ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন উত্তর উপনিবেশ অধ্যায় -আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

(গত সংখ্যার পর)

আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যে উদ্দেশ্য ছিল তা ব্যাহত হওয়ার মূল কারণ আলোচনা করতে গিয়ে উপমহাদেশে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের তাত্ত্বিক ভিত্তি রচনা করেন সাইয়েদ আবুল আলা মওদূদী (রহ.)। এ বিষয়টি তিনি বিস্তারিত আলোচনা করেন। ১৯৩৫ সনে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারে প্রশ্ন ওঠে “এখান থেকে প্রাপ্ত শতকরা ৯০ ভাগ শিক্ষার্থীই কেন নাস্তিকতা ও প্রকৃতিবাদের পূজারি?” দেশের পত্র-পত্রিকায় এসব নিয়ে লেখালেখি হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ এর কারণ ও প্রতিকার নির্দেশ করার জন্য একটি কমিটি করে দেয়। কমিটি অনেক চিন্তা ভাবনা করে বলে যে, প্রচলিত সিলেবাসে ইসলামী উপদেশ আগের তুলনায় কিছু বাড়িয়ে দিলেই শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান নাস্তিকতা ও প্রকৃতিবাদের সয়লাবের মুখে প্রতিরোধ সৃষ্টি করা সম্ভব।
মাওলানা মওদূদী (রহ.) ১৯৩৬ সালের আগস্ট সংখ্যা তরজমানুল কোরআনে এ অবস্থার প্রতিকারের নিমিত্তে গৃহীত কর্মপন্থাটি পর্যালোচনা করেন এবং তখনকার প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক ত্রুটির প্রতি অঙ্গুলি নির্দেশ করেন।
মওদূদী (রহ.) বলেন- মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তার বিগত এপ্রিল ১৯৩৬ সালের বার্ষিক অধিবেশনে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার প্রতি দৃষ্টি দিয়েছেন যা অনেকদিন থেকেই দৃষ্টি দেওয়ার মত গুরুত্ববহ। অর্থাৎ দ্বীনিয়াত বা ইসলামী বিষয়গুলোর ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাদান পদ্ধতি সংশোধন এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে প্রকৃত ইসলামী জ্ঞান ও ভাবধারায় স্ফুরণ।
“স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে, আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা শুধু ত্রুটিপূর্ণই নয় বরং স্যার সাইয়েদ আহমদ খান, মুহসিনুল মুলক, ভিকারুল মুলক এবং অন্যান্য ব্যক্তিবর্গ যেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হাসিলের জন্য একটি মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন এবং যে জন্য মুসলমানরা তাদের সামর্থ্যের চাইতেও বেশি উৎসাহের সাথে এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি নির্মাণকে স্বাগত জানিয়েছিল, সেসব উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের উল্টা ফলাফলই এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে। পরামর্শ দিতে গিয়ে মাওলানা মওদূদী (রহ.) বলেন, “আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়কে যদি সত্যিই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত করতে হয় তাহলে সর্বপ্রথম পাশ্চাত্য জ্ঞান-বিজ্ঞান হুবহু শিক্ষাদান প্রক্রিয়া সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করুন।
শিক্ষার্থীদের মন মগজে ইসলামের প্রকৃত স্পিরিট এবং ধ্যান ধারণা সৃষ্টি করতে হবে। এ জন্য কোথাও আপনি রেডিমেড সিলেবাস পাবেন না। সবকিছু একেবারে নতুনভাবে তৈরি করতে হবে। …..অর্থনীতি, ইতিহাস, দর্শন সব বিষয়কে ইসলামের আলোকে বিন্যাস করে নিতে হবে। শিক্ষা স্টাফের মধ্যে যেসব নাস্তিক ও ফিরিঙ্গিমনা শিক্ষক অনুপ্রবেশ করেছে তাদেরকে সরিয়ে দিতে হবে। সৌভাগ্যবশত ভারতবর্ষে এমন একদল লোক তৈরি হয়েছে যারা আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানে অভিজ্ঞ হওয়ার পাশাপাশি মন-মস্তিষ্ক ও ধ্যান ধারণার ক্ষেত্রেও পুরোপুরি মুসলমান। এসব ছড়ানো ছিটানো লোকদের একত্রিত করে বিশ্ববিদ্যালয়টি নতুন করে করতে হবে।
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান নামক স্বাধীন মুসলিম আবাসভূমি প্রতিষ্ঠিত হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা কী ধরনের হবে। দীর্ঘ ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সময় যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু ছিল তার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য ছিল একদল দোভাষী কেরানি বা অকর্মণ্য মানুষ তৈরি করা। ফলে সেই একই শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে স্বাধীন দেশের উপযোগী একদল সুনাগরিক যারা দেশপ্রেম ও ইসলামের আলোকে একটি নতুন দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে এগিয়ে নিতে পারবে তা গড়ে তোলা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। ১৯৫২ সালের ২৫ শে ফেব্রুয়ারি লাহোরের বরকত আলী মোহামেডান হলে ছাত্রদের এক সমাবেশে মাওলানা মওদূদী বলেন “দেশে কী ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা চালু হওয়া দরকার সে প্রশ্ন একটা মুসলিম দেশের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ অবান্তর। এটা অবিসংবাদিত ব্যাপার যে, একটা মুসলিম দেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থাই চালু হওয়া উচিত। তবে কিভাবে ও কী পন্থায় ইসলামী রূপ দেয়া যায়, কেবলমাত্র সেই বিষয় নিয়েই চিন্তাভাবনা করা দরকার।”
আর এজন্য প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার দোষত্রুটি ও সীমাবদ্ধতাগুলো উপলব্ধি করে তার সংশোধনের জন্য প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন তিনি। এ পর্যায়ে তৎকালীন পাকিস্তানের রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি বিষয়ে কয়েকটি কথা বলা জরুরি।
এক. ১৯৪৭ এ স্বাধীন হওয়া ১০০০ মাইলের ব্যবধানে অবস্থিত পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের ঐক্যবিনাশী ঘটনাগুলো একের পর এক ঘটতে থাকে এবং জাতীয় রাজনীতিতেও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। দেশের রাষ্ট্রভাষাকে কেন্দ্র করে সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিগণের এক তরফা ও দাম্ভিকতাপূর্ণ আচরণ একটি ভাষাভিত্তিক বিরোধিতা জন্ম দেয়। এখান থেকেই জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন। যার ধারাবাহিকতায় ’৫২-এর একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক ঘটনা। রক্তাক্ত এই ঘটনা মোড় ঘুরিয়ে দেয় পাকিস্তানের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও শিক্ষার।
দুই. ১৯০ বছরের চলে আসা শিক্ষাব্যবস্থা, স্বাধীনতা আন্দোলনের পাশাপাশি রুশ সমাজ বিপ্লব ও তাদের পরিচালিত “বিল্পব রফতানি” কর্মসূচির ধাক্কা বিভিন্ন দেশের মতো এতদঞ্চলেও পড়ে। বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র এমনকি স্কুলপড়–য়া ছাত্র-ছাত্রীদের একটি বড় অংশ ধর্মবিদ্বেষী, ধর্মীয় রাজনীতির ব্যাপারে অসহিষ্ণু হয়ে গড়ে ওঠে।
তিন. মেধাবী ছাত্রদের মাঝে এই প্রবণতার কারণে শিক্ষকদের বড় একটি অংশ আসতো এই বামধারার ছাত্রছাত্রীদের মধ্য থেকে। এরাই বিভিন্ন পর্যায়ে অধ্যয়নরত ছাত্র-ছাত্রীদের বাম রাজনীতিতে দীক্ষা দিতো। এ অবস্থায় তৎকালীন পাকিস্তানকে ইসলামী শিক্ষা, তাহজিব, তমদ্দুন ও ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন তুলে ধরা অপরিহার্য ছিলো। মাওলানা মওদূদী প্রতিষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি ছাত্রদের মাঝে ইসলামী চিন্তা, চরিত্র ও সংস্কৃতি সম্পন্ন আগামী প্রজন্ম তৈরির জন্য ১৯৪৮ সালে গড়ে ওঠে ছাত্রসংগঠন ইসলামী জমিয়তে তালাবা পাকিস্তান, যা পরবর্তীকালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে, ইসলামী ছাত্রসংঘ, নামে কাজ শুরু করে।
ছাত্রসংগঠনের একটি অন্যতম কর্মসূচি ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। ইসলামী শিক্ষা ও ছাত্র অধিকার সংক্রান্ত।
মূলত ছাত্রদের মাঝে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা। ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের দাবি উত্থাপন করার কথাটি ইতঃপূর্বে কোন সংগঠনের পক্ষ থেকে আসেনি। পাাকিস্তানের স্বাধীনতা যে মুসলিম লীগের নেতৃত্বে হাসিল হয় তারা এ বিষয়ে ছিলেন নির্বিকার। যার কারণে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর শিক্ষাব্যবস্থাকে ইসলামী শিক্ষায় রূপান্তরের কোন কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
এ জন্য মাওলানা মওদূদী ধাপে ধাপে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তনের যৌক্তিক দাবি এবং এ ব্যাপারে সরকার ও জনগণের করণীয় বিষয়ে বক্তব্য ও লেখনীয় মাধ্যমে তুলে ধরতে থাকেন। ’৪২-এর সেই বক্তৃতায় তিনি প্রাক-উপনিবেশ আমলের শিক্ষাব্যবস্থা যা তুলনামূলকভাবে ইসলামী ভাবধারা সম্পন্ন ছিল, যার আধুনিক সংস্করণ হওয়া দরকার ছিলো। ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা যা সেক্যুলার মনমস্তিষ্ক সম্পন্ন; দোভাষী কেরানি ও চাকুরে তৈরির কারখানা ছিলো। যা স্বাধীন দেশের উপযোগী নাগরিক তৈরির সম্পূর্ণ অনুপযোগী; যা বাহ্যিকভাবে আধুনিক, খোদাহীন, নৈতিকতা বিবর্জিত, অনেকটা আধুনিকতার সাথে ধর্মের লেজুড় জুড়ে দেয়া কিম্ভূতকিমাকার এক শিক্ষাব্যবস্থা বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি এর সমাধান হিসেবে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ কর্তৃক গৃহীত ভুল পদক্ষেপের গঠনমূলক আলোচনা করে পাকিস্তানও যাতে একই ভুল না করে তার জন্য একটি বৈপ্লবিক পদক্ষেপের প্রয়োজন তুলে ধরে শিক্ষার উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নির্ধারণ, ধর্ম ও দুনিয়াদারির পার্থক্য ঘুচিয়ে চরিত্র গঠন হতে পারে এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থার পরামর্শ দেন।
মাওলানা শিক্ষাব্যবস্থার স্তর, বিন্যাসের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা, বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের শিক্ষা এই চার স্তরের শিক্ষা সুপারিশ করেন। শিক্ষাপাঠক্রম হিসেবে তিনি প্রতিটি বিষয়ে প্রচলিত ও পাশ্চাত্য শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষাকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব করেন।
ধর্মীয় ও দুনিয়াবি শিক্ষার আলাদা আলাদা (মাদ্রাসা ও আধুনিক) ব্যবস্থার বিলুপ্তি সাধন করে একটি একক ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মোটামুটি প্রস্তাবনা তুলে ধরেন তিনি।
পাকিস্তান আমলে শিক্ষা আন্দোলন ও শিক্ষা কমিশনসমূহ
মুসলিম লীগের নেতৃত্বে গড়ে তোলা পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারসমূহের দেশ গঠন ও জাতি গঠনের কর্মসূচির চাইতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক লড়াই, ক্ষমতার হাতবদল, অন্তঃ ও আন্তঃদলীয় কোন্দল বেশি স্থান লাভ করেছে। পাকিস্তানের ইতিহাসে ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, বিভিন্ন সময়ে তৈরি শিক্ষা কমিশন, কমিশনের সুপারিশ, তার প্রেক্ষিতে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া, ’৬৬-এর ছয় দফা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ’৭০-এর নির্বাচন, ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা খুবই উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
কলেবর দীর্ঘ হয়ে যাবে বিধায় আমি ব্রিটিশ আমলে শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব দাবি-দাওয়া ও তার প্রেক্ষিতে সংস্কার হয়েছে সে আলোচনার অবতারণা থেকে বিরত থাকাটাই শ্রেয় মনে করছি।
ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন সময়ে যেসব অর্ডিন্যান্স কমিশন গঠন করা হয় তা নিম্নরূপ :
এক. পূর্ববাংলা শিক্ষা অর্ডিন্যান্স : ১৯৪৭
নতুন দেশের জন্য স্বকীয় আদর্শ ও স্বকীয়তার আলোকে শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের জন্য তৎকালীন সরকার একটি অর্ডিন্যান্স জারি করেন যার নাম ছিল ঊধংঃ ইবহমধষ বফঁপধঃরড়হধষ ড়ৎফরহধহপব ১৯৪৭. এর ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাগপাশ থেকে মুক্তি লাভ করে পূর্ব বাংলার সব ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনুমোদন ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়। এ অর্ডিন্যান্স বলে ইস্ট বেঙ্গল সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড স্থাপন করা হয়। এ অর্ডিন্যান্সের মাধ্যমে মাওলানা আকরম খাঁর সভাপতিত্বে (১৯৪৭-৫১) পূর্ব-পাকিস্তান অঞ্চলের শিক্ষা সংস্কারের লক্ষ্যে ইস্টবেঙ্গল এডুকেশনাল সিস্টেম রিকমেন্ডেশন কমিটি পূর্ববঙ্গের সরকারকে অনেকগুলো প্রস্তাব পেশ করে। দুঃখের বিষয় হলো কমিটির কোনো সুপারিশই তদানীন্তন সরকার কার্যকর করেননি।
দুই. শিক্ষা সংস্কার কমিশন : ১৯৫৭
পূর্ব পাকিস্তান সরকারের প্রধানমন্ত্রী আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে এডুকেশনাল রিফর্মস কমিশন ইস্ট পাকিস্তান (১৯৫৭) নামে একটি কমিশন গঠন করেন।
কমিশনের সুপারিশ ছিল –
১. ৬ হতে ১৪ বছর বয়স্ক বালক-বালিকাদের সার্বজনীন বাধ্যতামূলক অবৈতনিক শিক্ষা দান।
২. প্রাথমিক শিক্ষা শেষে ৬ বছর মেয়াদি মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর নির্ণয় ও তিন বছর মেয়াদি ডিগ্রি প্রদানকারী কলেজ স্থাপন।
৩. সাধারণ ও মাদ্রাসা শিক্ষার সমন্বয় সাধন।
৪. মাদ্রাসা শিক্ষকদেরকে ট্রেনিং ইনস্টিটিউটগুলোতে প্রশিক্ষণ দান।
৫. ওল্ড স্কিম মাদ্রাসায় ইংরেজি বাংলা ও অংক কোর্স চালু করার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়নের জন্য মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে অধ্যয়ন করার সুযোগ প্রদান।
৬. মিসরের ইসলামী শিক্ষার অনুরূপ মাদ্রাসা আলিয়ার শিক্ষা কোর্স চালু করা।
(উল্লেখ্য একমাত্র মাদ্রাসা পদ্ধতির সংশোধন ছাড়া অন্য কোনো সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়নি।)
তিন. জাতীয় শিক্ষা কমিশন- ১৯৫৮
পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের শিক্ষা সচিব এস এম শরীফকে সভাপতি করে ১৯৫৮ সালে ‘কমিশন অফ ন্যাশনাল এডুকেশন’ নামে একটি কমিশন গঠন করা হয়।
শরিফ কমিশন শিক্ষাব্যবস্থাকে নিম্নরূপে ঢেলে সাজানোর প্রস্তাব দেন-
ক. প্রাথমিক শিক্ষার স্তর : পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত
খ. অন্তর্বর্তী (ষরঃঃষব) স্তর : ষষ্ঠ হতে অষ্টম শ্রেণি
গ. মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর : নবম-দশম শ্রেণি
ঘ. উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষার স্তর : একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি
শিক্ষার্থীদের মন-মানসিকতা ঝোঁক-প্রবণতার নিরিখে নবম শ্রেণির বিজ্ঞান বাণিজ্য কারিগরি অর্থনীতি কৃষি বিভাগ ইত্যাদি বিভিন্নমুখী শিক্ষা কোর্স ও এ কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী চালু করা হয়।
ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে শরিফ কমিশন
– প্রথম শ্রেণী থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা মুসলমানদের জন্য অত্যাবশ্যক করা।
– নবম-দশম শ্রেণীতে এ শিক্ষাকে ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করা।
– ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য এ বিষয়টিকে একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে সন্নিবেশ করা। কমিশন ‘ইসলামে’ জীবন ও মূল্যবোধকে বাস্তবভাবে প্রতিফলনের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদেরকে ইসলামসহ অন্যান্য ধর্মের তুলনামূলক ইতিহাস পাঠ করার উপর গুরুত্বারোপ করে। এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশের পর (১৯৬২ সাল) পূর্ব পাকিস্তানে ছাত্র আন্দোলন শুরু হয়। ফলে এর সুপারিশসমূহ পুরোমাত্রায় বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও বলা হয় পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষা বিষয়ে যথাযথ সুপারিশ না থাকায় এ আন্দোলন ছিল। সকলের জানা আছে মূলত বামপন্থী সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন এ কমিশনের সুপারিশে ইসলামী সুপারিশসমূহের প্রতিবাদ ও আন্দোলন গড়ে তোলে।
চার. ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন (১৯৬৩-৬৪):
মাদ্রাসা শিক্ষার উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে ১৯৬৩-৬৪ সালে ‘ইসলামিক আরবি ইউনিভার্সিটি কমিশন’ গঠন করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ডক্টর এস এম হোসেনকে চেয়ারম্যান করে।
