ইসলামী চলচ্চিত্র নির্মাতাদের জ্ঞাতব্য বিষয় -শেখ আবুল কাশেম মিঠুন

ইসলামী আন্দোলনকে গতিশীল ও ত্বরান্বিত করার জন্য যদি চলচ্চিত্র তৈরি হয় তবে ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর কাছে বিষয়টি অনেক বেশি সুখের ও প্রেরণার উৎস হয়ে দাঁড়াবে।
রুশ বিপ্লব ও ফরাসি বিপ্লবের প্রারম্ভে যেসব চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছিলো, সেসব চলচ্চিত্র যেমন ঐসব দেশের জনগণের প্রেরণার উৎস হয়ে উঠেছিলো তেমনি আজও পৃথিবীর চলচ্চিত্র বোদ্ধাদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে আছে। সেসব পরিচালকের চিন্তাধারার গভীরতা, বিশাল হৃদয়বৃত্তি ও জ্ঞানের প্রসারতা আজও গবেষকদের গবেষণার বিষয়। আর তাদের চলচ্চিত্রগুলোও আজ অবধি চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের কাছে অনুসরণীয় হয়ে আছে। কারণ সেসব চলচ্চিত্র নিজ নিজ দেশের বিপ্লবকে সারা বিশ্বে পৌঁছে দিয়ে লক্ষ লক্ষ মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছিল।
একটি আন্দোলনমুখী চলচ্চিত্র যদি চলচ্চিত্রধর্মী হয়ে না ওঠে তবে তা অনুতাপের বৈকি! তাই যারা আন্দোলনমুখী চলচ্চিত্র তৈরি করতে চান তাদেরকে চলচ্চিত্র তৈরিতে যে শ্রম ও অর্থ ব্যয় হয় সেই একই শ্রম ও অর্থ দিয়ে সত্যিকার চলচ্চিত্র শিক্ষালাভ করে চলচ্চিত্র নির্মাণে অগ্রসর হওয়া উচিত। যাতে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ইসলামের সৌন্দর্য তার সার্বজনীনতা ও শাশ্বতরূপ প্রতিটি মানুষের কাছে তুলে ধরা সম্ভব হয়।
যারা চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে শিক্ষিত এবং গল্প বা উপন্যাস সাহিত্যের রসাস্বাদনে অভ্যস্ত এবং মানসিকভাবে পোক্ত তারা চলচ্চিত্র আস্বাদন করেন এক ধরনের উপলব্ধি দিয়ে। আর যারা চলচ্চিত্র দেখার ব্যাপারে অনভিজ্ঞ বা চলচ্চিত্রের নানা বিষয় নিয়ে ভাবনা চিন্তা করেন না, উপন্যাস বা গল্পসাহিত্যের রসাস্বাদনে অভ্যস্ত নন, চলচ্চিত্র দেখার আস্বাদন তাদের কাছে আর এক ধরনের। চলচ্চিত্র দেখার, বুঝার ও আস্বাদনের ব্যাপারে ইসলামী আন্দোলনবহির্ভূত দর্শকরা এক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে আছেন, ফলে চলচ্চিত্র বিষয় তারা অবশ্যই শিক্ষিত ও সজাগ ব্যাপারটি ইসলামী আন্দোলনের চলচ্চিত্র নির্মাতাদের স্মরণে রাখা প্রয়োজন।
সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে চলচ্চিত্রকে ব্যবহার করা হয়। দর্শকের অন্তরের নিভৃতে যে স্বপ্ন বা ইচ্ছা লালিত হয় তা চলচ্চিত্রের বদৌলতে জীবন্ত ও শক্তিশালী হচ্ছে না বিকৃত পথে ধাবিত হচ্ছে এ বিষয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতার গভীর পর্যবেক্ষণ থাকা দরকার।
এ কথাও জানা থাকা দরকার যে রাজনৈতিক ক্রিয়াকর্মের প্রতি গভীর আনুগত্যের ফলে চলচ্চিত্রের অনেক দর্শক চলচ্চিত্রটিকে চলচ্চিত্র হিসেবে দেখার যে দৃষ্টিভঙ্গি তা গ্রহণ করার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। মতের স্বপক্ষে কথা শোনা যাচ্ছে বলে চলচ্চিত্রের অন্যান্য গুণাগুণ সে না পারে আস্বাদন করতে না পারে মূল্যায়ন করতে। চলচ্চিত্র দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সে নিজেকে বঞ্চিত করে।
লিখিত আকারে যা কিছু আমরা পড়ি, তার প্রতিটি অক্ষর, শব্দ এবং বাক্যের অর্থ আমরা বুঝি, কারণ ছোটবেলা থেকে আমরা উক্ত বিষয়ে অভিজ্ঞতা অর্জন করি। মানুষের সাথে কথা আদান-প্রদান করতে করতে নিরক্ষর ব্যক্তিও শব্দ এবং বাক্যের অর্থ আয়ত্ত করে থাকে। চলচ্চিত্রও তদ্রুপ। কলম দিয়ে অক্ষর, শব্দ ও বাক্য লেখা হয়। আর চলচ্চিত্রে ক্যামেরা দিয়ে শট্ নামক অক্ষর সাজানো হয়। তারপর শট্রে পর শট্ সাজিয়ে শব্দ ও বাক্য নামক সিন তৈরি হয়। অতএব প্রতিটি শট্ এর নাম, তার অ্যাঙ্গেল, অর্থ, কম্পোজিশন, ফ্রেম, অভিনয়শিল্পীর অঙ্গভঙ্গি এবং মৌখিক ক্রিয়া, আলোক সম্পাত, সঙ্গীত, স্থাপত্যশৈলী, স্থিরচিত্র মোট কথা চলচ্চিত্র বিষয়ে সার্বিক জ্ঞান অর্জন করা প্রয়োজন।
অশ্লীল চলচ্চিত্রের দর্শক যেমন আছে, সুস্থ শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রের দর্শকও তেমনি বিদ্যমান। বটতলার উপন্যাস পড়ার পাঠক যেমন আছে, ক্লাসিক পড়ার পাঠকও বিদ্যমান।
সুস্থ-শিল্পসম্মত রুচির দর্শক তৈরিতে ফিল্ম সোসাইটিগুলো কাজ করে থাকে। আমাদের দেশে তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা অন্যাদের চেয়ে শিক্ষিত ও জ্ঞানী সেহেতু ধারণা হওয়া স্বাভাবিক তারাও চলচ্চিত্রের দর্শক হওয়ার ব্যাপারে শিক্ষিত। কিন্তু ধারণাটি সঠিক নয়। কারণ চলচ্চিত্র সৃষ্টির পর থেকে আমরা সবাই কমবেশি অশ্লীল অপসংস্কৃতির চলচ্চিত্র দেখতে অভ্যস্ত। তাই চলচ্চিত্র থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া স্বাভাবিক। যার জন্য অনেকের ক্ষেত্রে চলচ্চিত্র চর্চা আর হয়ে ওঠেনি।
চলচ্চিত্র যুগপৎ দেখা, শোনা ও পড়ার বিষয়। এর জন্য পৃথকভাবে জ্ঞান অর্জনের প্রয়োজন। এর জন্য ফিল্ম সোসাইটি প্রয়োজন। যারা পৃথিবীর প্রথম শ্রেণীর শিল্পসম্মত চলচ্চিত্রগুলো দেখিয়ে দেখিয়ে তা বিশ্লেষণ করে করে চলচ্চিত্রবোদ্ধা দর্শক তৈরি করবে।
চলচ্চিত্র নির্মাতাগোষ্ঠী, চলচ্চিত্র প্রদর্শক, চলচ্চিত্র বাজারজাত, চলচ্চিত্রের প্রচার বা বিজ্ঞাপন এসব যে পৃথক পৃথক বিজ্ঞান চলচ্চিত্রবিষয়ক শিক্ষা লাভ না করলে বিষয়টি বোধগম্য হওয়া সম্ভব নয়।
যেহেতু প্রদর্শক, বাজারজাত, বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বিষয়ে অভিজ্ঞ লোক তৈরি না করেই আমরা চলচ্চিত্র নির্মাণ করছি সেহেতু ইসলামী আন্দোলনের চলচ্চিত্র নির্মাতাদেরকে শুধুমাত্র নির্বাচিত ও সমর্থক দর্শকদের আনন্দ ও বোধের জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ না করে বৃহত্তর দর্শক সমষ্টির জন্য চলচ্চিত্র নির্মাণ করা উচিত। কারণ প্রদর্শন, বাজারজাত ও বিজ্ঞাপন ইত্যাদি বিষয়গুলো হয় বিজ্ঞানসম্মত হবে না অথবা উক্ত ব্যাপারগুলো আন্দোলনবহির্ভূত অভিজ্ঞদের মারপ্যাঁচে পড়বে। অতএব চলচ্চিত্র তৈরি এবং যা তা করে বাজারজাত ও প্রদর্শনের পাশাপাশি সব বিষয়ে অভিজ্ঞ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা একান্ত প্রয়োজন নইলে সমাজ পরিবর্তনের যে উদ্দেশ্য তা ব্যর্থ হয়ে যাবে। আদর্শিক চলচ্চিত্রের উদ্দেশ্য হলো ভাবাদর্শকে বিরোধীপক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা। তাই যুক্তির অবতারণা এবং বিশ্লেষণ ক্ষমতা দিয়ে বিরোধী দর্শকদের মনের মধ্যে যে ক্ষোভ, অন্ধত্ব এবং বিকার রয়েছে তা দূরীভূত করার চেষ্টা করা। চলচ্চিত্রটি যেন দর্শকের অনুভবকে জাগ্রত করে এবং কোনোভাবেই যেন বিরোধীদের ওপর নির্বাচিত ও সমর্থক দর্শকরা উত্তেজিত না হয়ে পড়ে। আবার বিরোধী গোষ্ঠীর মনের মধ্যেও যেন আরো তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার না হয়।
নিজের রুচিমাফিক চলচ্চিত্র তৈরি করার অধিকার পরিচালকের আছে। তেমনি দর্শকও দাবি করবে তার বিচার বুদ্ধিকে যথোচিত সম্মান করা হোক। অন্যদিকে চলচ্চিত্রটি যদি কোন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সাধনের জন্য তৈরি হয় তবে পরিচালকের নিজস্ব রুচি অনেক সময় পরিত্যাগ করতে হয় সেখানে বৃহত্তর আন্দোলনের দাবিকে প্রতিফলিত করা উচিত চলচ্চিত্রিক নিয়মে এবং যথাযথভাবে স্থান-কাল-পাত্র, রীতি-নীতি ও সঙ্গতি মেনে আন্দোলন এবং তার উদ্দেশ্যকে প্রতিষ্ঠা করা উচিত।
চলচ্চিত্রের টেকনিক তার উপস্থাপনা, ব্যক্ত করার ভঙ্গি, কাহিনী বর্ণনা, চিত্রনাট্য, সংলাপ বিভিন্ন শটের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়া অ্যাকশন এবং রিঅ্যাকশনের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা থাকা দরকার। ভাসাভাসা জ্ঞান নিয়ে চলচ্চিত্র তৈরি করলে হতে পারে তা ইসলামী আন্দোলনকেই হাস্যকর করে তুলবে।
অনেকে ব্যক্তি উদ্যোগে একটা আদর্শিক চলচ্চিত্র তৈরি করতে পারেন, সমস্ত দায়িত্ব তখন ঐ ব্যক্তিকেই বহন করতে হয়। কিন্তু যখন চলচ্চিত্রটির ব্যানার হয় বৃহত্তর সংগঠন তখন সমস্ত দায়-দায়িত্ব, সমালোচনা সবই সংগঠনের ওপর বর্তায়। তাই ব্যানারের সম্মান, ভাবগাম্ভীর্য, মর্যাদা রক্ষা এবং সংগঠনটির বক্তব্য, মতামত আদর্শ ও রুচি যথাযথভাবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে কি না সে বিষয়ে সজাগ থাকা চলচ্চিত্র নির্মাতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আদর্শটি পুরোপুরি সাংগঠনিক দৃষ্টিতে যথাযথ কিনা সে ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। আর সংগঠনের নেতৃত্ববৃন্দকে খেয়াল রাখা বাঞ্ছনীয় চলচ্চিত্রটির কোন বিষয়ে কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হলে সে প্রশ্নের উত্তর যেন যৌক্তিকভাবে দেয়া সম্ভব হয়।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশ সরকার চলচ্চিত্র আবির্ভাবের সময় বহু বিরূপ মন্তব্যের শিকার হয়েছিলো বিশেষ কিছু কারণে। পরবর্তীতে সময়োপযোগী যৌক্তিক নিয়মাবলি সংবলিত সেন্সর নীতিমালা তৈরি করেন তারা। এর পর বিরূপ সমালোচনা হলেও সে সমালোচনা মূলত গঠনমূলক ও সংশোধনের পর্যায়ে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায়। যার জন্য তিক্তকর পরিস্থিতি আর সৃষ্টি হয়নি। অতএব ইসলামী আন্দোলনের চলচ্চিত্রের জন্য অবশ্যই সেন্সর নীতিমালা তৈরি করা প্রয়োজন। যার মধ্য দিয়ে শরিয়ত, ইসলামী নৈতিকতা ও মূল্যবোধের পরিচয় যথাযথভাবে প্রতিফলিত হবে।
চলচ্চিত্রের নানা রকম ক্যাটাগরির মধ্যে একটি ক্যাটাগরি হলো রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। যদিও সব চলচ্চিত্রের মধ্যে একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকে, কিন্তু যেসব চলচ্চিত্রে সরাসরি রাজনীতি নিয়ে আলোচনা হয় সেগুলোই মূলত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। এ ধরনের বিশ্বমানের চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে বার্থ অব এ নেশন, ইনটলারেন্স, ব্যাটেলশিপ পোটেমকিন, আইভান দি টেরিবল, সিটিজেন কেএন, দ্যা ইমিগ্রান্ট, দ্যা ব্যাটস অব আলজিয়ার্স, ওপেন সিটি, গান্ধী, নেপোলিয়ান ইত্যাদি। ভারতের প্রখ্যাত চিত্রপরিচালক মৃণাল সেন ১৯৬৮তে ‘ইন্টারভিউ’ নামে একটি ছবি তৈরি করেন যাকে ভারতের রাজনৈতিক ছবির পথিকৃৎ বলা হয়। আমাদের দেশে রাজনৈতিক ছবি হয়েছে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’- এ ছাড়া আর যেসব ছবি হয়েছে তা চলচ্চিত্রগুণসম্পন্ন নয় বলে মানদন্ডে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। আর তাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে সেসব ছবি অনুপস্থিত।
বিশ্বখ্যাত ছবিগুলোর রেফারেন্স আনা হলো এ কারণে যে, কোন খেলনা উড়োজাহাজ বা গাড়ি তৈরি করতে হলেও মূল বস্তুটিকে সামনে রাখতে হয়। তাই মৌলিকত্বের ভূষণে ভূষিত পিতৃছবিকে মূল্যায়ন করতেই হবে। তা চর্চা করতে হবে। ভাবতে হবে, ভাবনার মধ্যে লালন করতে হবে। তার কাঠামো, বিন্যাস, ব্যঞ্জনা, স্থাপত্যশৈলী, মনস্তাত্ত্বিকতা এবং সামগ্রিকতাকে চর্চা না করে রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বানানো আহম্মকি ছাড়া আর কিছু নয়। রাজনৈতিক চলচ্চিত্র করবো কিন্তু তার সম্পর্কে কোনো কিছু চর্চা করবো না এটা হয় না। আগুনকে অস্বীকার করে আলো জ্বালানো সম্ভব নয়।

SHARE

Leave a Reply