ইসলামে বাইয়াতঃ মু’মিনের করণীয় । ড. মোঃ শফিকুল ইসলাম

৮. إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ৯. لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا ১০. إِنَّ الَّذِينَ يُبَايِعُونَكَ إِنَّمَا يُبَايِعُونَ اللَّهَ يَدُ اللَّهِ فَوْقَ أَيْدِيهِمْ فَمَنْ نَكَثَ فَإِنَّمَا يَنْكُثُ عَلَى نَفْسِهِ وَمَنْ أَوْفَى بِمَا عَاهَدَ عَلَيْهُ اللَّهَ فَسَيُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا .
৮. আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্যদানকারী, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে। ৯. যাতে তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর। ১০. যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের উপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ্ সত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন। (সূরাহ আল-ফাত্হ: ৮-১০)

নামকরণ
আল-ফাত্হ (الْفَتْحِ) অর্থ- সুসংবাদ দেয়া, খুলে দেয়া, বিজয় লাভ করা। অত্র সূরার প্রথম আয়াতে হুদায়বিয়ার সন্ধির মাধ্যমে ইসলাম প্রতিষ্ঠা এবং মুসলিম জাতির মহাবিজয়ের স্পষ্টতর ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা দিয়ে বলা হয়েছে – إِنَّا فَتَحْنَا لَكَ فَتْحًا مُّبِينًا “নিশ্চয় আমি তোমাকে প্রকাশ্য বিজয় দান করেছি।” এ আয়াত হতেالْفَتْحِ ’ (ফাত্হ ) শব্দটি চয়ন করে এই সূরার নামকরণ করা হয়েছে বলে প্রতিভাত হয়। উল্লেখ্য যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলে মানুষ পরস্পরের নিকট হতে নিরাপত্তা লাভ করল এবং মহান আল্লাহর দ্বীনের দিকে পরিব্যাপ্তি বেড়ে গেল, আর মু’মিনরা বিভিন্ন দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে ইসলামের প্রকৃত দাওয়াত তুলে ধরতে সক্ষম হলো তখন দলে দলে মানুষ ইসলামে প্রবেশ করল। তাই অত্র সূরার নামকরণ ‘আল্-ফাত্হ’ রাখা যথার্থ ও সার্থক হয়েছে।

সূরাটি নাজিলের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ও সময়কাল
ষষ্ঠ হিজরির জিলকদ মাসে যখন রাসূল (সা) স্বপ্নে আদিষ্ট হয়ে ওমরাহর উদ্দেশ্যে চৌদ্দশত সাহাবায়ে কেরামকে সাথে নিয়ে মক্কা মুর্কারমায় তাশরিফ নিয়ে যান এবং হেরেম শরিফের সন্নিকটে হুদায়বিয়া নামক স্থানে পৌঁছেন তখন কুরাইশরা রাসূল (সা)-এর কাফেলাকে মক্কা প্রবেশে বাধা প্রদান করে। তখন রাসূল (সা) হজরত উসমানকে (রা) কুরাইশ নেতৃবৃন্দের নিকট দূত হিসেবে প্রেরণ করেন এই সংবাদ দেয়ার জন্য যে, মুসলমানরা যুদ্ধ করার অভিপ্রায় নিয়ে এখানে আসেননি বরং তাঁরা এসেছেন বায়তুল্লাহ জিয়ারত ও হারামের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে। কুরাইশরা বলল, ‘আমরা মুহাম্মদকে কিছুতেই মক্কায় প্রবেশ করতে দিব না। হে উসমান! আপনি তাওয়াফ করতে চাইলে তা করতে পারেন।’ উসমান (রা) বলেন, মহানবী (সা) এই ঘর তাওয়াফ করার পূর্বে আমি কিছুতেই তা করবো না। তাঁর এই জবাব শুনে কুরাইশরা তাঁকে আটক করে। তারা তিন দিন পর্যন্ত তাঁকে আটক করে রাখে।
ইতোমধ্যে মুসলিম শিবিরে খবর আসে যে, উসমান (রা) শহীদ হয়েছেন। তখন মহানবী (সা) বলেন, এই স¤প্রদায়ের সাথে যুদ্ধ না করা পর্যন্ত আমরা এই স্থান ত্যাগ করব না। অতঃপর মহানবী (সা) উপস্থিত সাহাবীগণকে বায়াতের (আনুগত্যের শপথ) আহবান জানালেন। সকল সাহাবী মহানবীর (সা) আহবান শুনামাত্র চতুর্দিক হতে ছুটে এসে আল্লাহর রাসূলকে (সা) বেষ্টন করে দাঁড়ালেন। উপস্থিত সকল সাহাবী ‘সামুরা’ বৃক্ষের নিচে মহানবীর (সা) হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করেন। এই বায়াতই ইসলামের ইতিহাসে ‘বায়াতুর রিদওয়ান’ নামে প্রসিদ্ধ। অতঃপর কুরাইশরা পরিস্থিতির নাজুকতা উপলব্ধি করে উসমান (রা)-কে ছেড়ে দেয় এবং মুসলমানদের সাথে সমঝোতা ও সন্ধির জন্য আকৃষ্ট হয়ে সুহাইল ইবন আমরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল রাসূল (সা)-এর নিকট সন্ধি স্থাপনের জন্য প্রেরণ করে।
কুরাইশরা রাসূল (সা)কে এই বছর ওমরাহ না করে মদিনায় ফিরে গিয়ে পরবর্তী বছর ওমরাহ কাযা আদায়ের জন্য প্রস্তাব করেছিল। মহানবী (সা) একদল সাহাবীর অনিচ্ছা সত্তে¡ও তাদের প্রস্তাবে রাজি হয়েছিলেন। রাসূল (সা) যখন ইহরাম খুলে হুদায়বিয়া থেকে মদিনার দিকে যাত্রা করেন তখন পথিমধ্যে সূরাতুল ফাত্হ অবতীর্ণ হয়।

সূরাহ আল্-ফাত্হ’র আলোচ্য বিষয়
সূরাতুল ফাত্হ পবিত্র আল-কুরআনের ২৬তম পারার আটচল্লিশতম সূরা। এ সূরাটিতে মোট চারটি রুকু, ঊনত্রিশটি আয়াত রয়েছে। অত্র সূরায় মহান আল্লাহ হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রেক্ষাপট, বিজয়ের সুসংবাদ, বায়াতুর রিদওয়ান, মু’মিনদের প্রতি রহমত, রাসূল (সা) প্রেরণের উদ্দেশ্য, মুনাফিক ও মুশরিকদের অবস্থা বর্ণনা, সাহাবীগণের গুণাবলিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেছেন।
নির্বাচিত আয়াতসমুহের আলোচ্য বিষয়
নির্বাচিত আয়াতসমূহে (৮ম-১০ম) বিশেষভাবে দু’টি বিষয় আলোচনা করা হয়েছে। ১. রাসূলুল্লাহ (সা) ও মু’মিনদের দায়িত্ব কর্তব্য ২. ইসলামী শরিয়াতে বায়াতের গুরুত্ব।

নির্বাচিত আয়াতসমূহের ব্যাখ্যা:
৮ম আয়াত: রাসূলুল্লাহ (সা)-এর ওপর তিনটি দায়িত্ব
(إِنَّا أَرْسَلْنَاكَ شَاهِدًا وَمُبَشِّرًا وَنَذِيرًا ُ)
‘‘আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সাক্ষ্যদানকারী, সুসংবাদদাতা ও ভয় প্রদর্শনকারীরূপে।”
রাসূল (সা)-এর আগমন সমগ্র মানবজাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতস্বরূপ। তাঁকে প্রেরণের উদ্দেশ্য সম্পর্কে সূরা তাওবার ৩৩তম, ফাতাহর ২৮তম এবং আস-সফের ৯ম আয়াতে বলা হয়েছে যে, পৃথিবীতে যত মতবাদ, দ্বীন বা জীবনব্যবস্থা রয়েছে সেগুলোর ওপর দ্বীন ইসলামকে বিজয়ী বা প্রতিষ্ঠিত করাই হলো রাসূল প্রেরণের উদ্দেশ্য। এ উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উপর বহু দায়িত্ব রয়েছে। এ দায়িত্বের ধারাবাহিকতায় অত্র আয়াতে রাসূলুল্লাহর (সা) তিনটি দায়িত্বের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যথা-

  • এক. শাহিদ (شاهد) বা সাক্ষ্যদাতা
  • দুই. মুবাশ্শির (مبشر) বা সুসংবাদদাতা
  • তিন. নাজির (نذير) বা সতর্ককারী।

এক. তিনি شاهد (শাহিদ) বা সাক্ষ্যদাতা। রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাক্ষ্যদানের দায়িত্ব বড়ই ব্যাপক। দুনিয়ায় তিনি কথা ও কাজের দ্বারা সাক্ষ্য দেন। তিনি যা বলেন তা-ই সত্য ও সঠিক। কারণ তিনি নিজের পক্ষ থেকে নয়, আল্লাহর অহির ভিত্তিতে কথা বলেন। তিনি আল্লাহর ইচ্ছা ও মর্জির সাক্ষী। তিনি যে কাজ যেভাবে করেছেন সেটাই সঠিক। তিনি তাঁর জীবনে আল্লাহর ইচ্ছাই পূরণ করেছেন। তাই আমলের দিক দিয়েও তিনি আল্লাহর সাক্ষী।
আমরা জানি সাক্ষ্য দু’ধরনের হয়। মৌখিক সাক্ষ্য এবং বাস্তব সাক্ষ্য। রাসূলুল্লাহ (সা) বিশ্বমানবতার কল্যাণে সর্বদা সত্য ও ইনসাফপূর্ণ কথার মাধ্যমে মৌখিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। পাশাপাশি বাস্তব সাক্ষী হিসেবে তা কর্মের মাধ্যমে পেশ করেছেন।
এরপর আখিরাতেও তিনি সাক্ষীর দায়িত্ব পালন করবেন। সেখানে তিনি সাক্ষ্য দেবেন যে, তিনি আল্লাহর অহির বাণী পুরোপুরি পৌঁছে দিয়েছেন এবং কথা ও কাজের মাধ্যমে সঠিকভাবে আল্লাহ যা চান তা মানুষের নিকট স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। রাসূলের (সা) এ সাক্ষ্যের ভিত্তিতে আল্লাহ ফায়সালা করবেন যে, যারা রাসূলকে মেনে চলেছে, তাদের জন্যই পুরস্কার রয়েছে আর যারা তা করেনি তারা শাস্তিযোগ্য।
অতএব রাসূলুল্লাহ (সা)-এর উম্মত হিসেবে আখিরাতে তাঁর সুপারিশ পেতে হলে আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো, সত্যের জন্য মৌখিক ও বাস্তব উভয় ধরনের সাক্ষ্য দিতে হবে।
দুই. রাসূল (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘মুবাশ্শির’ তথা আনুগত্যশীল বান্দাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদদাতা। নবী-রাসূল ছাড়া অন্য কেউ ভালো কাজের যে ভালো ফল হবে বলে সুসংবাদ দেয়, তাতে ভুল হতে পারে। কিন্তু রাসূল যখন কোনো বিষয়ে সুসংবাদ দেন, তাতে সামান্য সন্দেহও করা চলে না। তাই রাসূল (সা) যখন কোন সুসংবাদ দেন তখন বুঝতে হবে যে, এটা আল্লাহরই আইন। তিনি যেসব কাজের বদলায় জান্নাতের সুসংবাদ দেন তা অকাট্য সত্য। তিনি মানবজাতিকে আল্লাহর পক্ষ থেকে এ সুসংবাদ দিয়েছেন, যে ব্যক্তি ঈমান গ্রহণ ও নেককর্ম করবেন তাদের জন্য রয়েছে দুনিয়াই শান্তি ও আখিরাতে চিরস্থায়ী জান্নাত।
তিন. রাসূল (সা) আল্লাহর পক্ষ থেকে ‘নাজির’ তথা জাহান্নামের আজাবের ব্যাপারে সতর্ককারী। এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্যই আইন। যেসব কাজের ফলে দুনিয়ায় অশান্তি ও দুঃখ হবে এবং আখিরাতে শাস্তি হবে বলে তিনি বলেছেন, তা নিশ্চিত হবে। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে কাফিরদের জন্য বিভিন্নভাবে জাহান্নামের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।

৯ম আয়াত: মু’মিনদের ওপর তিনটি দায়িত্ব : (لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَتُعَزِّرُوهُ وَتُوَقِّرُوهُ وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا)
যাতে তোমরা আল্লাহ্ ও রাসূলের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন কর এবং তাঁকে সাহায্য ও সম্মান কর এবং সকাল-সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা ঘোষণা কর।
অত্র আয়াতে মু’মিনদেরকে আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি ঈমান আনার নির্দেশ দেয়ার পর আরো তিনটি কাজের নির্দেশ দেয়া হচ্ছে। তাঁকে সাহায্য কর (تُعَزِّرُوهُ)। তাঁকে শ্রদ্ধা কর (تُوَقِّرُوهُ) এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা কর (وَتُسَبِّحُوهُ بُكْرَةً وَأَصِيلًا)।
ইমাম বাগাবী (রহ)সহ একদল বিশিষ্ট মুফাস্সির বলেন, আয়াতের অর্থ হবে, ‘তোমরা রাসূলকে তাঁর দায়িত্ব পালনে সহযোগিতা দান কর এবং তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দেখাও আর সকাল ও সন্ধ্যায় আল্লাহর পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকো।’ কিন্তু অপর একদল মুফাসসিরের মতে, বাক্যের অর্থ হবে, ‘তোমরা আল্লাহর সাথে থাকো, তাঁকে সম্মান ও মর্যাদা দেখাও এবং সকাল-সন্ধ্যায় তাঁরই পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাকো।’
সকাল-সন্ধ্যায় পবিত্রতা বর্ণনা করা (بُكْرَةً وَأَصِيلًا)-এর অর্থ শুধু সকাল ও সন্ধ্যায় নয়, বরং সর্বক্ষণ পবিত্রতা বর্ণনা করতে থাক। কিংবা সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর সালাত আদায় কর।
অতএব একজন মু’মিন হিসেবে আমাদের প্রত্যেকের কর্তব্য হলো রাসূলুল্লাহ (সা)-এর পূর্ণ আনুগত্য ও সম্মান করতে হবে এবং সকাল-সন্ধ্যা তথা ২৪ ঘণ্টায়ই আল্লাহর বিধান মোতাবেক জীবনকে পরিচালনা করতে হবে।

১০ম আয়াত: ইসলামী শরিয়াতে বায়াতের গুরুত্ব
“যারা আপনার কাছে আনুগত্যের শপথ করে, তারা তো আল্লাহর কাছে আনুগত্যের শপথ করে। আল্লাহর হাত তাদের হাতের ওপর রয়েছে। অতএব, যে শপথ ভঙ্গ করে; অতি অবশ্যই সে তা নিজের ক্ষতির জন্যই করে এবং যে আল্লাহর সাথে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে; আল্লাহ্ সত্বরই তাকে মহাপুরস্কার দান করবেন।”
ষষ্ঠ হিজরিতে হুদায়বিয়ার সন্ধির প্রাক্কালে রাসূল (সা) সাহাবায়ে কিরাম থেকে যে বায়াত নিয়েছিলেন সেই বায়াতের প্রতি এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে। বায়াতকারীদের প্রতি মহান আল্লাহ অত্যন্ত সন্তুষ্ট হলেন। বায়াতকালে মু’মিনেরা যে হাতে বায়াত করছিল তা ব্যক্তি রাসূলের হাত ছিল না, আল্লাহর প্রতিনিধির হাত ছিল এবং রাসূলের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর সাথে এ বায়াত অনুষ্ঠিত হচ্ছিল।
বায়াত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিভাষা। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট বায়াত হয়েছেন। বায়াত শব্দটি ‘বা’য়ুন’ শব্দ থেকে নির্গত। এর আভিধানিক অর্থ ক্রয়-বিক্রয়, লেন-দেন, চুক্তি, আনুগত্যের শপথ, অঙ্গীকার, নেতৃত্ব মেনে নেয়া ইত্যাদি।
মহান আল্লাহ বলেন, যারা রাসূলের (সা) হাতে বায়াত করেছে, তারা যেন স্বয়ং আল্লাহর হাতেই বায়াত করেছে। কারণ, এই বায়াতের উদ্দেশ্য আল্লাহর আদেশ পালন করা ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কাজেই তারা যখন রাসূলের হাতে হাত রেখে বায়াত করল, তখন যেন আল্লাহর হাতেই বায়াত করল। আল্লাহর হাতের স্বরূপ কারও জানা নেই এবং জানার চেষ্টা করার বৈধ নয়।
যাঁরা রাসূল (সা)-এর হাতে বায়াতে রিদওয়ানে শরিক হয়েছিলেন, তাঁদের প্রতি আল্লাহ তা‘আলা সন্তুষ্টি ঘোষণা করে অত্র সূরার ১৮তম আয়াতে বলেন, “মুমিনগণ যখন বৃক্ষের নিচে আপনার হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করেছে, তখন আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি তাদের হৃদয়ে যা ছিল তা তিনি অবগত ছিলেন। সুতরাং তিনি তাদের ওপর প্রশান্তি অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদেরকে দিলেন আসন্ন বিজয়।”
জাবির (রা) বলেন, রাসূল (সা) বলেছেন, “এই বৃক্ষের নিচে যারা বায়াত গ্রহণ করেছে সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করবে, তবে লাল উটের মালিক নহে।” তাঁর এ কথার পর আমরা তালাশ করে দেখলাম এক ব্যক্তি তার উট হারায়ে তা খোঁজ করছে। আমরা তাকে বললাম, “তুমি বায়াত গ্রহণ করেছ কি?” সে বলল, “বায়াতের চেয়ে আমার হারানো উট খুঁজে পাওয়া আমার নিকট শ্রেয়।”
আল্লাহর পথে জীবন উৎসর্গ করার এ ওয়াদা সাময়িক নয়। হুদায়বিয়াতে ঐ ওয়াদা পালনের দরকার হয়নি বলে সে ওয়াদার দায়িত্ব সেখানেই শেষ হয়ে যায়নি। এ ওয়াদা স্থায়ী এবং সারা জীবনের জন্য। যদি এ ওয়াদা কেউ পালন না করে তাহলে এর কুফল সে অবশ্যই ভোগ করবে। আর যারা সারাজীবন এ ওয়াদা পালন করতে থাকবে তারা বড় পুরস্কার পাবে।
রাসূলুল্লাহ (সা)-এর সাহাবীগণ সকলেই রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট বায়াতের মাধ্যমে আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন। তা ছাড়া বিভিন্ন সময়ে নিজেদের জান-মালকে উৎসর্গ করে দেয়ার জন্য সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর হাতে হাত রেখে বায়াত গ্রহণ করেছিলেন। যেমন- বায়াতে আকাবা, বায়াতে শাজারাহ ইত্যাদি। খোলাফায়ে রাশেদিনের যুগেও আনুগত্যের এ শপথ (বায়াত) অনুষ্ঠিত হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রকৃত ইসলামী সংগঠনের মধ্যে বায়াতের এ পদ্ধতি চালু রয়েছে।
একজন মু’মিনের প্রাথমিক দাবিই হলো জান্নাত লাভের উদ্দেশ্যে নিজের জান-মালকে আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দেবার জন্য বায়াতে আবদ্ধ হওয়া। আর এই বায়াত গ্রহণের পদ্ধতিই হলো দায়িত্বশীলের মাধ্যমে জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলনের কাছে দ্বীন কায়েমের জন্য খালেস নিয়তে নিজের জান-মালকে খরচ করার জন্য বায়াত গ্রহণ করা। সাহাবীগণ যে উদ্দেশ্যে বায়াত গ্রহণ করতেন সেটাই হলো বায়াতের আসল উদ্দেশ্য। মহান আল্লাহ বলেন-
وَأَوْفُوا بِعَهْدِ اللَّهِ إِذَا عَاهَدْتُمْ وَلَا تَنْقُضُوا الْأَيْمَانَ بَعْدَ تَوْكِيدِهَا وَقَدْ جَعَلْتُمُ اللَّهَ عَلَيْكُمْ كَفِيلًا إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا تَفْعَلُونَ
“আল্লাহর নামে অঙ্গীকার করার পর সে অঙ্গীকার পূর্ণ কর এবং পাকাপাকি কসম করার পর তা ভঙ্গ করো না, অথচ তোমরা আল্লাহকে জামিন করেছ। তোমরা যা কর আল্লাহ্ তা জানেন।”
সহিহ মুসলিম গ্রন্থে বর্ণিত, ইবন উমর (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যে ব্যক্তি বায়াত ছাড়াই মারা গেল সে জাহেলিয়াতের মৃত্যুবরণ করল।”
সহিহ বুখারি গ্রন্থে আরো উল্লেখ রয়েছে, ইবন উমর (রা) বলেছেন, আমরা যখন রাসূলুল্লাহ (সা)-এর কাছে বায়াত গ্রহণ করতাম শ্রবণ ও আনুগত্যের ওপর এবং তিনি আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী উক্ত আমল করার অনুমতি দিয়েছেন।”
অতএব, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য বায়াত বা শপথ গ্রহণ করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক।

শিক্ষা

  1. রাসূলুল্লাহ (সা) বিশ্বমানবতার কল্যাণে সর্বদা সত্য ও ইনসাফপূর্ণ কথার মাধ্যমে মৌখিক সাক্ষ্য দিয়েছেন। পাশাপাশি বাস্তব সাক্ষী হিসেবে তা কর্মের মাধ্যমে পেশ করেছেন। অতএব তাঁর উম্মত হিসেবে আমাদেরকেও এ দায়িত্ব পালন করতে হবে।
  2. রাসূলুল্লাহ (সা) মানবজাতিকে ঈমানের পথে নিয়ে আসার জন্য জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং জাহান্নামের শাস্তি সম্পর্কে সতর্কও করেছেন। অতএব আমাদেরকেও এ পদ্ধতিতে দাওয়াতি কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
  3. মুহাম্মদ (সা)-এর প্রতি অনাবিল ঈমানের মাধ্যমে আল্লাহকে সাহায্য করা, তাঁর সম্মান-মর্যাদার প্রতি গুরুত্ব দেয়া এবং সার্বক্ষণিক আল্লাহর পবিত্রতার ঘোষণা করার মধ্যেই মানবজাতির ইহ-পরকালীন কল্যাণ নিহিত।
  4. সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা)-এর নিকট বায়াত গ্রহণ করেছেন। অতএব আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য বায়াত বা শপথ গ্রহণ করা প্রত্যেকের জন্য আবশ্যক। আর শপথকৃত ওয়াদা পূরণকারীদের জন্য আল্লাহ আশাতীত পুরস্কার নির্ধারণ করে রেখেছেন।

লেখক: ইসলামী চিন্তাবিদ ও প্রফেসর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply