উচ্চশিক্ষা ভাবনা : প্রাসঙ্গিক কথা

higher Educationমো: জিল্লুর রহমান

পৃথিবীতে মানব সৃষ্টির পর থেকেই তার মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো শিক্ষা। শিক্ষা একজন ব্যক্তিকে, সমাজকে বা রাষ্ট্রকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত হতে সাহায্য করে। শিক্ষার প্রকার, পদ্ধতি বা এর সংজ্ঞা নিয়ে নানা বিতর্ক থাকলেও শিক্ষা ছাড়া যে কোনো দেশ বা জাতি পৃথিবীতে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না সে ব্যাপারে কোনো বিতর্ক নেই। তবে মহাকবি জন মিল্টনের শিক্ষার সংজ্ঞাকেই পরিপূর্ণ বলা যায়। তার মতে শিক্ষা হলো, ‘Education is the harmonious development of body, mind and soul.’ শিক্ষার প্রায়োগিক সম্পর্কে তিনি আরো বলেছেন, ‘I call a complete and generous education that which fits a man to perform justly, skillfully and magnanimously all the offices both private and public, of peace and war.’ তিনি আরো বলেন : “Education is the continuous process through which mental physical and moral training is provided top new generation, who also acquire their culture and ideals through it”. উল্লিখিত সংজ্ঞার আলোকে পৃথিবীতে উন্নত বা স্বল্পোন্নত জাতিসমূহ তারা তাদের নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি বা আদর্শকে সামনে রেখে শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে থাকেন এবং এর আলোকে নিজেদেরকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে তোলেন। বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্বাধীনতা-পরবর্তী বা পূর্ববর্তী সময়ে আজ পর্যন্ত আমরা সময়োচিত বা কার্যকর শিক্ষানীতি প্রণয়ন করতে সক্ষম হই নাই, যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেশের ছাত্রসমাজ নিজেদেরকে একজন সত্যিকার আদর্শিক, সাংস্কৃতিক ও ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন বা ধারণ করে সুশিক্ষিত ও সুনাগরিক হতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সামাজিক বা রাজনৈতিক নানা সমস্যার সৃষ্টি তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত শ্রেণীর। অথচ শিক্ষার মৌলিক দাবিই হলো শিক্ষিত মানুষই হলো সমাজ বা দেশের পরিচালক, তাদের কাছেই দেশ বা জাতি নিরাপদ। আমরা আমাদের সমাজে এর ঠিক বিপরীত চিত্র লক্ষ্য করে থাকি। বিষয়টির কারণ স্পষ্ট করতে হলে আমাদের উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির উন্নয়নের বিবর্তন পর্যালোচনা ও এর সূ² বিশ্লেষণ একান্ত জরুরি। আমাদের দেশে উচ্চশিক্ষা পদ্ধতি অনেক আগ থেকেই চলমান। ব্রিটিশ আমলে শুধুমাত্র সুবিধাভোগীরাই সীমিতভাবে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেত এবং যা তাদের প্রান্তিক বিশাল জনগোষ্ঠী থেকে অনেক বেশি বিছিন্ন করে রাখত। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানসমূহ দেশের নগরকেন্দ্রিক গড়ে তুলে সমাজের মধ্যে একটি প্রছন্ন বিভাজন তৈরির মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে শিক্ষাকে ব্যবহার করা হতো। উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির সেই ব্রিটিশ আমল থেকে বর্তমান কাল পর্যন্ত একটি স্পষ্ট ঐতিহাসিক ধারণা এবং এর একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরা প্রয়োজন বলে মনে করি।
প্রাথমিক পর্যায়ে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতবর্ষে শিক্ষা বিস্তার বা শিক্ষা স¤প্রসারণের বিষয়ে খুব একটা মনোযোগী ছিল না। ১৮১৩ সালে তারা তাদের চুক্তি নবায়নের পর প্রথম ভারতবর্ষের শিক্ষা উন্নয়নের জন্য ১ লাখ রুপি বরাদ্দ দেয়। ১৯২৩ সালে গণশিক্ষা বিষয়ে কলকাতাতে একটি কমিটি গঠন করে এরপরই খ্রিস্টান মিশনারিদের তত্ত¡াবধানে তারা অনেক নতুন নতুন স্কুল ও ভারতীয় ভাষায় অনেক বই ছাপানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে এবং এর সাথে সাথে ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনও শুরু করে। পরবর্তীতে লর্ড হার্ডিঞ্জ রেজুলেশনের (অক্টোবর ১০, ১৮৪৪) মাধ্যমে সকল সরকারি নিয়োগে ইংরেজি জ্ঞানের অগ্রাধিকার প্রদানের বিষয়টি প্রচলন করা হয়। ১৯৫৪ সালের চার্লস উডের শিক্ষানীতির মাধ্যমে প্রত্যেক প্রদেশে আলাদা শিক্ষা প্রশাসন গড়ে তোলার প্রস্তাব করা হয়। ১৮৫৭ সালে কলকাতা, বোম্বে ও মাদ্রাজে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার এক নতুন যুগের দ্বার উন্মোচন করা হয়। প্রকৃতপক্ষে এই ধারণা থেকেই গৃহীত হয় সরকারের ভবিষ্যৎ শিক্ষানীতি। প্রাথমিকভাবে এই তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় বিভিন্ন কলেজ ও ইনস্টিটিউটের অধিভুক্তি, পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল প্রকাশ, সনদ প্রদান এবং নানা আয়োজনের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ১৯০২ সালে লর্ড কার্জন ইন্ডিয়ান বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠনর মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। প্রাথমিক শিক্ষাপদ্ধতিও উন্নত হয় ১৯১৭ সালে স্যার মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন গঠনের মাধ্যমে। যদিও কমিশনের কর্মকাণ্ড পরিচালিত হতো শুধুমাত্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক তথাপিও এর প্রস্তাবনাসমূহ পুরো ভারতবর্ষের উচ্চশিক্ষা পদ্ধতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এই কমিশন তিন বছর মেয়াদি অনার্স কোর্স চালু, বিজ্ঞান শিক্ষা চালুকরণ, টিউটোরিয়াল পদ্ধতি ও গবেষণা কাজের ওপর গুরুত্ব প্রদান করে সুপারিশমালা পেশ করেন। ব্রিটিশ শাসনের শেষভাগে এসে প্রায় ১৪টি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষা আরো বিস্তৃত হয় এবং এর অব্যবহিত পরেই ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হয়। মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই ভারতবর্ষের বাংলাদেশ অংশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ ও বিস্তারের দ্বার উন্মোচিত হয়। শিক্ষাবিস্তার ও ইংরেজি শিক্ষার প্রচলনের আসল উদ্দেশ্য ছিল মূলত ব্রিটিশ কৃষ্টি ও কালচার সুকৌশলে বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে অনুপ্রবেশ করানো এবং সাথে সাথে রাজা ও প্রজার মধ্যে সংযোগ সৃষ্টির মাধ্যম হিসেবে তথাকথিত শিক্ষিত সমাজকে কাজা লাগানো। তাদের গৃহীত সকল পদক্ষেপসমূহ শিক্ষা বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখলেও প্রকারান্তরে এর মাধ্যমে সুকৌশলে তারা উপমহাদেশের জনগোষ্ঠীকে ব্রিটিশ দাসে পরিণত করে। বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়েছে ১৮৩৫ সালের ২ ফেব্রæয়ারি সুপ্রিম কাউন্সিলের সদস্য লর্ড ম্যাকেলের শিক্ষা বিবরণীতে যাতে একই বছরের ৭ মার্চ তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল উইলিয়াম বেন্টিক সম্মতি দেন এবং লেখেন, “the great object of the British Government ought to be the promotion of European literature and science among the natives of India.” এ ক্ষেত্রে রাজা রামমোহন রায় একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন। ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতি সম্পর্কে আরো পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে সরাসরি লর্ড ম্যাকেলের নিজের উক্তি থেকে, তিনি বলেন,”We must at present do our best to form a class who may be interpreters between us and the millions whom we govern, –a class of persons Indian in blood and colour, but English in tastes, in opinions, in morals and in intellect.”  তিনি তার কাজ শেষে উল্লাস করে বলেছিলেন, “It will be the proudest day in English history.” দুঃখজনক হলেও সত্য আমরা তাদের প্রদত্ত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে একটি আদর্শ দাসে পরিণত হয়েছি।
তথাপিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ক্রমে অধিভুক্তিকরণ এবং অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের আলোকে শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে পরিপূর্ণ বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই অঞ্চলে ১৯৫৩ সালে রাজশাহী ও ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্বদ্যিালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ষাটের দশকের শুরুতে তৎকালীন পাকিস্তানের পূর্ব পাকিস্তান (বাংলাদেশ) অংশে দু’টি প্রফেশনাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার নতুন মাত্রা সংযোজিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয় দু’টি যথাক্রমে ১৯৬১ সালে ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ১৯৬২ সালে বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)।higher Education-01 উল্লেখ্য আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়কেই বুয়েটে রূপান্তরিত করা হয়। মূলত পাকিস্তান আমলে সাধারণ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শিক্ষাবিস্তারের নতুন মাত্রা সংযোজিত হয় যা মানগতভাবে নয় বরং আনুভূমিক বিস্তৃতই বেশি লাভ করে। ১৯৫৯ সালে আতাউর রহমানের নেতৃত্বে জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয় যা পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষার ওপর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশমালা পেশ করে। যদিও পূর্ব পাকিস্তানের উচ্চশিক্ষা পদ্ধতি অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর তুলনায় অনেকটা দুর্বল ছিল। আতাউর রহমান শিক্ষা কমিশন মোট ৬৪টি সুপারিশমালা পেশ করে। ১৯৬৪ সালে বিচারপতি হামিদুর রহমানের নেতৃত্বে আর একটি শিক্ষা কমিশন গঠন করা হয়। যার নাম দেয়া হয়- স্টুডেন্টস প্রবলেমস অ্যান্ড ওয়েলফেয়ার। এই কমিশন পাকিস্তানের শিক্ষাব্যবস্থা এবং উচ্চশিক্ষা পদ্ধতির ওপর কিছু বিশেষ নির্দেশমালা পেশ করে। কমিশন সরকারি কলেজ, প্রাইভেট কলেজ, ছাত্রছাত্রীর চাহিদার ওপর বেশ কিছু বিশেষ সুপারিশমালা পেশ করে। পরবর্তীতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের শাসনামলে ১৯৬৯ সালে নুর খান কমিশন গঠন করা হয় পূর্ববর্তী কমিশনের সুপারিশ অগ্রাহ্য করে। নুর খান কমিশন শিক্ষা আইনসহ বেশ কিছু সুপারিশমালা পেশ করে। সুপারিশমালার মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের শিক্ষাপদ্ধতির কিছু নতুন প্রস্তাবনা পেশ করেন। এ ছাড়াও অধিভুক্ত কলেজসমূহের অধিকতর বিস্তৃতির মাধ্যমে নিয়মিত ও অনিয়মিত ছাত্রছাত্রীদের সুবিধা প্রদানের সুপারিশও এর আওতাভুক্ত ছিল। এখানে উল্লেখ্য পাকিস্তান আমলে কোনো শিক্ষা কমিশনেরই সুপারিশমালা বাস্তবায়ন তো দূরে থাক বরং নানাভাবে নতুন নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করে যা মূলত উচ্চশিক্ষা পদ্ধতিসহ সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার গতিপথকেই রুদ্ধ করেছে। যদিও কিছু কিছু ক্ষেত্রে কোনো কোনা পদক্ষেপ শিক্ষার পরিবেশ ও মানোন্নয়নে কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকাও রেখেছে।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের অনিবার্য অভ্যুদয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ নামক এক নতুন ও সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রের যাত্রা শুরু হয়। স্বাভাবিকভাবে সবাই আশা করে ছিল প্রতিশ্রæতিশীল সম্ভাবনাময়ী এই রাষ্ট্রের অন্যান্য দিকের সাথে সাথে শিক্ষাক্ষেত্রেও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হবে। শিক্ষা ক্ষেত্রে বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে এক নতুন মাত্রার সূচনা হবে এবং সেই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ১৯৭২ সালে প্রথম স্বাধীন বাংলাদেশে গঠিত হয় ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশন। কমিশন শিক্ষা ক্ষেত্রের নানা দুর্বলতা চিহ্নিতকরণ এবং প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার সাথে বাস্তব জীবনের সম্পর্কহীনতা চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে ব্রিটিশ কর্তৃক প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তনসহ বেশ কিছু সুপারিশমালা পেশ করে। ১৯৭৯ সালে জিয়াউর রহমানের শাসনামলে নতুন করে জাতীয় শিক্ষা উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করা হয়। এই পরিষদ দেশের উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে নানা অসামঞ্জস্যতা ও দুর্বলতা চিহ্নিত করে যার মধ্যে সমাজ ও রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কহীনতা পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা ব্যতিরেকে কলেজ স্থাপন, শিক্ষকসঙ্কট, গবেষণা কাজে সম্পৃক্ত না থাকা ইত্যাদি। উক্ত কমিটির নানা ফাইন্ডিংস ও সুপারিশমালার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন ব্যতিরেকে নতুনভাবে ১৯৯৭ সালে গঠন করা হয় জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন কমিটি, যার নেতৃত্বে ছিলেন প্রফেসর শামসুল হুদা। এই কমিটি কোটাপদ্ধতির পরিবর্তে মেধাভিত্তিক শিক্ষা, চার বছর মেয়াদি অনার্স ও ১ বছর মেয়াদি মাস্টার কোর্সসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষা উন্নয়ন শীর্ষক সুপারিশমালা পেশ করে। মাত্র ৫ বছরের ব্যবধানে ২০০২ সালে প্রফেসর এম এ বারীর নেতৃত্বে নতুন কমিশন গঠন করা হয়। বারী কমিশন কলেজভিত্তিক উচ্চশিক্ষাকেন্দ্রিক গুরুত্ব প্রদানসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশমালা পেশ করে। আশ্চর্যজনকভাবে এর এক বছর পরই ২০০৩ সালে প্রফেসর মো: মনিরুজ্জামান মিয়ার নেতৃত্বে নতুন কশিমন গঠন করা হয়। কমিশন প্রত্যন্ত অঞ্চলে নতুন নতুন কলেজ প্রতিষ্ঠা, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, প্রাইভেট সেক্টরে উচ্চশিক্ষা বিস্তার এবং স্থায়ী শিক্ষা কমিশন গঠনের সুপারিশমালা পেশ করে। সর্বশেষ ২০০৯ সালে প্রফেসর কবীর চৌধুরীর নেতৃত্বে নতুন কশিমন গঠন করেন। ২০১০ সালে কমিশন কর্র্তৃক প্রদত্ত সুপারিশমালা জাতীয় সংসদে পাস করা হয়। যদিও কমিশন কর্র্তৃক প্রদত্ত সুপারিশমালা দেশব্যাপী নানামহলে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সুপারিশমালায় উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে মেধাভিত্তিক বিবেচনার ওপর জোর দেয়া হয়। ৪ বছরব্যাপী অনার্স সম্পন্নকারীদের টিচিং (ঞবধপযরহম) ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে চাকরি প্রদানের সুযোগ সৃষ্টির বিষযটি অগ্রাধিকার দেয়া হয়।
১৯৭০-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সময়কালকে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে একটি বন্ধ্যাযুগ বলা যেতে পারে। এই সময়ে উচ্চ শিক্ষাক্ষেত্রে খুব কম অগ্রগতি পরিলক্ষিত হয়। ১৯৮৫-১৯৯২ সাল পর্যন্ত ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় যথাক্রমে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৮৫) কুষ্টিয়ায়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯০), খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯১), উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯২) ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় (১৯৯২) প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই সময়েই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ৩৪ (১৯৯২) পাস হয়। পরবর্তীতে এই আইনের আওতায় অদ্যাবধি প্রায় ৮০টির মতো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৯৬-২০০১ সময়ে আরো প্রায় ৫টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০১-২০০৬ সময়ে ড. বারী ও প্রফেসর মিয়া কমিশনের সুপারিশমালার আলোকে আরো বেশ কয়েকটি জেনারেল ও প্রফেশনাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী প্রায় ৩৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের ব্যাপক আনুভূমিক বিস্তৃতি লাভ করলেও গুণগত মান নিশ্চিত করার বিষয়টি বরাবরের মতো এখনো বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। (চলবে)

লেখক : বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক

SHARE

Leave a Reply