উজানে নদী নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম ও বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয় -সরদার আবদুর রহমান

বাংলাদেশ প্রকৃত অর্থেই নদীনির্ভর একটি ভূখণ্ড। কৃষি ও কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি, প্রকৃতি ও পরিবেশ, যোগাযোগ ও বিপুল কর্মসংস্থান ইত্যাদি এক বিশাল ও বিপুল কর্মযজ্ঞের আধার হয়ে আছে এখানকার একেকটি নদী। আর কোন নদীর মৃত্যু মানেই এতসব কর্মকান্ডের বিলুপ্তি। তার মানেই এখানকার বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রার ওপরে অপঘাত নেমে আসা। বাংলাদেশে একসময় নদীসংশ্লিষ্ট সংকটের কেন্দ্রে ছিলো প্রধানত গঙ্গা বা পদ্মা নদী। বিশেষত ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও তা চালুর পর থেকে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা উঠে আসে। আর তা এক সময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। কিন্তু এখন তা শুধু গঙ্গা-পদ্মায় সীমিত নেই। হালে আলোচনায় এসেছে তিস্তা ও বরাক নদী। এমনকি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবহমান অভিন্ন ৫৪টি নদীর প্রসঙ্গও উঠে আসছে। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তঃসীমান্ত নদ-নদীর সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। নির্ভরযোগ্য গবেষণায় দেখা গেছে, এই সংখ্যা হবে ৫৪টির স্থলে ৯৬টি। এই সংখ্যা বাড়তেও পারে।
১৯৭৬ সালের মওলানা ভাসানী যখন নদীকেন্দ্রিক আন্দোলন করেন তখন তাঁর লংমার্চের মূল লক্ষ্য ছিল ফারাক্কা বাঁধ। কিন্তু আজ দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশের উজানে তথা হিমালয়ের ভাটিতে বাংলাদেশমুখী পদ্মাসহ সব অভিন্ন নদীতেই বাঁধসহ অসংখ্য প্রকল্প নির্মাণ করে চলেছে ভারত। এর উদ্দেশ্য, ভারতের পুরো পানিসম্পদকে তার অভ্যন্তরীণ সেচ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যবহার করা। এর মধ্যে ‘আন্তর্জাতিক’ বলে পরিচিত নদীগুলোও রয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ভারত তার একতরফা নীতির আওতায় গঙ্গা তথা পদ্মায় যে বাঁধ নির্মাণ করে সেই বাঁধ বাংলাদেশের কোটি কোটি মানুষের জন্য আজ মারণফাঁদে পরিণত হয়েছে। এখানেই শেষ নয়, বাংলাদেশমুখী ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, মহানন্দা, বরাক প্রভৃতি নদীতেও একের পর এক প্রকল্প তৈরি করে চলেছে ভারত। এর ফলে বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সার্বিক পরিবেশের ওপর কালো মেঘের ছায়া দেখা দিতে শুরু করেছে।
কোন ‘উন্নয়ন প্রকল্প’ গ্রহণ করার কথা উঠলে একটা ইতিবাচক দৃশ্যই সাধারণত চোখের সামনে ভেসে উঠবে। কিন্তু সেই যে ‘কারো পৌষ মাস তো কারো সর্বনাশ’- এই প্রবাদের বাস্তবতাও এই প্রকল্পের ক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যায় না। তেমনি নদীসংশ্লিষ্ট এসব প্রকল্পের ব্যাপারে ভারত বাংলাদেশের পানি-স্বার্থের প্রতি বিন্দুমাত্রও দৃষ্টি দেয় না। ফলে এসব নিয়ে মাঝে মধ্যে আলোচনা উঠলেও দীর্ঘমেয়াদে তা দৃষ্টির আড়ালেই থেকে যায়। যা ভারতের ক্ষেত্রে হয়তো তা ‘পৌষ মাস’ হয়ে দেখা দেয়। কিন্তু তা যে বাংলাদেশের জন্য ‘সর্বনাশ’ ডেকে আনছে তা বৃহৎ প্রতিবেশী আমলেই নেয় না। এদিকে আবারো আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে ভারতের বহুল আলোচিত আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প। ভারত এই আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে চলেছে। এই কার্যক্রমের আওতায় গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-মেঘনা বেসিনের ৩৮টি নদীর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে এসব নদীর পানি ব্যাপক হারে প্রত্যাহার করে নেবে। এর ফলে ভাটির দেশ বাংলাদেশের অধিকাংশ নদী পানিশূন্য হয়ে পড়বে।

অভিন্ন নদীসমূহে ভারতের বাঁধ-ব্যারাজ
বাংলাদেশে এই কিছুদিন পূর্বেও পানিসম্পদ নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে ছিলো প্রধানত গঙ্গা বা পদ্মা নদী। বিশেষত ভারত ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ ও তা চালুর পর থেকে বিষয়টি ব্যাপক গুরুত্ব লাভ করে। তা একসময় দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়ে পরিণত হয়। কিন্তু এখন তা শুধু গঙ্গা-পদ্মায় সীমিত নেই। হালে আলোচনায় এসেছে ব্রহ্মপুত্র তথা যমুনা, তিস্তা, মহানন্দা ও বরাক নদী। এমনকি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে প্রবহমান অভিন্ন ৫৪টি নদীর প্রসঙ্গও উঠে আসছে। বাংলাদেশের জনসাধারণের জন্য ভয়ঙ্কর সংবাদ হলো, এই অভিন্ন নদীসমূহের প্রায় প্রতিটিতে এবং এর উপনদীগুলোতেও ভারত অসংখ্য প্রকল্প নির্মাণ করেছে এবং আরো প্রকল্পের জন্য মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে তা বাস্তবায়ন করে চলেছে। এর মধ্যে যেমন আছে বৃহদাকার ব্যারাজ, ড্যাম, সেচ ক্যানেল, আছে বিদ্যুৎ প্রকল্পও। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে যেমন অভিন্ন নদীসমূহের পানি উজানে একতরফাভাবে প্রত্যাহার করে নেয়া হচ্ছে, তেমনি পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এর অনিবার্য প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের নদী তথা পানিসম্পদের মালিকানা ও অধিকার থেকে এদেশের জনসাধারণ বঞ্চিত হচ্ছে। যা আন্তর্জাতিক আইনের বরখেলাপ এবং সেই সঙ্গে মানবাধিকারেরও চরম লঙ্ঘন।

বাংলাদেশের নদীনির্ভর অবস্থান
বাংলাদেশে ৭১০টি ছোটবড় নদীর মধ্যে (সরকারিভাবে স্বীকৃত) ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী, যার ৫৪টি ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে অবস্থিত। বার্ষিক গড়ে ১০ লাখ ৭৩ হাজার ১৪৫ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি ভারত-নেপাল থেকে বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। অভ্যন্তরীণ বৃষ্টিপাতের ফলে ২ লাখ ৫০ হাজার ৪০১ মিলিয়ন ঘনমিটার পানি বাংলাদেশের নদী-নালা-খাল-বিল-জলাশয়গুলো পেয়ে থাকে। বরাক-মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও গঙ্গা-পদ্মা নদীর মধ্য দিয়ে যথাক্রমে ১৫০ বিলিয়ন ঘনমিটার, ৭০০ বিলিয়ন ঘনমিটার ও ৫০০ বিলিয়ন ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের হিসেব অনুযায়ী ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অভিন্ন নদী রয়েছে ৫৪টি। এসব নদী হলো, ১. রায় মঙ্গল, ২. ইছামতি-কালিন্দী, ৩. বেতনা-কোদালিয়া, ৪. ভৈরব-কপোতাক্ষ, ৫. মাথাভাঙ্গা, ৬. গঙ্গা, ৭. পাগলা, ৮. আত্রাই, ৯.পুনর্ভবা, ১০. তেঁতুলিয়া, ১১. টাঙ্গন, ১২. কুলিক, ১৩. নাগর, ১৪. মহানন্দা, ১৫. ডাহুক, ১৬. করতোয়া, ১৭. তালমা, ১৮. ঘোড়ামারা, ১৯. দেওনাই-যমুনেশ্বরী, ২০. বুড়ি তিস্তা, ২১. তিস্তা, ২২. ধরলা, ২৩. দুধকুমার, ২৪. ব্রহ্মপুত্র, ২৫. জিনজিরাম, ২৬. চিলাখালি, ২৭. ভোগাই, ২৮. নিতাই, ২৯. সোমেশ্বরী, ৩০. যদুকাটা, ৩১. ধামালিয়া, ৩২. নোয়াগঞ্জ, ৩৩. ইউসিয়াম, ৩৪. ধলা, ৩৫. পিয়ান, ৩৬. সারিগোয়াইন, ৩৭. সুরমা, ৩৮. কুশিয়ারা, ৩৯. সোনাই বড়দাল, ৪০. জুরি, ৪১. মনু, ৪২. ধলাই, ৪৩. লংগলা, ৪৪. খোয়াই, ৪৫. সুতাং, ৪৬. সোনাই, ৪৭. হাওড়া, ৪৮. বিজনী, ৪৯. সালদা, ৫০. গোমতি, ৫১. ফেনী-ডাকাতিয়া, ৫২. সেলুনিয়া, ৫৩. মুহুরী ও ৫৪. ফেনী।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যৌথ নদী কমিশনের তালিকাবহির্ভূত ৪২টি নদ-নদীর মধ্যে ৩৭টি সরাসরি ভারতের সীমানা অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। এই নদীগুলোর পতিত মুখ বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। তালিকাবহির্ভূত এই নদীগুলো হচ্ছে, কর্ণফুলী, লুভা, আমরি, শিয়ালদহ, গঙ্গাধর, ফুলকুমার, হাড়িয়াভাঙ্গা, চাওয়াই, গিদারী, কুরুম, পাঙ্গা, রেংখিয়াং, কাসাল, মাইনি, মালদাহা, সিমলাজান, উপাদাখালী, কর্ণঝারা, কর্ণবালজা, কালাপানি, খাসিমারা, ঘাগটিয়া, চেলা, জাফলং-ডাউকি, জালিয়াছড়া, দুধদা, নয়াগাংজৈন্তাপুর, মহারশি, সোমেশ্বরী (ধর্মপাশা), সোমেশ্বরী শ্রীবর্দী, ঘুংঘুর, ডাকাতিয়া, লহর, গুকসী বা ঘুকসী, চিংগ্রী বা চেঙ্গি, যমুনা (পঞ্চগড়) ও সিংগিমারী। ৬টি নদী উৎপত্তি লাভ করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে। এগুলো বাংলাদেশের সীমান্ত অতিক্রম করে ভারতের বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশ করেছে। এই নদীগুলো হচ্ছে কুলিক, বেরং, ভেরসা, রাক্ষুসীনি তেঁতুলিয়া, লোনা বা নোনা ও চিরি। এই ৬টি নদীর মধ্যে শুধুমাত্র কুলিক নামের নদীটি যৌথ নদী কমিশনের তালিকাভুক্ত ৫৪টির মধ্যে একটি।

ভারতের নদীকেন্দ্রিক কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য
ভারতের নদীকেন্দ্রিক কর্মপরিকল্পনার লক্ষ্য প্রধানত তিনটি। ১. কৃষি জমিতে সেচ ব্যবস্থার সম্প্রসারণ, ২. জলবিদ্যুৎ উৎপাদন এবং ৩. বন্যা নিয়ন্ত্রণ। এছাড়াও এসব প্রকল্পের ফলে অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন, পানীয় স্বাদু পানি সরবরাহ প্রকল্প স্থাপন এবং পর্যটন ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবার সম্ভাবনাকে কাজে লাগানো হয়। নদীসমূহ বিভিন্ন উৎস থেকে পানির প্রবাহ লাভ করে থাকে। ১. মূল উৎস থেকে প্রাপ্ত প্রবাহ, ২. বৃষ্টির পানি, ৩. উপনদীর প্রবাহ ৪. ঝর্ণাধারার পানি এবং লোকালয় থেকে নর্দমা দিয়ে গড়িয়ে পড়া পানি। ভারতের প্রকল্পগুলোর জন্য মূলত প্রথম তিনটি উৎসকে বেছে নেয়া হয়েছে। বিস্তীর্ণ ভারতজুড়ে জালের মতো ছড়িয়ে থাকা নদীগুলোর বিপুল জলরাশিকে ব্যবহার করে নিজেদের সমৃদ্ধির সোপান গড়ে তুলতে চায় তারা। এজন্য তাদের গৃহীত কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে, নদীর পানি এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরের জন্য খাল বা ক্যানাল খনন, এক নদীর সঙ্গে অপর নদীর সংযোগ সাধন, নদীর উচ্চতম স্থানে ড্যাম তৈরি ও জলবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন, ব্যারাজ ও ব্রিজ নির্মাণ, নদীর এক বেসিন হতে অন্য বেসিনে পানি স্থানান্তর। ভারত ইতোমধ্যে দৃশ্যমান নদ-নদীগুলোর ওপর ৩ হাজার ৬০০টি বাঁধ বেঁধে ফেলেছে। আরো ১ হাজার বাঁধের নির্মাণকাজ চলছে পুরোদমে। গত ৫৫ বছরে ভারতে বন্যা-খরায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কত- এ ব্যাপারে তাদের পরিসংখ্যান নেই। তবে ভারত নদীর প্রায় সবক’টি উৎসকেই বিভিন্নভাবে বাধাগ্রস্ত করছে। এভাবে এসব উৎসের শতকরা ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নেয়া হচ্ছে।

গঙ্গা ও উপনদীতে অসংখ্য প্রকল্প
ভারত তার বহু সংখ্যক সেচ ও পানিবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য মূল গঙ্গা এবং এর উপনদীগুলোর ৯০ ভাগ পানি সরিয়ে নিচ্ছে। শুধু ফারাক্কা নয়, গঙ্গা-পদ্মাকেন্দ্রিক বাঁধ, জলাধার, ক্রসড্যাম, রেগুলেটরসহ অন্তত ৩৩টি মূল অবকাঠামো নির্মাণ করছে ভারত। এর সঙ্গে রয়েছে আনুষঙ্গিক আরো অসংখ্য ছোট-বড় কাঠামো। নতুন করে উত্তরাখন্ড রাজ্য সরকার ৫৩টি বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ভারত অনেক আগে থেকেই গঙ্গায় বৃহদাকার তিনটি খাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে, ‘আপারগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ এবং ‘নিম্নগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট।’ এ ধরনের প্রকল্পের হাজার হাজার কিলোমিটার খালের মাধ্যমে তারা গঙ্গার পানি সরিয়ে নিয়ে সেচ দেবার ব্যাপক কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। ‘উপর গঙ্গা খাল প্রকল্পের’ মাধ্যমে উত্তর প্রদেশের ২৫ লাখ একর জমিতে সেচ দেয়ার লক্ষ্যে ৬ হাজার কি.মি. খাল, ‘মধ্যগঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ নামের প্রকল্পে মূল ও শাখাসহ খননকৃত খালের মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৬০০ কি.মি. এবং ‘নিম্নগঙ্গা সেচ প্রকল্পের’ জন্য ৬ হাজার কি.মি. খাল খনন করা হয়েছে। এছাড়াও ভারত গঙ্গার ‘বাড়তি’ পানি কাজে লাগিয়ে ৩ লাখ ১ হাজার হেক্টর জমিতে সেচ দেবার জন্য ‘পূর্ব গঙ্গা ক্যানেল প্রজেক্ট’ তৈরি করেছে। এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ১৪০০ কি.মি। এসব ক্যানেল প্রকল্প চাঙ্গা রাখতে নিয়মিতভাবে গঙ্গার পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ভারতের ভেতরের গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের পানির উৎস বৃদ্ধির সহায়ক উপনদীগুলোতেও বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ পানির জন্য হাহাকার করলেও ফারাক্কায় পানি না থাকার অজুহাতে বাংলাদেশকে পানি বঞ্চিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো ভারত অনেক ভেতরেই বাঁধ দিয়ে এসব নদীকে বন্ধ্যা করে রেখেছে। গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ প্রধান নদীগুলো এসব উপনদী থেকে বিপুল পানি প্রবাহ লাভ করে থাকে। গঙ্গা নদীতে পানির প্রবাহ বৃদ্ধির অন্যতম সহায়ক নদী হলো ভাগিরথী, ঘাগরা, কোশী ও গন্ডক। নেপাল থেকে উৎসারিত এসব নদীতেও ভারত নিজ এলাকায় বাঁধ নির্মাণ করেছে। গঙ্গার উজান থেকে ভাটির দিকে বাম পাশে অবস্থিত এসব নদী সারা বছর গঙ্গাকে নাব্য রাখতে অনেক সহায়ক হয়। গঙ্গার অন্যতম উপনদী গোমতি, রামগঙ্গা, কর্ণালী, ঘাগরা, ধাউলিগঙ্গা প্রভৃতিতে বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কিন্তু এর ফলে বাধাগ্রস্ত মূল গঙ্গার প্রবাহ।

গঙ্গার উজানে প্রবাহ হ্রাসের কারণ
গঙ্গার উজানে প্রবাহ কেন কমছে? এ ব্যাপারটি ভারতীয় বিশেষজ্ঞদের মতামত থেকেই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। পশ্চিমবঙ্গের বিশেষজ্ঞ শ্রী অশোক কুমার বসু তার ‘গঙ্গাপথের ইতিকথা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, ‘উত্তরকাশী থেকে ফারাক্কা পর্যন্ত জলবিদ্যুৎ যোজনা সেচ বিভাগ ইত্যাদি সবাই মিলে গঙ্গা ও তার উপনদীগুলো নিয়ে এতো টানা-হেঁচড়া শুরু করেছে যে ফারাক্কার উজানে যথেষ্ট পরিমাণ পানি কমেছে। পাটনার উজানে সুবিশাল অববাহিকার জল সেচ কাজে লাগিয়ে বহুকাল ধরে গঙ্গার নাব্যতার ক্ষতি করা হয়েছে। আঠারোটি ক্যানেল দিয়ে গঙ্গার জল বাহান্ন হাজার বর্গ কিমি জমিতে সেচ দেয়া হয়। আপার-লোয়ার গঙ্গা ক্যানেল দু’টি তেরো হাজার বর্গকিলোমিটারের জন্য সেচের জল টানে। পরিণতিতে হরিদ্বার থেকে এলাহাবাদের মধ্যে গঙ্গা সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। আজ ফারাক্কার কাছে শুকনো মওসুমে জলপ্রবাহের পরিমাণ বাস্তবিক কত তা চিন্তার বিষয়। হয়তো ৫০ হাজার কিউসেকের অনেক নিচে।’ ‘ইন্ডিয়া টুডে’ পত্রিকার এক সংখ্যায় প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছে, ফারাক্কা পয়েন্টে আসার আগেই উজানে উত্তরপ্রদেশ ও বিহারে গঙ্গা থেকে ২৫ থেকে ৪৫ হাজার কিউসেক পানি প্রত্যাহার করা হচ্ছে। ফলে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহ কমে যাচ্ছে।’ ভারত-ভুটান-নেপালের পরিকল্পনা অনুযায়ী ৫৫২টি বাঁধকে কেন্দ্র করে সর্বমোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য হচ্ছে ২ লাখ ১২ হাজার ২৭৩ মেগাওয়াট। ভয়ানক ব্যাপার হচ্ছে, এ ৫৫২টি বাঁধ বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক নদীর উজানে। এখান থেকে এক মেগাওয়াট বিদ্যুতের অংশীদারিত্ব বাংলাদেশ না পেলেও ক্ষতির শিকার হবে ব্যাপকভাবে। আর বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে, কখনো যদি ৮ রিখটার স্কেলে কোনো ভূমিকম্প বাংলাদেশে হয় তাহলে প্রধান প্রধান নদীগুলোর প্রবাহপথ পরিবর্তিত হয়ে যেতে পারে।

ব্রহ্মপুত্র-যমুনার ধারা
ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বাংলাদেশ ৬৭ শতাংশ প্রবাহ পেয়ে থাকে। বাংলাদেশে ব্রহ্মপুত্র-যমুনার উপনদী ও শাখা-প্রশাখার মধ্যে রয়েছে, তিস্তা, ধরলা, করতোয়া, আত্রাই, হুরাসাগর, সুবর্ণসিঁড়ি, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, ধলেশ্বরী, দুধকুমার, ধরিয়া, ঘাঘট, কংস, সুতলা প্রভৃতি। এসব নদীর অববাহিকা হলো বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত অববাহিকা। তথ্যে প্রকাশ, ভারত তার পরিকল্পনা মোতাবেক গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র দু’টি অববাহিকায় পানির ৩৩টি সঞ্চয়াগার নির্মাণ করবে। প্রতিটি সঞ্চয়াগারের ধারণক্ষমতা হবে ১ লাখ ৫০ হাজার কিউসেক। অর্থাৎ ৩৩টি সঞ্চয়াগারের সর্বমোট ধারণক্ষমতা হবে প্রায় ৫০ লাখ কিউসেক পানি। এই পানি ভারতের পূর্ব, মধ্য ও উত্তরাঞ্চলে সেচ কাজে ব্যবহার করা হবে। এর আওতায় থাকবে ৩ কোটি ৫০ লাখ হেক্টর জমি। পাশাপাশি উৎপাদন করা হবে ৩০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ। ইতোমধ্যে স্থাপিত বাঁধের মাধ্যমে ভারত ৩৫ লাখ কিউসেক পানি ধরে রেখেছে। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভারত এসব সঞ্চয়াগারের মাধ্যমে ধরে রাখতে সক্ষম হবে ৫০ লাখ কিউসেক পানি। বাড়তি ১৫ লাখ কিউসেক পানির ঘাটতি বাংলাদেশকে এক ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিবে। গঙ্গার পর ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি প্রত্যাহার করার এক পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ভারত ব্রহ্মপুত্রের পানি নিয়ে যাবে দক্ষিণ ভারতের কাবেরী নদীতে। এ জন্য ১ হাজার ৪৬৬ কিলোমিটার খাল খনন করা হবে। ফারাক্কা থেকে কাবেরী নদী পর্যন্ত মূল সংযোগ খাল ছাড়াও অসংখ্য ছোট ছোট খাল কাটা হবে। এসব খাল অনেক নদী অতিক্রম করবে। নির্মাণ করা হবে পানি সংরক্ষণাগার ও বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে গঙ্গার পানি ফারাক্কা পয়েন্ট পর্যন্ত আনা হবে। গঙ্গার পানি ব্যয় করা হবে উত্তর প্রদেশ ও বিহারের বিভিন্ন সেচ প্রকল্পে। পরিণতিতে পদ্মা নদী একেবারে পানিশূন্য হয়ে পড়বে। অপরদিকে ধুবড়ি থেকে ফারাক্কা পয়েন্ট পর্যন্ত সংযোগ খাল কয়েকটি নদীর পানি টেনে নেবে। নদীগুলো হলো, তিস্তা, তোরসা, রায়ঢাক, জলঢাকা, মহানন্দা প্রভৃতি। এসব নদীই বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে প্রবাহিত নদীগুলোর পানির প্রধান উৎস। অন্যদিকে মেঘনা নদী মূলত সুরমা-কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন পাহাড়ি নদী এবং এর স্রোতের সঙ্গে মিলিত অন্যান্য জলধারার প্রভাবে স্ফীত থাকে। এই নদী বিভিন্ন স্থানে পদ্মা ও যমুনার প্রবাহও পেয়ে থাকে। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র-বরাক বেসিনে ভারতের বহুসংখ্যক বৃহৎ-ক্ষুদ্র অবকাঠামো নির্মাণের পরিণতির শিকার হবে মেঘনারও প্রবাহ। এর স্রোতধারা স্বাভাবিকভাবেই সংকীর্ণ হয়ে পড়বে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট পরিবেশবিদরা।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়)
লেখক : পরিবেশ সাংবাদিকতায় জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত। সভাপতি, রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়ন

SHARE

Leave a Reply