ঈমানের অগ্নিপরীক্ষায় মুমিনের বিজয় এবং জালিম শাসকদের পরিণতি । মোবারক হোসাইন

আল্লাহর দ্বীনের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী-রাসূল, সিদ্দিক ও মুত্তাকি জুলুম-নির্যাতনের মাধ্যমে ঈমানের অগ্নিপরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছিলেন। দুনিয়ার জীবনে কোন মুমিন বান্দাই পরীক্ষা থেকে রেহাই পাননি। কুরআনে বলা হয়েছে, “মানুষ কি মনে করে যে, আমরা ঈমান এনেছি বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে, আর তাদের পরীক্ষা করা হবে না? আর আমি তো তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছি। ফলে আল্লাহ অবশ্যই জেনে নেবেন, কারা সত্য বলে এবং অবশ্যই তিনি জেনে নেবেন, কারা মিথ্যাবাদী।” (সূরা আল আনকাবুত : ২-৩) দুনিয়ায় ক্ষণকালের ক্ষমতা কিংবা অক্ষমতা দিয়ে আল্লাহ মানুষকে পরীক্ষা করে কিছু মানুষকে মানবতার কল্যাণে বাছাই করতে চান। সে বাছাই পরীক্ষায় অনেকে অঙ্কুরে ঝরে যায়। ক্ষমতান্ধ হয়ে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে অবিবেচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে দেশ, জাতি, সমাজ ও পরিবারের ওপর নিজের নিষ্ঠুরতাকে চাপিয়ে দিয়ে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। ফেরাউন ছিলেন প্রাচীন দুনিয়ার নিষ্ঠুরতম স্বৈরশাসক। তিনি নিজেকে পুরো দুনিয়ার মালিক বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন- “আনা রাব্বুকুমুল আলা”। তার পদাঙ্ক অনুসরণ করেছে নমরুদসহ অসংখ্য জালিম শাসক। আজকের যুগেও যারা সত্য ও ন্যায়ের পথে চলছেন তারা জালিমদের জুলুমের শিকার হচ্ছেন। পক্ষান্তরে জালিমদের শাস্তি দুনিয়া ও আখেরাতে অবধারিত। মহান আল্লাহ তায়ালা আল কুরআনে বিভিন্ন জায়গায় সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেছেন যে তিনি জালিমকে পছন্দ করেন না। তিনি জালিমকে আখিরাতে কঠিন শাস্তি দেবেন। আর দুনিয়াতেও আবু লাহাব, ফেরাউন-শাদ্দাদ, নমরুদসহ কিছু জালিমের করুণ পরিণতি এবং আদ-সামুদসহ বিভিন্ন জাতি ধ্বংস হওয়ার ঘটনা দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।

ঈমানদারদের পরিচয়
ঈমান শব্দটি ‘আমন’ ধাতু থেকে নির্গত। ‘আমন’ এর মূল অর্থ হচ্ছে, আত্মার প্রশান্তি ও নির্ভীকতা লাভ। ঈমান শব্দটির আভিধানিক অর্থ হলো বিশ্বাস। এ ছাড়াও আনুগত্য করা, অবনত হওয়া, নির্ভর করা, স্বীকৃতি দেয়া অর্থেও ব্যবহৃত হয়। ছয়টি বিশ্বাসের ওপর ঈমান প্রতিষ্ঠিত: ১. আল্লাহ, ২. ফেরেশতাগণ, ৩. আসমানি কিতাবসমূহ, ৪. রাসূলগণ, ৫. শেষ দিবস এবং ৬. ভাগ্যের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনা। ঈমান হলো আল্লাহর জাত সিফাত ও আল্লাহর রাসূল কর্তৃক উপস্থাপিত জীবনাদর্শের ওপর গভীর বিশ্বাসের নাম। অর্থাৎ আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখা, এ বিশ্বাসের প্রতিফলন তার বাস্তব জীবনের বাস্তবায়িত করার নামই হলো ঈমান। কুরআন ও হাদিসের আলোকে ঈমানদারদের পরিচয় আমরা অনুধাবন করতে পারি-
ঈমান সম্পর্কে কোরআনে এমন অনেক আয়াত এসেছে, যাতে ঈমানের সাথে আমলের কথাও বলা হয়েছে। “যারা ঈমান আনে আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি আর নেক আমল করে।” (সূরা আল বাকারা : ৬২) “অতঃপর ঈমান আনা আল্লাহর প্রতি ও রাসূলের প্রতি যদি তোমরা ঈমান আনো ও তাকওয়া অবলম্বন কর। তবে তোমাদের জন্য বিরাট পুরস্কার রয়েছে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৭৯) দুনিয়ার জীবনযুদ্ধে একজন মুমিন তার ঈমানের দাবি পূরণে থাকেন সদা আপসহীন। সংগ্রামের পথে তিনি খুঁজে পান জীবনের সফলতা। কুরআনে এসেছে, “মুমিন কেবল তারাই যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি ঈমান এনেছে, তারপর সন্দেহ পোষণ করেনি। আর নিজদের সম্পদ ও নিজেদের জীবন দিয়ে আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম করেছে। এরাই সত্যনিষ্ঠ।” (সূরা হুজুরাত : ১৫)
হযরত আব্বাস (রা:) হতে বর্ণিত, রাসূল (সা:) এরশাদ করেছেন, “যে ব্যক্তি পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে আল্লাহকে রব, ইসলামকে দ্বীন এবং মুহম্মদ (সা:)কে নবী হিসেবে কবুল করেছে সেই ব্যক্তি ঈমানের প্রকৃত স্বাদ লাভ করেছে।” (বুখারি ও মুসলিম) হযরত আমর বিন আবাসা (রা:) হতে বর্ণিত, আমি রাসূলুল্লাহ্ (সা:)কে জিজ্ঞেস করেছিলাম ঈমান কী? জবাবে তিনি বললেন, “সবর (ধৈর্য ও সহনশীলতা এবং সামাহাত দানশীলতা, নমনীয়তা ও উদারতা হচ্ছে ঈমান।” (সহিহ মুসলিম) ঈমান গ্রহণকারী ব্যক্তি আল্লাহ্প্রদত্ত প্রশান্তি তখনই লাভ করবে তখন তাগুতি শক্তির কাছে মাথা নত করবে না। আল্লাহর আদেশের প্রতি থাকবে তার দৃঢ় আস্থা। আল্লাহর কাছেই সে মাথানত ও আত্মসর্পণ করবে। মৌখিকভাবে আল্লাহকে বিশ্বাস করার নাম ঈমান নয়। ঈমানের স্বীকৃতি দেয়ার সাথে সাথে তাকে নিজের নাফসের সাথে সংগ্রাম করতে হয়। আল্লাহর আদেশের বিপরীত সকল কর্মকাণ্ড থেকে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করে নেয়ার সাথে চিন্তার পরিশুদ্ধিও একান্ত প্রয়োজন। চিন্তাচেতনা এবং বাস্তবজীবনে ইসলামকে যখন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে সে মেনে নিবে তখন আসবে তার ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা। এই পরীক্ষায় যখন যে উত্তীর্ণ হবে তখনই সে হবে আল্লাহর খাঁটি বান্দা বা ঈমানদার।

মুমিনজীবনে ঈমানী পরীক্ষা অবশ্যম্ভাবী
প্রত্যেক নবী-রাসুল, সাহাবায়ে কেরাম, তাবে-তাবিঈন, মুমিনগণ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কুরআনে বলা হয়েছে, “আর আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা এবং জানমাল ও ফল-ফসলের স্বল্পতার মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও।” (সূরা আল বাকারা : ১৫৫) কুরআনে অন্যত্র বলা হয়েছে, “নাকি তোমরা ভেবেছ যে, তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করবে অথচ এখনো তোমাদের নিকট তাদের মতো কিছু আসেনি, যারা তোমাদের পূর্বে বিগত হয়েছে। তাদেরকে স্পর্শ করেছিল কষ্ট ও দুর্দশা এবং তারা কম্পিত হয়েছিল। এমনকি রাসূল ও তাঁর সাথি মুমিনগণ বলছিল, ‘কখন আল্লাহর সাহায্য আসবে?’ জেনে রাখ, নিশ্চয় আল্লাহর সাহায্য নিকটবর্তী।” (সূরা আল বাকারা : ২১৪)

যুগে যুগে ঈমানদারদের অগ্নিপরীক্ষা
আল্লাহ জান্নাতের বিনিময়ে মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ মুমিনদের থেকে তাদের জান ও মাল ক্রয় করে নিয়েছেন (এর বিনিময়ে) যে, তাদের জন্য রয়েছে জান্নাত।” (সূরা আত-তাওবা : ১১১) শায়েখ সা’আদি (রহ) বলেন, “আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই স্বীয় বান্দাদের বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করবেন এ জন্য যে, যেন সত্যবাদী, মিথ্যাবাদী এবং ধৈর্যশীল ও ধৈর্যহারা ব্যক্তির মধ্যে সুস্পষ্ট প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়।” (ইমাম তিরমিজি ও ইমাম ইবনু মাজাহ)
রাসূল (সা:) বলেছেন, “বিপদ ও পরীক্ষা যত কঠিন হবে তার প্রতিদানও তত মূল্যবান। আর আল্লাহ যখন কোনো জাতিকে ভালোবাসেন তখন অধিক যাচাই ও সংশোধনের জন্য তাদেরকে বিপদ ও পরীক্ষার সম্মুখীন করেন। অতঃপর যারা আল্লাহর সিদ্ধান্ত খুশি মনে মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে, আল্লাহ তাদের ওপর সন্তুষ্ট হন। আর যারা এ বিপদ ও পরীক্ষায় আল্লাহর ওপর অসন্তুষ্ট হয় আল্লাহও তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হন।”
প্রায় সকল নবী-রাসূলই আল্লাহর পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। পরীক্ষা এসেছে নানাভাবেÑ হজরত আইয়ুব (আ:)-এর পরীক্ষা এসেছিল রোগ যাতনার মাধ্যমে। দীর্ঘ ১৮ বছর কঠিন পরীক্ষা ভোগ করেন। তার ধন-সম্পদ, আত্মীয়-স্বজন, সকল কিছুই তার থেকে দূরে সরে যায়। শেষ পর্যন্ত আল্লাহর পরীক্ষায় তিনি উত্তীর্ণ হন। আবার তার সকল কিছুই তিনি ফেরত পান। হযরত ইউনূস (আ:) পরীক্ষা দিয়েছিলেন মাছের পেটে। ৪০ দিন তিনি মাছের পেটে থেকে আল্লাহর গুণগান করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চান। আল্লাহ্ তাকে ক্ষমা করে আবার তাকে জাতির কাছে ফেরত দেন (ভুল বুঝে আল্লাহর হুকুম ছাড়া হিজরতের উদ্দেশে বের হয়েছিলেন)। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর পরীক্ষা হয়েছিল দেশান্তরিত অবস্থায়। এক মহিলা কর্তৃক মিথ্যা অপবাদে আট বছর জেলে থেকে পরীক্ষায় সফল হয়ে তিনি মিসরের বাদশাহ্ হন। সবচাইতে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছিল হযরত ইবরাহিম (আ:)কে। বহুবার তাকে ঈমানী অগ্নিপরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। প্রতিবারেই তিনি সফলতার সাথে উত্তীর্ণ হন। শেষ পর্যন্ত আল্লাহ্ পাক তাকে মিল্লাতে আবি ইবরাহিম বা মুসলিম জাতির পিতার মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন।
সর্বশেষ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) ঈমানের পরীক্ষা দিয়েছেন মক্কি জীবনের দীর্ঘ ১৩টি বছর, আঘাতে আঘাতে জর্জরিত হয়েছেন। শরীর ফেটে রক্ত প্রবাহিত হতো। নবুয়তের আগে যিনি ছিলেন কুরাইশদের ভেতর সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি; নবুয়তের পর তিনি হলেন পাগল, উপহাসের পাত্র। সঙ্গী-সাথীদের ওপর নির্যাতনের পাহাড় ভেঙে পড়ল। তারপরও কোনদিন টুঁ শব্দটি করেননি। জুলুমের আঁধার অতিক্রান্ত হয়ে প্রভাত রবি উদয় হলো মদিনায় (হিজরতের মাধ্যমে)।
শুধু নবী-রাসূলগণই নন, তাদের উম্মতদেরকেও আল্লাহ্ ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা নিয়েছেনÑ শেষ নবীর সাহাবাদের দিতে হয়েছিল হৃদয় বিদীর্ণকারী অগ্নিপরীক্ষা। হযরত খাব্বাব, বেলাল, আবু জান্দাল, ইমাম হুসাইন (রা:) তাদের ঈমানের পরীক্ষার কথা মনে হলে গা শিউরে ওঠে। বিবি মরিয়মকে দিতে হয়েছে সতীত্বের অপবাদের পরীক্ষা। রাসূলের যুগে হযরত সুমাইয়া রা. জীবন দিয়ে হলেও বাতিলের কাছে মাথা নত করেননি। শাহাদাতের মাধ্যমে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করেন তিনি। ইমাম আবু হানিফাসহ চার ইমামকেই ঈমানের অগ্নিপরীক্ষা দিতে হয়েছে। মিসরে ইমাম হাসানুল বান্না, শহীদ আবদুল কাদের আওদা ও সাইয়্যেদ কুতুব, জয়নব আল গাজ্জালীকে দিতে হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের অগ্নিপরীক্ষা।
জুলুম নির্যাতনে তারা ভেঙে পড়েননি, শহীদ হয়ে গেছেন; তারপরও ঈমানের পরীক্ষায় ছিলেন তারা অগ্রগামী। এমনিভাবে, যুগে যুগে ঈমানদার বান্দাদের আল্লাহ্ পাক পরীক্ষা নিয়েছেন।

ঈমানদাররা কখনও হতাশ হয় না:
বাতিলের ষড়যন্ত্র আর চক্রান্ত দেখে হতাশ না হয়ে মুমিন বান্দার উচিত আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার জন্য গুণাবলি অর্জনে সচেষ্ট হওয়া। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তোমরা নিরাশ হয়ো না এবং দুঃখ করো না। যদি তোমরা মুমিন হও তবে, তোমরাই জয়ী হবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৯) অন্য একটি আয়াতে আল্লাহপাক আরও বলেন, “ভয় করো না, নিশ্চয় তুমি বিজয়ী হবে।” (সূরা ত্বাহা : ৬৮)
হতাশ না হয়ে সর্বদা আল্লাহর ফয়সালায় সন্তষ্ট থাকার বিষয়ে বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী স্কলার লা তাহযান গ্রন্থের প্রণেতা ড. শায়খ আইদ আল কারনি বলেন, আমাকে যদি ৫০ বছরের অভিজ্ঞতা আলোকে উপদেশ দিতে বলা হতো আমি চারটি কথা বলবোÑ ১. লা তাহযান বা হতাশ না হওয়া, ২. লা তাখাফ বা ভীতসন্ত্রস্ত না হওয়া, ৩. লা তাগযাব বা রাগ করবেন না, ৪. লা তাসখাত বা আল্লাহর ফায়সালায় অসন্তুষ্ট হবেন না।
আল্লাহ বলেন, “যারা ঘোষণা করেছে, আল্লাহ আমাদের রব, অতঃপর তার ওপর দৃঢ় ও স্থির থেকেছে নিশ্চিত তাদের কাছে ফেরেশতারা আসে এবং তাদের বলে, ভীত হয়ো না, দুঃখ করো না এবং সেই জান্নাতের সুসংবাদ শুনে খুশি হও তোমাদেরকে যার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। (সূরা হা-মিম আস সাজদাহ : ৩০) আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আখেরাতের শেষ বিচারে আজাবে আলিম বা দোজখের বেদনাদায়ক শাস্তি থেকে নাজাতের জন্যই এই জিহাদে অংশ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা সফের মাধ্যমে আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা যে ভাষায় এ ব্যাপারে নির্দেশনা দিয়েছেন তা খুবই প্রণিধানযোগ্য। আল্লাহর ঘোষণা বা নির্দেশনাটি নিmnরূপ :
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদেরকে কি এমন একটা ব্যবসার কথা বলব যা তোমাদেরকে আজাবে আলিম বা বেদনাদায়ক শাস্তি থেকে নিষ্কৃতি দেবে? (আর তা হলো) ঈমান আনো আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি (আর এর অনিবার্য দাবি অনুযায়ী) জিহাদ কর আল্লাহর পথে মাল দিয়ে এবং জান দিয়েÑ এটাই তোমাদের জন্য উত্তম যদি তোমরা প্রকৃত জ্ঞান লাভ করে থাক।” (সূরা আসসফ : ১০-১১) আল্লাহ তায়ালা আরো বলেন, “তোমাদের গোনাহসমূহ মাফ করে দেয়া হবে। তোমাদের প্রবেশ করানো হবে এমন জান্নাতে যার পাদদেশ দিয়ে ঝরনা প্রবাহিত হবে। আর সেই সুরম্য জান্নাতে বসবাসের জন্য থাকবে পূত-পবিত্র বাসস্থানসমূহ, এটাই সর্বোত্তম পুরস্কার। তবে এ ছাড়া আরো একটি পুরস্কার আছে যা তোমরা পছন্দ কর, আর তা হলো নিকটতম বিজয় (এই বিজয় সম্পর্কে), মুমিনদেরকে শুভ সংবাদ দাও।” (সূরা আসসফ : ১২-১৩)
ইসলামী আন্দোলনের কর্মী হিসেবে আমাদের মনে রাখতে হবে রাতের আঁধার যত গভীর হয় ভোরের সূর্য ওঠার সময় তত ঘনিয়ে আসে। নদীতে কখনও জোয়ার আসে আবার কখনও ভাটা আসে। সব সময় বাতাস একদিকে প্রবাহিত হয় না বা বাতাসের গতি সবসময় সমান থাকে না। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন সব সময় তাঁর প্রিয় বান্দাদের বিপদে রেখেই খুশি হন বিষয়টা এমন নয়। তিনি তাঁর প্রিয় বান্দাদের আরও বেশি প্রিয়পাত্র বানানোর জন্য পরীক্ষা করেন। এক্ষেত্রে কাউকে একটু বেশি পরীক্ষা করেন আর কাউকে একটু কম করেন। এমতাবস্থায় আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের তাঁর ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহ বলেন, “হে রাসূল! ওদেরকে বলুন, আল্লাহ আমাদের জন্য যা লিখে দিয়েছেন, তা ছাড়া কখনো কোনো (ভালো বা মন্দ) কিছুই আমাদের কাছে পৌঁছে না। তিনিই আমাদের মনিব। মুমিনদেরকে আল্লাহরই ওপর ভরসা করা উচিত।” (সূরা তওবাহ : ৫১) বিপদাপদ ও জুলুম নিপীড়নে ঘাবড়ে না গিয়ে আল্লাহর নিকট সাহায্য কামনা করতে হবে। আল্লাহ বলেন, “যে নিয়ামতই তোমরা পেয়েছ, তা আল্লাহর পথ থেকেই এসেছে। তারপর যখন তোমাদের ওপর কোন কঠিন সময় আসে তখন তোমরা ফরিয়াদ নিয়ে তাঁরই দিকে দৌড়াও।” (সূরা নাহল : ৫৩)
জালিমরা জুলুম করে আল্লাহর দ্বীনকে নির্বাপিত করতে চায় আর আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে জুলুম-নিপীড়নের মধ্য দিয়েই তার দ্বীনের নূরকে তিনি প্রজ্বলিত করবেনই। মহান আল্লাহর ঘোষণা, “তারা (কাফেররা) মুখের ফুৎকারেই আল্লাহর নূর নিভিয়ে দিতে চায়; অথচ আল্লাহ তাঁর এ নূর পরিপূর্ণ করে দিতে চান; তা কাফেরদের কাছে যতই অপছন্দনীয় হোক না কেন।” (সূরা আসসফ : ৮)

ধৈর্যের মাধ্যমে অর্জিত হবে প্রকৃত বিজয়
সবর বা ধৈর্য মুমিনের মহৎ গুণ। ধৈর্য মানবজীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুতপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ও কল্যাণকর জীবনযাপনের জন্য সবরের গুরুত্ব অপরিসীম। যুগে যুগে নবী-রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম এবং ঈমানদারগণ সীমাহীন অত্যাচার নির্যাতনের মোকাবিলায় ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রতিটি অধ্যায়ে তারা ছিলেন আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুলকারী এবং তাঁরই সাহায্যের মুখাপেক্ষী। আজকের দিনে সত্যের পথের পথিকদেরও একই পথ অনুসরণ করেই সামনে অগ্রসর হতে হবে।
রাসূল (সা:) বলেন, “যে সবর করে আল্লাহ তায়ালা তাকে সবর করার শক্তি দান করেন। আল্লাহ তায়ালা সবরের চেয়ে অধিক উত্তম ও কল্যাণকর আর কিছু কাউকে দান করেনি।” আল্লাহ তাআলা সূরা বাকারার ১৫৩ নম্বর আয়াতে বলেন, “হে মুমিনগণ তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন।” অন্য একটি আয়াতে আল্লাহ বলেন, “আর তুমি তোমার প্রভুর উদ্দেশ্যে ধৈর্য ধারণ কর।” (সূরা আল মুদ্দাসসির : ৭) সাফল্য লাভের জন্য সকল কাজেই ধৈর্য ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ আল্লাহ তাআলা সূরা হুদের ১১৫ নম্বর আয়াতে বলেন, “সবর অবলম্বন কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ মুহসিনদের (সৎকর্মশলীদের) কর্মফল বিনষ্ট করবেন না।”
চরম বিপদ-আপদ, জুলুম-নির্যাতনের মাঝেও ধৈর্য ধারণ করা ঈমানদারের প্রকৃত গুণ। এ ধৈর্যধারণের মাধ্যমেই অর্জিত হয় দুনিয়া ও পরকালের কাক্সিক্ষত বিজয়। আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমরা ধৈর্য ধারণ কর এবং ধৈর্যধারণের প্রতিযোগিতা কর এবং ধৈর্যসহকারে পরস্পরকে শক্তিশালী কর। আর আল্লাহকে ভয় করো যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।” (সূরা আলে ইমরান : ২০০)
ইসলামের জন্য মানুষের জীবন ও সম্পদ দ্বারা আল্লাহর রাস্তায় সংগ্রাম, দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আত্মনিয়োগ করা সব মুসলমানের ঈমানের দাবি। যারা ইসলামের জন্য দুনিয়ার যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট ও নির্যাতনে ধৈর্য ধারণ করবে তাদের জন্য দুনিয়া ও পরকালে রয়েছে মহা প্রতিদান।

ঈমানদারদের জন্য বেহিসাবি পুরস্কার প্রদান
রাসূল (সা:) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যদি সত্যের কালেমা উচ্চারণ এবং মিথ্যা প্রতিরোধের জন্য যুক্তি প্রদর্শন করে এবং নিজের প্রচেষ্টায় হকের সাহায্যের জন্য কাজ করে সেই ব্যক্তির এই কাজ আমার সঙ্গে হিজরত করার চেয়ে বেশি উত্তম বিবেচিত হবে।” রাসূল (সা:) আরো বলেন, “ইসলামের পথে কারো এক ঘণ্টার কষ্ট সহ্য করা এবং দৃঢ়পদ থাকা তার ৪০ বছর এবাদতের চেয়ে উত্তম।” হযরত কাতাদা (রা:) বলেন, হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা:) আমাকে বলেছেন যে, রাসূল (সা:) বলেছেন, “কেয়ামতের দিন দাঁড়িপাল্লা লাগানো হবে, সদকা খয়রাত যারা করবে তাদের দানের বিনিময়ে, পুরস্কার দেয়া হবে। নামাজ রোজা হজ ইত্যাদি নেক কাজের বিনিময় দেয়া হবে। এরপর আল্লাহর পথে বিপদ সহ্যকারীদের পালা আসবে। তাদের জন্য দাঁড়িপাল্লা লাগানোর আগেই তাদের নেক আমল ওজন হয়ে যাবে। তাদের বেহিসাব বিনিময় দেয়া হবে।” আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ধৈর্যশীলদের তাদের পারিশ্রমিক বিনা হিসেবে দেয়া হবে।” (সূরা জুমার : ১০) দুনিয়ার জীবনে বিপদে-মুসিবতে বিপন্ন অসহায় বান্দারা কেয়ামতের দিন বেহিসাব পুরস্কার পেতে থাকবেন। এই দৃশ্য দেখে দুনিয়ার জীবনে আরাম-আয়েশে বসবাসকারীরা আক্ষেপ করে বলতে থাকবে, আহা দুনিয়ার জীবনে আমার দেহ যদি কাঁচি দিয়ে কেটে টুকরো টুকরো করা হতো তবে আজ আমি অনেক বেশি পুরস্কার লাভ করতাম।

অত্যাচারী জালিম শাসকদের শেষ পরিণতি
প্রত্যেক শুরুরই শেষ আছে এবং প্রত্যেক শাসনকালের একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ আছে। মহান আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, “এবং তোমার রব তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে মোটেই উদাসীন নন।” (সূরা আল আনয়াম : ১৩২) পবিত্র কুরআনের অন্য একটি আয়াতের ঘোষণা, “অভিযোগ তো হচ্ছে তাদের ওপর, যারা মানুষদের ওপর অত্যাচার করে এবং পৃথিবীর বুকে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহের আচরণ করে বেড়ায়; এমন (ধরনের জালেম) লোকদের জন্যই রয়েছে কঠোর আজাব।” (সূরা আশ শুরা : ৪২)
রাসূল (সা:) বলেন, “আল্লাহ তা’আলা জালিমকে দীর্ঘ সময় দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, “তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন। তাঁর পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য।” (সহিহ বুখারি ও মুসলিম)
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর আপনি কখনো মনে করবেন না যে, জালিমরা যা করে সে বিষয়ে আল্লাহ উদাসীন। তবে তিনি তাদেরকে সে দিন পর্যন্ত অবকাশ দেন, যে দিন তাদের চক্ষু হবে স্থির। ভীত-বিহ্বলচিত্তে উপরের দিকে তাকিয়ে তারা ছুটোছুটি করবে, নিজেদের প্রতি তাদের দৃষ্টি ফিরবে না এবং তাদের অন্তর হবে উদাস।” (সূরা ইবরাহিম : ৪২-৪৩)
জালিমদের শেষ পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহর নিদর্শন পর্যায়ক্রমিক রূপে এসেছে এবং অত্যাচারীদের ওপর তাঁর শাস্তি বিরতিহীনরূপে এসে পড়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, “বলুন, তোমরা আমাদের দু’টি কল্যাণের (বিজয় ও শাহাদাত) একটির জন্য প্রতীক্ষা করছ এবং আমরা প্রতীক্ষা করছি যে, আল্লাহ তোমাদেরকে শাস্তি দিবেন সরাসরি নিজ পক্ষ থেকে অথবা আমাদের হাত দ্বারা। অতএব তোমরা প্রতীক্ষা করো, আমরাও তোমাদের সাথে প্রতীক্ষা করছি।” (সূরা তাওবা : ৫২)
মহান আল্লাহ তা’আলা বলেন, “ফিরাউনের বংশধররাও তাদের পূর্ববর্তীদের মত আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা মনে করেছিল। ফলে আল্লাহ তাদের পাপের জন্য তাদেরকে শাস্তি দান করেছিলেন। বস্তুত আল্লাহ শাস্তি দানে অত্যন্ত কঠোর।” (সূরা আলে ইমরান : ১১) বিশ্ববাসীর জন্য আল্লাহ তাদেরকে দৃষ্টান্তস্বরূপ পেশ করেছেন, যাতে পরবর্তীগণ তা থেকে শিক্ষা লাভ করতে পারে।
নিশ্চয়ই আল্লাহ বহু জালিমকে ধ্বংস করেছেন, একক কিংবা গোষ্ঠী নির্বিশেষে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর আমরা আদ ও সামুদকে ধ্বংস করেছিলাম, তাদের বাড়ি-ঘরের কিছু তোমাদের জন্য উন্মোচিত হয়েছে। আর শয়তান তাদের কাজকে তাদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল এবং তাদেরকে সৎপথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, যদিও তারা ছিল বিচক্ষণ। আর আমরা ধ্বংস করেছিলাম কারূন, ফিরাউন ও হামানকে। আর অবশ্যই মূসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিল, অতঃপর তারা জমিনে অহঙ্কার করেছিল। কিন্তু তারা আমার শাস্তি এড়াতে পারেনি। সুতরাং তাদের প্রত্যেককেই আমরা তার অপরাধের জন্য পাকড়াও করেছিলাম। তাদের কারো ওপর আমরা পাঠিয়েছিলাম পাথর বর্ষণকারী ঝড়, তাদের কাউকে আঘাত করেছিল মহাগর্জন, কাউকে আমরা মাটির নিচে ধসিয়ে দিয়েছিলাম এবং কাউকে দিয়েছিলাম ডুবিয়ে। আর আল্লাহ এমন নন যে, তিনি তাদের প্রতি জুলুম করবেন, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল। আর এসব দৃষ্টান্ত আমি মানুষের জন্য পেশ করি; আর জ্ঞানী লোকেরা ছাড়া কেউ তা বুঝে না।” (সূরা আনকাবুত : ৩৮-৪০, ৪৩)

ঈমান আনাই হলো মুমিনদের একমাত্র অপরাধ
‘জেল, জুলুম, নির্যাতন আন্দোলনের প্রশিক্ষণ’ ইসলামী আন্দোলনের সকল পর্যায়ের জনশক্তি এ স্লোগানের সাথে সম্যক পরিচিত। যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা পৃথিবীর বিভিন্ন জনপদে খোদাদ্রোহী ও বাতিল শক্তি দ্বারা জেল, জুলুম ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। বর্তমান সময়ে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীরা যে জেল, জুলুম ও নির্যাতন-নিপীড়নের শিকার হচ্ছে তা পূর্ববর্তী নির্যাতনের ধারাবাহিকতা মাত্র। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা:)-সহ অসংখ্য নবী, রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, মুজাদ্দিদ, মুজতাহিদ, ইমাম, মুজাহিদ, দ্বীনের দায়ীসহ দেশে দেশে ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী অসংখ্য ইসলামপ্রিয় মানুষ আল্লাহর দ্বীনের জন্য অকাতরে নির্যাতন সহ্য করেছেন। জালিমের পাহাড়সম জুলুম-নিপীড়ন ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি পাওয়ার প্রত্যাশায় সত্য ও ন্যায়ের পথে তারা অটল-অবিচল ছিলেন। জীবনের বড় একটি অধ্যায় তাদের পার হয়েছে ভীতিকর অবস্থা, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি, জীবনের হুমকি, মিথ্যা অপবাদ ও অপপ্রচারে সম্মুখীন হওয়ার মধ্য দিয়ে। তবুও তারা আন্দোলনের কাজ থেকে বিন্দুমাত্রও পিছপা হননি। শুধুমাত্র আদর্শগত বিরোধের কারণেই তাদেরকে জালিমের জুলুম ও পাশবিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছে।
ইসলামী আন্দোলনের একজন কর্মীর কাছে যেহেতু দুনিয়ার সফলতার চাইতে আখেরাতের সফলতাই চূড়ান্ত; সেহেতু দুনিয়ার সাময়িক দুঃখ-কষ্ট, বিপদাপদ ও জুলুম-নিপীড়নকে সে পরোয়া করার কথা নয়। দুনিয়ার জুলুম-নিপীড়নকে সে পরকালীন মুক্তির পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করে। দুনিয়ায় জালিমদের দৃষ্টিতে সে অপরাধী হয়ে শাস্তি ভোগ করলেও মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে সে নিরপরাধ হয়ে ন্যায়বিচার পাবে এ প্রত্যাশা নিয়েই তাকে আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে হবে। কেননা আল্লাহর ঘোষণা হচ্ছে, “কিয়ামতের দিন আমি ন্যায়বিচারের জন্য একটি মানদ- স্থাপন করবো, অতঃপর সেদিন কারো ওপরই কোনো রকম জুলুম হবে না; যদি একটি শস্য দানা পরিমাণ কোনো আমলও থাকে, তা আমি সামনে এনে হাজির করবো। হিসাব নেয়ার জন্য আমিই যথেষ্ট।” (সূরা আল আম্বিয়া : ৪৭)
ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের ওপর জুলুম ও নির্যাতনের কারণ কী? যুগে যুগে তাঁরা কেন জালিমদের টার্গেটে পরিণত হন? প্রশ্নদ্বয়ের উত্তর খুব সহজ। আল্লাহতা’আলা আল কুরআনে বলেছেন, “ঐ ঈমানদারদের সাথে তাদের শত্রুতার এ ছাড়া আর কোন কারণ ছিল না যে, তারা সেই আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিল যিনি পরাক্রমশালী এবং নিজের সত্তায় নিজেই প্রশংসিত, যিনি আকাশ ও পৃথিবীর রাজত্বের অধিকারী। আর সে আল্লাহ সব কিছুই দেখছেন। যারা মু’মিন পুরুষ-নারীদের ওপর জুলুম-নিপীড়ন চালিয়েছে, তারপর তা থেকে তওবা করেনি, নিশ্চিতভাবেই তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের আজাব ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি।” (সূরা বুরুজ : ৯-১০)
অর্থাৎ তাদের কোন দোষ নেই। জালেমদের দৃষ্টিতে তাঁদের একমাত্র দোষ হলো, তারা আল্লাহ তা’আলাকে সার্বভৌম ক্ষমতার একমাত্র অধিকারী বলে বিশ্বাস করে। তারা মানুষদেরকে অসংখ্য মিথ্যা খোদার নাগপাশ থেকে মুক্ত করে মহান পরাক্রমশালী আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। তাঁরা কুরআন ও রাসূলের সুন্নাহ অনুযায়ী জীবনে প্রতিটি কর্ম সম্পাদন করার জন্য মানুষকে আহবান জানায়। তাঁরা আরো আহবান জানায় যে, সকল পর্যায়ে তাগুত অস্বীকার করো। এই হলো ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের অপরাধ।
বর্তমান ইসলামবিরোধী অপশক্তি বাংলাদেশের ইসলামপন্থীদের উত্থান ঠেকানোর জন্য নতুন নতুন এজেন্ডা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। ৯০ ভাগ মুসলমানদের দেশে তৌহিদী জনতার ঈমান আকিদার সাথে সম্পৃক্ত ইসলামী দলগুলোর অগ্রযাত্রা তারা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। এরই ধারাবাহিকতায় গ্রেফতার- মামলা-হামলা, জেল-জুলুম-নিপীড়ন, গুম-খুন, অপহরণ, সন্ত্রাস, লুটপাটসহ অবিচার, অপপ্রচার ও অপবাদের শিকার হয়েছে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলন। এ শক্তিকে দমন করার জন্য ইসলাম বিরোধীরা নেতাকর্মীদের ওপর অব্যাহতভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালিয়ে আসছে। তার পাশাপাশি তাদের দলীয় ক্যাডার ও সন্ত্রাসী বাহিনী দিয়ে আন্দোলনের কর্মীদের বাসাবাড়ি, অফিস-আদালত ভাঙচুর ও লুটপাট করা হচ্ছে। বাসা-বাড়িতে রাতের অন্ধকারে হানা দিয়ে ঘুম থেকে তুলে গ্রেফতার করে নিয়ে এসে মিথ্যা মামলায় আসামি বানিয়ে আবার দিনের পর দিন রিমান্ডের নামে নির্যাতন চালিয়ে আন্দোলনের কর্মীদের মনোবল ভেঙে দেয়াসহ মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করাই তাদের চক্রান্ত। যুবক থেকে বৃদ্ধ পর্যস্ত তাদের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রম থেকে কেউই রেহাই পাচ্ছে না।
আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ আমাদের আন্দোলনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ আজ শুধুমাত্র ইসলামী আন্দোলনে ভূমিকা রাখার কারণে মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত হয়ে বছরের পর বছর কারান্তরীণ থেকে ঈমানের পরীক্ষা দিয়ে চলছেন। ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত পরীক্ষায় সফল হয়ে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করে আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়ে আল্লাহর সান্নিধ্যে চলে গেছেন আমাদের প্রিয় অভিভাবক শহীদ অধ্যাপক গোলাম আযম, শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, শহীদ আবদুল কাদের মোল্লা, শহীদ কামারুজ্জামান, শহীদ মীর কাসেম আলীসহ অসংখ্য নেতাকর্মী।
আমরা আমাদের এই জনপদে অনেক অত্যাচারী-জালিম শাসক দেখেছি। আমাদের আশপাশের দেশেও বহু অত্যাচারী শাসক ছিল। তাদের অনেকেই আজ আর নেই। শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার খায়েশে যুগে যুগে নির্যাতন-নিপীড়নের পথকেই অবলম্বন করেছে। অবশ্য কারো কারো পতনের ইতিহাস এতটাই করুণ যে তাদের নাম নেওয়ার মতোও কাউকে দুনিয়ায় রেখে যেতে পারেনি। আমরা যে সময়টা পার করছি সেটা চিরস্থায়ী নয়। নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর ওয়াদা রক্ষা করবেন। দুঃখের পরে সুখের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবেন। আমরা আল্লাহর সাহায্যের অপেক্ষায় থাকি এবং আমাদের ক্রমাগত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাই। এটাই বুদ্ধিমানের কাজ । এ সম্পর্কে কবি মতিউর রহমান মল্লিকের আহবানটুকু একটু শুনে নিই। “আশাহত হয়ো নাকো তুমি/ না হয় হলো মন শুকনো কোন মরুভূমি/ আরো কিছু পথ চলো মরীচিকা মাড়িয়ে/ দেখবে সাগর আছে দুটি বাহু বাড়িয়ে/ বিশাল ঢেউয়ের গান হাওয়ার গতি ভেঙে/ হাসছে কেমন করে জানবে তুমি।”

লেখক : সম্পাদক, মাসিক প্রেরণা

SHARE

Leave a Reply