ইসলামী আন্দোলনের পথে আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার উপযুক্ত হওয়াই আমাদের কাজ

মকবুল আহমাদ

csযুগে যুগে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে এ জমিনে তার প্রতিনিধিত্ব করেছেন নবী রাসূলগণ। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন খাতাম্মুন নাবীয়্যিন আর আমরা হচ্ছি তাঁর উম্মত। একদিকে যেমন মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত হিসেবে আমাদের রয়েছে অনেক মর্যাদা তেমনি নবী রাসূলগণ যে দায়িত্ব পালন করেছেন সে কঠিন দায়িত্ব আজ উম্মতে মুসলিমার ওপর অর্পিত। মুসলমানরা আজ তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য ভুলে যাওয়ার কারণে পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে অশান্তি, অনাচার, দুরাচার আর অরাজকতা। আর এই বিপর্যয় সৃষ্টি করছে কতিপয় মানুষ যার শীর্ষে রয়েছে শাসকগোষ্ঠী। তারা তাদের মনগড়া নিজস্ব মত, পথ, তত্ত্ব ও তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। তারা দুনিয়ায় মানবরচিত মতাদর্শ কায়েমের মাধ্যমে শাশ্বত বিধান আল-ইসলাম থেকে মানুষকে ফিরাতে চায়। কিন্তু যারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর উলুহিয়াত ও রাবুবিয়াতকে এই জমিনে কায়েম করতে প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালায় তাদের সাথে কায়েমি স্বার্থবাদীদের লড়াই অবধারিত। এই লড়াই যুগে-যুগে নবী-রাসূলদের সাথেও হয়েছে। জুলুম, নির্যাতন, অপপ্রচার, কারাবরণ, দেশান্তর এমনকি শাহাদাতের মতো ঘটনাও সংঘটিত হয়েছে তাদের জীবনে। এটাই ইতিহাসের বাস্তবতা। সুতরাং যারাই এই পথে চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, অপপ্রচার, কারাবরণ, দেশান্তর তথা শাহাদাতের মতো ঘটনা ঘটেছিল। এই সব কিছুর মধ্যে বিরোধীদের আসল লক্ষ্য হচ্ছে এই জমিন থেকে চিরতরে দ্বীনের মূলোৎপাটন করা। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী এই কাজে বাতিলরা কখনও সফল হয়নি হবেও না ইনশাআল্লাহ।
সীমাহীন জুলুম নিপীড়ন ও অত্যাচার সত্ত্বেও ঈমানদারগণ মহান আল্লাহপ্রদত্ত দায়িত্ব পালন করে যায় দ্বিধাহীন চিত্তে। কাক্সিক্ষত মনজিলে পৌঁছার অদম্য স্পৃহায় তারা এগিয়ে চলে। কোন বাধাই তাদের চলার পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে না।
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর জুলুম ও নির্যাতন : পৃথিবীতে এমন কোনো নবী রাসূল আসেননি যাদের ওপর জুলুম নির্যাতন চালানো হয়নি। প্রত্যেকেই এ জমিনে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বিরোধীদের বিভিন্ন রকম বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর  চালানো হয়েছিল অবর্ণনীয় জুলুম ও নির্যাতন। ব্যঙ্গ-বিদ্রƒপ, গালিগালাজ ও অপপ্রচারাভিযানের সাথে সাথে কোরাইশদের উন্মত্ত বিরোধিতা ক্রমশ গুন্ডামি, সন্ত্রাস ও সহিংসতার রূপ নিত। বিরোধীরা মূর্খ ও বখাটে লোকদের উসকিয়ে দিতো। তাঁকে কবি, জাদুকর, জ্যোতিষী ও পাগল বলে অপবাদ দিতো। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর দ্বীন প্রচার ও প্রসার করার কাজে অবিচল থাকলেন,  প্রকাশ্যভাবে দাওয়াত দিতে লাগলেন।
আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা) বলেন, “একদিন যখন কুরাইশ সরদারগণ হাজরে আসওয়াদের নিকট সমবেত হয়েছে, তখন আমি সেখানে উপস্থিত হলাম। তারা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালামের প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বললো, ‘এই লোকটার ব্যাপারে আমরা যতটা সহিষ্ণুতা দেখিয়েছি তা নজিরবিহীন। সে আমাদেরকে বোকা বানিয়েছে এবং আমাদের দেব-দেবীকে গালাগালি করেছে। অত্যন্ত নাজুক ও মারাত্মক ব্যাপারে আমরা তাকে সহ্য করেছি। এভাবে তাদের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকাকালে  রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসালাম সেখানে উপস্থিত হলেন। শান্ত পদক্ষেপে এগিয়ে গিয়ে তিনি কা’বা তাওয়াফ করতে লাগলেন। তাদের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় কেউ কেউ বিরূপ মন্তব্য করলো।
