উপজেলা নির্বাচন ২০১৪ হীরক রাজার দেশ

হিরক রজার দেশে

সাদেক খান

তৃতীয় দফা উপজেলা নির্বাচনের আগেই ভোট জালিয়াতির কারসাজি, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর প্রকাশ্য লাঞ্ছনা, অপহরণের ঘটনা, বিরূপ ভোটদাতাদের হুমকি ভয়ভীতি দিয়ে জব্দ রাখার কায়দা, সরাসরি সংঘর্ষ সহিংসতা ও নির্লজ্জ প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের ঘটনা চরমাকার ধারণ করেছে। এক সপ্তাহ আগে থেকেই গাজীপুরের শ্রীপুরে চলছিল ক্ষমতাসীন দলেরই দুই প্রার্থীর অনুচরদের সশস্ত্র সংঘাত, গুলিবিনিময়। পুলিশসহ শ’ খানেক জখম হয়েছে, গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৯ জন। মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেল পুড়েছে কয়েকটি, গাড়ি ভাঙচুর হয়েছে আরো বেশ কিছু। এরই মধ্যে নর্দমায় পাওয়া গেলো আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থক এক ছাত্রলীগ নেতার লাশ। অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী ও পৌর মেয়র তাদের লোকজন দিয়ে ওই যুবককে ধরে পিটিয়ে গুলি করে মুমূর্ষু অবস্থায় নর্দমায় ফেলে দিয়েছেন। এর আগে বিদ্রোহী প্রার্থীকে র‌্যাব ধরে নিয়ে গিয়েছিল। প্রতিবাদে তার কর্মী-সমর্থকেরা ময়মনসিংহ মহাসড়কের একটি চৌরাস্তাসহ চতুর্দিকের সড়কগুলোও অবরোধ করে রাখে সারা বিকেল। তাতে র‌্যাব ওই প্রার্থীকে ছেড়ে দেয়। অবশেষে ১১ মার্চ মিটিং করে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত দিয়েছে, নির্বাচনের সুপরিবেশ না থাকায় শ্রীপুর উপজেলা নির্বাচন স্থগিত করা হলো। কমিশনের স্থানীয় রিটার্নিং অফিসার এই সিদ্ধান্তের কথা প্রকাশের সাথে সাথেই শুরু হয় ১৯ দলীয় বিরোধী জোটের বিক্ষোভ। উপজেলা চেয়ারম্যান পদের জন্য বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী বলেন : ‘১৯ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থীর জয় নিশ্চিত দেখে সরকারের চালে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সন্ত্রাসীদের কাছে নির্বাচন কমিশন এবং সরকার হেরে গেছে।’Herok Rajer deshe-02
তৃতীয় দফার অন্যান্য উপজেলা নির্বাচনের এলাকাগুলোতেও মারাত্মক হয়ে উঠেছে সরকার সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে প্রশাসনের নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ এবং মন্ত্রী-এমপিদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা। যেমন- খুলনায় সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ : পাইকগাছা, ফুলতলা, রূপসা, তেরখাদা, দাকোপ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় বেশির ভাগ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ১৯ দলীয় জোট সমর্থিত। এ জন্য পুলিশ তাদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এলাকা ত্যাগের হুমকি দিচ্ছে; যেন ১৯ দলের পক্ষে কাজ করা মানেই অপরাধ। নির্বাচনী আচরণবিধি অমান্য করে স্থানীয় এমপিদের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা ৫০ থেকে ১০০টি মোটরসাইকেল নিয়ে এলাকায় প্রতিনিয়ত মহড়া দিচ্ছে যাতে ভোটারেরা ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে আসতে ভয় পান। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা দেয়ার পর সব বিধিবিধান লঙ্ঘন করে খানজাহান আলী থানার ওসিকে বদলি করে থানায় ছাত্রলীগের একজন সাবেক নেতাকে বসানো হয়েছে। এই ওসি আওয়ামী লীগ নেতা, ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থীর আত্মীয় হিসেবে পরিচিত। নির্বাচন চলাকালে এলাকায় মন্ত্রীদের প্রবেশাধিকারে বিধিনিষেধ থাকলেও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফুলতলা উপজেলা চেয়ারম্যানপ্রার্থীর মালিকানাধীন আফিল জুটমিলে বসে পুলিশের সাথে রুদ্ধদ্বার মিটিং করেছেন, যা নির্বাচনী আচরণবিধির সম্পূর্ণ পরিপন্থী। এসব বিষয় লিখিত আকারে খুলনার রিটার্নিং অফিসারকে জানানো হয়েছে। কোনো কাজ হয়নি।
সংবাদ ভাষ্যকারেরা আগেই আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন, উপজেলা নির্বাচনে গত দুই ধাপের ধারাবাহিকতায় তৃতীয় ধাপে কেন্দ্র দখল ও ভোট জালিয়াতি, আচরণবিধি লঙ্ঘন, হামলা, ভাঙচুর ও কেন্দ্র দখলের ঘটনা অনেক বাড়বে। রহস্যজনক কারণে এসব অভিযোগের বিষয়ে কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি বলে জানা গেছে। সরকারদলীয় প্রার্থীদের হুমকিতে আতঙ্কে রয়েছেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীদের কর্মিসমর্থকেরা। কয়েকটি উপজেলায় বিরোধী দল সমর্থিত প্রার্থীরা হামলা ও অপহরণের শিকার হয়েছেন।
আরো চলেছে টাকার খেলা। খোদ নির্বাচন কমিশনেরই মাঠ প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসংখ্য কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পছন্দের প্রার্থীদের বিশেষ নির্বাচনী সুবিধা দেয়া, আচরণবিধি লঙ্ঘন সত্তে¡ও ব্যবস্থা না নেয়া, প্রতিপক্ষকে হয়রানি করাসহ নানা গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী রিটার্নিং ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উৎকোচ দাবি করার অভিযোগ রয়েছে। বেশির ভাগ অভিযোগ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। নির্বাচন সামনে রেখে তারা ব্যাপক ধরপাকড় ও ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এতে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে পারেননি অনেক প্রার্থী।
গোলযোগের আশঙ্কা করে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা চেয়ে কমিশনে আবেদন করেছিলেন অনেক প্রার্থী। ঝুঁকিপূর্ণ ভোটকেন্দ্রের নাম উল্লেখ করে ওই সব কেন্দ্রে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন অনেকে। বেশ কয়েকজন প্রার্থী গত ১৯ ও ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দু’দফা নির্বাচনের অনিয়ম তুলে ধরে পুনরায় ভোটগ্রহণ ও ফলাফলের গেজেট প্রকাশ বন্ধ রাখতে নির্বাচন কমিশনের কাছে অনুরোধ করেছিলেন। এতে ফল হয়নি।
অনেক ভোটদাতার জন্য প্রকাশ্য ও গোপন জবরদস্তির ‘বৈরী বাতাসে’ ম্লান হয়ে গেছে ভোটদানের উৎসাহ। সংঘর্ষ আর প্রাণনাশের আতঙ্ক প্রায় সার্বজনীন। সেনাবাহিনী নেমেছে। কিন্তু তাদের উপস্থিতি তো ভোটকেন্দ্রের বাইরে, শুধু পথে-ঘাটে। ঘরে ঘরে গিয়ে যে হুমকি দেয়া হয়েছে কিংবা ভোটকেন্দ্র দখলের যে আক্রমণ ঘটেছে, এর প্রতিকার মেলেনি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা অনেকে মনে করেছিলেন, ৫ জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণে জমে উঠবে আবারো জাতীয় রাজনীতির মাঠ। এ কথা ঠিক, উপজেলা নির্বাচনকে উপলক্ষ করে চাঙ্গাভাব ও সহিংসতা দু’টিই ফিরেছে দেশের রাজনীতিতে। সংসদে বাকপটুত্বে বন্ধ্যা বিএনপিবিহীন রাজনীতিতে টনিক হয়ে কাজ করেছে চলতি উপজেলা নির্বাচন। অন্য দিকে সরকারি দল আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র আধিপত্য রাজনীতিতে যে গুমোট দশা এনেছিল, তার ওপর হালকা দমকা বাতাস হিসেবে এসেছে এ নির্বাচন। উপজেলার এ পর্যন্ত তিন দফার নির্বাচনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই, ভোট ডাকাতি, দু’পক্ষেই বিদ্রোহী প্রার্থী এবং সেই সাথে টাকার খেলা। তবে উপজেলায় ভোটের মাপকাঠিতে যেভাবে প্রক্সি জনসমর্থন পরীক্ষার ধুম চলছে এবং সরকারপক্ষ মরিয়া হয়ে উঠেছে ছলে বলে কৌশলে ‘দখল’ কায়েম করতে, তাতে ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে ক্ষমতার পালাবদল শুরু হয়ে গেছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করা বিএনপি-জামায়াতের দখলে অনেকটাই চলে যাচ্ছে স্থানীয় সরকারের ময়দান। পাঁচ ধাপের এ নির্বাচনের প্রথম কয়েক ধাপ থেকে দেখা যায়, মূলত জনসমর্থনশূন্য হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ ও সতীর্থ দলগুলো। উপজেলা নির্বাচনে সরকারের আজ্ঞাবহ বিরোধী দল জাতীয় পার্টি রাজনীতির মাঠে চতুর্মুখী চাপে নিষ্পেষিত জামায়াতে ইসলামীর ধারে কাছেও যেতে পারেনি। প্রথম দুই দফা নির্বাচনে ২১০টি উপজেলার মধ্যে ক্ষমতাসীন দলের চেয়ারম্যানের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৯ জন। আর বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলের চেয়ারম্যানের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৬ জনে। এর মধ্যে জামায়াত পেয়েছে চেয়ারম্যানের ২০টি পদ।
আওয়ামী লীগের পুরো সমর্থন পেলেও এরশাদের জাতীয় পার্টি মাত্র দু’টি চেয়ারম্যান পদ পেয়েছে। ক্ষমতায় থেকে উপজেলা নির্বাচনে হারের প্রতিক্রিয়ায় আওয়ামী লীগ বলছে, দল হারলেও সুষ্ঠুভাবে নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে সরকারের জয় হয়েছে। অন্য দিকে সংসদে প্রতিনিধিত্বহীন বিএনপির বক্তব্য, উপজেলা নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে জনগণ। ক্ষমতাসীনদের প্রতি সহানুভূতিশীল সুশীল ব্যক্তিরাও বলছেন, উপজেলা নির্বাচনে কার্যত আওয়ামী লীগের ভরাডুবি ঘটেছে এবং বিএনপি বিজয়ী হয়েছে, এমনটা নয়। তবে বিএনপিসহ বিরোধী দলের প্রতি মানুষের যে ব্যাপক জনসমর্থন আছে সেটা প্রমাণিত হয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোটের সমর্থকেরা বেশি জয়লাভ করায় প্রমাণিত হয়েছে আওয়ামী লীগের চেয়ে তাদের জনপ্রিয়তা বেশি। সেই সাথে সরকারের প্রতি অনাস্থাও জানিয়ে দিয়েছেন সাধারণ ভোটারেরা। জামায়াতের প্রতি সমর্থনও বেড়ে যাওয়ার লক্ষণ দেখা গেছে এ নির্বাচন থেকে।
দ্বিতীয় দফার তিনটি উপজেলার স্থগিত কেন্দ্রগুলোর নির্বাচনে প্রকাশ্যে একরকম জোরজবরদস্তি করেই বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছেন সরকারি দলের দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী, একটিতে পারেনি, বিএনপি জয়ী হয়েছে। তৃতীয় ধাপে যেমন আশঙ্কা করা গিয়েছিল, তেমনি হয়েছে। তবে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তপনার সব সীমা অতিক্রম করেও বেসরকারি ফলাফলে আওয়ামী লীগ ৮০ উপজেলায় বিএনপির চেয়ে মাত্র সাত আসন বেশি পেয়েছে। জামায়াত পেয়েছে সাত আসন। ১৯ দলীয় জোটভুক্ত এলডিপি পেয়েছে একটি আসন। দশম সংসদ নির্বাচন বয়কটকারী ১৯ দলের উপজেলা চেয়ারম্যানের সংখ্যা তিন পর্ব মিলিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের চেয়ে ৩৭টি বেশি। ভাইস চেয়ারম্যান ও নারী ভাইস চেয়ারম্যানের সংখ্যাও তাদেরই বেশি। তাই আগামী জাতীয় নির্বাচনে যে ক্ষমতার পালাবদল হবে সাধারণ মানুষের চোখে সেটা স্পষ্ট হয়ে গেছে। ৫ জানুয়ারি সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার বঞ্চিত সাধারণ মানুষ এ নির্বাচনে ভোট দিয়ে তাদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে।
সরকারি মহলে খবরের খোঁজে নিয়োজিত সাংবাদিকদের মুখে শোনা যায়, এ নিয়ে আওয়ামী লীগের মধ্যেও বেড়ে চলেছে এক ধরনের অস্বস্তি। সরকার কত দিন টিকবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। মুখে অবশ্য বড়াইয়ের শেষ নেই, সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ডাঁকসাইটে আওয়ামী নেতাকর্মীদের বচনে লাগাম নেই। কিন্তু আরেকটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য পাশ্চাত্য ‘উন্নয়ন সহযোগী’ শক্তিগুলোর চাপ যে বেড়েই চলেছে, ক’দিন পরপরই যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জার্মানি, কানাডা বা ফ্রান্স কারো না কারো পক্ষ থেকে স্মরণ করিয়ে দেয়া হচ্ছে, বাংলাদেশ সরকারের সাথে তাদের ‘বিজনেস অ্যাজ ইউজুয়াল’ বা স্বাভাবিক কাজকর্ম অব্যাহত থাকলেও ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যে গ্রহণযোগ্য নয়, তাদের এই অবস্থান অপরিবর্তিত। আরেকটা নির্বাচনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ রচনার জন্য সংলাপে বসার বিষয়ে জানতে চেয়ে কূটনৈতিক তাগিদও আসছে বারবার। সরকার তাতে ভ্রƒক্ষেপ না করলেও আওয়ামী লীগেরই অনেক নেতাকর্মী বিব্রত বোধ করছেন। ‘একতরফা’ নির্বাচন দিয়ে ‘পাতানো বিরোধী দল’ সাজিয়ে ‘সর্বদলীয়’ বাকশাল সরকার গঠনের কলঙ্ক চাপা পড়ার আগে সাততাড়াতাড়ি উপজেলা নির্বাচন দিয়ে যে ফলাফল আসছে তার রাজনৈতিক মাত্রাযোগ সরকারের অবস্থানকে আরো নাজুক করে তুলেছে। উপজেলা নির্বাচনে সরকার-সমর্থিত প্রার্থীদের একরকম ভরাডুবি ৫ জানুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাকে দেশ-বিদেশে আরো প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। তবে হয়তো সান্ত্বনা, শুরুতেই নির্বাচন দিয়ে বিএনপি জোটকে সরকারবিরোধী আন্দোলন থেকে বিরত রাখা গেছে। উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে কিছু সময়ের জন্য হলেও ব্যস্ত রাখা গেছে আন্দোলনমুখী প্রধান বিরোধী জোটকে। এভাবে সরকার নির্বাচনোত্তর অশান্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিক করে তুলতে সক্ষম হয়েছে।
সিনিয়র নেতাদের এই সান্ত্বনায় আস্থা রাখতে পারছেন না সরকারি দলেরই বেশির ভাগ নেতাকর্মী। উপজেলা নির্বাচনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করেও বিরোধী জোটকে কাবু করা যাচ্ছে না। সরকারপক্ষের প্রতি সাধারণ ভোটদাতাদের বিরূপ মনোভাব এত প্রকট হয়ে উঠেছে যে, আওয়ামী লীগের ঘোর সমর্থকেরাও এই সরকারের মেয়াদ নিয়ে সংশয়াপন্ন। সরকারের মন্ত্রীরা, আওয়ামী লীগ কর্মকর্তারা অবশ্য বলেই চলেছেন, এই সরকারও পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকবে; আর শেখ হাসিনার অধীনেই খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে আসতে হবে। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘুরিয়ে এ কথাও বলছেন, খালেদা জিয়া ‘ভিন্ন মতলব’ নিয়ে উপজেলা নির্বাচনে এসেছেন; তিনি কয়েকটি উপজেলায় বিজয়ী হয়ে প্রমাণ করতে চান, এ সরকারের সঙ্গে জনগণ নেই।Herok Rajer deshe-03
বাস্তবিক, বিরোধী ১৮ দলীয় জোটের তরফে ৫ জানুয়ারির পাতানো নির্বাচন বয়কট করে নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাধায়ক সরকারের দাবিতে অটল থাকার কৌশল আর তারপর আন্দোলনে বিরতি দিয়ে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার কৌশল একই সূত্রে গাঁথা। সার্থকভাবে সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে বেগম জিয়া ও তার অনুসারীরা প্রমাণ করেছেন, সরকার বৈধ ক্ষমতার অধিকারী নয়। আজ্ঞাবহ কিছু ক্ষুদ্র দল এবং মামলায় কাতর একটি শরিক দলনেতাকে একরকম গৃহবন্দী করে রেখে শেখ হাসিনা যে লোক-দেখানো নির্বাচন করেছেন, তাতে ডান বা বামের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোনো দলই যোগ দেয়নি। এখন উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে খালেদা জিয়া বুঝিয়ে দিতে পারছেন, ভোটদাতারা যে সরকারপক্ষকে প্রত্যাখ্যান করছে শুধু তাই নয়, এ কথাও প্রমাণ করছে যে, ১৯ দলীয় বিরোধী জোটের নেতৃত্বেই আস্থা রাখে দেশবাসী। একই সাথে উপজেলা নির্বাচনে প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের ন্যক্কারজনক ভূমিকা, ভোট কারচুপির সহায়তা আর নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তা আরো প্রমাণ করছে, হাসিনা সরকারের অধীনে সুষ্ঠু বা অবাধ নির্বাচন অসম্ভব। নির্দলীয় নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের জন্য বিরোধীদলীয় দাবি আরো যুক্তিসিদ্ধতা অর্জন করেছে এবং জোরদার হয়েছে উপজেলা নির্বাচনে জবরদস্তি, পুলিশের জুলুম, অনিয়ম, সহিংসতা ও প্রকাশ্য ভোট কারচুপির কারণে। বিরোধী জোটনেত্রী খালেদা জিয়া এখন নোটিশ দিয়েছেন, উপজেলা নির্বাচন শেষ হলে, তথা ৩১ মার্চের পর ‘দ্রুত সরকার পতনের আন্দোলন’। ৫ জানুয়ারি নির্বাচন বর্জন কর্মসূচিতে দেশব্যাপী সাড়া আর দফায় দফায় উপজেলা নির্বাচনে তার জোটের সফল লড়াই খালেদা জিয়ার আন্দোলনের শক্তিকে আরো জোরদার করবে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক কৌশলবিদেরা।
এদিকে বাহ্যত সরকার নির্বিকার। রাজনৈতিক সহিংসতা, সশস্ত্র অপরাধ, ছিনতাই খুন অপহরণ বাণিজ্য আর এসব অপরাধে সরকারি বাহিনীরই একটি অংশের যোগসাজশ বা অংশীদারিত্ব সারা দেশকে যেন মগের মুল্লুকে পরিণত করেছে। অথচ পুলিশ বাহিনীর মহাপরিদর্শক বড়াই করে বলছেন- ‘আমরা আনন্দের মধ্যে আছি, স্বস্তির মধ্যে আছি। বর্তমান সময়ে আমরা স্বাভাবিকভাবে জীবনযাপন করতে পারছি। এজন্য মহান আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় করছি। আমাদের পারফরম্যান্স দেখে প্রধানমন্ত্রী দারুণ খুশি। তিনি একাধিকবার এজন্য প্রশংসা করেছেন। আমরা মাথা উঁচু করে সর্বক্ষেত্রে বলতে পারছি আমরা নিষ্ঠাবান, কর্তব্যপরায়ণ। সব সময় জনস্বার্থকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে আমরা আমাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব আগেও পালন করেছি, বর্তমানেও করছি এবং ভবিষ্যতেও করে যাবো।’ অথচ, দেশের মানুষ আনন্দে নেই। এসব কথা শুনে তারা হাসবে না কাঁদবে ঠাওরে উঠতে পারছে না।
আনন্দে আছেন হামবড়া অর্থমন্ত্রীও। ব্যাংক থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা ধার করে তিনি সরকার চালাচ্ছেন। এখন ব্যবসায়ীদের পেছনে লেগেছেন শত কোটি টাকা চাঁদাবাজির জন্য বাংলাদেশে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের অনুষ্ঠানে বিলাসবহুল আয়োজনের নামে। অর্থমন্ত্রীর এই চাঁদা আদায় ও ব্যয়ের জবাবদিহিতার নিশ্চয়তা দাবি করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ এমন সরকারি চাঁদাবাজিকে নৈতিক অবক্ষয় বলে অভিহিত করেছে।
স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও মনের সুখে বিরোধী জোটনেত্রীকে অশালীন কটাক্ষ করে চলেছেন, বিদেশীদের কাছে ‘নালিশ করে’ খালেদা জিয়া ‘বালিশ পেয়েছেন’; ‘লাল টুকটুকে শাড়ি’ পরে সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বর্তমানে আরেকটি জোটপ্রধান ‘বদু কাকা’র (ড: বি চৌধুরী) সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। এমন কটূক্তি করে প্রধানমন্ত্রী যদি আনন্দ পেয়েও থাকেন, দেশের যে সম্মান বাড়েনি সে কথা নিঃসন্দেহ।
আরো প্রকাশ, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিবউদ্দীন আহমদ বিতর্কিত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেই পদত্যাগ করতে চেয়েছিলেন। পদত্যাগপত্র নিজ হাতে লিখে টাইপও করে রেখেছিলেন। কিন্তু বন্ধু-বান্ধব ও সহকর্মীরা তাকে পরামর্শ দেন, পদত্যাগ করলে বিপদ হতে পারে। পদত্যাগপত্র গৃহীত হবে, এমন নিশ্চয়তাও নেই। যেমনটা হয়েছিল জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বেলায়। এরশাদ নির্বাচন থেকে সরে গিয়েও রেহাই পাননি। তার দলের অনেকেই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেছিলেন। কিন্তু তার নিজেরটা প্রত্যাহার করা হয়নি। তাকে হাসপাতালে বন্দী করে রেখে নির্বাচনের পর শপথ নিতে তাকে বাধ্য করতে ভয় দেখানো হয়, ‘মঞ্জুর হত্যা মামলা রায়ের জন্য প্রস্তুত।’ তা ছাড়া তার ছেলে শাদের বিরুদ্ধে যে হত্যা প্রচেষ্টা মামলা রয়েছে, তা আবার সচল হবে। উপায়ান্তর না দেখে এরশাদ শপথ নিলেন। মাঝখানে রওশন এরশাদ দলের নেতৃত্বে ভাগ বসালেন শক্তিশালী মহলের ইশারায়। এ অবস্থা পর্যালোচনা করে প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বলা হয়, পদত্যাগ করতে পারেন, তবে শেষ পরিণতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। উপজেলা নির্বাচন যেভাবে শুরু হয়েছিল তাতে ধারণা হয়েছিল, এই নির্বাচন মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হবে। সরকারি হস্তক্ষেপ তেমন হবে না। কিন্তু দ্বিতীয় দফার উপজেলা নির্বাচনে সরকারপক্ষের দাপট দেখে প্রধান নির্বাচন কমিশনার নির্বাচন চলাকালে নজিরবিহীনভাবে দেড় মাসের ছুটি নিয়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্র চলে গেছেন। ১১ মার্চ ‘প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত’ জাঁদরেল এরশাদ তার ‘বাধ্য সন্তান’ যারা তার নির্দেশে ৫ জানুয়ারি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়িয়ে জনপ্রতিনিধিত্বের সুযোগবঞ্চিত হয়েছেন, তাদের জড়ো করে বলেছেন, এই সরকারেই তাদের জন্য কিছু কিছু পদ বা সুবিধা করে দেবেন। আরো বলেছেন, ‘আমি নিঃস্ব, আমি রিক্ত। আমি কেন নির্বাচনে যাই নাই (তথা যেতে চাইনি), সেটা তোমরা এক দিন বুঝবে। সেটাই ইতিহাস হবে।’
অর্থাৎ তিনিও বললেন, বাংলাদেশ এখন একটা বৃহৎ কারাগার। তবে হীরক রাজার দেশে কখন কিভাবে রশির টানে রাজকারাগার খান খান হবে কে জানে?

লেখক : প্রবীণ সাংবাদিক, কলামিস্ট

SHARE

Leave a Reply