হাজির হয়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘‘যে নিয়ামতই তোমরা পেয়েছ তা আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। তারপর যখন তোমাদের ওপর কোনো কঠিন সময় আসে তখন তোমরা ফরিয়াদ নিয়ে তারই দিকে দৌড়াও।’’ (সূরা আন-নাহল : ৫৩)দোয়ার ফল কখনও দুনিয়াতে চোখে পড়ে আবার কখনও চোখে পড়ে না। তবে আখিরাতে তা দেখতে পাওয়া যাবে। তাই দোয়া করাকে গুরুত্বহীন ভাবা যেমনি ঠিক নয় অনুরূপভাবে দোয়ার ফল পেতে বিচলিত হয়ে যাওয়া উচিত নয়। আল্লাহ তায়ালা সকল মু’মিনের দোয়া শোনেন। কার দোয়ার উত্তর কখন দেবেন তা তিনিই ভালো জানেন। তিনি তাঁর বান্দার জন্য যা কল্যাণকর তাই করেন- এ বিশ্বাস সকল মুমিনকে রাখতে হবে।
তাই সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাইতে হবে। মহান আল্লাহর রাসূল সা: ফরিয়াদ করেছেন, হে আল্লাহ আজ যদি মুসলমানেরা পরাজিত হয় তাহলে তোমার জমিনে তোমার ইবাদত করবে কে?
তায়েফের ময়দানে রাসূল সা: দু’রাকাত নামাজ পড়ে নিম্নের মর্মস্পর্শী দোয়া করলেন, ‘‘হে আল্লাহ! আমি আমার দুর্বলতা, সম্বলহীনতা ও জনগণের সামনে অসহায়ত্ব সম্পর্কে কেবল তোমারই কাছে ফরিয়াদ জানাই। দরিদ্র ও অক্ষমদের প্রতিপালক তুমিই। তুমিই আমার মালিক। তুমি আমাকে কার কাছে সঁপে দিতে চাইছ? আমার প্রতি বিদ্বেষপরায়ণ প্রতিদ্বন্দ্বীর কাছে, নাকি শত্রুর কাছে? তবে তুমি যদি আমার ওপর অসন্তুষ্ট না থাক, তাহলে আমি কোনো কিছুই পরোয়া করি না। কিন্তু তোমার পক্ষ থেকে শান্তি ও নিরাপত্তা পেলে সেটাই আমার জন্য অধিকতর প্রশান্তি। আমি তোমার কোপানলে অথবা আজাবে পতিত হওয়ার আশঙ্কা থেকে তোমার সেই জ্যোতি ও সৌন্দর্যের আশ্রয় কামনা করি, যার কল্যাণে সকল অন্ধকার দূরীভূত হয় এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। তোমার সন্তোষ ছাড়া আমি আর কিছু কামনা করি না। তোমার কাছ থেকে ছাড়া আর কোথাও থেকে কোনো শক্তি পাওয়া সম্ভব নয়।*
আজকের যুগেও আমাদেরকে কঠিন মুহূর্তে সদাসর্বদা মহান আল্লাহর কাছেই ফরিয়াদ জানাতে হবে। আল্লাহ তা’আলা কুরআনে দোয়া করার নির্দেশ দিয়েছেন, ‘‘তোমাদের পালনকর্তা বলেন, তোমরা আমাকে ডাক আমি সাড়া দেবো। যারা আমার ইবাদতে অহঙ্কার করে তারা সত্বরই জাহান্নামে দাখিল হবে লাঞ্ছিত হয়ে।’’ (সূরা আল মু’মিন : ৬০)
‘‘বল আল্লাহ বলে আহ্বান কর কিংবা রাহমান বলে- যে নামেই আহ্বান করো না কেন সব সুন্দর নাম তারই।’’ (সূরা বনি-ইসরাইল : ১১০)
আমাদেরকে স্মরণ রাখতে হবে আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে সাহায্য চেয়ে লাভ নেই। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো কাছে কিয়ামত পর্যন্ত দোয়া করলেও কোনো উপকারে আসবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, ‘‘তোমরা তাদেরকে ডাকলে তারা তোমাদের ডাক শুনে না। শুনলেও তোমাদের ডাকে সাড়া দেয় না। কিয়ামতের দিন তারা তোমাদের শিরক অস্বীকার করবে। বস্তুত আল্লাহর ন্যায় তোমাকে কেউ অবহিত করতে পারবে না’’। (সূরা ফাতির : ১৪)
আল্লাহর কাছে দোয়া চাওয়ার উত্তম সময় হচ্ছে, গভীর রাতে কিয়ামুল লাইল তথা তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করে কান্নাকাটি করা। মহান আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গভীর রাতে সবসময় জেগে নামাজ আদায় করতেন। আর তা করার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে তার প্রতি নির্দেশ ছিল।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে চাদর মুড়ি দিয়ে শায়িত ব্যক্তি! কিছু সময় বাদ দিয়ে রাতের বেলা নামাজে দাঁড়িয়ে থাকুন। আধা রাত বা তার চেয়ে কিছু কম করুন। অথবা তার চেয়ে কিছু বেশি বাড়িয়ে নিন আর কুরআন খুব থেমে থেমে পড়–ন। নিশ্চয়ই আামি আপনার ওপর এক ভারী কথা নাজিল করব। আসলে রাত জাগা নফসকে দমন করার জন্য খুব বেশি ফলদায়ক এবং কুরআন ঠিকমত পড়ার জন্য বেশি উপযোগী। দিনের বেলা তো আপনার জন্য অনেক ব্যস্ততা আছে। আপনার রবের জিকর করুন সবকিছু থেকে আলাদা হয়ে তারই হয়ে থাকুন। তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের মালিক। তিনি ছাড়া আর কোনো ইলাহ নেই। অতএব তাকেই নিজের উকিল অভিভাবক বানিয়ে নিন। আর লোকেরা যা বলে বেড়াচ্ছে, সে বিষয়ে সবর করুন এবং ভদ্রভাবে তাদের থেকে আলাদা হয়ে যান।” (সুরা আল-মুয্যাম্মিল : ১-৯)
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘‘আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, দুই প্রকারের চক্ষুকে আগুন স্পর্শ করবে না। প্রথমত সে চক্ষু যা আল্লাহর ভয়ে কাঁদে, দ্বিতীয়টি হলো সে চক্ষু যা শত্রুর প্রতীক্ষায় আল্লাহর পথে পাহারাদারি করে রাত কাটিয়েছে।’’ (তিরমিযি)
কুরআনে বলা হয়েছে, ‘‘তাদের দোয়া কেবল এতটুকু ছিল : ‘হে আমাদের রব’ আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দাও। আমাদের কাজের ব্যাপারে যেখানে তোমার সীমালঙ্ঘিত হয়েছে, তা তুমি মাফ করে দাও। আমাদের পা মজবুত করে দাও এবং কাফেরদের মোকাবেলায় আমাদের সাহায্য করো।’’ (সূরা আলে-ইমরান : ১৪৭)

মানবতার কল্যাণে যে আন্দোলনের জন্ম
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহান আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব পালন করার এক দ্বীনি কাফেলা। মূলত আল্লাহপ্রদত্ত ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রদর্শিত  জীবনবিধান কায়েমের জন্যই কাজ করে যাচ্ছে এ সংগঠন।  দেশের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থে জাতীয় জীবনের সকল ক্ষেত্রে ইসলামী মূল্যবোধের আলোকে জাতীয় ঐক্য প্রচেষ্টাই আমাদের লক্ষ্য। জাতীয় স্বার্থ অক্ষুন্ন রাখতে জামায়াতে ইসলামী সবসময় আঞ্চলিক আধিপত্যবাদ, সা¤্রাজ্যবাদ ও সম্প্রসারণবাদী শক্তির নীতির বিরুদ্ধে আপসহীন ভূমিকা অব্যাহত রেখেছে। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের নানা ব্যর্থতা, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিরোধী ষড়যন্ত্র, সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি-এক কথায় দুঃশাসনের প্রতিবাদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ দেশের গণমানুষের অত্যন্ত জনপ্রিয় দল হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছে। দেশের রাজনীতি এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলন, বিভিন্ন জনকল্যাণ ও সমাজকল্যাণমূলক কাজের মাধ্যমে জামায়াতের এই জনপ্রিয়তা আর নেতৃত্বেও এই ক্লিন ইমেজ-ই যেন প্রতিপক্ষের সবচেয়ে বড় চক্ষুশূলের কারণ।
তা ছাড়া বিগত চারদলীয় জোটের সময় জামায়াতের দুই শীর্ষ নেতা ৩টি মন্ত্রণালয় পরিচালনার ক্ষেত্রে যে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন প্রতিপক্ষের জন্য তা ঈর্ষনীয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যারা আজীবন সন্ত্রাস, দুর্নীতি, অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, যারা দেশের প্রতিটি নাগরিককে সততা, দেশপ্রেম ও মানবতার কল্যাণে কাজ করার চেতনায় উদ্বুদ্ধ করেছেন, তাদেরকে আজ মানবতাবিরোধী আখ্যা দেয়া ইতিহাসের জঘন্য মিথ্যাচার নয় কি? যে দলটি দীর্ঘ ৪২ বছর আপনাদের পাশে থেকে দেশের মানুষের ঈমান আকিদা সংরক্ষণ, স্বাধীনতা সর্বভৌত্বের পক্ষে মজবুত প্রাচীর গড়ে তুলেছে, গভীর দেশপ্রেম নিয়ে জনগণের ভাগ্যের উন্নয়নে, সততা, আন্তরিকতা সহকারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। যেখানে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে ঐতিহাসিক অবদানের জন্য যাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে ভূষিত করার কথা, সেখানে শুধু ইসলামী আন্দোলন করার অপরাধে আওয়ামী লীগ আজ রাষ্ট্রের সকল শক্তি নিয়োগ করে তাদের ওপর পরিচালনা করছে ইতিহাসের বর্বর ও জঘন্যতম নির্যাতন, যা কোনো সভ্য সমাজে কল্পনা করা যায় না। আজ এমন একটি আদর্শিক দলকে বাংলাদেশের মানচিত্র থেকে নিশ্চিহ্ন করার ঘৃণ্য ষড়যন্ত্রের পথ বেছে নিয়েছে বর্তমান আওয়ামী সরকার। জামায়াতে ইসলামীর বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর ওপর আওয়ামী লীগ ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয়ভাবে আজ নির্যাতন নিপীড়ন চালাচ্ছে। সারাদেশে গণগ্রেফতার এখনো চলছে। সারাদেশে পুলিশি হামলায় আহত হয়েছে কয়েক হাজার নেতাকর্মী। নিখোঁজ রয়েছে ৮ নেতাকর্মী। পুলিশ-ছাত্রলীগের হামলায় গুরুতর আহত অনেকেই।
এ ছাড়া সরকারের ২০০৯ থেকে প্রথম ৪৬ মাসের শাসনামলে জামায়াত ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রায় ২৫ হাজার নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করা হয়েছে প্রায় তিন হাজারের মতো। আসামি সংখ্যা প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার। পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৬ শ’। ছাত্রীদের মাঝে ইসলামী আদর্শ প্রচারের সংগঠন ইসলামী ছাত্রীসংস্থা ও বোরকা পরা ছাত্রী মহিলাকর্মীদের গ্রেফতার করা হয় প্রায় ১০০ জন। এদেরকে রিমান্ডে নিয়ে চালানো হয় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এর থেকে রেহাই পায়নি বৃদ্ধ মহিলা ও অন্তঃসত্ত্বা নারীও। তাদের ৫৪ ধারায় গ্রেফতার করলেও জামিন না দিয়ে কারাগারে আবদ্ধ রাখা মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। এমনকি বইয়ের দোকানে বই কিনতে এসে এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও পুলিশের হয়রানি এবং গ্রেফতারের শিকার হয়েছেন পর্দানসিন ছাত্রীগণ। অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা  হয়েছে জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের শতাধিক কার্যালয়ে। এ সরকারের আমলে খুন হয় জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবিরের শত-শত নেতাকর্মী। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের দুইজন সম্ভাবনাময় নেতা আল-মুকাদ্দাস ও ওয়ালিউল্লাহসহ অনেককে গুম করা হয়। আজ পর্যন্ত তাদের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। জুলুম-নির্যাতন চালিয়ে অনেককে চিরদিনের জন্য পঙ্গু করে দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আজ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের শিকার। গত নির্বাচনে জামায়াত কম আসন পেলেও মাত্র কয়েকটি আসনে নির্বাচন করে জামায়াত ভোট পেয়েছে প্রায় ৫৪ লাখ। এর আগের নির্বাচন থেকে এ নির্বাচনে প্রায় ৯ লাখ ২০ হাজার ভোট বেশি পেয়েছে। যেখানে নির্বাচন করেনি সেখানে জামায়াতের প্রায় ১৩ লাখ ভোট রয়েছে। জেলে নিয়ে হত্যা করে আহত করে এই সংখ্যাকে  মিটিয়ে দেয়ার হীন ষড়যন্ত্র কার্যকর হবে না। মজলুমের বিজয় অবশ্যই হবে ইনশাআল্লাহ।

যুদ্ধাপরাধ ইস্যু এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শ গণতান্ত্রিক দল। দেশগঠনে এ দলটি যথার্থ ভূমিকা রেখে যাচ্ছে। গত চারদলীয় জোট সরকারের আমলে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রণালয়গুলো অত্যন্ত দক্ষতা ও সততার সাথে পরিচালনা করে যথেষ্ট সুনাম কুড়িয়েছিলেন সংগঠটির আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। কিন্তু বর্তমান সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণ, দুর্নীতি, লুটপাট, ইসলাম ও দেশ বিরোধী কর্মকান্ডের কঠোর সমালোচনা ও প্রতিবাদ করায় সরকার জামায়াত ও জামায়াত নেতৃবৃন্দের আদর্শিক মোকাবেলায় ব্যর্থ হয়ে দমন-নিপীড়নের পথ বেছে নিয়েছে। তথাকথিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে জামায়াত নেতৃত্বকে সাজা দেয়ার আয়োজন প্রায় সম্পন্ন করেছে। এই বিচারের জন্য প্রণীত আইন ও বিধিমালা নিয়ে দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞগণ প্রশ্ন তুলেছেন। দেশ-বিদেশে যথেষ্ট সমালোচনার পরও সরকার জামায়াত নেতৃবৃন্দকে সাজা দেয়ার হীন উদ্দেশ্যে জনমতকে উপেক্ষা করে বিচারের নামে নাটক মঞ্চস্থ করে যাচ্ছে। অথচ বিগত চল্লিশ বছর ধরে এই নেতৃবৃন্দের কারো নামে মামলা তো দূরে থাক বাংলাদেশের কোন থানায় একটি জিডি পর্যন্ত ছিল না।

বাংলাদেশের স্থপতি স্বয়ং যুদ্ধাপরাধ ইস্যুর চূড়ান্ত মীমাংসা করে গেছেন
শেখ সাহেবের সরকার তদন্তের মাধ্যমে পাক সেনাবাহিনী ও সহযোগী বাহিনীর মধ্য থেকে ১৯৫ জন পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তাকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে তালিকাভুক্ত করেন। তাদের বিচার করার জন্য ১৯৭৩ সালের ১৯ জুলাই জাতীয় সংসদে পাস করে ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঈৎরসবং (ঞৎরনঁহধষ) অপঃ। পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে ৯ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের মধ্যে এক চুক্তির মাধ্যমে ঐ যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষমা করা হয়। শেখ সাহেব বাংলাদেশের কোনো বেসামরিক ব্যক্তিকে যুদ্ধাপরাধের তালিকায় শামিল করেননি। যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়নি, যারা মুক্তিযুদ্ধে বর্বরতা চালিয়েছিল এবং যারা সেনাবাহিনীর সহযোগী হয়েছিল তাদেরকে শেখ সাহেবের সরকার কলাবোরেটর আখ্যা দিয়েছিলেন।
উল্লেখ্য, পাকিস্তান সেনাবাাহিনীর সাথে সহযোগিতা করার উদ্দেশ্যে ১৯৭১ সালে সামরিক সরকার এক আদেশের মাধ্যমে জনগণ থেকে জেলা প্রশাসক ও সার্কেল অফিসারে মধ্যে যে রাজাকার, আলবদর, আলসামস নামে বিভিন্ন বাহিনী গঠন করে। এসব বাহিনীকেও শেখ সাহেবের সরকার কলাবোরেটর আখ্যা দেয়। কলাবোরেটদের বিচার করার উদ্দেশ্যে ১৯৭২ সালের ২৪ জুন “কলাবোরের্টস অর্ডার” নামে একটি আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল। এদের মধ্যে অভিযোগ আনা হয়েছিল ৩৭৪৭১ জনের বিরুদ্ধে, এই অভিযুক্তদের মধ্যে ৩৪৬২৩ জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যপ্রমাণের অভাবে কোনো মামলা দায়ের সম্ভব হয়নি। মাত্র ২৮৪৮ জনকে বিচারে সোপর্দ করা হয়। বিচারে ৭৫২ জনকে সাজা দেয়া হয়। এবং অবশিষ্ট ২০৯৬ জন বেকসুর খালাস পেয়ে যায়। পরবর্তীতে ১৯৭৩ সালে নভেম্বরে সরকার সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করার পর গ্রেফতারকৃত ও সাজাপ্রাপ্ত সকলেই মুক্তি পায়। অবশ্য যারা হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের মতো অপরাধী তাদেরকে ঐ আইনে বিচার করার সিদ্ধান্ত অব্যাহত রাখা হয়। কিন্তু এরপর দু’বছর পর্যন্ত কারো বিরুদ্ধে ঐ সব অভিযোগে মামলা দায়ের না হওয়ায় এ আইন বিলুপ্ত করা হয়। যাদের বিরুদ্ধে সে সময় অভিযোগ ওঠেনি, কোন মামলাতো দূরের কথা বাংলাদেশের কোন থানায় একটি জিডি পর্যন্ত কেউ দায়ের করেনি (অথচ তখন সাক্ষীপ্রমাণ তাজা পাওয়া যেত) সেই নিরপরাধীদেরকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় যুদ্ধাপরাধী সাজাবার জন্য ৪০ বছর পর এখন মিথ্যা মামলা  দিয়ে মিথ্যা সাক্ষী তৈরি করতে হচ্ছে?
গ্রেফতারকৃত জামায়াত নেতৃবৃন্দ এ দেশেই ছিলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচন করেছেন, কেউ কেউ এমপি, মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁরা যদি মানবতাবিরোধী কোনো অপরাধে অপরাধী হতেন তা হলে জনগণ তাদেরকে ভোট দিতেন না। তাই বিচারের নামে যে প্রহসন চলছে তা নিছক রাজনৈতিক নিপীড়নের উদ্দেশ্যেই করা হচ্ছে।
যেহেতু যুদ্ধাপরাধী বিচারের আইন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত তাই বিশ্বের বিভিন্ন যুদ্ধাপরাধ বিশেষজ্ঞ আইনবিদরা বাংলাদেশের এ আইনের ত্রুটি উল্লেখ করে সংশোধনী দিয়েছেন সরকার তা গ্রহণ না করে বলল এটা যুদ্ধাপরাধ বিচার নয়, মানবতাবিরোধী বিচার। অথচ মানবতাবিরোধী বিচারের জন্য আমাদের দেশে প্রচলিত আইনই যথেষ্ট। এ সরকারের আমলে নিজ দলের যেসব লোক দলীয় সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হয়েছে, বিরোধী দল, বিশ্বজিৎ, সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনিসহ যেসব নিরীহ সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, তাদের সাক্ষীসাবুদ এখনো তাজা, যদি মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করতেই হয় তাহলে এগুলোর বিচার আগে করা উচিত যা করছে না সরকার।
যুদ্ধাপরাধের বিচারের আড়ালে দীর্ঘ ৪২ বছরের ঐহিত্যবাহী দলটির শীর্ষ নেতাদের নানাভাবে চরিত্র হননের চেষ্টা করা হচ্ছে। লুটপাট, দখলদারিত্ব এবং সর্বোপরি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে দেশ বিকিয়ে দেয়ার আয়োজনকে বাধাহীন করতেই সরকার চাইছে ইসলামী ভাবাদর্শে গড়া দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরী জামায়াতে ইসলামীকে নিশ্চিহ্ন করতে। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের ওপর অত্যাচার হয়েছে, নির্যাতন হয়েছে, নিপীড়ন হয়েছে নানাভাবে, নানা কৌশলে। বারবার থামিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে। কিন্তু কোনো দলন নিপীড়নই ইসলামী আন্দোলনের পথচলা থামিয়ে দিতে পারেনি, পারবেও না ইনশাআল্লাহ। গুম, আর খুনের কালো কাপড়ে আজ বাংলার আকাশ ঢাকা। সন্তানহারা বাবা-মায়ের বিনিদ্র রজনীর চোখের পানি, আর কারাগারের চার দেয়ালে বন্দী মজলুমের ফরিয়াদ কখনো বৃথা যাবে না।

পৃথিবীতে হক ও বাতিলের সঙ্ঘাত অনিবার্য। সত্যপন্থীদের অবশ্য দীর্ঘকাল পরীক্ষার আগুনে ঝালাই হতে হবে। তাদের পরীক্ষা দিতে হবে নিজেদের সবর সহিষ্ণুতা, সততা, সত্যবাদিতা, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আত্মোৎসর্গিতা, ঈমানী দৃঢ়তার ওপর ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরশীলতা, বিপদ-মুসিবত, সমস্যা ও সঙ্কটের সুকঠিন পথ অতিক্রম করে তাদের মধ্যে এমন গুণাবলি সৃষ্টি করতে হবে যা কেবলমাত্র ঐ কঠিন বিপদসঙ্কুল গিরিপথেই লালিত হতে পারে। তাদেরকে শুরুতেই নির্ভেজাল উন্নত নৈতিক গুণাবলি ও সচ্চরিত্রের অস্ত্র ব্যবহার করে জাহেলিয়াতের ওপর বিজয় লাভ করতে হবে। এভাবে তারা নিজেদেরকে  সবরকারী বলে প্রমাণ করতে পারলেই মহান আল্লাহর সাহায্য যথাসময়ে এগিয়ে আসবে। সত্যপন্থীদের বিজয় সুনিশ্চিত, ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহ আমাদেরকে বাতিলের সকল ষড়যন্ত্রের পথ মাড়িয়ে তার সন্তুষ্টির পথে টিকে থাকার তাওফিক দান করুন। দুনিয়া ও আখেরাতে কামিয়াব করুন, আমিন।
(সমাপ্ত)

লেখক : ভারপ্রাপ্ত আমির, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

সহায়ক গ্রন্থ
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা:)-নঈম সিদ্দিকী।
সিরাতে ইবনে হিশাম, দ্বিতীয় খন্ড।
আসহাবে রাসূলের জীবনকথা

SHARE

Leave a Reply