এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা হারুন ইবনে শাহাদাত

রাজনৈতিক আদর্শ পছন্দ করার স্বাধীনতা মানুষের জন্মগত অধিকার। জন্মভূমি বাছাই করার ক্ষমতা কোনো মানুষের নেই। একজন মানুষ কোথায় জন্মগ্রহণ করবে এক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছেই চূড়ান্ত। তাই কাউকে নিজ জন্মভূমি থেকে বহিষ্কার বা বাস্তুচ্যুত করা জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার সনদ অনুসারে মানবতাবিরোধী অপরাধ। একজন মানুষ জন্মগ্রহণ করার পর জন্মভূমির ওপর রাজনৈতিক অধিকার আপনা থেকেই লাভ করে। জন্মভূমিকে ভালোবাসা এবং এর মানুষের ভালো-মন্দ চিন্তা এবং কল্যাণের জন্য কাজ করা সবই রাজনৈতিক অধিকারের মধ্যে পড়ে। আধুনিক সভ্য দুনিয়ায় রাজনীতি এখন আর শুধু রাজাদের বিষয় নয়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সাধারণ জনগণই তাদের শাসককর্তা বা রাজা নির্বাচন করেন। এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করার অধিকার সংবিধানের শর্ত পূরণকারী প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে। জনগণকে এই অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোন ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দল যখন শাসনক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে চায়, সভ্য দুনিয়ার মানুষের কাছে তাদের পরিচয় স্বৈরাচার। এই স্বৈরশাসকদের হাত থেকে জনগণের অধিকার রক্ষার জন্য প্রণীত হয়েছে সার্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্র বা সনদ। এই ঘোষণাপত্রে উল্লিখিত এ সংক্রান্ত কয়েকটি ধারা আলোচানার সুবিধার্থে তুলে ধরা হলো :
ধারা ১৮ : প্রত্যেকেরই ধর্ম, বিবেক ও চিন্তার স্বাধীনতায় অধিকার রয়েছে। এ অধিকারের সঙ্গে ধর্ম বা বিশ্বাস পরিবর্তনের অধিকার এবং এই সঙ্গে, প্রকাশ্যে বা একান্তে, একা বা অন্যের সঙ্গে মিলিতভাবে, শিক্ষাদান, অনুশীলন, উপাসনা বা আচারব্রত পালনের মাধ্যমে ধর্ম বা বিশ্বাস ব্যক্ত করার অধিকারও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
ধারা ১৯ : প্রত্যেকেরই মতামত পোষণ এবং মতামত প্রকাশের স্বাধীনতায় অধিকার রয়েছে। অবাধে মতামত পোষণ এবং রাষ্ট্রীয় সীমানা নির্বিশেষে যে কোনো মাধ্যমের মারফত ভাব এবং তথ্য জ্ঞাপন, গ্রহণ ও সন্ধানের স্বাধীনতাও এ অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।
ধারা ২০ : ১. প্রত্যেকেরই শান্তিপূর্ণ সমাবেশে অংশগ্রহণ ও সমিতি গঠনের স্বাধীনতায় অধিকার রয়েছে। ২. কাউকে কোন সংঘভুক্ত হতে বাধ্য করা যাবে না।
ধারা ২১ : ১. প্রত্যক্ষভাবে বা অবাধে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে নিজ দেশের শাসন পরিচালনায় অংশগ্রহণের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। ২. নিজ দেশের সরকারি চাকরিতে সমান সুযোগ লাভের অধিকার প্রত্যেকেরই রয়েছে। ৩. জনগণের ইচ্ছাই হবে সরকারের শাসন ক্ষমতার ভিত্তি; এই ইচ্ছা নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে অনুষ্ঠিত প্রকৃত নির্বাচনের মাধ্যমে ব্যক্ত হবে; গোপন ব্যালট কিংবা সমপর্যায়ের কোনো অবাধ ভোটদান পদ্ধতিতে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
সার্বজনীন মানবাধিকারের ঘোষণাপত্রের আলোকে কেমন আছে আমাদের প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশ। তা ব্যাখ্যা না করলেও সচেতন প্রত্যেক নাগরিকের কাছে পরিষ্কার। দেশে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের পর থেকে কার্যত নাগরিকদের সকল রাজনৈতিক অধিকার লুণ্ঠিত হয়েছে। বিশ্ববাসীর কাছে সাধু সাজতে রাজনৈতিক দলগুলোকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু মাথা তুলে দাঁড়াতেও দেয়া হচ্ছে না। বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জনপ্রিয় বিরোধী দলীয় জোট ২০ দলের শীর্ষনেতাদের বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় শুধু হয়রানি নয়, বিচারের মুখোমুখি করে মৃত্যুদণ্ডও দেয়া হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গৃহবন্দী, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান নির্বাসনে। ২০ দলীয় জোটের অন্যতম প্রধান দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমির, সেক্রেটারি জেনারেল, নায়েবে আমির, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নির্বাহী পরিষদের কয়েকজন সদস্যকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। বর্তমান নায়েবে আমির সাবেক সংসদ সদস্য আনম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক সংসদ সদস্য মাওলানা হামিদুর রহমানসহ কয়েকজন নেতাকে সম্প্রতি গ্রেফতার করা হয়েছে। সরকারের চলমান প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে বিরোধী দলের নেতাদের গ্রেফতার নির্যাতন অব্যাহত আছে। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র ও গোপন বৈঠক। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিরোধী দল গোপনে কিংবা প্রকাশ্যে বৈঠক করবে, এটা কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। জনগণের সমর্থন নিয়ে কর্মকৌশল প্রণয়নের জন্য গোপন বৈঠক করা কোনো অপরাধ নয়। সরকারের বিরোধিতা মানে রাষ্ট্রবিরোধিতা বা রাষ্ট্রদ্রোহ নয়। বরং সরকার জনগণ ও দেশের জন্য কল্যাণ মনে করে কোনো উদ্যোগ নিলে বিরোধী দল যদি মনে করে তাতে লাভে চেয়ে ক্ষতির পাল্লা ভারী তাহলে কঠোর ভাষায় তার সমালোচনা তাদের সংবিধান স্বীকৃত অধিকার। সমালোচনায় কাজ না হলে জনমত গঠন করে রাজপথে আন্দোলন এমনকি সরকার পতনের ডাকও দিতে পারে। সরকার গণতান্ত্রিক পন্থায় এই সঙ্কট মোকাবেলায় জনমত যাচাই করবে। জনমতকে উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জোর খাটানো গণতন্ত্রের ভাষা না। গণতান্ত্রিক সরকারের কাজ নয়।

বিরোধী দলের মিছিল, মিটিংসহ সব কর্মসূচি বাস্তবায়নে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সহযোগিতা করবে। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে দিয়ে সহযোগিতা করতে ব্যর্থ হলে কোনো অঘটন ঘটলে তার দায় সরকারকেই নিতে হয়। গোপন বৈঠকের সিদ্ধান্তের গোপনীয়তা রক্ষার দায়িত্বও সরকারের। বিরোধীদলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের গোপন সংবাদ সংগ্রহ করার অপরাধে সরকারের পতন হওয়ার ইতিহাসও আছে। যেসব সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী এ কাজে সহযোগিতা করেন তাদের শুধু চাকরি থেকেই বহিষ্কার করা হয় না, বিচার করে জেলেও প্রেরণ করা হয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় প্রত্যেক রাজনৈতিক দল তাদের কর্মকৌশল নির্ধারণের জন্য একান্তে নিজেরা বসেন। এর মধ্যে এমন কিছু বৈঠকও আছে যাতে নিজ দলের সকল কর্মীদেরও রাখা হয় না। এসব বৈঠকে নির্দিষ্ট কমিটির সদস্যরাই বসার অনুমতি পান। এদিক বিবেচনা করলে এসব বৈঠক অবশ্যই গোপন বৈঠক। রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে এ জাতীয় বৈঠকে ব্যাঘাত সৃষ্টি করা কিংবা এসব বৈঠকে কী আলোচনা হলো সে খবর সংগ্রহের চেষ্টা করা গণতান্ত্রিক আচরণের পরিপন্থী। সংবিধান স্বীকৃত দল গঠন, সভাসমাবেশ করার মৌলিক অধিকারে লঙ্ঘন করার শামিল। একাজে সরকারের কোন কর্মকর্তা কর্মচারী জড়িত থাকলে তার শাস্তি বিধান করা সত্যিকারে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বাধীন বিচারব্যবস্থার বিচারকদের পবিত্র দায়িত্ব। আমেরিকার ওয়াটারগেট কেলেঙ্কারির কথা আমরা জানি। ১৯৭৪ সালে আমেরিকার ডেমোক্র্যাকি পার্টির কনভেনশন চলাকালে রিপাবলিকান দলের কয়েকজন সদস্য আড়িপাতা যন্ত্র স্থাপন করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন। একাজে সহযোগিতা করার অপরাধে নিক্সন প্রশাসনের অনেককে জেলে যেতে হয়েছিল। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী সচেতন নাগরিকদের সমালোচনার মুখে প্রেসিডেন্ট নিক্সন পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধীদলের কর্মকৌশল নির্ধারণের জন্য গোপন বৈঠক করা মৌলিক অধিকার। সম্মানের সাথে এ অধিকার নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। যে সরকার এ দায়িত্ব পালন করেন না, সে সরকার গণতান্ত্রিক নয়, ফ্যাসিবাদী। মুখে যতই গণতন্ত্রের কথা বলুক না কেন? তারা একবার ছলেবলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারলে ষড়যন্ত্র করে চিরদিন মসনদ ধরে রাখার জন্য। নিজেরা জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির মাধ্যমে জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা না করে, অন্যদলের অন্য দলের কর্মসূচি পালনে বাধা সৃষ্টি করে। বিরোধীদলকে গণসংযোগ করতে দিতে ভয় পায় নিজেদের দুর্নীতি অপর্কীতি ফাঁস হয়ে যাওয়ার ভয়ে।

দুর্নীতির হাত ধরেই ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসকদের উত্থান ঘটে। ক্ষমতার অপব্যবহার করে যারা জুলুম নির্যাতন ও লুটপাট চালায় তাদেরকে একটি আতঙ্ক সব সময় তাড়া করে। ক্ষমতা হারালে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। এই ভয়ে তারা ক্ষমতা ছাড়তে চায় না। কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘খাপছাড়া’ গ্রন্থের ‘রাজব্যবস্থা’ ছড়ায় স্বৈরাচারী শাসকদের ভয়ের চিত্র এঁকেছেন এভাবে,
‘মহারাজা ভয়ে থাকে পুলিশের থানাতে,
আইন বানায় যত পারেনা তা মানাতে।
চর ফিরে তাকে তাকে,
সাধু যদি ছাড়া থাকে,
খোঁজ পেলে নৃপতিরে হয় তাহা জানাতে
রক্ষা করিতে তারে রাখে জেলখানাতে।’
সাধু অর্থাৎ ভালো মানুষদের জেলখানায় রেখে ক্ষমতা দীর্ঘ বা চিরস্থায়ী করার অপচেষ্টা সফল হয় না। এ কথা বর্তমানে যারা ক্ষমতায় আছে তাদের সোনালি এবং বিবর্ণ ইতিহাসের দুই পাতাতেই আছে।
এদেশের সরকার ও বিরোধী দলের জন্য এই সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনগণের ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেয়া। এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হওয়া ছাড়া রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার কি পারবে এই চ্যালেঞ্জে বিজয়ী হতে? অথচ এই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ভোটাধিকার রক্ষার আন্দোলনের রয়েছে সোনালি ইতিহাস। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর এদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই দিনটিতে তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম এবং শেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সে নির্বাচনের পর বিজয়ী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করে। এর জেরে শুরু হওয়া তীব্র রাজনৈতিক সঙ্কট শেষ পর্যন্ত গড়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। যার পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে। এর আগে পূর্ব পাকিস্তানে গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন আইয়ুব খান। এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান দায়িত্ব গ্রহণ করে সামরিক শাসন জারি করেন। তারপর ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অন্যতম উপদেষ্টা জি. ডব্লিউ চৌধুরীর মতে, একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের আগ্রহের কোনো ঘাটতি ছিল না। মি. চৌধুরী উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট চেয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া যেন মসৃণ হয়। আওয়ামী লীগ নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারতের জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামলী ঘোষ। তিনি পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের ওপর গবেষণা করে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তাঁর বই ‘দ্য আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। মিস ঘোষ লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রচারাভিযান শুরু করে। ১৯৭০ সালের নির্বাচনের পর বিজয়ী আওয়ামী লীগের কাছে ক্ষমতা দিতে চাননি পাকিস্তানের শাসকরা। এর পরিণতিতে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।’

১৯৭০ সালের নির্বাচনে কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ইয়াহিয়া খান সরকারের মন্ত্রিসভার কোনো সদস্যের এই নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুমতি ছিল না। জি. ডব্লিউ চৌধুরীর মতে, সেই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে হয়েছিল। জাতীয় পরিষদের সে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৬২ আসন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ১৩৮ আসন। পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সব আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সব আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রার্থী দিয়েছিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন)। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৯৩। এছাড়া পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি ৭৯ আসনে এবং জামায়াতে ইসলামী পাকিস্তান ৭০ আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। গবেষক শ্যামলী ঘোষ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিশ্লেষণ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ১৬২ আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছিল, তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ছিল আইনজীবী। এছাড়া ব্যবসায়ী ছিল ১৯ শতাংশ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিল ৬ শতাংশ। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রার্থী দেয়নি। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮ আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। কিন্তু তারা সবক’টি আসনে প্রার্থী দেয়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রার্থী সংখ্যা ছিল ১১৯। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র আটজন প্রার্থী দিয়েছিল।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সে ঝড়ের পর নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে, সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পেয়েছিল সবাই। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০ আসনে জয়লাভ করে। পূর্ব পাকিস্তানের বাকি দুটি আসনের মধ্যে যারা জয়লাভ করেছিলেন তাদের একজন হলেন নুরুল আমিন এবং অপরজন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮ আসনের মধ্যে ৮১ আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি। সে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পর আবার নতুন করে সঙ্কট শুরু হয়। জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজেকে পশ্চিম পাকিস্তানের নেতা হিসেবে দাবি করেন। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তানের নেতা হয়ে ওঠেন শেখ মুজিবুর রহমান। নির্বাচনের সময় সমগ্র পূর্ব পাকিস্তানকে একটি প্রদেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। অন্যদিকে পশ্চিম পাকিস্তানকে চারটি প্রদেশে ভাগ করা হয়। মি. ভুট্টো প্রশ্ন তোলেন, একটি প্রদেশে জয়ী হয়ে কিভাবে পুরো পাকিস্তানের শাসনভার শেখ মুজিবের হাতে তুলে দেয়া যায়? মি. ভুট্টোর এই অবস্থানের কারণে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা শুরু করেন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান।

শেখ মুজিবকে সরকার গঠনে আহ্বান করার পরিবর্তে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ১৯৭১ সালের ১ মার্চ জাতীয় পরিষদ অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষণা করেন। এর প্রতিবাদে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে পূর্ব পাকিস্তানে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়। আন্দোলন দমন করতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেফতার এবং ২৫ মার্চ রাতে যুদ্ধ শুরু করেছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। কিন্তু এত কঠোর অবস্থানের পরও আন্দোলন-সংগ্রাম দমন করতে ব্যর্থ হয় তৎকালীন পাকিস্তানি সেনাশাসক।
পাকিস্তানের স্বৈরাচারী শাসক ফিল্ড মার্শাল জেনারেল আইয়ুব খানের জুলুম-নির্যাতনের মোকাবিলা করে রাজনীতির পাঠ শুরু করেছিল বর্তমান শাসক দল আওয়ামী লীগ। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাতার আন্দোলন সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধসহ দেশের অনেক গৌরবময় অধ্যায়ের সাথে দলটির ঐতিহাসিক সংযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি শিশু গণতন্ত্রের অপমৃত্যু ঘটিয়ে একদলীয় বাকশালের জন্ম হয়েছিল তাদের হাতেই। যদিও এদেশের মানুষ বাকশালকে মেনে নেয়নি। দেশে আবার বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সেই বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থারও কবর রচিত হয়েছিল বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বন্দুকের নলে। তারপর সাড়ে ৯ বছর আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের হাত ধরে দেশে আবার জনগণের ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র ফিরে এসেছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে, ততবার গণতন্ত্রের ওপর আঘাত এসেছে। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর পর ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বাকশালের দর্শনের আলোকে বিরোধী দল জাসদ (রব) ও জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) থেকে মন্ত্রী বানিয়ে সর্বদলীয় সরকারের এক আজব গণতান্ত্রিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেছিল। দলটি ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর দলনিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকারের বিধান বাতিল করেছে। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার হরণের যে ইতিহাস আওয়ামী লীগ সৃষ্টি করেছে, তা এই জাতি কোনোদিন ভুলবে না।

এই নির্বাচনের পর বিরোধী দলের সিল-প্যাড, সাইনবোর্ড বদল না করলেও আওয়ামী লীগ সরকারে আত্তীকরণ করা হয়েছে মন্ত্রিপরিষদের সদস্য করার মাধ্যমে। রাজনীতি পর্যবেক্ষকরা এর মাঝে বাকশালের প্রতিচ্ছবি আবিষ্কার করলেও ‘সংসদীয় গণতন্ত্র’ নামেই তা চলছে। সাথে সাথে প্রকৃত বিরোধী দলগুলোর ওপর চালাচ্ছে নির্যাতনের স্টিমরোলার। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ পরমতসহিষ্ণুতা ভুলে ডাণ্ডা মেরে ঠাণ্ডা করে ক্ষমতাকে দীর্ঘায়িত করার অপকৌশল গ্রহণ করেছে এবং এখনো করে যাচ্ছে। আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করার শপথ ভুলে গিয়েছে। আদর্শিক গণতন্ত্র এবং মুক্ত সমাজের প্রশংসা মুখে মুখে করলেও, তাদের রাজত্বে সকল ব্যক্তি শান্তির পূর্ণসহাবস্থান করার সমান সুযোগ রাখেনি। জনগণ না চাইলে ক্ষমতার বাইরে গিয়েও যে তাদের পাশে থেকে দেশ ও জনগণের সেবা করা যায় সে কথা তারা বেমালুম ভুলে গেছে। বিরোধী দলকে প্রতিদ্বন্দ্বী সহায়ক শক্তি মনে না করে শত্রু বলে গণ্য করছে। তারা ভুলে গেছে গণতান্ত্রিক সভ্য দুনিয়ায় এই নীতি অচল। সরকারের এই নীতির কারণে শুধু বিরোধী দল, ভিন্নমতের মানুষই শুধু ক্ষতিগ্রস্ত হন না, দেশের উন্নয়ন অগ্রগতিতেও এর কুপ্রভাব পড়ে। সরকারও গণবিচ্ছিন্ন হয়ে চাটুকার পরিবেষ্টিত হয়ে পড়ে। দেশের বাইরের মিত্রদের কাছেও সরকারের নেতিবাচক ভাবমর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশ মিত্রশূন্য হয়।
আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জনগণের ভোটাধিকার রক্ষার দাবি জোরালো হচ্ছে। বিরোধী দল এই দাবিতে ঐক্যবদ্ধ। বাইরের মিত্ররাও চায় বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরে আসুক। প্রতিষ্ঠত হোক জনগণের শাসন। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর জুলুম নির্যাতন বন্ধ হোক।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক

SHARE

Leave a Reply