ঈদ উৎসব পরিশুদ্ধ সংস্কৃতির মডেল -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

ঈদ। হৃদয়ের সুখানুভূতি প্রকাশের দিন। উচ্ছ্বাস প্রকাশের দিন। এ অনুভূতি পবিত্রতার। এ উচ্ছ্বাস পাপ মোচনের। তাইতো আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ সা. বলেছেন- প্রত্যেক জাতিরই আনন্দ উৎসব আছে, আর আমাদের আনন্দ উৎসব হলো দুই ঈদ। হজরত মুহাম্মদ সা.-এর এমন ঘোষণার মাধ্যমেই দ্বিতীয় হিজরিতে ঈদ উৎসবের গোড়াপত্তন হয়। সেই ঈদ এখন বিশ্বের সবচেয়ে শুদ্ধতম আনন্দ উৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর দুই বার এই আনন্দের জোয়ারে ভাসতে থাকে গোটা মুসলিম বিশ্ব। ঈদুল ফিতর পালন করা হয় শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে। পবিত্র রমজান মাসের পরিসমাপ্তির পর পশ্চিম আকাশে যখন ঈদের বাঁকা চাঁদ ভেসে ওঠে তখন ছোট-বড় নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মুসলিমদের হৃদয়ে ঈদের আনন্দ দোলা দেয়। এ যেন নতুন কিছু প্রাপ্তির মহা আনন্দ। প্রকৃতপক্ষে রমজানের কঠোর সাধনা, ইবাদত-বন্দেগি ও রোজার প্রতিদান স্বরূপ মহাপুরস্কার ঘোষণার দিন হচ্ছে এ আনন্দময় দিন। আর জিলহজ মাসের দশ তারিখে পালিত হয় ঈদুল আজহা। ইসলামে দুই ঈদের গুরুত্ব ও মর্যাদা সমান।
হজরত মূসা আ. যেদিন বনি ইসরাইলদের ফিরআউনের কবল থেকে উদ্ধার করেন, সে দিনটিতে প্রতি বছর তার অনুসারীরা ঈদ হিসেবে পালন করেন। হজরত ঈসা আ.-এর অনুসারীরা তাঁর জন্মদিনে আনন্দোৎসব করেন। জাপানের শ্যাস্টোর অনুসারীরা শ্যাস্টোর জন্মদিনে ও মৃত্যুদিনে জাঁকজমকের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করে থাকে। মদিনাবাসীরাও শরতের পূর্ণিমায় নওরোজ এবং বসন্তের পূর্ণিমায় মিহিরজান নামে দু’টি উৎসব পালন করতো। উৎসব দু’টি প্রথমে ৬ দিনব্যাপী এবং পরবর্তীতে ৩০ দিনব্যাপী পালন করা হতো। নওরোজ ছিল বর্ষবরণের উৎসব। মিহিরজান ছিল পারসিকদের অনুকরণে আনন্দ উৎসব। জাহেলি ভাবধারা, স্বভাব, প্রকৃতি ও ঐতিহ্যানুযায়ী এ দু’টি উৎসব উদযাপিত হতো। অশালীন আনন্দ-উল্লাস, কুরুচিপূর্ণ রঙ-তামাসা ও হৈ-হুল্লোড় হতো এসব অনুষ্ঠানে। সমাজের বিত্তশালীরা নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত হয়ে এ উৎসব পালন করতো। নারী-পুরুষের অবাধ মিলনকেন্দ্র ছিল এসব উৎসব। রাসূলুল্লাহ সা. এসব আনুষ্ঠানিকতা দেখে দারুণভাবে ব্যথিত হন এবং উদ্বেগ প্রকাশ করেন। হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- নবী করীম সা. যখন মদিনায় উপস্থিত হলেন, তখন তিনি দেখতে পেলেন মদিনাবাসীরা; যাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক লোক পূর্বেই ইসলাম গ্রহণ করেছেন, তারাও দু’টি জাতীয় উৎসব পালন করছে। আর এ ব্যাপদেশে তারা খেল-তামাসার আনন্দ-অনুষ্ঠান করছে। নবী করিম সা. তাদেরকে জিজ্ঞাসা করলেন, তোমরা এই যে দু’টি দিন উৎসব পালন কর, এর মৌলিকত্ব ও তাৎপর্য কী? তারা প্রতি-উত্তরে বললো, ইসলামের পূর্বে জাহিলিয়াতের যুগে আমরা এ উৎসব এমনি হাসি-খেলা ও আনন্দ-উৎসবের মাধ্যমেই উয্যাপন করতাম, এখন পর্যন্ত তাই চলে আসছে। এ কথা শুনে নবী করিম সা. বললেন, আল্লাহ তায়ালা তোমাদের এ দু’টি উৎসব দিনের পরিবর্তে তদপেক্ষা অধিক উত্তম দু’টি দিন ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা দান করেছেন। অতএব পূর্বের উৎসব বন্ধ করে এ দু’টি দিনের নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানাদি পালন করতে শুরু কর।” (আবু দাউদ, মুসনাদে আহমাদ)। নওরোজ-মিহিরজান আর আমাদের দুই ঈদের মধ্যে মূল যে পার্থক্য তা হলো- ওদের অনুষ্ঠান দু’টি ছিল অশ্লীলতায় ভরপুর আর ধনিক শ্রেণির জন্য পালনীয়। অপর দিকে আমাদের ঈদ হলো অশ্লীলতামুক্ত এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান মুক্ত। ঈদ উৎসব গরিবদের সাথে নিয়ে পালন করাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ঈদুল ফিতরের নামাজের পূর্বেই তাদের পাওনা তথা ফিতরা আদায় করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর ঈদুল আজহায় তাদেরকে কোরবানির গোশত দেয়া হয় ধনীদের পক্ষ থেকে।
নিছক আনন্দ উপভোগ ঈদের উদ্দেশ্য নয়। নিজের সুখ অপরকে বিলি করা, অন্যের দুঃখের অংশীদার হওয়া, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে শামিল হওয়া ঈদের মূল উদ্দেশ্য। তাই ঈদ উপলক্ষে বিশেষ দান ‘ফিতরা’র বিধান রয়েছে। যেন সবাই একই সাথে আনন্দ ভাগাভাগি করতে পারে। পবিত্র মাস রমাদানের অব্যবহিত পরেই আসেই ঈদুল ফিতর। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের নির্ধারিত দিনগুলোর পরে এই ঈদ আসার মানে হলো, আমরা যেনো পবিত্র হয়ে এই ঈদ উদযাপন করি। যাতে আমাদের ঈদ উদযাপন সার্থক হয়। ইসলামের নিয়মে ঈদ পালন করতে সহজ হয়। পারস্পরিক সম্পর্ক রক্ষা, সহানুভূতি প্রদর্শন, ভ্রাতৃত্ব স্থাপন, আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখা ঈদের অন্যতম উদ্দেশ্য। ঈদের আগের দিন সন্ধ্যায় হৈ-হুল্লোড় করে চাঁদ দেখা, ঈদের দিন ফজরের নামাজের পর সবাই মিলে ঈদগাহ সাজানো, ফুল টানানো, পুকুরে যেয়ে হল্লা করে গোসল, নতুন জামা কাপড় পরে আতর মেখে ঈদগাহে নামাজ, নামাজ শেষে কোলাকুলির হিড়িক, কবর জিয়ারত, বাড়ি বাড়ি ঘুরে খাওয়া-দাওয়া, বিকাল হলে মা-বাবার সাথে নানা বাড়ি যাওয়া, আরো কত কী। এরকম মজার দিনই তো ঈদ। প্রত্যেকের জীবনের প্রত্যেক ঈদই যেন স্মৃতির নক্ষত্রখচিত আকাশ।
