ইসলামী আন্দোলন দেশে দেশে

বিগত কয়েক শ’ বছরের ধারাবাহিক পরিবর্তন, বিশেষ করে জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তির উৎকর্ষতার পাশাপাশি বর্তমান বিশ্বে আদর্শিক শক্তি হিসেবে ইসলামের অগ্রগতি বিশ্ব ইতিহাসে এক বাস্তব ঘটনা। গত শতাব্দীর সূচনালগ্নে সমাজতন্ত্রের উত্থান, লাখো মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে ইউরোপের কয়েকটি দেশে সমাজতন্ত্রের জয়জয়কার পরিস্থিতি, তুর্কী খেলাফতের পতন – মুসলমানদের জীবনে দুর্বিষহ পরিবেশ ডেকে আনে। সারা দুনিয়ায় মুসলমানরা এক অস্বস্তিকর পরিবেশে নিপতিত হয়। রাজনৈতিক আশ্রয় নেয়ার স্থানগুলো ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মুসলমানদের জীবনে পরিবর্তনের শুভ সূচনা হয়। এ সময় পাক-ভারত উপমহাদেশ ও আরব বিশ্বে ইসলামী আন্দোলনের দাওয়াতী তৎপরতা ব্যাপক রূপ লাভ করে। মুসলিম যুবসমাজ মুক্তির অন্বেষায় জেগে উঠতে থাকে। মুসলমানরা উপলব্ধি করতে থাকে, একমাত্র ইসলামী আদর্শই তাদের চিরবাঞ্ছিত মুক্তি নিশ্চিত করতে পারে। তাই উপমহাদেশের মুক্তিপাগল জনতা ‘জামায়াতে ইসলামী’র পতাকাতলে ও আরব বিশ্বের জনতা ‘ইখওয়ানুল মুসলিমিনের’ পতাকাতলে সংঘবদ্ধ হতে থাকে।
১৯৬৭ সালে ইসরাইল কর্তৃক ফিলিস্তিনে হামলা, মুসলমানদের প্রথম কেবলা বায়তুল মোকাদ্দাস দখলের ঘটনা মুসলমানদের চেতনাকে নিদারুণভাবে শানিত করে। মুসলমানরা বুঝতে সক্ষম হয় সংঘবদ্ধভাবে মোকাবেলা ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধানগণ মুসলমানদের কেবলা, নবী-রাসূলদের পদধূলিধন্য, ওহির নাজিলগাহ পবিত্র কাবা প্রাঙ্গণে সমবেত হয়ে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বায়তুল মোকাদ্দাস উদ্ধারে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে গড়ে ওঠে ‘ইসলামী সম্মেলন সংস্থা’। মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান ও বিশ্ব মুসলিম ঐক্য ঐশী আবেগ-অনুভূতিতে উজ্জীবিত হয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকে।
ইরানের ইসলামী বিপ্লব মুসলমানদের উৎসাহ- উদ্দীপনায় ব্যাপক গতি সঞ্চার করে। দিকে দিকে যুবসমাজ জেগে উঠতে থাকে। এর এক দশকের মধ্যে সমাজতন্ত্রের পতন ইসলামের আদর্শিক অগ্রযাত্রাকে আরো শানিত করে।
আলজেরিয়ায়  সালভেশন ফ্রন্টের বিজয়, তুরস্কে ইসলামপন্থীদের বিজয়, আফগানিস্তান থেকে রাশিয়ার পিছুটান মুসলমানদের রাজনৈতিক বিজয়কে উজ্জ্বল করে তুলে। সমাজতন্ত্রের পতনের মাধ্যমে একদিকে আদর্শ হিসেবে ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা মানুষের মনের মণিকাঠায় বৃদ্ধি পেতে থাকে, অপর দিকে ইসলাম সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিকট একমাত্র চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়।
আজকের পরাশক্তি স্পষ্টই উপলব্ধি করছে আদর্শিক শূন্যতার প্রেক্ষাপটে ইসলামই মানবজাতির মুক্তির একমাত্র আলোকবর্তিকা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। গত শতাব্দীর প্রথম দিকে অর্থাৎ ১৯২৮ সালে মিসরে ইখওয়ানুল মুসলিমিন এবং এর ১৩ বছর পর পাক- ভারত উপমহাদেশে ১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামীর আত্মপ্রকাশ দুনিয়ার ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক ঘটনা।
এ দুই সংগঠনের পতাকাতলে বিশ্বের প্রতিটি জনপদে লাখো জনতা সংঘবদ্ধ হতে থাকে। সেদিনের সে ক্ষুদ্র আলোর বিন্দু ধীরে ধীরে ব্যাপ্তি লাভ করে এখন বিশ্বের প্রতিটি জনপদে তার তাপ বিকিরণ শুরু করেছে।
ইহুদি ও ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি যারা একদিন মুখের ফুৎকারে ইসলামী আন্দোলনকে নিশ্চিহ্ন করে দেবে বলে ভেবেছিল তারাও আজ ইসলামী আন্দোলনের শক্তিকে সহজে নির্মূল করা সম্ভব নয় বলে বাস্তবে মেনে নিয়েছে।
নতুন সহস্রাব্দের সূচনালগ্নে বিশ্বমানবতা আজ বিশ্বের দিকে দিকে নানাবিধ সঙ্কটে নিমজ্জিত। এ সঙ্কট থেকে মানবজাতিকে  মুক্তি দিতে পারে একমাত্র ইসলাম। যুগ যুগ ধরে যেসব কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী মানবজাতিকে বঞ্চিত করে শাসন শোষণ করে যাচ্ছিল আজ তাদের প্রস্থানের সময় এসেছে।  এ প্রস্থান বিশেষ কোন একটি দেশের স্বৈরাচারী শাসকের জন্য প্রযোজ্য নয় – এটা সমগ্র বিশ্বের প্রতিটি দেশের স্বৈরশাসকের জন্য প্রযোজ্য। ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আজ অত্যন্ত সজাগ ও সতর্কতার সাথে সামনে অগ্রসর হতে হবে। কেননা তথ্যসন্ত্রাস ও মিডিয়ার সুবাদে মানবতাবিরোধী এসব শক্তি ধরাকে সরা জ্ঞান করে ও যাবতীয় দায়-দায়িত্ব ইসলামপন্থীদের ওপর চাপিয়ে গায়ের জোরে শাসন কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখার যে কূটকৌশল অবলম্বন করেছে অতি অল্প সময়ের মাঝেই তার পরিসমাপ্তি ঘটবে।
বিশ্বের যুবসমাজ আজ জেগে উঠেছে। মুক্তির অন্বেষায় তারা আজ নিজেদের বুকের রক্ত ঢেলে দিতে শিখেছে। তাদের খুনরাঙা পথ বেয়ে একদিন মানবজাতি মুক্তি লাভ করবে।  ইসলামের সুমহান আদর্শ বিশ্বের দিকে দিকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। ইসলামী আন্দোলনের সেই চলমান অগ্রযাত্রা আমরা দেখতে পাবো পৃথিবীর দেশে দেশে।

ইসলামী শক্তির বিকাশ
ইসলামী আদর্শবাদের যে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো একদিন ভেঙে পড়েছিল তা আবার জোড়া লাগছে। শুধু জনগণের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিবর্তন আসছে না। বরং একটি পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা হিসেবে এবং সরকারপদ্ধতি হিসেবেও এর বিকাশ ঘটছে। পাশ্চাত্য ধ্যান-ধারণা তথা সভ্যতা সংস্কৃতি যা একদিন মুসলিম বিশ্বকে গ্রাস করেছিল তার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে মুক্তিকামী তরুণ সমাজ। ইসলামকে ধর্ম হিসেবে প্রচার করে একদা যারা মসজিদ, মাদ্রাসা ও খানকায় ইসলামকে বন্দী করে রাখতে চেয়েছিল আজ তাদের সকল চক্রান্ত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হচ্ছে। ভ্রান্তির বেড়াজাল ছিন্ন করে ইসলামের আদর্শ মানুষের চিন্তাজগৎকে নাড়া দিতে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক চাকচিক্যময়তা ও সংস্কৃতির নামে নগ্নতা ও অশ্লীলতার মাধ্যমে যুবসমাজকে বিপথগামী করার যে চক্রান্ত করা হয়েছিল তার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে  যুবসমাজ ইসলামী আদর্শের ঝাণ্ডা হাতে নিয়ে অগ্রসর হওয়ার চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছে।
মুসলিম বিশ্বের জনশক্তি, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা, তাদের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক পরিবর্তন ইত্যাদি বিশ্লেষণ করলে ইসলামী আন্দোলনের অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির শক্তিশালী ভিত্তি প্রতীয়মান হয়।
বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের মোট জনসংখ্যা এখন দেড়শো কোটির উপরে। মুসলমানদের এ সংখ্যা ক্রমাগতভাবে বেড়েই চলছে। আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিশ্বের সর্বত্র প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে। বিশ্বের বিখ্যাত পত্রিকায় আজ এ কথা জোরেশোরে লেখা হচ্ছে,  “We will have to surrender in whole to Islam.” তেল  ও খনিজসম্পদ, কাঁচামাল এবং শিল্পোৎপাদনের উপকরণের জন্য বিশ্ববাসীকে মুসলিম বিশ্বের দ্বারস্থ হতে হয়। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গঠন আগামীদিনে ইসলাম বিজয়ের এক উজ্জ্বল ঘটনা।
মদিনায় প্রতিষ্ঠিত ইসলামী রাষ্ট্র একদিন মুসলমানদের সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ করেছিল, তা যতদিন টিকে ছিল ততদিন মুসলমানরা এক ও অখণ্ড ছিল।
১৯২৪ সালে উসমানীয় খিলাফতের বিলোপ সাধনের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত মুসলমানদের একটা ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম ছিল। কিন্তু উসমানীয় খিলাফতের অবসানের সাথে সাথে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম বলতে আর কিছুই অবশিষ্ট রইল না। ঐক্যের কোন সম্ভাবনাও যখন ফুটে উঠছিল না তখনই ঘটে গেল এক ঐতিহাসিক ঘটনা।     (চলবে)

লেখক : সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির

SHARE

Leave a Reply