হোসেন কমিশনের সুপারিশ ছিল-
১. মাদ্রাসার ইসলামী শিক্ষাকে অধিকতর সম্প্রসারণের জন্য আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে ইসলামের মৌলিক শিক্ষাদান।
২. জাতীয় শিক্ষা কমিশনের সুপারিশকৃত পদ্ধতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদেরকে উপযুক্ত চাকরি বা কর্মসংস্থান ও প্রয়োজনীয় নাগরিক হওয়ার ক্ষেত্রে বাধা বিপত্তি দূরীকরণ।
৩. ইসলামিয়াত বিষয়ে গবেষণা পরিচালনার জন্য ইসলামিক জ্ঞান অনুশীলনের সুবিধাদি নিশ্চিত করণ।
৪. বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে উক্ত উদ্দেশ্যসমূহ বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। কিন্তু আগের অধিকাংশ কমিশনের সুপারিশের মতো এ কমিশনের সুপারিশসমূহ কার্যকর হয়নি।
পাঁচ. হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন (১৯৬৬) :
১৯৬৪-এর ১৫ সেপ্টেম্বর কমিটি গঠন, ১৯৬৫ সালে তথ্য সংগ্রহ এবং ১৯৬৬ সালে এ কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশিত হয়।
এ কমিশন যেসব বিষয়ে সুপারিশ করে তা হলো-
১. মাতৃভাষা হবে শিক্ষার মাধ্যম।
২. চিকিৎসা, শিক্ষা, কৃষি, নারী শিক্ষা, মাদ্রাসা, ভোকেশনাল ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উন্নয়ন।
৩. বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট পুনর্গঠন।
এ কমিশন ছিল মূলত ছাত্রসমস্যা ও ছাত্রকল্যাণ সম্পর্কিত। এ ছাড়া ছিল-
ক. আট বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা।
খ. টএঈ প্রতিষ্ঠা।
গ. স্কুলে মহিলা শিক্ষিকা নিয়োগ।
এর কিছু সুপারিশ বাস্তবায়িত হয়।
ছয়. নূর খানের নয়া শিক্ষানীতি (১৯৬৯) :
পাকিস্তান সরকার পূর্বেকার কমিশন সমূহের ব্যর্থতার প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯ সালে নিউ এডুকেশন পলিসি বা নতুন শিক্ষানীতি ঘোষণা করে। এ নয়া শিক্ষানীতির প্রণেতা ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত এয়ার ভাইস মার্শাল এম নূর খান। এ কমিশনের সুপারিশ ছিল নিম্নরূপ:
১. সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা।
২. মাধ্যমিক শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও বিভিন্ন ধারার প্রয়োজনীয়তার প্রতি পুনর্বার গুরুত্বারোপ।
৩. বিজ্ঞান ও প্রকৌশল শিক্ষার উৎকর্ষ সাধন।
৪. বিজ্ঞান ও কলা বিভাগের শিক্ষার ভারসাম্য রক্ষা।
৫. দশম শ্রেণী পর্যন্ত ইসলামিয়াত বাধ্যতামূলক করা।
৬. বিদেশি মিশনারি স্কুলসমূহকে জাতীয়করণ করা।
লক্ষণীয় যে এ কমিশনও পাকিস্তানের জন্য একটি সেক্যুলার শিক্ষানীতিই সুপারিশ করল। অপর দিকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত ইসলামিয়াত বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করা বামপন্থী সংগঠনসমূহ এর বিরোধিতা করতে থাকে। এ সময় ইসলামী ছাত্রসংঘ পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি ইসলামের দাবিতে সভা, সমাবেশ, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম আয়োজন করে। এরই এক পর্যায়ে ১৯৬৯ সালের ১২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ঘওচঅ-য় আয়োজিত সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মেধাবী ছাত্র আবদুল মালেক এর পক্ষে বক্তব্য দিলে ছাত্রলীগ ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন নেতৃবৃন্দ তার ওপর চড়াও হয় এবং রেসকোর্স ময়দানে তাকে আঘাতের পর আঘাত হেনে রক্তাক্ত ও অজ্ঞান করে ফেলে যায়। ১৫ আগস্ট এই মেধাবী ছাত্রনেতা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সেই থেকে এ দেশের ইসলামী আন্দোলন ১৫ই আগস্টকে শহীদ আবদুল মালেকের স্মৃতিবিজড়িত ইসলামী শিক্ষা দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। মূলত আবদুল মালেক উপমহাদেশের ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ আর তার শাহাদাতের ঘটনা একটি ঐতিহাসিক মাইলফলক। (চলবে)

লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply