ইসলামের দৃষ্টিতে খাদ্য ও পুষ্টি গ্রহণ -উম্মে নাজিয়াহ

খাদ্য মানুষের মৌলিক প্রয়োজনীয় উপাদানের মধ্যে প্রথম। খাদ্য ছাড়া কোনো প্রাণী বাঁচতে পারে না, পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকে আল্লাহ পাক সকল প্রাণীর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ধর্ম, জাতির প্রকারভেদে মানুষের খাবারের মধ্যে ব্যাপক বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়। একেক দেশ জাতি এবং ধর্মের লোকদের কাছে খাবারের উদ্দেশ্য একেক রকম। আমাদের পবিত্র ইসলাম ধর্মে মানুষের খাদ্য এবং পানীয় কী ধরনের হবে, খাদ্য গ্রহণের উদ্দেশ্য এবং পদ্ধতি সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দেয়া হয়েছে। খাদ্য গ্রহণের উদ্দেশ্য লোভ নয় এবং ভোগ নয়, শরীরকে কর্মক্ষম এবং রোগ থেকে প্রতিরোধের জন্য খাবার গ্রহণ প্রয়োজন। নবী করিম (সা) বলেছেন, তোমাদের কেউ যখন খাবার গ্রহণ করে তখন সে যেন ডান  থেকে খাবার খায় এবং ডান হাতে পানি পান করে, কেননা শয়তান বাম হাতে খায় এবং বাম হাতে পানি পান করে। (তিরমিজি)
নবীজি (সা) ইরশাদ করেছেন, বরকত নাজিল হয় খাবারের মাঝখান থেকে। সুতরাং খাবারের পাশ থেকে খাও, খাবারের মাঝখান থেকে খাবে না। (তিরমিজি : ১৮২৫)
খাবারের শুরুতে বিসমিল্লাহ এবং শেষে আলহামদুলিল্লাহ পড়া সুন্নাত। খাবার পছন্দ না হলে উহ আহ না করা। বিরক্তি প্রকাশ না করা বরং কেবল খাবার গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা।
খাবারের স্বাদের জন্য আমাদের সমাজে কত সমস্যাই না হয়ে থাকে। খাবার খারাপ হলে খাবার ছুড়ে ফেলাসহ গালাগাল এবং মারার ঘটনাও ঘটে থাকে। অথচ এসব কিছুই শিষ্টাচার পরিপন্থী।
বিরক্তিকরভাবে উচ্চ আওয়াজে খাবার চিবিয়ে খাওয়া নিষেধ করা হয়েছে। তদ্রƒপ কাঁচা পেঁয়াজ কিংবা কাঁচা রসুন খেয়ে মসজিদে গমন করাও নিষেধ করা হয়েছে। এতে মুখের দুর্গন্ধ অন্য লোকদের এবং ফেরেস্তাদের অসুবিধা হয়।
ইসলাম এমনই একটি ধর্ম যেখানে নিজের বিষয় বলে নয় অন্য মানুষের সুবিধার ব্যাপারে দৃষ্টি দিতে বলা হয়েছে।
ইদানীং অনেক ভদ্রলোক ঠিকভাবে মুখ পরিষ্কার করে না, মুখের দুর্গন্ধে কথায় বলে ভূতও পালায়। গায়ের জামা কাপড় না পরিষ্কার করে বের হওয়ার সময় দামি পারফিউম ¯েপ্র করে বের হয়। ঘরবাড়ি অগোছালো, পরিচ্ছন্নতার অভাব, দামি আসবাবপত্র থাকলেও পবিত্রতার বিষয় নেই। এ ধরনের মানুষ যত শিক্ষিত আর অর্থের মালিকই হোক না কেন সে প্রশংসিত নয় এবং পবিত্রও নয়। অনেকে এভাবে খাবার খায় যেমন কড়মড় করে কিংবা চবচব করে শব্দ করে যা অত্যন্ত লজ্জাকর এবং বিরক্তিকর।
নবীজি (সা) আরও ইরশাদ করেছেন, তোমাদের কেউ যখন ঘুমাতে যাবে তার আগে হাতে খাবারের গন্ধ রয়েছে যেমন গোশত, চর্বি ইত্যাদি সে যেন তা ধুয়ে নেয়।
অন্যথায় তার ওপর কোন বিপদ আবর্তিত হলে যে তার জন্য নিজেই দায়ী থাকবে।
তোমরা হেলান দিয়ে খাবার খাবে না, ডান পা দাঁড় করিয়ে বাম পায়ের ওপর বসে খাবার খাবে। আমরা যেনো দাসের মতো করে খাবার খাই কেননা আমি আল্লাহর কাছে একজন দাস ছাড়া কিছুই নই।
সুবহান আল্লাহ! এত বিনয়ী আমাদের প্রিয়নেতা আল্লাহর প্রিয় রাসূল অথচ আমরা খাদ্য গ্রহণের সময় কতই না অহঙ্কার প্রদর্শন করি, টেবিল ভর্তি রকমারি খাবার, দামি গ্লাস, প্লেট বিস্তার অপচয়, প্রতিযোগিতা, অহঙ্কারের সাথে খাবার গ্রহণ করা, খাবারের ডিজাইন, খাবারের পদ নির্বাচন, রান্নাপদ্ধতি নিয়ে তীব্র প্রতিযোগিতা, নাক সিটকানো টিটকারি, নিজকে দামি মনে করা, প্রচুর সময় নষ্ট করা রান্নার রেসিপি নির্বাচনের জন্য অথচ এই সকল অপচয় কমিয়ে গরিবদের সাহায্য করা, সময় বাঁচিয়ে ধর্মীয় কাজ করা সম্ভব।
অতিরিক্ত ভোজন সম্পর্কে নবীজি (সা) বলেছেন, কাফির খায় সাত পাতে, আর মুমিন খায় এক পাতে। (তিরমিজি : ১৮১২)
ইদানীং অনেক ব্যক্তি, পরিবার কারণে-অকারণে সারাদিন খাওয়া পছন্দ করে যাকে বলে ভোজনরসিক। খেতে বসলে পছন্দ মত খাবার হলে তো কথাই নেই, গলা পর্যন্ত ভরে খায়। অনেকে তো খাবার পর পর অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন গ্যাসের ঔষধ, পেপসি, বাতাস, বিশ্রাম, বমি, প্রেসার বেড়ে যাওয়া ডায়রিয়া ইত্যাদি সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে পড়ে। এ প্রসঙ্গে হাদিসে আছে, তোমরা পেটের ১/৩ খাবারের জন্য, ১/৩ পানীয়ের জন্য এবং ১/৩ খালি রাখতে হবে।
বনি আদমের তো মাত্র কয়েক লোকমা খাবারই যথেষ্ট যা তাকে সোজা রাখবে।
আধুনিক পুষ্টি বিজ্ঞানেও এই কথা বলে- পেট ভরে খেতে নেই। মানুষের বয়স, পুরুষ অথবা মহিলা, কাজের প্রকৃতি, শরীরের ওজন, শারীরিক অবস্থা সব কিছু বিবেচনা করে খাবার খেতে হবে। একবারে না খেয়ে চাহিদা অনুযায়ী খাবার অল্প অল্প করে খেতে হবে তবে শরীর সুস্থ এবং কর্মক্ষম থাকবে।
নবীজি (সা) আরো বলেছেন, তোমরা খাবারে ফুঁ দেবে না, এতে ক্ষতির কারণ রয়েছে।
তিনি আরো বলেছেন, সদ্য রান্না করা খাবারের ধোঁয়া নিঃশেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা কর।
আমরা জানি অতিরিক্ত গরম অথবা ঠান্ডা খাবার দাঁত এবং পাকস্থলীর জন্য ক্ষতিকর এবং ফুঁয়ের সঙ্গে অনেক ব্যাকটেরিয়া খাদ্যদ্রব্যকে বিষাক্ত করে ফেলতে পারে।
নবীজি (সা) আরো বলেছেন, আহার কালে যদি কোন লোকমা পড়ে যায় তবে সন্দেহের কিছু দেখলে সে যেন পরিষ্কার করে নেয় এবং তারপর তা খেয়ে নেয়, শয়তানের জন্য যেন তা ছেড়ে না দেয়। (তিরমিজি : ১৮০৯)
খাবারে মাছি পড়ে গেলে সেটি ডুবিয়ে দাও কেননা এর এক ডানায় রোগ এবং অন্য ডানায় শেফা রয়েছে।
খাবার খাওয়ার পর থালা বাসন পরিষ্কার করে রাখবে এবং খাবার, পানির পাত্র ঢেকে রাখতে হবে যাতে সেগুলো দূষিত না হয়ে পড়ে।
আমাদের দেশে হাদিসের এই শিক্ষাগুলো গ্রহণ না করার ফলে বহু মানুষ খাদ্যে বিষক্রিয়ায় মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হয়ে পড়ে, এমনকি বহু মানুষ মৃত্যুবরণ করে থাকে।
নবীজি (সা) আরো বলেছেন, খাবার বিশুদ্ধ এবং সুখাদ্য হতে হবে, মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, অখাদ্য, নেশাদ্রব্য, হিং¯্র প্রাণী ইত্যাদি খাবার হারাম করা হয়েছে। প্রত্যেক নেশাদ্রব্যই মাদক আর প্রত্যেক নেশাদ্রব্য হারাম। (বুখারি ও মুসলিম শরিফ : ৫৫৭৫ ও ৫০০৩)
নবীজি (সা) হারাম খাবার বিশিষ্ট দস্তরখানে বসতেও নিষেধ করেছেন।
খাবার হিসাবে খেজুর, জাইতুনের তেল (ওলিভ অয়েল), মিরকা (ভিনেগার), খাদ্যশস্য, ফল, মধু, হালাল মাংস খওয়ার কথা বলেছেন। নবীজি (সা) কদু পছন্দ করতেন। তিনি বলেছেন, তোমরা তেল খাও এবং শরীরে ব্যবহার কর।
সবচেয়ে উত্তম খাদ্য হলো খেজুর। “যে ব্যক্তি সকালে সাতটি খেজুর খাবে সারাদিন তাকে বিষ কিংবা জাদু কোন ক্ষতি করতে পারবে না।” (বুখারি ৪৪৫, মুসলিম : ২০৪৭)
খেজুর যকৃৎ শক্তিশালী করে, প্রকৃতিতে কোমলতা আনে, প্রেসার কমায়, মুখের জীবাণু ধ্বংস করে। খেজুর একই সাথে ফল, খাদ্য ঔষধ এবং মিষ্টান্ন।
ইসলামের জীবনবিধান অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ। আধুনিক পুষ্টি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে খাবারের প্রকৃতি এবং খাবার গ্রহণপদ্ধতি এবং খাদ্যবস্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হাদিসে সেই বিষয়গুলোর দিকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে যা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত এবং সে বিষয়গুলো দৈনন্দিন জীবনে বাস্তবায়ন করে সুন্দরভাবে জীবনযাপন করতে পারি।

SHARE