উজানে নদী নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় -সরদার আবদুর রহমান

(গত সংখ্যার পর)

 

ব্রহ্মপুত্রে ভারতের প্রকল্প
ব্রহ্মপুত্রে ভারতের অন্তত ২১টি সেচ প্রকল্প রয়েছে। এসব সেচ প্রকল্পের মাধ্যমে বিশেষত আসামের বিস্তীর্ণ জমিতে পানি সেচ দেয়া হচ্ছে। এগুলোর মধ্যে একটি পশ্চিমবঙ্গে এবং একটি নাগাল্যান্ডে অবস্থিত। বাকিগুলো রয়েছে আসামে। ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহের অন্যতম প্রধান উৎসগুলোর একটি সংকোশ নদীর ওপর একটি বাঁধ নির্মাণের জন্য ভুটান সরকারের সাথে চুক্তি অনুযায়ী ১৪৩ কি.মি. খাল খনন করা হবে। এ খাল ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে ফারাক্কায় অতিরিক্ত ১২ হাজার কিউসেক পানি সরবরাহ করবে। পানির সাথে বাড়তি পাওনা হবে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। ব্রহ্মপুত্রের অন্যতম উৎস রাঙ্গানদীর উপর ভারত বাঁধ নির্মাণ করেছে। অরুণাচল প্রদেশের সুবানসিঁড়ি জেলায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে এই বাঁধ নির্মিত হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের উৎস পাগলাদিয়ায় একটি বিশাল বাঁধ নির্মিত হয়েছে। এর মাধ্যমে অর্ধলক্ষ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান ও কিছু বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। আসামের লংকা থেকে ৭৯ কিলোমিটার দূরে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী খানডং-এ ৬৬ মিটার উচ্চতার একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। এই বাঁধের সাহায্যে একদিকে ১২৫৬ বর্গকি.মি. এলাকায় সেচ এবং ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এজন্য কয়েকটি পানি সংরক্ষণাগারও নির্মাণ করা হয়েছে। ব্রহ্মপুত্রের আরেক বৃহৎ উপনদী ডিহিং (বুড়ি ডিহিং) নদীতে সিয়াং বহুমুখী বাঁধ প্রকল্প নির্মাণ করেছে। ব্রহ্মপুত্রের আরেক উপনদী কালসি নদীতে বহুমুখী বাঁধ নির্মাণ করায় ব্রহ্মপুত্রে পানির প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। আসাম ও মেঘালয়ের সীমান্ত গ্রাম উকিয়ামের দেড় কি.মি দূরে এর কাজ চলছে। এই বহুমুখী প্রকল্পের মাধ্যমে একাধারে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, ২৬ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান এবং ৫৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হবে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার প্রবাহের গুরুত্বপূর্ণ উৎস রাইডাক নদীতে ভুটান-ভারতের যৌথ উদ্যোগে বৃহৎ একটি পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলা হয়েছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ৩৩৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্রের আরেক উৎস লাংপি নদীতে নির্মিত ‘কারবি-লাংপি’ প্রজেক্ট-এর মাধ্যমে ভারত ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। ব্রহ্মপুত্র নদের উৎস কপিলি নদীকে কেন্দ্র করে ভারত বেশ কয়েকটি বাঁধ ও রিজার্ভার নির্মাণ করেছে। সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণের পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন এই বাঁধ প্রকল্পের লক্ষ্য। এই নদীর আরেক উৎস সুবানসিড়ি নদীর পানি প্রত্যাহারসহ বেশ কয়েকটি প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজে হাত দিয়েছে ভারত। নাগাল্যান্ডে ডয়াং নদীর উপর নির্মিত একটি ড্যাম ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহে বাধার সৃষ্টি করছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত ৭৫ মেগাওয়াট পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। আরেক উৎস উমিয়াম নদীতে মেঘালয়ের রাই-ভই জেলায় বাঁধ দিয়ে অন্তত চারটি বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করেছে ভারত। অরুণাচল প্রদেশের চাংলাং জেলার মিয়াও শহরের চার কি.মি দূরে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী ডিহিং নদীতে নও ডিহাং বাঁধ প্রকল্পের মাধ্যমে ৭৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপন্ন করা হচ্ছে। অপর উপনদী দিবাং-এর উপর ‘আপার সিহাং হাইড্রো-ইলেকট্রিক প্রজেক্ট’ নামে একটি বৃহদাকার বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা হয়েছে।

তিস্তার পানি খাল কেটে মহানন্দায়
শুধু গজলডোবায় বাঁধ দিয়ে পানি আটকানোই শেষ নয়, উজানে ‘তিস্তা-মহানন্দা ক্যানেল’ নামের প্রকল্পের মাধ্যমে ২৫ কি.মি খাল কেটে তিস্তার পানি মহানন্দায় সরিয়ে নিচ্ছে ভারত। আর মহানন্দায় একটি ব্যারাজ প্রকল্পের সাহায্যে এই বাড়তি পানি দিয়ে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাংশের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেচের বিস্তার ঘটানো হচ্ছে। অন্যদিকে বাংলাদেশকে কতটুকু পানি দেয়া হবে না হবে তা নিয়ে এক কৃত্রিম দরকষাকষি চালানো হচ্ছে। এছাড়াও ভারত তিস্তার উপরে বহু সংখ্যক পানি-বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব প্রকল্পের জন্য বিশাল বাঁধ ও জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে। এর ফলে তিস্তার পানি ভারতের অভ্যন্তরেই থেকে যাবে।

তিস্তা ও উপনদীতে বাঁধ
ভারত পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিঙে তিস্তার দুই উপনদী রামমাম ও লোধামা নদীতে ১২.৭৫ মেগাওয়াট করে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা সম্পন্ন দু’টি বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণ করেছে। দার্জিলিং থেকে ৭৭ কি.মি দূরে অবস্থিত এই প্রকল্প ১৯৯৫-৯৬ সালে নির্মাণ করা হয়। তিস্তার আরেক উপনদী রঙ্গিত নদীর উপর জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ২০০০ সালে নির্মাণ করে ভারত। শিলিগুড়ি থেকে ১৩০ কি.মি দূরে অবস্থিত এই প্রকল্পের জন্য ৪৭ মিটার উঁচু বাঁধ ও একটি রিজার্ভার নির্মাণ করা হয়েছে। এই প্রকল্প থেকে ৩৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি হচ্ছে। ভারত তিস্তা ক্যানেল পাওয়ার হাউজ নামে তিন স্তরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। শিলিগুড়ির কাছে তৈরি ক্যানেল মহানন্দা ব্যারাজে মিলিত হয়েছে। এর ফলে একদিকে যেমন তিস্তার পানি মহানন্দায় নেয়া যাচ্ছে আবার এই ক্যানেলে উপর পাওয়ার হাউজও নির্মাণ করা হচ্ছে। এগুলো মহানন্দা ব্যারাজ থেকে ৫ কি.মি, ২১ কি.মি ও ৩১ কি.মি পর পর তৈরি করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের কারণে বাংলাদেশে তিস্তার প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

অকেজো হবার পথে বাংলাদেশের তিস্তা প্রকল্প
তিস্তার পানি ভারতের একতরফা প্রত্যাহারের ফলে অকেজো হয়ে পড়ছে বাংলাদেশের তিস্তাসহ উত্তরাঞ্চলের সেচ প্রকল্পগুলো। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলীয় অংশে সেচ সংকট নেই, কিন্তু বিপরীতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ আবাদযোগ্য জমিতে চলছে পানির জন্য হাহাকার। ভারত শুধু গজলডোবায় বাঁধ দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি- শুকনো মওসুমে দেড় হাজার কিউসেক করে পানি তার অংশের মহানন্দায় প্রত্যাহার করে নিয়ে যাচ্ছে। বর্ষা-বন্যায় কিছু পানি থাকলেও শুষ্ক মওসুম শুরু হবার সঙ্গে সঙ্গেই চরের বিস্তার ঘটতে থাকে। এই সময় বাংলাদেশের তিস্তা ব্যারাজের নিচে পর্যাপ্ত পানি থাকার আশা করা হলেও বিরাজ করছে বিপরীত চিত্র। এ কারণে তিস্তা প্রকল্পের অধীন সাড়ে ৭ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ দেবার কার্যক্রমও শিকেয় উঠতে বসেছে। ভারত তার অসংখ্য প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ করা শুরু করলে বাংলাদেশের তিস্তার অপমৃত্যুই ঘটবে না- বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্রের প্রবাহও ব্যাপক হ্রাস পাবে।

মহানন্দাকেন্দ্রিক প্রকল্প
বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া সীমান্তের বাংলাবান্ধা জিরো পয়েন্টের পশ্চিম-উত্তর কোণে মহানন্দা নদীর ওপর বিশাল এক বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। ১৯৭৯-৮০ সালে ‘ফুলবাড়ি ব্যারাজ’ নামে খ্যাত এই বাঁধটি তৈরি করে তারা। এই ব্যারাজের মাধ্যমে তিনটি ইউনিটে সাড়ে ২২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ৬৭৫ বর্গকিলোমিটার এলাকার বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এই সঙ্গে প্রতি বছর শুষ্ক মওসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে পানি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের সেচ কাজ করছে। বিপরীতে বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ এলাকার ভুগর্ভস্থ পানি নিচে নেমে যাওয়ার কারণে সেচকাজ বিঘিœত হচ্ছে। বাঁধের মাধ্যমে পানি আটকে রাখায় শুষ্ক মওসুমে জেলার নদ-নদীগুলোকে মরা নদীতে পরিণত করছে। এই সঙ্গে প্রতি বছর শুষ্ক মওসুমে ফিডার ক্যানেলের সাহায্যে পানি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার রাজ্যের বিভিন্ন স্থানের সেচ কাজ করছে।

বরাক ভ্যালিতে ৩০ প্রকল্প
ভারত আন্তর্জাতিক নদী বরাক ও তার উপনদীগুলোতে টিপাইমুখসহ ৩০টি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। ছোট-বড় এসব প্রকল্প-বাঁধের মাধ্যমে ভারত প্রায় ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। এই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেচ ব্যবস্থারও সম্প্রসারণ ঘটানো হবে। এসব বাঁধের কারণে বরাক নদীতে কার্যত ভারতের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পাবে। অন্যদিকে ভাটির দেশ বাংলাদেশ হবে বরাকের পানি থেকে বঞ্চিত। ফলে সুরমা-কুশিয়ারা নদী পানিশূন্য হয়ে বাংলাদেশের বৃহত্তর সিলেট ও সন্নিহিত অঞ্চলে প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দেবে।
আন্তর্জাতিক নদী বরাক একাধারে ভারত, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। ফলে এটি ত্রিদেশীয় তথা আন্তর্জাতিক নদীর মর্যাদা লাভ করেছে। পাহাড়ি নদী হবার কারণে বিপুল খরস্রোতা বরাক ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো ছাড়াও বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে পানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের উৎস হিসেবে অবদান রেখে চলেছে। ভারতের প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে ভারত প্রায় চার হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ও সেচের সুবিধা পেলেও বাংলাদেশ হবে ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে ১০০ কিলোমিটার উজানে প্রস্তাবিত টিপাইমুখ বাঁধ প্রকল্প নিয়ে ইতোমধ্যে বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়েছে। এই বাঁধ নির্মাণে ভারতের মনিপুরের নাগরিকরাও প্রবল আপত্তি জানিয়ে আসছে। মনিপুর রাজ্যের টিপাইমুখে ভারতের বৃহত্তর প্রকল্পের মাধ্যমে ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ ছাড়াও বরাক ও তার শাখা ও উপনদীগুলোকে কেন্দ্র করে আরো ২৯টি প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই কাজ চলছে।

অন্যান্য নদী
বাংলাদেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নদী সোমেশ^রীর মূল প্রবাহ সিমসাং নদীর উপর ভারত একটি বৃহদাকার সেচ ও বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে দেশের পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশে বিরূপ প্রতিক্রিয়া হবে বলে জানা গেছে। ভারতের নদীয়া জেলার করিমপুর থানার গঙ্গারামপুরের ৮ কিলোমিটার ভাটিতে সীমান্তের প্রায় কাছাকাছি ভৈরব নদের উৎসমুখে একটি ক্রসবাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই বাঁধের উজানে ভৈরব নদের উৎসমুখ জলঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছে একটি রেগুলেটর। রায়মঙ্গল সাতক্ষীরার শ্যামনগর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সীমান্ত নদী মাথাভাঙ্গা গঙ্গার একটি প্রধান শাখা। ফারাক্কা ব্যারাজ হওয়ার পর নদীটি দিনে দিনে মরা গাঙে রূপ নিয়েছে। ফলে এর বিশাল অববাহিকায় পরিবেশ বিপর্যয় নেমে এসেছে। নওগাঁর নদ-নদীতে পানি প্রবাহের মূল উৎস ছোট যমুনার মাতৃনদী ঘুকশি। ভারত জলপাইগুড়ি জেলার মেখলিগঞ্জ থানার কাশিয়াবাড়িতে বাঙ্গু নদীর ওপর একটি রেগুলেটর ও বালুরঘাটের ঝিনাইপোজে অপর একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে। ঘুকশি ও বাঙ্গু নদীতে বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে ছোট যমুনায় পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় পানি সঙ্কট দেখা দেয় নওগাঁ জেলাসহ বরেন্দ্র অঞ্চলে। আত্রাইয়ের মাতৃনদী করতোয়ার উজানে ভারতের জলপাইগুড়ি জেলার আমবাড়ি-ফালাকাটায় একটি ব্যারাজ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে। ফলে বাংলাদেশে দু’টি অংশে ২৭০ কিলোমিটার দীর্ঘ আত্রাই পাড়ের মানুষের জীবন জীবিকায় বিপর্যয় নেমে এসেছে। ঘোড়ামারা ছোট্ট একটি সীমান্ত নদী। এর অববাহিকা ৬৫ বর্গকিলোমিটার। স্লুইসগেট করে পানি সরিয়ে নেয়ায় শুষ্ক মৌসুমে নদীটি শুকিয়ে যায়। ব্রহ্মপুত্রের উপনদী ও অভিন্ন সীমান্ত নদী ধরলা ও দুধকুমার। ভুটান থেকে আসা ব্রহ্মপুত্রের এ দু’টি উপনদীতে ব্যারাজ তৈরি করে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভারত ও ভুটান। পাওয়ার প্রজেক্টসহ অন্যান্য প্রকল্পের আওতায় দু’টি নদীরই উজানে একাধিক বাঁধ দিয়ে পানি প্রত্যাহার করে নিচ্ছে ভুটান ও ভারত। সীমান্ত নদী জিনজিরাম, চিতলখালী, ভোগাই-কংস, নিতাই, সোমেশ্বরী, জাদুকাঠা-রক্তি, জালুখালী, নায়াগাঙ ও উমিয়াম নামে বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও রংপুর অঞ্চলের নদীগুলোর উৎপত্তি মূলত মেঘালয়ের গারো পাহাড় ও খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়ে। শুষ্ক মৌসুমে অস্থায়ী মাটির বাঁধ ও রেগুলেটর করে নদীগুলোর পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে। ফলে মরা গাঙ হয়ে পড়েছে এগুলো। মরে যাচ্ছে ময়মনসিংহ-জামালপুরের প্রধান নদ পুরাতন ব্রহ্মপুত্র। শুষ্ক মৌসুমে উজান থেকে পানি না আসায় নেত্রকোনা ও সুনামগঞ্জের হাওরগুলোতে পানি পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে ধনু, মনু, ধলা, পিয়াইন, খোয়াই ও ধলাই নদীতে বাঁধ ও ¯œুইসগেট করে শুষ্ক মৌসুমে একতরফা পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। মনু নদীর উজানে ত্রিপুরা রাজ্যের কেলা শহরের কাছে কাঞ্চনবাড়িতে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে ভারত। ওই বাঁধ থেকে তারা মনু নদীর পানি একতরফা নিয়ন্ত্রণ করছে। ধলার উজানে ত্রিপুরার কুলাইয়ে একটি বাঁধ নির্মাণের ফলে মনু ও ধলা শুষ্ক মৌসুমে থাকে পানিশূন্য। পিয়াইন নদীর মাতৃনদী ডাউকি নদীর পশ্চিম তীরে ভারত ৪৩ মিটার লম্বা, ৯ মিটার চওড়া ও ৯ মিটার উঁচু গ্রোয়েন নির্মাণ করেছে। এই গ্রোয়েনের কারণে জাফলং কোয়ারিতে পাথর আসার পরিমাণ কমে গেছে। খোয়াই নদীর উজানে ত্রিপুরা রাজ্যের চাকমাঘাটে ও কল্যাণপুরে দু’টি বাঁধ নির্মাণ করে পানি প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে। খোয়াই’র ভারতীয় অংশে শহর প্রতিরক্ষার নামে স্পার নির্মাণ করে নদীকে বাংলাদেশ ভূখন্ডের দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। কুশিয়ারায় গ্রোয়েন নির্মাণ করে এর ¯্রােত ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশের দিকে। সীমান্ত নদী সারি বা সারিগোয়াইনের উপর মেঘালয় সরকার ১২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য বাঁধ দিচ্ছে।

আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প
ভারত প্রায় ২০ বছর যাবৎ বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও পর্যালোচনা করে পানি এক স্থান হতে অন্য স্থানে সরিয়ে নেয়ার জন্য উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৩৮টি বিভিন্ন নদীর মধ্য দিয়ে সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। এর বিশেষ দিক হচ্ছে নদীর এক বেসিন হতে যেখানে পানির ঘাটতি রয়েছে সেখানে পানি স্থানান্তর করা। এজন্য তারা ১২০০ কি.মি. দীর্ঘ ৩০টি খাল খননের মাধ্যমে সংযোগ চিহ্নিত করেছে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্ষার সময় অতিরিক্ত পানি সঞ্চিত রাখার জন্য সারা দেশে মোট ৭৪টি জলধারা ও বেশ কিছু বাঁধ নির্মাণ করা হবে। ফলে বর্ষার সময়ের সঞ্চিত পানি শুষ্ক মৌসুমে বিভিন্ন স্থানে কৃষি ও অন্যান্য কাজের জন্য সরবরাহ করা যাবে। এতে একদিকে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি যেমন রোধ করা যাবে অন্যদিকে তেমনি খরার আশঙ্কাও দূর হবে বলে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ধারণা। ভারত এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ ইতোমধ্যে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এই কার্যক্রমের আওতায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনের ৩৮টি নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এসব নদীর পানি ব্যাপকহারে প্রত্যাহার করে নেবে। এর ফলে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী পানিশূন্য হয়ে পড়বে। প্রকল্পের আওতায় ১৭ হাজার ৩০০ কোটি ঘনমিটার পানি গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র থেকে প্রত্যাহার করে ভারতের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলের শুকনো এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে। ভারতের এই প্রকল্পের লক্ষ্য হলো, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর এই পানি প্রবাহ ব্যবহার করে ১২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খনন, ৩ কোটি ৫০ লাখ হেক্টর জমিতে সেচ প্রদান এবং ৩৪ হাজার মেগাওয়াট পানি-বিদ্যুৎ উৎপাদন। হিমালয়ান অঞ্চলের যে সব নদী এই সংযোগের আওতায় আসবে তার মধ্যে রয়েছে, কোসি-মেচি লিঙ্ক, কোসি-ঘাগরা লিঙ্ক, গন্ধক-গঙ্গা লিঙ্ক, ঘাগরা-যমুনা (ইয়ামুনা) লিঙ্ক, সারদা-যমুনা লিঙ্ক, যমুনা-রাজস্থান লিঙ্ক, রাজস্থান-সবরমতি লিঙ্ক, চুনার-সোন ব্যারাজ লিঙ্ক, সোন ব্যারাজ-গঙ্গার দক্ষিণাঞ্চলীয় উপনদীসমূহের সংযোগ, মানাস-সঙ্কোশ-তিস্তা-গঙ্গা (ফারাক্কা) লিঙ্ক, যোগীঘোপা-তিস্তা-ফারাক্কা লিঙ্ক, ফারাক্কা-সুন্দরবন লিঙ্ক, গঙ্গা-দামোদর-সুবর্ণরেখা লিঙ্ক, সুবর্ণরেখা-মহানদী লিঙ্ক প্রভৃতি। এই পরিকল্পনা প্রণয়নে ভারত দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞ সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে।

প্রতিক্রিয়া হবে বাংলাদেশের তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ ব্যাপারে অনেক আগে থেকেই ভারতের কাছে প্রতিবাদ জানানো হয়। ২০০৫ সালে সংসদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বিষয়টির প্রতি আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন, ‘ভারতের নদী সংযোগ প্রকল্প এ দেশের জন্য নানা সমস্যার সৃষ্টি করবে। বিপন্ন হবে কৃষি-অর্থনীতি, নদীর নাব্যতা, সুন্দরবনের জীব-বৈচিত্র্য। নদী ও প্লাবন-ভূমিতে বাড়বে লবণাক্ততার প্রকোপ।’ পানিসম্পদ নিয়ে আন্তর্জাতিক বিধিতে বলা আছে, এক দেশের প্রকল্প যেন অন্য দেশের পরিবেশ ও আবাসন ব্যবস্থাকে ব্যাহত না করে। কিন্তু বাংলাদেশমুখী নদীগুলোতে ভারত নানা প্রকল্প তৈরি করে এই পরিবেশ ও জীবনযাত্রাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। দেশের নদী ও পানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক পানি আইন ও গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী উজানের দেশ ভারত আন্তঃদেশীয় নদীর পানি প্রত্যাহার করতে পারে না। এমনকি যে কোন ধরনের কার্যক্রম হাতে নিতে হলেও দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী তাদের বাংলাদেশকে সঙ্গে নিয়ে তা করতে হবে। আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্পের মাধ্যমে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও গঙ্গা নদীর পানিপ্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তর-মধ্যাঞ্চল, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও দক্ষিণ-মধ্যাঞ্চলের শাখা নদীগুলোর পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে। আর জলাভূমিগুলোও শুকিয়ে যাবে।

আন্তর্জাতিক অভিমত
প্রভাবশালী ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকা ১৯৯৭ সালের মার্চ মাসে এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করে, ‘ভারত যখন থেকে গঙ্গার পানি সীমান্তে তার দিকে সরিয়ে নিয়েছে তখন থেকে বাংলাদেশের দিকের সর্বনাশ হয়েছে। নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকদের মতে এ বাধা বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবনের বহু দিকের ওপর গুরুতর সঙ্কট সৃষ্টি করেছে, ধানের চাষ আর কাগজের কল পরিচালনা থেকে শুরু করে ফেরি চলাচল আর পানির কূপ পর্যন্ত। একজন গবেষক অনুমান করেছেন, পানি সরিয়ে নেয়ার ফলে ‘পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র’ এই দেশে বার্ষিক লোকসানের পরিমাণ চার বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে।’ ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ‘পানীয় জলের জন্য কোনো কোনো গ্রামবাসীকে ২০০ ফুট গভীর পর্যন্ত কুয়া খনন করতে হচ্ছে। একতরফা এবং বিতর্কিতভাবে ফারাক্কা বাঁধ তৈরির ফলে গঙ্গার পানির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের বহু মানুষের জন্য অবর্ণনীয় দুঃখ-দুর্দশা দেখা দিয়েছে। বিগত ২৫ থেকে ৩০ বছরে এই বাঁধ এ অঞ্চলের পরিবেশও ধ্বংস করেছে। একদিকে ফারাক্কা, অন্য দিকে তিস্তার ওপরে গজলডোবা, ব্রহ্মপুত্রের পর আন্তঃনদী সংযোগ পরিকল্পনা এবং মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা টিপাইমুখ বাঁধ যদি তৈরি হয়, তবে বাংলাদেশের ৮০ শতাংশ মানুষই আর্সেনিকসহ নানান বিপর্যয়ের শিকার হবে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের একটি অভ্যন্তরীণ পরিপত্রে অভিযোগ করা হয়েছে, ভারতের বাঁধগুলো আধুনিক মানের বিচারে অনিরাপদ। বিশ্বব্যাংকের ‘চলমান নিরাপদ বাঁধ প্রজেক্ট’ জরিপে ২৫টি বাঁধের উপর প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, এগুলোর কোনটিই পানি ধারণ সম্পর্কিত প্রশ্নে সঠিক নকশায় তৈরি হয়নি। এর মধ্যে ২টি বাঁধ বন্যা প্রতিরোধের জন্য যেভাবে তৈরির কথা ছিল তার চেয়ে ৭ গুণ বেশি বন্যায় আক্রান্ত হতে পারে। বিশ্বব্যাংকের জরিপে বলা হয়, ভারতের হাজার হাজার মানুষ বাঁধ-কবলিত ঝুঁকিতে রয়েছে। ভারতের কোন কোন প্রকৌশলীও এসব বাঁধ প্রবল ভূমিকম্পের কারণ হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন।

হুমকির মুখে বাংলাদেশের পরিবেশ
একজন বিশিষ্ট পানি বিশেষজ্ঞ একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, ফারাক্কা বাংলাদেশের কৃষি, শিল্প-কারখানা সবকিছুতে মারাত্মক ক্ষতি করেছে। মিঠাপানি ছাড়া কৃষি তথা কোন ধরনের শিল্প-কারখানা চলতে পারে না। ফারাক্কার কারণে যশোর-খুলনা অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমে গেছে। ফারাক্কার কারণে পদ্মার তলদেশ ওপরে ওঠে এসেছে। জলজপ্রাণিকুল ধ্বংস হয়ে গেছে। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এখন আর পদ্মায় ইলিশ পাওয়া যায় না। ইলিশের বিচরণক্ষেত্র ছিল রাজশাহী-পাবনার ওই অংশ। মাছ আসার জন্য পানিতে যে পরিমাণ প্রবাহ থাকার কথা সেটি না থাকায় এখন আর পদ্মায় ইলিশ আসে না। গাঙ্গেয় পানি ব্যবস্থায় দুই শতাধিক প্রজাতির মিঠাপানির মাছ ও ১৮ প্রজাতির চিংড়ি ছিল। সেগুলোর অধিকাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। ফারাক্কা-পরবর্তী সময়ে গঙ্গা অববাহিকার নদীগুলোতে নাব্য সংকটে নৌ-পরিবহনে মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে। ৩২০ কিলোমিটারের বেশি প্রধান ও মধ্যম নৌপথ বন্ধ রাখতে হয়। ফারাক্কার প্রভাবে নদীর জীবনচক্র ধ্বংস হয়ে গেছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। নদী শুকিয়ে যাওয়ায় ভূগর্ভস্থ যে পানি উত্তোলন করা হয় সেটা পূরণ (রিচার্জ) হচ্ছে না। লবণাক্ততার কারণে জমির উর্বরতা নষ্ট হয়ে গেছে। নদীর বুকে জেগে উঠেছে বিশাল ধু ধু বালু চর, নদীর মূলধারা বিভক্ত হয়ে পড়েছে অসংখ্য সরু ও ক্ষীণ ¯্রােতধারায়। এর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে জনজীবন, কৃষিক্ষেত্র ও পরিবেশের ওপর। উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য ছোট ও মাঝারি ধরনের নদ-নদী শুকিয়ে গেছে। নদীর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ এলাকা এখন অনেকটাই মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশে ফারাক্কাজনিত কারণে পানির অভাবে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া ও ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ পাওয়া যায় এরূপ : ১. উত্তরাঞ্চলে প্রায় ২ কোটি মানুষ সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে; ২. দক্ষিণাঞ্চলের প্রায় ৪ কোটি মানুষ ও এক-তৃতীয়াংশ এলাকা সেচের পানির অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; ৪. গঙ্গা-কপোতাক্ষ প্রকল্পের ৬৫ শতাংশ এলাকায় সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না; ৫. অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য জমির উর্বরা শক্তি কমে গেছে; ৬. দেশের প্রায় ২১ শতাংশ অগভীর নলকূপ ও ৪২ শতাংশ গভীর নলকূপ ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না; ৭. গঙ্গার পানি চুক্তির (১৯৯৬) পর বাংলাদেশে গঙ্গার পানির অংশ দাঁড়িয়েছে সেকেন্ডে ২০ হাজার ঘনফুটের কম। অথচ ফারাক্কা বাঁধ চালুর আগে শুষ্ক মৌসুমেও বাংলাদেশ ৭০ হাজার কিউসেকের চেয়ে কম পেতো না; ৮. প্রায় ১৫০০ কি.মি. নৌপথ বন্ধ হয়ে গেছে; ৯. ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় হাজার হাজার হস্তচালিত পাম্প অকেজো হয়ে গেছে; ১০. ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের বিষাক্ত প্রভাবে পশ্চিমাঞ্চলের অনেক জেলায় টিউবওয়েলের পানি খাবার অযোগ্য হয়ে পড়েছে; ১১. বৃহত্তর খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় প্রচলিত ধান উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে; ১৩. মাছের পরিমাণ হ্রাস পেয়েছে; ১৪. লবণাক্ততার কারণে পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ সুন্দরবনের প্রায় ১৭ ভাগ নষ্ট হয়ে গেছে। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় এক সমীক্ষায় উল্লেখ করেছে, ফারাক্কায় বাঁধ দেয়ার কারণে বাংলাদেশের প্রায় ৯৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রতি বছর ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ
১. আন্তর্জাতিক আইনের বিধান হচ্ছে, ‘প্রতিবেশী কোনো রাষ্ট্রের ভূখন্ডের প্রাকৃতিক অবস্থার ক্ষতিসাধন করে, কোনো রাষ্ট্রের নিজ ভূখন্ডে প্রাকৃতিক অবস্থার পরিবর্তন করতে পারে না।’
এ কারণে নিজ ভূখন্ড থেকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রে প্রবাহিত কোনো নদীর গতিপথ বন্ধ বা পরিবর্তন করাই শুধু নিষিদ্ধ নয়, নদীর পানি এমনভাবে কোনো রাষ্ট্র ব্যবহার করতে পারবে না, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য বিপদ সৃষ্টি করে বা প্রতিবেশী রাষ্ট্রের জন্য তার নিজ অংশে নদী প্রবাহ ব্যবহারে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়।
২. ১৯৭১ সালের ডবঃষধহফ ঈড়হাবহঃরড়হ অনুসারে যৌথ জলাভূমি ও এর প্রাণবৈচিত্র্য এবং ১৯৭২ সালের ডড়ৎষফ ঐবৎরঃধমব ঈড়হাবহঃরড়হ চুক্তি অনুসারে সুন্দরবনের ক্ষতি না করার দায় রয়েছে ভারতের।
৩. ১৯৯২ সালের প্রাণবৈচিত্র্য চুক্তির ৩ ও ৫ নং অনুচ্ছেদে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, কোনো দেশ নিজ স্বার্থে অন্য দেশের প্রাণবৈচিত্র্যের ক্ষতিসাধন করতে পারবে না। ৫নং অনুচ্ছেদে পারস্পরিক সহযোগিতার বাধ্যবাধকতাও রয়েছে। ১৯৯২ সালের এই চুক্তির পক্ষে যেহেতু বাংলাদেশ ও ভারত স্বাক্ষর করেছে, তাই তা অস্বীকার করা ভারতের পক্ষে সহজে হবে না।
৪. ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর বাংলাদেশ গঙ্গার পানি ভাগাভাগি নিয়ে ভারতের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তির প্রস্তাবনার ৩নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ভারত ও বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নদীগুলোর পানি ভাগাভাগি ও এসব নদীতে প্রকল্প গ্রহণের ক্ষেত্রে দু’দেশের জনগণের সুবিধা বিবেচনা করে দেখবে।
৫. গঙ্গার পানি চুক্তির ৯নং অনুচ্ছেদে আছে, দু’দেশের সরকার ন্যায়বিচার, নায্যতা ও কারো ক্ষতি করা নয়- এসব নীতিমালার আলোকে নদীর পানি ভাগাভাগি করতে সম্মত আছে।
৬. আন্তর্জাতিক চুক্তি ও প্রথাগত আইনে রয়েছে, কোনো দেশের প্রকল্পের কারণে অন্য দেশের ক্ষতি হবে কিনা সে সিদ্ধান্ত এককভাবে কোনো দেশ নিতে পারে না। প্রকল্প গ্রহণকারী দেশটিকে প্রকল্প সংক্রান্ত সব কাগজপত্র অন্য দেশটিকে সরবরাহ করতে হবে। অন্য দেশটির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে এ বিষয়ে নিষ্পত্তি করতে হবে।
৭. নদী আইন সংক্রান্ত ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘ কনভেনশনটির কথা অবশ্যই বাংলাদেশ ও ভারতকে ভাবতে হবে।
৮. জাতিসংঘের নদীবিষয়ক কনভেনশনে বলা আছে, সংক্ষুব্ধ রাষ্ট্র ক্ষতি সাধিত নদীর পক্ষে বিচার বিভাগের কাছে বিচার চাইতে পারবেন।
৯. জাতিসংঘের নদী কনভেনশনের ৩৩ অনুচ্ছেদে আছে, উভয়পক্ষ পানি সংক্রান্ত সমঝোতায় ব্যর্থ হলে শালিস ট্রাইব্যুনাল বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত-এর মাধ্যমে নিষ্পত্তি করবে।
১০. জাতিসংঘ নদী কনভেনশনে আন্তর্জাতিক নদীর পানি ব্যবহারে ‘ন্যায়ানুগ ও সঙ্গত’ আচরণের কথা বলা হয়েছে। আরো বলা হয়, যে কোনো কাজের মাধ্যমে অন্যের ‘উল্লেখযোগ্য ক্ষতিসাধন’ করা যাবে না। অভিন্ন নদী ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন গঠনের মধ্যে সুযোগ রয়েছে।

