ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন উত্তর-উপনিবেশ অধ্যায় -আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

[শেষ কিস্তি]
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর কালে গঠিত
শিক্ষা কমিশনসমূহ
১৯৭০ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী ১৯৭২ সালের ২৭ জুলাই জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. কুদরাত-ই-খুদার নেতৃত্বে গঠিত কমিশন ১৯৭৩ সালে দেশ বিদেশে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অর্জনের বিনিময় শেষে ১৯৭৪ সালের ৩০ মে রিপোর্ট প্রকাশ করে। এই রিপোর্টের গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো নিম্নরূপ :
১. প্রাথমিক শিক্ষা ৮ বছর করে তা বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা।
২. মাধ্যমিক শিক্ষা হবে নবম থেকে ¯œাতকের পূর্ব পর্যন্ত।
৩. খুলনায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।
৪. কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষার উপর জোর প্রদান করা হয়।
৫. তিন বছরের ডিগ্রি পাস কোর্স এবং চার বছরের অনার্স ডিগ্রি কোর্স।
৬. খণ্ডকালীন শিক্ষা প্রসারের জন্য উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুরোধ প্রকল্প চালু করা।
৭. ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার পরিবর্তে সেক্যুলার শিক্ষার জন্য বিতর্কিত কিছু সুপারিশ করা হয়।
৮. প্রথম থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষার পরিবর্তে নৈতিক শিক্ষার সুপারিশ করা হয়।
৯. মাদ্রাসা শিক্ষা সম্বন্ধে কিছুই বলা হয়নি।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সংঘটিত নৃশংস হত্যাকাণ্ড ও ক্ষমতার পালাবদলের কারণেই কমিশনের সুপারিশ কোন কাজে আসেনি।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটির রিপোর্ট
১৯৭৫ সালে সরকার কমিশনের প্রস্তাব ও সুপারিশ বিচার-বিশ্লেষণে এ কমিটি গঠন করা হয়। কমিটিকে আধুনিক বিশ্বের সাথে সমন্বয় করে প্রস্তাব প্রদানের জন্য নির্দেশ দেয়া হয়। এ কমিটি ২০০১ পৃষ্ঠার এক বিশাল রিপোর্ট প্রদান করে। সরকার সেসব বিবেচনা করে বাস্তবায়নের জন্য পদক্ষেপ নেন। এই কমিটি গঠিত সাব-কমিটি সমূহের রিপোর্ট প্রদান করে এবং কমিটিতে তা গৃহীত হয়।

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় স্কিম (ড. এম এ বারী কমিটি) ১৯৭৭
বিদ্যমান দুই ধরনের শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠী বিশেষ করে মুসলিমগণ পরস্পরবিরোধী মনোভাব নিয়ে গড়ে উঠেছে। তাই ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একদল উচ্চ শিক্ষিত মানুষ তৈরির উপায় খুঁজে দেখার জন্য এ কমিটি গঠন করা হয়।
বারী কমিটি ১৯৭৭ সালে মক্কায় অনুষ্ঠিত ইসলামী শিক্ষা সম্মেলনের প্রস্তাবের আলোকে একটি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সুপারিশ করেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালের ২৩ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। যদিও জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে সরিয়ে দিয়ে জেনারেল এরশাদ ক্ষমতা দখল করার পর এ বিশ্ববিদ্যালয়টি গাজীপুর স্থানান্তরিত করেন। সাত্তার-পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে এরশাদ সাহেবের অন্য কারণ দেখিয়ে সেটাকে তার পুরনো জায়গায় ফিরিয়ে নেন। এটি একটি দীর্ঘ ইতিহাস ও ষড়যন্ত্র যা এই ছোট্ট লেখায় বলা সম্ভব নয়।
অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি ১৯৭৯
একটি অন্তর্বর্তীকালীন শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য সরকার জাতীয় শিক্ষা কমিটি গঠন করে শিক্ষামন্ত্রী কাজী জাফর আহমদের সভাপতিত্বে কমিটির সুপারিশ মাধ্যমিক স্তরের কথা বলে।
১. নিম্ন মাধ্যমিক স্তর – ৩ বছর
২. মাধ্যমিক স্তর – ২ বছর
৩. উচ্চমাধ্যমিক স্তর – ২ বছর
তিনটি স্তরে স্তরেই প্রান্তিক পরীক্ষা হবে বলে সিদ্ধান্ত হয়।

বাংলাদেশ জাতীয় শিক্ষা কমিশন (মফিজ উদ্দিন)
রিপোর্ট, ১৯৮৮ ১৯৮৭ সালের ২৩ এপ্রিল সরকার শিক্ষা ক্ষেত্রে বিরাজমান অবস্থা ও বর্তমান পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে সকল স্তর সম্পর্কে যথার্থ সুপারিশ করার জন্য মফিজ উদ্দিনের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করে। এ কমিশনের উল্লেখযোগ্য সুপারিশগুলো ছিল নিম্নরূপ:
১. মাধ্যমিক শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।
২. ২০০০ সালের মধ্যে ৮ বছর মেয়াদি প্রাথমিক শিক্ষা চালু করা।
৩. সহকারী প্রধান শিক্ষকের পদ সৃষ্টি করা।
৪. মাদ্রাসা শিক্ষাকে যুগোপযোগী উৎপাদনমুখী করা।
এ কমিটির সুপারিশগুলোও তেমন একটা বাস্তবায়িত হয়নি।

মাদ্রাসা শিক্ষা কমিটি (ড. এম এ বারী) কমিটি; ১৯৮৯
মাদ্রাসা শিক্ষার শিক্ষাক্রমে পাঠ্যপুস্তক পাঠদান, শিক্ষা পদ্ধতি, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ সুপারিশ এবং শিক্ষক নিয়োগ, দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও বিভিন্ন স্তরের সাথে সাধারণ শিক্ষার সমতা নির্ণয় করার সুপারিশ প্রদানের জন্য ১৯৮৯ সালে ড. এম এ বারীকে চেয়ারম্যান করে এ কমিটি গঠন করে। কমিটি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বোর্ডের চেয়ারম্যানবৃন্দ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সংগঠিত হয়। এ কমিটি বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেও তা নিয়ে বিশ্লেষণ করে যেসব সুপারিশ করেন তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:-
১. ইবতেদায়ি শিক্ষাক্রম এমন হতে হবে যাতে ইবতেদায়ি পাস করে সাধারণ শিক্ষার ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হতে পারে।
২. প্রাথমিক শিক্ষার ন্যায় ইবতেদায়িকে সুযোগ দিতে হবে।
৩. আলিমের তিনটি বিভাগের সাথে বাণিজ্য বিভাগ চালু করা।
৪. শিক্ষকদের মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ (Refreshes Training) প্রদান।
৫. কামিল উত্তীর্ণদের M Phil, M.S ও Ph. D সহ মৌলিক গবেষণার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি (১৯৯৭)
একটি পূর্ণাঙ্গ ও সুষ্ঠু শিক্ষানীতি তৈরির উদ্দেশ্যে এবং কুদরত-ই খুদা শিক্ষানীতির ভিত্তিতে বাস্তব, গণমুখী ও যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়নের জন্য সরকার ১৯৫৭ সালে প্রফেসর শামসুল হকের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করে। কমিটি শিক্ষার বিভিন্ন স্তর ও বিভাগের জন্য উপ-কমিটি গঠন করে। সরকারও দেশীয় দর্শনকে সামনে রেখে স্তর ও বিভাগভিত্তিক সুপারিশ পেশ করে। শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য স্থির করা হয়। এ কমিটি কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের অধিকাংশ সুপারিশ অনেকটা হুবহু অনুসরণ করে।
১. প্রাথমিক স্তর ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত হবে এবং তা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক হবে।
২. মাধ্যমিক স্তর হবে নবম-দশম শ্রেণি পর্যন্ত।
এ ছাড়া এ কমিটির উল্লেখযোগ্য সুপারিশ হলো:-
৩. মাধ্যমিক স্তর (সাধারণ শিক্ষায়) ৪ বছর হলে মাদ্রাসার জন্যও দাখিল+আলিম ২+২ = ৪ বছর রাখার সুপারিশ করা হয়।
৪. বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি শিক্ষার উপর জোর দিতে হবে। ইন্টারনেট ব্যবহারের অগ্রগম্যতা থাকতে হবে।
৫. নারী শিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি করতে হবে।
৬. শিক্ষার সকল ক্ষেত্রে মহিলাদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
৭. প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সামরিক বিজ্ঞান বিষয়কে ঐচ্ছিক হিসেবে খুলতে হবে।
৯. ৮ম শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষা হবে।
১০. দশম শ্রেণি শেষে একটি পাবলিক পরীক্ষা থাকবে যার লক্ষ্য হবে মাধ্যমিক পরীক্ষা প্রথম পর্ব, মাধ্যমিক স্তরের চূড়ান্ত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ শ্রেণির শেষে। দুই পরীক্ষার ফলাফল একত্র করে চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে।
এই কমিটির সুপারিশ জাতীয় সংসদে আলোচনা করে গৃহীত হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

জাতীয় শিক্ষা কমিশন ২০০৩ (মনিরুজ্জামান মিঞা)
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর মনিরুজ্জামান মিঞাকে প্রধান করে এ কমিশন গঠিত হয় জানুয়ারি ২০০৩-এ। ২৪ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিশন ২০০৪ সালে ৩১ শে মার্চ রিপোর্ট প্রদান করে।
এ কমিশনের প্রধান প্রধান সুপারিশ ছিল:-
শিক্ষার মূল লক্ষ্য স্থির করা হয়; সমগ্র জনগোষ্ঠীকে স্বল্প সময়ের মধ্যে সম্পদে পরিণত করা। প্রাথমিক শিক্ষার ২২টি উদ্দেশ্য, মাধ্যমিক শিক্ষার ৯টি লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির ১০টি লক্ষ্য উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হলেও এর ভেতর নৈতিক শিক্ষা প্রদানের কথা আসেনি। মাদ্রাসা শিক্ষারও সুস্পষ্ট লক্ষ্য উদ্দেশ্য উল্লেখ করা হয়।
শিক্ষার ৩টি ধারার কথা উল্লেখ করা হয়; ক. সাধারণ শিক্ষা খ. মাদ্রাসা শিক্ষা গ. বৃত্তিমূলক শিক্ষা। তবে প্রাথমিক স্তরে বৃত্তিমূলক শিক্ষার পরিবর্তে ইংরেজি মাধ্যমিক শিক্ষাকে একটি ধারা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান ৫টি স্তরকে বহাল রাখার পরাপর্শ দেয়া হয়। যথাক্রমে-
প্রাথমিক- ৫ বছর
নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা- ৩ বছর
মাধ্যমিক শিক্ষা- ২ বছর
উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা- ২ বছর
উচ্চশিক্ষা- ৩ থেকে ৫ বছর
মাদ্রাসা শিক্ষার ও ৫টি স্তর:
ইবতেদায়ি- প্রাথমিক স্তর
দাখিল- মাধ্যমিক স্তর
আলিম- উচ্চমাধ্যমিক স্তর
ফাজিল- ¯œাতক স্তর
কামিল- মাস্টার্স
বিভিন্ন শ্রেণির পর্ব নির্ধারণ করা হয়।
উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণিতে ৭টি শাখাতেই বাংলা, ইংরেজি ও কম্পিউটার শিক্ষা আবশ্যিক থাকবে। মাদ্রাসা শিক্ষার ইবতেদায়ি, দাখিল ও আলিম শ্রেণির জন্য পৃথকভাবে কোন পাঠ্য বিষয়ের উল্লেখ নেই।
সাধারণ ও মাধ্যমিক শিক্ষায় আবশ্যিক শিক্ষাক্রম (Course curriculum) একই রকম রাখার প্রস্তাব করা হয় আর তা হলো: বাংলা, ইংরেজি ও গণিত।
ধর্মীয়, শিক্ষার ক্ষেত্রে সুপারিশ করা হয় সে দ্বিতীয় থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত ধর্মীয় শিক্ষা সূচনা হবে, তবে কোন পাঠ্যবই এবং আনুষ্ঠানিক কোন পরীক্ষা হবে না। ৩য়-৫ম শ্রেণিতে ধর্ম শিক্ষা থাকবে তবে মৌখিক পরীক্ষা হবে। ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম পর্যন্ত ১০০ ন্যায়ের ধর্মশিক্ষা আবশ্যিক থাকবে। উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ৭টি শাখার একটি হবে ধর্ম শিক্ষা শাখা। অন্যান্য শাখার নৈতিক শিক্ষার জন্য ধর্ম শিক্ষাকে আবশ্যিক করা হয়নি। সকল শাখার জন্য বাংলা, ইংরেজি ও কম্পিউটারকে আবশ্যিক করা হয়। পেশাগত শিক্ষায় কৃষি, প্রকৌশল, চিকিৎসা নৈতিক শিক্ষা স্থানের কোন প্রস্তাব নেই।

১ম শ্রেণি হতে সূচনা হয়ে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত ইংরেজি শিক্ষা অব্যাহতি থাকবে। ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণি পর্যন্ত ২০০ নম্বরের ইংরেজি থাকবে।
৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে ১০০ নম্বরে ঐচ্ছিক আরবি থাকবে। উল্লেখ্য, ১২টি ঐচ্ছিক বিষয় থেকে যে কোন একটি নেয়ার সুযোগ থাকবে।
ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষা নিয়ে আলাদা আলোচনা করা হয়নি বা ত্রুটির বিভিন্ন বিষয়কে বিবেচনায় আল হয়নিও সংজ্ঞায়িত করা হয়নি।

জাতীয় শিক্ষানীতি কমিটি (অধ্যাপক কবীর চৌধুরী) ২০১০
বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ০৬ এপ্রিল ২০০৯-এ জাতীয় অধ্যাপক কবীর চৌধুরীকে চেয়ারম্যান করে ১৮ সদস্য বিশিষ্ট জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি গঠন করা হয়।
কমিটি ২০১০ সালে ৭৯ পৃষ্ঠাব্যাপী একটি রিপোর্ট প্রদান করে যা সংসদের অনুমোদন পাওয়ার পর বর্তমানে কার্যকর রয়েছে। পাকিস্তান আমলে শিক্ষানীতি বা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে যতগুলি কমিশন গঠন করা হলো সবগুলো কমিশনই কমবেশি শিক্ষা সংস্কারের সুপারিশ করেছে। কিন্তু এক অজানা কারণে কোন শিক্ষা কমিশনের সুপারিশই পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি। অজানা কারণটি দুর্বোধ্য নয়। মূলত ক্ষমতা বদলের সাথে সাথে জাতীয় নীতি ভ্রষ্টতা।

তুলনামূলকভাবে ভারতে শিক্ষাব্যবস্থার ধারাবাহিকতা, স্থিরতা অনেক বেশি। একইভাবে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর যে কয়টি কমিশন হয়েছে তাদের সুপারিশগুলোও সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
একমাত্র ড. কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশনের সুপারিশসমূহ অনুকূল সরকারের সময় আবারও বিবেচনায় আনা হয় এবং অনেকাংশে বাস্তবায়নের মুখ দেখে।
বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনে একটি ক্ষুদ্র পর্যালোচনা
এই শিক্ষা আন্দোলন বিশেষ করে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের দুই দিক থেকে বিবেচনা করা যায়। একটি হলো সরকারের কাছে বিভিন্ন কমিশনের সময় দাবি দাওয়া যা মূলত এসেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির, মাদ্রাসা ছাত্র আন্দোলন পরিষদ ও অন্যান্য ইসলামী রাজনৈতিক ও ছাত্রসংগঠনের পক্ষ থেকে। আর অপরটি হলো শিক্ষাব্যবস্থার প্রায়োগিক পরিবর্তন, বাস্তবায়ন ও সংস্কারের লক্ষ্যে বেসরকারি উদ্যোগ।

বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির তার চতুর্থ দফা কর্মসূচি রেখেছে শিক্ষা আন্দোলন ও ছাত্র অধিকার রক্ষা শিরোনামে। শিবিরের জন্মের পর থেকেই শিবির একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষানীতি ও তার আলোকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ দলীয় লেজুড়বৃত্তিভিত্তিক সন্ত্রাস ও পেশিনির্ভর ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তে মেধাবীদের নেতৃত্বের চেষ্টা করে আসছে। এজন্য ছাত্রশিবির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহে নিরপেক্ষ ছাত্র সংসদ নির্বাচন ও শিক্ষার অনুকূল পরিবেশের দাবি জানিয়ে আসছে। শিবিরে প্রতিটি পত্রিকা ম্যাগাজিন, বুলেটিন, দেয়াল লিখনসহ সর্বত্র এ দাবির পক্ষে সোচ্চার আওয়াজ তোলা হয়েছে।
শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামী দৃষ্টিকোণ, সংস্কার, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তন ও বাস্তবায়নের দাবিতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য শিবির দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, বরেণ্য বুদ্ধিজীবী ও ইসলামী চিন্তাবিদদের নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে সেমিনারে আয়োজন করে। শিবিরের প্রথম জাতীয় শিক্ষা সেমিনার ছিল ১৯৭৮ সালে সেখানে সে পর্যন্ত গঠিত শিক্ষা কমিশনসমূহের সুপারিশ নিয়ে আলোচনা হয়। সুপারিশমালা তৈরি করা হয়, স্মারক প্রকাশ করা হয়। ঠিক তার ১০ বছর পর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট হলে কি জাতীয় শিক্ষা সেমিনার আয়োজন করা হয় ১৯৮৮ সালের ২৬ ও ২৭ আগস্ট সে সেমিনারে প্রফেসর সৈয়দ আলী আহসান, অধ্যাপক দেওয়ান মোহাম্মদ আজরফসহ জাতীয় ব্যক্তিত্বগণ অংশগ্রহণ করেন। এ সেমিনারে ১৯৮৭-এর শিক্ষা কমিশনের সুপারিশ ও রিপোর্টের উপর পর্যালোচনা হয় ও কতিপয় সুপারিশ গ্রহণ করা হয়। এর পরের জাতীয় সেমিনারটি শিবির আয়োজন করে জাতীয় প্রেস ক্লাব মিলনায়তনে ১৯৯৭ সালের ১৭ ও ১৮ আগস্ট। সর্বশেষ জাতীয় সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয় ২০০৪ সালের ১৮ ও ১৯ শে আগস্ট বিসিআইসি মিলনায়তনে “শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সেমিনার ২০০৪” শিরোনামে।
প্রতিটি জাতীয় সেমিনারেই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অধিশেনে দেশবরেণ্য শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী ও ইসলামী চিন্তাবিদগণ প্রবন্ধ পাঠ করেন, আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন, স্মারক প্রবন্ধ লেখেন এবং পরবর্র্তীতে জাতীয় পত্রপত্রিকার ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে কলম ধরেন। ১৯৭৮ সালের সেমিনারের পক্ষ থেকে মোট ১৩ দফা সুপারিশ গ্রহণ করা হয় যার মধ্যে ছিল;

১. শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক শূন্যতা দূর করা।
২. ১৯৮০ সালের মধ্যেই কমপক্ষে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করা।
৩. ইসলামী শিক্ষার বাস্তব মডেল হিসেবে পেশ করার জন্য অবিলম্বে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা। মাদ্রাসা ও আধুনিক শিক্ষার সমন্বয়ে একমুখী শিক্ষাব্যবস্থা চালু করা।
৪. বেতন, চাকরি, অনুদান, উপকরণ ও অন্যান্য সুযোগ সুবিধার থেকে সাধারণ শিক্ষার মতই মাদ্রাসা শিক্ষাকে সুযোগ দিতে হবে।
৫. প্রাথমিক থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত কারিকুলাম সংশোধনের কাজ ১৯৭৯ সালের মধ্যে শুরু করতে হবে। সে আলোকে প্রণয়ন ও পাঠ্যপুস্তক তৈরির কাজ করতে হবে।
৬. মাধ্যমিক স্তর হতেই বৃত্তিমূলক শিক্ষা চালু করা। বেকারত্বমুক্ত করার জন্য উচ্চশিক্ষাকে উৎপাদন ও কর্মমুখী করতে হবে।
৭. শিক্ষার সর্Ÿোচ্চ স্তরের পর্যন্ত মাতৃভাষায় শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. উচ্চমাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত ইসলামের মৌলিক বিধি বিধান শিক্ষার জন্য একটি বিষয় সকল স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য অবশ্য পাঠ্য হিসেবে চালু করতে হবে।
৯. বর্তমান পরীক্ষাপদ্ধতির আমূূল পরিবর্তন করতে হবে।
১০. শিক্ষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা ও পেশাগত দক্ষতার উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হবে।
১১. জাতীয় আয়ের শতকরা ১০ ভাগ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দিতে হবে।

১৯৮৮ সালের ইসলামী শিক্ষা সেমিনারে দুই দিনে ৬টি অধিবেশনে ৬টি নিবন্ধ পাঠ ও ৩৭ জন আলোচক আলোচনা পেশ শেষে মোট ১৪টি সুপারিশ গ্রহণ করে।
১৯৯৭ সালের জাতীয় শিক্ষা সেমিনারে ২ দিনে ৫টি অধিবেশনে ৫টি নিবন্ধ পেশ হয়। এতে অসংখ্য জ্ঞানী-গুণীজন আলোচনায় অংশ নেন। এই সেমিনারে মোট ১৫টি সুপারিশ গৃহীত হয়।
২০০৪ সালের “শিক্ষা ও সংস্কৃতিক সেমিনার’’ ২ দিনে ৪টি প্রবন্ধ পাঠ হয় এবং সেসবের উপর শিক্ষাবিদ সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব, আলেম ওলামাগন বিশদ আলোচনা করেন। এ সেমিনারে শিক্ষাবিষয়ক ১২টি এবং সংস্কৃতি বিষয়ক ৫টি প্রস্তাব ও ৭টি দাবি সংবলিত সুপারিশ প্রণয়ন করে।
বাংলাদেশে ইসলামী ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ও প্রধান প্রধান শহরে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে সভা, সমাবেশ মিছিল শিক্ষা উৎসব, সেমিনার আলোচনা সভা ইত্যাদির আয়োজন করে। এর উদ্দেশ্য ছিল একটাই যাতে উৎপাদনবিমুখ, নৈতিকতা শূন্য, বেকার তৈরির কারখানা খ্যাত দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার ও পরিবর্তন এর দাবিতে সবাই সোচ্চার হয়।
ইসলামী ছাত্রশিবিরের চতুর্থ দফা কর্মসূচির আলোকে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না আসা পর্যন্ত এ আন্দোলন চলবে।
বিগত দিনগুলোর ক্রমাগত আন্দোলনের ফলে বেশকিছু ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন এলেও মূল দাবি শতকরা ৯০ জন মুসলমানের দেশে শিক্ষাব্যবস্থার ইসলামীকরণ সুদূর পরাহত রয়ে গেছে। মাদ্রাসা ছাত্র আন্দোলন পরিষদের দাবির প্রেক্ষিতে মাদ্রাসা শিক্ষার মান, স্বীকৃতি ও মর্যাদা অনেকটা বাড়লেও তারা এখনও সাম্য ও অধিকার বঞ্চিত।

বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় প্রায়োগিক আন্দোলন বা কর্মসূচি
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে ঢাকার মোহাম্মদপুরে প্রতিষ্ঠিত হয় বাংলাদেশের প্রথম ইসলামী কিন্ডারগার্টেন স্কুল ‘বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউট’। এর প্রতিষ্ঠাতা ও উদ্যোক্তা ছিলেন শিক্ষানুরাগী ইসলামী ব্যক্তিত্ব মরহুম আব্দুল খালেক। বাদশাহ ফয়সাল ইনস্টিটিউট নামটি দেন মসজিদ সমাজের সাধারণ সম্পাদক এম নোয়াব আলী ভূঁইয়া।
বাদশা ফয়সাল ইনস্টিটিউট মূলত সেক্যুলার বাংলাদেশে প্রথম ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এ প্রতিষ্ঠানের পাঠদান পাঠ্যসূচি, শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষক শিক্ষিকা ইত্যাদিকে সামনে রেখে পরবর্তীতে সারাদেশে অসংখ্য স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজ ইত্যাদি গড়ে ওঠে।
১৯৭৪ এর পর থেকে বাংলাদেশের শিক্ষা বিস্তার ও ইসলামী প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক সামাজিক, ধর্মীয় ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান এগিয়ে আসে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ইসলামিক এডুডেকশন সোসাইটি ((IES)), স্কুল অব ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড এডুকেশন, মসজিদ সমাজ। ঢাকা শহরে বর্তমানে কয়েক শ’ ইসলামী কিন্ডারগার্টেন ইসলামী ধারার স্কুল কলেজ ক্যাডেট মাদ্রাসা যথেষ্ট সুনাম ভালো রেজাল্ট নিয়ে ভালোভাবে চলছে, ঢাকার বাইরে প্রায় প্রতিটি বড় শহর ও জেলা সদর এমনকি উপজেলা সদর ও কোন কোন ইউনিয়নেও এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এই যে অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তাদের প্রায় সবারই ইসলাম শিক্ষা কুরআন শিক্ষা ও জীবনবোধ গড়ার জন্য সরকারি পাঠ্যের পাশাপাশি তালিকাভুক্ত বইপুস্তক রয়েছে। ইসলামী এডুকেশন সোসাইটি এমন অনেক বই প্রকাশ করছে। তাদের বইগুলো শত শত স্কুল, মাদ্রাসা ও প্রতিষ্ঠান পাঠ্য। ওঊঝ সারাদেশে এসব ইসলামী প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।
দেশের প্রধান প্রধান শহরে ইসলামী ধারায় গড়ে উঠেছে বেশ কিছু বোর্ড ও দেশসেরা প্রতিষ্ঠান। ঐসব কলেজ ও মাদ্রাসা থেকে পাস করা ছাত্র ছাত্রীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠানে মেধা তালিকায় স্থান লাভ করে থাকে।
বাংলাদেশে প্রথম ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন আকরম খাঁ, তা সফল হয়নি। চট্টগ্রামের মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীও একটি উদ্যোগ নেন, আনোয়ারার দেয়ং পাহাড়ে এ জন্য জমিও নিয়েছিলেন কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় আর হয়নি। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয় অ্যাক্ট ১৯৯২ অনুমোদিত হলে গড়ে ওঠে দারুল ইহসান বিশ^বিদ্যালয়, আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইসলামী ইউনিভার্সিটি, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামী শিক্ষার সমন্বয় ঘটায়।
বাংলাদেশে এগিয়ে যাচ্ছে সামনে। এদেশের মানুষও এগিয়ে যাবে উন্নয়নের পথ ধরে। কেবল অর্থ-বিত্ত-বৈভবে নয় ইসলামের আলোয় উজ্জীবিত চিত্তও তাদের সাথী থাকবে। আর এভাবেই একদিন বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন সরকারের সহযোগিতায় সফল হবে। বাংলাদেশের আগামীর সাহসী, খোদাভীরু, সৎ ও দক্ষ নাগরিক তৈরি হবে সেই শিক্ষা আন্দোলনের ফসল হিসেবে। (সমাপ্ত)
লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply