ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়ন -আবুল কালাম আজাদ

মানবসম্পদ (Human Resources) একটি দেশের অন্যতম শক্তিশালী পুঁজি। একটি দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের জন্য মানবসম্পদই চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। মানসম্পন্ন মানবসম্পদ কোন একটি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ বা খনিজসম্পদ অপেক্ষা অধিক গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হিসেবে বিবেচিত। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেবলমাত্র মানবসম্পদের ওপর ভর করে উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করেছে। এ জন্যই বর্তমান বিশ্বে মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
মানব উন্নয়ন বা (Human development) বলতে আমরা কর্মক্ষম মানুষের স্বাস্থ্য, জ্ঞান, দক্ষতা এবং সফলতা বৃদ্ধিকে বোঝাই। সমাজবিজ্ঞানীগণ Human Resources developmentবলতে বোঝান it is a process of increasing Knowledge. skill and capacity of a people in the society. উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানবসম্পদই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ factor হিসেবে কাজ করে। অর্থনীতিবিদদের পরিভাষায় মানবপুঁজির (Human capital) উৎপাদন প্রক্রিয়ায় কার্যকরভাবে ব্যবহার করার নামই Human Resources development.
মানবসম্পদ উন্নয়ন সম্পর্কিত ধারণাটি এখন নানাভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞগণ ভিন্ন ভিন্ন আঙ্গিকে মানব উন্নয়নকে সংজ্ঞায়িত করেছেন। কয়েক বছর আগে হাঙ্গেরির বুদাপেস্টে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনে বলা হয় ‘আধুনিক অর্থে মানব উন্নয়ন হচ্ছে মানুষের উৎপাদন নীতি বৃদ্ধিকরণ অর্থাৎ উৎপাদনকর্মে প্রয়োজনীয় উপকরণ হিসেবে মানুষের কারিগরি দক্ষতা বা ব্যবহার উপযোগী বৃদ্ধিকরণ। হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০০১ এ বলা হয়েছে it is about creating an environment in which people can develop their full potential and lead productive creative lives in acres with their needs and interest. এখানে জীবনের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ বা পরিস্ফুটনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে মানুষের কর্মদক্ষতা উন্নয়নের (building of human capabilities) ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। মৌলিকভাবে মানব উন্ননের জ্ঞানার্জন, সম্পদের ব্যবহার স্বাস্থ্যকর এবং মানসম্মত জীবনযাপনের প্রতি জোর দেয়া হয়। Human development past present and future শিরোনামে প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, The most basic capabilities for human development as to lead long and healthy lives, to lee knowledgeable to have access to the resources receded for a decent standard of living and to be able to participate in the community.
মানবসম্পদ উন্নয়ন একটি প্রক্রিয়া। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী সম্পদে পরিণত হয়। মানবসম্পদে উন্নয়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মানবগোষ্ঠীর সুপ্ত প্রতিভা, প্রচ্ছন্ন শক্তি লুক্কায়িত সামর্থ্য অন্তর্নিহিত কর্মক্ষমতা, যোগ্যতা ও মেধাকে উৎপাদনশীল কাজে ব্যবহার উপযোগী করার উপযুক্ত পরিবেশ ও ক্ষেত্র তৈরি হয়। মানব উন্নয়নের মাধ্যমে মানুষের আশা আকাক্সক্ষা পূরণের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তাই এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে বলা হয়েছে-it is a process of enlarging the range of peoples choice incareging tear opportunities for education heathcares income employment and covering the full of mankind from sound physical environment to economic and political freedom.
মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্র: মানবসম্পদ উন্নয়নের ব্যাপারে পর্যাপ্ত শ্লোগান শোনা গেলেও মানবসম্পদ উন্নয়নের উপায় নির্ধারণ বেশ কঠিন। তবে সাধারণভাবে বলা যায়, মানবসম্পদ উন্নয়নের উপায় বা ক্ষেত্র হচ্ছে দেশের জনগণ, জনসাধারণের স্বাস্থ্য শিক্ষা প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।
যেমন-
ষ শিক্ষা সম্প্রসারণ
ষ প্রশিক্ষণ
ষ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা উন্নয়ন
ষ পুষ্টি
ষ পরিবেশ
ষ জনসংখ্যা
ষ প্রযুক্তি উন্নয়ন
ষ মানব উন্নয়নের নতুন চ্যালেঞ্জ
(ক) সন্ত্রাস (খ) মাদকাশক্তি (গ) দুর্যোগ

ইসলামে মানবসম্পদ উন্নয়ন
শিক্ষা হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে মানবসম্পদের উন্নয়ন ঘটে। এ কারণে শিক্ষাকে জাতীয় উন্নয়নের চাবিকাঠি বলা হয়। শিক্ষা মানুষের মন, অভ্যাস, আচরণ ও মূল্যবোধকে প্রভাবিত করে। শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা অর্জিত হয়। যার ফলে শিক্ষাকে বলা হয় Education is key to development.
মানুষের দৈহিক ও মানসিক দক্ষতা বা কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যক্তির মধ্যে মানসিক গুণাবলির বিকাশ ও চরিত্র গঠন। কল্যাণের সমাজ গঠনের জন্য ব্যক্তিকে উৎপাদনক্ষম ও মানববীয় গুণাবলি সম্পন্ন হতে হবে। এদিক থেকে শিক্ষা হচ্ছে লক্ষ্য অর্জনের একটি প্রক্রিয়া। এ প্রক্রিয়ায় একটি সার্বজনীন ও শাশ্বত আদর্শের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয়।
একদিকে বিশ্বময় অভাবনীয় ক্রমাগত উন্নয়ন ও অপরদিকে হতাশাব্যঞ্জক চরম দারিদ্র্যের সহাবস্থানের মাঝেও একটি সর্বজনীন ও শাশ্বত আদর্শের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।
এরই ফলশ্রুতিতে জাতিসংঘের উইলি ব্রান্ড কমিশনের সুচারিকো যর্থাথই বলা হয়েছে- “পৃথিবীর নতুন প্রজন্মের জন্য শুধু অর্থনৈতিক সমাধানই যথেষ্ট নয়। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করার আদর্শের ও প্রয়োজন। তাদের মানবিক মর্যাদা পারস্পরিক সৌহার্দ্যবোধ, সততা, দয়া ও ন্যায়বিচারের মূল্যবোধে উজ্জীবিত হওয়া প্রয়োজন। শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত তিনটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য, দৈহিক ও মানবিক কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যক্তিকে উৎপাদন বা কর্মক্ষম করা ব্যক্তির মধ্যে চারিত্রিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানো। সার্বজনীন ও শাশ্বত একটি আদর্শকে প্রেরণার উৎস হিসেবে গ্রহণ।
সকল দিক বিবেচনা করে ইসলামে শিক্ষার ওপর অত্যধিক গুরুত্বরোপ করে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “বল হে আমার প্রভু আমার জ্ঞান বৃদ্ধি কর। বল যারা জানে, আর যারা না জানে উভয়ে কি সমান? জ্ঞানীরা উপদেশ গ্রহণ করে থাকে।”
আবার অন্যত্র বলা হয়েছে, “তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে ও যাদেরকে জ্ঞান দান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা বহু উন্নত করেছেন। তোমরা যে কাজ কর আল্লাহ তার সংবাদ রাখেন।”
হাদিসে বলা হয়েছে “সৎ শিক্ষাদানের চেয়ে শ্রেষ্ঠতর কোনো বৃক্ষ কোন পিতা তার পুত্রের জন্য রোপণ করতে পারেনি।” (আবু দাউদ ও তিরমিজি)
অন্য আরেকটি হাদিসে বলা হয়েছে, “যে বিদ্যা অর্জনে বের হয়েছে, সে ফিরে না আসা পর্যন্ত আল্লাহর সাথে থাকে। শিক্ষার মাধ্যমে মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে নিম্নোক্ত কয়েকটি লক্ষ্য অর্জিত হয়।
ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন সামাজিকভাবে স্বীকৃত একটি মেকানিজম গড়ে ওঠে।
ষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন, দৈহিক ও মানসিক দিক থেকে নাগরিকবৃন্দকে কর্মক্ষম করে তোলেন।
ষ মানবীয় ও চারিত্রিক গুণাবলি অর্জিত হয়।
ষ শক্তিশালী অনুপ্রেরণামূলক শক্তি সৃষ্টি হয়।
ষ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে ইতিবাচক ও শক্তিশালী কলাকৌশল অর্জিত হয়।
ষ প্রচলিত পদ্ধতি পরিবর্তন বা পুনঃবিন্যাসের কলাকৌশল অর্জিত হয়।
ষ মানবজীবনের বহুমুখী চাহিদার সাথে জীবনবিকাশের ধারাকে তিনটি পর্যায়ে ভাগে করা যায়।
ক. মানবজীবনে জাতীয় অনুভূতি ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনা তথা কর্মক্ষম বা উপার্জনক্ষম হতে অনুপ্রেরণা জোগায় এবং উদ্বুদ্ধ করে। আল্লাহপ্রদত্ত সম্পদভাণ্ডারকে মানবসম্পদ কাজে লাগিয়ে সর্বাধিক লাভ ও সুবিধা প্রাপ্তিরত উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি দক্ষতা অর্জনে ব্যক্তি উদ্বুদ্ধ হয়।
মানবকল্যাণে আরো সম্পদ আরোহণ অনুসন্ধান ও কল্যাণকর কাজে নিয়োজিত করতে নির্দেশনা ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। কুরআনুল করীমে বলা হয়ছে, “পৃথিবীকে আমি বিস্তৃত করেছি এবং এতে পর্বতমালা স্থাপন করেছি তোমাদের জন্য আর তোমরা যাদের জীবিকাদাতা নও তাদের জন্যও।” (সূরা হিজর : ১৯-২০)
কুরআনে আরো বলা হয়েছে, “তিনিই সমুদ্রকে অধীন করেছেন যাতে তোমরা উহা হতে তাজা মাংস আহার করতে পার যাতে তা হতে আহরণ করতে পার রতœাবলি যা তোমরা ভূষণরূপে পরিধান কর।” (সূরা নাহল : ১৪)
আবার বলা হয়েছে, “সালাত সমাপ্ত হলে তোমরা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ সন্ধান করবে ও আল্লাহকে অধিক স্মরণ করবে, যাতে তোমরা সফলকাম হও।” (সূরা জুমা : ১০)
প্রাকৃতিক সম্পদরাজিকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জনে ইসলামে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। কোরআনুল কারিমে বিজ্ঞানের কালকে প্রভূত কল্যাণকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “তিনি যাকে ইচ্ছা হিকমত দান করেন এবং যাকে হিকমত দান করা হয় তাকে প্রভূতকল্যাণ দান করা হয় এবং বোধশক্তি সম্পন্ন লোকেরাই শুধু শিক্ষা গ্রহণ করে।” (সূরা বাকারা : ২৯৬)
যাবতীয় বিষয়বস্তুকে সঠিক জ্ঞানদ্বারা জানাকে হিকমত বলে। শিক্ষার মাধ্যমে বিজ্ঞানও প্রযুক্তিগত জ্ঞান অর্জন করে জনগণকে সম্পদে পরিণত করার মধ্যই সফলতা।
খ. একজন ব্যক্তির মধ্যে মানবীয় এবং চারিত্রিক গুণাবলি তৈরি ও বিকশিত হয়। ব্যক্তির মধ্যে সততা, ন্যায়বোধ, দয়া, আত্মত্যাগ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার মত গুণাবলি অর্জিত হয়। দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টি হয়। মানবিক ও আত্মিক গুণাবলির উন্মেষ ঘটে। শুধু তাই নয়, চারিত্রিক ও মানবীয় যত উত্তম গুণ আছে ব্যক্তির মধ্যে তা সৃষ্টি হয়। এ পর্যায়ে ব্যক্তির ভ্রাতৃত্ববোধ, মানবকল্যাণ ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত উজ্জীবিত হয়। ব্যক্তির মধ্যে আখলাকে হাসানা সৃষ্টি হয়। কুরআনে যে মহৎ গুণের কথা উল্লেখ আছে সেগুলো মানব চরিত্রে বিদ্যমান থাকলে তাকে আখলাকে হাসানা বা উত্তম চরিত্র বলা হয়। অন্য কথায় মানব চরিত্রের মহৎ গুণগুলোকে আখলাকে হাসানাহ বলে। অপর পক্ষে যেসব খারাপ গুণ ব্যক্তিকে হীন, নীচ, ইতর ও নিন্দনীয় করে তাকে আখলাকে সাজিয়ার অন্তর্ভুক্ত। মানবজীবনে আখলাকে হাসানার গুরুত্ব অপরিসীম। হযরত রাসূলে করীম সা:-এর জীবনদর্শনই আখলাকে হাসানার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
উত্তম গুণাবলির অধিকারী ব্যক্তি সম্পর্কে হযরত রাসূলে করীম সা: বলেছেন, “তোমাদের মাঝে সে ব্যক্তিই উত্তম যার চরিত্র উত্তম। (মিশকাত) একটি হাদিস বর্ণিত হয়েছে কিয়ামতের চরিত্র।” (আবু দাউদ)
আখলাকে হাসানা মানুষের সাথে পারস্পরিক সুসম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব অটুট রাখতে ও কল্যাণকর সমাজগঠনের ভিত বিনির্মাণে সাহায্যে করে। শিক্ষার মাধ্যমে ব্যক্তির মাধ্যমে আখলাকে হাসানা সৃষ্টি হয়।
আখলাকে হাসানা সমাজে ন্যায়পরায়ণতা সুবিচার ছাড়া একত্ববাদ, আল্লাহর প্রতিনিধিত্ব ও ভ্রাতৃত্ববোধের ধারণা অন্তঃসারশূন্য। সকল প্রকার অসমতা অবিচার শোষণ জুলুম, অন্যায় ও অন্যের অধিকার হরণের প্রতিবাদের মাধ্যমে সুবিচার প্রতিষ্ঠার প্রতি ইসলামের অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
অন্য এক আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেছেন, “হে মুমিনগণ আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানে অবিচল থাকবে। কোন সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ তোমাদেরকে যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। সুবিচার করবে ইহা নিকটতম এবং আল্লাহকে ভয় করবে। তোমরা যা কর আল্লাহতার সম্যক খবর রাখেন।” (সূরা মায়িদা : ৮)
শিক্ষা মানবসম্পদ উন্নয়নে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি শীর্ষক এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে, “গভীর অনুধাবন, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের মাধ্যমে আল্লাহকে উপলব্ধির পর, স্বভাবতই মানুষের মনে আল্লাহর প্রতি কৃজ্ঞতাবোধ এবং তার কর্তৃত্বের প্রতি আনুগত্যের অনুভূতি জাগরিত হয়। মানুষ কামনা করে আল্লাহর সান্নিধ্য ও করুণা।
প্রাকৃতিক গুণাবলি পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানিক জ্ঞানার্জনের প্রতি কুরআনুল করীমেও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিকৌশলে, দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে, যা মানুষের হিত সাধন করে তাসহ সমুদ্রে বিচরণকারী জলযানসমূহে আল্লাহ আকাশ থেকে যে ভারী বর্ষণ দ্বারা ধরিত্রীকে তার মৃত্যুর পর পুনরুজ্জীবিত করেন তাতে এবং তার মধ্য যাবতীয় জীবজন্তুর বিচরণে বায়ুর দিক পরিবর্তনে আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়মিত মেঘমালাতে জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।” (সূরা বাকারা : ১৬৪) অন্য আর একটি আয়াতে বলা হয়েছে, “আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টিতে দিবস ও রাত্রির পরিবর্তনে নিদর্শনাবলি রয়েছে বোধশক্তিসম্পন্ন লোকের জন্য।” (সূরা আলে ইমরান : ১৯০)
(গ) মানবজীবন বিকাশের ক্ষেত্রে এটাই সবচেয়ে উচ্চপর্যায়। একে “নাফসে মুতামাইন্না হিসেবে অভিহিত করা হয়। মানবজীনের এ স্তরে মানবজীবনের দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে সচেনতা সৃষ্টি হয় এবং মানবীয় গুণাবলি বিকশিত হয়। এ পর্যায়ে মানুষে সততা ও ন্যায়বোধ দয়া ও ত্যাগের অনুভূতিতে উজ্জীবিত হয়ে কল্যাণকর ও সৎকর্ম সৃষ্টিতে প্রয়াসী হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে আল্লাহর খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে অর্পিত দায়িত্ব পালনের জন্য আত্মিক ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটে। মানবজীবনের লোভ-লালসা, রোগ-ব্যাধি, হিংসাবিদ্বেষ, গিবত, আপবাদ, বিদ্বেষ, অহঙ্কার ইত্যাদি মন্দ স্বভাব পরিত্যাগ করে সততা, ন্যায়পরায়ণতা, বিনয়, নম্রতা, দয়া ও ত্যাগ ইসলাম ও আমানতদারি দ্বারা নিজেকে সুশোভিত করা ইহসানের মূল কথা। ইহসানের আভিধানিক অর্থ হলো সুন্দর ব্যবহার, ভালোভাবে কোনো কাজ সম্পাদন করা, আরো কষ্ট লাঘব করা। সহজ কথায় মহান আল্লাহ রাববুল আলামিন ও তাঁর সৃষ্টির প্রতি যাবতীয় কর্তব্য সুন্দর ও উত্তমরূপে সম্পাদন করার নাম ইহসান।
প্রকৃতপক্ষে পিতা-মাতা আত্মীয়স্বজন, পাড়া, প্রতিবেশী, ইয়াতিম, দুস্থ, অভাবগ্রস্ত প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী প্রভৃতি সকলের প্রতি ইহসান করার ব্যাপারে কুরআন মজিদে নির্দেশ করা হয়েছে। কুরআনে বলা হয়েছে, “এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম, অভাবগ্রস্ত, নিকটাত্মীয়, দূর প্রতিবেশী, সঙ্গী-সাথী, মুসাফিরদের প্রতি সদ্ব্যবহার করবে।” (সূরা নিসা : ৩৬)
মানুষ ছাড়াও আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টি যেমন উদ্ভিদ, প্রাণী, জীবজন্তু ও কীট-পতঙ্গের প্রতিও ইহসান করতে হবে। এ বিষয়ে গুরুত্বারোপ করে হজরত রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, “তোমরা জমিনের অধিবাসীদের প্রতি দয়া প্রদর্শন করবে তাহলে আসমানের অধিপতি আল্লাহও তোমাদের প্রতি দয়া করবেন।” (তিরমিজি শরিফ)
বাস্তবিক পক্ষে আদল ইহসান নৈতিকতা আধ্যাত্মিকতার উৎকর্ষতা ও পরিপূর্ণতা বিধানের জন্য রাসূলকে প্রেরণ করা হয়েছে। স্বয়ং তিনি এরশাদ করেন, “মাকারিম আখলাক সচ্চরিত্রের পরিপূর্ণতা বিধানের জন্য আমি প্রেরিত হয়েছি।”
ইহসান প্রকৃতপক্ষে মহৎগুণ, মানবজীবনে এর অসাধারণ গুরুত্ব রয়েছে। সৎকর্মকে শ্রেষ্ঠ কাজ হিসেবে উল্লেখ করে কুরআনুল করীমে এরশাদ করা হয়েছে, “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে তারাই সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ, যার নিম্ন দেশে নদী প্রবাহিত। সেথায় তারা চিরস্থায়ী হবে।” (সূরা বায়্যিনা : ৭-৮)
জীবন বিকাশের বিভিন্ন পর্যায়ের সাথে সঙ্গতি রেখে অর্জিত ফলাফলের ক্ষেত্রে তিনটি মাত্রা পরিলক্ষিত হয়। সেগুলো যেমন
মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণকল্পে সকল সম্পদকে ব্যবহার উপযোগী করার জন্য বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি জ্ঞানও দক্ষতা অর্জন। প্রকৃতি, স্রষ্টা, জীবন ও জগৎ পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনার মাধ্যমে মানবিক গুণাবলি অর্জন ও বিকাশে শিক্ষার মাধ্যমে উল্লিখিত উদ্দেশ্যাবলি বাস্তবায়িত হয়। মানবসম্পদ উন্নয়নের ক্ষেত্রে শিক্ষা অন্যতম হাতিয়ার। মানবসম্পদ উন্নয়নে এর কোনো বিকল্প নেই, যা কুরআন ও হাদিসের মূল কথা ও সকল ক্ষেত্রে সেটাই বিধৃত হয়েছে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক

SHARE

Leave a Reply