উপভোগ্য জীবনে ব্যস্ততা -সায়ীদ মোস্তাফিজ

জীবন সংক্ষিপ্ত। আসলেই খুব সংক্ষিপ্ত। মায়ের উদর থেকে জন্ম নিয়ে শৈশব, কৈশোর, যৌবন থেকে দেখতে দেখতেই বার্ধক্যে পৌঁছে যায়। আবার অনেকের সে সৌভাগ্যটুকুও হয় না। কৈশোর বা যৌবনেই পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে যেতে হয়। বার্ধক্যে বড় একা হয়ে যান অনেকে। চারপাশে একটা সমবয়সী মানুষও অবশিষ্ট থাকে না আর। নতুন প্রজন্মের সাথে বসবাস করতে গিয়ে ক্লান্ত হয়ে যান। খুঁজে ফেরেন হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো। স্মৃতি ও মানুষগুলো!

অতীতের খেরোখাতা হাতড়িয়ে হয়তো কিছু স্মৃতি ফিরে পান। তাতে একা একা হেসে ওঠেন কখনো, আবার কখনো গভীর দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে ওঠে হৃদয়। খুব ছোটকালে হারিয়ে যাওয়া মায়ের মুখটা স্মরণ করার শত চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। মার্বেল খেলার সাথী প্রিয় বন্ধুর চেহারাটা খেয়াল করতে পারেন না হয়তো। শৈশবে মানুষের দুনিয়াটা ছোট থাকে, বার্ধক্যে তা আরো সঙ্কীর্ণ হয়ে যায়। রঙিন থাকে মাত্র কটা বছর। মাত্র! সময়ের স্রােতে তা হলদে হতে থাকে। কিন্তু অল্প এ সময়টাই অনেক দীর্ঘ মনে হতে থাকে। থমকে যায় যেন ঘড়ির কাঁটা। কাল থেকে কালান্তর একঘেয়েমি ও বিরক্তিতে ঘিরে ধরে। রোগ শোকের বাইরেও যে সময়টা পাওয়া যায় সেটাও উপভোগ করা যায় না পুরোপুরি। জীবনের এই সংক্ষিপ্ত সময়কে কাজে লাগাতে হলে কর্মে ও সৃজনশীলতায় ব্যস্ত থাকতে হবে। জীবনের প্রতিটি মূল্যবান মুহূর্তের বিনিময় হবে নতুন সৃষ্টির সাথে। আমাদের সমাজে তরুণ-তরুণীদের হতাশা ও হীনম্মন্যতায় ভোগার অন্যতম কারণ হলো ব্যস্ত না থাকা। অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা হওয়ায় তা অপরাধপ্রবণতা ও আত্মহত্যাকে প্রলুব্ধ করছে। ভেঙে খান খান হচ্ছে সুখের সংসার। বাড়ছে মাদকের বিধ্বংসী সয়লাব। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন সমস্যার।

ব্যস্ততা বলতে আমি যা বোঝাতে চাচ্ছি তা অবশ্যই সমাজ ও সংসার বিমুখ কোনো রোবোটিক গতিশীলতা নয় বরং একটি ভারসাম্যপূর্ণ লাইফস্টাইল। একটা নির্দিষ্ট সময়কে বিনোদনের জন্য বরাদ্দ রাখাও সে ব্যস্ততার অংশ হতে হবে। আবার যে ব্যস্ততা বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনের হক আদায়ে উদাসীনতা তৈরি করে সে ব্যস্ততাও উপভোগ্য জীবনের ব্যস্ততা নয়। ব্যস্ততার অর্থ যদি হয় শুধুই টাকা ও সম্মানের সন্ধান, যশ খ্যাতি প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম তবে সেটাও উপভোগের ব্যস্ততা হতে পারে না। যে ব্যস্ততা ধর্মে-কর্মে, ইবাদত-বন্দেগিতে শিথিলতা আনে সেটাও আমার আলোচনার প্রাসঙ্গিক বিষয় নয়। দেহ মনকে সবসময় ইতিবাচক কাজের মধ্যে রাখার যে তৎপরতা সেই ব্যস্ততার মধ্যেই রয়েছে জীবন উপভোগের সকল উপকরণ। ভালো থাকতে হলে সদাসর্বদা কোনো না কোনো কাজের মধ্যেই থাকতে হবে আমাদের। সেই কাজ যে সবসময় পদার্থবিজ্ঞানের শর্ত পূরণে সক্ষম হবে তা নয়। ‘সরণ’ হোক বা না হোক বাংলা ব্যাকরণের ক্রিয়ার সংজ্ঞা অনুসারে কাজ হলেই চলবে। তবে তা যেন শুধু খাওয়া ও ঘুমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে! কাজের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র সময় কাটানো হলে তাকে বিজ্ঞান বা ব্যাকরণ যতই কাজ বলে স্বীকৃতি দিক না কেন তা শক্তি, মেধা ও সময়ের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। বরং কাজের উদ্দেশ্য হতে হবে সর্বদা প্রোডাক্টিভ। কাজটা যদি বসে বসে গল্প করাও হয়ে থাকে তবুও তার প্রোডাক্টিভ দিক হবে আত্মীয়তা বা বন্ধুত্বের সম্পর্ক রক্ষা বা উন্নয়ন। কারণ আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করাও একটি ইবাদত। শুয়ে শুয়ে সমাজ নিয়ে ভাবনা যতই অকর্ম মনে হোক না কেন উপভোগ্য জীবনের জন্য এই ব্যস্ততার বড়ই প্রয়োজন।

ব্যস্ততাকে ক্রিয়াশীল করতে প্রথমেই একটি সুন্দর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। পরিকল্পনাটা হতে পারে দৈনিক, মাসিক বা বাৎসরিক। বলা হয়ে থাকে সুন্দর পরিকল্পনা একটি কাজের অর্ধেক। কাজ ছাড়া পরিকল্পনা বা পরিকল্পনা ছাড়া কাজ দুটোই ব্যর্থতা। সেক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা হতে হবে বাস্তবসম্মত। আবেগবর্জিত পরিকল্পনা না হলে আম ও ছালা দুটোই হারাতে হয় অবশেষে। সুযোগ ও সামর্থ্যরে দিকে লক্ষ্য রেখে নির্ধারণ করতে হবে সবকিছু। নিজেকে ব্যস্ত রাখতে প্রথম পরিকল্পনা হওয়া উচিত পড়াশোনা। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের প্রথম নাযিল হওয়া নির্দেশনা হলো- ‘পড় তোমার প্রভুর নামে যিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ (সূরা আলাক : ১)
মজার ব্যাপার হচ্ছে পড়া বলতেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে একাডেমিক বড় বড় পুস্তকের চিত্র। এর বাইরে কোনো কিছু চিন্তাই করতে পারি না। ফলে আমাদের দেশে একাডেমিক জীবন শেষ করার সাথে সাথে বই-পুস্তকের সাথে সম্পর্কেরও ইতি ঘটে। অনেকটা ছেড়ে দে মা পালিয়ে বাঁচি অবস্থা! দেখা যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা খেলা দেখে সময় অপচয় হয় ঠিকই কিন্তু বছরের পর বছর চলে গেলেও একটা বই পড়া হয় না। পরিকল্পিতভাবে প্রতিদিন অন্তত দুই পৃষ্ঠা করে বই পড়লেও দেখা যেত কয়েক বছরে আমাদের বেশ কিছু বই পড়া হয়ে গেছে। এটা তো গেল দৈনিক ব্যাপার। আমরা যদি মহাগ্রন্থ আল কুরআনটাই পরিকল্পিতভাবে পড়তাম, এক মাসে সূরা ইয়াসিন তার পরের মাসে সূরা মূলক তবে একটা সময় আমাদের অর্জনে বেশ ওজন চলে আসতো। এক বছর কাজী নজরুল ইসলাম আরেক বছর জসীমউদ্দীনকে পরিকল্পনায় রাখতে পারলে জ্ঞানের পরিধিটা বৃদ্ধি পেত দিনকে দিন।

ব্যস্ততার পরিকল্পনায় বিশেষ কিছু দক্ষতা অর্জনের দিকে মনোযোগী হতে হবে আমাদের। কিছু মা-বাবা এমনও আছেন যে বই আর ঘরের মধ্যে সন্তানকে আটকে রাখতে খুব পছন্দ করেন। তাতে সন্তান হয়তো গণিত, বিজ্ঞান বা ইতিহাসের পণ্ডিত বনে যায় ঠিকই কিন্তু সাঁতার না জানার কারণে নৌকায় উঠতে ভয় পায় বা সাইকেলে চড়তে পারে না আজীবন। বাবা-মায়ের ইচ্ছা সৎ ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই কিন্তু জীবন উপভোগের জন্য একদম হাতের কাছের অধিকার থেকে সন্তান বঞ্চিত হয়ে গেছে তাদের অজান্তেই।
এখানে বিশেষ দক্ষতার মধ্যে কম্পিউটার তথা তথ্যপ্রযুক্তিকে গুরুত্ব দিতে হবে। এই সময়েও এমন অনেক ভালো ছাত্র পাওয়া যাবে যারা হুবহু বইয়ের পাতা মুখস্থ বলতে পারে ঠিকই কিন্তু কম্পিউটারের মাউসটা ঠিকমতো ধরতে পারে না এখনো। এবং আরো দুঃখজনক ব্যাপার হলো বছরের পর বছর চলে গেলেও সামান্যতম অগ্রগতি হয় না তাদের। কী করতে কী হয় এই হীনম্মন্যতায় তাদের আর শেখা হয়ে ওঠে না কিছুই। অথচ বিভিন্ন বিষয়ের টুকিটাকি জ্ঞান আমাদের জীবনকে সহজ করে দেয়। বিশেষ প্রতিভা থাকলে নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে তাকে শাণিত করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে রাতারাতি স্টার বনে যাওয়ার রোগে যেন না পেয়ে বসে। লেখালেখি শুরু করার পরের দিনই পত্রিকায় ছড়া ছাপেনি বলে পেরেশান হওয়ার প্রবণতা তরুণদের মাঝে খুব দেখা যায়।

ক্যারিয়ার ডিজাইনেও আমাদের মনোনিবেশ করা দরকার। যে ব্যস্ততায় ক্যারিয়ার ভাবনা নেই তা সময়ের ব্যবধানে নির্ঘাত মুখ থুবড়ে পড়বে। মানবতার কল্যাণে সামাজিক কিছু কাজের পরিকল্পনা থাকতেই হবে। লক্ষ্য রাখতে হবে যেন এর উদ্দেশ্য শুধুই লোকদেখানো না হয়ে যায়। শারীরিকভাবে সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত খেলাধুলা ও ব্যায়ামও হতে পারে আমাদের পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ। আবার নিয়মিত ব্যস্ততার মধ্যে পরিবার, আত্মীয় স্বজনের খোঁজখবর রাখার কথা ভুলে গেলে চলবে না।
ব্যস্ত আমাদের থাকতেই হবে। যে বৃদ্ধ মানুষটার বাহ্যত কোনোই কাজ নেই তাকে অন্তত বাচ্চা সামলাতে দিন। তবুও যেন অলস মনে শয়তানের বেগার না খাটে। ব্যস্ত থাকা মানেই ভালো থাকা। ব্যস্ত মনের দেয়াল ভেদ করে হতাশা ও হীনম্মন্যতা প্রবেশ করতে পারে না কখনো। ফলে জীবন হয়ে ওঠে বেশ উপভোগ্য।
লেখক : প্রাবন্ধিক

SHARE

Leave a Reply