ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল -ড. মো: হাবিবুর রহমান (প্রথম পর্ব)

মানুষের দুনিয়ার জীবনের আমল বা কর্ম দুইভাগে বিভক্ত (ক) আমলে সালেহ বা ভালো আমল যা মানুষের ঈমানের জন্য সহায়ক বা ঈমান বৃদ্ধিকারী (খ) আমলে সাইয়্যেয়াত বা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। যে ব্যক্তি ভালো আমল করবে আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দিবেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যে মুমিনগণ নেক আমল করে তাদেরকে সুসংবাদ দাও যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৯) আরো বর্ণিত হয়েছে, “যারা সৎকর্ম করে, নিশ্চয় তাদের জন্য রয়েছে উত্তম প্রতিদান।” (সূরা কাহাফ : ২)
পক্ষান্তরে যারা আল্লাহর সাথে কুফ্রি করবে এবং খারাপ আমল করবে তাদের জন্য রয়েছে জাহান্নাম। আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর তাওবা নাই তাদের, যারা অন্যায় কাজ করতে থাকে, অবশেষে যখন তাদের কারো মৃত্যু এসে যায়, তখন বলে, আমি এখন তাওবা করলাম, আর তাওবা তাদের জন্য নয়, যারা কাফির অবস্থায় মারা যায়; আমি এদের জন্যই তৈরি করেছি যন্ত্রণাদায়ক আজাব।” (সূরা আন-নিসা : ১৮)
আলোচ্য প্রবন্ধে আল-কুরআন ও আল-হাদিসের আলোকে ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা তুলে ধরা হলো:

নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.)-এর সিদ্ধান্তের চেয়ে অগ্রাধিকার দেয়া :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বদ আমল হচ্ছে নিজের মতামত ও সিদ্ধান্তকে আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের (সা.) এর সিদ্ধান্তের উপরে অগ্রাধিকার দেয়া। এ ধরনের কাজ ঈমান ও আমল সম্পূর্ণ বিনষ্ট করে দেয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে অগ্রবর্তী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।” (সূরা আল হুজুরাত : ১)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা নবীর আওয়াজের ওপর তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা নিজেরা পরস্পর যেমন উচ্চস্বরে কথা বলো, তাঁর সাথে সে রকম উচ্চস্বরে কথা বলো না। এ আশঙ্কায় যে তোমাদের সকল আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে অথচ তোমরা উপলব্ধিও করতে পারবে না।” (সূরা আল হুজুরাত : ২)

উপদেশ অনুযায়ী কাজ না করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে আর একটি বদ আমল হচ্ছে কোন ব্যক্তি মানুষকে যে উপদেশ বা নসিহত করে অথচ নিজে সম্পূর্ণরূপে তা ভুলে থাকে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “তোমরা কি মানুষকে ভালো কাজের আদেশ দিচ্ছ আর নিজেদেরকে ভুলে যাচ্ছ? অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত কর। তোমরা কি বুঝ না?” (সূরা আল-বাকারা : ৪৪)
এ জাতীয় খারাপ আমলকে আল্লাহ খুবই অপছন্দ করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ, তোমরা তা কেন বলো, যা তোমরা কর না? তোমরা যা কর না, তা বলা আল্লাহর নিকট বড়ই ক্রোধের বিষয়।” (সূরা আস-সাফ : ২-৩)
এ জাতীয় আমলকারীকে বলা হয় মুনাফিক। আর মুনাফিকদের জন্য রয়েছে জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় মুনাফিকরা জাহান্নামের সর্বনিম্ন স্তরে থাকবে। আর তুমি কখনও তাদের জন্য কোন সাহায্যকারী পাবে না।” (সূরা আন-নিসা : ১৪৫)
আমানতের খেয়ানত করা :
ঈমান ধ্বংসকারী বদ আমলের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে আমানতের খেয়ানত করা। আমানতের খেয়ানত করতে নিষেধ করে রাসূল (সা.) বলেন, “তোমাকে বিশ্বস্ত মনে করে যে ব্যক্তি তোমার কাছে আমানত রাখবে, তার আমানত ফিরিয়ে দাও। আর যে ব্যক্তি তোমার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাসঘাতকতা করবে, তুমি তার সাথে খেয়ানত ও বিশ্বাস ঘাতকতা করবে না।” (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)
কারো হক নষ্টকারীকে বা খিয়ানতকারীকে কিয়ামতের দিন আল্লাহ জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) সাহাবীদের বললেন, তোমরা কি জানো প্রকৃত দরিদ্র কে? সাবাহীরা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সা.) যার টাকা-পয়সা ও দুনিয়ার সম্বল নেই সে। রাসূল (সা.) বললেন, আমার উম্মতের মধ্যে সেই প্রকৃত দরিদ্র, যে কিয়ামতের দিন সালাত, সাওম, জাকাতসহ উঠবে। ঠিক তার সাথে কাউকে অভিশাপ করেছে, কাউকে আঘাত করেছে, অন্যায়ভাবে অন্যের মাল আত্মসাৎ করেছে, কাউকে প্রহার করেছে। কিয়ামতের দিন এটার কারণে তাকে দাঁড় করানো হবে এবং বলা হবে, এরা তোমার কাছে পাওনাদার তাদের প্রাপ্য তোমার ভালো কাজ দ্বারা পরিশোধ করো। পাওনাদারের পাওনা পরিশোধের পূর্বেই তার ভালো আমল সব শেষ হয়ে যাবে। তখন এসব পাপের কারণে তাকে ধরা হবে এবং জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। (সুনান আত-তিরমিযি ও মুসনাদ আহমদ)

মানুষের ওপরে জুলুম বা অত্যাচার করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আমলের মধ্যে আর একটি আমল হচ্ছে মানুষের ওপরে জুলুম-অত্যাচার করা। কিয়ামতের দিন জুলুমকারীকে তার কর্মের প্রতিফল ভোগ করতে হবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “আজ প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অর্জন অনুসারে প্রতিদান দেয়া হবে। আজ কোন জুলুম নেই। নিশ্চয় আল্লাহ দ্রুত হিসাব গ্রহণকারী। আর তুমি তাদের আসন্ন দিন সম্পর্কে সতর্ক করে দাও। যখন তাদের প্রাণ কণ্ঠাগত হবে দুঃখ-কষ্ট সংবরণ অবস্থায়। জালিমদের জন্য নেই কোন অকৃত্রিম বন্ধু, নেই এমন কোন সুপারিশকারী যাকে গ্রাহ্য করা হবে।” (সূরা মু’মিন : ১৭-১৮)
রাসূল (সা.) জুলুমের শাস্তি সম্পর্কে বলেছেন, “যে ব্যক্তি অত্যাচার করে এক বিঘত পরিমাণ জমিন গ্রহণ করবে, (কিয়ামতের দিন) তার গলায় সাত তবক জমিন পরিধান করানো হবে।” (সহীহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা :
ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের মধ্যে অন্যতম একটি বর্জনীয় আমল হচ্ছে নিজের আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর যারা আল্লাহর সাথে দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকার করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যে সম্পর্ক অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে এবং জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই লানত আর তাদের জন্যই রয়েছে আখিরাতের মন্দ আবাস।” (সূরা রাআদ : ২৫)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “কবিরা গুনাহ হলো আল্লাহর সাথে কাউকে শরিক করা, পিতা-মাতার নাফরমানি করা, কোন মানবকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা এবং ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা শপথ করা।” (সহিহ আল-বুখারি)

পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া :
আল্লাহর ইবাদতের পরেই পিতা-মাতার হক আদায় করার ব্যাপারে আল-কুরআনে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাই পিতা-মাতার অবাধ্য হওয়া এবং তাদের সাথে খারাপ আচরণ করা ঈমানের পরিপন্থী। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি কি তোমাদের সর্বাপেক্ষা বড় পাপ সম্পর্কে অবহিত করব না? কথাটি তিনি তিনবার বললেন। আমরা বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ (সা.) অবশ্যই আপনি বলে দিন। তিনি বলেন, আল্লাহর সাথে শরিক করা আর পিতা-মাতার নাফরমানি করা।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)
লোকদেখানো আমল করা :
মানুষকে খুশি করার জন্য কোন আমল করা হচ্ছে ঈমানের পরিপন্থি। এ আমল তাকে দুনিয়া ও আখেরাতে খতিগ্রস্ত করবে। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, “অতএব সেই সালাত আদায়কারীদের জন্য দুর্ভোগ, যারা নিজেদের সালাতে অমনোযোগী, যারা লোকদেখানোর জন্য তা করে এবং ছোটখাটো গৃহসামগ্রী দান করতে নিষেধ করে।” (সূরা আল-মাউন : ৪-৭)
লোকদেখানো আমলের কুফল সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “জাহান্নামে এমন একটি প্রান্তর আছে যা থেকে স্বয়ং জাহান্নামই প্রতিদিন চারশত বার পানাহ চায়। এ প্রান্তরটি তৈরি করা হয়েছে উম্মতে মুহাম্মাদির ঐ সব রিয়াকার লোকদের জন্য, যারা আল্লাহর কিতাবের আলিম, দান খয়রাতকারী, আল্লাহর ঘরের হাজী এবং আল্লাহর রাস্তায় জিহাদকারী।” (আল-মু’জামুল কুবরা)

অন্যের হক নষ্ট করা ও জুলুম করা :
অন্যের অধিকার নষ্ট করা মস্তবড় অন্যায় কাজ যা মানুষের ঈমান ধ্বংস করে দেয়। এ ধরনের অন্যায়কারীকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) আরাফার সন্ধ্যায় নিজ উম্মতের জন্য দোআ করেন। আল্লাহ তা‘আলার পক্ষ থেকে এর জবাব আসে, তোমার দো‘আ আমি কবুল করলাম, তোমার উম্মতের পাপ আমি ক্ষমা করে দেব। তবে যারা অন্যের অধিকার হরণ করেছে, তাদের মুক্তি নেই। আমি জালিমের কাছ থেকে মযলুমের অধিকার অবশ্যই আদায় করে দেবো।” (সুনান ইব্ন মাযা)
মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের সাথে থাকা :
মিথ্যা কথা বলা ও মিথ্যাবাদীদের কাজে সহযোগিতা করা ঈমান বিনষ্টকারী আমলের অন্যতম। কারণ আল্লাহ তাআলা মুমিনদের সত্যবাদীদের সাথে থাকতে এবং মিথ্যা পরিহার করতে বলেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর এবং সত্যবাদীদের সাথে থাক।” (সূরা আত-তাওবা : ১১৯)
মিথ্যার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “মিথ্যা পাপের পথ দেখায় আর পাপ দোজখের আগুনের দিকে নিয়ে যায়। মানুষ মিথ্যার অনুসরণ করতে করতে অবশেষে আল্লাহর কাছে মিথ্যাবাদী নামে লিপিবদ্ধ হয়।” (সহিহ আল-বুখারি ও সহিহ মুসলিম)

দ্বীনের মধ্যে নতুন বিষয়ের উদ্ভাবন করা :
ঈমান বিনষ্টকারী বর্জনীয় আর একটি আমল হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু আবিষ্কার করা বা বিদাআত করা। আল্লাহ তাআলা বিদআত করা থেকে বিরত থাকার উপদেশ দিয়ে আমাদেরকে বলেন, “আর এটি তো আমার সোজা পথ। সুতরাং তোমরা তার অনুসরণ কর এবং অন্যান্য পথ অনুসরণ করো না, তাহলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে। এগুলো তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর।” (সূরা আল-আনআম : ১৫৩)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “আমি তোমাদেরকে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক করছি। কারণ খারাপ বিষয় হচ্ছে দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু তৈরি করা। আর দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে বিদাআত, আর প্রত্যেক বিদাআত হচ্ছে ভ্রষ্টতা।” (সুনান ইব্ন মাযা)

অত্যাচারীকে সাহায্য করা :
অত্যাচারীকে সাহায্য করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক আমলের অন্যতম। কারণ ইসলামে অত্যাচারীকে সাহায্য করার কোন সুযোগ দেয়া হয়নি। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি জেনে শুনে কোন অত্যাচারীকে সাহায্য করে শক্তি জোগাবে, সে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।” (বায়হাকি, শুয়াবুল ঈমান)
ধার-কর্জ নেয়া জিনিস ফেরত না দেয়া :
ধার-কর্জ নেয়া জিনিস ফেরত না দেয়া ঈমানের পরিপন্থি আমলের অন্যতম। কারণ রাসূল (সা.) কোন জিনিস কর্জ নিয়ে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, “ধারে নেয়া জিনিস, দুধ খাওয়ার জন্য প্রদত্ত জন্তু ও ঋণ অবশ্যই ফেরত দিতে হবে। আর যে ব্যক্তি কারো জামিন হবে তাকে তার জামানত অবশ্যই ফেরত দিতে হবে।” (সুনান আবু দাউদ)
উত্তরাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করা :
উত্তরাধিকারীকে তার প্রাপ্য ওয়ারিশ থেকে বঞ্চিত করা বড় ধরনের অন্যায় কাজ। আর যে ব্যক্তি উত্তরাধিকারীর হক হঞ্চিত করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে জান্নাতের অধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি তার উত্তরাধিকারীকে প্রাপ্য অংশ থেকে বঞ্চিত করবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করবেন।” (সুনান ইব্ন মাযা)
সুদ ও ঘুষ খাওয়া :
সুদ ও ঘুষ খাওয়া ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল। এ কাজ আল্লাহর সাথে যুদ্ধ করার শামিল। আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “হে মু’মিনগণ, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং সুদের যা অবশিষ্ট আছে, তা পরিত্যাগ কর, যদি তোমরা মু’মিন হও। কিন্তু যদি তোমরা তা না কর তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের ঘোষণা নাও।” (সূরা আল-বাকারা : ২৭৮-২৭৯)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা বহুগুণ বৃদ্ধি করে সুদ খাবে না। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর, যাতে তোমরা সফল হও।” (সূরা আলে-ইমরান : ১৩০)
সুদ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “যে সুদ খায়, যে খাওয়ায়, যে ব্যক্তি সুদের সাক্ষী হয় এবং যে ব্যক্তি এতদসংক্রান্ত বিবরণ কাগজেপত্রে লিপিবদ্ধ করে, তাদের সকলকে রাসূল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন।” (সুনান ইব্ন মাযা)
ঘুষ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “ঘুষখোর ও ঘুষদাতা উভয়ের ওপর আল্লাহর অভিশাপ।” (সুনান ইব্ন মাযা)

প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয়া :
প্রতিবেশীকে আচরণ ও কথার মাধ্যমে কষ্ট দেয়া ঈমান বিনষ্টকারী একটি খারাপ আমল। যদি কেউ ভালো আমল করে অথচ প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় সে জান্নাত থেকে বঞ্চিত হবে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “একজন ব্যক্তি রাসূল (সা.) কে বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা প্রচুর নফল নামায, রোযা ও সদকার জন্য প্রসিদ্ধ, কিন্তু প্রতিবেশীকে কটু কথা বলার মাধ্যমে কষ্ট দেয়। রাসূল (সা.) বললেন, সে জাহান্নামে যাবে। লোকটি আবার বললো, হে আল্লাহর রাসূল (সা.), অমুক মহিলা সম্পর্কে খ্যাতি রয়েছে যে, সে খুবই কম নফল নামায, রোযা ও সদকা করে এবং দু-একটা টুকরো সদকা করে থাকে। কিন্তু নিজের জিহবা দিয়ে কাউকে কষ্ট দেয় না। রাসূল (সা.) বললেন, সে জান্নাতে যাবে।” (মুসনাদ আহমদ)
অসৎ পথে ব্যবসা করা :
আল্লাহ তাআলা ব্যবসাকে হালাল করেছেন তবে সে ব্যবসা সৎ পথে হতে হবে। অসৎ পথে ব্যবসা করার পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “একমাত্র তাকওয়া ও সততা অবলম্বনকারী এবং সত্যবাদী ব্যতীত সকল ব্যবসায়ী কিয়ামতের দিন পাপী ও বদকার হিসেবে উত্থিত হবে।” (সুনান আত-তিরমিযি, সুনান ইবনে মাজা)
মাপ ও ওজনে কম দেয়া :
আল্লাহ তাআলা বলেছেন, “আর তোমরা ন্যায়সঙ্গতভাবে ওজন প্রতিষ্ঠা কর এবং ওজনকৃত বস্তু কম দিও না।” (সূরা আর-রাহমান-৯) কাজেই ওজনে কম দেয়া হচ্ছে অন্যতম একটা খারাপ আমল যা মানুষের ঈমান বিনষ্ট করে দেয়। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “রাসূল (সা.) মাপ ও ওজনের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয়কারী ব্যবসায়ীদেরকে সম্বোধন করে বললেন, তোমরা এমন দুটো কাজের দায়িত্ব পেয়েছো, যার কারণে তোমাদের পূর্বে অতিবাহিত জাতিগুলো ধ্বংস হয়ে গেছে।” (সুনান আত-তিরমিযি)
মজুদদারি করা :
মজুদদারি করে বাজারে মালের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা ঈমান বিনষ্টকারী খারাপ আমল। এর মাধ্যমে মানুষের অধিকার নষ্ট হয় বিধায় ইসলামে এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি যথাসময়ে বাজারে সরবরাহ করে সে আল্লাহর রহমত ও অধিকতর জীবিকা লাভের যোগ্য। আর যে ব্যক্তি মজুদদারিতে লিপ্ত সে অভিশপ্ত।” (সুনান ইব্ন মাযা)
মানুষের চলাচলের পথ বন্ধ করা :
সমাজের মানুষ যে রাস্তা দিয়ে চলাচল করে সে পথ বন্ধ করে দেয়া ইসলামে নিষেধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত সাহাল ইব্ন মুয়ায ইব্ন আনাস আল জুহানি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমরা রাসূল (সা.) এর সাথে কোন এক যুদ্ধে গিয়েছিলাম। আমাদের সাথীরা এমন গাদাগাদি করে অবস্থান করতে লাগলো যে, চলাচলের রাস্তাই বন্ধ হয়ে গেলো। রাসূল (সা.) একজন ঘোষণাকারী পাঠিয়ে ঘোষণা করিয়ে দিলেন যে, যে ব্যক্তি অবস্থানস্থলকে সঙ্কীর্ণ করে দেবে বা চলাচলের পথ বন্ধ করে দেবে, সে জিহাদের সওয়াব পাবে না।” (সুনান আবু দাউদ)
দান করে খোঁটা দেয়া এবং লোকদেখানো দান করা :
ইসলামে নিঃস্বার্থভাবে দান করতে বলা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা দান করে খোঁটা দেয়া এবং লোকদেখানো আমল করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, “হে মু’মিনগণ, তোমরা খোঁটা ও কষ্ট দেয়ার মাধ্যমে তোমাদের সদাকা বাতিল করো না। সে ব্যক্তির মত, যে তার সম্পদ ব্যয় করে লোকদেখানোর উদ্দেশ্যে এবং বিশ্বাস করে না আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি।” (সূরা আল-বাকারা : ২৬৪)
অন্যের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা ও দোষ অন্বেষণ করা :
মুমিনজীবনের আমল বিনষ্ট হওয়ার অন্যতম একটি খারাপ আমল হচ্ছে একজন মুসলিম অন্য মুসলিমের ব্যাপারে খারাপ ধারণা করা এবং দোষ অন্বেষণ করা। এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “কারো প্রতি খারাপ ধারণা পোষণ করো না, কেননা খারাপ ধারণার ভিত্তিতে যে কথা বলা হবে, তা হবে সবচেয়ে বড় মিথ্যা কথা। অন্যদের সম্পর্কে তথ্য অনুসন্ধান করে বেড়িও না, গোয়েন্দাগিরিতে লিপ্ত হয়ো না, দালালি করো না, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করো না, পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করো না। আল্লাহর বান্দা হয়ে থাক, পরস্পরে ভাই ভাই হয়ে জীবন-যাপন কর।” (সহিহ আল-বুখারি)
একে অন্যের গিবত করা :
একজন অন্য জনের গিবত করা ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমলের অন্যতম যা মানুষের ঈমানকে নিঃশেষ করে দেয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন“হে মু’মিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে দূরে থাক। নিশ্চয় কোন কোন অনুমান তো পাপ। আর তোমরা গোপন বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং একে অপরের গিবত করো না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের গোশ্ত খেতে পছন্দ করবে? তোমরা তো তা অপছন্দই করে থাক। আর তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক তাওবা কবুলকারী, অসীম দয়ালু।” (সূরা আল-হুজুরাত : ১২)
এ সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেন, “যখন আমার প্রভু আমাকে (মি’রাজের রাত্রে) আকাশে নিয়ে গেলেন, তখন আমি সেখানে এমন কিছু লোককে দেখতে পেলাম, যাদের নখ পিতলের তৈরি এবং তা দিয়ে তারা নিজেদের বুক ও মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত করছিলো। আমি জিবরাইলকে জিজ্ঞেস করলাম, এরা কারা? জিবরাইল বললো, এরা দুনিয়ায় অন্য লোকের গোশত খেত এবং তাদের মান-সম্ভ্রম নিয়ে ছিনিমিনি খেলতো।” (সুনান আবু দাউদ ও মুসনাদ আহমদ)
অহঙ্কার করা :
অহঙ্কার করা ঈমান বিনষ্টকারী একটি বর্জনীয় আমল। অহঙ্কার করে দুনিয়ায় চলাফেরা করতে আল্লাহ তাআলা মানুষকে নিষেধ করেছেন। এ সম্পর্কে আল-কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, “আর জমিনে বড়াই করে চলো না; তুমি তো কখনো জমিনকে ফাটল ধরাতে পারবে না এবং উচ্চতায় কখনো পাহাড় সমান পৌঁছতে পারবে না।” (সূরা বনি ইসরাইল : ৩৭)
আল্লাহ আরো বলেন, “হে জিন ও মানবজাতি, যদি তোমরা আসমানসমূহ ও জমিনের সীমানা থেকে বের হতে পার, তাহলে বের হও। কিন্তু তোমরা তো (আল্লাহর দেয়া) শক্তি ছাড়া বের হতে পারবে না।” (সূরা আর-রাহমান- ৩৩)
অহঙ্কারের পরিণাম সম্পর্কে রাসূল (সা.) বলেছেন, “যার অন্তরে কণা পরিমাণও অহঙ্কার থাকবে, সে বেহেশতে যেতে পারবে না। এক ব্যক্তি বললো, মানুষতো চায়, তার কাপড় ভালো হোক, জুতা ভালো হোক। (এটাও কি অহঙ্কার বলে গণ্য হবে?) রাসূল (সা.) বললেন, আল্লাহ সুন্দর ও পবিত্র। তিনি সৌন্দর্য, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাকে পছন্দ করেন। অহঙ্কার হলো আল্লাহর ইবাদত যথাযথভাবে না করা এবং তাঁর বান্দাদেরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা।” (সহীহ মুসলিম)

জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেয়া :
জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধিয়ে দেয়া ইসলামে জায়েজ নেই। বরং এর থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল (সা.) জীব-জন্তুর মধ্যে লড়াই বাধাতে নিষেধ করেছেন।” (সুনান আবু দাউদ ও তিরমিযি)
অপচয় ও অপব্যয় করা :
অপচয় ও অপব্যয় করা শয়তানের কাজ। তাই কোন মুমিনের উচিত নয় অপচয় ও অপব্যয় করা। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “আর আত্মীয়কে তার হক দিয়ে দাও এবং মিসকিন ও মুসাফিরকেও। আর কোনোভাবেই অপব্যয় করো না। নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই। আর শয়তান তার রবের প্রতি খুবই অকৃতজ্ঞ।” (সূরা বনি ইসরাইল : ২৬-২৭)
এ সম্পর্কে আল-হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, “হযরত ইব্ন আব্বাস (রা.) বলেন, যা ইচ্ছা খাও, যা খুশি পর, কেবল অপচয়-অপব্যয় ও অহঙ্কার বর্জন করা চাই।” (সহিহ আল-বুখারি)

অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা :
অন্যায়ভাবে মানুষ হত্যা করা ঈমান ধ্বংসকারী সবচেয়ে বড় অপরাধ। আল-কুরআনে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করাকে একটা জাতিকে হত্যা করার সাথে তুলনা করা হয়েছে। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি কাউকে হত্যা করা কিংবা জমিনে ফাসাদ সৃষ্টি করা ছাড়া যে কাউকে হত্যা করলো, সে যেন সব মানুষকে হত্যা করলো। আর যে তাকে বাঁচালো, সে যেন সব মানুষকে বাঁচালো।” (সূরা আল-মায়িদা : ৩২)
উপরোল্লেখিত খারাপ আমল ছাড়াও আরো অনেক ঈমান বিনষ্টকারী ও ঈমানের বৈসাদৃশ্যমূলক বর্জনীয় আমল রয়েছে যার বর্ণনা পরবর্তী পর্বে পেশ করব ইনশাআল্লাহ। (চলবে)
লেখক : বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ

SHARE

Leave a Reply