ইসলাম প্রতিষ্ঠায় নারীর অংশগ্রহণ

হাফেজা আসমা খাতুন

ইসলাম সমগ্র মানবজাতির জন্য স্রষ্টাপ্রদত্ত একমাত্র নির্ভুল জীবনব্যবস্থা। স্রষ্টাপ্রদত্ত এ নির্ভুল জীবনব্যবস্থা সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র সার্বিক কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা।
ইসলাম ছাড়া দুনিয়ায় যত ধর্ম, মত, পথ, ইত্যাদি সৃষ্টি হয়েছে, সমস্ত মানুষের মনগড়া ধর্ম, মনগড়া মতবাদ। মানুষের মনগড়া ধর্ম, মনগড়া মতবাদ, কোনকালেই মানবজাতির কোন কল্যাণ দিতে পারেনি, এখনো পারছে না, আর কোনো কালে পারবেও না।
বরং মানবরচিত এসব মনগড়া ধর্ম, মনগড়া মতবাদ চিরকাল মানুষকে শোষণ করেছে, নির্যাতন করেছে ও অত্যাচার করেছে। একমাত্র স্রষ্টাপ্রদত্ত ইসলাম তার ব্যতিক্রম।
স্রষ্টাপ্রদত্ত, সর্বশেষ ঐশীগ্রন্থ আল কুরআনের বিধান ইসলামই একমাত্র মানবজীবনের সাথে পূর্ণ সামঞ্জ্যশীল জীবনবিধান। ইসলামের মুখাপেক্ষী আজ সারা বিশ্বের মানুষ। ইসলামের নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা, ইসলামের সহনশীল, সহমর্মিতার সমাজব্যবস্থা এবং ইসলামের ন্যায়, ইনসাফ ও সুবিচারপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থা ছাড়া বিশ্ব মানবতার মুক্তির আর কোন বিকল্প নেই।
আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীতে আল্লাহর আলো, বাতাস, পানি যেমন সকল মানুষের জন্য সমান কল্যাণকর, তেমনি মানুষের একমাত্র স্রষ্টা, বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ রাব্বুল প্রেরিত একমাত্র নির্ভুল জীবনব্যবস্থা, ইসলাম তেমনি সমগ্র মানবজাতির জন্য একমাত্র কল্যাণকর জীবনব্যবস্থা।
আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীতে আল্লাহপ্রদত্ত ন্যায় ও ইসনাফপূর্ণ জীবনবিধান ইসলাম প্রতিষ্ঠিত না থাকায় বিশ্বজুড়ে সবলের অত্যাচার, নির্যাতন, নিষ্পেষণে নির্যাতিত  দুর্বলের হাহাকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। এখন স্রষ্টা প্রেরিত জীবনব্যবস্থা ইসলামের বাস্তব প্রতিষ্ঠাই এ ধ্বংসোন্মুখ পৃথিবীর মানব গোষ্ঠীকে রক্ষা করতে পারে।
আল্লাহপ্রেরিত জীবনব্যবস্থা দ্বীন ইসলামের বাস্তব প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব বর্তমানে বিশ্বের সোয়া শ’ কোটি মুসলমানের ওপর ন্যস্ত রয়েছে।
অতীতের প্রত্যেক নবীর ওপর দায়িত্ব ছিল আল্লাহর দ্বীনকে আল্লাহপ্রদত্ত জীবনব্যবস্থাকে মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে ‘‘তিনি তোমাদের জন্য দ্বীনের সেইসব বিধিবিধান নির্বাচন করেছেন, যার নির্দেশ তিনি নূহকে দিয়েছিলেন এবং হে মুহাম্মদ যা আমি এখন তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পৌঁছাচ্ছি এবং যার আদেশ আমি দিয়েছিলাম ইবরাহিম (আ) মূসা আলাইহিস সালাম ও ঈসা আলাইহিস সালামকে এই তাগিদ সহকারে যে দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা কর এবং এ ব্যাপারে পরস্পর কোন মতপার্থক্য করো না। হে মুহাম্মদ! এ কথাটিই এসব মুশরিকদের কাছে সবচেয়ে অসহ্য, অপছন্দনীয়। যার দিকে তুমি তাদেরকে আহবান জানাচ্ছ।’’ (সূরা আস শূরা : ১৩)
পবিত্র কুরআনে অন্যত্র আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘‘তোমাদের কাছে তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাজিল করা হয়েছে তা মেনে চল। তাকে ছাড়া আর কাউকে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করো না। (সূরা আল-আরাফ : ৩)
পবিত্র কুরআনের এসব আয়াত থেকে পরিষ্কার হয়ে গেছে যে,  স্রষ্টার পক্ষ থেকে যে বিধান আসে, তা মেনে চলতে হবে। অর্থাৎ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এ ব্যাপারে কোন মতপার্থক্য করা যাবে না। আল্লাহতায়ালা বলেন, হে নবী (দ্বীনকে প্রতিষ্ঠা কর) এ কথাটিই মুশরিকদের কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় বলে আল্লাহতায়ালা নবী করিম (সা) সতর্ক করেছেন।
আল্লাহপ্রেরিত জীবনব্যবস্থা ইসলাম ব্যক্তিজীবনে, পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতেই আল্লাহর রাসূল (সা) এবং তার সাহাবীদের জীবনে ২৯টি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে এবং আল্লাহর রাসূল (সা)কে ১৯টি যুদ্ধে নিজে অংশগ্রহণ করতে হয়েছে।
মানবরচিত শোষণ, নির্যাতন, নিষ্পেষণের আইন পরিবর্তন করে এবং সমাজ থেকে পবিত্র কুরআনের নিষিদ্ধ সমস্ত হারাম কাজ উৎখাত করে আল্লাহপ্রেরিত ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচারের দ্বীন ইসলামের বিধিবিধান পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে, প্রতিষ্ঠিত করতেই এ সংগ্রাম করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠিত করতেই আল্লাহর রাসূল (সা) সাহাবীদের এ সংগ্রাম করতে হয়েছে।
মানবতার নবী হজরত মোহাম্মদ (সা) এর ওপর আল্লাহ রাববুল আলামিনের পক্ষ যে, দ্বীন বা জীবনবিধান নাজিল হয়েছে তা মানবসমাজে প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে কোন মানুষই ন্যায়, ইনসাফ, সুবিচার, কল্যাণ, শান্তি  বা জীবনের নিরাপত্তা বা ন্যায্য অধিকার কোনো কালেই পাবে না। এ জন্যই আল্লাহ পাকের কড়া নির্দেশ ‘‘দ্বীনকে কায়েম কর, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠিত কর।’’
আল্লাহর পৃথিবীতে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত করে প্রতিটি মানুষের জান, মাল, ইজ্জত ও ধর্মের নিরাপত্তা বিধান করার দায়িত্ব ছিল নবী রাসূলগণের ওপর। বর্তমানে এ দায়িত্ব ন্যস্ত হয়েছে সর্বশেষ নবীর উম্মত বিশ্বের সোয়া শ’ কোটি মুসলমানের ওপর।
মুসলমান নারীরাও নবীর উম্মত। নবীর উম্মত হিসেবে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব মুসলমান নারী পুরুষের সকলের ওপর সমান দায়িত্ব।
আল্লাহতায়ালা তাঁর সৃষ্ট পৃথিবীতে নারী-পুরুষ সৃষ্টি করে তাদের মাঝে কর্ম বণ্টন করে দিয়েছেন। নারীর সন্তান গর্ভে ধারণের কষ্ট, সন্তান প্রসবের কষ্ট, সন্তানের স্তন্য দান, সন্তানের প্রতিপালন এসব নারীর একক দায়িত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখে নিরাপদ গৃহকেই নারীর উপযোগী প্রকৃত কর্মক্ষেত্র নির্ধারণ করেছেন। সর্বজ্ঞ আল্লাহতায়ালা পুরুষকে দিয়েছেন বাইরের কঠিন, কঠোর পরিবেশের দায়িত্ব পালনের নির্দেশ। একজন পুরুষ রাত ১২টার পরও বাইরের কাজে একাকী চলাফেরায় তার নিরাপত্তার কোন বিঘœ ঘটবে না। কিন্তু নারীর নিরাপত্তা বিঘিœত হবে। স্রষ্টা আল্লাহ রাববুল আলামিন তাই পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, অর্থাৎ : এরশাদ হচ্ছে, তোমরা মোমেন (নারীরা) মর্যাদা সহকারে গৃহে অবস্থান কর। জাহেলি যুগের মেয়েদের মতো সাজসজ্জার প্রদর্শনী করে বেড়িও না।’’ নামাজ কায়েম কর, জাকাত প্রতিষ্ঠিত কর এবং আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য কর। আল্লাহ তো চান তোমাদের পরিবার থেকে অপরিচ্ছন্নতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পুরোপুরি পাক পরিচ্ছন্ন করে দিতে।’’ (সূরা আহজাব-৩৩ আয়াত)। নারীর কোমলতা, নমনীয়তা, স্নেহপ্রবণতা, নারীর সন্তান গর্ভে ধারণের কষ্ট, সন্তান প্রসবের জীবন মরণ কষ্ট, সন্তানের স্তন্যদান, সন্তানের যতœ, প্রতিপালন, সন্তানের শিক্ষাদান, সন্তানের সঙ্গদান, গৃহের বহুমুখী দায়িত্ব পালন, গৃহের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবারের সদস্যদের সুষ্ঠু সুষম আহারের ব্যবস্থা করা, মেহমানদারি ইত্যাদি বহুমুখী দায়িত্বের প্রতি লক্ষ্য রেখেই সর্বজ্ঞানী আল্লাহতায়ালা তার বিধান ইসলামে পুরুষকে বাধ্য করেছেন। স্ত্রী, সন্তান, পিতামাতা, ভাইবোনের ভরণ পোষণ, শিক্ষা-দীক্ষা, চিকিৎসা, বিয়ে শাদি, বাসস্থান সব কিছুর সুব্যবস্থার দায়িত্ব।
ইসলামের এই কর্মবণ্টন ব্যবস্থা যেমন যৌক্তিক, তেমনি বিজ্ঞানসম্মত, তেমনি পরিবারের প্রতি সদস্যের জন্য কল্যাণকর প্রমাণিত। স্রষ্টাপ্রদত্ত এ নির্ভুল কর্মবণ্টনব্যবস্থা মুসলমানগণ মেনে চলেন বলেই মুসলমানদের পারিবারিক বন্ধন মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।
ইসলামের পারিবারিক দায়িত্ব আল্লাহতায়ালা মানবতার কল্যাণের স্বার্থে নারী-পুরুষের মাঝে বণ্টন করে দিলেও আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার  দায়িত্ব কিন্তু আল্লাহতায়ালা নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর বর্তিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘‘মুমিন নারী, মোমেন পুরুষ তারা পরস্পরের সাথী বন্ধু। তারা মানুষকে অর্থাৎ (নারীরা নারীদেরকে, পুরুষরা পুরুষদেরকে) সৎ কাজের আদেশ দেয়, অসৎ কাজ থেকে ফিরিয়ে রাখে, নামাজ কায়েম করে, জাকাত প্রতিষ্ঠিত করে এবং আল্লাহ এবং তার রাসূলের (সা) অনুসরণ করে চলে। (যেসব মোমেন নারী পুরুষগণ এ দায়িত্ব পালন করবে তাদের সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন,) শিগগিরই এদের ওপর আল্লাহতায়ালা রহমত বর্ষণ করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা মহাপরাক্রমশালী, মহাবিজ্ঞানী। (যেসব মোমেন নারী পুরুষগণ এ দায়িত্বগুলো পালন করবে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে চিরস্থায়ী জান্নাতের ওয়াদা দিয়েছেন। যে জান্নাতের নিচ দিয়ে সদা ঝর্ণাধারা প্রবহমান। যে চিরস্থায়ী জান্নাতে তাদের জন্য রয়েছে পবিত্র আলয় বা বাসস্থান। আর এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় সাফল্য। (সূরা আত তওবা : ৭১-৭২)
পৃথিবীর ৫০-৭০ বছরের জীবনে বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স প্রচুর অর্জন করাটাকে আল্লাহতায়ালা মানবজীবনের সফলতা বলে অভিহিত করেননি। কারণ মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির জন্য এসব বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংক ব্যালেন্স কোন কাজে আসে না। দুনিয়াতেই থেকে যায়। ব্যক্তি খালি হাতে চলে যায়। বরং মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী জীবনে যে চিরকাল বসবাসের, চিরসুখের জান্নাত লাভকেই আল্লাহতায়ালা মানবজীবনের সফলতা বলেছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন, তোমরা প্রতিযোগিতা করে সেইদিকে দৌড়াও দ্রুতগতিতে যেদিকে রয়েছে আকাশ ও পৃথিবী সমান বিস্তৃত জান্নাত, যা মুত্তাকিনদের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে (সূরা আলে ইমরান : ১৩৩)।
মুত্তাকিন কারা? যারা জীবন পথে চলতে আল্লাহতায়ালাকে ভয় করে, আল্লাহপাকের নির্দেশিত পথে জীবনযাপন করেছে, পৃথিবীতে কোন অশান্তি, বিপর্যয় সৃষ্টি করেনি, মানুষকে কষ্ট দেয়নি, কোন মানুষকে অধিকারবঞ্চিত করেনি, মানুষের প্রাপ্য অধিকার আদায় করেছে, সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে কথা বলেছে, কোনদিন মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়নি, নারীর প্রতি সম্মান মর্যাদা প্রদর্শন করেছে, নারীকে স্ত্রী হিসেবে, কন্যা হিসেবে, মা হিসেবে ইসলাম যে মর্যাদা দিয়েছে, তা আদায় করেছে, হারাম পথে কোন উপার্জন করেনি, পরের জমি, পরের সম্পদ আল্লাহর ভয়ে আত্মসাৎ করেনি বা দখল করেনি, যে আল্লাহর ভয়ে আল্লাহর আদেশ মতো সৎভাবে জীবনযাপন করেছে, তাদেরকেই পবিত্র কুরআনে ‘মুত্তাকিন’ (খোদাভীরু) নামে অভিহিত করা হয়েছে। আর এদের  জন্যেই আল্লাহতায়ালা চিরস্থায়ী জীবনে চিরসুখের জান্নাত প্রস্তুত করে রেখেছেন বলে আল্লাহতায়ালা সুসংবাদ দিয়েছেন।
পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন, যে চিরস্থায়ী জাহান্নামের দাউ দাউ করে জ্বলা আগুন থেকে বেঁচে গেল এবং চিরস্থায়ী সুখের জান্নাত পেয়ে গেল, সে বড় বাঁচা বেঁচে গেলো এবং বড় পাওয়া পেয়ে গেলো।
সৎ কর্মশীল নারী-পুরুষ, তারা যদি ঈমানদার হয়, তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে। তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করা হবে না। (সূরা আন নিসা : ১২৪)
যে কেউ জুলুম করার পর, তওবা করবে এবং কল্যাণকর কাজ করবে, আল্লাহতায়ালা তার প্রতি ক্ষমাশীল। (সূরা আল মায়েদা : ৩৯)
আল্লাহপাকের দৃষ্টিতে মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী জীবনে দাউ দাউ করে জ্বলা কঠিন জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় বাঁচা। আর চিরস্থায়ী জীবনে চিরসুখের জান্নাত পাওয়াই হচ্ছে সবচেয়ে বড় পাওয়া।
যারা দুনিয়ার স্বল্পকালীন জীবনের সুখের জন্য সারাটা জীবন ব্যস্ততায় কাটায়, পবিত্র কুরআনে আল্লাহ পাকের আদেশ মতো জীবন যাপনে চিন্তা বা চেষ্টাও করে না, মুসলমান নারী-পুরুষের ওপরে পবিত্র কুরআনে আল্লাহতায়ালা কি দায়িত্ব অর্পণ করেছেন, সে দায়িত্ব পালনে চিন্তাও করে না, চেষ্টাও করে না, তাদের কি দশা হবে, মৃত্যুর পর চিরস্থায়ী জীবনে।
একজন মুসলমান নারী-পুরুষ দুনিয়ার জীবনে শান্তি, কল্যাণ এবং আখিরাতে পরকালীন জীবনে যদি শান্তি ও মুক্তি পেতে চায়, তাহলে একজন মুসলমান নারী-পুরুষকে প্রতিদিন আল্লাহপ্রেরিত নির্ভুল জ্ঞান ও নৈতিক জ্ঞানের আধার পবিত্র কুরআন পড়তে হবে, কুরআনের অর্থ যার যার ভাষায় জানতে হবে এবং স্রষ্টা আল্লাহ রাববুল আলামিনের আদেশ মানতে হবে এবং রাসূল (সা) হাদিস জানতে হবে এবং মানতে হবে। তাহলেই একজন মোমেন মুসলমান নারী-পুরুষ দুনিয়াতে ও আল্লাহপাকের সাহায্যে সার্থক, সফল জীবনের অধিকারী হবে এবং মৃত্যুর পর আখেরাতের চিরস্থায়ী জীবনে ও চিরস্থায়ী সুখের জান্নাতের অধিকারী হতে পারবে।
আল্লাহর সৃষ্ট পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া, আল্লাহপ্রেরিত আল কুরআনের নির্ভুল জীবনব্যবস্থা বা আদ্বীন প্রতিষ্ঠা করা প্রত্যেক মোমেন মুসলমান নারী-পুরুষের ওপর আল্লাহতায়ালা ফরজ করেছেন। আল্লাহর রাসূল (সা)  যেভাবে আল্লাহর দ্বীনকে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠা করেছেন, তাঁর আদর্শ, শিক্ষা, অনুসরণ করে ঠিক সেভাবেই আল্লাহর দ্বীনকে পরিবারে, সমাজে, রাষ্ট্রে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। কারো মনগড়া পন্থায় আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হবে না এবং যে পন্থা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যও হবে না। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কুরআনে এরশাদ করেছেন, অর্থাৎ তোমরা আল্লাহর আদেশের আনুগত্য কর, রাসূল (সা) এর আনুগত্য কর এবং তোমাদের উলিল আমর যারা আল্লাহ এবং আল্লাহর রাসূলের আনুগত্যের ভিত্তিতে তোমাদের নেতৃত্ব দেন, তাদের আনুগত্য কর।’’ (সূরা আন নিসা : ৫৯)
এখন নারীরা আল্লাহপ্রদত্ত ফরজ নির্দেশ অর্থাৎ দ্বীন প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব কিভাবে পালন করবে? কিভাবে অংশগ্রহণ করবে? আল্লাহতায়ালা সুস্পষ্টভাবে যেসব বিধান মোমেন নারী-পুরুষ উভয়ের ওপর দায়িত্ব বর্তিয়েছেন তা হচ্ছে, নামাজ কায়েম করতে হবে, জাকাত প্রতিষ্ঠিত করতে হবে, সৎ কাজের আদেশ দান ও অসৎ কাজের বাধা দানের দায়িত্ব পালন করতে হবে।
১ নম্বর দায়িত্ব নামাজ কায়েম করতে হবে। এ জন্য একজন মোমেন নারী প্রথমেই কুরআন সুন্নাহর নির্ভুল জ্ঞানার্জনে সচেষ্ট হবেন। পরিবারের সদস্যদের কুরআন সুন্নাহর জ্ঞানদানে আন্তরিক হবেন। একজন মোমেন নারী নিজে ৫ ওয়াক্ত নামাজ সময় মতো নিষ্ঠার সঙ্গে আদায় করবেন। পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নামাজের গুরুত্ব কুরআন হাদিস থেকে তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। এজন্য পারিবারিক বৈঠক অত্যন্ত উপযোগী। স্বামী সন্তানদের নিয়ে এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে সাপ্তাহিক পারিবারিক বৈঠকের মাধ্যমে নিয়মিত কুরআন, হাদিস আলোচনার মাধ্যমে পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে নামাজে উদ্বুদ্ধ করা যায়। নামাজ যে আল্লাহপাকের ফরজ আদেশ, নামাজ যে কোনভাবেই মাফ নেই, যে ছোটবেলা অর্থাৎ যুবক বয়স থেকে ৫ ওয়াক্ত নামাজী হবে, আল্লাহর আরশের ছায়ার নিচে সেই স্থান পাবে, যেদিন কোন ছায়া থাকবে না কুরআন ও হাদিসের এসব বাণী পারিবারিক বৈঠকে আলোচনা করে এবং প্রতি ওয়াক্তের মা মেয়েদের সাথে নিয়ে নামাজ পড়ার অভ্যাস করলে এবং বাবা প্রতি ওয়াক্তে ছেলেকে মসজিদে সাথে করে নিয়ে নামাজে গেলে মসজিদের প্রতি সন্তানের মহববত বাড়ে এবং সে সন্তান ৫ ওয়াক্ত নামাজী হবেই। এভাবেই বাবা-মা সচেতন হলেই পরিবারে নামাজ কায়েম হবে। আল্লাহর দ্বীন মহল্লার লোকদের বা প্রতিবেশী লোকদের নামাজী বানাতে হলে বা নামাজ কায়েম করতে হলে, জাকাত প্রতিষ্ঠিত করতে হলে এবং সৎ কাজের আদেশ দান এবং অসৎ কাজে বাধা দানের দায়িত্ব পালন করতে হলে প্রতি মহল্লায় ১টা করে কুরআন তাফসীর বৈঠক চালু করা জরুরি। যারা কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান রাখেন, তাদেরকেই এ দায়িত্ব পালনে এগিয়ে আসতে হবে। কুরআন সুন্নায় শিক্ষেত নারীরা নারীদের মাঝে এ দায়িত্ব পালন করবেন। তবেই নারীসমাজের মাঝে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে ইনশাআল্লাহ। যিনি কুরআন সুন্নাহর জ্ঞান রাখেন তিনি নিজের  বাসায়ই এ কাজ শুরু করতে পারেন।
কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানের অভাবে অনেক মা তাদের সন্তানদের নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলতে পারছেন না। ফলে সমাজের তরুণেরা, যুবকেরা উচ্ছৃঙ্খল হচ্ছে, ড্রাগ এডিকটেড হচ্ছে। অ্যাডভারটাইজমেন্টের নগ্ন নারী চিত্র, সহপাঠী উচ্ছৃঙ্খল মেয়েদের নগ্ন পোশাক পরিচ্ছদ যুবসমাজকে ক্রমেই ধ্বংসের অতলে তলিয়ে দিচ্ছে। কুরআন সুন্নাহ শিক্ষিত মেয়েরা মায়েরা তাদের সমবয়সী বোনদের কাছে কুরআন সুন্নাহর নৈতিক জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে মেয়েদের, মায়েদের অর্থসহ কুরআন ও হাদিসের জ্ঞানার্জনের গুরুত্ব তুলে ধরে কুরআন-সুন্নাহ অর্থসহ পড়ায় অভ্যস্ত করে দিতে হবে। প্রত্যেক কুরআন সুন্নাহ শিক্ষিত বোনরা পরিচিত, আত্মীয় মা-বোনদের, বান্ধবীদের হাতে কুরআন অর্থসহ তুলে দিতে হবে। জোগাড় করে কিনে দিতে হবে। তাদেরকে কুরআন সহীহ পড়ার ব্যবস্থা করে দিতে হবে। কুরআন তাফসির বৈঠকে সহীহ কুরআন শিক্ষারব্যবস্থা রাখতে হবে।  প্রতি সপ্তাহে এবং সহীহ নামাজশিক্ষা নিয়মিত চালু করা হলে নারীসমাজের মাধ্যমেই সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে ইনশাআল্লাহ। প্রত্যেক কুরআন সুন্নাহ শিক্ষিত বোনেরা ৩-৫ জনকে টার্গেট নিয়ে অর্থসহ কুরআন পড়ায় অভ্যস্ত করা হলে কতজনকে অভ্যস্ত করলেন টার্গেট নিয়ে কাজ করলে সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হবে ইনশাআল্লাহ।
সমাজের অর্ধেক নারী। নারী সমাজই হচ্ছে মানুষ গড়ার কারিগর, আর পরিবার হচ্ছে মানুষ গড়ার কারখানা। একটি পরিবারের মা এবং বোনেরা যদি কুরআন সুন্নাহর নির্ভুল জ্ঞানে সুশিক্ষিত হন, তাহলেই যে পরিবারের প্রতিটি সদস্য কুরআন সুন্নাহর ফলোয়ার হতে পারে এবং এসব পরিবারের সন্তানদেরই কুরআন সুন্নাহর ফলোয়ার হওয়া সহজ।
সন্তানকে ভালো সঙ্গ দিতে হবে। সে একা থাকবে না। মা বোনেরা যদি তাদের সন্তান, তাদের ভাইদের ভালো সঙ্গ জোগাড় করে দিতে না পারেন, সে তার সঙ্গী জোগাড় করে নেবেই। তখন তার সে সঙ্গী খারাপও হতে পারে। ভালও হতে পারে। তাই সন্তানকে ভাল সঙ্গী জোগাড় করে দিতে হবে। ইসলামী ছাত্রসংগঠনে আপনার সন্তানকে যুক্ত করে দিতে পারলে আপনার সন্তান ভাল সঙ্গ পাবে।
ইসলামী ছাত্রসংগঠনের ইসলামী চরিত্রের ভাল ভাল ছেলেদের সঙ্গ লাভে আপনার সন্তানও ইসলামী চরিত্রের হয়ে গড়ে উঠবে। ইসলামী ছাত্রসংগঠনের নামাজী ছেলেদের সাথে থেকে আপনার ছেলেও ৫ ওয়াক্ত নামাজী হয়ে গড়ে উঠবে। আপনার ছেলেকে নামাজী বানানোর জন্য আপনাকে কষ্ট করতে হবে না।
সমাজে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব যদি আপনি উপলব্ধি করেন, আপনার দায়িত্ব আপনার সন্তানদের, আপনার ভাইদের, বোনদের ইসলামী সংগঠনে যুক্ত করে দেয়া। ছেলেদের, ভাইদের ইসলামী ছাত্রসংগঠনে, বোনদের, মেয়েদের ইসলামী ছাত্রীসংগঠনে যুক্ত করে দেয়া। বোনদের দায়িত্ব ভাইদের এবং নিকট আত্মীয় ছেলেদের ইসলামী ছাত্রসংগঠনে যুক্ত করে দেয়া এবং বোনদের দায়িত্ব নিকট আত্মীয়, প্রতিবেশী, পরিচিত মেয়েদের ইসলামী সংগঠনের গুরুত্ব তাদের পরিবারকে বুঝিয়ে ছাত্রীসংগঠনে যুক্ত করে দেয়া।
ইসলামী নৈতিক শিক্ষাব্যবস্থা তুলে দিয়ে মাদরাসা শিক্ষা সঙ্কোচন করে, ইসলামী সংগঠনের নেতৃবৃন্দকে জেলে পুরে ভারতীয় উলঙ্গ নাচনেওয়ালীদের বাংলাদেশে প্রতি মাসে আমদানি করে, লাক্স-চ্যানেল আই-এর উলঙ্গ নারী প্রদর্শনী করে অ্যাডভারটাইজমেন্টে উলঙ্গ নারী চিত্রের প্রদর্শনী করে প্রতি মাসে ভারত থেকে দেদার মাদকদ্রব্য পাচার করে  দেশের যুব চরিত্র ধ্বংস করে দেয়া হচ্ছে, যাতে মুসলমান তরুণেরা যুবকেরা দেশ রক্ষার দায়িত্ব পালনে অকেজো অথর্ব হয়ে যায়। এসব সুদূরপ্রসারী চক্রান্ত থেকে আপনার সন্তানকে একা ঘরে পাহারা দিয়ে কোনদিন রক্ষা করতে পারবেন না। আপনার সন্তানকে ভাল সঙ্গ দিতেই হবে। ভাল সঙ্গীর প্রভাবে আপনার সন্তান দেশের এসব ক্ষতিকর প্রভাব থেকে বেঁচে চলতে পারবে, ইনশাআল্লাহ। আমাকে বিদেশে একজন প্রশ্ন করেছিল, আপনার সবগুলো সন্তান এক রকম হলো কিভাবে। আমার জবাব ছিল, আমার সব ছেলেমেয়েদের ইসলামী সংগঠনে যুক্ত রাখার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। যার ফলে ইসলামী ভাল সঙ্গের প্রভাবে ভাল হয়ে গড়ে উঠেছে।
পবিত্র কুরআনের আইন কায়েম হলে জাকাত রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় আদায় ও বিলিবণ্টন হবে। তাতে কোটি কোটি টাকা ধনীদের কাছ থেকে ইসলামী সরকার জাকাত আদায় করে গরিবের মাঝে বিলিবণ্টন করবে। তাতে দেশে কর্মক্ষম মানুষ আর বেকার থাকবে না। একটা মেয়েও অসহায় থাকবে না।
ব্যক্তিগত দাওয়াতী কাজই প্রধান কাজ। অবশ্য ইসলামী বইও কর্মীর কাজ করে। সব সময় বই সঙ্গে রাখবেন, যেখানে যাবেন একটা বই পৌঁছাবেন। বাসায় মেহমান আসলেও তাকে প্রাথমিক দাওয়াতী বইগুলো একটা পড়তে দেবেন। বিদায়ের সময় প্রাথমিক বইগুলো প্রেজেন্ট করতে পারেন। আর কিনে নিতেও বলতে পারেন। যেখানেই বেড়াতে যান কমপক্ষে ১ সেট বই সাথে রাখবেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও মাথায় সব সময় চিন্তা রাখবেন, কাকে সাথে নিয়ে বৈঠকে যাওয়া যায়। দাওয়াতী কাজে সব সময় আত্মীয়, পরিচিত এবং প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দিতে হবে। এ কাজে নিজে সকলের সঙ্গে মিশুক প্রকৃতির হবেন, হাসিখুশি হবেন, দরদি মন হবেন। প্রতিবেশীর অসুখে বিসুখে বিপদে আপদে আপনি সকলের আগে হাজির হবেন। তাহলেই প্রতিবেশীরা আপনার দ্বীনের কাজে সঙ্গী হবেন।
স্বামী, সন্তানের সঙ্গে হাসিখুশি মিষ্টভাষী হতে হবে। দরদি মন হতে হবে। তাহলে স্বামী সন্তানদের দ্বীনের কাজে আপনার সহযোগী পাবেন এবং দ্বীনের কাজে তারাও দ্বীনের পথে সানন্দে অগ্রসর হবেন।
সংগঠনের বোনেরা জানেন, বাতিলের অন্যায়, জুলুম, শোষণের সমাজব্যবস্থা পরিবর্তন করে আল্লাহর জমিনে আল্লাহ পাকের প্রেরিত ন্যায় ও ইনসাফপূর্ণ দ্বীন প্রতিষ্ঠার পথ কুসুমাস্তীর্ণ নয়। এ পথে ঘরে বাইরে সর্বত্র এই ধারার সম্মুখীন হওয়া, এটাই স্বাভাবিক।
নবী করিম (সা) যিনি ছিলেন কাফেরদের কাছে আলআমিন, সবচেয়ে বিশ্বস্ত, যিনি তাঁর দাসদের সাথে কোনদিন খারাপ আচরণ করেননি, তিনিই যখন  তাঁর সমাজের মানুষগুলোকে খারাপ কাজ বর্জন করে  মূর্তি পূজা বর্জন করে আল্লাহর দ্বীনের দিকে আহবান জানালেন তখন তারাই হলো তাঁর চরম দুশমন। এমন দরদি মানুষ, যিনি মানুষের কল্যাণের চিন্তায়, মানুষের কল্যাণের স্বার্থেই আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে বিবি খাদিজার অগাধ সম্পদ ব্যয় করে নিঃস্ব হয়ে তায়েফে যখন তায়েফের সর্দারদের কাছে দাওয়াতী কাজে যান, তখন তার একটা বাহন পর্যন্ত ছিল না। এ দরদি মানুষটা তায়েফে দাওয়াতী কাজে গিয়ে কিভাবে রক্তাক্ত হলেন। তারপরও তায়েফবাসীর জন্য বদ দোয়া করলেন না যে, এদের মাঝেও ভালো লোক জন্মাতে পারে, যারা হয়তো আল্লাহর দ্বীনগ্রহণ করবে। কত দরদি মন, সুবহানাল্লাহ।
এরপর কাফেরদের অত্যাচারে একে একে সব মুসলমানগণ সহায়-সম্পদ, আত্মীয়-পরিজন সব ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে বাধ্য হলেন। তারপরও  কাফেররা মুসলমানদের শান্তিতে থাকতে দেয়নি। মদিনায় মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য পর পর তিনবার কাফেররা মদিনা আক্রমণ করে। নবী করিম (সা) তার সাথীগণ সাহসী ভূমিকা পালন করে, নবী করিমের বিচক্ষণ নেতৃত্বে কাফেরদের মোকাবেলা করে বিজয়ী হন।
আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠা করতে সমগ্র আরবের কাফের শক্তির মোকাবেলা নবী করিম (সা) এবং সাথীদের করতে হয়েছে। তারপরও তিনি তখনকার দুই বৃহৎ শক্তি পারস্য রোম সম্রাটদের কাছে দূত পাঠিয়ে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন। এই দুই বৃহৎ শক্তির মোকাবেলা করতে হয়েছে যুদ্ধের ময়দানে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নবী করিম (সা) এবং তার সাহাবীগণ মিথ্যা বাতিল শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, সংগ্রাম করে আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
ওহুদের যুদ্ধে যখন মুসলমানগণ  চরম বিপর্যয়ের সম্মুখীন হন, রাসূলে করিম (সা) কপালে তীরবদ্ধি হন, তীরের আঘাতে তার দাঁত খসে যায়, তখন একজন মহিলা সাহাবী এমন ক্ষীপ্রগতিতে তলোয়ার চালিয়ে নবী করিম (সা)কে রক্ষা করেছিলেন যে, পরবর্তীতে নবী করিম (সা) বলতেন, ওহুদের দিনে আমি তাকে যেদিকে চেয়েছি সেদিকে তাকে দেখেছি। আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এমন জীবন-মরণ সংগ্রাম করে আল্লাহর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন নবী করিম (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ এবং মহিলা সাহাবীগণ। মক্কায় শেরে আবু তালিব পাহাড়ে কাফের মোশরেকরা নবী করিম (সা) এবং তার সাহাবীগণকে একঘরে করে রেখেছিল সমস্ত  পরিবার পরিজনসহ ক্ষুধার্ত শিশুদের  চিৎকারে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে যেত। সাহাবীগণ না খেয়ে শুকিয়ে গিয়েছিলেন। তাদের পায়খানা হতো ছাগলের বিষ্ঠার মতো, কেউ কাফেরদের চোখ এড়িয়ে গোপনে উটের দুধ দিয়ে আসত। উটের রাখালরা এ কাজ করত। এত কষ্ট করেছেন নবী করিম (সা) এবং তাঁর সাহাবীগণ এবং সাহাবীগণ। এক মাস নয় দুই মাস নয়, ছয় মাস নয়। পুরো ৩টি বছর এ কষ্ট করেছেন। তবু তারা কাফেরদের সাথে আপস করেননি বা এ কথা বলেননি বা ভাবেননি যে, আমরা এভাবে কতদিন কষ্ট করব। দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ত্যাগ করে নিজেদের জীবন বাঁচাই। না তা তারা করেননি। কারণ তারা জানতেন, আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত এই যে দান প্রথা, কন্যাসন্তান হত্যা, মারামারি, হানাহানি গোত্রে গোত্রে, কোনকালেই তা বন্ধ হবে না। নারীদের সম্মান, মর্যাদা, অধিকার, কোনকালেই প্রতিষ্ঠিত হবে না। তাই তারা কষ্ট করেই দ্বীনের পথে অটল রইলেন। এটা ছিল মুসলমানদের জন্য এক বিরাট অগ্নিপরীক্ষা। তিন বছর পর সমাজের কিছু সৎ প্রবণ যুবকদের সাহায্যে তারা বন্দী জীবন থেকে মুক্তি পান।
আমাদেরকেও মনে রাখতে হবে দ্বীন প্রতিষ্ঠার আন্দোলন ছাড়া আমাদেরও কোন মুক্তি নেই। বর্তমানে জাহেলি সমাজের চেয়ে আরও ভয়াবহ অবস্থা, প্রতিদিন মানুষ খুন হচ্ছে নির্বিচারে পেশাদার খুনিদের হাতে, পরের বাড়ি, পরের জমি দখল করে নিচ্ছে সরকারি দলের লোকেরা সরকারের ছত্রছায়ায়, প্রতিদিন নারী নির্যাতন হচ্ছে যৌতুকের জন্য, কিশোরী, যুবতী, স্কুল ছাত্রীরা পর্যন্ত ধর্ষণের শিকার হয়ে জীবন দিচ্ছে। শিশুরা পর্যন্ত হত্যার শিকার হচ্ছে জায়গা জমির বিরোধ নিয়ে এ ভয়াবহ অবস্থা আর কোন পরিবর্তন হবে না, যতদিন বাংলাদেশে আল্লাহর দ্বীন, কুরআনের আইন প্রতিষ্ঠিত করা না যাবে, ততদিন দেশ ও জাতির ভাগ্যের কোন পরিবর্তন হবে না। দেশের ঘরে ঘরে নারীসমাজের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। সাপ্তাহিক কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা বৈঠকে মহল্লার নারীদের কাছে এ বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। সাধারণ সভা সমাবেশ করেও নারীদের মাঝে আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব যথাযথভাবে পৌঁছে দিতে হবে। ইসলামী সচেতন শিক্ষিত নারীদের এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
বিত্তবান ইসলামী সচেতন বোনেরা সমাজের দুস্থ বস্তিবাসী নারীদের সমস্যা দূরীকরণে তাদের কাজের  ব্যবস্থা করে দিয়ে তাদের বিবাহযোগ্য মেয়েদের বিয়ে-শাদিতে সাহায্য সহযোগিতা করে, তাদের ইসলামের মৌলিক শিক্ষা কালেমা, নামাজ, রোজা, দোয়া-দরূদ, হারাম-হালাল মুখে মুখে শিক্ষা দিয়ে তাদের সহযোগিতা করা হলে তাদের  নৈতিক সমর্থন অবশ্যই পাওয়া যেতে পারে।
পবিত্র কুরআন ও রাসূল (সা) সুন্নাহর বাণী যদি মহল্লায় মহল্লায়, মসজিদে মসজিদে, বিভিন্ন অফিস-আদালতে, স্কুল-কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, মেডিক্যাল কলেজে, জেলখানায়, হাসপাতালে, বিভিন্ন সংগঠন সংস্থায়, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত সপ্তাহে একদিন শিক্ষাদানের ব্যবস্থা করা হতো তাহলেই দেশের সব সিন্ডিকেটের দল, মজুতদারি, কালোবাজারির দল, খুনি, ধর্ষণকারী, নারী নির্যাতনকারী, সব ধীরে ধীরে আল্লাহর ভয়ে আখেরাতের জবাবদিহিতার ভয়ে ভালো মানুষ হয়ে যেতো।
এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানে, সংস্থায়, নারীরা নারীদের মাঝে এ দায়িত্ব পালন করে দ্বীন প্রতিষ্ঠায় যথার্থ অবদান রাখতে পারে। আল্লাহপ্রেরিত আল কুরআনের জ্ঞান এবং রাসূল (সা) সুন্নাহর বাণী একমাত্র মানুষের অন্তরে খোদাভীতি এবং আখিরাতের জীবনে জবাবদিহিতার ভয়।
লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply