ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড । নাজমুস সাদাত

ইসলামের দৃষ্টিতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডবিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কথাটি বাংলাদেশের মানুষের কাছে অতি পরিচিত একটি আতঙ্কের নাম। এর বিভিন্ন রূপ আছে। এটি অনেক সময় ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ বা এনকাউন্টাররূপে হাজির হয়। আবার গ্রেফতারের পর অস্বীকার করে চিরতরে গুম করার ঘটনাগুলোও নেহাত কম নয়। অত্যধিক নির্যাতনে থানা হেফাজতে মৃত্যুর ঘটনা মাঝে মাঝেই ঘটে থাকে। এক কথায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলতে রাষ্ট্রীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার বা অপহরণের পর তাদের হেফাজতে থাকা অবস্থায় (বিনা বিচারে) কোন ব্যক্তির অস্বাভাবিক মৃত্যুকে বুঝায়।
তবে বাস্তবতা হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কখনও এ সকল হত্যাকাণ্ডকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে স্বীকার করতে চান না। তারা বিভিন্ন কাহিনীর অবতারণা করে থাকেন। যাইহোক গ্রেফতার বা অপহরণের পর কাউকে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করলো কী করলো না সেটা প্রমাণের জন্য আমার এ লেখাটি নয়। প্রকৃত ঘটনা কী তা যাচাইয়ের ভার আমি সেই মহান সত্তার নিকট সমর্পণ করছি যিনি আলিমুল গায়েব হিসেবে পরিচিত। আমি শুধু এখানে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে ইসলাম কী বলে তা বলার চেষ্টা করব।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে সকল সদস্য নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দিতে পছন্দ করেন, যারা পরকালে বিশ্বাস রাখেন বা যারা মনে করেন দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজের হিসাব আখিরাতে দিতে হবে এবং সে অনুযায়ী সেখানে ফল লাভ করতে হবে শুধুমাত্র তাদের উদ্দেশ্যে এ লেখাটি।
যারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে বিভিন্নভাবে জড়িয়ে পড়েছেন বা সামনে এ ধরনের পরিস্থিতিতে পড়তে পারেন, তারা অবশ্যই একটু গভীরভাবে চিন্তা করবেন। আপনারা যে কাজটি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বা চাপে পড়ে করছেন তা একজন মুসলিম হিসেবে আপনাদের করা উচিত কি না? এর জন্য দুনিয়াতে ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক কী শাস্তির বিধান আছে? বা পরকালে কী ভয়াবহ পরিণাম অপেক্ষা করছে?
আমাদের থেকে আপনারা অনেক বেশি জানেন বন্দুকযুদ্ধ বা ক্রসফায়ারের নামে সত্যিকারে কী ঘটনা ঘটে! বিনা বিচারে একজন মানুষকে পরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করে কিভাবে আবার নাটক সাজানো হয়! ক্রসফায়ার বা বন্দুকযুদ্ধের পরে আপনাদের দেয়া বিবৃতি যদি সত্য হয় তাহলে কোন কথা নয়, কিন্তু সেটা যদি সত্যিকারের হত্যাকাণ্ড হয় তাহলে কি ভেবে দেখেছেন এর পরিণতি কত ভয়ঙ্কর হতে পারে? আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করুন।
আপনারা নিজেরাও জানেন এভাবে আইন হাতে তুলে নিয়ে মানুষকে হত্যা করা দেশের প্রচলিত আইনবহির্ভূত। প্রকৃত বিচার হলে আপনাদের মৃত্যুদণ্ড হবে এটা স্বাভাবিক। তবে যেহেতু আপনারা সরকারের পক্ষে এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছেন, সেহেতু চিন্তা করছেন দুনিয়াতে আপনাদের বিচার করার মতো কেউ নেই। কিন্তু একজন মুসলিম হিসেবে আপনাদের সব সময় চিন্তা করা দরকার দুনিয়াতে বিভিন্নভাবে পার পেয়ে গেলেও কাল কেয়ামতের ময়দানে আপনাদের এ ঘটনার জন্য অবশ্যই কঠিন বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।
ইসলামে সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া শাস্তি হিসেবে কোন মানুষকে হত্যা করা মারাত্মক অপরাধ। এ শাস্তি প্রদান আবার বৈধ কর্তৃপক্ষ ব্যতীত প্রদান করার নিয়ম নেই। অর্থাৎ সুষ্ঠু বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শাস্তি প্রদান করতে হবে। আমাদের দেশে শাস্তি প্রদান বা কার্যকর করার জন্য পুলিশ, র‌্যাব বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোন বৈধ কর্তৃপক্ষ নয়, এর জন্য আলাদা বিচারব্যবস্থা আছে। সুতরাং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যেকোনো ধরনের শাস্তি প্রদান বা হত্যাকাণ্ড অবৈধ। যদিও হত্যার শিকার ব্যক্তি গুরুতর অপরাধী হয়ে থাকে। ক্রসফায়ারের নামে আমাদের দেশে যা হচ্ছে, ইসলামের দৃষ্টিতে তা সুস্পষ্ট হত্যাকাণ্ড ব্যতীত আর কিছু না। কারণ এখানে অবৈধ কর্তৃপক্ষ আইন হাতে তুলে নিচ্ছে। আবার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড সুনির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্র ছাড়া দেয়ার বিধান নেয়, কিন্তু এভাবে নিয়মবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় তার ব্যত্যয় ঘটে অহরহ।
ক্রসফায়ার, বন্দুকযুদ্ধ, গুম করে হত্যা যে নামেই ডাকা হোক না কেন এ ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের (নির্দেশদাতা ও বাস্তবায়নকারী উভয়েই) শাস্তি ইসলামের দৃষ্টিতে অবশ্যই মানুষ হত্যার শাস্তি হবে। আর মানুষ হত্যার শাস্তি ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত ভয়াবহ। ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যাকারী দুনিয়াতে কঠোর শাস্তির পাশাপাশি আখিরাতেও কঠোর শাস্তির সম্মুখীন হবে। হত্যাকারী চিরদিন জাহান্নামে থাকবে। এমনকি অনিচ্ছাকৃতভাবে মানুষ হত্যাকারীকেও ছাড় দেয়া হয়নি। পবিত্র কুরআন ও হাদিসে মানুষ হত্যা সম্পর্কে কি বলা আছে তা আমরা এখন জানার চেষ্টা করবো।
মানুষ হত্যাকারী চিরকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। এ সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের সূরা নিসার ৯২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করছেন-
“আর কেউ স্বেচ্ছায় কোনো মুমিনকে হত্যা করলে তার শাস্তি জাহান্নাম, সেখানে সে চিরকাল অবস্থান করবে। আর আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন ও তাকে অভিশপ্ত করেছেন এবং তার জন্য ভীষণ শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”
আল কুরআনে আল্লাহ একজন মানুষ হত্যা করাকে গোটা মানবজাতিকে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।
“নরহত্যা বা পৃথিবীতে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া কেউ কাউকে হত্যা করলে সে যেন দুনিয়ার সমগ্র মানবগোষ্ঠীকে হত্যা করলো।” (সূরা মায়িদা : ৩২)
ভুলবশত হত্যা করলেও পবিত্র কুরআনে কঠোর শাস্তির কথা বলা হয়েছেÑ
“কোন মুমিনের কাজ নয় অন্য মুমিনকে হত্যা করা, তবে ভুলবশত হতে পারে। আর যে ব্যক্তি ভুলবশত কোন মুমিনকে হত্যা করে তার কাফ্ফারা হিসেবে একজন মুমিনকে গোলামি থেকে মুক্ত করে দিতে হবে এবং নিহত ব্যক্তির ওয়ারিসদেরকে রক্ত মূল্য দিতে হবে তবে যদি তারা রক্তমূল্য মাফ করে দেয় তাহলে স্বতন্ত্র কথা। কিন্তু যদি ঐ নিহত মুসলিম ব্যক্তি এমন কোন জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে যাদের সাথে তোমাদের শত্রুতা রয়েছে তাহলে একজন মুমিন গোলামকে মুক্ত করে দেয়াই হবে তার কাফ্ফারা। আর যদি সে এমন কোন অমুসলিম জাতির অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে যাদের সাথে তোমাদের চুক্তি রয়েছে, তাহলে তার ওয়ারিসদেরকে রক্তমূল্য দিতে হবে এবং একজন মুমিন গোলামকে মুক্ত করে দিতে হবে। আর যে ব্যক্তি কোন গোলাম পাবে না তাকে পরপর দু’মাস রোজা রাখতে হবে। এটিই হচ্ছে এই গোনাহের ব্যাপারে আল্লাহর কাছে তাওবা করার পদ্ধতি। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও জ্ঞানময়।” (সূরা নিসা : ৯২)
আল্লাহতায়ালা মানুষের জীবনের সুরক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য কিসাসের মতো কঠোর শাস্তির বিধান দিয়েছেন। কিসাস হচ্ছে কেউ কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করলে এর শাস্তিস্বরূপ ঘাতককে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা। কুরআনে বলা হয়েছে-
“হে ইমানদারগণ! তোমাদের প্রতি নিহতদের ব্যাপারে কিসাস গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ করা হয়েছে।” (সূরা বাকারা : ১৭৮)
“আমি এ গ্রন্থে তাদের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ, চোখের বিনিময়ে চোখ, নাকের বিনিময়ে নাক, কানের বিনিময়ে কান, দাঁতের বিনিময়ে দাঁত ও জখমসমূহের বিনিময়ে সমান জখম।” (সূরা মায়েদা : ৪৫)
মানুষ হত্যা সম্পর্কে হাদিস শরিফেও অত্যন্ত কঠোর কথা বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ (সা) সতর্ক করে বলেছেন-
“জঘন্যতম কবিরা গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে শিরক সাব্যস্ত করা, পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা।” (বুখারি ও মুসলিম)
“দুনিয়া ধ্বংস করে দেয়ার চেয়েও আল্লাহর কাছে ঘৃণিত কাজ হলো মানুষ হত্যা করা।” (তিরমিযি)
নবী করিম (সা) ইরশাদ করেছেন, “কোনো মুসলমানকে হত্যা করা আল্লাহর কাছে সমগ্র দুনিয়া ধ্বংস হয়ে যাওয়া থেকে গুরুতর।” (নাসাঈ)
নরহত্যার ভয়াবহতার কারণে কিয়ামতের দিন আল্লাহ সর্বপ্রথম রক্তের হিসাব নিবেন, তারপর অন্যান্য অপরাধের বিচার করবেন। রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
“কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সর্বপ্রথম যে মোকদ্দমার ফায়সালা হবে, তাহলো রক্তপাত (হত্যা) সম্পর্কিত।” (বুখারি ও মুসলিম)
শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নয় বরং প্রত্যেক পরকালীন বিশ্বাসী মানুষকে হত্যাকাণ্ডের মত এ ভয়ঙ্কর অপরাধ থেকে বেঁচে থাকা জরুরি। আমাদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোর কিছু সদস্য বা দেশ পরিচালনার কিছু নেতৃবৃন্দ ঘুষ, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত থাকে বলে আমরা বিভিন্ন সময় সংবাদ মাধ্যমগুলোর মাধ্যমে জানতে পারি। ঘুষ, চাঁদাবাজি বা দুর্নীতি এগুলো পাপকাজ। এ জন্য অবশ্যই শাস্তি ভোগ করতে হবে। কিন্তু মানুষ হত্যার মতো এত মারাত্মক ও জঘন্য অপরাধ সেগুলোর সাথে তুলনা করা চলে না। এজন্য যে কোন উপায়েই হোক না কেন মানুষ হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সর্বদা পরিত্যাজ্য।
এখন প্রশ্ন আসতে পারে- সরকারের নির্দেশে, চাপে পড়ে বা চাকরি বাঁচাতে যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা দাবি করে তারা বাধ্য হয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে; তবে কি তারা ইসলামী আইনে মুক্তি পাবে?
অবশ্যই না। কারণ হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে আনুগত্য শুধুমাত্র ভালো কাজের। ইসলাম বহির্ভূত কোন কাজের আনুগত্য করা যাবে না।
নেতার আনুগত্য প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন-
মুমিন ব্যক্তির জন্য আমিরের (নেতার) কথা শোনা ও মানা অপরিহার্য। যেসব কথা পছন্দ হয় না সেগুলোও, যতক্ষণ তিনি আল্লাহ ও রাসূলের (সা) বিধানের বিরোধী কোনো হুকুম না দেবেন। অবশ্য যখনই তিনি আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের বিরোধী কোনো হুকুম দেবেন, তা শোনাও যাবে না, মানাও যাবে না। (বুখারি ও মুসলিম)
শুধু ইসলামী আইন না, বরং দেশের প্রচলিত আইন এবং পুলিশের নীতিমালাতেও এভাবে আইন হাতে তুলে নেয়া অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। কিন্তু পদোন্নতি বা কিছু নগদ লোভে, সরকারের রোষানলে পড়ে চাকরি হারানোর ভয়ে বা নিজ আদর্শের বিরোধীদের দমন করতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দেশের প্রচলিত আইন ও ইসলামী আইন উভয়ই লঙ্ঘন করছে। যার পরিণতি অবশ্যই জড়িতদের ভোগ করতে হবে। দুনিয়াতে শাস্তির হাত থেকে বেঁচে গেলেও আখিরাতে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচা সম্ভব নয়। তাই শুধু দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থে আখিরাতের অনন্ত জীবনে সীমাহীন দুর্দশা ক্রয় করা কোন বুদ্ধিমানের জন্য সমীচীন হবে না।
এ কথাগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য প্রযোজ্য নয়। বরং যারা তাদেরকে এ সকল কাজের জন্য বর্তমানে নির্দেশ দিচ্ছেন, অতীতে দিয়েছেন বা ভবিষ্যতেও দিবেন তাদের জন্যও প্রযোজ্য। আবার যারা এ সকল অবৈধ কাজ হতে দেখেও মুখ বুজে সহ্য করছেন আল্লাহ তাদেরকেও পাকড়াও করতে নিণ্ডয় ভুলবেন না, বিশেষ করে যাদের হাতে ক্ষমতা আছে এ গর্হিত কাজ সংশোধনের, তাদের জবাবদিহিও বেশি হবে।
আল্লাহ আমাদের দ্বারা মানুষ হত্যার মতো নিকৃষ্ট কাজ থেকে ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সকল অবস্থায় হেফাজত করুন এবং প্রকৃত মুমিন হয়ে চলার তৌফিক দিন। আমিন।
লেখক : বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply