উঁচু-নিচু । এইচ এম আব্দুল আলীম

শব্দ দু’টি অতি সংক্ষিপ্ত হলেও এর মূল্যায়ন, মাহাত্ম্য, বাস্তবতা বেশি বড় কঠিন। সারা পৃথিবীতে এটা নিয়েই খেলা চলছে। এই শব্দযুগলের ওপর ভিত্তি করেই মানুষ তাদের জীবন পরিচালনা করছে। নিচু স্তরের মানুষ কিভাবে উঁচু হওয়া যায় তা নিয়েই পেরেশান। অন্য দিকে উঁচু স্তরের মানুষ নিচু স্তরের মানুষকে শোষণ করে নিজেদের স্বার্থ সিদ্ধির জন্য ব্যস্ত আছে।
বাংলা ব্যাকরণে যে ‘সমাস’ নামক একটি বিষয় আছে আমরা ছোট থেকেই পড়ে আসছি, তার প্রথম প্রকারটা হলো দ্বন্দ্ব সমাস। উঁচু-নিচু সেই সমাসের একটি উদাহরণ। দ্বন্দ্ব সমাসের নিয়ম অনুযায়ী প্রথম পদ পরপদ দু’টিতেই সমান অর্থ দেয়, গুরুত্ব থাকে এবং মূল্যায়ন করা হয়। কিন্তু এই শব্দতে (উঁচু-নিচু) এসে আমরা অন্য বিষয় দেখতে পাই। এখানে এক পক্ষ থাকে একেবারে ওপরে আর এক পক্ষ থাকে একেবারে নিচে।
উঁচু-নিচুর এই দৃশ্য বা প্রকারভেদ বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন ধরনের। ব্যক্তিগত জীবন, পারিবারিক জীবন, কর্মজীবন, সমাজজীবন, জাতীয়জীবন, এমনকি আন্তর্জাতিক জীবন। ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা যোগ হয়ে থাকে। তবে এটা নিশ্চিত যে, পৃথিবীর সব জায়গায় এটাকে কেন্দ্র করেই সংঘটিত হয় অধিকাংশ খোনাখুনি, রাহাজানি এবং রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ। হয়তোবা এমন হতে পারে, যারা এটা করেন তারা বুঝতে পারেন না এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব কত খারাপ।

ব্যক্তিগত জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে প্রত্যেক মানুষই বড় হতে চায়। অধিকাংশ ব্যক্তিই নিজেকে অন্যের চাইতে উঁচু মনে করে। কেউ প্রত্যক্ষভাবে এবং কেউ পরোক্ষভাবে, আবার কেউ আকার ইঙ্গিতে। যদিও একটা প্রবাদ চালু আছে ‘নিজে যাকে বড় বলে বড় সে নয়, লোকে যারে বড় বলে বড় সেই হয়’ অধিকাংশ মানুষ নিজেকে উঁচু মনে করে স্বার্থ উদ্ধার করার চেষ্টা করে। খুব কম মানুষই নিজেকে অন্যের থেকে ছোট মনে করতে পারে। কেউ যখন নিজেকে উঁচু হিসেবে চিন্তা করে স্বাভাবিক কারণে সে তখন তার স্বার্থকে বড় করে দেখে। ফলে শুরু হয় স্বার্থরক্ষার প্রতিযোগিতা। যদি সে পরাজিত হয়, তাহলে ক্ষিপ্ত হয় এবং অন্যকে শোষণ করার চিন্তা করে।
অন্য দিকে একজন মানুষ যখন তার অধীনে থাকা মানুষগুলোকে নিচু চিন্তা করে তখন তাদেরকে অবমূল্যায়ন করার চেষ্টায় থাকে। এমনকি মাঝে মাঝে তাদের অধিকার হরণ করে। নিজের লাভের জন্য নিচু শ্রেণীর মানুষকে কতটুকু চাপে রাখা যায় সেই চিন্তা করে। অন্যদের সামনে চেহারার বিকৃতিটাও তেমনি ঘটায়। নিজের প্রয়োজনে অন্যদের ধমক দেয়, আদেশ করে, শাসন করে, শোষণ করে। এই রকম ব্যক্তিদের অধিকাংশ মানুষই পছন্দ করতে পারে না।
ব্যক্তিজীবনের আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হলো ছাত্রজীবন। যে ছাত্র নিজেকে উঁচু মনে করে সে অন্য ছাত্রকে মূল্যায়ন করে না, সহযোগিতা করে না, এমনকি বন্ধু হিসেবেও মেনে নিতে পারে না। ইয়ারকির ছলে মাঝে মাঝে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতেও দ্বিধা বোধ করে না।

কর্মজীবন
মানুষের কর্মজীবন হলো এক সংগ্রামমুখর জীবন। প্রত্যেক মানুষই এখানে সংগ্রাম করে নিজেকে তুলে ধরার জন্য। প্রতিযোগিতার মানসিকতা নিয়েই এখানে জীবন পরিচালনা করে। অন্যের সুখে দুঃখে অংশগ্রহণ করা বা অন্যকে সহযোগিতা করার মানসিক অবস্থা অনেকেরই থাকে না। তবে কিছু মানুষের ভিন্ন অবস্থাও দেখা যায়। কর্মজীবনে যে যে অবস্থানে থাকুক না কেন প্রত্যেকে নিজ অবস্থানকে দৃঢ় করতে চায়। অন্য দিকে তার নিচের লোকদের প্রয়োজনে শোষণ করতে চায়।
অফিসগুলোতে একটা কথা চালু আছে সেটা হলো ‘বস-সারভেন্ট’ যেটাকে মালিক চাকর বলা হয়। অধিকাংশ অফিসারই তার নিচের পদের লোকগুলাকে চাকর মনে করে। তাদের সাথে কথাবার্তা, আচার আচরণে সর্বক্ষেত্রে এটা প্রতিফলিত হয়। অধস্তনের সুযোগ সুবিধাটা দেখার মতো তার সময় নাই, ডাকা মাত্রই দৌড় দিয়ে যেতে হবে। প্রত্যেকটি কথার ফাঁকে স্যার স্যার করতে হবে। বসের খাবারটা সময় মতো হওয়া চাই, চাকরের খাবারটা ২ বেলা খাইলেও হয়। আপ্যায়ন আনার জন্য যখন বলা হয় তখন চাকর পিয়নকে বাদ দিয়ে গণনা করা হয়, যা অত্যন্ত অমানবিক। সচরাচর অফিসগুলাতে এরকমই হয়। সুতরাং এ অফিসের কর্মচারীরা বসের কথা শুনে ভয়ে, আন্তরিকভাবে ভালোবেসে নয়। অন্যদিকে যে অফিসের বস চাকরকে একসাথে নিয়ে একই খাবার খায় সে চাকর বসের কথা শুনে একান্ত ভালোবেসে। বসের বেতন মাসের ১ তারিখ হতে হবে কিন্তু পিয়নের বেতন ১০-১২ তারিখ হলেও সমস্যা নাই। চাইলেও ধমক খেতে হয়। ভাবখানা দেখে মনে হয় বস হল মানুষ আর অন্যরা মানুষ নয়। বস অফিসে দেরি করে এলে অথবা কয়েক দিন না এলেও সমস্যা নাই। কিন্তু কর্মচারী কয়েক মিনিট দেরি করলেই মাথা গরম হয়ে যায়।

পারিবারিক জীবন
পরিবারে যিনি কর্তা হন তিনি স্বাভাবিকভাবে নিজেকে সবার চেয়ে উঁচু মনে করেন। তার সিদ্ধান্ত সবাই মেনে নেবে বলে তিনি দাবি করেন। তার কথার ওপর কেউ কথা বলবে না বলে তিনি বিশ্বাস করেন। যদিও অনেক অভিভাবক আছে যারা সবার সাথে পরামর্শ করে থাকেন। কিছু অভিভাবক আছেন যারা পরিবারের সবাইকে তার অনুগত দাস বলে মনে করেন। তাদের পরিবারে যে পরিচারিকা/ কাজের মেয়ে থাকে তাদেরকে তারা শোষণ করে থাকে। তাদের মৌলিক অধিকারটুকুও তারা নিশ্চিত করতে চায় না। তাদের সামর্থ্যরে চাইতে বেশি কাজ চাপিয়ে দেয়া হয়। এমনকি মাঝে মাঝে আমরা তাদের ওপর চরম নির্যাতনের খবরও শুনতে পাই। তারা উঁচু-নিচুর ভেদাভেদকে গুরুত্ব দিয়েই এটা করে থাকেন।

সমাজজীবন
মানুষকে নিয়েই যেহেতু সমাজ সেহেতু মানুষের জীবনে সমাজের অনেক প্রভাব বিদ্যমান। আবার মানুষের কাজকর্মের প্রভাবে সমাজ প্রভাবিত হয়। সুতরাং বলা যায় মানুষ সমাজ গঠন করে আবার সমাজ মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণ করে। সমাজ পরিচালিত হয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বারা। এই ব্যক্তিগুলো মনে করে তারা ছাড়া সমাজ অচল। তারা ধনী বলে মধ্যবিত্ত বা নিম্নবিত্ত শ্রেণীর কেউ তাদের সাথে কথা বলার সাহস করে না। এই সুযোগে তারা তাদের মোড়লিপনা চালিয়ে যায়।
এই সমাজপতিরা তাদের ক্ষমতা দেখাতে গিয়ে মানুষকে শোষণ করতেও ছেড়ে দেয় না। মাঝে মধ্যে তারা গরিব নিচু শ্রেণীর মানুষের প্রতি নির্যাতন করে, কারণ তারা যে উঁচু!! যেকোন অপরাধ করলে তাদের কোন বিচার হয় না। মামলা হলেও কোন ফলাফল পাওয়া যায় না। উঁচু নিচুর ভেদাভেদ সবচেয়ে বেশি দেখা যায় সমাজজীবনে যা মানবিক বিপর্যয় তৈরি করে। শ্রমিক, মজুর, রিক্শাচালক, বাসের হেলপার, ভিক্ষুকদের সাথে উঁচু শ্রেণীর লোকদের আচরণ মাঝে মাঝে মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানায়। আর এর মাধ্যমেই সমাজে এক প্রকার অশান্তি তৈরি হয়।

জাতীয়জীবন
উঁচু-নিচুর ভেদাভেদ জাতীয় জীবনকে অতিষ্ঠ করে। একটি জাতি গঠন করার জন্য এই ভেদাভেদ প্রতিবন্ধক হিসেবে দেখা দেয়। জাতীয় জীবনে যারা উঁচু জায়গায় অবস্থান করে তারা নিচু শ্রেণীর মানুষকে ব্যবহার করে তাদের স্বার্থ উদ্ধার করতে চায়। তাদেরকে দিয়ে অনেক অপরাধ সংঘটিত হয়। অনেক ধনী মানুষ আছে যারা গরিব কিছু মানুষের হাত-পা কেটে ভিক্ষুক বানাতেও দ্বিধা বোধ করে না। একজন উঁচু পর্যায়ের মানুষের জন্য সমস্ত পর্যায়ের হাজার হাজার মানুষ ট্রাফিক সিগন্যালে আটকে থাকে। অসংখ্য হোটেল রেস্টুরেন্টে খাবার অতিরিক্ত পড়ে থাকে কিন্তু গরিব-দুঃখী অনেকেই তিনবেলা খাবার পায় না। ফুটপাথে অনেকেই অনাহারে অর্ধাহারে জীবন অতিপাত করে। রেডিসন হোটেলে এক কাপ চায়ের দাম ২৫০ টাকা। কিন্তু অন্যদিকে ১০ টাকার চা কিনে কয়েকজন রিকশাচালক ভাগ করে খায়। অনেকে ২০ তলায় এসি রুমে ঘুমালেও অসংখ্য মানুষ গাছ তলায় ঘুমাতে বাধ্য হয়।
কিছু মানুষের কয়েকটা প্রাইভেট গাড়ি থাকে। একটা নিজের একটা ছেলের একটা মেয়ের ইত্যাদি….
অন্য দিকে অসংখ্য মানুষ আছে যাদের রিক্শা ভাড়া জুটানো মুশকিল হয়ে যায়। কোন ব্যক্তির সন্তানের জন্য প্রতি সাবজেক্টে টিচার থাকে, অন্যদিকে কারও সন্তানের ভাগ্যে একজন শিক্ষকও জোটে না। কোন ব্যক্তির নিজস্ব ডাক্তার থাকলেও কোন কোন ব্যক্তির ডাক্তার দেখানোর টাকা থাকে না। কেউ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে প্রমাণ হলেও বিচার হয় না আবার কেউ কোন অপরাধ না করেও শাস্তি পায়।
উঁচু-নিচুর এই ব্যবধান যতদিন পর্যন্ত একটি দেশ ও জাতির সামনে থাকবে ততদিন সে জাতি তার লক্ষ্যপানে পৌঁছতে পারবে না। সুতরাং সবার উচিত একটি সুন্দর সমাজ ও জাতিগঠনে উঁচু- নিচুর ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জীবন পরিচালনা করা, সবাইকে সহযোগিতা করা। জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়-
“ইসলামে নেই ছোট বড় কোন কিছু
এক কাতারে এনেছে সবারে
যত ছিল উঁচু-নিচু।”

SHARE

Leave a Reply