ইসলামী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি । এস. এম রুহুল আমীন

ইসলামী নেতৃত্বের প্রয়োজনীয় গুণাবলি । এস. এম রুহুল আমীননেতৃত্ব শব্দটি আমাদের সমাজে বহুল ব্যবহৃত এবং সুপরিচিত একটি শব্দ। যার ইংরেজি প্রতিশব্দ হলো (Leader) এবং আরবি হলো ইমাম। যেমন আরবিতে বলা হয় মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)কে ‘ইমামুল মুরসালিন’ অর্থাৎ রাসূলগণের নেতা। কুরআনে হযরত ইব্রাহীম (আ)কে বলা হয়েছে “ওয়া জায়ালনাকা লিন্নাসি ইমামা” অর্থাৎ আপনাকে আমি মানুষদের ইমাম করে পাঠিয়েছি। তাই বলা যায়- যিনি কোনো জনসমষ্টি পরিচালনা করেন বা যার নেতৃত্বে পরিচালিত হয় তাকেই নেতা বা পরিচালক বলে। কোন মিশন বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নেতৃত্বের কোনো বিকল্প নেই। নেতৃত্বশূন্য মিশন বা দল Rudder Less Boat এর সাথে তুলনীয়। তাই এ অপরিহার্য উপাদানটি যতো গুণাবলি সম্পন্ন ও যোগ্য হবে তৎসংশ্লিষ্ট মিশন ততো তাড়াতাড়ি সফলতার আলপস পর্বত বিজয় করতে সক্ষম হবে।

স্বভাবতই প্রশ্ন আসে ইসলামী নেতৃত্ব কী?
যিনি ইসলামের কোনো উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে নিছক আল্লাহর সন্তোষ অর্জনের জন্য কোনো জনসমষ্টি পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন তাকেই ইসলামী নেতৃত্ব বলে।

ইসলামী নেতৃত্বের গুণাবলি
ইসলামী নেতৃত্বের গুণাবলি আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই প্রচলিত নেতাদের গুণাবলি এক নজরে দেখে নিতে হয়। বলা হয়ে থাকে “Who is the best leader Who is the best cadre” যার যতো বেশি শক্তি তাকেই এ সমাজে নেতা মনে করা হয়। কাজেই ইসলাম একটা পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধানের নাম। যারা এ পথে লোকদের পরিচালনার দায়িত্ব পাবেন তাদেরকে সার্বক্ষণিক আল্লাহর ভয়ে ভীত হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হয়। আর তাকে থাকতে হবে কিছু অনন্য ও ব্যতিক্রম বৈশিষ্ট্যের ধারক ও বাহক হিসেবে। যেসব গুণাবলি ব্যক্তিকে আল্লাহর সন্তোষ অর্জনে অগ্রসর করে সে বৈশিষ্ট্য বা গুণাবলি থাকতে হবে ইসলামী নেতৃত্বের মধ্যে। আর সে বৈশিষ্ট্যের সংক্ষিপ্ত একটি চিত্র তুলে ধরা হলো নিম্নোক্তভাবে:
১. নেতা হবেন জ্ঞানী
ইসলামী নেতৃত্বের অধিকারী ব্যক্তিকে ব্যাপক জ্ঞানের অস্ত্রে সজ্জিত হতে হবে। তা হবে আদর্শের এবং সমসাময়িক জ্ঞান। কারণ বলা হয়েছে “Knowledge is power”. কুরআনে বলা হয়েছে, “আল্লাহ তায়ালা আদমকে সকল বিষয়ের জ্ঞান শিখালেন।” (সূরা আল বাকারাহ : ৩১) মহানবী (সা) বলেন, “কুরআনের অধ্যয়নকারীরা কওমের নেতা হবে।” (মুসলিম)
২. আস্থাশীল যোগ্যতা অর্জন
সবচেয়ে বেশি আস্থাভাজন ব্যক্তিই হবেন নেতা। আস্থা হারালে আর তিনি নেতা থাকবেন না। নেতা হবেন তিনি যার সততা ও যোগ্য পরিচালনায় জনগণের আস্থা রয়েছে। কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, “নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের মধ্যে যোগ্যতমরা পৃথিবীর উত্তরাধিকারী হবে।” (সূরা আল আম্বিয়া : ১০৫)
৩. আমানতদার
নেতৃত্ব একটি আল্লাহ প্রদত্ত আমানত। যার কাছে এটা না থাকবে তিনি জনগণের ইজ্জত আবরু হেফাজতে ব্যর্থ হবেন। কাজেই নেতাকে আমানতদার হতে হবে। কুরআনে সে কথা বলা হয়েছে, “মহান আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তোমাদের আমানত তার যোগ্য পাত্রে অর্পণ করো।” (সূরা আন নিসা : ৫৮)
৪. সাহসী
নেতাকে অবশ্যই সাহসী হতে হবে। কারণ তা না হলে পদে পদে এর খেসারত দিতে হবে। আর পৃথিবীর যতো ইতিহাস তা বীর ও সাহসীরাই তৈরি করেছেন। হাদিসে এরশাদ হয়েছে, “তোমরা যদি আমার পরে উমরকে নেতা বানাও তবে তাকে সাহসী ও আমানতদার পাবে।”
৫. গণতন্ত্রমনা
পরামর্শ গ্রহণ নেতৃত্বের জন্য বলিষ্ঠতা। স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি সকলের অপ্রিয় ও অপছন্দনীয়। ইসলামী নেতৃত্বের জন্য শূরা অবশ্য কর্তব্য। কুরআনে এ কথারই উজ্জ্বল প্রমাণ “নবী হে, আপনি সাথীদের সাথে সিদ্ধান্ত গ্রহণে পরামর্শ নিন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৮)
৬. ন্যায়পরায়ণ
ন্যায়পরায়ণতা নেতৃত্বের রক্ষাকবচ। ভাষা, ধর্ম-বর্ণ, সবল-দুর্বল, ধনী-গরিব নির্বিশেষে নেতা সবার প্রতি ইনসাফ প্রদর্শন করবেন। আল কুরআনে বলা হয়েছে যে, “তোমাদের ওপর ইনসাফ প্রতিষ্ঠার জন্য আমাকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” (সূরা আশ-শুয়ারা : ১৫)
৭. উদার
উদারতা হচ্ছে নেতৃত্বের ভূষণ। প্রশস্ত মনের অধিকারী হতে হবে নেতাকে। তার সুন্দর আচার-আচরণ, ভারসাম্যপূর্ণ মেজাজ থাকতে হবে। ইরশাদ হয়েছে, “আল্লাহর মেহেরবানি যে, তিনি আপনার হৃদয়কে অনুসারীদের জন্য কোমল করে দিয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান: ১৫৮)
৮. ক্ষমার মানসিকতা সম্পন্ন
ক্ষমা মহৎগুণ। নেতাকে সব সময় ক্ষমার মানসিকতা পোষণ করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “আপনি এদের ত্রুটিসমূহকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখুন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৮)
৯. কল্যাণকামী
নেতা সব সময়ই কর্মীদ্বারা আবর্তিত থাকেন। তাই তিনি কর্মীদের কল্যাণ কামনা করবেন। আল্লাহ বলেন, “তাদের (অধীনস্থ কর্মীদের) জন্য আপনি শাফায়াত বা ক্ষমা প্রার্থনা করুন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৮)
১০. দৃঢ় সঙ্কল্পচেতা
নেতাকে সব সময়ই দৃঢ় সঙ্কল্পচেতা সম্পন্ন হতে হয়। হতে হয় এ মন্ত্রে উদ্ধুদ্ধ “Do or die” কুরআনে এসেছে, “যখন কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তার ওপর দৃঢ় সঙ্কল্প হয়ে যান।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৮)
১১. আল্লাহর প্রতি অগাধ আস্থার অধিকারী
নেতার সকল কাজের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থাশীল হতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “অতঃপর আল্লাহর ওপর ভরসা করুন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৫৮)
১২. কর্মঠ
নেতার মধ্যে কাজের প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্বানুভূতি পূর্ণ মাত্রায় থাকতে হবে। আর এটা তাকওয়ার দাবি। কুরআনে সে কথারই প্রতিধ্বনি “আল্লাহর কাছে সে-ই প্রিয় যে বেশি তাকওয়াসম্পন্ন।” (সূরা আন নূর : ১৩)
১৩. স্বাস্থ্যবান ও চালাক চতুর
নেতা সব সময়ই স্বাস্থ্যবান ও চালাক-চতুর হবেন। মহান আল্লাহ বলেন, “তাদের (নবী)কে শারীরিকও ইলমি তথা মানসিক উভয় যোগ্যতায় ভূষিত করা হয়েছে।” (সূরা আল বাকারা : ২৪৮) হাদিসে বলা হয়েছে, “একজন স্বাস্থ্যবান মু’মিন একজন অসুস্থ মু’মিন হতে উত্তম।” (আবু হুরায়রা)
১৪. উদ্ভাবনী শক্তিসম্পন্ন
নেতাকে উদ্ভাবনী ও আবিষ্কারের যোগ্যতা থাকতে হবে। মনোবিজ্ঞানীর ভূমিকা পালন করে জনশক্তিকে কাজে লাগাতে হবে এবং নিত্যনতুন আবিষ্কারের মনমানসিকতা থাকতে হবে। আল কুরআনে এসেছে, “ডাকো, তোমার প্রভুর দিকে হিকমত ও উত্তম কথার মাধ্যমে।” (সূরা আল নাহল : ১২৫)
১৫. সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন
নেতাকে বিশেষ মুহূর্তে সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতা থাকতে হবে। যাতে জনশক্তি ভড়কে না যায় এবং সমূহ অহেতুক বিপদ মুসিবত থেকে রক্ষা পেয়ে মিশনকে এগিয়ে নিতে পারে অভীষ্ট লক্ষ্য বা মনজিলের দিকে।
১৬. উৎসাহ ও উদ্যোগ গ্রহণের যোগ্যতাসম্পন্ন
নেতাকে সঙ্কটকালে উৎসাহ দান ও উদ্যোগ গ্রহণের যোগ্যতার অধিকারী হতে হবে। তাহলেই অধীনস্থ বা জনশক্তির আগ্রহ বাড়াতে এবং নতুন কাজ করা সম্ভব হবে।
১৭. ধৈর্যশীল
নেতা সব সময় ধৈর্যশীল হবেন। কুরআনে আল্লাহ তা‘য়ালা বলেছেন- “নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” (সূরা আল বাকারা : ১৫২)
১৮. মুখলিস
নেতাকে মুখলিস বা একনিষ্ঠ বা একাগ্রচিত্ত হতে হবে। কোনো রকম নিফাকি ও রিয়া তাদের মধ্যে স্থান পাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, “আনুগত্যকে খালেস করে আল্লাহর জন্য ইবাদত করো।” (সূরা আল জুমার : ২)
১৯. ভ্রাতৃত্ববোধসম্পন্ন
ইসলামী নেতৃত্বকে অবশ্যই ভ্রাতৃত্বের চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন, “নিঃসন্দেহে মু’মিন একে অপরের ভাই।” (সূরা আল হুজুরাত : ১০)
২০. ইহতেসাব গ্রহণের মানসিকতাসম্পন্ন
মানুষ ভুলের ঊর্ধ্বে নয়, কাজেই নেতাও ভুল করতে পারেন। এ ক্ষেত্রে তাকেও স্মরণ রাখতে হবে এবং ইহতেসাব গ্রহণের মন মানসিকতা থাকতে হবে। রাসূল (সা) বলেন, “এক মু’মিন আরেক মু’মিনের জন্য আয়না স্বরূপ।” (মিশকাত)
২১. লোভহীন
অবশ্যই ইসলামী নেতৃত্বকে লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে। কারণ মহানবী (সা) বলেছেন, “যারা আমার কাছে ক্ষমতা চায় তাদেরকে আমি ক্ষমতা দিই না।” জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন-
“আমাদের মাঝে যার বুকে আছে লুকায়িত প্রলোভন
তাকেও সাজা দিতে হবে আল্লাহর প্রয়োজন।”
২২. জনগণের সেবক
ইসলামী নেতৃত্বকে জনগণের শাসক না হয়ে জনগণের খাদেম হতে হবে। মহানবী (সা) বলেছেন, “সাইয়েদুল কাওমি খাদেমুহুম।” A leader of a nation is the servent of that nation.
২৩. সুবক্তা ও স্পষ্টভাষী
সর্বোপরি ইসলামী নেতৃত্বকে সুবক্তা ও স্পষ্টভাষী হতে হবে। তা না হলে তার মিশন জাতিকে বুঝাতে অক্ষম হবেন। মহানবী (সা) বলেছেন, “তোমরা জিহাদ করো তোমাদের তরবারি ও জিহ্বা দ্বারা।”

সুতরাং, নেতৃত্বকে একটা গাড়ির Driver এর সাথে তুলনা করা যেতে পারে। যদি Driver বুদ্ধিমত্তা ও বাস্তব অভিজ্ঞতা দ্বারা গাড়ি চালান, তাহলে গাড়ি বিপদ মুক্তভাবে যথাসময়ে যথাস্থানে পৌঁছতে সক্ষম হবে।
ঠিক তেমনি সঠিক নেতৃত্ব তার চরিত্র, আদর্শ যদি সঠিকভাবে প্রতিফলন ঘটিয়ে জনগণের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারেন। তাহলে তা জাতিকে কাঙ্ক্ষিত সাফল্যের সুবাতাসে আবগাহন করাতে সক্ষম হবে।
পরিশেষে প্রিয় নবীর একটি প্রিয় হাদিসের উল্লেখ করেই শেষ করতে চাই। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি মুসলমানের কোনো বিষয় ও ব্যাপারে দায়িত্বশীল হলো কিন্তু তাদের (জনগণ/কর্মী) খেদমত ও কল্যাণের জন্য ততোটুকু চেষ্টাও করলো না, যতোটুকু সে নিজের জন্য করে থাকে। তবে তাকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার কারণে আল্লাহ উপুড় করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।” (জামুস সাগির) মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর দেয়া দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তৌফিক দিন।

লেখক : সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply