উপমহাদেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ রহ. অধ্যাপক মুজিবুর রহমান

ইন্নাল হামদা লিল্লাহ। আসসালাতু অসসালামু আলা রাসূলিল্লাহ ওয়া আলা আলিহি ওয়া আসহাবিহি আজমাইন।

কিছু ব্যক্তি এমন থাকেন যাদের কথা খুব মনে পড়ে; সহজে ভুলা যায় না। মরহুম মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ছিলেন সেই ধরনের এক ব্যক্তিত্ব। বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনে তার অবদান অবর্ণনীয়। এমন জেলা খুব কমই আছে যেখানে তাঁর অবদান নেই। যেখানে বসে কোনো বৈঠক করার জায়গা ছিল না সেখানে অধিকাংশ জায়গায় তিনি মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানার মতো অসংখ্য দাতব্যপ্রতিষ্ঠান কায়েম করে সাদকায়ে জারিয়ার কাজ করে গেছেন, ইসলামী আন্দোলনের জন্য জায়গা করে দিয়ে আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে আছেন। মরহুম মাওলানা আবুল কালাম ইউসুফ ছিলেন বাংলাদেশ তথা দক্ষিণ এশিয়ার প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সুলেখক, গবেষক এবং একজন বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ। উপমহাদেশেরে প্রখ্যাত হাদীসবিশারদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট আলেমে দ্বীন, অসংখ্য আলেম-ওলামার রুহানি উস্তাদ, সাবেক মন্ত্রী, বহু গ্রন্থপ্রণেতা মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ। আল্লাহর দ্বীনের এই একনিষ্ঠ দায়ী দেশে-বিদেশে দ্বীনের দাওয়াত প্রচার-প্রসারে ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করেছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন অসংখ্য মসজিদ, মাদরাসা ও সামাজিক সংগঠন। চাষিদের জন্য কল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তাদের তিনি ছিলেন অন্যতম। সামাজিক অনাচার, দুরাচার মুক্ত করতে তিনি আমৃত্যু ভূমিকা পালন করেছেন।

বাংলা বিশ্বকোষে মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ একজন বাংলাদেশী ধর্মীয় পণ্ডিত, লেখক ও ইসলামী রাজনীতিবিদ ছিলেন। তিনি হাদীস অধ্যয়নের বিশেষজ্ঞ ছিলেন: তিনি হাদীস বিজ্ঞানের উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য মমতাজ আল-মুহাদ্দেসিন উপাধি অর্জন করেন এবং এ বিষয়ে তিনি অনেক বই প্রকাশ করেছেন। তিনি ১৯২৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি বাগেরহাট জেলার শরণখোলা উপজেলার রাজইর গ্রামে মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
মাওলানা ইউসুফ বহু জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। তিনি ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ চাষী কল্যাণ সোসাইটির চেয়ারম্যান, ৩০ বছরেরও বেশি সময় দারুল-আরবীয়া ওয়া দারুল-ইফতা বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং ৬০ বছরেরও বেশি সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। মিথ্যা অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাকে কারাবন্দী করে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মারা যান।” তিনি বাংলাদেশ থেকে আরবী ভাষার মাসিক ‘আল-হুদা’ প্রকাশ করেন যার মধ্যপ্রাচ্যে এটির বিস্তৃত প্রচলন রয়েছে।

মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলা রাজাইর (শরণখলা) গ্রামের বাসিন্দা। তিনি প্রাথমিক শিক্ষা তার গ্রামের স্কুল এবং পরে রায়েন্দার একটি স্কুল থেকে সম্পন্ন করেন। তার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা বরিশাল গলুয়া থেকে সম্পন্ন করেন। তিনি শর্ষিনা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে নাহু ও সরফ (আরবী ব্যাকরণ ও অঙ্গসংস্থানবিদ্যা) শিক্ষার পাশাপাশি হাদীস ও কুরআনের তাফসির বিষয়ে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন।

মাওলানা ইউসুফ তার স্নাতক (ফাজিল) এবং স্নাতকোত্তর (কামিল) শিক্ষা সম্পন্ন করেন ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে। ১৯৫০ সালে তিনি পূর্ব পাকিস্তান মাদ্রাসা বোর্ডের অধীনে ফাজিল (সম্মান) পরীক্ষায় মেধার ভিত্তিতে দেশে প্রথম স্থান অর্জন করেন। একই সময় ফুলহাতা গ্রামের অয়েজুদ্দীন মোল্লার কন্যা রাবিয়া খাতুনকে বিয়ে করেন। এরপর তিনি ১৯৫২ সালে স্নাতক (কামিল) পরীক্ষা শেষ করেন, মমতাজ আল-মুহাদ্দেসিন হিসাবে স্বীকৃতি অর্জন করেন, দক্ষিণ এশিয়ার ইসলামের পণ্ডিতদের কাছে এটি সর্বোচ্চ সুনাম।
তিনি ১৯৫২ সালে মাদ্রাসা শিক্ষক হিসাবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ১৯৫৮ সালে খুলনা আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হন। তিনি মঠবাড়িয়া (বরিশাল) এর টিকিট সিনিয়র মাদ্রাসায়ও শিক্ষকতা করেছিলেন, যেখানে তিনি প্রধান শিক্ষক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
ছাত্রজীবনে মাওলানা ইউসুফ মেধাবী ছাত্র ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তান মাদরাসা বোর্ডের অধীনে অনুষ্ঠিত পরীক্ষায় প্রথম স্থান অধিকার করে সরকারি বৃত্তি লাভ করেন।
ছাত্রজীবন থেকে তিনি ছাত্রসংগঠনে সক্রিয়ভাবে জড়িত হয়ে পড়েন। জমিয়তে তালাবায়ে আরাবিয়ার একজন কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। তিনি ব্রিটিশবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। পঞ্চাশ এর দশকে মাওলানা ইউসুফ ইসলামী আন্দোলন এর সংস্পর্শে আসেন। ১৯৫২ সালের মাঝামাঝি তিনি জামায়াতে ইসলামীতে একজন মুত্তাফিক হিসাবে যোগদান করেন। একই বছরে ডিসেম্বরে তিনি পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর (রুকন) সদস্যপদ লাভ করনে।

মাওলানা আবুল কালাম মুহাম্মদ ইউসুফ ১৯৫২ সালে জামায়াতে ইসলামীতে যোগদান করেন। তিনি ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দলের খুলনা বিভাগের আমির ছিলেন। সামরিক আইন প্রত্যাহারের পরে মাওলানা ইউসুফকে দলের পূর্ব পাকিস্তান বিভাগের জন্য নায়েব-ই-আমির পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। তিনি সাইয়িদ আবুল আ’লা মওদূদীর নেতৃত্বে টানা তিনবার পূর্ণ মেয়াদে জামায়াতের মজলিসে শূরা (কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী পরিষদ) এর সদস্যও ছিলেন। স্বাধীনতা-উত্তর পরপর তিনবার জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।
মরহুম মাওলানা জাতীয় রাজনীতিতে একজন ভালো বক্তা ছিলেন। সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সুচিন্তিত বক্তব্য রাখতেন। মাওলানার তথ্যবহুল উদাহরণ সংবলিত সরস বক্তব্য শ্রোতাদের জন্য আকর্ষণ সৃষ্টি করতো। আওয়ামী লীগ গোড়া থেকেই জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতা করে এসেছে। জামায়াতের জনসভা পণ্ড করা মাইক ভাঙচুরসহ কর্মীদের আহত করা শহীদ করা পর্যন্ত সকল কাজ তারা করে আসছে। একবার এক জনসভায় আমি ছিলাম। সবেমাত্র ছাত্রজীবন শেষ করে জামায়াতে যোগ দিয়েছি। তিনি রূপকভাবে বলছিলেন, আওয়ামী লীগের কর্মী মানেই মাথা গরম এক লোক। এদের মাথা এতই গরম যে আপনি চা বানানোর জন্য পানি গরম করতে চুলার দরকার হবে না। চুলার বদলে আওয়ামী লীগের কর্মীর মাথায় পানির কেটলি এক মিনিট চেপে ধরবেন পানি এমনিতেই গরম হয়ে যাবে। তার কথার যথার্থতা এখন দেখা যাচ্ছে। ইসলামী আন্দোলনের নেতাকর্মীদের উপর গুম খুন ধর্ষণ জেল জুলুম অত্যাচার নির্যাতন যেভাবে তারা চালিয়ে যাচ্ছে তাতো আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।

তিনি সকলের সাথে হাসিমুখে কথা বলতেন। মাঝে মধ্যেই কথার ফাঁকে হাস্যরসের উপমা টানতেন। এ ব্যাপারে নায়েবে আমির জনাব মাওলানা আবদুস সুবহান রাহিমাহুল্লাহ এক নম্বরে থাকবেন বলে অনেকেই মনে করেন, এর পরেই মাওলানার কথা মনে পড়ে যায়। মাওলানা আবুল কালাম ইউসুফ সাহেবের একটা স্মৃতি মনে পড়ল। তিনি আমাকে একটা গল্প শুনালেন। উন্নতি করার জন্য অনেক সময় লাগে ও কষ্ট করা লাগে, অবনতির জন্য সময় লাগে না। দু’জন লোক একসাথে যাচ্ছিল। সাথের লোকটি অনেক সময় ধরে একটি গাছের উপরে উঠেছে। কিন্তু হঠাৎ ডাল ভেঙে নিচে ধপাস করে পড়ে গেছে। সাথের লোকটি বলল যাই হোক তুমি খুব দ্রুতই নিচে নামতে পেরেছ। তিনি বুঝালেন অধঃপতনের জন্য সময় লাগে না। উন্নতির জন্যই সময় লাগে।

বিবাহিত জীবনে তার ১১টি সন্তান হয়। এর মধ্যে তিনটি কন্যাসন্তান একেবারেই অপরিণত বয়সে মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে তার ৮ সন্তানের মধ্যে পাঁচটি কন্যা ও তিনটি পুত্রসন্তান রয়েছে। তিনি জামায়াতে ইসলামীসহ বিভিন্ন সংগঠনের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৫৮ সালের অক্টোবর পর্যন্ত মাওলানা এ কে এম ইউসুফ জামায়াতে ইসলামীর খুলনা বিভাগের আমির হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতের নায়েবে আমির হিসাবে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। তিনি তিন টার্ম সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর তিনি নায়েবে আমির এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত সিনিয়র নায়েবে আমিরের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭৭ সালে ১৪ জুন কৃষকদের সেবার ব্রত নিয়ে সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ চাষীকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। মাওলানা এ কে এম ইউসুফ এই সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। এ ছাড়া তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে দারুল আরাবিয়া হতে আরবী ভাষায় একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এটা ছিল বাংলাদেশের একমাত্র আরবী পত্রিকা। ১৯৭৭ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ চাষীকল্যাণ সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন ও সমিতির প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন। তিনি ১৯৯৫ সাল থেকে দারুল আরাবিয়া হতে আরবী ভাষায় একটি মাসিক পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। এটা ছিল বাংলাদেশের একমাত্র আরবী পত্রিকা। তিনি ‘মহাগ্রন্থ আল কুরআন কী ও কেন’, ‘হাদীসের আলোকে মানবজীবন’, ‘আমার আমেরিকা, কানাডা ও ইংল্যান্ড সফর’, ‘দেশ হতে দেশান্তরে’ (১৩টি দেশের ভ্রমণ কাহিনী), ‘কুরআন-হাদীসের আলোকে জিহাদ’, ‘মাওলানা মওদূদী ও জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার অন্তরালে’ নামে গুরুত্বপূর্ণ বই প্রকাশ করেন। তিনি ৬০-এর দশকে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত পিডিএম এবং ডাক-এর কেন্দ্রীয় সদস্য ছিলেন। তিনি বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেন। তিনি প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত একজন বিচক্ষণ ব্যক্তি ছিলেন। পার্লামেন্টের সদস্য হিসেবে তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে অত্যন্ত বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেছেন।
১৯৬২ সালের নির্বাচনে মাওলানা ইউসুফ তার নির্বাচনী এলাকা খুলনা ও বরিশালের পক্ষে প্রার্থী হওয়ার জন্য জামায়াতকে মনোনীত করেছিলেন। আলিয়া মাদ্রাসায় শিক্ষকতার অবস্থান থেকেও ছুটি নিয়ে তিনি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং জয়ী হন। ৩৫ বছর বয়সে তিনি পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সর্বকনিষ্ঠ প্রতিনিধি ছিলেন।

তিনি ১৯৬০-এর দশকে স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে নাগরিক অশান্তি আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত পাকিস্তান গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (পিডিএম) এবং পরে শেখ মুজিবুর রহমানের মতো উল্লেখযোগ্য নেতাদের পাশাপাশি কাজ করেছিলেন ডেমোক্র্যাটিক অ্যাকশন কমিটিতে (ডিএসি) অংশ নিয়েছিলেন। আতাউর রহমান খান, নবাবজাদা নসরুল্লাহ খান, চৌধুরী গোলাম মোহাম্মদ প্রমুখ ব্যক্তিদের সাথে সমসাময়িক আন্দোলন করেছেন।
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ ইসলামী দাওয়া বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার, বাহরাইন, আরব আমিরাত, ওমান, জর্দান, মিসর, সুদান, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলংকা, গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা ও কানাডা ভ্রমণ করেছেন। তিনি প্রায় ৩০টি দেশে ভ্রমণ করেছেন। এসব দেশ সফরকালে আন্তর্জাতিক ইসলামী ব্যক্তিদের সাথে সাক্ষাৎ করে মতবিনিময় করেছেন এবং বিভিন্ন সংস্থার সম্মেলনে অংশগ্রহণ করে বক্তব্য পেশ করেছেন।

মাওলানা এ কে এম ইউসুফের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠা ৪ শতাধিক মসজিদ, মাদরাসা ও এতিমখানা গরিবদের মধ্যে সুদমুক্ত ঋণ প্রদান, প্রতিবন্ধীদের সাহায্য পুনর্বাসন কার্যক্রম, বয়স্ক, গরিবদের বিয়েতে সহযোগিতা, বিধবা ও স্বামী পরিত্যক্তা দুস্থ মহিলাদের সাহায্য অনুদান পরিচালনা করে গেছেন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী জনাব আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ (আল্লাহ তার শাহাদাত কবুল করুন) যৌতুকবিহীন বিবাহ সম্পাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানগুলোতে মাঝে মধ্যে মন্ত্রী হিসেবে প্রধান অতিথি থাকতেন। জাতীয় প্রেস ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে আমার থাকার সুযোগ হয়েছিল যেখানে শত শত যৌতুকবিহীন বিবাহ ও পঙ্গু লোকদের জন্য হুইল চেয়ার প্রদানের কাজ সম্পন্ন করে গেছেন। তিনি কৃষি কর্মকর্তাদের কাজে লাগিয়ে প্রচুর জনকল্যাণমূলক কাজ করে গেছেন।

কাজ করতে গেলে ভুল-ত্রুটি হতেই পারে- আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা যেন মাফ করে দেন। তার মৃত্যুতে আমরা একজন জাতীয় অভিভাবককে হারিয়েছি এবং ইসলামী আন্দোলন এক মহান প্রাণপুরুষকে হারিয়েছে।
মাওলানার সাথে সর্বশেষ দেখা ও কথা হয়েছিল কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার-১ এর চতুর্থতলার ডিভিশনে। পরস্পর খোঁজখবর নেয়ার পর বললেন আপনার লেখা আখেরাতের প্রস্তুতি বইটি আমার স্ত্রী দাওয়াতি কাজে অনেক বিলি বণ্টন করেছেন। দাওয়াতি কাজে তিনি খুবই আগ্রহী। সামনের সপ্তাহে দেখা করার জন্য তার পরিবার এলে আমি তাকে আমার শুকরিয়া ও সালাম পৌঁছানোর সেই সাথে দোয়া করার জন্য অনুরোধ করেছিলাম। পরে গাজীপুর জেলে স্থানান্তর হওয়ার সময় আমি সালাম দিয়ে চলে এলাম। সেদিন জানতে পারিনি ঐ সালামই যে জীবনের শেষ সালাম হয়ে যাবে! এর পরে আর কথাও হলো না দেখাও হলো না। আল্লাহ রহম করুন-আমিন।

সরকার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবেলা করতে ব্যর্থ হয়ে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের হত্যা করার চক্রান্ত করেছে। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে প্রহসন করে শীর্ষ নেতাদের পরিকল্পিতভাবে হত্যার গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন মাওলানা এ কে এম ইউসুফকে কথিত বিচারের নামে কারারুদ্ধ করে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।
ইসলামের প্রচার ও প্রসার তথা ইসলামী আন্দোলনকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি ছিলেন হাজারো আলেমে দ্বীনের উস্তাদ।
মাওলানা এ কে এম ইউসুফ রাহিমাহুল্লাহ মৃত্যুর প্রস্তুতি হিসেবে গ্রেফতারের আগে তার পরিবার ও শুভাকাক্সক্ষীদের উদ্দেশ্যে একটি অসিয়তনামা লিখে রেখেছিলেন, এখানে তা সংক্ষিপ্তভাবে উল্লেখ করা হলো;
“আমার বয়স এখন ৮৭ বছরে উপনীত হয়েছে। যে কোনো সময় আল্লাহর পক্ষ থেকে পরপারের আহ্বান আসতে পারে, আমি পরম করুণাময় আল্লাহর একজন ক্ষুদ্র বান্দাহ ও দাস। আমি জীবনভর দ্বীনের পথ অনুসরণ করে চলার চেষ্টা করেছি। যদিও চলার পথে ইচ্ছা-অনিচ্ছায় ভুল-ভ্রান্তিও হয়েছে। যার জন্য আমি মহান আল্লাহর দরবারে ক্ষমাপ্রার্থী ও তার করুণার ভিখারি।

আল্লাহ নিজেই ঘোষণা দিয়েছেন: ‘তোমরা আমার রহমত হতে নিরাশ হবে না। আল্লাহ তোমাদের গুণাহসমূহ মাফ করে দিবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল ও দয়ালু।’ (আল যুমার : ৫৩)
তোমরা আত্মীয়-স্বজনদের অধিকারের ব্যাপারে যেমন সতর্ক থাকবে, তেমনি সতর্ক থাকবে প্রতিবেশী ও দরিদ্রের অধিকারের ব্যাপারে। মুসলিম উম্মাহর কল্যাণের কথাটাও যেন তোমাদের চিন্তায় থাকে।
সাধ্যের মধ্যে থেকে তোমরাও কিছু সদকায়ে জারিয়াহ্ কাজ করবে। কেননা সদকায়ে জারিয়াহ সওয়াব মৃত্যুর পরেও আমলনামায় জমা হতে থাকে। আমার শেষ উপদেশ হলো, নামায, রোজা, জাকাত নিয়মিত আদায়ের ব্যাপারে আদৌ গাফিলতি করবে না। গুনাহের কাজের ধারে কাছেও যাবে না।
উপরে যে অসিয়ত আমি আমার সন্তান-সন্ততিদের উদ্দেশ্যে করলাম, ঐ একই অসিয়ত আমার আন্দোলনের সাথী প্রবীণ ও তরুণদের জন্যও রইল। মরহুমের নেক আমলগুলোকে কবুল করে নিয়ে আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের উচ্চ মর্যাদা দান করুন।”

মরহুম মাওলানা আবুল কালাম ইউসুফ ছিলেন দক্ষিণ এশিয়ার বরেণ্য আলেমে দ্বীন, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, সুলেখক, গবেষক, প্রথিতযশা সাংবাদিক এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিক। তার মৃত্যুতে আমরা একজন জাতীয় অভিভাবককে হারিয়েছি এবং ইসলামী আন্দোলন এক মহান প্রাণপুরুষকে হারিয়েছে। তিনি তার কর্ম ও চিন্তা-চেতনায় ইসলামকে বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য আমৃত্যু সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তার গতিশীল নেতৃত্ব, সৃজনশীল চিন্তা-চেতনায়, ক্ষুরধার লেখনী ও বস্তুনিষ্ঠ গবেষণার মাধ্যমে ইসলামী আন্দোলন নব-উদ্যম ও গতিশীলতা পেয়েছে। যা নতুন প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হিসেবে ইতিহাসের পাতায় স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
চিকিৎসা মানুষের মানবিক ও মৌলিক অধিকার হলেও এই সরকারের যাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে ৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৪ সালে মাওলানা ইউসুফ কারাগারে ইন্তেকাল করেছেন।

একটি আকুল আবেদন

ইসলামী আন্দোলনের ভাইবোনদেরকে যাদেরকেই মনে পড়বে সেইসাথে আপনজন আত্মীয়স্বজন সকলের জন্য নি¤েœর এ দোয়াটি পাঠ করবেন-
প্রিয় নবীর ভাষায় তার জন্য দোয়া করি-
‘হে আল্লাহ তুমি তাকে মাফ করো, তাকে রহম করো, তাকে নিরাপত্তা দাও, তাকে সম্মানিত মেহমান বানাও, তার কবরকে প্রশস্ত করে দাও, তাকে পানি, বরফ ও শিলারাশি দ্বারা ধৌত করে দাও, তার গুনাহগুলো দূর করে দাও যেমন সাদা কাপড় থেকে ময়লা দূর করা হয়, তাকে দুনিয়ার বাড়ি-ঘরের চেয়ে উত্তম বাড়ি-ঘর দান কর, দুনিয়ার আহলের চাইতে উত্তম আহল দান কর, দুনিয়ার সাথী-সঙ্গীর চেয়ে উত্তম সাথী-সঙ্গী দান কর। তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও, তাকে আগুনের আযাব থেকে রক্ষা করো- আমিন।’ (মুসলিম ২/৬৬৩)

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে দোয়া করি তিনি যেন মেহেরবানি করে আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি মাফ করে দেন, জানা অজানা, ছোট বড়, গোপন প্রকাশ্য, ইচ্ছাকৃত অনিচ্ছাকৃত সকল গোনাহখাতা মাফ করে দেন। আমাদের পিতা-মাতা বন্ধু বান্ধব আত্মীয়স্বজন ও দ্বীনি ভাইবোন সকলকে মাফ করে দিয়ে কিয়ামতের ভয়াবহ দিনের জন্য তার কাছে সংরক্ষিত ৯৯টি রহমত দিয়ে আমাদেরকে জান্নাতুল ফিরদাউসে বসবাস করার তৌফিক দান করেন। আমিন অআখিরু দাওয়ানা আনিল হামদুলিল্লাহি রব্বিল আলামিন।
‘সুবহানাকা আল্লাহুম্মা অবিহামদিকা আসহাদু আন লাইলাহা ইল্লা আনতা আসতাগফিরুকা অআতুবু ইলায়কা’

তার লিখিত বইসমূহ-
– বাংলাদেশে ইসলামের আগমন
– উসমানী খিলাফাতের ইতিকথা
– যুগে যুগে ইসলামী আন্দোলন
– ইসলামী নেতৃত্ব
– দারসুল কুরআন সংকলন-১
– সফল জীবনের পরিচয়
– ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতি
– ইসলামের সোনালি যুগ
– আল্লাহর পরিচয়
– দারসুল কুরআন সংকলন-২
– ইসলামী জাগরণের তিন পথিকৃৎ
– আদর্শ মানব মুহাম্মদ সা.
– আসহাবে রাসূলের জীবনধারা
– ইসলামী সংগঠন
– ইসলামী বিপ্লবের স্বাভাবিক পদ্ধতি
– যুগে যুগে ইসলামী জাগরণ
– সত্যের সেনানী
– সূরা হামিমুস সাজদাহর ৩০ থেকে ৩৩ নাম্বার আয়াতের শিক্ষা
– সূরা আশ্ শূরার তেরো নাম্বার আয়াতের শিক্ষা
– শাহাদাত নাজাতের সহজ পথ
– আলহায়াতুদ দুনিয়া ওয়াল আখিরাহ
– পুরুষ ও মহিলাদের স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্র
– আল্লাহর দিকে আহবান
– জামায়াতে ইসলামীর ইতিকথা
– আমানত ও আমানতদারি
– ইসলামী সংগঠনে নেতা নির্বাচন
– সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (জীবনীগ্রন্থ)

লেখক : ইসলামী চিন্তাবিদ ও সাবেক সংসদ সদস্য

SHARE

Leave a Reply