ঈদুল ফিতরের তাৎপর্য

শায়খ ফয়সল হামিদ আবদুর রাজ্জাক

ঈদুল ফিতর কথাটার অর্থ হলো, যে আনন্দ বা উৎসব বারবার আসে। সব মুসলমানের জন্যই ঈদের দিনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ঈদুল ফিতরের অনুপম বৈশিষ্ট্য
সব দিক দিয়েই এই ঈদ অনন্য। এর বিশিষ্ট দিক হলে মুসলমানদের প্রতিদিনের সালাত বা নামাজ, সাপ্তাহিক জমায়েত বা জুমার জামাত এবং বার্ষিক পুনর্মিলনী, এই তিনটিই ঈদের মধ্যে দেখা যায়।
ঈদুল ফিতরের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক কল্যাণকর বৈশিষ্ট্য অনেক। এর মধ্যে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো :
ক) একটি বড় সাফল্যের উদ্যাপন : সর্বশক্তিমান আল্লাহতায়ালার উদ্দেশ্যে ব্যক্তিহিসেবে মুসলিমদের একটি বড় ইবাদতের মাধ্যমে যে অর্জন, তার জন্য সুস্থ ও নির্মল আনন্দ উদ্যাপিত হয় ঈদুল ফিতরের মাধ্যমে। সে অর্জন হচ্ছে, এক মাসব্যাপী সিয়াম সাধনা যাতে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য পানাহার ও যৌনানন্দ থেকে বিরত থাকতে হয়। এটা মুমিন নর-নারীর জন্য সুনির্দিষ্টভাবেই একটি বিরাট সফলতা ও কৃতিত্ব।
খ) শুকরিয়া আদায়ের দিন : ঈদুল ফিতরের দিনটিতে মুসলমানরা ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও আনন্দমুখর পরিবেশে একত্র হয়। তারা সমবেত হয় রাব্বুল আলামিনকে ধণ্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা বা শুকরিয়া জ্ঞাপনের জন্য। মাহে রমজানে আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য যে দায়িত্ব বর্তায়, তা সুচারুরূপে সম্পন্ন হওয়ায় ঈদের দিবসে আল্লাহর প্রতি জ্ঞাপন করা হয় শুকরিয়া। শুধু মুখের কথা কিংবা ধর্মীয় আচার-প্রথার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না শুকরগুজারির এই প্রক্রিয়া। সামাজিক কর্মকাণ্ড এবং মানবিক উপলব্ধির মধ্য দিয়েও এর বহিঃপ্রকাশ ঘটে। মাসব্যাপী রোজা রাখার পর মুসলমানেরা ঈদের দিনে দীনদরিদ্রের মধ্যে দানখয়রাত করে থাকে। এভাবে আমরা যা দেখি, তা হলো একজন মুসলমান সর্বাধিক আনন্দিত ও সুখী যখন থাকে, তখনো আল্লাহতায়ালার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে; তার গরিব ও অভাবী ভাইবোনকে শুধু স্মরণ নয়, সাহায্যও করে থাকে। ঈদুল ফিতরে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের এই পন্থা আধ্যাত্মিক সাধনা আর মানবিক কল্যাণের চমৎকার সমন্বয় ঘটে।
গ) স্মরণের দিবস : পবিত্র ঈদুল ফিতর স্মরণের দিনও। সবচাইতে আনন্দ-উৎফুল্ল ও উল্লাসমুখর যখন থাকে মুসলমানেরা, সেই ঈদের দিনটিতেও তারা নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে আল্লাহতায়ালার ইবাদত-বন্দেগীর মাধ্যমেই। তাঁর দয়া ও করুণাকে মুসলমানেরা স্মরণ করে নামাজের মধ্য দিয়ে এবং তাঁর নামের গৌরব ও মাহাত্ম্য বর্ণনা করে। এর সাথে স্মরণ করা হয় যারা ইতোমধ্যে দুনিয়া থেকে নিয়েছেন চিরবিদায়, তাদের। মাগফিরাত কামনা করা হয় তাদের জন্য। গরিব ও দুস্থ মানুষকে স্মরণ করা হয় তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়ে। মুসলমানেরা দুঃখীজনকে স্মরণ করে সহানুভূতি ও সান্ত্বনা দিয়ে। আর আর্তপীড়িতজনকে স্মরণ করা হয় তাদের দেখতে যাওয়া এবং আশারবাণী শোনানো ও কল্যাণকামনার মাধ্যমে। এভাবে এটাই পরিস্ফূট হয় যে, ঈদুল ফিতর হচ্ছে ‘স্মরণের দিন’।
ঘ) বিজয় দিবস : ঈদের এই দিন বিজয়েরও। ব্যক্তি হিসেবে একজন মুসলমান যদি তার আধ্যাত্মিক উন্নতি ও বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে, তিনি ঈদকে স্বাগত জানান বিজয়ীর চেতনায়। যিনি বিশ্বস্ততার সাথে রোজার মাসে তার ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করেন, সেই বিশ্বাসী ব্যক্তি বা মুমিন ঈদের দিন অনুভব করেন যে, তিনি একজন বিজয়ী। তিনি প্রমাণ করেন, নিজের লোভলালসা, কামনাবাসনার ওপর কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপে তিনি সক্ষম; যথাযথ আত্মনিয়ন্ত্রণ তার দ্বারা সম্ভব এবং তিনি সুশৃঙ্খল জীবনের স্বাদ পেয়েছেন। এটা তার শ্রেষ্ঠতম বিজয়। কারণ, যিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণের উপায় এবং কামনাকে নিয়মের আওতায় আনতে জানেন, তিনি পাপ ও মন্দকাজ, ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতা, অন্যায়-অশালীনতা, ঈর্ষা ও লালসা এবং মানুষ দাসত্ব করে এমন অন্যান্য দোষ ও দুর্বৃত্তি থেকে মুক্ত। ঈদের দিনটা এই মুক্তিরূপী পরম সাফল্যই নির্দেশ করে। সে দিন ওই বিশ্বাসী তার সর্বশ্রেষ্ঠ বিজয় উদ্যাপন করে থাকেন।
ঙ) সুফল লাভের দিবস : ঈদে সৎকাজের সুফল প্রাপ্তি ঘটে। পরম করুণাময় আল্লাহতায়ালার উদ্দেশে যেসব ভালো কাজ করা হয়, তার সুফল অর্জনের উপলক্ষ এই ঈদুল ফিতর। এ দিনে আল্লা তাঁর দয়া ও আশীর্বাদের প্রাচুর্যে মুমিনদের জীবন ধন্য করেন। যারা মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত, তাদের জন্য আল্লাহতায়ালার দয়া অসীম। যাদের দানখয়রাতের সামর্থ্য নেই, তারা অন্যদের কাছ থেকে সাহায্য ও উপহার পেয়ে থাকেন। এমনি করে ঈদের দিন সবাই আল্লাহর রহমত ভোগ করতে পারেন।
চ) ক্ষমার দিবস : মুসলমানেরা ঈদের দিন জমায়েত হয়ে আল্লাহতায়ালার কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। যারা ঐকান্তিকতা ও নিষ্ঠাসহকারে আল্লাহর শরণাপন্ন হয়, তিনি তাদের করুণা ও ক্ষমা করার নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ঈদুল ফিতরে একজন মুসলমান দেখতে পান, তিনি অন্যদের সাথে মিলে অন্তর ও হৃদয় পরিশুদ্ধ করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। এটাই তো ঈদের চেতনা। এ দিন একজন অন্যজনকে ক্ষমা করে দেন। মুসলমানদের পারস্পরিক ক্ষমার ফলে আল্লাহতায়ালাও তাদের ক্ষমা করে দেন ও করুণা বর্ষণ করেন। তাই তো বলা যায়, ঈদুল ফিতর ক্ষমার দিন।
ছ) ইসলামের দিবস : ঈদুল ফিতরের সত্যিকার তাৎপর্য হলো, এটা একাধারে শান্তি ও কৃতজ্ঞতা, ক্ষমা ও নৈতিক বিজয়, পুণ্য অর্জন ও প্রকৃত সাফল্য, স্মরণ ও নির্মল উৎসবের অনন্য একটি দিবস। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পালিত ঈদের এসব কিছুরই সম্মিলন ঘটে এবং থাকে এর বাইরে আরো কিছু।

মুনাজাত করি সত্য আসলে কী, তা চেনার পথ যেন আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রদর্শন করেন। তিনি যেন সে পথ অনুসরণের তৌফিক দেন। আল্লাহ যেন মিথ্যাকে চেনার সামর্থ্য এবং তা থেকে দূরে থাকার দৃঢ় ইচ্ছা আমাদের দান করেন, সে জন্যও প্রার্থনা করছি।
ভাষান্তর – মীযানুল করীম

SHARE

Leave a Reply