ইসলামী কার্যক্রমে ব্যাপকতা জরুরি -আলী আহমাদ মাবরুর

একটি সংগঠন বা সংস্থা একটি সামগ্রিক ও পূর্ণাঙ্গ কাঠামো। অন্তত সেভাবেই আমরা সংগঠনকে দেখতে চাই। এখানে নানা পেশার ও নানা চিন্তাধারার লোকজন থাকে। নানা অবস্থান থেকে মানুষজন একটি সংগঠনের অধীনে থেকে কাজ করে। প্রত্যেকের অবস্থান থেকে মূল্যায়ন ও চিন্তাধারা ভিন্ন হবে- তা খুব স্বাভাবিক। সব মিলিয়েই একটা কাঠামো যদি পূর্ণতা পায় তাহলেই বরং তা অর্থবহ ও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
সেদিন একজন সিনিয়র নিউজ এডিটরের সাথে রাস্তায় হাঁটছিলাম। তার হাতে সদ্য প্রকাশিত পত্রিকা। আমি পত্রিকায় একটু চোখ বুলালাম। হেডলাইনটা ভালো লাগলো। প্রশংসা করলাম। তিনি বললেন, আমি প্রায় আধাঘণ্টা ভেবে এ হেডলাইনটা বের করেছি। আমি বললাম, ‘আপনার পরিশ্রম সার্থক। আসলেই সে রকম হেডলাইন হয়েছে। তিনি খুব খুশি হলেন।’
ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। আমার আপনার কাছে একটা পত্রিকার দাম ১০ টাকা। কিন্তু যিনি এ জগতের ভেতর যাননি, তিনি ধারণাও করতে পারবেন না, এ পত্রিকার প্রতিটি লাইনে ও শব্দে কতগুলো মানুষের শ্রম লুকোনো থাকে। একটি ৮/১২/১৬ পত্রিকার পাতা প্রতিদিন বের করতে হয়। এর পেছনের পরিশ্রমটা অনেকের জন্য কল্পনা করাও কঠিন।
আমি যখন টেলিভিশনের বার্তা বিভাগে কাজ করতাম, তখন আমার প্রধান বার্তা সম্পাদক (সিএনই) প্রায়ই বলতেন, “আমার কাছে একটি সংবাদ তৈরি করা, সিরিয়াল ঠিক করা, কোনো একটি সংবাদকে অগ্রাধিকার দেয়া বা নিউজে একটি লাইন ঢুকিয়ে দেয়া অথবা একটি লাইন বাদ দেয়া- রীতিমতো জিহাদ বলে মনে হয়। আমার মনে হয় আমি প্রতিদিন যেন যুদ্ধ করি।” আমি সাংবাদিকতা জগতের মানুষগুলোর এ স্পিরিটটাকে খুব সম্মান করি। এমনটাই হওয়া দরকার।
এখন ধরুন, মিডিয়াতে যে কাজ করে, তার কাছে যদি তার প্রিয় সংগঠনকে ঘিরে কিছু পরামর্শ দিতে বলা হয়, সে কী বলবে?
একজন অ্যাকাডেমিশিয়ানকে যদি তার জায়গা থেকে কিছু সুপারিশ দিতে বলা হয়, তাহলে তার চোখে হয়তো ভিন্ন ধরনের অসঙ্গতি চোখে পড়বে। তিনি হয়তো তার মতো করে কিছু সমাধান দেবেন।
একজন তৃণমূলের রাজনীতিবিদকে যদি কিছু বলতে দেয়া হয়, তাহলে তিনি হয়তো পথে প্রান্তরে চলতে গিয়ে প্রতিদিন যে প্রতিবন্ধকতা ফেস করছেন, যে গ্যাপগুলো তার চোখে পড়ছে- সেগুলোকে প্রায়োরিটি দিয়ে তিনি হয়তো পরিকল্পনা দিবেন।
যে আইনজীবী বিগত এক যুগ ধরে নিজ চোখে তার সংগঠনকে আইনি লড়াইয়ে কোণঠাসা হতে দেখছেন, তিনি হয়তো তার মতো করে পরামর্শ দেবেন।
যিনি আবার সিভিল সোসাইটি নিয়ে কাজ করেন, যার সাথে নানা পেশার মানুষের প্রতিদিন মতবিনিময় হয়, তিনি হয়তো তার মতো করে কিছু বলবেন।
যিনি সাংস্কৃতিক জগতে কাজ করেন, তিনি বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন থেকে নিজের দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার সুপারিশ দিয়ে এবং সুষ্ঠু ও সুন্দর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড প্রণয়নের ওপর গুরুত্ব দেবেন।
এটাই স্বাভাবিক। সব মিলিয়ে, সবাইকে নিয়েই সংগঠন। আপনি প্রশাসনের জায়গা থেকে দলকে যে সার্ভিস দিতে পারবেন, মাঠপর্যায়ে কাজ করে হয়তো তা পারবেন না। ডাক্তার হয়তো আরেকভাবে সার্ভিস দেবেন, বুদ্ধিজীবী হয়তো তার মতো করে। প্রত্যেকে তার জায়গাতেই সেবা করার অনেক স্কোপ পাবেন, যদি তিনি চান। আর তাতেই একটি সংগঠন গতিশীল হয়।
এটা খুবই ভালো লাগছে যে, সাম্প্রতিক কালে অনেকেই তাদের চিন্তাভাবনা শেয়ার করছে। নিজ নিজ জায়গা থেকে এ কথাগুলো আসা ভালো। তবে ভাষার ক্ষেত্রে একটু বিনয়ী হওয়া প্রয়োজন। উপরে যতগুলো পেশা বা সেক্টরের কথা বললাম, তার বাইরেও আরো বহু পেশা আছে। সবাই যদি তার মতো করে কিংবা ব্যক্তিগত উপলব্ধির জায়গা থেকে সংগঠনকে রিশাফল করে নতুনভাবে ঢেলে সাজানোর কথা বলে, তাহলে টানাটানিতে হয়তো দড়িই ছিঁড়ে যাবে। এ কারণে নিজেদের কাজের ধরন ও গণ্ডি অনুধাবন করে সুপারিশ করা প্রয়োজন। আমার চিন্তাকে অগ্রাধিকার দিয়ে সেই আলোকে গোটা সংগঠনকে সাজাতে হবে- এ ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি সঠিক নয়, কারণ তাতে অন্যের চিন্তাধারাকে অগ্রাহ্য করা হয়।
আমার মনে হয়, বিদ্যমান চিন্তাধারা ও কৌশলের সাথে আমাদের নিজেদের চিন্তাগুলোকে অ্যাকোমোডেট বা অন্তর্ভুক্ত করে নেয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়া উচিত। অ্যাকোমোডেশন ভালো শব্দ, কেননা তাতে সবার জন্য স্পেস থাকে। বেশ কিছু স্পর্শকাতর বিষয় আছে, যেগুলো আমাদেরকে বুঝতে হবে। যেমন: কাজের ধরন। অনেক ধরনের কাজ হতে পারে। কেউ হয়তো কর্মক্ষেত্রে নিজের পরিচয় আড়াল করে কাজ করছে। পরিচয় প্রকাশ্যে চলে এলেই তার কাজের উদ্দেশ্যটিই ব্যাহত হবে। তাই ধৈর্য ধরে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেই দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন।
আবার অনেক কাজ আছে, যেগুলো প্রচার করা যায় না। নীরবে নিভৃতে করে যেতে হয়। অনেক বছর পর হয়তো এসব কাজের ফলাফল পাওয়া যায়। এগুলো সবই বাস্তবতা। আগে থেকেই এ কাজের ধারাগুলোও ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক উত্থানের পর নানা ধরনের সঙ্কটের জন্ম হয়েছে। কিছু কাজকে একেবারেই দেদার লোকজনের সামনে প্রদর্শন করা যাচ্ছে। ফলে, সাধারণ মানুষ বিশেষ করে কিশোর ও তরুণ সম্প্রদায়ের লোকেরা এতে প্রভাবিত হচ্ছে। তারা যে কাজগুলোকে দেখতে পাচ্ছে শুধুমাত্র সেগুলোকেই কাজ মনে করছে। এই কাজগুলো যারা করছেন তাদেরকেই কীর্তিমান মনে করছেন। নিজেরাও তাদের মতোই হতে চাইছেন। এতে যে সঙ্কটগুলো তৈরি হয়েছে তার মধ্যে আছে :
নবীন প্রজন্ম এমন কাজ করতে চাইছে যা করে পপুলার হওয়া যায়। যা অপরকে দেখানো যায়।
যে কাজগুলোর প্রভাব তাৎক্ষণিকভাবে বা অন্তত অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়া যায়।
দীর্ঘ সময় নিয়ে সুদূরপ্রসারী কাজের দিকে নতুন প্রজন্মেও তেমন কোনো আগ্রহ তৈরি হচ্ছে না। অথচ আদর্শিক সফলতার জন্য স্বল্পমেয়াদি কাজগুলো যেমন গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘমেয়াদি বা সুদূরপ্রসারী কাজগুলোর গুরুত্ব তার চেয়ে বেশি ছাড়া কম নয়।
যারা নীরবে নিভৃতে কাজ করে যাচ্ছিলেন, তারাও যেহেতু রক্তমাংসের মানুষ। তাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের এই সেলিব্রেটিজমের প্রভাবে তাদের মধ্যেও প্রতিক্রিয়া হচ্ছে। কখনো কখনো তারা অবমূল্যায়নের আশঙ্কা করছেন। আবার কখনো তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। তাদের কাজের গতিও মন্থর হয়ে যাচ্ছে।
আমরা লম্বা একটি সময় ধরে যে ক্রাইসিস পার করছি, তা এককেন্দ্রিক কোনো সঙ্কটের কারণে নয়। তাই সমাধানও এককেন্দ্রিক দেয়া উচিত নয়। বরং কিছু বিষয়কে মাথায় নিয়েই নিজেদের কথা বলা উচিত:
১. আমাদেরকে সবার আগে টোটালিটির কনসেপ্ট বুঝতে হবে। আমি একজন ব্যক্তি। একটি সংগঠন বা সংস্থা আমার মতো আরো অনেক ব্যক্তির সমন্বয়। আমার অবস্থান সেখানে ক্ষুদ্র। সামগ্রিকতাকে ধারণ করতে পারলেই বরং আমার স্বতন্ত্র অবস্থান আরো মজবুত হবে।
২. শরীর যেমন নানা অঙ্গের সমন্বয়। আমাদেরকে সংগঠনের কাঠামোতেও বিদ্যমান নানা সেক্টরের সমন্বয় ঘটাতে হবে।
৩. প্রতিটি সেক্টরকে তার মতো করে সম্মান ও মূল্যায়ন করতে হবে।
৪. যার যার কাজটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। নিজের কাজটি সর্বোত্তম উপায়ে করার চেষ্টা করতে হবে। আমার লাইনে আমার কাজটি যেন নিখুঁত হয়। আরবিতে একে ইতক্বন বলা হয়। আর ইতক্বনকে আল্লাহ নিজেও পছন্দ করেন।
৫. যদিও নিজের কাজকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলেছি তারপরও সতর্ক থাকতে হবে যাতে নিজের কাজকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে অন্যের কাজকে অবমূল্যায়ন করা না হয়। অবমূল্যায়ন করার দায় কেউ নিতে চায় না। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের ভাষা ও প্রকাশভঙ্গিতে সেই অবমূল্যায়নটি প্রায়শই চোখে পড়ে। প্রত্যেকেই তার কাজের ধরন ও তার কাজের প্রয়োজনীয়তাকেই গুরুত্ব দিতে চায়। নিজের কাজটাকেই সহিহ, সময়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং একমাত্র ইসলাম উপযোগী কাজ হিসেবে গণ্য করে।
ইমাম মালিকের (রহ.) সাথে তৎকালীন সময়ের প্রখ্যাত কিছু দরবেশেরও সাক্ষাৎ হয়েছিল। যার মধ্যে অন্যতম হলেন আব্দুল্লাহ বিন আবদুল আজিজ আল উমার। তিনি মালিককে (রহ.) কঠিন ও নিঃসঙ্গ জীবন বেছে নিতে উৎসাহিত করেছিলেন। ইমাম মালিক (রহ.) অবশ্য এর প্রতিক্রিয়ায় আব্দুল্লাহ আল উমারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন এবং আল্লাহর কাছে তার জন্য দুআও করেন। তবে, ইমাম মালিক (রহ.) বিনয়ের সাথে আল উমারর পরামর্শের সাথে দ্বিমত করেন। কারণ তিনি জানতেন, লোকজনকে ছেড়ে দূরে কোথাও গিয়ে নিঃসঙ্গ জীবন তার জন্য যথার্থ হবে না। ইমাম মালিক (রহ.) বিশ্বাস করতেন, স্থানীয় সকল সম্প্রদায়ের সাথে জীবন ঘনিষ্ঠভাবেই যুক্ত থাকা এবং মানুষের প্রতি সহনশীল মনোভাব সংরক্ষণ করাই বরং তার দায়িত্ব। ইমাম মালিক আব্দুল্লাহ আল উমারকে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। যার ভাষাটি নিম্নরূপ-
“আল্লাহ কাউকে যেমন অগাধ পরিমাণে দিয়েছেন আবার অনেককে ততটা বেশিও দেননি। কোনো কোনো মানুষ ইবাদতে খুবই সার্থক, কেউ বা দান-সাদাকায়। আবার অনেকেই আছে যারা রোজা পালনে অন্য সবাইকে পিছনে ফেলে দেয়। আবার কাউকে আল্লাহ সম্পদে সমৃদ্ধ করেছেন এবং তারাও সেই সম্পদের জোরেই ইসলামের খেদমত করে। কিন্তু হয়তো ততটা মানসম্মতভাবে ইবাদত পালন করতে পারে না। ঠিক একইভাবে, জ্ঞানার্জন এবং দ্বীনি ইলম বিতরণটাও খুবই উত্তম একটি আমল। অন্য অনেক আমলের তুলনায় এ আমলটি বেশি মর্যাদাসম্পন্ন। আমি আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করি কেননা তিনি আমাকে এ কাজে মনোনিবেশ করার তাওফিক দিয়েছেন। আপনি যেভাবে দ্বীনের খেদমত করছেন, আমার কাজটিকে আমি তার চেয়ে দুর্বল কিছু মনে করি না। বরং আমি মনে করি, আমরা দুজনেই ভালো কাজে ব্যস্ত রয়েছি। আল্লাহ যে ব্যক্তিকে যে যোগ্যতা দিয়েছেন, সে আলোকেই তার ভূমিকা পালন করা উচিত।”
অর্থাৎ ইমাম মালিক ((রহ.)) নেক আমলের যাবতীয় পথ পরিক্রমাকে সমান্তরাল বলেই গণ্য করতেন। একটি কাজকে অন্য কাজের পরিপূরক বলেই গণ্য করতেন। তার দৃষ্টিতে প্রতিটি আমল পারস্পরিক ক্ষেত্রে সম্পূরক, প্রতিযোগিতামূলক নয়। প্রতিটি আমলের মধ্যে শিকড়গত সাদৃশ্য আছে, কিন্তু একটি আমল দিয়ে কখনোই অন্য আমলের হক আদায় হয় না। আবার একটি আমলের কারণে অপরটি ক্ষতিগ্রস্তও হয় না।
একজন বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি কেমন হতে পারেন, ইমাম মালিক (রহ.) এক্ষেত্রে ছিলেন একজন আদর্শ দৃষ্টান্ত। তিনি অনুধাবন করতেন, আল্লাহ তাকে দ্বীনি ইলম তথা সর্বোচ্চ নেয়ামত দান করেছেন আর এ জ্ঞানের সুরক্ষা ও প্রচারের মাধ্যমেই তিনি দ্বীনের সবচেয়ে বেশি খেদমত করতে পারবেন। ইমাম মালিক (রহ.) তার জীবদ্দশায় নানা ধরনের মানুষের সান্নিধ্য লাভ করেন। এদের মধ্যে কেউ কেউ ছিল ভীষণ রকম বৈষয়িক। এ মানুষগুলো তাকে বরাবরই দ্বীনি ইলমের পথ থেকে বিচ্যুত করার চেষ্টা করতো। কিন্তু মালিক (রহ.) কখনোই তাদের ফাঁদে পড়তেন না বরং তিনি সবসময়ই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন এবং রবের প্রতিশ্রুত পুরস্কারকেই সর্বাধিক অগ্রাধিকার দিতেন। আবার এমন মানুষের সাথেও তার দেখা হতো যারা মুসলিম হিসেবে দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে তাকে কয়েক দিনের জন্য সফরে নিতে চাইতেন। কিন্তু ইমাম মালিক (রহ.) তাতেও অংশ নেননি। কারণ তিনি উপলব্ধি করতেন যে, তিনি যে ইলম শিখছেন, দ্বীনের জন্য তার আবশ্যকতা বরং বেশি।
মুসলিমদের নানা ধরনের দায়িত্ব ও করণীয় থাকে। মুসলিম উম্মাহর জন্য এ সবগুলো কাজেরই প্রয়োজন। আর প্রতিটি অঞ্চলেই নানা মানসিকতার ও নানা চিন্তার মুসলিম থাকে, যারা ভিন্ন ভিন্নভাবে এসব দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যায়। ইমাম মালিক (রহ.) এ ধরনের কোনো কাজকেই হেয় করতেন না। বরং তিনি বিশ্বাস করতেন, যিনি যে কাজটি ভালো পারেন, তার সেই কাজটিই করা উচিত।’
সালাফদের জীবন থেকে আমাদেরও শিক্ষা নেয়া প্রয়োজন। প্রত্যেকের কাজকে সমীহ করুন। সবার অবদানকে জরুরি বলে মনে করুন। আমরা এত বছর ধরে কাজ করার পরও প্রত্যাশিত সফলতা না পাওয়ার একটি বড় কারণ হলো অনেকগুলো সেক্টরে আমরা এখনো পদার্পণই করতে পারিনি। এক্ষেত্রে আমাদের মানসিক সঙ্কীর্ণতাও বড় একটা ফ্যাক্টর। আমরা কাউকে ভালো পর্যায়ে যেতে দেখলে কিংবা ভালো কোনো কাজ করতে দেখলে এখনো ইতিবাচকভাবে তার প্রশংসা করতে পারি না। এই সঙ্কীর্ণ মানসিকতা থেকে অনতিবিলম্বে বেরিয়ে আসা দরকার।
কাউকে কিছু পেতে বা অর্জন করতে দেখলে মাশাআল্লাহ বলুন। মাশাআল্লাহ অর্থ হলো আল্লাহর ইচ্ছাতেই সব হয়। এই জিকিরের চর্চাটি আপনার অন্তরের মধ্য থেকে হিংসার অনুভূতিকে দূর করবে। ইসলামে হিংসার কোনো স্থান নেই। তাই যে আল্লাহর নেয়ামত পায় তাকে হিংসা করবেন না। তার পেছনে না লেগে বরং যারা অনেক কম সৌভাগ্য পায়, আপনার থেকেও যারা অনগ্রসর তাদেরকে নিয়ে ভাবুন। তাহলে আপনি আল্লাহর প্রতি অনেক বেশি কৃতজ্ঞ হয়ে উঠবেন।
যে মানুষগুলো আমাদেরকে সাহায্য করছে, আমাদের কাজকে সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার জন্য যারা অবদান রাখছে তাদেরকে ধন্যবাদ দেয়ার চেষ্টা করুন। আমরা অনেক সময় তাদের সহযোগিতাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেই এবং তাদের ভূমিকাকে অগ্রাহ্য করে যাই। আমার বাসার যে ছোট সদস্যটি আমাকে এক গ্লাস পানি দিয়ে সাহায্য করলো বা বাসার যে বুয়া প্রতিদিন এসে সংসারের কাজে সাহায্য করছে বা আমাদের মা- যিনি আমাদের ঘরটিকে গুছিয়ে রাখছেন তাদেরকে আমরা কয়জনই বা ধন্যবাদ দেই? আমাদের উচিত তাদের এই সুচিন্তাগুলোর জন্য ধন্যবাদ দিয়ে যাওয়া। রাসূল সা. বলেছেন, “যে মানুষটি ছোট নেয়ামতের জন্য কৃতজ্ঞতা জানায় না, সে একসময় বড় বিষয়গুলোর জন্যও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে ভুলে যায়। আর যে তার আশপাশের সহায়ক মানুষগুলোকেই ধন্যবাদ জানাতে পারে না সে আল্লাহর প্রতিও সঠিকভাবে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে না। (তথ্যসূত্র : আব্দুদ দুনিয়া)
ঘরের ভেতরের মানুষগুলোকে মূল্যায়ন করতে আমাদের ক্রমাগত যে অনীহা একটা সময়ে তা বাইরের জগতেও প্রতিফলিত হয়। আরেকটি বিষয়ও ইদানীং দেখা যাচ্ছে তাহলো, প্রত্যেকের পছন্দনীয় কিছু ব্যক্তিত্ব রয়েছে। ঘুরে ফিরে তাদের কথাই যেন বলা হয়। এর বাইরে অন্যদের অবদানের কথা সহজে আলোচিত হয় না। যাদের কাজ আপনার নজরে পড়ছে শুধু তারাই কাজ করছে তা কিন্তু নয়। আরও অনেক মানুষ আছেন যারা নীরবে নিভৃতে কাজ করছেন। যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায় নিজের কর্মকাণ্ডগুলোকে আড়াল করে রাখতে চাইছেন। যাদের কোনো বৈষয়িক বা রাজনৈতিক অভিসন্ধিও নেই। এ মানুষগুলোর অবদানও কিন্তু অনেক। ওপরে ইমাম মালেকের (রহ.) কথা বলেছি। সোনালি যুগের এই মানের সব ইমাম এবং ইসলামিক স্কলারদের কথা ভাবুন। তাদের অনেকের নাম আমরা জানি, অনেকের লেখনী ও বক্তব্য আজও এ পৃথিবীতে টিকে আছে। অথচ, সে সময়ে মানুষ যাদেরকে নিয়ে মাতামাতি করতো কিংবা তৎকালীন সময়ে কারা শাসক পর্যায়েও ছিলেন তাদের নাম নিশানা বের করতে আমাদের হয়তো ঘাম ছুটে যাবে।
ইসলামকে এগিয়ে নিতে চাইলে ইসলামিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি করতে হবে। আর ইসলামিক কর্মকাণ্ডকে অগ্রসর করার জন্য প্রতিটি সেক্টরের মানুষকে সম্মান দিতে হবে। তাদের কাজগুলোকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে কিছু সেক্টরেই শুধু নয় বরং ব্যাপকভিত্তিক ইসলামী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।
লেখক : সাংবাদিক, অনুবাদক ও কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply