ইসলামী আন্দোলন দেশে দেশে

মতিউর রহমান আকন্দ

(গত সংখ্যার পর)

হারামের চত্বরে কাবামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে বাদশাহ খালেদ তার উদ্বোধনী ভাষণে ঘোষণা করেন, ‘‘পূর্ব নয়, পশ্চিম নয়, আমাদের আনুগত্য খালেসভাবে ইসলামের প্রতিই।” ইহরাম বাঁধা অবস্থায় পবিত্র মসজিদুল হারামের চত্বরে কাবামুখী হয়ে বসা ৩৭টি মুসলিম দেশের স্বাক্ষরিত এই ঘোষণাকে বলা হয় ‘মক্কা ঘোষণা’। মুসলিম উম্মাহর জন্য এটা একটা ঐতিহাসিক দলিল। কাবাকে সামনে রেখে কাবার মালিক আল্লাহ রাব্বুল আলামিনকে সাক্ষী রেখে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানগণ যে শপথ ও স্বীকৃতির কথা ঘোষণা করেছেন তা থেকে মুসলিম দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তির স্পষ্ট নির্দেশনা ফুটে ওঠে। সে ঘোষণার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের কোটি কোটি জনতা উদ্দীপ্ত হয়েছিল। মুসলমানদের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, চিন্তা-চেতনা, আবেগ ও অনুভূতির বহিঃপ্রকাশ ছিল সম্মেলনের এ ঘোষণায়।

যে কাবাকে কেন্দ্র করে  দুনিয়ায় এক সভ্যতার গোড়া পত্তন হয়েছিল, মক্কা বিজয়ের সময়ে বিশ্বনবী (সা) যে কাবা থেকে মূর্তি ও প্রতিমা উৎখাত করে সত্যের বিজয় ঘোষণা করেছিলেন, যে কাবার সাথে হযরত ইব্রাহিম ও ইসমাইল (আ)-এর স্মৃতিসম্পৃক্ত সে কাবা চত্বর থেকে মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানদের ঘোষণা সমগ্র মুসলিম বিশ্বকে নবতর চেতনায় উজ্জীবিত করেছিল। মুসলমানরা তাদের রাজনৈতিক গগন থেকে ঘোর অমানিশা দূর করে এক নতুন পৃথিবী গড়ার শক্তিতে উদ্ভাসিত হয়েছিল। সেই মক্কা ঘোষণার বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করলেই তার অন্তর্নিহিত শক্তি উপলব্ধি করা যাবে।

মক্কা ঘোষণার ভূমিকায় রাষ্ট্রপ্রধানগণ বলেন, ‘‘আমরা অরগানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের সদস্য রাষ্ট্রসমূহের রাষ্ট্রপ্রধান ও সরকার প্রধানগণ ১৪০১ হিজরির ১৯-২২ রবিউল আউয়াল, মোতাবেক ১৯৮১ সালের ২৫-২৮ জানুয়ারি পবিত্র মক্কা মোকাররমায় তৃতীয় ইসলামী সম্মেলনে মিলিত হয়েছি।

সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আমাদের লাখো সিজদাহ্। তিনি তাঁর অপার করুণায় আমাদেরকে বিশ্ব মুসলিমের কিবলায়, ওহির নাজিলগাহ পবিত্র কা’বার সান্নিধ্যে এই পবিত্র নগরীতে নতুন এক হিজরির সুবে সাদিকে সমবেত হওয়ার সুযোগ দিয়েছেন। আমরা এই সুযোগকে মুসলিম উম্মাহর ইতিহাসে এক অতিগুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং সার্বিক ইসলামী পুনর্জাগরণের এক শুভারম্ভ বলে মনে করছি। মানবসভ্যতা এবং বিশ্বসমাজে পুনরায় সেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী আসন লাভ, মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস এবং ইসলামের সংহতি শিক্ষার দৃষ্টিকোণ থেকে অতীতের স্মৃতিচারণ, বর্তমানের মূল্যায়ন ও উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রচনার জন্য আস্থার সাথে সামনে এগোবার ক্ষেত্রে এক অমূল্য সুযোগ এটা।”

এ ভূমিকার পর রাষ্ট্রপ্রধানগণ যে বিশ্বাসের ঘোষণ দেন তা নিম্নরূপ :

“এক পরিপূর্ণ জীবনবিধান হিসেবে ইসলাম, ইসলামী আদর্শ ও ইসলামী মূল্যবোধের প্রতি অনড় ও নিষ্ঠাপূর্ণ আনুগত্য এবং অনুসরণই বিরুদ্ধ শক্তির বিরুদ্ধে মুসলমানদের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টি। ইসলামের পথই একমাত্র পথ যে পথ শক্তি, সম্মান, সমৃদ্ধি ও সুন্দর ভবিষ্যতের দিকে আমাদের পরিচালিত করবে। ইসলামই শুধু মুসলিম উম্মাহকে বস্তুবাদের যন্ত্রণাদায়ক সয়লাব থেকে বাঁচিয়ে মুসলিম উম্মাহর স্বকীয়তাকে সমুন্নত এবং এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে। এবং ইসলামই মুসলিম জনতা ও তাদের নেতৃবৃন্দের জন্য এক অতুল শক্তির সঞ্জীবনী সুধা। শুধু এর দ্বারাই তারা পারে তাদের পবিত্র স্থানগুলো মুক্ত করাসহ এই বিশ্বে তাদের হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে এবং অন্যান্য জাতির পাশে যোগ্য আসনে দাঁড়িয়ে বিশ্ব মানবজীবনে সাম্য, শান্তি ও সমৃদ্ধি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখতে। আমরা মনে করি, মুসলিম উম্মাহর অন্তর্নিহিত গুণই হলো : এটা ঐক্য ও সংহতির দিশারি হবে। অগ্রগতি ও অগ্রযাত্রার পথনির্দেশ করবে এবং শক্তি ও সমৃদ্ধির নিয়ামক হয়ে দাঁড়াবে। আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সা)-এর সুন্নাহর মহামালিক হলো এই উম্মত। মানুষকে মঙ্গল ও মুক্তির পথে পরিচালিত করার জন্য পরিপূর্ণ জীবনবিধান এদের কাছে রয়েছে। আর এটাই আমাদের মহান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই ঐতিহ্যের শক্তিই আমাদের পরাধীনতার শিকল ভাঙায় সক্ষম করে এবং সাহায্য করে আমাদের অন্তর্নিহিত সর্বশক্তিকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করার লক্ষ্যে আমাদের আধ্যাত্মিক শক্তিকে সংহত করতে। মূলত আমাদের সত্যপথকামী জীবনের আসল ঠিকানা এটাই।

… আমাদের দৃঢ়বিশ্বাস বিভিন্ন বংশ-গোত্র নিয়ে গঠিত ভূমণ্ডলের বিশাল এলাকাজুড়ে পরিব্যাপ্ত সম্পদ-সামর্থ্যরে মালিক ১০০ কোটি মানুষের এই উম্মাহ যদি তার এ আধ্যাত্মিক শক্তিতে বলীয়ান হয়ে তার বস্তু ও জনসম্পদকে পুরোপুরি কাজে লাগায় তাহলে বিশ্বে তারা একটি বিশিষ্ট আসন লাভ করতে পারে এবং বিশ্বমানবতাকে একটা ভারসাম্যপূর্ণ জীবন উপহার দেবার জন্য তাদের নিজেদের সমৃদ্ধি অর্জনের পথকে তারা নিশ্চিত করে তুলতে পারে।

এই বিশ্বাসের ঘোষণা দান করার পর তাদের মক্কা ঘোষণার ১৪টি বিষয়ে নিজেদের অঙ্গীকার ঘোষণা করেন। তাঁদের প্রথম ঘোষণা ছিল মুসলমানদের জাতিসত্তা সম্পর্কে।

এই ঘোষণায় তারা যা বলেন তার একাংশ এই :

“ভাষা, বর্ণ, দেশ এবং এ ধরনের যাবতীয় পার্থক্য সত্ত্বেও বিশ্বের সব মুসলমান এক ও অখণ্ড জাতিসত্তার অন্তর্ভুক্ত, একই বিশ্বাসের বন্ধনে আবদ্ধ। একই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে উজ্জীবিত হয়ে তারা একই দিকে ধাবিত হচ্ছে এবং একটিমাত্র লক্ষ্যই তাদের সামনে। সব রকমের ভিন্ন শক্তি-জোট ও মতবাদ প্রত্যাখ্যান করে এবং অনৈক্যের ষড়যন্ত্র ও স্বার্থদ্বন্দ্বের কাছে আত্মসমর্পণ করতে অস্বীকার করে মুসলমানরা এক মহান জাতি হিসেবে বিশ্বে দণ্ডায়মান রয়েছে। সুতরাং আমাদের সংহতি জোরদার করে বিভেদ-বিরোধের অবসান ঘটানো এবং ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং আমাদের জন্য চিরন্তন সুবিচারের মাপকাঠি আল্লাহর কিতাব ও রাসূল (সা)-এর সুন্নতের প্রতি আমাদের বিশ্বাসের ওপর ভিত্তিশীল নীতি ও বিধানের মাধ্যমে আমাদের মধ্যকার যাবতীয় বিরোধ মিটিয়ে ফেলার লক্ষ্যে সামনে এগিয়ে যাবার জন্য আমরা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।”

জাতীয় নিরাপত্তা ও জনগণের অধিকার সম্পর্কিত নবম ঘোষণায় রাষ্ট্রপ্রধানগণ বলেন:

“আমাদের জনগণ তাদের বিশ্বাসের প্রতি অনুসরণ এবং সুবিচার, নৈতিকতা ও বিশ্বাসের প্রতি নিবেদিত সমাজগঠনের ঐতিহ্যের প্রতি তাদের আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তার কথা অনুধাবনের পর আমরা আমাদের জীবন ও সমাজগঠন এবং বিশ্বের মানুষ ও দেশসমূহের সাথে আমাদের সম্পর্ক উন্নয়নে আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সা)-এর সুন্নাত দ্বারা পরিচালিত হওয়ার আমাদের দৃঢ়সঙ্কল্পের নিশ্চয়তা দান করছি। আমরা এই বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ যে, সত্য ও মহত্ত্বের বিজয় এবং সুবিচার ও শান্তির এটাই সর্বোত্তম গ্যারান্টি।

আর ইসলামিক উম্মাহর সম্মান, সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তার এটাই নিশ্চিততম পথ।

আমরা আমাদের এ আকাক্সক্ষার ঘোষণা দিচ্ছি যে, জাতীয় জীবনে সুকৃতির প্রসার এবং মন্দের বিলুপ্তির লক্ষ্য অর্জনের জন্য আমরা মুসলমানদের মধ্যে শূরায়ি (পরামর্শ) সিস্টেমের অনুশীলন প্রতিষ্ঠা করে এবং জনজীবনের সকল ক্ষেত্রে এ নীতির প্রকাশ স্বাভাবিক করে তুলবো। এর ফলে সম্মিলিত ধারণার মধ্যে সংহতি দৃঢ়মূল হয়ে উঠবে এবং জনগণ অনৈক্য ও বিভেদ থেকে মুক্ত হয়ে তাদের নিজেদের কাজ পরিচালনায় কার্যকরভাবে অংশগ্রহণ করতে পারবে। অব্যাহত আলাপ-আলোচনা এবং মতবিনিময়ের সুযোগ দানের জন্য মুসলিম জনগণ এবং তাদের প্রতিষ্ঠানসমূহের মধ্যে সংযোগ সম্পর্ক উন্নয়নের যথাসাধ্য চেষ্টা আমরা করবো। হেদায়েতের দিশারি আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (সা)-এর সুন্নতের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত আমরা মানবাধিকার এবং মানবমর্যাদা সংরক্ষণ করার আমাদের দৃঢ়সঙ্কল্পের কথা ব্যক্ত করছি।”

শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে তাদের দশম ঘোষণায় ৩৭টি দেশের রাষ্ট্রপ্রধানগণ বলেন :

“শিক্ষা ও সংস্কৃতি ক্ষেত্রে আমাদের প্রয়াস-প্রচেষ্টাকে সমন্বিত করার জন্য আমরা আমাদের প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করছি; মুসলিম উম্মাহকে ঐক্যবদ্ধ করা, তাদের সংস্কৃতিকে সংহত করা, নৈতিক গুণের বিকাশ ঘটিয়ে নৈতিক অবক্ষয় রোধ করা, আমাদের যুবসমাজকে অজ্ঞানতা থেকে এবং তাদের অর্থনৈতিক অসুবিধার সুযোগ নিয়ে তাদের ধর্মচ্যুত করার ষড়যন্ত্র থেকে তাদের রক্ষা করার জন্য আমরা ধর্ম ও ঐতিহ্যের শক্তিকে কাজে লাগাবো। ইসলামের নীতি ও আদর্শকে এর গৌরব ও সংস্কৃতিকে ইসলামী সমাজে ও সমগ্র দুনিয়ায় প্রচার করা এবং ইসলামের বিরাট ঐতিহ্য, এর আধ্যাত্মিক শক্তি, নৈতিক মূল্যবোধ এবং অগ্রগতি, সুবিচার ও সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এর অমূল্য আবেদন তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার প্রতি গভীর আস্থা স্থাপন করে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য বৈষয়িক ও জনসম্পদের সংগ্রহ ও সরবরাহের ক্ষেত্রে আমরা পারস্পরিক সহযোগিতা দানে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হচ্ছি। আমাদের চলমান ইসলামী চিন্তার অঙ্গন থেকে যাবতীয় বিজাতীয় ও বিভেদমূলক চিন্তার উচ্ছেদ করার মাধ্যমে একে পবিত্র এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের চিন্তাধারার পুনর্বিন্যাসকরণের জন্য সবরকম চেষ্টা সাধনায়ও আমরা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করছি। আমরা আরও প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, ইসলামের শিক্ষা সামনে রেখে আমাদের সমাজ সংস্কারে কার্যকর ভূমিকা পালনে উপযুক্ত হিসেবে গোটা দুনিয়াকে আমাদের সঠিক রূপ দেখিয়ে দেয়া ও পশ্চিমা প্রচারমাধ্যমের বিভ্রান্তিকর প্রচারণা নস্যাৎ করার জন্য আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও যুক্তকর্মসূচির এক ও একক কাঠামোর অধীনে পক্ষপাতহীন, নীতিনিষ্ঠ ও সুবিচারমূলক গণমাধ্যম ও তথ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় আমরা সচেষ্ট হবো।”

উদ্ধৃতিগুলো গভীর মনোযোগের সাথে বিশ্লেষণ করলে সুস্পষ্টই প্রতীয়মান হয় ঐতিহাসিক মক্কা ঘোষণায় মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানগণ কাবা শরীফে বসে যে শপথ করেছিলেন তা মূলত ইসলমী জনতার অন্তরের প্রত্যাশার প্রতিধ্বনিই ছিল। ঐতিহাসিক মক্কা ঘোষণা বিশ্ব মুসলিম সমাজের হৃদয়ে আশার আলো সঞ্চার করেছিল – কিন্তু আজ ৩০ বছর পর সে স্মৃতি, সে আবেগ সেই ঘোষণার শব্দগুলো উচ্চারণ করে আমরা রোমাঞ্চিত হই কিন্তু তা যেন আমাদের এক কল্পনার অধ্যায়ে অন্তর্ভুক্ত কতিপয় শব্দসমষ্টি মাত্র। বিশ্ব মুসলিম ঐক্যের যে প্লাটফরম জেরুসালেমের মসজিদে হামলার পর গড়ে উঠেছিল আজ হয়তো তা তার গতি কিছুটা মন্থর কিন্তু এ প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব মুসলমানদের জন্য এক সম্ভাবনাময় শক্তি হিসেবে ভবিষ্যতে কাজ করবে। দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনের ক্রমবর্ধমান অগ্রগতির প্রেক্ষাপটে এ প্রতিষ্ঠান মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির প্লাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। সাম্রাজ্যবাদী ও আধিপত্যবাদী শক্তির ছোবল থেকে ইসলাম ও মুসলিম জাতিসত্তা রক্ষার প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।

(চলবে)

SHARE

Leave a Reply