সর্বশেষ খবর হলো, ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে ১৯৯৭ সালের জাতিসংঘের ‘কনভেনশন অন দ্য ল অব নন-নেভিগেশনাল ইউজেস অব ইন্টারন্যাশনাল ওয়াটার কোর্সেস’-এ স্বাক্ষর করেছে। আরবিট্রেশনের পদ্ধতিসহ এ কনভেনশনের ৩৬ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ৩৫টি সদস্য দেশের অনুসমর্থনের ৯০ দিনের অব্যবহিত পর থেকে এটি কার্যকর হবে। গত ২০১৪ সালের ১৯ মে ভিয়েতনাম ৩৫তম দেশ হিসেবে এ কনভেনশন অনুসমর্থন করে। নিয়মানুযায়ী জাতিসংঘ মহাসচিব কনভেনশনটি পরবর্তী ৯০ দিবসের মধ্যে কার্যকর হবে। কিন্তু বিস্ময়কর সত্য হলো, বাংলাদেশ আজ পর্যন্ত কনভেনশনটিকে সার্টিফাই বা অনুসমর্থন করেনি। সার্বিক বিবেচনায় আলোচ্য কনভেনশনটি আন্তর্জাতিক পানি প্রবাহের ওপর ভাটির দেশের অধিকারের একটি রক্ষাকবচ। আমাদের এ কনভেনশন অবিলম্বে অনুসমর্থন করা উচিত।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের পানিবিষয়ক রীতিটিকে উপেক্ষা করা চলবে না, একে ফাইলবন্দী করে ড্রয়ারে ঢোকানো হলে বিপদ আছে। ভারত তার নিজ দেশের কৃষি, সেচ ও জলবিদ্যুৎ-এর প্রয়োজন দেখিয়ে যে নদী ও পানি পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে তার মধ্যে সবচাইতে বিপজ্জনক উদ্যোগ হলো আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। পৃথিবীর ইতিহাসে নদীর গতিপথ পরিবর্তনের মাধ্যমে পানি ব্যবহারের যতো উদ্যোগের নজির আছে তার সবই একই বেসিন বা একই অববাহিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ। এক অববাহিকা থেকে অন্য অববাহিকায় পানি সরিয়ে নেয়ার কোন নজির ইতিহাসে না থাকায় পানি বা নদী বিষয়ক আন্তর্জাতিক আইনে এ বিষয়ক কোন বিধি বিধানও নেই। এ উদ্যোগ যে প্রকৃতির বিরুদ্ধে এক অভূতপূর্ব অপরাধ এ বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হিমালয় অঞ্চলের নদীসমূহের পানি- যা বাংলাদেশের নদ-নদীর পানিপ্রবাহের অন্যতম প্রধান উৎস, তা অন্যত্র সরিয়ে নেয়ায় বাংলাদেশ যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা বলাই বাহুল্য।
ভারতের সঙ্গে ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ব্যবহার নিয়ে বাংলাদেশের সামনে অনেক কঠিন সময় আসছে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক নদী কনভেনশন ১৯৯৭ নদী অববাহিকার দেশগুলোর জনগণের নদীর ঐতিহাসিক প্রবাহের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। তাই এ কনভেনশনটি তিস্তাসহ সব অভিন্ন নদীর পানির ওপর অধিকার স্থাপনের লক্ষ্যে বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। বাংলাদেশের মানুষ ভারতের নতুন সরকারের সঙ্গে তিস্তার পানিব্যবহার নিয়ে কোনো ‘লোক দেখানো চুক্তি’ চায় না। তারা চায়, ভারত ও বাংলাদেশ পানি চুক্তি সম্পাদনকালে জাতিসংঘের ১৯৯৭ সালের নদী কনভেনশনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবে।
বিশ্বের অভিন্ন নদীগুলোর মধ্যে ইউরোপের ১১টি দেশ দানিউব নদীর পানি বণ্টন নিয়ে সমঝোতায় পৌঁছেছে। এশিয়ার মেকং নদীর পানি বণ্টনে ভিয়েতনাম, লাওস, কাম্পুচিয়া, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশকে সহযোগিতা করেছে জাতিসংঘ। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো, ভারত ও পাকিস্তান প্রভৃতি দেশের মধ্যে অভিন্ন নদীর পানির পরস্পর ন্যায্য হিস্যা প্রাপ্তিতে একমত হতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বেলায় তার ব্যতিক্রম হচ্ছে কেন- তা বোধগম্য নয়। বিষয়টি অবশ্যই আন্তর্জাতিক ফোরামে উত্থাপন করতে হবে।

সমাধান কোন পথে
পানি সংকট পারমাণবিক সঙ্কটের ভয়াবহতাকেও ম্লান করে দেয়। পানির অভাবে এ দেশে বড় ধরনের সমস্যার উদ্ভব হবে, যা পার্শ্ববর্তী দেশেকেও আক্রান্ত করতে পারে। তাই :
১. সর্বপ্রথম ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তাদের আগ্রাসী নীতি পরিত্যাগ করতে হবে।
২. পানি সমস্যা দ্বিপাক্ষিকভাবেও সমাধান করা যাবে না। আন্তর্জাতিক নদীর পানির সুষ্ঠু ব্যবহারের স্বার্থে নদী বিষয়ে ভারত, বাংলাদেশ, চীন, নেপাল ও ভুটানকে নিয়ে একটি আঞ্চলিক পানি ফোরাম গঠন করতে হবে।
৩. নেপালে জলাধার নির্মাণ করে হিমালয়ের পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে ফারাক্কায় পানি প্রবাহ ১ লাখ ৩০ হাজার কিউসেক থেকে ১ লাখ ৯০ হাজার কিউসেক পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব। তাতে সবাই লাভবান হবে।
৪. জলাধারের সাহায্যে নেপাল প্রতি বছর প্রায় সাড়ে দশ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে সক্ষম, যা নেপাল বাংলাদেশেও রফতানি করতে পারে।
৫. গঙ্গার পানি বণ্টনের সঙ্গে ব্রহ্মপুত্রসহ অন্যান্য নদীর বিষয়ও আলোচনাভুক্ত করতে হবে। পানি বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে গেছে। এই নিরাপত্তার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
লেখক : পরিবেশ সাংবাদিকতায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত। সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন

SHARE

Leave a Reply