তাওয়াফ শেষে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখান থেকে চলে গেলেন। পরদিন আবার সবাই একই স্থানে সমবেত হলো, আমিও সেখানে ছিলাম। তখন তারা বলাবলি করতে লাগলো, ‘দেখ তো! মুহাম্মদ কতদূর বেড়েছে এবং সে কতদূর ধৃষ্টতা দেখালো। তোমরা যে কথা একেবারেই পছন্দ কর না তা সে তোমাদের মুখের ওপর স্পষ্ট বলে দিল। আর তোমরা তাকে ছেড়ে দিলে।’
একদিন একযোগে তাঁর ওপর সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লো। সবাই তাঁকে ঘেরাও করে বলতে থাকলো, ‘তুমিই তো আমাদের ধর্ম ও দেব-দেবীর বিরুদ্ধে আপত্তিকর কথা বলে থাকো।’’
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘হ্যাঁ, আমিই ঐসব কথা বলে থাকি।’ আমি দেখলাম তাদের মধ্যে এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর গলার ওপরের চাদরের দু’পাশ ধরে ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। সেই মূহূর্তে হজরত আবু বকর (রা) এগিয়ে গিয়ে বাধা দিলেন। তিনি কেঁদে ফেললেন এবং বললেন, ‘একটি লোক আল্লাহকে নিজের রব বলে ঘোষণা করেছে, এই কারণেই কি তোমরা তাঁকে হত্যা করে ফেলবে!’ এরপর জনতা সেখান থেকে চলে গেল। সেদিন আমি “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর কুরাইশদের যেরূপ মারাত্মক আক্রমণ দেখেছি, তেমন আর কখনও দেখিনি।”
শুধু তাই নয় তারা রাসূলুলাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেয়ার জন্য মহল্লার অধিবাসী বড়-বড় মোড়ল ও গোত্রপতি তাঁর পথে নিয়মিতভাবে কাঁটা বিছাতো, নামাজ পড়ার সময় ঠাট্টা ও হৈ-চৈ করতো, সিজদার সময় তাঁর পিঠের ওপর জবাই করা পশুর নাড়িভুঁড়ি নিক্ষেপ করতো, চাদর পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস দিত, মহল্লার বালক-বালিকাদেরকে হাতে তালি দেয়া ও হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ানোর জন্য লেলিয়ে দিত এবং কুরআন পড়ার সময় হইচই, কুরআনকে এবং আল্লাহকে গালি দিত।
এ অপকর্মে সবচেয় বেশি অগ্রগামী ছিল আবু লাহাব ও তার স্ত্রী। এ মহিলা এক নাগাড়ে কয়েক বছর পর্যন্ত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পথে ময়লা আবর্জনা ও কাঁটা ফেলতো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিদিন অতি কষ্টে পথ পরিষ্কার করতেন। এই হতভাগী তাঁকে এত উত্ত্যক্ত করেছিল যে, তাঁর সান্ত¡নার জন্য আল্লাহ-তায়ালা আলাদাভাবে সূরা লাহাব নাজিল করেন এবং তাতে ঐ দুর্বৃত্ত দম্পতির ঠিকানা যে দোজখে, তা জানিয়ে দেন।

রাসূল (সা)-এর কারাবরণ
আজকের মুসলমানদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কারাবরণের এই সুন্নাত কতই না গৌরবের যাদেরকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করেছেন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানবের আন্দোলনের সফলতা তাদেরকে বেপরোয়া ও দিশেহারা করে ফেলেছে। ফলে বয়কট ও আটকাবস্থা সত্ত্বেও ইসলামের শত্রুরা তাদের সকল ফন্দি-ফিকিরের ব্যর্থতা, ইসলামের অগ্রগতির ও বড় বড় প্রভাবশালী ব্যক্তির ইসলাম গ্রহণের দৃশ্য দেখে দিশাহরা হয়ে ওঠে।’
‘নবুওয়তের সপ্তম বছরের মহররম মাসে মক্কার সব গোত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বনু হাশেম গোত্রকে বয়কট করার চুক্তি সম্পাদন করলো। চুক্তিতে স্থির করা হলো যে, বনু হাশেম যতক্ষণ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের হাতে সমর্পণ না করবে এবং তাকে হত্যা করার অধিকার না দেবে, ততক্ষণ কেউ তাদের সাথে কোনো আত্মীয়তা রাখবে না, বিয়ে শাদির সম্পর্ক পাতাবে না, লেনদেন ও মেলামেশা করবে না এবং কোনো খাদ্য ও পানীয় দ্রব্য তাদের কাছে পৌঁছাতে দেবে না। গোত্রীয় ব্যবস্থায় এ সিদ্ধান্তটা ছিল অত্যন্ত মারাত্মক এবং চূড়ান্ত পদক্ষেপ। সমগ্র বনু হাশেম গোত্র অসহায় অবস্থায় ‘শিয়াবে আবু তালেব’ নামক উপত্যকায় আটক হয়ে গেল। এই আটকাবস্থার মেয়াদ প্রায় তিন বছর দীর্ঘ হয়। এই সময় তাদের যে দুর্দশার মধ্য দিয়ে কাটে তার বিবরণ পড়লে পাষাণও গলে যায়। বনু হাশেমের লোকেরা গাছের পাতা পর্যন্ত চিবিয়ে এবং শুকনো চামড়া সিদ্ধ করে ও আগুনে ভেজে খেতে থাকে। অবস্থা এত দূর গড়ায় যে, বনু হাশেম গোত্রের নিষ্পাপ শিশু যখন ক্ষুধার যন্ত্রণায় কাঁদতো, তখন বহু দূর পর্যন্ত তার মর্মভেদী শব্দ শোনা যেত। কোরাইশরা এসব কান্নার শব্দ শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়ে যেত।

তায়েফে ইসলামের দাওয়াত ও নির্যাতন
বিশ্বমানবতার পরম বন্ধু মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথে তায়েফবাসী পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট আচরণ করেছিল। তারা তাদের শহরের সবচেয়ে নিকৃষ্ট বখাটে তরুণদেরকে, চাকর নকর ও গোলামদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পেছনে লেলিয়ে দিল এবং বলে দিল যে, যাও, এই লোকটাকে লোকালয় থেকে তাড়িয়ে দিয়ে এসো।’ বখাটে যুবকদের এক বিরাট দল আগে-পিছে গালি দিতে দিতে, হইচই করতে করতে ও পাথর ছুড়ে মারতে মারতে চলতে লাগলো। তারা তাঁর হাঁটু লক্ষ্য করে পাথর মারতে লাগলো, যাতে তিনি বেশি ব্যথা পান। পাথরের আঘাতে আঘাতে এক একবার তিনি অচল হয়ে বসে পড়ছিলেন। কিন্তু তায়েফের গুন্ডারা তার বাহু টেনে ধরে দাঁড় করাচ্ছিল এবং পুনরায় হাঁটুতে পাথর মেরে হাতে তালি দিয়ে অট্টহাসিতে ফেটে পড়ছিল। ক্ষতস্থানগুলো থেকে অঝোর ধারায় রক্ত ঝরছিল। এভাবে জুতোর ভেতর ও বাইরে রক্তে রঞ্জিত হয়ে গেল।
নির্যাতনের চোটে অবসন্ন ও সংজ্ঞাহীন হয়ে যাওয়ার পর যিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘাড়ে করে শহরের বাইরে নিয়ে এসেছিলেন, সেই যায়েদ বিন হারেসা ব্যথিত হৃদয়ে বললেন, আপনি এদের বিরুদ্ধে আল্লাহর কাছে বদদোয়া করুন।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, “আমি ওদের বিরুদ্ধে কেন বদদোয়া করবো? ওরা যদি আল্লাহর ওপর ঈমান নাও আনে, তবে আশা করা যায়, তাদের পরবর্তী বংশধর অবশ্যই একমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে।”
এই সফরকালেই জিবরাইল (আ) এসে বলেন, পাহাড়সমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতারা আপনার কাছে উপস্থিত। আপনি ইঙ্গিত করলেই তারা ঐ পাহাড় দুটোকে এক সাথে যুক্ত করে দেবে, যার মাঝখানে মক্কা ও তায়েফ অবস্থিত। এতে উভয় শহর পিষ্ট ও ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু মানবতার বন্ধু মহান নবী (সা) এতে সম্মত হননি।
এহেন নৈরাশ্যজনক পরিস্থিতিতেই জিনেরা এসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কুরআন তেলাওয়াত শোনে এবং তাঁর সামনে ঈমান আনে। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জানিয়ে দিলেন যে, দুনিয়ার সকল মানুষও যদি ইসলামের দাওয়াতকে প্রত্যাখ্যান করে, তবে আমার সৃষ্ট জগতে এমন বহু জীব আছে, যারা আপনার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে নোংরা অপপ্রচার
সকল যুগেই সত্যের পথিকদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কিন্তু কোনো রকম অত্যাচার চালিয়ে বাতিলেরা সফল হতে পারেনি। ইসলামী আন্দোলনের আদর্শ ও উদ্দেশ্যকে যখন কোনো দিক দিয়েই হামলা করে ক্ষতিগ্রস্ত করার সুযোগ পাওয়া যায় না, তখন শয়তান তাকে পিঠের দিক দিয়ে আঘাত করার প্ররোচনা দেয়। আর শয়তানের দৃষ্টিতে পিঠের দিক দিয়ে আঘাত করার সর্বোত্তম পন্থা হলো, এর নেতার ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্বের ওপর কলঙ্ক লেপন করা। এ জন্যই এক পর্যায়ে ক্ষমতার মোহ এবং স্বার্থপরতার জঘন্য অপবাদ আরোপ করা হয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিরুদ্ধে। এরপর অপপ্রচারণার এই ধারা আরো সামনে অগ্রসর হয় এবং ইসলামী আন্দোলনের সর্বোচ্চ নেতার পরিবারকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। আর এই পরিবারের কেন্দ্রের ওপর আঘাত হানাই ছিল ঐ অবকাঠামোকে ধ্বংস করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। শেষ পর্যন্ত নাশকতাবাদী শক্তি এই শেষ আঘাতটা হানতেও দ্বিধা করলো না। এই বৈরী আঘাতের মর্মন্তুদ কাহিনী কুরআন, হাদিস, ইতিহাস ও সিরাতের গ্রন্থাবলিতে ‘ইফকের ঘটনা’ তথা ‘হজরত আয়েশার (রা) বিরুদ্ধে অপবাদের কাহিনী’ নামে শিক্ষা গ্রহণের জন্য সংরক্ষিত রয়েছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যার ষড়যন্ত্র
কোনো ষড়যন্ত্রেই যখন এই আন্দোলনকে স্তব্ধ করতে পারেনি তখন তারা ইসলামী আন্দোলনের নেতাকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। এ ধরনের কুচক্রী শত্রুরা যদি ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের গদিতে আসীন হয়, তাহলে তারা প্রতিপক্ষের ওপর রাজনৈতিক নির্যাতন চালায় এবং আইনের তরবারি চালিয়ে বিচারের নাটক মঞ্চস্থ করে মানবতার সেবকদের হত্যা করে। আর ক্ষমতা থেকে যারা বঞ্চিত থাকে, তারা সরাসরি হত্যার ষড়যন্ত্রমূলক পথই বেছে নেয়। মক্কার জাহেলি নেতৃত্ব এই শেষোক্ত পথই বেছে নিলো।
হিজরি চতুর্থ সালের কথা। আমর বিন উমাইয়া যামরি আমের গোত্রের দুই ব্যক্তিকে হত্যা করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হত্যাকান্ডের দিয়ত আদায় করা ও শান্তি চুক্তির দায়দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে দেয়ার জন্য বনু নাযির গোত্রের লোকদের কাছে গেলেন। সেখানকার লোকেরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে একটা দেয়ালের ছায়ার নিচে বসালো। তারপর গোপনে সলাপরামর্শ করতে লাগলো যে, একজন উপরে গিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাথার ওপর বিরাটকায় পাথর ফেলে দিয়ে হত্যা করবে। আমর বিন জাহ্হাশ বিন কাব এই দায়িত্বটা নিজের কাঁধে নিয়ে নিলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দুরভিসন্ধি টের পেয়ে আগে ভাগেই উঠে চলে এলেন।

যুগে যুগে জুলুম-নির্যাতন ও শাহাদাত
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে ইসলামী আন্দোলনের পুরো ইমারতের ভিত্তি রচিত হয়েছে সাহাবীদের শাহাদাতের খুন জুলুম নির্যাতন এর উপর ভিত্তি করে। রাসূলে কারিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবাগণ নানা ধরনের জুলুম নির্যাতনের সম্মুখীন হন। হজরত বেলাল (রা)-এর ওপর কী অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল! প্রচন্ড গরম বালুর ওপর শুইয়ে দিয়ে বুকে পাথর চাপা দেয়া হয়েছিল। তবুও তিনি আহাদ আহাদ বন্ধ করেননি। হজরত আবুযার (রা)কে ঈমান আনার কারণেই রক্তাক্ত হতে হয়েছে। হজরত আমের বিন ফাহিরার শরীর কাঁটা দিয়ে বিদ্ধ করা হয়েছে। এ ধরনের নির্যাতনে তার দৃষ্টিশক্তি লোপ পায়। আল্লাহর কুদরতে পরে আবার দৃষ্টি ফিরে পান। হজরত খাব্বাব (রা) কে জ্বলন্ত অঙ্গারে শুইয়ে রাখা হতো। ফলে তার গায়ের চর্বিতে আগুন নিভে যেত। হজরত আমের (রা)কে পানিতে ডুবিয়ে নির্যাতন করা হয়। তাঁর মা হজরত সুমাইয়ার লজ্জাস্থানে বর্শা নিক্ষেপ করে শহীদ করা হয়। তার পিতা হজরত ইয়াসির ও ভাই আবদুল্লাহ নির্যাতনের শিকার হয়ে শাহাদাত বরণ করেন। হজরত যায়েদ বিন দাসানাকে বলা হয়, তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শূলে চড়ালে তুমি কি সহ্য করবে? তিনি জবাব দেন, তাঁকে শূলে চড়ানো তো দূরের কথা তার পায়ে সামান্য কাঁটার আঘাত ও সহ্য করব না। এ কথা শোনার পর তার ওপর অবর্ণনীয় নির্যাতন করা হয়। ফলে তিনি শহীদ হয়ে যান। যুদ্ধে শহীদ হবার পর হামজার (রা) কলিজা চিবিয়ে খাওয়া হয়েছে। এভাবে অসংখ্য সাহাবীকে অবর্ণনীয় নির্যাতন সহ্য করে দ্বীনের পথে চলতে হয়েছে। যারা ইসলাম গ্রহণ করে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুসরণ করছিলো তাদের ওপর মুশরিকরা ভীষণ অত্যাচার চালাতে লাগলো। প্রত্যেক গোত্র মুসলমানদের ওপর সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লো। কিন্তু তাদেরকে সত্যের পথ থেকে এক বিন্দুও টলাতে পারেনি। সাহাবায়ে কিরামের ওপর যে জুলুম নির্যাতন হয়েছে এতে তাদের মর্যাদা আল্লাহর দরবারে বহু গুণে বৃদ্ধি পেয়েছে। তাদের মর্যাদার সেই চিত্রটি আল্লাহ তায়ালা এভাবে বর্ণনা করেছেন ঃ
‘‘আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না। এ ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত।’’ (সূরা বাকারাহ : ১৫৪)
কুরআনে বর্ণিত আছে “এটা হচ্ছে তোমাদের করণীয় কাজ। আল্লাহ চাইলে নিজেই তাদের সাথে বুঝাপড়া করতেন। কিন্তু (তিনি এ পন্থা গ্রহণ করেছেন এ জন্য) যাতে তোমাদেরকে পরস্পরের দ্বারা পরীক্ষা করেন। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হবে আল্লাহ কখনো তাদের আমলসমূহ ধ্বংস করবেন না। তিনি তাদের পথপ্রদর্শন করবেন। তাদের অবস্থা শুধরে দেবেন এবং তাদেরকে সেই জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার পরিচয় তিনি তাদেরকে আগেই অবহিত করেছেন।” (সূরা মুহাম্মদ : ৪-৬)
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, “জবাবে তাদের রব বলেন, আমি তোমাদের কারো কর্মকান্ড নষ্ট করবো না। পুরুষ হও বা নারী, তোমরা সবাই একই জাতির অন্তর্ভুক্ত। কাজেই যারা আমার জন্য নিজেদের স্বদেশ ভূমি ত্যাগ করেছে এবং আমার পথে যাদেরকে নিজেদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়া ও কষ্ট দেয়া হয়েছে এবং যারা আমার জন্য লড়েছে ও মারা গেছে, তাদের সমস্ত গোনাহ আমি মাফ করে দেবো এবং তাদেরকে এমন সব বাগানে প্রবেশ করাবো যার নিচে দিয়ে ঝরনাধারা বয়ে চলবে। এসব হচ্ছে আল্লাহর কাছে তাদের প্রতিদান এবং সবচেয়ে ভালো প্রতিদান আল্লাহর কাছেই আছে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯৫)
এই জুলুম নির্যাতনের কারণ অন্য কিছুই ছিল না, আল্লাহ বলেন, ‘ওই ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার এ ছাড়া আর কোনো কারণ ছিল না যে, তারা সেই আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিল যিনি মহাপরাক্রমশালী এবং নিজের সত্তায় নিজেই প্রশংসিত, তিনি আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী। আর আল্লাহ সবকিছু দেখছেন।” (সূরা আল বুরুজ : ৮-৯)
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ পাক বলেন, “যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে তারাই তাদের রবের কাছে সিদ্দীক ও শহীদ বলে গণ্য। তাদের জন্য রয়েছে পুরস্কার ও নূর। আর যারা কুফুরি করেছে এবং আমার আয়াতকে অস্বীকার করেছে তারাই দোজখের বাসিন্দা।” (সূরা আল হাদিদ : ১৯)
হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, জিহাদ সম্পর্কিত একটি দীর্ঘ হাদিসের শেষাংশে প্রিয় নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “সেই আল্লাহর শপথ যাঁর হাতে আমার জীবন, আমার মন তো চায় আল্লাহর পথে আমি শহীদ হই, আবার জীবিত হই, আবার শহীদ হই, আবার জীবিত হই এবং আবার শহীদ হই।” (সহিহুল বুখারী ও মুসলিম)
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) থেকে বর্ণিত আছে, ‘রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমাদের মহান আল্লাহ সে ব্যক্তির ওপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট, যে আল্লাহর রাহে জিহাদ করে এবং তাঁর সঙ্গী-সাথীরা পরাজয় বরণ করলেও নিজ দায়িত্ব উপলব্ধি করে ফিরে দাঁড়ায় এবং আমৃত্যু লড়াই করে। তখন আল্লাহ ফেরেশতাদের উদ্দেশ্যে বলেন, “তোমরা আমার এ বান্দার দিকে লক্ষ্য কর, আমার পুরস্কারের আশায় এবং শাস্তির ভয়ে সে পুনরায় জিহাদে লিপ্ত হয়েছে শেষ পর্যন্ত নিজের জান দিয়েছে। তোমরা সাক্ষী থাক, আমি তাকে মাফ করে দিলাম।” (আবু দাউদ)
হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘একজন সাহাবী কোনো এক স্থান অতিক্রম করছিলেন, সেখানে একটি নহর ছিল। তিনি নহরটি পছন্দ করলেন এবং মনে মনে চিন্তা করলেন, এ জায়গায় একাকী বসে ইবাদাত করলে কতই না ভালো হতো। তিনি তাঁর ইচ্ছা নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে ব্যক্ত করলেন। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তা করবে না। তোমাদের পক্ষে ঘরে বসে ৭০ (সত্তর) বছর নামাজে কাটানোর চেয়ে আল্লাহর পথে বের হওয়া অধিক উত্তম। তোমরা কি চাও না যে, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করে দিন এবং বেহেশতে স্থান দান করুন। আল্লাহর পথে জিহাদ করÑ যে ব্যক্তি কিছুক্ষণ সময়ের জন্য আল্লাহর পথে যুদ্ধ করেছে, তার জন্য জান্নাত অবধারিত। (তিরমিযি)
হজরত উম্মে হারেসা বিনতে সারাকা থেকে বর্ণিত, ‘তিনি হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে এসে আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ, আপনি কি হারেসা সম্পর্কে কিছু বলবেন না? জঙ্গে বদরের পূর্বে একটি অজ্ঞাত তীর এসে তাঁর শরীরে বিঁধে যায় এবং তিনি শহীদ হন। যদি তিনি জান্নাতবাসী হয়ে থাকেন তাহলে আমি সবর করবো, অন্যথায় প্রাণ ভরে কাঁদব। হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, হারেসার মা, বেহেশতে তো অনেক বেহেশতবাসীই রয়েছেন তোমার ছেলে তো সেরা ফেরদাউসে রয়েছেন।’ (সহিহুল বুখারী)
চিন্তা করে দেখুন জান্নাতের চিন্তা কিভাবে তাঁদেরকে প্রাণপ্রিয় পুত্রের শোক পর্যন্ত ভুলিয়ে দেয়।
হজরত মিকদাদ বিন মাদকারব থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহর নিকট শহীদের ছয়টি বৈশিষ্ট্য। প্রথম আক্রমণেই তাকে ক্ষমা করে দেয়া হয়, দুনিয়ায় থাকাকালীন অবস্থাতেই তাকে বেহেশতের ঠিকানা জানিয়ে দেয়া হয়, কবর আজাব থেকে তার নাজাত হয়, কিয়ামতের ভয়াবহ আতঙ্ক থেকে সে নিরাপদ থাকবে, তাকে ইয়াকুত খচিত একটি সম্মানিত টুপি পরিধান করানো হবে, যা সারা দুনিয়া এবং দুনিয়ার মধ্যে যা কিছু রয়েছে তার চেয়েও মূল্যবান হবে, মৃগ-নয়না হুরেরা তার স্ত্রী হবে এবং সে ৭০ (সত্তর) জন আত্মীয়ের জন্য শাফায়াত করবে।” (তিরমিযি, ইবনে মাজাহ)
হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর মেহমান তো কেবল তিনজন, গাজী, হাজী ও ওমরা সম্পাদনকারী।” (মুসলিম)
হজরত আবু দারদা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শহীদ তার বংশের সত্তর ব্যক্তির জন্য শাফায়াত করবে।’ (আবু দাউদ)
হজরত আবু হুরাইরা (রা) থেকে বর্ণিত, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, যে ব্যক্তি মরে গেল, অথচ সে জিহাদ করেনি বা তার মনে জিহাদের জন্য কোনো চিন্তা, সঙ্কল্প বা ইচ্ছাও দেখা যায়নি তবে সে মুনাফিকের ন্যায় মারা গেল।’ (মুসলিম ও আবু দাউদ)

সাহাবীদের ওপর জুলুম নির্যাতন

হজরত খুবাইব (রা)
হজরত খুবাইব (রা)-এর হস্তদ্বয় পিচমোড়া করে বেঁধে মক্কার নারী পুরুষরা তাকে ধাক্কা দিতে দিতে ফাঁসির মঞ্চের দিকে নিয়ে যায়। কাফেররা করতালি দিয়ে এ হত্যাকান্ডকে যেন উৎসবে পরিণত করে। কিন্তু তাদের নির্মম নির্যাতনে তিনি ব্যাকুল হননি। ফাঁসির মঞ্চে বসার আগে তিনি বললেন, ‘তোমরা আমাকে দু’রাকাআত নামাজ আদায় করার সুযোগ দাও অতঃপর হত্যা কর। তারা নামাজ আদায়ের সুযোগ দিল। খুবাইব (রা) খুব অল্প সময়ে নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর বললেন, আল্লাহর শপথ তোমরা যদি এ ধারণা না করতে যে, আমি মৃত্যুর ভয়ে নামাজ দীর্ঘ করছি তাহলে আমি আরও বেশি নামাজ আদায় করতাম। নামাজ আদায়ের পর জীবিত অবস্থায় তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো একের পর এক বিচ্ছিন্ন করতে থাকে আর বলে, তুমি কি চাও, তোমাকে ছেড়ে দিয়ে তোমার পরিবর্তে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করি? রাসূলপ্রেমিক খুবাইব এই করুণ অবস্থায় উত্তর দিলেন, আল্লাহর শপথ আমি মুক্তি পেয়ে আমার পরিবার পরিজনের নিকট ফিরে যাবো আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গায়ে কাঁটার আঁচড় লাগবে তা হতে পারে না। তারা চিৎকার করে বলে উঠল তাকে হত্যা কর তাকে হত্যা কর। সাথে সাথে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলন্ত খুবাইব (রা) এর ওপর হিংস্র হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল কাফিররা। তীর-বর্ষা আর খঞ্জরের আঘাতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। শাহাদাতের মুহূর্তে কালেমা শাহাদাত পড়ছিলেন আর বলছিলেন “হে আল্লাহ এদের শক্তি ও প্রতিপত্তি ধ্বংস কর এবং এদের কাউকে ক্ষমা করো না।”

হজরত খাব্বাব (রা)
প্রাথমিক স্তরের ইসলাম গ্রহণকারীদের তালিকায় হজরত খাব্বাব (রা) যেমন ৫-৬ জনের একজন, তেমনি ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায়ও তিনি ছিলেন অন্যতম। হৃদয়বিদারক অত্যাচার নির্যাতন হয়েছিল তাঁর ওপর। মরুভূমির প্রচন্ড রোদে লোহার কড়া পরিয়ে উত্তপ্ত বালুর ওপর শুইয়ে রাখা হতো আর উত্তাপে খাব্বাবের কোমরের গোশত পর্যন্ত গলে যেত।
হজরত খাব্বাব (রা) হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে মিলিত হয়েছে এ কথা শুনে তাঁর মনিব জনৈকা মহিলা লোহার শলাকা গরম করে খাব্বাবের (রা) মাথায় দাগ দিতে লাগল। এতেও খাব্বাবকে বিচলিত করা যাচ্ছে না বিধায় একদিন কোরাইশ দলপতিগণ মাটিতে প্রজ্বলিত অঙ্গার বিছিয়ে তার ওপর খাব্বাবকে (রা) চিৎ করে শায়িত করলো এবং কতিপয় পাষন্ড তার বুকে পা দিয়ে চেপে ধরলো। অঙ্গারগুলো তার পিঠের গোশত-চর্বি পুড়তে পুড়তে এক সময় নিভে যেত। তবুও নরাধমরা তাকে ছাড়ত না। এভাবে তার শরীরে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছিল। হজরত খাব্বাব (রা) তার এই নির্যাতনের চিহ্ন যাতে কেউ না দেখে সে জন্য চাদর গায়ে দিয়ে থাকতেন। একদিন হজরত ওমর (রা) তার শরীর দেখে বললেন, হে ভাই খাব্বাব তোমার শরীরে এমন বড় বড় গর্তগুলো কিসের? হজরত খাব্বাব (রা) বললেন, আমাকে আগুনের অঙ্গারে চেপে ধরে রাখা হতো, আর আমার শরীরের রক্ত এবং চর্বি গলে আগুন নিভে যেত।

হজরত মুসআব (রা) এর শাহাদাত
ওহুদের রণপ্রান্তরে ইসলামের শত্রুরা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে হত্যা করার লক্ষ্যে এগিয়ে এলো। হজরত মুসআব ইবনে ওমায়ের রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু বিপদের ভয়াবহতা উপলব্ধি করলেন। তিনি ছিলেন ওহুদ যুদ্ধে মুসলিম বাহিনীর পতাকাবাহক। তিনি ক্ষণিকের মধ্যেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেন, তাঁর দেহে প্রাণ থাকা পর্যন্ত তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেহে সামান্যতম আঘাত বরদাশত করবেন না। আল্লাহর নবীর দিকে কাফির বাহিনী শাণিত অস্ত্র হাতে ছুটে আসছে। হজরত মুসআব এক হাতে পতাকা আরেক হাতে তরবারি নিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নিজের পেছনে রেখে কাফিরদের আক্রমণ প্রতিহত করতে থাকলেন। কাফিরদের ভেতরে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্য তিনি তাদের সামনে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে মুখ দিয়ে ভীতিকর শব্দ সৃষ্টি করতে লাগলেন। এ ধরনের ভূমিকা গ্রহণ করার কারণ হলো কাফিরদের দৃষ্টি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর থেকে সরিয়ে তাঁর নিজের ওপরে নিয়ে আসা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন নিরাপদে থাকতে পারেন, এটাই ছিল তাঁর লক্ষ্য। এভাবে হজরত মুসআব (রা) ওহুদের প্রান্তরে মুসলিম বাহিনীর এক করুণ মুহূর্তে নিজের একটি মাত্র সত্তাকে একটি  বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন। তিনি কাফিরদের সামনে ঢালের মতোই ভূমিকা পালন করেছিলেন। শত্রুরা তাঁর দেহের ওপর দিয়েই আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আক্রমণ করছিল। শত্রুদের তীব্র আক্রমণের মুখে যখন মুসলিম সৈন্য বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়তো, তখন হজরত মুসআব একাই শত্রুর সামনে পাহাড়ের মতোই অটল হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আঘাতকারী ইবনে কামিয়াহ এগিয়ে এলো। হজরত মুসআব (রাদিয়াআল্লাহু তা’য়ালা আনহু) তাকে বাধা দিলেন। পাপিষ্ঠ কামিয়াহ তরবারি দিয়ে আঘাত করে হজরত মুসআবের ডান হাত বিচ্ছিন্ন করে দিল।
কাফিরদের তরবারির আরেকটি আঘাতে হজরত মুসআবের আরেকটি হাত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। তিনি তাঁর কাটা হাতের বাহু দিয়ে ইসলামের পতাকা জড়িয়ে ধরে উড্ডীয়মান রাখলেন। ইসলামের শত্রুরা এবার তাঁর ওপর বর্শার আঘাত হেনে তাঁকে পৃথিবী থেকে চিরদিনের জন্য বিদায় করে দিল। তিনি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করলেন।
দাফন-কাফনের সময় হজরত মুসআব (রাদিয়াল্লাহু তা’য়াআলা আনহুর) লাশ পাওয়া গেল। হাত দুটো তাঁর নেই। তিনি হাত দুটো দিয়ে মহাসত্যের পতাকা ধারণ করেছিলেন, এ অপরাধে শত্রুরা তাঁর হাত দুটো দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। তাঁর পবিত্র শরীরে রয়েছে জোড়াতালি দেয়া শত ছিন্ন জামা। সে জামাও রক্ত আর বালুতে বিবর্ণ। তবুও তাঁর গোটা মুখমন্ডল দিয়ে যেন জান্নাতের দ্যুতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হজরত মুসআবের (রা) এই অবস্থা দেখে চোখের পানি ধরে রাখতে পারলেন না।
সাহাবায়ে কেরাম এতক্ষণ নীরবে চোখের পানি ফেলছিলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের চোখে পানি ঝরতে দেখে সহাবায়ে কেরাম ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। তাঁকে কাফন দেয়ার মতো ছোট এক টুকরা কাপড় ছাড়া আর কিছুই পাওয়া গেল না। সে কাপড় দিয়ে পা ঢাকলে মাথা উন্মুক্ত থাকে, মাথা ঢাকলে পা উন্মুক্ত থাকে। পরে কাপড় দিয়ে মাথা ঢেকে ঘাস দিয়ে পা ঢেকে তাকে দাফন করা হয়। তিনি ছিলেন মক্কার ধনীর আদরের দুলাল। তাঁর কাফনের আজ এই করুণ অবস্থা। অথচ ইসলাম গ্রহণের পূর্বে তাঁর মতো জাঁকজমকপূর্ণ পোশাক আর সুগন্ধি কেউ ব্যবহার করতো না। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করার জন্য তিনি তরুণ বয়সেই পৃথিবীর সমস্ত বিলাসিতা আর ধন-সম্পদের পাহাড়কে পদাঘাত করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সাথী হয়েছিলেন। হজরত মুসআব (রাদিয়াল্লাহু তা’য়ালা আনহু) অত্যন্ত সুদর্শন ও বিশাল ধন-সম্পদের উত্তরাধিকারী ছিলেন। দৃষ্টি আকর্ষণকারী মূল্যবান পোশাক ব্যবহার করা ছিল তাঁর অভ্যাস। শরীরে তিনি এমন সুগন্ধি ব্যবহার করতেন যে, তাঁর বিচরণ ক্ষেত্র আকর্ষণীয় গন্ধে সুরভিত হয়ে উঠতো। ওহুদের যুদ্ধে তাঁর মা ছিলেন ইসলামের শত্রুদের দলে। ইসলাম গ্রহণের অপরাধে তাঁর মা তাঁকে বন্দী করে রাখতেন। অসহনীয় অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে তিনি আবিসিনিয়ায় হিজরত করেছিলেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামের প্রথম দূত হিসেবেই তাঁকে মক্কা থেকে মদিনায় প্রেরণ করেছিলেন। মদিনার ঘরে ঘরে ইসলামের আলো জ্বালিয়ে দেয়ার একক কৃতিত্ব যেন তাঁরই।

হজরত আবুযর (রা)
হজরত আবুযর (রা) ইসলাম কবুল করার পর চুপ করে বসে থাকার পরিবর্তে কাবা ঘরে গিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা দিলেন যে, আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো মাবুদ নাই, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর রাসূল। এ ঘোষণা দেয়ার পর কুরাইশরা হিংস্র পশুর মতো আবুযরের (রা) ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। সবাই তাকে চারিদিক থেকে নির্মমভাবে প্রহার করতে লাগল। আঘাতে আঘাতে তার দেহ ক্ষত-বিক্ষত হলো। রক্তে কাপড়-চোপড় ভিজে গেল। এভাবে শুধু একবার নয় বারবার নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিন্তু আবুযর (রা) আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সব কিছুই মেনে নিয়েছেন হাসি মুখে।
(চলবে)

লেখক : ভারপ্রাপ্ত আমির, বাংলাদেশ জমায়াতে ইসলামী

সহায়ক গ্রন্থ :
মানবতার বন্ধু মুহাম্মদ (সা)-নঈম সিদ্দিকী।
সিরাতে ইবনে হিশাম, ২য় খন্ড।
আসহাবে রাসূলের জীবন কথা।

SHARE

Leave a Reply