ঈদ মূলত ইসলামের নিজস্ব সংস্কৃতি। এটা ইসলামের স্বকীয় বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ইসলাম আনন্দের এ উৎসব দু’টিকে গুরুত্বপূর্ণ দু’টি ইবাদত ও মৌলিক স্তম্ভ তথা রোজা ও হজের সাথে সংযুক্ত করেছে। কোনো ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে ঈদকে সম্পৃক্ত করতে চাইলে অনেক ঘটনা রয়েছে যা উদযাপনের দিন হিসেবে গণ্য হতে পারত। যেমন কুরআন অবতরণ ও মহানবী সা.-এর নবুওয়াত প্রাপ্তির দিন, মিরাজ, বদরের বিজয়, মক্কাবিজয় ইত্যাদি। কিন্তু ইসলাম তা করেনি। কেননা এসব ক্ষেত্রে ব্যক্তির নিজস্ব কোনো ভূমিকা থাকে না, শুধু ইতিহাসের সাফাই শুনতে হয়; সর্বোচ্চ উক্ত ঘটনা থেকে প্রেরণা লাভ করা যায় মাত্র। ফলে দিবসনির্ভর উৎসব মানবকল্যাণে বিশেষ কোনো ভূমিকা রাখে না বা সার্বজনীনতা পায় না। ইসলাম তাই উৎসবে ব্যক্তির নিজস্ব ভূমিকাকে বড় করে দেখে একে ইবাদতের অংশ হিসেবে নির্ধারণ করেছে। ইসলামের ঈদ নিছক আনন্দ ভোগ আর উচ্ছলতার জোয়ারে ভেসে যাওয়ার জন্য নয়। বরং এর মধ্যে ইসলামী সমাজ ও সংস্কৃতি বিনির্মাণের নির্দেশনা রয়েছে। তাই ঈদ উদযাপনে আমাদের স্বকীয়তাকে ভুলে গেলে প্রকারান্তরে ঈদের মূল প্রেরণা এবং অস্তিত্বকেই অস্বীকার করা হবে। এ ক্ষেত্রে নিম্নক্ত করণীয় বিষয়ের প্রতি আমাদের খেয়াল রাখা প্রয়োজন-

প্রথমত, ঈদ মুসলিম উম্মাহর জাতীয় উৎসব এবং ইসলামের একটি ধর্মীয় দিবস। ধর্মীয় দৃষ্টিতে রয়েছে এর বিশেষ মর্যাদা ও গুরুত্ব। ধর্মীয় গাম্ভীর্যতায় ও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি উদযাপনের জন্য রয়েছে এ দিবসের বিশেষ কিছু সুন্নত। ঈদ একটি ইবাদাতের নাম। এ দিনটি আমাদের জন্য এক বিরাট নিয়ামত। এ দিনেও বিশেষ কিছু ইবাদাত বা আমল রয়েছে এবং রয়েছে এসব আমল বা ইবাদাতের বিশেষ প্রতিদান। রাসূল সা. ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি পাঁচটি রাত জেগে ইবাদত করবে, তার জন্য জান্নাত ওয়াজিব হবে। রাতগুলো হলো- জিলহজের রাত, আরাফার রাত, ঈদুল আজহার রাত, ঈদুল ফিতরের রাত এবং মধ্য শাবানের রাত। সুতরাং ঈদুল ফিতরের রাতে ইবাদত করা খুবই পুণ্যময় কাজ এবং এ ব্যাপারে মুমিন বান্দাদের একান্তভাবে সতর্ক থাকা উচিত। সেই সাথে অন্য দিনের চেয়ে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠা এ দিনের বিশেষ সুন্নত। খুব ভোরে ঘুম থেকে জেগে মিসওয়াকসহ অজু করে ফজরের নামাজ নিজ মহল্লার মসজিদে আদায় করা, দেহের অবাঞ্ছিত পশম পরিষ্কার করে, দাঁত মেসওয়াক করে, ভালোভাবে গোসল করা এ দিনের প্রস্তুতির বিশেষ অংশ।

দ্বিতীয়ত, ঈদের দিনে নতুন কাপড় বা সাধ্যের মধ্যে পবিত্র ও পরিচ্ছন্ন উত্তম পোশাক পরিধান অন্যতম সুন্নত। পোশাক নতুন হওয়ার ব্যাপারে শরিয়তের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। নতুন-পুরাতন যেকোনো ধরনের পোশাক হলেই চলবে। তবে পোশাক উত্তম হওয়াটা কাম্য। উত্তম পোশাক বলতে এমন ধরনের পোশাক যা মহানবী সা.-এর পোশাকের মতো হবে। বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে, টুপি ও পাগড়ি দিয়ে মাথা ঢেকে রাখা নবী করিম সা. ও তার প্রিয় সাহাবিদের পোশাকের অবিচ্ছেদ্য সুন্নত। বিনা ওজরে ঈদের দিন টুপির প্রতি অবহেলা ও শিথিলতা প্রদর্শন করে খালি মাথায় ঈদগাহে যাওয়ার দ্বারা নিছক সুন্নতের প্রতি অনাগ্রহই প্রকাশ পায় না, বরং সেই সঙ্গে সমাজ, সময় ও পরিবেশের ব্যাপারে অসচেতনতাও বিকটভাবে প্রকাশ পায়। পোশাকের সুন্নতি ডিজাইন সঠিক থাকা সাপেক্ষে পোশাকের গুণগত মান উত্তম হওয়াটাও পোশাক উত্তম হওয়ার অংশ। তাই আল্লাহতায়ালা যাদের সামর্থ্য দিয়েছেন তারা তাদের সামর্থ্য অনুপাতে ভালো মানের পোশাক পরে ঈদগাহে গেলে আল্লাহর দেয়া নিয়ামতের প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ পাবে। তবে যাদের নতুন কাপড় নেই তারা ব্যবহৃত কাপড় পরিষ্কার করে পরিধান করবে। পুরুষের জন্য মেয়েলি স্বভাবের কাপড় পরা নিষেধ। আর নারীরা যেন পুরুষালি কাপড় না পরে। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য টাইটফিট কাপড় বৈধ নয়। অতি পাতলা অথবা অঙ্গ প্রকাশ পায় এমন কাপড় পরা নারীদের জন্য অবৈধ।

তৃতীয়ত, সুবাস বা সুগন্ধি ব্যবহার করাও ঈদের সুন্নত। তবে সে সুবাস অবশ্যই হালাল হতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিশুদ্ধ আতর হলে সবচেয়ে ভালো। তবে অন্য কোনো হালাল পারফিউম ব্যবহার করা যাবে। খেয়াল রাখতে হবে যে তা যেনো কোন মুসল্লির কাছে অহসনীয় মনে না হয়। অর্থাৎ এমন পারফিউম ব্যবহার করা যাবে না যা অন্যের কাছে উৎকট গন্ধ বলে মনে হয়। ঈদুল ফিতরের দিন ঈদগাহে যাওয়ার পূর্বে বেজোড় সংখ্যায় খেজুর খাওয়া নবীজি সা.-এর সুন্নত। সংগ্রহে খেজুর না থাকলে যেকোনো মিষ্টান্ন দ্রব্যও খাওয়া যেতে পারে।

চতুর্থত, মানুষের মধ্যে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ নির্মাণ করে মানুষকে দাঁড় করিয়ে দেয় কল্যাণমূলক অর্থনৈতিক পরিবেশের দোরগোড়ায়। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর রা. বর্ণিত এক হাদিসে রাসূল সা. সাদকাতুল ফিতরকে বাধ্যতামূলক করে দিয়েছেন। তাইতো সাদকায়ে ফিতর আদায়ের মাধ্যমে গরিব দুঃখী সবার মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলা ঈদের অন্যতম অনুষঙ্গ। ঈদের আগেই সাদকাতুল ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। সাদাকতুল ফিতর থেকে গরিব অসহায় মানুষ যাতে ঈদ আনন্দে শরিক হওয়ার জন্য কেনাকাটা করতে পারে সে জন্য ঈদের আগেই বিশেষত ঈদের দুই তিন দিন আগেই সাদাকতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। অনেকে সাদাকাতুল ফিতর আদায়ে অমনোযোগী থাকেন। এটাকে ততটা গুরুত্ব দেয় না। এটা মোটেই ঠিক নয়। সাদাকাতুল ফিতর রোজাকে সবল করে, সুস্থ করে। রোজার ছোটখাটো ভুল-ত্রুটি মাফ হয়ে যায় এ সাদাকাহ আদায়ের মাধ্যমে। তাই এটাকে কোনোভাবেই অবহেলা করা একজন মুমিনের জন্য শোভনীয় নয়। সাদাকাতুল ফিতর ছাড়াও অধিক পরিমাণে দান সদকা করা এবং এতিম মিসকিন ও গরিবদের সাধ্যমতো পানাহার করানো ঈদ আনন্দের অন্যতম অনুষঙ্গ। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বিত্তবানদের সে রকম নির্দেশনাই দিয়েছেন- ‘যতক্ষণ না তোমরা দরিদ্রদের চোখের পানি মুছে দেবে, যতক্ষণ না তোমরা তাদের ভালো পোশাকে আবৃত করবে এবং তাদের জন্য ভালো খাবারের ব্যবস্থা করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঈদ পালন করবে না।’

পঞ্চমত, নবীজি সা. কর্তৃক প্রবর্তিত উৎসব সম্পূর্ণ অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতিমুক্ত। ইসলামের অন্যসব আনুষ্ঠানিকতার মতোই অর্থবহ, সমৃদ্ধ, প্রাণসম্পন্ন ও কল্যাণমুখী। সাহাবায়ে কেরাম রা. ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে দিতে ঈদের ময়দানে হাজির হতেন। তাই দেরি না করে, পায়ে হেঁটে তাকরিরে তাশরিক বলতে বলতে ঈদগাহে যাওয়া সুন্নাত। হজরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. এরশাদ করেন, আল্লাহ তায়ালা ঈদের দিন ফেরেশতাদের মাঝে রোজাদারদের নিয়ে গর্ব করে বলেন, ‘হে ফেরেশতারা আমার কর্তব্যপরায়ণ প্রেমিক বান্দার বিনিময় কী হতে পারে?’ ফেরেশতারা বলেন, হে প্রভু পুণ্যরূপে পুরস্কার দান করাই তো তার প্রতিদান। আল্লাহ বলেন, আমার বান্দারা তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব রোজা পালন করেছে। অতঃপর দোয়া করতে করতে ঈদগাহে গমন করেছে। আমার মর্যাদা, সম্মান, দয়া ও বড়ত্বের কসম আমি তাদের দোয়া কবুল করব এবং তাদেরকে মাফ করে দেব। (বায়হাকি : ৩/৩৪৩)

ষষ্ঠত, ঈদের মূল আনুষ্ঠানিকতা হলো নামাজ। ঈদের নামাজ ওয়াজিব। এ দিনে বিশেষভাবে নামাজ আদায় করার জন্য আদেশ করেছেন নবীজি সা.। ঈদের নামাজ পড়ার ক্ষেত্রে অনেকের ধারণা, নামাজের নিয়ত আরবিতে করা জরুরি। এমনটি ঠিক নয়। যেকোনো ভাষায়ই নামাজের নিয়ত করা যায়। নবীজি সা. মুসলমানদেরকে নিয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করে তাদের উদ্দেশ্যে খুতবা দিয়ে ঈদের আসল তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতেন। ঈদের নামাজের অন্যতম সুন্নত হলো প্রশস্ত মাঠে তা আদায় করা। মসজিদে নববিতে সালাত আদায় করার সওয়াব বহুগুণ বেশি হওয়া সত্ত্বেও নবীজি সা. কখনো মসজিদে ঈদের সালাত আদায় করেননি। কেবল একবার বৃষ্টির কারণে তিনি মসজিদে নববিতে আদায় করেন। সমস্যা ছাড়া মসজিদে ঈদের জামাত আদায় মাকরূহ বলেই ফকিহদের অভিমত।

সপ্তমত, ঈদের আনুষ্ঠানিকতায় সৌহার্দ্য, সম্প্রীতি, মানবতা, আধ্যাত্মিকতা ও সামাজিকতার যে সফল সমন্বয় ঘটেছে তা কল্যাণমূলক উৎসব হিসেবে এর পূর্ণতা ও স্বকীয়তাকে বাড়িয়ে দিয়েছে আরেক ধাপ। ঈদগাহে নেই কোনো ভেদাভেদ। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো, শত্রু-মিত্র নির্বিশেষে এক কাতারে দাঁড়িয়ে যায় নির্দ্বিধায়। একে অন্যকে বুকে জড়িয়ে বছর ধরে চলে আসা শত্রুতার সমাপ্তি ঘটিয়ে দেয় নিমিষেই। একে অন্যের মঙ্গল কামনা করে দুআ করে মহান প্রভুর কাছে। আত্মার সম্মিলনের এক জান্নাতি দৃশ্য ফুটে ওঠে ঈদগাহে। শুভেচ্ছা জানানো ঈদের অন্যতম আমল। আমাদের দেশে ‘ঈদ মোবারক’ বলে ঈদের শুভেচ্ছা জানানোর প্রচলন রয়েছে। ‘ঈদ মোবারক’ বলে শুভেচ্ছা বিনিময় জায়েজ। কিন্তু সালামের আগেই ঈদ মোবারক বলে শুভেচ্ছা বিনিময় করা বৈধ নয়। ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করার সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ বলা। এর অর্থ হলো, আল্লাহ আমাদের এবং আপনার পক্ষ থেকে নেক আমলগুলো কবুল করুন। হজরত ওয়াসিলা রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সা.-এর সঙ্গে ঈদের দিন সাক্ষাৎ করলাম। আমি বললাম, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’ আর তিনিও বললেন, ‘তাকাব্বালাল্লাহু মিন্না ওয়া মিনকা’। (বায়হাকি : ৩/৪৪৬) তা ছাড়াও ঈদের দিনে সালাম, মুসাফাহাও ইসলামী শিষ্টাচারের মৌলিক অনুষঙ্গ। এ দিনে মুআনাকা বা কোলাকুলিরও অনুমোদন রয়েছে। সালাম ইসলামী অভিবাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। সালামের মাধ্যমে আল্লাহ পারস্পরিক মুহব্বত বৃদ্ধি করে দেন। রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, ‘ঈমানদার না হওয়া পর্যন্ত তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর একে অন্যকে ভালো না বাসলে ঈমানদার হতে পারবে না। আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি কাজ শিখিয়ে দেবো না, যা করলে তোমরা পরস্পরে ভালোবাসতে পারবে? তোমাদের মধ্যে সালামের প্রচলন করো।’ (মুসলিম : ১/৪৭) সালামের পূর্ণ বাক্যটি বললেই বেশি সওয়াব পাওয়া যাবে। হজরত আবু উমামা রা. বলেন, যে ব্যক্তি ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলবে তার জন্য ১০টি নেকি লেখা হবে, যে ব্যক্তি ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ’ বলবে তার জন্য ২০টি নেকি লেখা হবে আর যে ব্যক্তি ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু’ বলবে তার জন্য ৩০টি নেকি লেখা হবে। (তাবরানি: ৩/২০) সালামের উত্তর প্রদান ওয়াজিব। সালামদাতার চেয়ে উত্তম করেই দিতে হয় সালামের উত্তর।

অষ্টমত, ইসলামী অভিবাদনের আরেকটি বৈধ বিষয় হলো চুমু খাওয়া। রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবিগণ পরস্পরের হাতে চুমু খেয়েছেন বা তাবেয়িগণ সাহাবিগণের হাতে চুমু খেয়েছেন এমনটি হাদিসে পাওয়া যায়। সন্তান, পিতামাতা, উস্তাদ, আলেম বা নেককার মুরব্বিদের হাতে চুমু খাওয়া ইসলামী শিষ্টাচারের অংশ। হজরত আয়েশা রা. বলেন, ‘যায়েদ ইবনে হারেসা রা. মদিনায় আগমন করে আমার বাড়ির বাইরে এসে সাড়া দিলে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর দিকে দৌড়ে যান তাকে জড়িয়ে ধরেন এবং চুমুখান।’ (তিরমিজি : ৫/৭৬) তা ছাড়া শিশুদের গালে, কপালে বা মাথায় আদরের চুমু দেয়াও রাসূলুল্লাহ সা.-এর রীতি ছিল। (নববী, আল আজকার: ১/২৬২)
নবমত, উৎসবের নামে নৈতিকতা বিবর্জিত বল্গাহীন অনুষ্ঠান আড়ম্বরের অবকাশ নেই। কারণ ঈদ শুধু উৎসবই নয় বরং তা একটি ইবাদত। ঈদ তো আনন্দ ও কৃতজ্ঞতার সমন্বয়। এ আনন্দ প্রেম ও পুরস্কারের। পৃথিবীবাসীকে সব ধরনের অপসংস্কৃতির উৎসব থেকে মুক্ত করতে সুস্থ সংস্কৃতির উৎসব ঈদের প্রচলন করেছেন প্রিয়নবী মুহাম্মাদ সা.। নবীজি সা. কর্তৃক প্রবর্তিত ঈদ ইসলামের অন্যসব আনুষ্ঠানিকতার মতোই সম্পূর্ণ অশ্লীলতা ও অপসংস্কৃতিমুক্ত, অর্থবহ, সমৃদ্ধ, প্রাণসম্পন্ন ও কল্যাণমুখী। তবে এ কথাও সত্য যে, বৈধ ও নির্দোষ আনন্দ-স্ফুর্তি, শরীরচর্চামূলক খেলাধুলা, নৈতিক মূল্যবোধ ও ঈমানী ব্যঞ্জনাসমৃদ্ধ শিল্প-সঙ্গীত এগুলোও ঈদের দিনের বৈধ আনুষ্ঠানিকতার বাইরে নয়। হজরত আয়েশা রা. বলেন, ঈদের দিন হাবশিরা খেলা করছিল। রাসূলুল্লাহ সা. ক্রীড়ারত হাবশিদের উৎসাহ দিয়ে বলেছিলেন- ‘ছেলেরা, খেলে যাও! ইহুদিরা জানুক যে আমাদের দ্বীনের প্রশস্ততা আছে।’ (বোখারি : ১/১৭৩; মুসলিম ২/৬০৮) ঈদ আনন্দে অপসংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ঠেকাতে শরীরচর্চামূলক নির্মল বিনোদনের ব্যবস্থার করা যায়। উৎসবের সাথে মানুষের রুচি ও চাহিদার বিষয়টি জড়িত বলেই অন্যান্যদের উৎসব ও আমাদের উৎসবের মধ্যে পার্থক্য আকাশ-পাতাল।

দশমত, ঈদের দিন রোজা রাখা হারাম। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. দুই দিন রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। সে দুদিন হলো- রোজা শেষে অর্থাৎ এক মাস রোজার পর ঈদুল ফিতরের দিন এবং ঈদুল আজহার দিন। (বোখারি : ২/৭০২) হজরত আবু সাঈদ খুদরি রা. হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহার দিনে রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। (বোখারি: ২/৭০২) ঈদের জামায়াতের আগে নেই কোনো নফল নামাজ। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. হজরত বেলালকে রা. সঙ্গে নিয়ে ঈদুল ফিতরের দিন বের হয়ে দুই রাকাত সালাত আদায় করেন। তিনি এর আগে ও পরে কোনো নামাজ আদায় করেননি। (বোখারি : ১/৩৩৫)

পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের দেয়া দুটি আনন্দ উৎসবের সঙ্গে মিশে আছে আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্য। ঈদ আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়। শিক্ষা দেয় ভেদাভেদ ভুলে যাওয়া শ্রেণিবৈষম্যের মূলোৎপাটন করা, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে গরিব-ধনী এক কাতারে চলার। ঈদুল ফিতরকে পুরস্কার প্রদানের দিনও বলা হয়। এ পুরস্কার তাঁরাই পেতে পারেন, যাঁরা এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে রিপুকে দমন করতে পেরেছেন। আর যারা অসৎ চিন্তা, অসৎ কার্যাবলি থেকে বিরত থাকতে পারেনি, রমজানের পবিত্রতাকে কলুষিত করেছে, তাদের জন্য ঈদুল ফিতর কোনো সুসংবাদ নয়। প্রকৃত অর্থে ঈদুল ফিতরের আনন্দ তার জন্য, যে তাওবা ও ইস্তেগফারের মাধ্যমে পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত থাকতে পেরেছে। এ জন্য বলা হয়, ঈদুল ফিতর হলো, সিয়াম সাধনায় সাফল্যের প্রতীক। হজরত ওয়াহাব ইবনে মুনাব্বিহ রা. ঈদের দিন কাঁদছিলেন। কারণ জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বললেন, ‘আজ খুশির দিন ওই ব্যক্তির জন্য, যার রোজা কবুল হয়েছে। কিন্তু আজকাল আমরা গলাটিপে হত্যা করছি আমাদের সভ্যতা ও শিকড়ের সংস্কৃতিকে। আমরা আজ ঈদকে বানিয়ে ফেলেছি শ্রেণিবৈষম্যের নব্য পাঠশালা! ঈদের দিনে মানুষ হয়ে যাচ্ছে মানুষ থেকে ভিন্ন। এলিট ও নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হচ্ছে যোজন যোজন ফারাক। পৃথিবীর এ বিচিত্র পাঠশালার মধ্যে আমরা ভুলে যাচ্ছি আমাদের সভ্যতার সংস্কৃতি ও শিকড়ের শিক্ষা। ঈদ এলেই ঈদের নামে চলে বেহায়াপনার প্রদর্শনী। ঈদ নাটক, ঈদ গান, ঈদের ছবি, ঈদ রেসিপি ও ঈদ ফ্যাশন বলে বেহুদা ও ক্ষতিকর সংস্কৃতির চর্চা করা হয়। সাত দিন থেকে পনেরো দিনব্যাপী চলে ঈদের নামে প্রহসন। চ্যানেলে চ্যানেলে ভাঁড়ামি, নষ্টামি ও তথাকথিত প্রেম-পিরিতি নিয়ে চলে মাতামাতি। ইসলামের আবিষ্কৃত ঈদের উৎসবে থাকে না ইসলামের কোনো তাহজিব তমদ্দুনের শিক্ষা। ইসলামের উদারতা ও মানবপ্রীতি নিয়ে আলোচনা হয় না কোনো খবরের কাগজ কিংবা টিভি চ্যানেলে। ঈদ উপলক্ষে করা ঈদ সংখ্যায় স্থান পায় না কোনো ইসলামী ঈদ রচনা, প্রবন্ধ ও নিবন্ধ। ফিচার বা প্রতিবেদন হয় না কোনো ইসলামী ঐতিহ্য নিয়ে। কিংবা কোনো বিষয় নিয়ে হয় না আলোচনা। ইসলামের দেয়া ঈদ উৎসবে চলে ভিন জাতির নোংরা সব কালচারের প্রদর্শন; চলে বেহায়াপনার তোড়জোড় ও আস্ফাালন। আজ সময় এসেছে এ সব থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে পরিশুদ্ধ সংস্কৃতি চর্চার; সময় এসেছে ঈদ সংস্কৃতির মৌলিক ধারণা চারিদিকে ছড়িয়ে দেয়ার।

লেখক : কবি ও গবেষক; প্রফেসর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

SHARE

Leave a Reply