ইসলামের সাংস্কৃতিক অবয়ব -জুলফিকার আহমেদ কিসমতী

কোনো জাতির রণাঙ্গনের পরাজয় আসল পরাজয় নয়-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরাজয়ই তার সার্বিক পরাজয়। কারোর রণাঙ্গনের পরাজয় যেমন তার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরাজয়ের মধ্য দিয়েই সূচিত হতে থাকে, তেমনি রণাঙ্গনের পরাজয়কে জয়ে রূপান্তরিত করতে হলে আগে সাংস্কৃতিক রণাঙ্গনে তাকে জয়ী হতে হয়। বস্তুত এ কারণেই বিশ্বের সব জাতিই নিজ নিজ সংস্কৃতি রক্ষায় সদা-সচেষ্ট। একই কারণে নিজস্ব সংস্কৃতি রক্ষা এবং অপসংস্কৃতি রোধের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়ে থাকে। আমাদের দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গ প্রায় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নিজস্ব সংস্কৃতির বিকাশ এবং বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ রোধের ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকেন। সাংস্কৃতিক অনুপ্রবেশই বাইরের হস্তক্ষেপের পথ সুগম করে দেয়। তাই এ বাস্তব সত্যের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তারা জাতিকে হুঁশিয়ার করেন।
সাহিত্য, সঙ্গীত, কারুকার্য, ভাস্কর্য প্রভৃতি শিল্পকলাকে অনেকে সংস্কৃতি বললেও এগুলো সংস্কৃতি নয়Ñসাংস্কৃতিক বাহন মাত্র। একই শিল্পের মাধ্যমে বিশ্বের যে কোনো সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তি ঘটতে পারে। সাহিত্যে একই নীতির অনুসরণে শব্দব্যঞ্জনা, উপমা, অলঙ্কার, অনুপ্রাসের প্রয়োগ করে একই রূপ রচনাশৈলীর মাধ্যমে জীবনবোধ ও জীবন ধারায় অভিব্যক্তি ঘটানো যেতে পারে। সঙ্গীতে একই সুর-তাল-লয়ের ব্যবহারে এবং একই মুদ্রা ও তালের প্রয়োগে বিভিন্ন জীবনবোধ ও জীবনধারা থেকে উৎসারিত ও নিঃসৃত রস যদি পরিবেশিত হতে পারে, এটা হতে পারবে না কেন? একইভাবে কারুকার্য, স্থাপত্য, ভাস্কর্য প্রভৃতি যাবতীয় শিল্পের ক্ষেত্রেও এই একই কথা প্রযোজ্য।
প্রশ্ন জাগতে পারে, শিল্প যদি সংস্কৃতির বাহন হয়, সংস্কৃতি বলা হবে কোনটিকে? আসলে মানুষের দৈহিক ও মানসিক বৃত্তিগুলোর উৎকর্ষ সাধন, তার ব্যবহারিক জীবন প্রত্যক্ষ জড় পরিবেশে সেগুলোর ফলিত রূপই হচ্ছে সংস্কৃতি। জীবন ও জগতের প্রতি মানুষের বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি এ বৃত্তিগুলোর পরিচর্যার ধারা ও পদ্ধতি নিয়ন্ত্রণ করে এবং তার ফলে মানুষের ব্যষ্টি ও সমষ্টি জীবনের সংস্কৃতির ওপর জীবনাদর্শের প্রভাব অত্যন্ত গভীর, ব্যাপক ও মৌল। আর এ কারণেই জীবনাদর্শ ভিন্ন হলে সংস্কৃতিও ভিন্ন ভিন্ন হতে বাধ্য। ইসলাম একটি জীবনাদর্শ। তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাতভিত্তিক জীবনদর্শন সঞ্জাত এই আদর্শ আর ইসলামভিত্তিক এ ব্যবস্থাই ইসলামী জীবনব্যবস্থা। ইসলামের এই দর্শন মানুষের বৃত্তিগুলো পরিচর্যার ধারা ও পদ্ধতিকে যেভাবে নিয়ন্ত্রণ করে, এর ফলে মানুষের ব্যবহারিক জীবন ও পরিবেশে যে সংস্কৃতি ফলিত হয়, তাই ইসলামী সংস্কৃতি। সুতরাং ইসলামী সাংস্কৃতিতে ইসলামের মূল্যবোধগুলো সক্রিয় থাকবে। এটাই প্রকৃতি স্বীকৃত বাস্তবতা। সুতরাং ইসলামী সংস্কৃতিতে ইসলামের মূল্যবোধগুলো সক্রিয় থাকবে- এটাই প্রকৃতি স্বীকৃত বাস্তবতা। ফলে ইসলামী সমাজে সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্র, স্থাপত্য, ভাস্কর্য প্রভৃতি শিল্পকলা ইসলামী মূল্যবোধের বাহন হবে- এ কথাই আমাদের বলিষ্ঠ কণ্ঠে বলতে হবে। অন্যথায় এতে কোনরূপ অস্পষ্টতা আমাদের লক্ষ্যে-অলক্ষ্যে নিছক বস্তুবাদী জীবনবোধকেন্দ্রিক সংস্কৃতির যূপকাষ্ঠে আবদ্ধ করা অসম্ভব কিছু নয়, যে জীবনবোধ ও সংস্কৃতিতে মৃত্যু-পরবর্তী জীবনে মানুষের কর্মকান্ডের জবাবদিহিতার বালাই নেই এবং নেই নৈতিকতার স্থান। ফলে এতে আত্মিক পরিশুদ্ধতার বিষয়টি গৌণ হয়ে মানববৃত্তিতে পাশবিকতা প্রাধান্য পায় আর তখন মানুষ সম্পূর্ণ ব্যক্তিস্বার্থকেন্দ্রিক এমন এক জীবে পরিণত হয়, যার ফলে ন্যায়-অন্যায়, বৈধ-অবৈধতার সীমা মেনে চলার প্রয়োজনীয়তাবোধ থাকে না। বলাবাহুল্য, আজ দেশে-বিদেশে সামাজিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ছোট-বড় যত অপরাধপ্রবণতা, নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা ও অশ্লীলতায় মানবজীবন কলুষিত এবং অশান্তির আগুনে দগ্ধিভূত, তার সবই হচ্ছে উল্লিখিত জড়বাদ নিঃসৃত জীবনবোধ, জীবনদর্শন ও তা থেকে সৃষ্ট সংস্কৃতির অবশ্যম্ভাবী পরিণতি। মূলত এ সংস্কৃতিই অপসংস্কৃতি পদবাচ্যের অধিকারী। পাশ্চাত্যের জড়বাদী শক্তিগুলো সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নামে অপরের ওপর নিজেদের আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অপসংস্কৃতিকেই বেছে নিয়েছে।
ইসলামী জীবন-চেতনা ও মূল্যবোধের সঙ্গে সংঘর্ষিত কোনো সাংঘর্ষিক কোনো সংস্কৃতির নাম যাই হোক না কেন, সেটা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ কোনো দেশ ও সমাজের জন্য যেমন সংস্কৃতি পদবাচ্যের অধিকারী হতে পারে না, তেমনি তা গ্রহণযোগ্যও নয়। এরূপ সংস্কৃতিকে কেউ কোনো মুসলিমপ্রধান দেশে ছলে-বলে কৌশলে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করলে সেটা বিদেশি হস্তক্ষেপের পথ সুগম করারই নামান্তর হবে। ক্ষমতা যাদের হাতে থাকে তারা অপসংস্কৃতির সয়লাবও ডেকে আনতে পারেন, আবার অনুপ্রবেশ বন্ধও করতে পারেন। এ জন্য কারো থেকে তাদের কোনো নতুন পরামর্শ বা বুদ্ধি গ্রহণের দরকার পড়ে না। কিন্তু এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিদের আহবানে আন্তরিকতা থাকলেও আহবান কার্যকর করায় আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। এই অভাব থাকার কারণে আহবান উদ্দেশ্যহীন হয়ে পড়েছে। অথচ প্রধান ভূমিকা আহবানকারীদেরই পালন করার কথা। এই অসঙ্গতির কারণে আহবানকে কাজের মাধ্যমে বাস্তবায়নে অনীহা থাকার ফলে অপসংস্কৃতির ধ্বজাধারীরা এ আহবানকে তাদের অনুকূলে সম্মতি ও অনুমতি বলেই ধরে নিয়েছেন, তারা সে অনুযায়ী তৎপর হয়ে অপসংস্কৃতি ডেকে আনছেন। কারণ তারা দেখেছেন, অপসংস্কৃতির এত বান-বন্যা ডেকে আনায় দেশের কোনো দায়িত্বশীল ও কর্তৃপক্ষীয় ব্যক্তিদের সঙ্গে তাদের কোনো গরমিল দেখা দিচ্ছে না বরং এ অঙ্গনে তারা প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতাই পাচ্ছেন, আর এ জন্য এ আহবানকে তারা ধরে নিয়েছেন পাবলিক ঠান্ডা রাখার রেওয়াজি আহবান হিসেবে। তাই বাস্তবে দেখা যায় সিনেমার বাণিজ্যিক প্রদর্শনীর এত প্রাবল্য, মারদাঙ্গা ছায়াছবি তৈরির এত হিড়িক, পর্নো পত্রপত্রিকার এত ছড়াছড়ি আর নগ্নতা ও বেহায়াপনার এত ব্যাপ্তি।
আমাদের মনে হয় অপসংস্কৃতির সংজ্ঞা ও ব্যাখ্যা নিয়ে যথেষ্ট বিভ্রান্তি রয়েছে। সবাই অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে কথা বলছেন, অথচ অপসংস্কৃতি বন্ধ হচ্ছে না বরং আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। এক পক্ষ যাকে অপসংস্কৃতি বলছে, অপরপক্ষ তাকেই আবার বলছে সংস্কৃতি। আবার এ পক্ষের সংস্কৃতি অপর পক্ষের কাছে অপসংস্কৃতি হিসেবে গণ্য হচ্ছে। এ জাতীয় বিভ্রান্তি থাকার কারণে প্রকৃত অপসংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ার অনুকূল পরিবেশ পাচ্ছে। এই বিভ্রান্তি থেকে বাঁচতে হলে অপসংস্কৃতির রাষ্ট্রীয় সংজ্ঞাও থাকা দরকার। এ জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি বা জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ। আমাদের মতে, এ লক্ষ্য বা দৃষ্টিভঙ্গি নির্ধারণ হয়েই আছে, শুধু রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুসরণই বাকি। আমরা কোন জাতি, আমাদের উদ্দেশ্য-আদর্শ কী? আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সভ্যতা-সংস্কৃতি, ঈমান-আকিদা কী তা নতুন করে বলার কিছু নেই। দেশের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা এবং দেশবাসী সব মানুষই তা জানেন। শুধু সেই ঈমান-আকিদা ও ইতিহাস-ঐতিহ্যের ভিত্তিতে জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি সরকারিভাবে ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করলেই আমাদের বিশ্বাস, অপসংস্কৃতি পালানোরও পথ পাবে না। এই উদ্যোগ আর পদক্ষেপ যতদিন না নেয়া হবে, ততদিন অপসংস্কৃতি নিয়ে মৌসুমি আদেশ-নিষেধ জারি করা হবে এবং বক্তৃতা-বিবৃতিতে প্রতিরোধের আহবান জানানো হবে; কিন্তু অপসংস্কৃতি কখনো দূর হবে না।

SHARE

Leave a Reply