ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন উত্তর উপনিবেশ অধ্যায় -আবু জাফর মুহাম্মদ ওবায়েদুল্লাহ

আজকের প্রবন্ধের মুখ্য বিষয় ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন, বিশেষ করে তার উত্তর উপনিবেশ অধ্যায়। বলা যায় ১৯৪৭ সাল থেকে আজ অবধি পরিচালিত ব্যষ্টি, সমষ্টি ও দলীয় পর্যায়ে ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন। কিন্তু: এরও একটি প্রেক্ষাপট রয়েছে। সে কারণেই প্রথম আমরা উপনিবেশ পূর্ব ও উপনিবেশ কালের শিক্ষাব্যবস্থা এবং ইসলামী শিক্ষা আন্দোলনের প্রেক্ষিত নিয়ে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা করবো। এ আলোচনাটি যুগপৎ প্রাসঙ্গিক, প্রয়োজনীয় ও প্রণিধানযোগ্য।

ইসলামী শিক্ষার সোনালি অতীত
মানবতার সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বন্ধু শিক্ষক ও শাসক হযরত মুহাম্মদ সা. মাত্র ২৩ বছরের অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে জাজিরাতুল আরবের ঊষর মরুর ধূসর বুকে গড়ে তোলেন এক অবিশ্বাস্য শান্তিময় রাজ্য যা আজ অবধি কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। আর তাঁর মৃত্যুর মাত্র ৩০ বছর সময়কালের মধ্যেই তাঁর তৈরি করা শিক্ষাব্যবস্থা, শিক্ষাক্রম, পাঠ্যসূচি এমন একদল সোনার মানুষ তৈরি করলো যারা তৎকালীন গোটা পৃথিবীর অর্ধেকটা জয় করে নিলেন, যতটা না যুদ্ধ জিতে, তার চেয়ে ঢের বেশি হৃদয় জয় করে। আর তারই ফলে তৎকালীন পৃথিবীর পরাশক্তি পারস্য আর রোম সা¤্রাজ্য মাথা নত করলো ইসলামী দুনিয়ার কাছে। এরপর কেবলই জয় আর জয় দেখেছে মুসলিমগণ। তারা বীরবিক্রমে ইসলামের পতাকা বয়ে নিয়ে গেছে দেশ থেকে দেশান্তরে, নদী-সমুদ্র আর পর্বত শৃঙ্গের দুর্গম এলাকায়। তারা তাদের অনুপম চরিত্র, সামঞ্জস্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা আর অত্যাশ্চর্য সভ্যতাকে পৌঁছে দিয়েছে আফ্রিকার গহিন অরণ্যে। পূর্বের নবী-রাসূলদের জনপদ, গোবির চারণভূমি আর ইউরোপের পতনমুখী রাজন্যবর্গের সভ্য ভূমিতে। মুসলমানগণ কমবেশি প্রায় একহাজার বছর পৃথিবীকে তাঁদের জাদুর ছোঁয়ায় আলোকিত, জ্ঞান-বিজ্ঞান; সুশাসন আর সামাজিক সুবিচার ফল্গুধারায় সিক্ত করে রাখে। পাশ্চ্যাত্যের প্রাচ্য-তত্ত্বের ঘোর ইসলামবিদ্বেষীরাও কিন্তু এই সভ্যতাকে অস্বীকার করতে পারেনি। ইসলামী শিক্ষার প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিলো মসজিদে নববীর একদিক সংরক্ষিত সুফ্ফা এলাকা। এখানে আসহাবে রাসূলগণ দুনিয়াবি সকল ধ্যান-জ্ঞানকে অস্বীকার করে রাতদিন জ্ঞান অন্বেষায় চাতকের মতো তৃষ্ণাতুর হৃদয় নিয়ে অবস্থান করতেন। তাঁরা নবী করীম সা. যিনি সামষ্টিক বিবেচনায় ‘সুফ্ফা’ নাম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান মুআল্লিম (শিক্ষক) ছিলেন তাঁর কথা, কাজ ও সায় (অনুমোদনকে) মনোযোগ দিয়ে শুনতেন হৃদয়ঙ্গম করতেন। মুখস্থ করতেন আর তা হুবহু জীবনে বাস্তবায়নে করতেন। এই শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপারে কুনআনে হাকিমে বলা হয়েছে, “তিনি উম্মিদের মধ্যে থেকে তাদের জন্য একজন রাসূল পাঠালেন যিনি তাদেরকে তাঁর কাছে আসা আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করে শোনান, তাদেরকে তাযকিয়া বা পরিশুদ্ধির শিক্ষা দেন আর তাদেরকে হিকমাহ বা কৌশল শিখান।” (সূরা জুমআ : ০২)
রাসূলের এই সার্বক্ষণিক ছাত্র-শিক্ষকগণ এখানেই থাকতেন, এখানেই খেতেন আর এখানেই রাসূলের নির্দেশে এই শিক্ষার আলোকে জীবন যাপন করতেন। এভাবেই যে নবী জিবরিলের বয়ে আনা কুরআনের বাণী, ইকরা বি ইসমি রাব্বিকাল্লাজি খালাক’ শুনে বলেছিলেন, ‘আনা লা আদরি’ আমিতো জানি না তিনিই এক অপূর্ব শিক্ষার আলোয় আলোকিত মানুষ তৈরির কারখানা গড়ে তুললেন। বিশ্ব এখনো বিশ্বাসের সাথে ঐসব মহান ছাত্র, পরবর্তীকালের যারা প্রত্যেকেই হয়ে গেছেন এক একটি মহাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষক ও প্রয়োজনে সেনাপতি; তাদের স্মৃতি রোমন্থন করে।
মূলত মুসলমানদের প্রতিটি ঘর, প্রতিটি মসজিদ এবং পরবর্তীকালে গড়ে তোলা প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই ‘সোনার মানুষ’ তৈরির কারখানা হিসেবে গড়ে ওঠে। তারা একদল মানুষ তৈরি করতে থাকে যারা তাদের রবের কাছে দোয়া করতো “রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাতাঁও ওয়াফিল আখিরাতি হাসানা’ ‘হে আমাদের রব, আমাদেরকে দুনিয়া ও আখেরাত উভয় জগতেই কল্যাণ দান করুন।’ কিন্তু তারা সবসময় দুনিয়ার সাফল্য ব্যর্থতা নয় সবার আগে বিবেচনা করতেন আখেরাতে সাফল্যকে। মুসলমানদের এই নয়া সভ্যতার ব্যাপক সাফল্য ও বিশ্বাস ঘটে চার খলিফার বা খোলাফায়ে রাশেদার যুগ, উমাইয়া আব্বসীয় ও উসমানীয় খলিফাদের যুগে। এসময়ে মুসলমানদের যে শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলে তার একটি সারাংশ নিচের সারণিতে উল্লেখ করা হলো-

খোলাফায়ে রাশেদার শিক্ষাব্যবস্থা
হযরত আবু বকর রা. থেকে হযরত আলী রা. পর্যন্ত ৪ খলিফার যুগে প্রতিটি এলাকার প্রতিষ্ঠিত মসজিদসমূহ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো যা আজকের যুগের উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বলা যেতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে ইবনে মাসউদ রা.-এর মসজিদভিত্তিক মাদ্রাসায় ৪০০০ ছাত্র ছিলো। দামিশকে প্রতি ৪০ জন ছাত্র নিয়ে একজন শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হতো। এ যুগের শিক্ষার বিষয়বস্তু পর্যালোচনা করে দেখা যায় তখন ১. আল কুরআন ২. আল হাদিস ৩. বাক্যালঙ্কার (Rhetoric) ৪. নীতিশাস্ত্র ৫. দর্শন ৬. ইতিহাস ৭. অঙ্ক ও ৮. বাক্য- পাঠ্যভুক্ত ছিলো।
খোলাফায়ে রাশেদার হাতে ধীরে ধীরে ইসলামের প্রশাসক ব্যবস্থাসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গড়ি ওঠে। খলিফাগণ তাদের অধীনস্থ শাসকদের কাছে দিকনির্দেশনামূলক যে চিঠিপত্র লিখতেন তাই-ই ছিলো আজকের দিনের সরকারি গেজেট ও প্রজ্ঞাপন। বিশেষ করে হযরত উমর রা. ও হযরত আলী রা.-এর এইসব প্রশাসনিক নির্দেশ ও পত্রাবলি এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। হযরত উমর রা. সকল সক্ষম পুরুষের জন্য শারীরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে দেন এবং তাদেরকে সেনাবাহিনীর অন্তর্ভুক্ত করে নেন। সহশিক্ষাকার্যক্রম হিসেবে তিনি প্রত্যেককে ক. সাঁতার খ. তীর বর্শা নিক্ষেপ গ. ঘোড়-দৌড় শিখতে নির্দেশ দেন। এ ছাড়া অভিভাবকদের নির্দেশ দেন তারা যেন সন্তানকে বাগধারা, প্রবচন, জ্ঞানমূলক কথা এবং শিক্ষণীয় কবিতা শিক্ষা দেয়।
এসব শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যে ছিলো রাষ্ট্রের প্রতিটি সদস্যকে কল্যাণকর জ্ঞান, উত্তম চরিত্র, শারীরিকভাবে সক্ষম ও জনহিতৈষী করে গড়ে তোলা।

উমাইয়া যুগে শিক্ষা
উমাইয়া যুগে শিক্ষাব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। আবার এসব প্রতিষ্ঠান ছিল ২ ধরনের-
ক. খলিফা ও অভিজাত শ্রেণীর মেয়েদের জন্য
খ. সাধারণ নাগরিকদের সন্তানদের জন্য
অভিজাত শ্রেণীর শিক্ষা ছিল মূলত গৃহশিক্ষককেন্দ্রিক। অভিভাবক ও গৃহশিক্ষকগণ ঠিক করতেন সন্তানকে কী কী শিক্ষা দেয়া হবে। এদেরতো মূলত মর্যাদা ও সাহসিকতাসম্পন্ন রণকৌশলে পারদর্শী করা হতো। সাধারণ শিক্ষার্থীরা মসজিদ বা মসজিদসংলগ্ন মক্তবে পড়ালেখা করতো। এ যুগের সব মক্তবকে বর্তমানের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে তুলনা করা যায়।
এ যুগে শিক্ষায় বিষয়বস্তু ছিল- ১. আল কুরআন ২. আল হাদীস ৩. হালাল হারামের বিষয়সমূহ ৪. কবিতা, ক্বাসিদা, গযল ও বক্তৃতা ৬. আরবি ব্যাকরণ ৭. ইসলামের বিজয় ইতিহাস ৮. শিক্ষা সফর, ঘোড়াদৌড়, সাঁতার, তীর নিক্ষেপ জাতীয় সহপাঠকার্যক্রম। চ.ক ঐরঃঃর উমাইয়া যুগের শিক্ষার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এভাবে “We Ethical ideals of education were sabr, jeor (obligation) to the neighbors, muruah (manliness) generosity, hospitality regard for women and up keeping of promises.”

আব্বাসীয় যুগে শিক্ষাব্যবস্থা
মুসলিম শাসনের এই যুগটি রাজ্য জয় ও বিস্তারের চাইতে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা, সভ্যতা নির্মাণ ও শিক্ষা বিস্তারের জন্য সর্বাধিক পরিচিত। এ যুগকে ইসলামের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ (এড়ষফবহ ধমব) বলা হয়। এ যুগে মসজিদ, মক্তবের পাশাপাশি প্রাথমিক ও উচ্চশিক্ষার জন্য অসংখ্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়। এ যুগে মহিলাদের দ্বীনি শিক্ষার পাশাপাশি উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী হতে দেখা যায়। খলিফা আল মামুন ৮৩০ খ্রিষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠা করেন বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ ‘বায়তুল হিকমাহ’। এ প্রতিষ্ঠানে সৌরবিজ্ঞান, অনুবাদ (বিশেষ করে গিীক, সিরীয় ও পার্সি ভাষায় লিখিত সাহিত্যের অনুবাদ)। সাহিত্যের ভিত্তিতে ‘আওয়াম বিজ্ঞান’ শিক্ষাদানের মাধ্যমে ধর্ম দর্শন ইত্যাদি শিক্ষা দেয়া হতো। সেলজুক সুলতানদের যুগে তাদের পার্সিশাস্ত্র ‘নিজামুল মূলক’ ইসলামের ইতিহাসে প্রথম উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র (বিশ্ববিদ্যালয়) ‘নিজামিয়া’ প্রতিষ্ঠা করেন ১০৬৫-৬৭ খ্রিষ্টাব্দে। মানবিক বিভাগের (ঐঁসধহরঃরবং)-এর ভিত্তি হিসেবে শিক্ষা দেয়া হতো- আল কুরআন, শরিয়াত, প্রাচীন কবিতা। এ প্রতিষ্ঠানে আবাসিক ও বৃত্তি ব্যবস্থা চালু ছিল। ইমাম গাজ্জালী রহ. ৪ বছর এ প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার মূল লক্ষ্য
লক্ষণীয় যে প্রত্যেক যুগেই ইসলামী শিক্ষার মূল লক্ষ্য মানুষকে আল্লাহভীরু, সৎ সাহসী, নিষ্ঠাবান হিসেবে তৈরি করা। এজন্য ইসলামী শিক্ষার অপরিহার্য পাঠ্য হচ্ছে আল কুরআন ও আল হাদীস। বাকি সকল পাঠ্য এরই নিরিখে সাব্যস্ত ও নির্ধারণ করা হতো। আব্বসীয় যুগে এসে উমাইয়া যুগের পাঠ্যসূচির সাথে যুক্ত হয় : ১. নবীদের জীবনী ২. বিশেষভাবে কবিতা অধ্যায়ন, এ যুগে হাদীসশাস্ত্রের সবিশেষ বিকাশ ঘটে ৩. প্রাথমিক গণিত ৪. দর্শন ৫. প্রাচীন সাহিত্য পাঠ ৬. চিকিৎসাবিজ্ঞান ৭. জ্যোতির্বিদ্যা ইত্যাদি।
মুসলিম স্পেনে জর্ডান, সেভিস, টলেডোতে যে সমস্ত উচ্চ শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে সেখানে ফ্রান্স, ইতালি, ইংল্যান্ড হতে রাজ পরিবারের সদস্যগণ অধ্যয়ন করতে আসতো। স্পেনের প্রায় সকলেই শিক্ষিত ছিলেন। সরকার প্রচুর অবৈতানিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। যাই হোক ইসলামী শিক্ষার মূল ভিত্তি হচ্ছে তাওহিদ, আখেরাত ও রিসালাত। তাওহিদ হচ্ছে মুসলমানদের ঐক্যের মূল সূত্র। ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে যতবার মুসলমানগণ পতন ও অবক্ষয়ের মুখে পড়েছে একমাত্র ইসলাম তাদের রক্ষা করেছে। আল্লামা ইকবালের ভাষায়- “ইতিহাসের সন্ধিক্ষণে মুসলমানগণ ইসলামকে রক্ষা করেনি বরং ইসলামই মুসলমানদের রক্ষা করেছে।”
আজ তাই ইসলামবিষয়ক শিক্ষার জ্ঞানার্জন ও তার সুষ্ঠু বিকাশ মুসলিম জাতির অন্যতম মিশন হাওয়া উচিত। (চলবে)
লেখক : শিক্ষাবিদ, কলামিস্ট ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply