ইসলামে জবাবদিহিতা -এস. এম রুহুল আমীন

জবাবদিহিতা ইসলামের অন্যান্য বিষয়ের মতোই অন্যতম একটি মৌলিক বিষয়। মানবসমাজে এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে রাসূূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘সাবধান! তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেকেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে। শাসক তার জনগণের দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। একজন পুরুষ তার পরিবারের দায়িত্বশীল, অতএব তাকে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। স্ত্রী তার স্বামী ও সন্তানের দায়িত্বশীল, কাজেই সে তার দায়িত্বশীলতা বিষয়ে জিজ্ঞাসিত হবে। আর দাস তার মনিবের সম্পদের দায়িত্বশীল, তাকে তার দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জবাবদিহি করতে হবে। তোমরা প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল। অতএব তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ নিজ অধীনস্থের দায়িত্বশীলতার ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে।’ (সহিহ বুখারি ও মুসলিম) জবাবদিহিতার কারণে ইসলামের সৌন্দর্য শুধু নয় বরং তার গ্রহণযোগ্যতাও হয়েছে সবার কাছে। এ কথা স্বতঃসিদ্ধ যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদেরকে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়া বল্গাহীন করে সৃষ্টি করেননি। পবিত্র কুরআনের দু’টি আয়াতে সরাসরি এ ব্যাপারে কথা হয়েছে।

তার একটি হলো- “অবশ্যই আমি পৃথিবীতে একজন খলিফা বা প্রতিনিধি পাঠাতে চাচ্ছি।” (সূরা বাকারাহ : ৩০) এবং দ্বিতীয়টি হলো- “আমি জিন এবং মানুষকে আমার ইবাদাতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।” (সূরা আয-যারিয়াত : ৫৬) আর তাই এই দুনিয়ার প্রত্যেকটি কাজের জবাবদিহি করতে হবে আমাদের। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো; আর প্রত্যেকের চিন্তা করে দেখা উচিত যে, সে আগামীকালের অর্থাৎ আখিরাতের জন্য কী অগ্রিম পাঠিয়েছে বা প্রেরণ করেছে; তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। তোমরা যা করো নিশ্চয়ই আল্লাহ সে বিষয়ে খবর রাখেন বা সম্যক অবহিত।” (সূরা হাশর : ১৮) আমাদের সব কাজের বিবরণ আল্লাহ নিজেই সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর নিশ্চয়ই তোমাদের ওপর পরিদর্শক বা সংরক্ষকগণ রয়েছে, সম্মানিত লেখকবৃন্দ, তারা জানে, যা তোমরা করো।’ (সূরা ইনফিতার : ১০-১২) এবং বিচারের দিন আমাদের তা পাঠ করার জন্য বলা হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাকে বলা হবে, পাঠ করো তোমার কিতাব, আজ তুমি নিজেই তোমার নিজের বিরুদ্ধে হিসাব-নিকাশকারী হিসেবে যথেষ্ট।’ (সূরা বনি ইসরাইল : ১৪) সেসব কাজের ওপর ভিত্তি করে আমাদের পুরস্কার হিসেবে জান্নাত কিংবা শাস্তি হিসেবে জাহান্নামে দেয়া হবে।

আর তাই এই দুনিয়াবি জীবনের প্রত্যেকটি কাজই গুরুত্বপূর্ণ। ভালো কিংবা মন্দ সব কাজেরই বিনিময় দেয়া হবে এই দিনে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “যে হিদায়াত গ্রহণ করে, সে তো নিজের জন্যই হিদায়াত গ্রহণ করে এবং যে পথভ্রষ্ট হয় সে নিজের জন্যই পথভ্রষ্ট হয়। আর কোন বহনকারী অপরের পাপের বোঝা বহন করবে না। আর রাসূল প্রেরণ না করা পর্যন্ত আমি কোনো জাতিকে শাস্তি দেই না।” (সূরা বনি ইসরাইল : ১৫) উপরন্তু, কোনো কিছুই; সম্পত্তি কিংবা ব্যক্তি সে দিন কারো কোনো কাজে আসবে না ব্যক্তির আমল ছাড়া, আর আল্লাহর সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এটা সে দিন, যে দিন কোনো ব্যক্তির অপর ব্যক্তির জন্য কিছু করার কোনো ক্ষমতা থাকবে না। সে সমস্ত কর্তৃত্ব থাকবে একমাত্র আল্লাহর হাতে।” (সূরা ইনফিতার : ১৯)
উল্লেখ্য, ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যক্তির জবাবদিহিতা দুইভাবে বিবেচিত হয়। এক. দুনিয়াতে তাকে জবাবদিহি করতে হবে এবং দুই. আখিরাতের বিচারের দিবসে।

উদাহরণস্বরূপ, কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দেয়া হবে, কিংবা ডাকাতি বা সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালালে তার বিপরীত দিক থেকে এক পা এবং এক হাত কেটে দেয়া হবে। অন্যদিকে, আখেরাতের জীবনের জবাবদিহিতা অত্যন্ত যৌক্তিক। কারণ, একজন ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলে তার শাস্তি হবে মৃত্যুদণ্ড কেউ যদি একাধিক ব্যক্তিকেও হত্যা করে তাহলে তাকে একাধিকবার হত্যা করা সম্ভব নয়। অন্যদিকে অনেক অপরাধী আছে যাদের সম্পর্কে জানা যায় না কিংবা জানার পরেও প্রচলিত বিধানে শাস্তি দেয়া হয় না। সে ক্ষেত্রে, বৈষম্য অবধারিত হয়ে ওঠে। কিন্তু আখিরাতে এটি করা সম্ভব হবে। এভাবে দুনিয়ার জীবনের প্রত্যেকটি অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে ইসলামে। এখানে তাই আখিরাতের বিচারে সফলতা কিংবা ব্যর্থতাই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হবে। সেখানে জান্নাতিরাই হবে চূড়ান্ত সফলকাম। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “জাহান্নামবাসী ও জান্নাতবাসীরা সমান নয়; কারণ জান্নাতবাসীরাই হবেন সফলকাম।” (সূরা আল-হাশর : ২০)

ফলে একজন বিশ^াসীর সার্বক্ষণিক চিন্তাচেতনা থাকে তার কোনো অপরাধ সম্পর্কে কেউ না জানলেও কিংবা কোনো জবাবদিহিতা না করতে হলেও আল্লাহর সামনে তাকে দাঁড়াতে হবে এবং হিসাব দিতে হবে মানে জবাবদিহি করতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “সেদিন রুহ বা জিবরাইল ও ফেরেশতাগণ সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াবে, যাকে পরম করুণাময় অনুমতি দেবেন সে ছাড়া অন্যরা কোনো কথা বলবে না। আর সে শুধুমাত্র ন্যায়সঙ্গত ও সঠিক কথাই বলবে।” (সূরা নাবা : ৩৮) সুতরাং সে নিজেকে এসব থেকে বিরত রাখার যথাসাধ্য চেষ্টা করে। ফলে, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টিতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে।

আখিরাতে প্রত্যেকটি বিষয়ের সূক্ষ্মভাবে হিসাব নেয়া হলেও বিশেষ কয়েকটি বিষয়কে কুরআন ও হাদিসে উল্লেখ করে তার উপরে বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। যেমন, প্রখ্যাত সাহাবি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, কিয়ামতের দিন পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত কেউ এক কদমও সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। আর তা হলো- ‘কিয়ামতের দিন কোনো আদম সন্তান তার রবের কাছে পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর না দেয়া পর্যন্ত এক কদমও সামনে অগ্রসর হতে পারবে না। (১) কিভাবে সে তার জীবনকে অতিবাহিত করেছে? (২) তার যৌবনকে সে কিভাবে ব্যয় করেছে? (৩) সে কিভাবে অর্থ সম্পত্তি আয় করেছে? (৪) অর্জিত অর্থ সম্পত্তি কোন পথে ব্যয় করেছে? (৫) সে তার জ্ঞানের আলোকে কী করেছে? (সুনানু তিরমিজি) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা মানুষের ছোট-বড় সব কাজ লিখে রাখছেন- “তারা যা করছে সবই রেজিস্টারে লিখিত আছে এবং প্রতিটি ছোট ও বড় বিষয়ই লিখিতভাবে বিদ্যমান আছে।” (সূরা ক্বামার : ৫২-৫৩)
মূলত এ পাঁচটি প্রশ্নের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের সামাজিক, অর্থনৈতিক অবস্থা ভিন্ন হওয়া সত্ত্বেও নির্বিশেষে সবার প্রত্যেক বিষয়েরও হিসাব নেয়া সম্ভব। এসব প্রশ্নের উত্তর তখনই যথাযথভাবে দেয়া যাবে যখন ব্যক্তি তার জীবনকে আল্লাহর দেয়া বিধানের আলোকে এবং রাসূল সা.-এর দেখানো পথে পরিচালিত করতে সচেষ্ট হয়।
সত্যিকার অর্থে কিভাবে এ জীবনকে কাজে লাগিয়ে আখিরাতের জীবনে সফলতা নিশ্চিত করা যায় সে ব্যাপারেও রাসূল সা. কার্যকর দিকনির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘পাঁচটি বিষয়ের আগে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দাও। (১) বৃদ্ধ হওয়ার আগে তোমার যৌবনকে, (২) অসুস্থ হওয়ার আগে সুস্থতাকে, (৩) দরিদ্রতার আগে সচ্ছলতাকে, (৪) ব্যস্ততার আগে অবসর সময়কে এবং (৫) মৃত্যুর আগে জীবনকে।’ (সুনানু আহমদ)
আখিরাতের জবাবদিহিতা হবে পুঙ্খানুপুঙ্খরুপে, ক্ষুদ্্রাতিক্ষুদ্র এবং সূক্ষ্মাতি সূক্ষ্মভাবে। আল্লাহ তায়ালার দৃষ্টি এড়ানো যাবেনা কোন কিছু থেকেই। সূরা যিলযালের ৭ ও ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তায়ালা একথাই স্পষ্ট করে বলেছেন, “সুতরাং যেই আমল করবে অণুপরিমাণ ভালো, সে তা দেখতে পাবে। আর যেই আমল করবে অণুপরিমাণ মন্দ। সেও তা দেখতে পাবে।”

আখিরাতে আদালতে মানুষ তার স্বভাব অনুযায়ী অস্বীকার করতে চাইবে তার খারাপ কাজগুলোকে। কিন্তু কোনো কাজই হবে না। অস্বীকার করার কোনো সুযোগই থাকবে না। মহান আল্লাহ তায়ালা মানুষের মুখ বন্ধ করে দিয়ে খুলে দিবেন অন্যান্য অঙ্গ প্রত্যঙ্গ। সে কথাই প্রতি ধ্বনিত হয়েছে- সূরা আন নূরের ২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “কিয়ামতের সেই দিন তাদের জিহ্বা, তাদের হাত এবং তাদের পা তারা যা কিছু করেছে সে সম্পর্কে সাক্ষ্যদান করাবেন।”

কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে আল্লাহ প্রদত্ত, রাসূল সা. প্রদর্শিত দুনিয়ার অর্পিত সকল দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে যেমন, ঠিক তেমনই ভোগ করা সকল নিয়ামত সম্পর্কে। সূরা আত-তাকাসুরের ৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তারপর সেই দিন অর্থাৎ কিয়ামতের দিন তোমাদের দেয়া সকল নেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”

মানুষ অন্যায় করে এবং একটা ভুলের ঘোরে নিমজ্জিত থাকে। তাকে মনে হয় তথা কার্যত কোনো পীর বা বিনিময়ের মাধ্যমে পার পেয়ে যাবে তার অপরাধ থেকে আসলে তা সবই গুড়ে বালি। মহান আল্লাহ তায়ালা এসব ভ্রান্ত ধারণা প্রতিবাদ করে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় সূরা আল বাকারাহর ৪৮ নম্বর আয়াতে বলেন, “আর তোমরা ভয় করো ঐদিনকে (কিয়ামত) যেদিন কোনো মানুষ অন্য মানুষের কোনো দাবি পরিশোধ করতে পারবে না, কবুল করা হবে না কারো পক্ষ থেকে কারো জন্য কোনো সুপারিশ, গ্রহণ করা হবে না কারো পক্ষ থেকে কোনো বিনিময় এবং তাদেরকে কোনো সাহায্য ও করা হবে না।” সূরা ইয়াসিনের ৬৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আমরা দুনিয়ার অস্বীকারকারীদের মুখে সিল মেরে কথা বন্ধ করে দেবো, আর এদের হাত আমার সাথে কথা বলবে, অপরাধের সাক্ষ্য দেবে তাদের পা, এভাবেই তাদেরকে ব্যবহারের কৃতকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য প্রদান করবে।” আর সে জন্য আমাদের প্রত্যেকেরই উচিত বুদ্ধিমান হওয়া। দুনিয়ার জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে মৃত্যুর কথা বেশি বেশি স্মরণ করে তার জন্য প্রস্তুতি নেয়া। আর এটাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ। নি¤েœ সে কথারই প্রতিধ্বনি হয়েছে। রাসূল সা. বলেছেন, হযরত আব্দুল্ল­াহ্ ইবনে উমর রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, এক ব্যক্তি বললো, হে আল্ল­াহর নবী! লোকদের মধ্যে অধিক বুদ্ধিমান, জ্ঞানী ও সতর্ক ব্যক্তি কে? উত্তরে নবী করীম সা. বলেছেন, লোকদের মধ্যে যে মৃত্যুকে সবচেয়ে বেশি স্মরণ করে এবং উহার জন্য যে সবচেয়ে বেশি প্রস্তুতি গ্রহণ করে তারাই হচ্ছে প্রকৃত বুদ্ধিমান ও হুঁশিয়ার লোক, তারাই দুনিয়ার সম্মান ও পরকালের মর্যাদা লাভ করতে পারে। (তাবরানী ও মু’জামুস সাগীর)

প্রতিটি মুহূর্তই আমাদেরকে মৃত্যু তথা ইহকালীন জীবনের শেষ মুহূর্তের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। অথচ একবারও কি চিন্তা করে দেখেছি কী প্রেরণ করছি আমাদের সত্যিকারের জীবন অনন্ত জীবন আখিরাতের জন্য? এসব চিন্তা আমাদের সবারই করা জরুরি।

সুতরাং, উল্লিখিত কুরআন ও হাদিসের আলোকে যদি আমাদের ইহজাগতিক জীবনের সময় ও সুযোগগুলোকে কাজে লাগানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করতে পারি তাহলে বিচার দিবসের কঠিন পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে সকল কাজের জবাবদিহিতার মাধ্যমে আল্লাহর অনুগ্রহ নিয়ে চূড়ান্ত সফলতা তথা জান্নাতে অধিবাসী হতে পারবো, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : গবেষক ও প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply