ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন ও শহীদ আবদুল মালেক । ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ইসলামী শিক্ষা আন্দোলন ও শহীদ আবদুল মালেক । ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দশহীদ আবদুল মালেক একটি নাম একটি ইতিহাস। যে নামটি ইসলামী আন্দোলনের প্রতিটি কর্মীর হৃদয়ের মণিকোঠায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা। যে নাম বিপ্লবী সুর সৃষ্টি করে, স্পন্দন জাগায় হৃদয়ে হৃদয়ে, স্বপ্ন জাগায় হাজারো স্বপ্নবাজ মানুষের বুকে। নামটির সাথে আমার পরিচয় ছোটবেলা থেকেই। আমার ছোট দাদু মরহুম মাওলানা আবদুল গফুরের মুখে শুনেছিলাম তাঁর কীর্তিগাথা। বাংলাদেশে ইসলামী আন্দোলনের সূচনালগ্নের অন্যতম সাহসী কাণ্ডারি ছিলেন দাদু। শহীদ আবদুল মালেকের সার্থক জীবনের গল্প শুনিয়েছিলেন তিনি। লেখাপড়ার উদ্দেশ্যে বগুড়ার সারিয়াকান্দীতে আসার পরে এ নামটি আমার কাছে হয়ে ওঠে অন্যতম আদর্শিক সিম্বল। তাঁর কবর জিয়ারতের জন্য হৃদয়টা আকুলি বিকুলি করতো নিয়মিত। অবশেষে ১৯৮৭ সালে সে আশা পূর্ণ হলো। তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আমিনুল ইসলাম মুকুল এসেছিলেন শিক্ষা দিবসের অনুষ্ঠানে। বগুড়া জিলা সভাপতি আবু তাহের সিদ্দিকী এবং সেক্রেটারি নাসির উদ্দিনসহ ছাত্রআন্দোলন ও বৃহত্তর সংগঠনের নেতাকর্মী এবং ইসলামপ্রিয় জনসাধারণের সমন্বয়ে দারুণ একটি জমজমাট অনুষ্ঠান হয়েছিল সেখানে। সেখানেই পরিচয় হয় শহীদ আবদুল মালেকের ভাইপো মুহাম্মদ আবদুল বাছেদের সাথে। তিনি তখন বগুড়া জেলার শেরপুর শহর শাখার সভাপতি। তাদের আন্তরিক আতিথেয়তা এবং শহীদ আবদুল মালেকের টানে সেদিন গোসাইবাড়িতেই থেকে যাই। শহীদ আবদুল মালেক যেখানে শুয়ে আছেন- গোসাইবাড়ির মানিকপোটলেই ছিলাম। প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তেই গিয়েছিলাম কবর জিয়ারতে। তারপর থেকেই এ পরিবারের সাথে সখ্যতা। বগুড়া জেলা শাখায় একসাথে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। অধ্যাপক মুনসী আবদুল বাছেদ, মাওলানা খলিলুর রহমান, অধ্যাপক ফজলুল হক, আলমগীর হোসেন, ডা. আনোয়ার হোসেন, মোস্তফা মনোয়ার সকলের সাথেই একান্তভাবে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি হয়। শহীদ আবদুল মালেকের ভাতিজা হিসেবে চাচার বৈশিষ্ট্যসমূহ ধারণ করে এগিয়ে যাবার প্রয়াস তাদের সকলের মধ্যেই দৃশ্যমান। তাদের সাথে অনেকটা পারিবারিক সদস্যের মতোই আছি আজও।
বগুড়ায় থাকালীন শহীদ আবদুল মালেক ট্রাস্ট এবং মূল সংগঠনের আয়োজনে অনেকবার নানা ধরনের অনুষ্ঠানের আয়োজনেও সম্পৃক্ত ছিলাম। তাঁকে নিয়ে বেশ কয়েকটি প্রবন্ধও লিখেছিলাম ইতঃপূর্বে। ১৯৯৩ সালে তাঁকে নিয়ে প্রথম প্রবন্ধ লিখি দৈনিক পত্রিকায়। তাঁকে নিয়ে অনেকেই লিখেছেন। কিন্তু লেখাগুলোতে খুব বেশি নতুনত্ব পাওয়া কঠিন। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটিতেও যে নতুন কিছু থাকবে তাও বলতে পারছি না। তবুও নতুন প্রজন্মের কাছে তাঁকে উপস্থাপন করা এখন সময়ের দাবি। কারণ আবদুল মালেক শুধু একজন শহীদই নন, ইসলামী আন্দোলনের অনুকরণীয় একজন আদর্শিক ব্যক্তিত্ব। জ্ঞানে, ধ্যানে, চিন্তা-চেতনায় একজন মানুষ কত উজ্জ্বল হতে পারে শহীদ আবদুল মালেক তারই এক শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, ছাত্রজীবন, সাংগঠনিক জীবন, তাঁর লেখনী, চিঠিপত্রের আদান-প্রদান, দায়িত্বশীলদের সাথে মেলামেশা প্রত্যেক ক্ষেত্রে শিক্ষণীয় অধ্যায় খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁর সহপাঠী ও বন্ধুদের লেখার মাধ্যমে যতটুকু জানার সুযোগ হয়েছে তাতে এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, শহীদ আবদুল মালেক হচ্ছেন ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের জন্য প্রেরণায় এক অনুপম প্রতীক।
বাড়ির পাশেই খোকশাবাড়ী স্কুল। মানিক পোটল এবং খোকশাবাড়ি একসাথেই লাগানো গ্রাম। ঠিক যেন এ পাড়া ও পাড়া। স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন আব্দুল জলিল। তিনি শিশু আবদুল মালেকের তাৎক্ষণিক মেধা যাচাই করে সরাসরি ২য় শ্রেণীতে ভর্তি করে নিয়েছিলেন। প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে গোসাইবাড়ী হাইস্কুল। এলাকার মধ্যে এ স্কুলটির বেশ সুনাম ছিল। পরবর্তীতে শিশু আবদুল মালেককে সে স্কুলে ভর্তি করা হয়। আবদুল মালেক জুনিয়র বৃত্তি পরীক্ষায় বৃত্তি পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন। গোসাইবাড়ী হাইস্কুলে বিজ্ঞান বিভাগ না থাকায় তিনি ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১ম স্থান অধিকার করে ভর্তি হন জেলাস্কুলে। স্কুলের হোস্টেলে থেকে পড়ালেখা করে মেট্রিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করেন। পরীক্ষা চলাকালীন তার বাবা মারা যান। পরীক্ষার কারণে তাঁকে বিষয়টি জানতে দেয়া হয়নি। ২ দিন পর তাঁর বড় ভাই মাস্টার আব্দুল বারী দেখা করতে গেলেন আবদুল মালেকের সাথে। পরীক্ষার খোঁজ খবর নেয়ার পর আবদুল মালেকও বাড়ির খোঁজ জানতে চাইলেন। বড় ভাই কৌশলে জানালেন যে, উপস্থিত সবাই ভালো আছেন। পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে বাইরে বেশি ঘুরাফিরা না করে মনোযোগ দিয়ে পরীক্ষা শেষ করেই বাড়ি আসার জন্য পরামর্শ দিলেন। কারও মাধ্যমে বাবার মৃত্যুর খবর জেনে পরীক্ষা যেন খারাপ না হয় সে জন্যই এমন পরামর্শ দিয়েছিলন। পরে পরীক্ষা শেষে বাড়ির নিকটবর্তী হতেই প্রতিবেশীর কাছে বাবার মৃত্যুর খবর পেয়ে অচেতন হয়ে পড়েছিলেন তিনি। মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় রাজশাহী বোর্ডে মেধা তালিকায় ত্রয়োদশ স্থান অধিকার করে রাজশাহী কলেজে ভর্তি হন আইএসসিতে। রাজশাহী কলেজ থেকে মেধা তালিকায় ৪র্থ স্থান লাভ করে ভর্তি পরীক্ষায় মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করে অনার্সে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। অবশেষে আরেকটি কৃতিত্বপূর্ণ ফলাফলের জন্য জাতিকে অপেক্ষমাণ রেখে তিনি চলে যান মহান আল্লাহর সান্নিধ্যে।
আবদুল মালেকের শাহাদাতের ঘটনাটি ছিল নিষ্ঠুর ষড়যন্ত্রের ফসল। ১৯৬৯ সালে শহীদ আবদুল মালেকসহ ১০ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল পাকিস্তানের তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী এয়ার মর্শাল নুর খানের সাথে সাক্ষাৎ করে দেশে সর্বজনীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর দাবি করেন। শহীদ আবদুল মালেকের প্রতিনিধিদলের পর দেশের অন্যান্য সংগঠনও একই দাবি তোলেন। সবার দাবির মুখে অল্প কিছুদিনের মধ্যে সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়নের লক্ষ্যে একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করে এবং কমিশন একটি শিক্ষানীতিও ঘোষণা করে। ঘোষিত শিক্ষানীতিতে কিছু ত্রুটি বিচ্যুতি থাকলেও এতে ইসলামী আদর্শের প্রাধান্য পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ইসলামবিদ্বেষী চক্রের কাছে পছন্দ হয়নি। তারা এ শিক্ষানীতি বাতিলের দাবি জানায়। এমনই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাব্যবস্থার আদর্শিক ভিত্তি কী হবে তা নিয়ে জনমত জরিপের আয়োজন করা হয়। জনমত জরিপের অংশ হিসেবে ১৯৬৯ সালের ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নিপা) ভবনে (বর্তমান ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ) এ শিক্ষানীতির ওপর একটি আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই আলোচনা সভায় বামপন্থীদের বিরোধিতামূলক বক্তব্যের মধ্যে শহীদ আবদুল মালেক মাত্র ৫ মিনিট বক্তব্য রাখার সুযোগ পান। অসাধারণ মেধাবী বাগ্মী শহীদ আবদুল মালেকের সেই ৫ মিনিটের যৌক্তিক বক্তব্যে উপস্থিত সবার চিন্তার রাজ্যে এক বিপ্লবী ঝড় সৃষ্টি করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র আবদুল মালেক সে সময়ে জাতির বৃহত্তর কল্যাণকে সামনে রেখে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার অবশ্যম্ভাবী পরিণতিকে উপলব্ধি করেছিলেন। একজন দূরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষ হিসেবে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সমাজতন্ত্র, পুঁজিবাদ কিংবা আধুনিকতা দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নৈতিকতাহীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সাথে সাথে স্বকীয় ভাষা-সংস্কৃতির নির্বাসন হবে। তাই তার বক্তব্যের এ ধারণাটিকে তিনি যুক্তি সহকারে খুব সুন্দরভাবে উপস্থাপন করেছিলেন। তিনি বক্তব্যে Common set of cultural values এর ধারণা উত্থাপন করে এর সুন্দর ব্যাখ্যা ও যুক্তি দাঁড় করিয়েছিলেন। তিনি বলেন, এর মানে One set of cultural values নয়, One set of cultural values সোভিয়েট রাশিয়াতে রয়েছে, যেখানে রয়েছে একটি Authoritian society আর সেখানে বিভিন্ন অঙ্গরাষ্ট্রগুলো তাদের Culture-কে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করে দিয়ে সেখানে একটা One set of cultural values তৈরি করেছে। আমরা এটার বিরোধী। আমরা এখানে চাই Common set of cultural values not one set of cultural values. ফলে সভার মোটিভ পুরোপুরি পরিবর্তন হয়ে যায়। উপস্থিত শ্রোতা, সুধীমণ্ডলী এবং নীতি নির্ধারকরা শহীদ আবদুল মালেকের বক্তব্যের সাথে ঐকমত্য পোষণ করে একটি সর্বজনীন ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে মত দেন।
নিপার আলোচনা সভায় তাদের শিক্ষাব্যবস্থার পক্ষে জনমত তৈরিতে ব্যর্থ হওয়ার পর হীন উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার জন্য ডাকসুর নামে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষার পক্ষে প্রস্তাব পাস করানোর উদ্দেশ্যে ১২ আগস্ট ঢাবির টিএসসিতে এক আলোচনা সভার আয়োজন করে। ছাত্রদের পক্ষ থেকে শহীদ আবদুল মালেকসহ কয়েকজন ইসলামী শিক্ষার ওপর কথা বলতে চাইলে তাদের সুযোগ দেয়া হয়নি। সভার এক পর্যায়ে জনৈক ছাত্র নেতা ইসলামী শিক্ষার প্রতি কটাক্ষ করে বক্তব্য রাখে। তখন উপস্থিত শ্রোতারা এর তীব্র বিরোধিতা করে ইসলামী শিক্ষার পক্ষে শ্লোগান দেয়। সাথে সাথেই ইসলামী শিক্ষার বিরোধী পক্ষ হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে সাধারণ ছাত্রদের ওপর। সন্ত্রাসীদের ছোবল থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আবদুল মালেক তার সাথীদের স্থান ত্যাগের নির্দেশ দেন। এ সময় সকল সঙ্গীকে নিরাপদে বিদায় দিয়ে আবদুল মালেক ২-৩ জন সাথীকে সাথে নিয়ে টিএসসির পাশ দিয়ে তার হলে ফিরছিলেন। হলে ফেরার পথে লোহার রড-হকিস্টিক নিয়ে সন্ত্রাসীরা তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে তাকে রেসকোর্স ময়দানে অর্থাৎ বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নিয়ে মাথার নিচে ইট দিয়ে, ইটের ওপর মাথা রেখে উপরে ইট ও লোহার রড- হকিস্টিক দিয়ে উপর্যুপরি আঘাত করে রক্তাক্ত ও অর্ধমৃত অবস্থায় ফেলে রেখে চলে যায়। তাঁর সঙ্গী গাজী ইদ্রীসও মারাত্মকভাবে আহত হন। আবদুল মালেককে আহত এবং অজ্ঞান অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। কিন্তু তিনি আর ফিরে আসেননি মায়ের কোলে। ১৫ আগস্ট শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে যান তিনি।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পূর্বক্ষণে শিক্ষানীতির ব্যাপারে দেশের ভবিষ্যতের নির্ধারণী ইঙ্গিত দিয়ে গেছেন শহীদ আবদুল মালেক। তিনি ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে, শিক্ষাব্যবস্থা হচ্ছে একটি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে আলোকিত করার প্রধান সোপান, জাতীয় উন্নতি ও অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি, জাতীয় ঐক্যের প্রতীক, জনগণের মধ্যে চিন্তা ও কর্মের বিভাজন দূরীকরণের সহায়কশক্তি এবং জাতীয় মিশন ও ভিশন বাস্তবায়নের রূপকার। জনগণের সকল প্রকার আর্থসামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা সমাধানের উদ্দীপক ও প্রেরণাদানকারী শক্তি হিসেবেও কাজ করে শিক্ষাব্যবস্থা। শুধু তাই নয়, জনগণকে তার সর্বোচ্চ ধর্মীয় চেতনায় উদ্দীপ্তকরণে শিক্ষাব্যবস্থার অপরিসীম ভূমিকা থাকে। জীবনের সর্বক্ষেত্রে শান্তি ও শৃঙ্খলা স্থাপনে শিক্ষাব্যবস্থা অদম্য প্রত্যয় সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের মধ্যে শক্তি জোগায়। মূলত শিক্ষাব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে একটি দেশের গোটা জাতীয় সত্তার কাঠামো।
শিক্ষা হচ্ছে সফলভাবে মানুষ গড়ার প্রকৃত মাধ্যম। আর শিক্ষাব্যবস্থা বা শিক্ষানীতি যদি মূল্যবোধে উজ্জীবিত করার ক্ষমতা সম্পন্ন না হয় তাহলে মানুষ তৈরি হবে না। তৈরি হবে অমানবিক কিছু পাশবিক আত্মাসম্পন্ন দানব। কেননা যা ধর্মের বিষয়াবলির সাথে সংশ্লিষ্ট নয় তাই সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা। এ শিক্ষাব্যবস্থাকে ধর্মের বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত করা যায় না। অথচ মানুষের খুদি বা রূহকে উন্নত করার প্রচেষ্টার নামকেই শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছেন মহাকবি আল্লামা ইকবাল। মানুষের অন্তর্নিহিত গুণাবলির উন্নতি ও বিকাশ সাধনকে শিক্ষা বলেছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। নিজেকে জানার নামই শিক্ষা বলেছেন সক্রেটিস এবং প্লেটো। অন্যদিকে মিসরীয় দার্শনিক মুহাম্মদ কুতুব মনে করেন, শিক্ষা হলো বস্তুজীবন, পার্থিব জীবন ও আত্মিক জীবনের সমন্বয় স্থাপনকারী একটি মাধ্যম। জন মিল্টন দেহ, মন ও আত্মার সমন্বিত ভারসাম্যপূর্ণ উন্নতির নামই শিক্ষা হিসেবে অভিহিত করেছেন। এ তিনের উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে শিক্ষা সে শিক্ষাই প্রকৃত শিক্ষা। শরীর, মন ও আত্মার সমন্বিত অগ্রগতি কোনো ধর্মীয় আদর্শ ছাড়া উজ্জীবিত হতে পারে না। ইসলামের দৃষ্টিতে চিরন্তন ও শাশ্বত নৈতিক মূল্যমানের ভিত্তিতে সত্য-মিথ্যা, ভালো-মন্দ নির্ধারণের ক্ষমতা অর্জন, পরিবেশ মুকাবিলার জন্য বৈজ্ঞানিক কলাকৌশল ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের সমন্বিত ব্যবস্থাপনার নামই শিক্ষা। ইসলামী শিক্ষার ভিত্তি হলো তাওহিদ, রিসালাত ও আখেরাত; যা সর্বস্তরে উচ্চ নৈতিকতাসম্পন্ন, নির্লোভ, সৎ, যোগ্য ও দেশপ্রেমিক মানুষ তৈরি করে। মানুষের হাত-পা, মনন ও মস্তিষ্ক সবকিছুকে আল্লাহর অনুগত বানিয়ে থাকে। মানুষের ধর্মীয় ও বৈষয়িক জীবনকে আল্লাহর রঙে রঞ্জিত করে। ফলে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে শয়তানের বিরুদ্ধে মানুষের যুদ্ধ চলে। এমতাবস্থায় ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি শয়তানের যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সর্বদা পৃথিবীকে সুন্দরভাবে আবাদ করতে চায়। ফলে পৃথিবীর জীবনপদ্ধতি অনেক সুন্দর ও স্বাচ্ছন্দ্যময় হয়।
সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে ঘুণে ধরা বাঁশের মত জাতির মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। মূলত আমাদের একজন ছাত্রকে অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞান পড়িয়ে একেকটি চালাক প্রাণীতে পরিণত করা গেলেও মানবিকতাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হয় না। আজকের পৃথিবীতে বড় বড় অশান্তির মূল কারণ হলো অনেক ক্ষেত্রেই শিক্ষিত নেতৃবৃন্দ; যাদের শিক্ষায় আল্লাহভীরুতা নেই, আখেরাতে জবাবদিহিতা নেই, রয়েছে দুনিয়াসর্বস্বতা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা ইসলামী বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত না হওয়ায় আমাদের জাতীয় জীবনে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট আদর্শিক শূন্যতা, নৈতিক দুর্বলতা, ব্যক্তিত্বের মধ্যে বিভাজন, আগামী প্রজন্মের মধ্যে হতাশা, জাতীয় উন্নতিতে স্থবিরতা, জাতীয় জীবনের সর্বক্ষেত্রে অশান্তি, বিশৃঙ্খলা ও অস্থিরতা ইত্যাদি ইত্যাদি। ফলে শিক্ষিত মানুষগুলোর মধ্যে মানবীয় গুণাবলির বিপরীতে দানবীয় গুণাবলি সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতার কোনো ঘাটতি না থাকলেও, সততা ও নৈতিকতার দিক থেকে তাদের অবস্থান অনেকটাই শূন্যের কোটায়। এই শ্রেণীর মানুষগুলোই দুনিয়াতে ভদ্রবেশে সকল প্রকার শয়তানি অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। নৈতিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষাব্যবস্থার অনুপস্থিতিতে মানবিক মানুষ, আলোকিত মানুষ, সাদা মনের মানুষ বা বদলে যাওয়া মানুষ বানানোর বিষয়টি শুধু শ্লোগানসর্বস্ব হয়ে থাকে। যে কারণে বাংলাদেশে শিক্ষার প্রসার ঘটলেও ঘুষ, দুর্নীতি, সন্ত্রাস, হত্যা, গুম, ধর্ষণ, অপহরণ ক্রমশ বেড়েই চলেছে। এ যেন নিয়ন্ত্রণহীন এক পাগলা ঘোড়া। সুতরাং একটি দেশকে উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বর্ণশিখরে আরোহণ করতে কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক একক ও পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা চালুর বিকল্প নেই। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম দেশের কোন সরকারের জন্য তা অপরিহার্যও বটে। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করে এবং ভবিষ্যতে এর সুদূরপ্রসারী আরো নেতিবাচক প্রভাবের কথা চিন্তা করে দেশের সামগ্রিক স্বার্থে সেদিন শহীদ আবদুল মালেক ইসলামী শিক্ষার পক্ষে তার যুক্তিপূর্ণ বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন।
শহীদ আবদুল মালেক শুধুমাত্র একজন শ্রেষ্ঠ বক্তাই ছিলেন না বরং তিনি তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপে অনন্য কৃতিত্বের স্বাক্ষরও রেখেছেন। তার জীবনের পরতে পরতে ঘটেছিল মেধা ও যোগ্যতার এক অনন্য সমন্বয়। অ্যাকাডেমিক জীবনের হাতেখড়ি থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ পর্যন্ত তিনি মেধার স্বাক্ষর রেখে গেছেন। তিনি ছিলেন প্রখর মেধাবী, নিরহঙ্কারী, বিনয়ী, মিষ্টভাষী, সঠিক নেতৃত্ব দানের দুর্লভ যোগ্যতার অধিকারী। ভালোবাসা, ত্যাগের উজ্জ্বল ও অনুপম দৃষ্টান্ত মিশে গিয়েছিল তার জীবনের সাথে। তার মতো এ ধরনের প্রখর মেধাবী, প্রজ্ঞাবান, আদর্শিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত, নিষ্ঠাবান, ভালোবাসায় হৃদয়ভরা নিরহঙ্কারী হাজার গুণের সমন্বয়ে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আর দ্বিতীয়জন পায়নি। তাইতো তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বকালের সেরা ছাত্রের স্বীকৃতি দিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষকগণও। ছোট্ট একটি চিঠির অংশবিশেষ থেকেই চেনা যায় শহীদ আবদুল মালেকের চরিত্র সম্পর্কে। মহিউদ্দিন সাহেবের বাড়িতে লজিং থেকেও লেখাপড়া করেছিলেন শহীদ আবদুল মালেক। তাঁর কাছে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন- ‘জানি আমার দুঃসংবাদ পেলে মা কাঁদবেন, কিন্তু উপায় কী বলুন? বিশ্বের সমস্ত শক্তি আল্লাহর দেয়া জীবনবিধানকে পৃথিবীর বুক থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। আমরা মুসলমান যুবকেরা বেঁচে থাকতে তা হতে পারে না। হয় বাতিল উৎখাত করে সত্যের প্রতিষ্ঠা করবো নচেৎ সে প্রচেষ্টায় আমাদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আপনারা আমায় প্রাণভরে দোয়া করুন, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়েও যেন বাতিলের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে পারি। কারাগারের অন্ধকার, সরকারি জাঁতাকলের নিষ্পেষণ যেন আমাকে ভড়কে দিতে না পারে।’
পরিশেষে বলা যায়, শহীদ আবদুল মালেকের বৃত্তির একটা বড় অংশ ব্যয় হতো বই কেনার পেছনে। ক্লাসের পাঠ্যপুস্তকের বাইরে ইসলামী আন্দোলন সংক্রান্ত বহুবিধ পুস্তক তাঁর ব্যক্তিগত পাঠাগারে সংগৃহীত ছিল। অথচ আমরা যারা তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়নে শপথের কর্মী, আমাদের অবস্থান কোথায়? বই ক্রয়ের নজির তো দূরের কথা প্রকাশিত লেখাগুলো পড়ার আন্তরিকতা দেখাতে পেরেছি কি? শহীদ আবদুল মালেকের চরিত্রে আল্লাহ্ ভীতি ও দুনিয়াবি যোগ্যতার যে সমন্বয় ছিল তা আজো আমাদের স্বপ্নজাগায়। তাঁর ব্যক্তিগত চিঠিগুলো পড়লে আজও শরীরে শিহরণ জাগে। লেখনীতে বাহুল্যতা নেই, সংক্ষিপ্ত অথচ প্রভাব বিস্তারকারী। দায়িত্বশীল হিসেবে তিনি অনুপ্রেরণার উৎস। নিবিড় তত্ত্বাবধানকারী দায়িত্বশীল হিসাবে তাঁর দৃষ্টান্ত ছিল অনন্য। নামাজ কাজা বন্ধ করার জন্য ফজলুল হক হল থেকে কর্মীর হোস্টেলেই গিয়ে তিনি ডেকে তুলেছিলেন। দায়িত্বশীল মানেই একজন সেবক তার প্রমাণ তাঁর চরিত্রে সমুজ্জ্বল। বাড্ডায় টিসিতে টয়লেট মজবুত নয় মর্মে ইহতেসাবের পর তিনি নিজেই রাতে একবুক পানিতে নেমে টয়লেট ঠিক করেছেন। পরিচালকের জন্য ইহতেসাব গ্রহণের এ দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল। মেহমান এলে নিজে বই মাথায় দিয়ে শুয়ে মেহমানকে উপরে শুতে দিতেন। এমন ভারসাম্যপূর্ণ দায়িত্বশীল ইসলামী বিপ্লবের জন্য বড় বেশি প্রয়োজন।
লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply